শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১২
অনামিকা তাহসিন রোজা
মেঘে ঢাকা বিকেলের আলোয় কুঁড়েঘরের মতো জীর্ণ বাড়িটা যেন আরেকটু মলিন দেখাচ্ছে। চারপাশে আগাছায় ভরা আঙিনা, এক কোণে শ্যাওলা ধরা ভাঙা কুয়া। বাঁশের বেড়া এদিক-ওদিক হেলে পড়েছে, যেন একটু জোর হাওয়াতেই ভেঙে যাবে। দরজাটা টালমাটাল, কাঠের গায়ে বয়সের দাগ, গা ঘেঁষে নেমে এসেছে খয়েরি ফাটল। ছনের চালের বেশ কয়েক জায়গায় পুরনো পলিথিন চেপে রাখা, বৃষ্টির পানির দাগে দেয়াল কালচে হয়ে গেছে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে মাটির ঘরের সেঁতসেঁতে গন্ধ, আর দূরে কোথাও যেন কেউ চুলায় ভাত চাপিয়েছে, ধোঁয়ার গন্ধ মিশে যাচ্ছে বাতাসে।
শ্রাবণ আর ধারা পা রাখলো উঠোনের সামনে। পায়ের নিচের মাটিটা শক্ত নয়, বরং কাদামাখা, ছিপছিপে। টিনের দরজাটায় একটু আঙুল দিয়ে শব্দ করে জোরে ডেকে উঠলো
—” ফুফু! ও ফুফু!”
হঠাৎই ভেতর থেকে খটখট শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। বেরিয়ে এলেন এক বয়স্কা মহিলা, মুখে লাল পান, ঠোঁটের কোণে সাদা চুনের দাগ। পুরনো, রঙ ঝরে যাওয়া শাড়ি গায়ে, চুলে পাক ধরা, তবু চোখদুটোতে আশ্চর্য উজ্জ্বলতা। মুখভরা পান চিবোতে চিবোতে খুশিতে হাঁ হয়ে গেলেন, যেন অনেকদিন পরে চেনা কাউকে দেখেছেন।
—” আরে ধারা! হায় আল্লাহ, তুই?”
কিছুটা দৌঁড়ে এসেই ধারাকে জড়িয়ে ধরলেন তার ফুফু ললিতা খাতুন।
ধারাও চোখে একরাশ হতাশা নিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” কেমন আছো ফুফু? শরীর ঠিক আছে?”
পান খাওয়া দাঁত মেলে হাসলেন ললিতা, ধারার মাথায় দুহাত নিয়ে হাত বুলিয়ে বললেন,
—” ভালা আছি রে বু, ভালা আছি! তোরে দেইখা বুকটা ভইরা গেলো!”
ধারা চোখের কোণায় আসা পানি মুছতেই ললিতা চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন পাশে দাঁড়ানো শ্রাবণকে। খানিক ভ্রু কুঁচকে নিশ্চিত হতে ধারার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। ধারা ধীর গতিতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাতেই হঠাৎ মহিলার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল,
—” আয়হায়, বাজানও আইছে দেখি!”
ললিতা খাতুনের চোখে মুখে তখন উচ্ছ্বাসের ঢেউ, পানের লাল রঙে যেন আরও ফুটে উঠেছে সেই আনন্দ। শ্রাবণও শব্দহীন হাসলো। জিজ্ঞেস করল কেমন আছেন, শরীর কেমন? প্রত্যেক প্রশ্নেই ফোকলা দাঁতে হেসে জবাব দিলেন ললিতা। তারপর দ্রুত টেনে বাড়িতে ঢোকালেন!
ললিতা খাতুনের স্বামী মা রা গিয়েছে দু বছর আগে। তখন থেকেই এই বাড়িতে তিনি একা একা বসবাস করেন। মাঝেমধ্যে ঘুরে আসেন আত্মীয় দের বাসা থেকে৷ কিন্তু দিন শেষে এই কুটিরে পৌঁছাতে হয় তাকে। একা থাকেন বলে বাড়িঘরের যত্নও নেন না ঠিকমত। কয়েক বছর আগেও এই ছোট বাড়িটা অনেক সুন্দর ছিল। ফুলের বাগানে ভরপুর ছিল উঠান, শোয়ার ঘর থেকে শুরু করে রান্নাঘর পর্যন্ত সবই ছিল অনেক গোছানো, সুন্দর, পরিপাটি। কিন্তু পরবর্তীতে বয়সের ভারে আর পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতার কারনে সবকিছু থেকে অবসর নিয়েছেন ললিতা। তবে ভাতিজি আর জামাইয়ের আসার খবর জানতেন তিনি৷ বিশ্বাস ছিল ধারা দেখা না করে শহরে ফিরে যাবে না। তাই তিনি একটা ঘর খুব সুন্দর করে পরিষ্কার করেছেন । ঘরের মধ্যে থাকা ভাঙা খাটটা মেরামত করে পরিষ্কার করেছে। মাটির ঘর হলেও মোটামুটি সবকিছু তিনি সুন্দর করে রেখেছেন।
সেই ঘরেই শ্রাবণ আর ধারাকে জায়গা করে দিলেন ললিতা। তারপর তড়িঘড়ি করে বিকেলের জন্য কিছু খাবার বানাতে ঢুকে পড়লেন ছাওনি দেয়া রান্নাঘরে। ঘরে ঢুকেই হাতের ব্যাগপ্যাক গুলো একপাশে গুছিয়ে রাখলো শ্রাবণ। মনে মনে বেশ অবাকও হলো। তাকে যে মাটির ঘরেও থাকতে হবে, এটা জানা ছিল না তার। শহরে বসে এসব ভাবতেই গা গুলিয়ে আসত।কিন্তু কেনো যেন কোনো এক অজানা কারনে এখন আর খারাপ লাগছে না। বরং বিষয়টা কে উপভোগ করছে।
আসলে মানবজীবনে সবরকম অভিজ্ঞতা থাকাই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ-পরিস্থিতি মানুষকে কখন কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, এ সম্পর্কে কেও কিছুই জানেনা। তাই প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলাটাও একটা গুণ, যা প্রত্যেককেই আয়ত্ত করে নেয়া উচিত। অক্ষমতার মধ্যে কোনো গর্ব নেই, বরং সব বিষয়ে, সব পরিবেশে নিজেকে প্রস্তুত করা, যোগ্য করাটাও একটা আত্ম-সম্মানের, পরিচয়ের চিহ্ন।
ধারা ময়লা হওয়া টেবিলটা একটা কাপড় দিয়ে মুছে ব্যাগ থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র বের করে গোছাতে থাকলো। শ্রাবণ বিছানার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— ” ধারা… বাড়িটার অবস্থা এমন কেনো?”
ধারা একটু সময় নিল, এরপর ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। ঠোঁট ভিজিয়ে বলতে শুরু করল,
—” ফুফুর স্বামী মারা যাওয়ার পর উনি একেবারেই একা হয়ে গিয়েছিলেন। সংসারের কাজকর্ম, বাড়ির যত্ন, সব কিছু থেকেই মন উঠে যায়। আগের মতো আর বাগানে ফুলের যত্ন নেন না, উঠান গুছিয়ে রাখেন না। আগে এই ঘর, এই উঠান, সব অনেক সুন্দর ছিল জানেন। আমিও ছোটবেলায় এখানে এলে এত সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে যেতাম। কিন্তু সময়… সে তো সবকিছু বদলে দেয়। ফুফা মারা যাওয়ার পর এই ছোট্ট বাড়িটা একদম ধ্বংস হয়ে গেলো! আবার ফুফুর তো সন্তানও হয়নি, তাই কেওই নেই তার!”
