Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৩

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৩

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৩
অনামিকা তাহসিন রোজা

ভোরের আলো ধীরে ধীরে ফুটতে শুরু করেছে
আকাশে ফিকে নীলের ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে গোলাপি আভা ঢুকে পড়ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়া আলোর পাতলা রেখা বিছানার চাদরে লম্বা দাগ কেটে দিয়েছে। পাখিরা হালকা ডাকাডাকি শুরু করেছে, দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে সকালের হাওয়ায়।

ধারা এখনো শুয়ে আছে, কিন্তু ঘুমায়নি। তার মুখে কোনো আবেগ নেই। না হাসি, না বিরক্তি, না দুঃখ, শুধুই এক নির্লিপ্ত দৃষ্টি। মাথা হালকা কাত করে পাশের মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে সে। শ্রাবণের বুকের ওঠানামা স্থির, শ্বাসপ্রশ্বাস গভীর। ঘুমন্ত মানুষের নির্ভার ছন্দ যেন এক অদৃশ্য সুর বয়ে আনছে ঘরের ভেতর। ধারার চোখ গাঢ় ও অনড়, যেন সে শুধু মুখটাই দেখছে না, বরং চেষ্টা করছে এই মানুষটার ভেতরে লুকানো সব প্রশ্ন, সব রহস্য বুঝে নিতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অগোছালো চুলের কিছু অংশ কপালে এসে পড়েছে শ্রাবণের, ঠোঁটের কোণে হালকা এক শান্তির রেখা। এ শান্তি দেখে মনে হয় না রাতটিতে সে কোনো অশান্ত ভাবনায় ডুবে ছিল। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো ধারা। হঠাৎ টের পেল, তার ভেতরের এক অদ্ভুত টান, অনুভব করলো। যা তাকে এই মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করছে, অথচ সেই টানের নামটা দিতে পারছে না। ভোরের আলো একটু একটু করে বাড়ছে, আর তার নির্লিপ্ত চোখের ভেতরে যেন আরও গভীর হয়ে জমে উঠছে কোনো অজানা চিন্তা।
ধারা এবার একেবারে কাত হয়ে শ্রাবণের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লো। একটা হাত নিজের মাথার নিচে দিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকালো। মাঝে থাকা বালিশটা খুবই অল্প নামিয়ে দিয়ে দেখলো শ্রাবণকে। বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সহসাই ফট করে চোখজোড়া মেলল শ্রাবণ। ধারা সময়ের স্বল্পতার কারনে নড়তেও পারল না, বুঝতেও পারল না। কিন্তু শ্রাবণের চোখ খুলতে দেখে একটু চমকালো। শ্রাবণ ঘুমের ঘোরে কিছুটা ভাঙা স্বরে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

—” কী দেখছো?”
খুবই কঠিন প্রশ্ন, যার উত্তর মোটেই ধারার কাছে নেই। সে এখন কীভাবে বলবে যে মানুষটাকেই দেখছিল। তাই আবারো চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে খানিক মাথা নেড়ে বলল,
—” না না, কিছু না তো!”
আবারো মুখ কুঁচকালো শ্রাবণ। বোঝাই গেলো ঘুমের ঘোরে বিরক্ত হচ্ছে সে। খানিকক্ষণের জন্য তাকিয়ে থাকলো ধারার মুখের দিকে। সকাল বেলা কি একটু বেশি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে? নাকি তারই চোখ সকাল বেলা ঝাপসা হয়েছে? কিছুক্ষণ ভেবে চোখজোড়া আবারো বন্ধ করল শ্রাবণ। এরপর একটু পরে চোখ খুলে বলল,
—” মুরগির ছানার মত চোখ বড় বড় করে কী দেখছো? তখন থেকেই তাকিয়ে আছো তুমি!”
ধারা এবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—” আপনি কীভাবে বুঝলেন? আপনি তো ঘুমোচ্ছিলেন!”
ধারার হতবাক হয়ে যাওয়ার সরল কন্ঠটা শুনে সকাল সকাল বেশ হাসি পেলো শ্রাবণের। কিন্তু হাসলো না। মেয়েটা সত্যিই বোকা! শ্রাবণ বিড়বিড় করে গাধা বলল ধারাকে। ধারা শুনতে পেলো। কিছুটা মন খারাপ হলো বোধহয়। তাই মাথা নিচু করে গাল ঘেঁষে থাকল বালিশের সাথে। একটু পর শ্রাবণ নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল,
—” রাতে ঘুম হয়েছে তোমার?’
ধারা মাথা দুলিয়ে বলল,
—” জ্বি।”