শ্রাবণ কপালের ভাঁজ গভীর করল, ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” তাহলে কেউ কি খোঁজও নেয় না উনার?”
ধারা ম্লান হেসে মাথা নাড়ল, বলল,
— ” শ্বশুড়বাড়ির কিছু আত্মীয়-স্বজন আসে-যায়, কিন্তু কেউই দীর্ঘ সময় এখানে থাকে না। ফুফু হয়তো একা থাকার অভ্যাস করে ফেলেছেন…কিংবা একা থাকার যন্ত্রণা ঢাকতে শিখে গেছেন।
শ্রাবণ চুপ করে রইল। এরপর ধীরে গিয়ে বসে পড়ল বিছানার উপর। বিছানার চাদর ধোয়া হয়েছে। খাটটাও নড়বড়ে হলেও মেরামত করা হয়েছে। আবার বালিশ কাঁথা সব গুছিয়ে রাখা। একটু মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারা যায় যে ললিতা খাতুন তার আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেন নি। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার। গ্রামের কিছু কিছু মানুষদের এমন উদার মনমানসিকতা সবাইকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। মনে মনে অপরাধবোধ হলো শ্রাবণের। কিছুটা লজ্জাবোধ করল।
ধারা ইতোমধ্যে জামা কাপড় সব বের করে ফেলেছে। শ্রাবণ এবার বিছানায় বসে বসেই ধারার দিকে পূর্ণদৃষ্টি ফেলল। কিছুক্ষণ ব্যস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলো নিভৃতে। মনে মনে, অকারনেই আবিষ্কার করল ধারার মুখটা অনেক স্নিগ্ধ। কখনো সাজেনি মেয়েটা। সেই যে বাসর রাতে একবার দেখেছিল, সেটাই শেষ। এরপর থেকে চোখে কাজলও দিতে দেখেনি মেয়েটাকে। যদিও বাসর রাতে শ্রাবণ খুব একটা মনোযোগ দিয়ে দেখেনি ধারাকে। ওভাবে প্রয়োজনবোধ বলে মনে করেনি। তবে আজ, এই মুহুর্তে হুট করেই ধারাকে সাজতে দেখার ইচ্ছে জাগলো।
সেজে মেয়েটা কে আরো কতটা স্নিগ্ধ দেখাবে তারই হিসেব কষতে ব্যস্ত হলো শ্রাবণ শেখ। মনে মনে ভাবলো, আচ্ছা, ওই টানা কিন্তু সরল চোখজোড়ায় কি কাজল দিলে তিব্বতের রাণীর মত দেখাবে পিচ্চি টাকে, ঠোঁটে একটু লালরঙা প্রসাধনী দিলে কি রাজকুমারীর মত দেখাবে, আর সবসময় খোপা করে রাখা লম্বা চুলগুলো খুলে দিলে কি অপ্সরা মনে হবে? সত্যিই কি মনে হবে? ধারা কি এতটা সুন্দর? উহু, তা তো জানা নেই শ্রাবণের। সে তো দেখেনি কখনো।
নিজেও অবাক হলো শ্রাবণ। ধারা যে খুব বেশি তাক লাগানোর মত সুন্দরী, তা কিন্তু না। তবে মায়াময় মুখটার স্নিগ্ধতা দেখে যে কেও হারিয়ে যেতে বাধ্য বলে মনে করল শ্রাবণ। আরেকটা জিনিস মনে পড়ল তার। ধারার খোলা চুলে শাড়ি পড়ে দেখার সৌভাগ্য এখনো হয়নি। সেটাও দেখার ইচ্ছে জাগলো। শ্রাবণ যখন তার মস্তিষ্কের বিশেষ জায়গাটায় চিন্তা করতে ব্যস্ত তখনি ধারার কাপড় ঝেড়ে গুছিয়ে রাখার শব্দে হুঁশ ফিরল তার। এতক্ষণ যাবৎ অপ্রত্যাশিত অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাভাবনার জন্য বিষম খেলো মনে মনে। শব্দ করে গলা খাঁকারি দিল।
শ্রাবণের গলা খাঁকারির শব্দে ফট করে তার দিকে তাকালো ধারা। দেখে মনে হলো, শ্রাবণের কোনো কিছু দরকার কিনা সেটা জানতে চাইছে চোখ দিয়েই। শ্রাবণ এবার ধারার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—” আমায় গোসল করতে হবে। ঘেমে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি!”
ধারা এবার একটু চিন্তায় পড়লো। চারপাশে একবার তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল। বোঝা গেল, কিছু বলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছে, এরপর মিনমিন করে বলল,
—” উম…আসলে ফুফুর বাড়িতে…মানে এখানে তো আসলে….
শ্রাবণ কপাল কুঁচকালো। মেয়েটা মাঝে মাঝেই এমন আমতা আমতা করে। ফোস করে শ্বাস ফেলে শ্রাবণ জানতে চাইলো,
— “এখানে তো আসলে কী?”
ধারা মাথা নিচু করে, গলার স্বর আরও নিচু করল, আঁচলে আঙুল দিয়ে খুট পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
— ” আসলে..এখানে কোনো বাথরুম নেই..!”
শ্রাবণ আকাশ থেকে পড়ল তৎক্ষনাৎ, মুখে অবাক ভাব ফুটে উঠল সহসা। হতবাক হয়ে অসহায় গলায় বলল,
— ” কীহ! বাথরুম নেই মানে? তাহলে মানুষ গোসল করে কোথায়?
ধারা ইতস্তত করল, হাতের আঁচলে আঙুলে পেঁচানোর গতিটা আরো ধীর করে বলল,
— ” পুকুরে… মানে বাড়ির পেছনের পুকুরেই সবাই গোসল করে..ওখানে গোসল করতে হবে! যদিও…
বাকিটা যেন গিলে ফেলল ধারা। গলার স্বরে দ্বিধা, চোখেমুখে অস্বস্তি। যেন পুকুরে গোসল করার কথা বলাটাই তার জন্য লজ্জাজনক হয়ে গেল।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এমনটা নয় যে সে সাঁতার জানেনা। কিন্তু পুকুরে গোসল করার অভিজ্ঞতা তার নেই বললেই চলে। যাক, কি আর করার! মেনে নিতে হবে- এমনটা ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। তারপর ব্যাগ থেকে টাওয়াল, টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে হাতে নিয়ে আবারো হুট করে থমকালো। ধারার দিকে তাকিয়ে হতবিহবল গলায় বলে উঠলো,
—” ওয়েট আ সেকেন্ড, বাথরুম না থাকলে বাকি কাজ কোথায় সাড়ব?”
ধারা প্রথমে কথাটার মানে বুঝলো না। তাই কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে তাকালো। শ্রাবণ বুঝলো হয়তো যেটা ভাবছে সেটাই! তাই চোখ বড় করে মাথা নেড়ে বলল,
—” ডোন্ট টেল মি যে, বাকি কাজও পুকুরে সাড়তে হবে!”
এবার বিষয়টা বুঝতে পেরে মুচকি হাসলো ধারা। মাথা নেড়ে বলল,
—” না না, বাকি কাজের জন্য জায়গা আছে। শুধু জায়গাটা বাড়ির পিছনের দিকেই আর ওখানে আপনাদের বাড়ির মত কমোড নেই, এই আর কি!”
শ্রাবণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, কিন্তু সেই সঙ্গে কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল,
—” মানে… ওই গ্রামীণ ধাঁচের টয়লেট?”
ধারা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল,
—” হ্যাঁ, তাই বলতে পারেন।”
শ্রাবণ মাথা চুলকালো, দেখে মন হচ্ছে জীবনের বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এসবে সে মোটেই অভ্যস্ত নয়। কীভাবে যে ম্যানেজ করবে একমাত্র সেই জানে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলল,
—” আচ্ছা, গোসলটা আগে সেরে নিই। না হলে এই ঘাম আর ধুলো মিলে মনে হচ্ছে গায়ে পুরো কাদা জমে গেছে।”
ধারা এবার চুপচাপ খাটের কোণে রাখা লাল-নীল চেকের গামছাটা হাতে নিল। তারপর সামান্য কুণ্ঠা নিয়ে বলল,
—” তাহলে চলুন, আমি আপনাকে পুকুর দেখিয়ে দিই।”
দু’জন বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। ললিতা খাতুন বারান্দায় দাঁড়িয়ে পান চিবোতে চিবোতে হেসে বললেন,
—” যাও বাপ, পুকুরের জল খুব ঠান্ডা আজ। গরমে বেশ লাগবে।”
শ্রাবণ মেকি হাসলো। ঠান্ডা হোক আর গরম, পুকুরে পিছলে মান সম্মান না খোয়ালেই হয় আর কি। বাড়ির পেছনের সরু কাঁচা পথ ধরে হাঁটতে লাগল শ্রাবণ, পাশেই ধারা। পথের দুপাশে পুরোনো গাছ, কিছু শুকনো ডাল মাটিতে পড়ে আছে। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে। বিকেলের হালকা রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছিটকে পড়ছে পথে। ধারা একটু সামনে, শ্রাবণ দুই কদম পেছনে। পথে মাঝে মাঝে নিচু ডালে মাথা ঠেকে যাচ্ছে তার, আর সে বিরক্ত মুখে সেগুলো সরাচ্ছে। আসলে কিছু করার নেই!
এই অসময়ে জিহানের কল পেয়ে ভ্রু কুঁচকালো মুনিরা। কিন্তু যতবারই কলটা কেটে দিচ্ছে, ততবারই আবারো কল দিচ্ছে ছেলেটা। আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছে মুনিরা। আসলে যতই যা হোক না কেন, এই বান্দরের লেজ কখনো সোজা হবে না! মুনিরা বারবার করে সাবধান করে দিয়েছে যে অফিসের কাজের সময়ে যেন জিহান তাকে কল করে বিরক্ত না করে। অথচ এই জিহান বাবাজি যখন তখন কোনো কারণ ছাড়াই মুনিরাকে কল দিতেই থাকে। নাহ! আর নেয়া যাচ্ছে না! এবার ছেলেটাকে সামলাতে হবে। তা না হলে মাথায় উঠে যাচ্ছে! এরপর মাথায় উঠে চিকনি চামেলী নাচ করাও শুরু করবে!
মুখে রীতিমতো বিরক্তিকর ভাব টা রেখেই ফট করে কলটা ধরে ফোন মুখের কাছে এনে জোরেসোরে একটা ধমক দিল মুনিরা,
—” জিহানের বাচ্চা জিহান, হারপিকের ফটোকপি, পচা ফুলকপি, ভেজা ঝাল জিলাপি, তোরে আমি এমন লাথ্থি মারব যে, আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে উগান্ডায় বউয়ের কোলে গিয়ে পড়বি একদম, বেয়াদ্দপ পোলা!”
কলের ওপাশে থাকা জিহানের মধ্যে কোনোরূপ জুলুম দেখা গেলো না। সে চোখ সরু করে খুব মনোযোগ সহকারে নিজের একমাত্র প্রিয়তমা, এক ও অনন্য গার্লফ্রেন্ডের কথা গুলো খুটিয়ে খুটিয়ে শুনলো। এরপর বেশ ভাবুক ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” তা তো ঠিক আছে জান! সবই মানলাম। কিন্তু তুমি কবে থেকে উগান্ডার অধিবাসী হলে বলোতো? খবর তো দাও নি! আবার তুমি নিজেই আমায় লাথ্থি মেরে নিজের কোলেই ফেলে দেবে! এটা কেমনে কি? ব্যাপার টা বেশ ইন্টারেস্টিং! ”
এ পর্যায়ে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকলো মুনিরা। এমনিতেই অফিসের কাজ করতে গিয়ে সে আধমরা, তার উপর এই অশভ্য লোকের কথা শুনতে গিয়ে মাথায় এখন আগুন জ্বলছে তার। নিজেকে কোনোমতে সামলে সে জিহানকে বলল,
—” এই পঁচা ডিমের বস্তা! কান খুলে দেখো, আর চোখ খুলে শোনো টমেটোর খেত, আমি এখন অফিসে ব্যস্ত আছি। শ্রাবণ স্যার শ্বশুর বাড়ি গেছে, তাই সব কাজ আমাকেই করতে হচ্ছে। এমনিতেই মেজাজ খারাপ! তুমি আর মেজাজ খারাপ করোনা! নইলে একদম চিলে চ্যাপটা পাপড় বানিয়ে দেব!”
জিহান এবার ধুপ করে নিভে গেলো। ভীষন অসহায় চিত্তে নখ খুটতে খুটতে নাক টেনে বলল,
—” শেষে শ্রাবণও শ্বশুর বাড়িতে গেল। আহা! কি সুন্দর ভাগ্য! শালা কুত্তা-ম’রা ভাগ্য শুধু এই আমারই! এখনো শ্বশুর বাড়ির চেহারা দেখতে পারলাম না। আর হবু বউ তো আমার নাউজুবিল্লাহ… না মানে থুক্কু মাশা-আল্লাহ!”
চেতে উঠলো মুনিরা। খেপে গিয়ে বলল,
—” এই গোলামের পুত, তোর পাছায় কিন্তু আমি গরম কড়াই বসাব। ফালতু পোলা! তোরে আমি কইনাই যে আমার বাপের কাছে গিয়া প্রস্তাব দে! তখন যাস নাই ক্যান হ্যাঁ! আমি সাফসাফ বলে দিচ্ছি জিহান, তুমি আমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব না দিলে আমি ওই চৌরাস্তার ভজগৌরাঙ্গ কে বিয়ে করে হানিমুনে গুলশান যাব। এরপর এডলফ খানের মত বাচ্চা নিয়ে ঘুরব! এত উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে না চাইলে তাড়াতাড়ি আমার বাবার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসো!”
জিহান এবার মুখটা আরো একটু চুপশে ফেলল। কষ্টে ফেটে যাওয়া বুকে হাত রেখে কাতর কন্ঠে বলল,
—” বিশ্বাস করো জান, তোমার বাবার সামনে গেলে আমার পাকস্থলী কাঁপে। কিডনী কাঁপতে কাঁপতে মাথায় উঠে যায়… টেরাস্ট মি জান!”
বিড়বিড় করে গালি দিয়ে মুনিরা বলল,
—” তুই নিজেও কাঁপতে কাঁপতে উপরে উইঠা যা কচ্ছপের জাত! খবরদার কল করবিনা তুই আমারে। কানের নিচে দামামা বাজাব তোর আমি!”
জিহান খুবই কষ্ট পাচ্ছে। প্রিয়তমার মুখে এমন অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি শুনে তার কলিজাটাও এখন কাঁপছে। বলা যায় না, কলিজা কাঁপতে কাঁপতে নিচেও চলে যেতে পারে। বিষয়টা ভয়ানক হবে বলে নিজেকে সামলালো জিহান। কলিজাটা হাতে চেপে ধরে প্রতিবাদ করে বলে উঠলো,
—” তুমি নিজে এমন করছো মুনিরা? মানুষের কথা তো খুব বলো। তুমি এখন শ্রাবণের বউকে দেখে এসো যাও। কত নম্র, ভদ্র, কিউট, সরল একটা বউ পেয়েছে শ্রাবণ! অথচ তুমি…
কানে ফোনটা কাঁধ দিয়ে চেপে কিছু ফাইল খুলে কম্পিউটারে টাইপ করতে থাকলো মুনিরা। জিহানের কথা শেষ করতে না দিয়েই শুরু মুখ ভেঙচিয়ে বিদ্রুপ করে বলল,
—” পাবেই তো। এটা তো স্বাভাবিক! শ্রাবণ স্যার হলেন একজন সভ্য, ভদ্র, ভালো একজন নিঁখুত মানুষ। উনি ভালো বউ পাবে না, শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার ভাগ্য পাবে না, তো কি তোমার মত বলদ পাবে?”
বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিল জিহান। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সে আজই রাতের খাবারের পর হারপিকের সাথে লেবু আর লবণ মিশিয়ে পান করবে। এরপরে যা হবার হবে!
পুকুরের ধারে পৌঁছাতেই শ্রাবণ থমকে দাঁড়াল। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ হলো তার। চকচকে সবুজ শ্যাওলায় ঢাকা পানি, একপাশে পাথরের ঘাট, অন্য পাশে বেতের ঝোপ। গাছের ছায়া পড়ে পানির রং আরও গভীর সবুজ হয়ে গেছে। বাতাসে ভিজে কাদা আর জলজ ঘাসের গন্ধ। ধারা পুকুরের দিকে ইশারা করল,
—” এই হলো আমাদের গোসল করার বাথরুম!”
শ্রাবণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল। কোঁমড়ে দুহাত রেখে বলল,
—” হুম। দেখতেই পাচ্ছি! বাহ! ফাইভ স্টার সুবিধাও আছে দেখছি। বটে, বেশ পানি আছে ঘাটে!”
শ্রাবণের কথা শুনে হাসি পেলো ধারার। ফিক করে হাসলোও একটু। শ্রাবণ এক পলক সেদিকে তাকিয়ে তারপর টাওয়াল হাতে ঘাটের দিকে নামতে গিয়ে থমকালো, পেছন ফিরে ফট করে বলল,
—” তুমি কি… এখানেই গোসল করবে?”
ধারা মিনমিন করে বলল,
—” না মানে, এখানেই তো করতে হবে আর কি। আপনি করে নিন, এরপর আমি আসব!”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো। আশেপাশে তাকিয়ে পরিবেশ দেখে নিল। যদিও আশেপাশে কোনো বাড়িঘর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, আর না দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, কোনো মানুষজন। কিন্তু এভাবে ফাঁকা একটা জায়গায় খোলা আকাশের নিচে একটা মেয়ে মানুষ কীভাবে গোসল করবে সেটা ভেবেই বিরক্ত হলো শ্রাবণ।
শ্রাবণ চোখ সরু করে ধারার দিকে তাকাল। বিরক্তি নিয়ে বলেই ফেলল,
—”তুমি পাগল নাকি? এই ফাঁকা ঘাটে, খোলা আকাশের নিচে…!”
কথাটা শেষ করল না সে, বরং গম্ভীরভাবে বলল,
—” অসম্ভব! এখানে গোসল করবেনা। তুমি বুঝতে পারছো না, এখানে যে কেউ আসতে পারে, কোনো লোকচক্ষু নেই, মানে নিরাপদ, তা না। এখানে আশেপাশে বাড়ি নেই বলেই কি পুরোপুরি নিরাপদ ভেবেছো? একদম ফাঁকা জায়গা, দূর থেকে কারো চোখে পড়ে গেলে বা.. কেউ চুপচাপ এসে দাঁড়ালে.. .তুমি কি বুঝতে পারবে?”
ধারা মিনমিন করে বলল,
—”তবে করতে তো হবে… পানি তো এখানেই..!”
—”চুপ!”
শ্রাবণের কণ্ঠে এবার তীক্ষ্ণতা ফুটে উঠলো,
— “তুমি একা এভাবে কোথাও গোসল করবে না, আমি থাকতে থাকতেও না। এমন ঝুঁকি নিয়ে কখনো এসব কাজ করবেনা মেয়ে। গ্রাম বলে কি সবাই তোমার মত সহজ সরল?”
শ্রাবণের গলায় একরাশ বিরক্তি টের পাওয়া গেল। কিন্তু বিরক্তির নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক দৃঢ়তা, যা ধারা আগে কখনও টের পায়নি। ও অবাক হয়ে তাকালো।
শ্রাবণ এবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো পুকুরের দিকে। এরপর বলল,
—’ আমি এখানে গোসল করব৷ কিন্তু তুমি এখানে করতে পারবেনা। তুমি হয় বাড়ির ভেতরে টিউবওয়েল পাড়ে করো, না হলে আমি কোনো ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, কিন্তু এইভাবে না। কথা বুঝেছো?’
ধারা তৎক্ষনাৎ ছোট করে বলল,
—” জ্বি!”
শ্রাবণ এবার ঘাটের দিকে একবার তাকিয়ে আবার ধারার দিকে ফিরিয়ে আনে। চোখে একরাশ অটল দৃষ্টি দিয়ে বলে,
—” একটু চালাক-চতুর হও ধারা। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি শহরে মোটেই টিকতে পারবেনা। আর সবমসময় তোমার সাথে কেও থাকবেনা, যে তোমায় বুঝিয়ে দেবে৷ শিখে নিতে হবে তোমায়! নিজের মত সবাইকে সরল মনের ভেবো না। আমার কথা বুঝতে পেরেছো?”
ধারা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছে যেন হৃদয়ের ভেতরে কেউ ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ঢেলে দিচ্ছে। কি আশ্চর্য! একটা মানুষ তাকে বকাবকি করছে, অথচ একটুও কষ্ট লাগছে না ধারার। বরং কাজ করছে একরাশ ভালোলাগা, শান্তি!
ধারার মনে পড়ে যাচ্ছে, তার মা তাকে ছোটবেলায় ঠিক এভাবেই শাসন করতো। তাহলে কি ফুফুর কথাই সঠিক। এই মানুষটা কি তার একমাত্র অভিভাবক। তার বাবা-মায়ের অভাব টা কি এখন এই মানুষটা পূরণ করতে পারবে? পারবে মা-বাবার মত আগলে রাখতে? এও কি হয়? রক্তের সম্পর্ক ছাড়া এটাও কি সম্ভব! তৎক্ষনাৎ ধারার ভেতরের এক সত্তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ধারার তথাকথিত রক্তের সম্পর্ক নিজের চাচাকে! ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! রক্তের সম্পর্কই তো এমন করে আগলে রাখেনি তাকে! এই মানুষটা কিসের টানে এমন করছে তবে.?
ধারার ভাবনা চিন্তার মধ্যেই পুকুরে নামার জন্য গায়ের টি শার্ট টা ফট করে খুলে ফেলল শ্রাবণ। ধারার মন তো এখনো সেই শাসনের তীক্ষ্ণ অথচ স্নিগ্ধ উষ্ণতায় ডুবে আছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই থমকে গেলো, চোখের সামনে ভেসে উঠা সূর্যের আলোয় চকচকে হয়ে ওঠা তামাটে পেটানো শরীরটা দেখে। শ্রাবণের ফর্সা গায়ের রঙ, কাঁধের কাছে টানটান পেশি, আর বুকজুড়ে স্পষ্ট পুরুষালি রেখাগুলো স্পষ্ট, যেন প্রতিটা শিরা-উপশিরা ধীরে ধীরে স্পন্দিত হচ্ছে। ঢোক গিলল ধারা। লজ্জায় কুন্ঠিত হলো। এই প্রথমবার কোনো পুরুষকে এমনভাবে দেখছে যে। এক মুহূর্তের জন্য ধারা চোখ সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে পারল না। হৃদস্পন্দন অকারণেই একটু দ্রুত হয়ে গেল, শ্বাসের গতি বেড়ে উঠল অজান্তেই। বুকের ভেতর কোথাও যেন হালকা কাঁপন ছড়িয়ে পড়ল। আবিস্কার করে ফেলল, মানুষটা দেখতে খুব সুন্দর!
পরক্ষণেই লজ্জা যেন আলতো করে গলা টি/পে ধরল তার। গাল গরম হয়ে উঠল, যেন কেউ টের পেয়ে যাবে তার দৃষ্টি কোথায় ছিল। তড়িঘড়ি করে মাথা নিচু করে আঁচল দিয়ে মুখের পাশটা ঢেকে ফেলল ধারা। মনে হলো, চোখের পাতার ভেতর থেকে যেন কোনো ছবি তাড়ানো যাচ্ছে না, যতই চাইল মুছে ফেলতে, দৃশ্যটা আরও গভীরে খোদাই হয়ে যাচ্ছে।
এরমধ্যেই এগিয়ে এসে মাত্রই খুলে ফেলা হাতে থাকা টি শার্ট টা ধারার হাতেই ধরিয়ে দিল শ্রাবণ, মুখে বলল,
—” কষ্ট করে ধুয়ে দিও!”
মাথা নিচু করেই ঘাড় এলিয়ে —” ঠিক আছে” বলল ধারা। একটা বারের জন্যও মাথা উঠালো না। দেখতে চাইলো না শ্রাবণের উন্মুক্ত পুরুষালি শরীরটা। তবে পুকুরের দিকে যাওয়ার সময় পিঠের দিকে একবার চোখ চলে গেছে ধারার। এক পলকেই নামিয়েও ফেলেছে দৃষ্টি। কিন্তু তাতে কি? বুকের ভেতরের ধুকপুকানিতে যেন আরও চাপ বাড়ল। এখানে আর তার থাকা সম্ভব না! তাই কোনোমতে পুকুরপাড় থেকে বাড়ির দিকে দৌঁড়ে চলে এলো ধারা। উঠোনে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ললিতা খাতুন। ছেড়া শাড়ি গায়ে, মুখে পান চিবানোর ভিজে লাল রঙ, হাতে প্লেটে গরম গরম বড়া। কেবলই শ্রাবণের জন্য বানালেন তিনি। উঠোনে এসে বসা ধারা হাঁপাচ্ছে, কপালে ঘাম জমে উঠেছে। পাশে বসতে বসতে ললিতা খাতুন চোখ কুঁচকে তাকালেন, বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— ” এ ছেড়ি দৌঁড়ে আইলি ক্যান? বিয়ার পরেও তোর ছেলেমানুষী গেলো না রে! কেও কিছু কইছে নাকি তা? কী হইছে? ”
ধারা চোখ তুলে তাকাল না। হাঁপানো ধীরে ধীরে কমছে, কিন্তু বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে। আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল,
—”না…কিছু না।”
ললিতা খাতুন সন্দেহের দৃষ্টি ফেললেন,
—”তোর এই কিছু না কথায় কিন্তু অনেক কিছু থাকে। তোরে চিনি না নাকি? ক তো দেখি!”
ধারা কিছু বলল না, শুধু হাত বাড়িয়ে প্লেট থেকে একটা বড়া নিল। দাঁতে কামড় দিতে গিয়ে মনে পড়ল পুকুরঘাটে সেই মুহূর্ত, শ্রাবণের গলা, চোখের দৃষ্টি, আর… অজান্তেই চোখের কোণে হালকা লজ্জার আভা ফুটে উঠল। কি আশ্চর্য! কোনো কারন ছাড়াই লজ্জা লাগছে!
ললিতা খাতুন অবাক হয়ে তাকালেন ধারার দিকে,
—”হায় হায়! তোর নাক মুখ লাল হইতাছে ক্যান রে? তুই কি লজ্জা পাচ্ছোস নাকি?”
ধারা তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে দিল,
—”না, না,. বড়াটা তো গরম..তাই!”
অথচ বেচারি সহজ সরল ললিতা খাতুন বুঝলেন না যে উষ্ণতা ছিল…আসলেই ছিল। কিন্তু মনে ছিল, বড়াতে নয়।
বিকালে একসাথে একটু আড্ডা দিয়েছেন ললিতা খাতুন আর শ্রাবণ। যদিও প্রথম প্রথম ললিতা খাতুন কে শ্রাবণের খুব একটা পছন্দ হয়নি, এমনকি তার কথাবার্তাও খুব একটা ভালো লাগেনি। কিন্তু বিকেল থেকে গল্প করার পর থেকে শ্রাবণের মনে হচ্ছে এনার মত সহজ সরল মানুষ দুটো নেই। বাইরে থেকে দেখতে অনেক বেশি পাশের বাড়ির আন্টিদের মত খিচখিচে মনে হলেও ভেতর থেকে তিনি অনেক বেশি ভালো এবং উদার মনের।
তবে ললিতা খাতুনের সাথে বিকেল বেলা গল্পগুজব করতে গিয়ে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে শ্রাবণের জন্য। গল্প করতে করতে একটা গোপন তথ্য বের করতে পেরেছে সে, আর সেটা হলো— ধারা নাকি খুব সুন্দর গান করতে পারে। ছোটবেলা থেকে নাকি গানের প্রতি তার ঝোঁক ছিল অনেক বেশি। কিন্তু পারিবারিক সমস্যা আর পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে কখনো আর গান গায়নি। ললিতা খাতুন এও বললেন, মাঝে মাঝে ধারাকে গুনগুন করতে শুনেছেন তিনি। তার মানে এখনো গান গায়।
প্রথমে শুনে অবাক হয়েছে শ্রাবণ! এই মেয়েটা আবার গানও গাইতে পারে। যেভাবে সবসময় মিনমিন করে কথা বলে, এই গলায় গান গাইলে তো মশার গুনগুনানি মনে হবে। বিষয়টা ভেবেই ফিক করে হাসলো শ্রাবণ। তবে মনে মনে ঠিক করল, মেয়েটার মিনমিন করা কন্ঠেই একটা গান শুনতে হবে। মনে মনে অনেক বেশি উৎফুল্লিত হলো শ্রাবণ। পিচ্চিটার কন্ঠে গান! বাহ! এমনিতেই তো তার কন্ঠ অনেক মিষ্টি, গান গাইলে কি আরও বেশি মিষ্টি লাগবে?
গত রাতের মত এই রাতেও ঘরে ঢুকে চমক খেল শ্রাবণ। কারণ আজকেও ধারা নিজের মতো করে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে, আর বরাবরের মতোই বিছানা সাজিয়ে দিয়েছে শ্রাবণের জন্য। গতরাতে এই দৃশ্য দেখে শ্রাবণ মনে মনে অনেক বেশ খুশি হয়েছিল, প্রশান্তিও পেয়েছিল বটে। তবে আজ মোটেই খুশি হতে পারল না, প্রশান্তিও পেল না। কারণটা সে নিজেই জানে না। শুধু এটুকু জানে, ধারাকে মেঝেতে ঘুমোতে দেখে তার ভালো লাগবে না।
তবে এখন কিছু বললনা আর শ্রাবণ। নিজের মতো করে বিছানায় গিয়ে বসলো। তাকে দেখে ধারা নিজের বালিশটা মেঝেতে ঠিকঠাক করে রেখে মিষ্টি হেসে বলল,
—” আপনার কি রাতের খাবার খেতে কষ্ট হয়েছে? আলুর ভর্তাটা ঠিকঠাক হয়নি জানি। আলুটা সিদ্ধ করতে পারিনি আমি!”
মুখ কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। আগা মাথা কিছুই বুঝলো না ধারার কথার। কারণ প্রথমত শ্রাবণ যখন ভাত খাচ্ছিল, তখন তার পূর্ণদৃষ্টি ছিল সদ্য গোসল করে আসা ধারার দিকে। আসলে, শ্রাবণের কথা শুনেছে ধারা। টিউবয়েলপাড়ে গিয়ে চারপাশে শাড়ি দিয়ে আড়াল করে গোসল করেছে সে।
কিন্তু তাই বলে মেয়েটা সন্ধ্যেবেলা কেনো গোসল করল তার কোনো কারণ খুঁজে পেল না শ্রাবণ। এ পর্যন্ত দুই-তিন দিন তাকে খুব সন্ধ্যাবেলা গোসল করতে দেখেছে সে। তবে তাই বলে এই নয় যে, শ্রাবণ খাবার দেখেনি৷ লক্ষ্য করেনি। কই! তার কাছে তো আলু ভর্তা ঠিকই মনে হলো!
—” কষ্ট হবে কেনো? রাতের খাবার ভালো ছিল!”
শ্রাবণের কথা শুনে প্রশান্তিতে সস্থির শ্বাস ফেলল ধারা। হুট করেই মনে মনে কিছু একটা ভেবে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” চিংড়ি মাছের তরকারি টা কেমন ছিল?’
শ্রাবণ কোনোকিছু না ভেবেই ফট করে উত্তর দিল,
—” হুম, অনেক ভালো ছিল। ওটা বেশি ভালো লেগেছে!”
তারপর কিছু একটা মনে পড়তেই ফট করে ধারার দিকে তাকালো শ্রাবণ। কিছুক্ষণ ওই স্নিগ্ধ মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠলো,
—” চিংড়ির তরকারি তুমি বানিয়েছো?”
ধারা মুচকি হেসে মাথা নাড়লো। চোখ একরাশ আশা নিয়ে বলল,
—” জ্বি। ওটা…ভালো হয়েছে? ”
ধারার কথার উত্তর না দিয়ে শ্রাবণ কিছুক্ষণ একরাশ বিস্ময় নিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে উৎসাহিত নয়নে শ্রাবণের দিকে চেয়ে রয়েছে ধারা। এত উদগ্রীব হয়ে কী দেখছে ও? মেয়েটা কি একটু প্রশংসা আশা করছে? কিন্তু শ্রাবণ তো অবাক হয়েছে অন্য কারণে। শ্রাবণ এবার বিছানায় পা তুলে বসে সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি কীভাবে জানলে চিংড়ি আমার পছন্দ?”
ধারা একটু লাজুক হয়ে কপাল চুলের পাশে হাত বুলিয়ে বলল,
— ” না না, আমি তো… ওটা আসলে আগে থেকেই বানানো ছিল। মানে..আমি তো জানতাম না যে আপনার পছন্দ.. এমনিতেই বানিয়েছি আর কি…!”
আমতা আমতা করে কথাগুলো বলে দৃষ্টি নামালো ধারা। শ্রাবণের কুঁচকানো ভ্রু আরেকটু সংকুচিত হলো। তবে কিছু বলল না। সটান হয়ে শুয়ে পড়ল চৌকির উপর। ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেদিনের মতই জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। কিন্তু আজ আর চাঁদের আলো আসলো না, জোছনা নেই আজ। যদিও মায়াময়ী একটা তিমির আলো টের পাওয়া যাচ্ছে। ধারা ধীর গতিতে এসে শুয়ে পড়ল মেঝেতে।
কিন্তু চোখ বন্ধ করার ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে শ্রাবণের গুমোট গলা ভেসে এলো,
—” ধারা…!”
চোখ খিঁচে বন্ধ করল ধারা। কেনো যেন শ্রাবণের মুখে নিজের নামটা শুনলে অদ্ভুত অনুভূতি হয় ধারার। মনে হয় যেন এত সুন্দর করে তার নামটা আর কেউ উচ্চারণ করতে পারে না। এত মোহনীয় কন্ঠে কেউ তার নাম ধরে ডাকতে পারে না। কেউ আগে কখনো এত যত্ন নিয়ে তার নাম উচ্চারণ করেনি। প্রতিবারের মতো এবারও চমকে গেল ধারা। ধীরেসুস্থে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বিছানার দিকে, মিনমিন করে বলল,
—” জ্বি বলুন!”
— ” একটা আবদার করি?”
শ্রাবণের এমন অসহায় গলা শুনে একটু থমকালো ধারা। সন্দিহান হয়ে বলল,
— ” জ্বি করুন!”
—” একটা গান শোনাবে আমায়?”
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন পেয়ে বিষম লেগে গেলো ধারার। মনে মনে নিজেকে ধাতস্থ করে ধারা অবাক হয়ে তাকালো বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে উপরের টিনে চোখ রাখা শ্রাবনের দিকে।
শ্রাবণ নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারো বলে,
—” ফুফু বলল, তুমি নাকি খুব সুন্দর গান গাইতে পারো। আমায় একটা গান শোনালে কি খুব ক্ষতি হবে?”
ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইলো। এমনিতেই অনেকদিন ধরেই ধারা গান গায় না। তার উপর এই মানুষটার সামনে সে কোনোমতে গলা ছাড়তে পারবে না। কিন্তু যেভাবে মানুষটা আবদার করছে, মনে হচ্ছে গাইতেই হবে! ভেবেই ঢোক গিললো ধারা। মিনমিন করে বলল,
—” আমি তো গান পারি না। অনেকদিন গাইনি!”
ফোঁস করে শ্বাস ফেলল শ্রাবণ। নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারো বলল,
—” দুটো হলো!”
ধারা চোখ পিটপিট করে বলল,
—” মানে?”
শ্রাবণ এবার ধারার দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লো। বলল,
—”মানে এই পর্যন্ত দুটো মিথ্যে হলো। তুমি আমাকে দুটো মিথ্যে বলেছো। প্রথম মিথ্যে হলো, চিংড়ি মাছের তরকারিটা তুমি এমনিই বানিয়েছো, আর দ্বিতীয় টা হলো তুমি গান গাইতে পারোনা!”
ধারা সাথে সাথে সংকুচিত হলো। একটা কোল বালিশের অভাব বোধ করল সে। আলাদা একটা বালিশ থাকলে এই মুহূর্তে মুখ লুকিয়ে ফেলত ধারা। কিন্তু মাথার লম্বা বালিশটা ছাড়া কোনো বালিশ নেই।
হঠাৎ করেই শ্রাবণ অন্যদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। কিছু একটা ভেবে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ধারার দিকে, অনেক বেশি রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো,
—” আমি যদি তোমাকে অভিশাপ দিই, তাহলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে ধারা! স্বামীরা অভিশাপ দিলে আল্লাহ পাপ দেয়, ফেরেস্তারা অভিশাপ দেয়, শোনো নি?”
ধারা তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়ালো। হ্যাঁ সে শুনেছে। খুব ভালো করে শুনেছে। আর এসবের অনেক বেশি ভয় আছে ধারার। অভিশাপকে অনেক বেশি ভয় পায় সে। তার মা বলতো, তাদের নাকি অভিশপ্ত জীবন। এই কারণে ছোট থেকেই অভিশাপকে অনেক বেশি পরিমাণে ভয় পায় ধারা। এত অভিশাপ নিয়ে এসেই তার জীবন আজ এই পর্যায়ে,! আরো বেশি অভিশাপ নিয়ে নিজের জীবন নষ্ট করতে চাইলো না ধারা।
তাই তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বিছানা থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে কাতর কন্ঠ বলে উঠলো,
—” না না! অভিশাপ দেবেন না। দোহাই লাগে! আমি ক্ষমা চাইছি। মিথ্যা বলা উচিত হয়নি আমার। আমি সত্য টা বলছি। হ্যাঁ, আমি জানি যে, চিংড়ি মাছ আপনার পছন্দের। মা বলেছিল। আর মা এটাও বলেছিল যে আপনার পছন্দের খাবারগুলো যেন আমি আপনাকে বানিয়ে খাওয়াই আর শিখে নিই। এজন্য চিংড়ি মাছটার রান্না আজকে প্রথম শিখলাম। কারণ আমি জানি এটা আপনার পছন্দ। আর আমি গান পারি, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি অনেক দিন গান গাইনি। আমার মনে হয় না যে আমার আর গান গাওয়ার গলা আছে। এটা সত্যিই বলেছি!”
শ্রাবণ হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারল না। সে অভিশাপের কথাগুলো নিতান্তই বানিয়ে বানিয়ে বলেছে। আল্লাহ জানে আদৌও এরকম কোনো হাদিস আছে কিনা। শুধু ভয় দেখাতেই কথাটা বলেছিল শ্রাবণ। কিন্তু সত্যি সত্যি যে পিচ্চিটা ভয় পেয়ে যাবে, সেটা ভাবেনি। আড়ালে মুচকি হাসলো শ্রাবণ। মেয়েটাকে জ্বালাতে বেশ মজা পাচ্ছে সে, অদ্ভুত রকমের ভালো লাগা কাজ করছে। কিন্তু এখনই প্রকাশ করা যাবে না। তাই শ্রাবণ আরো বেশি গম্ভীর মুখ করল, তারপর বলল,
—” আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারব না ধারা। তুমি আমার সাথে অনেক বেয়াদবি করেছো। আমার কথার অমান্য করেছো, অবাধ্য হয়েছো। অথচ তুমি জানো যে, স্বামীর সব কথা শুনতে হয়। বিয়ের প্রথম রাতে তুমি বলেছিলে যে, তুমি আমার সব কথা শুনবে। অথচ আজ কোনো কথা শুনছো না। বিষয়টা সত্যিই দুঃখজনক। আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারলাম না বলে অত্যন্ত দুঃখিত! সরি বাট নট সরি!”
আরো বেশি উৎকন্ঠায় অস্থির হলো ধারা। অতিরিক্ত ভয়ে আতঙ্কে অস্থির হয়ে সে একদম রীতিমত দৌঁড়ে এসে বিছানার উপর বসে পড়ল, আর শ্রাবণের হাত শক্ত করে মুঠোয় ধরে বলতে থাকলো,
—”এরকম বলবেন না। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। দোহাই লাগে আপনার। এভাবে বলবেন না। আমি তো সরি বলেছি। আপনি বলুন কি করতে হবে। আপনি যা যা বলবেন, আমি ঠিক তাই করব। তবুও ক্ষমা করে দিন আমাকে। আমি আর কখনো আপনার অবাধ্য হবো না, অসন্তুষ্ট হবেন না আপনি। মিথ্যা বলব না আর। দয়া করে ক্ষমা করে দিন, নইলে মরে যাওয়ার পর আমি জান্নাত পাব না!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে অস্থির ধারা ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে। চোখে একরাশ আশা! এক্ষুনি হয়তো ক্ষমা করে দিবে, এই আশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে সে। অথচ শ্রাবন তো থমকে আছে। কারণ তার হাত এখন দুটো কোমল মেয়েলি হাতের মুঠোয় বদ্ধ। হয়তো সেই দুটো হাতের মালিক এখনো উপলব্ধি করতেই পারিনি যে সে শ্রাবনের হাত ধরেছে, শ্রাবণকে স্পর্শ করেছে।
শ্রাবণ এবার ধারার চোখের থেকে চোখ সরিয়ে হাতের কাছে দৃষ্টি ফেলল। শ্রাবণের দৃষ্টি অনুসরণ করে ধারাও নিজের হাতের দিকে তাকালো। সাথে সাথে বুঝতে পেরে, শক্ত করে ধরে রাখা শ্রাবণের হাতটা ছেড়ে দিল ধারা। ভয় পেলো আবারো, আমতা আমতা করে মুখে বলল,
—” আমি বুঝতে পারিনি!”
বলে বিছানায় বসা থেকে উঠতে চাইলো ধারা। কিন্তু এবার হুট করে শ্রাবণ ধারার বাম হাতটা এক ঝটকায় ধরে ফেলল। উঠতে পারল না ধারা। যেভাবে বসে ছিল ওইভাবে বসে রইল। প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ এবার শোয়া থেকে উঠে বসলো। ধারার চোখে চোখ রেখে বলল,
—” গানটা শুনিয়ে যাও। তবেই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। না হলে কিন্তু তুমি বেহেশত পাবে না মেয়ে! ভেবে দেখো!”
ধারা ঠোঁট উল্টে তাকালো। চেহারা দেখে বোঝাই গেল কতটা কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা। ভয়ে আতঙ্কে মুখটা কালো হয়ে গেছে ধারার। অথচ শ্রাবণ তা বুঝেও মায়া দেখালো না। এবার মিনমিন করে ধারা বলল,
—” আমি কিন্তু খুব একটা ভালো গান পারি না। আপনার ভালো না লাগলে কি অভিশাপ দেবেন?”
শ্রাবণ এবার কোনোমতে হাসি আটকে বলল,
—” না। ভালো না লাগলে অভিশাপ দেব না! তবে পছন্দ হলে দোয়া দেব!”
ধারা এবার মাথা নিচু করল। তার বাম হাতটা এখনো শ্রাবণের এক হাতের মুঠোয় বন্দি। মানে গান শেষ হলেই তবে হাতটা ছাড়বে বোধহয়। একটা বড় করে শ্বাস নিল ধারা। শুকনো ঢোক গিলে গাইতে শুরু করল সুমধুর কন্ঠে, তবে মিহি করেই,
—❝ তুমি সুখ যদি নাহি পাও
যাও সুখেরও সন্ধানে যাও
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়ও মাঝে
আর কিছু নাহি চাই গো
আমারো পরানো যাহা চায়..❞
থেমে গেল ধারা। আর গাইতে পারবেনা সে। গান থামিয়ে এবার নিচু মাথাতেই কোনোমতে দৃষ্টি তুলল শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ এখনো নির্বিকার ভঙ্গিতে চেয়ে রয়েছে।
মনে মনে ভয় পেলে ধারা। মানুষটা কি তার গান পছন্দ করেনি? কিছু বলছে না যে। নাকি কম গেয়ে ফেলেছে! এর থেকে বেশি আর গাওয়ার সাহস নেই ধারার। তাই মিনমিন করে বলল,
—” শেষ হয়েছে তো!”
শ্রাবণ এবার ফট করে হাতটা ছেড়ে দিল। ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—” অভিশাপ তুলে নিয়েছেন তো? ভালো হয়নি?”
শ্রাবন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ধারার দিকে। মোহনীয় সেই দৃষ্টি অপরিচিত ঠেকলো ধারার কাছে। কিছুক্ষণ পর শোনা গেল গুমোট স্বরে বলা ছোট্ট জবাব,
—” হুম। ভালো হয়েছে!”
ধারা এবার মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তি পেল। বিছানা থেকে উঠে যেতে চাইলে আবারও ডেকে উঠল শ্রাবণ,
—” কোথায় যাচ্ছো?”
ধারা চমকে তাকালো শ্রাবণের কন্ঠ পেয়ে। চরম পর্যায়ে অবাক হলেও মুখে কিছু বলল না, বরাবরের মত মিনমিন করে বলল,
—” ঘুমোতে!”
শুকনো ঢোক গিলল শ্রাবণ। এটারই ভয় পাচ্ছিল সে। আজ কোনোভাবেই এই কাজ করতে ইচ্ছে করছেনা শ্রাবণের। নির্মম ঠেকছে নিজের কাছে। ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,
—” আমার সাথে ঘুমোতে কি খুব সমস্যা হবে তোমার?”
ধারা খানিক বিস্ময়ভরা চোখে তাকালো মানুষটার দিকে। কিছু বলতে চাইলো বোধহয়, তার আগেই শ্রাবণ সরে গিয়ে আরেকটা বালিশ ঠিক করে রেখে বলে উঠলো,
—” মাঝে একটা কোলবালিশ দিয়ে দেব না হয়। তুমি উপরে শুয়ে পড়ো।”
ধারার কি হলো কে জানে। যন্ত্রের মত জিজ্ঞেস করল,
—” আপনার অসুবিধে হবে না?”
শ্রাবণ গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। কিছু একটা ছিল সেই দৃষ্টিতে। হয়তো মায়া, না হয় স্নেহ! ভালোবাসা কিনা বোঝা গেলো না। ঢোক গিলে যথাসম্ভব স্বাভাবিক সুরে শ্রাবণ বলল,
—” উহু, একটুও অসুবিধে হবে না। একটুও না!”
ধারা এবার কিছুক্ষণ থ মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
—” কিন্তু কোলবালিশ তো নেই এখানে!”
শ্রাবণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলল মেঝেতে থাকা ধারার চিকন বালিশটার দিকে। ধারা বুঝলো সেই দৃষ্টির মানে। আর কথা না বাড়িয়ে মেঝে থেকে বালিশটা তুলে বিছানার মাঝখানে দিয়ে দিল, আর শ্রাবণের দেওয়া বালিশটাতে শুয়ে পড়ল ধীরে। কি আশ্চর্য! আজ এই মানুষটাকে এত ভয় লাগছে কেনো তার। মনে হচ্ছে তার কথার অবাধ্য হলে এক্ষুনি গলা টি/পে মেরে ফেলবে। ধারা শ্রাবণের উল্টোপাশ ফিরে শুয়েছে, মানে শ্রাবণের দিকে পিঠ দিয়েছে। শ্রাবণও এবার শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ নীরবতা থাকলো দুজনের মধ্যেই। শ্রাবণ খুব ভালো করেই জানে ধারা আজকেও ঘুমাবে না। বিছানাতে তো ঘুমাতে পারে না মেয়েটা। কিন্তু তাকে এখন থেকে বিছানাতেই ঘুমাতে হবে, আর ঘুমানো শিখতে হবে। এটাই তার শেষ কথা। এদিকে ধারাও জানে পাশের মানুষটা ঘুমায়নি, বরাবরের মতো চোখ খুলে উপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে কেনো তাকে বিছানায় শুতে বলল, এটা ভেবে পেল না ধারা। মনে মনে ভেবে নিল, হয়তো মেঝেতে ঠান্ডা লাগবে বলে লোকটা মায়া দয়া করে তাকে শুতে দিয়েছে। কিন্তু মনের খচখচানি মিটলো না।
তাই ওপাশ ফিরে থেকেই মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,
—” আপনি বিছানাতে শুতে বললেন কেন আমাকে? আমি তো মেঝেতেই শুতে পারতাম! ”
গুমোট স্বরে তাৎক্ষণিক জবাব এলো শ্রাবণের,
—” মেঝেতে তেলাপোকা দেখেছি আমি।”
ডাহা এক মিথ্যে কথা বলে নিজেকে আড়াল করল শ্রাবণ। কিন্তু মনে হয় না তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে। কারণ ধারা মোটেই তেলাপোকা ভয় পায় না। তবে বিশ্বাস করল হয়তো এই কারনেই মানুষটা দয়ামায়া করেছে। একটু পরে এবার শ্রাবণ ডেকে উঠলো,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১১
—” ধারা! ”
আবারো একই ডাকে একইভাবে সাড়া দিল ধারা,
—” জ্বি!”
শ্রাবণ বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিল। ঠোঁট ভিজিয়ে বলেই ফেলল,
—” খুব মিষ্টি গলা তোমার। গুনগুন করে না গেয়ে মাঝেমাঝে আমায় গান শোনাবে, তাহলে দোয়া দেব। আর বেহেশতও পাবে।”
মনের গুঢ় কথা ব্যক্ত করেই তৎক্ষনাৎ উল্টোপাশে ফিরে চট করে চোখ বন্ধ করে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিয়ে নিল শ্রাবণ। পেটে আটকে থাকা কথা সে বলতে পেরেছে, এবার নিশ্চয়ই ভালো একটা ঘুম হবে!