সত্যি কিনা জানেনা শ্রাবণ। তবে সে তার দায়িত্ব পালন করেছে। বিছানায় ঘুমোতে দিয়েছে ধারা কে। এটাই অনেক। এখন যদি ধারা নাও ঘুমোয়! কিছু করার নেই তার। এবার একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে শুয়ে পড়লো শ্রাবণ। একবার জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” সকাল হয়েছে? ”
ধারা আবারো আগের মত মাথা দুলিয়ে বলল,
—” হুম হয়েছে কিছুটা। একটু পর আকাশ একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে!”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা মনে করল, এরপর ফট করে বলল,
—” কাল শুনলাম তোমার ফুফুর নাকি লিচু বাগান আছে। আমায় একবার নিয়ে যেয়ো তো।”
ধারা জিজ্ঞেস করল,

—” এখনি যাবেন? ”
—” যাওয়া যাবে এখন?”
ধারা একটু ভেবে বলল,
—” হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবে। কিন্তু এখন তো লিচু নেই। আরো কয়েকমাস পর হবে!”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে বলল,
—” জানি তো। শুধু বাগানটাই দেখতে চাইছিলাম। ভীষণ বড় বাগান নাকি।”
ধারা এবার একটু হেসে বলল,
—” হ্যাঁ! জানেন, বিরাট বড় বাগান। আসলে একটা গল্প আছে এই বাগানের।”
উৎফুল্লিত হলো শ্রাবণ। একটু নড়েচড়ে ধারার দিকে তাকিয়ে উদগ্রীব গলায় বলল,
—” তাই নাকি? কেমন গল্প শুনি! ”
ধারা এবার ঠোঁট ভিজিয়ে বলতে শুরু করল,

—” আমার ফুফুর তো অনেক কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল। একদম ছোট তে। হয়তো বারো-তেরো বছর বয়স ছিল। এই কারনে ফুফা ফুফুকে অনেক আদর করতো, একদম বাচ্চাদের মত যত্ন করতো। তো, ফুফা একদিন ফুফুর জন্য বাজার থেকে একশ লিচু কিনে এনেছিল। ফুফুর ভীষন পছন্দের তো তাই। কিন্তু ফুফুর কোনো এক শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় ফুফুকে ভীষন কথা শুনিয়েছিল। মানে ফুফুর জন্য কেনো ফুফা এতগুলো আনবে এই নিয়ে আর কি। অথচ বাড়ির সবার জন্যই এনেছিল। কিন্তু ফুফুকে যে বেশি দিয়েছে এটাতেই সবার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল। এরপরে কে যেন ফুফুর কাছ থেকে লিচু কেড়েও নিয়েছিল। আর অপমান করে কথা শুনিয়েছিল। ফুফু তো কাঁদতে কাঁদতে একদম বন্যা বইয়ে দিয়েছিল!”

বেশ উদগ্রীব হলো শ্রাবণ। সরু চোখে বেশ মনোযোগ দিয়েই কথা শুনছিল সে। উৎফুল্লতায় নড়েচড়ে বলল,
—” ইন্টারেস্টিং! তারপর?”
ধারা এবার ঠোঁট উল্টে বলল,
—” তারপর আর কী হবে? ফুফা তো ফুফুর চোখের পানি সহ্য করতে পারত না। ওইযে ছোট ছিল যে, খুব আদর করতো। তখন রেগেমেগে একটা আস্ত লিচুর বাগানই করে ফেলেছে, শুধুমাত্র ফুফুর জন্য। গ্রামের সবাই জানে ওই বাগান করা হয়েছে ফুফুর জন্য।”
শ্রাবণ পুরো ঘটনাটা শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে রইল। এমন কাহিনী সে সিনেমা তেই দেখেছে। অথচ এটা যে বাস্তবেও হয়, তা তো জানা ছিল না। বেশ অবাক হয়েছে শ্রাবণ। তৎক্ষনাৎ মনে পড়েছে মমতাজের জন্য শাজাহানের তাজমহল বানানোর ঘটনাটা! চোখের কোণে হালকা হাসির রেখা দেখা গেলো শ্রাবণের। যদিও সেটা আনন্দের চেয়ে বেশি ছিল বিস্ময় আর অদ্ভুত এক আবেগের মিশেল। কন্ঠে হালকা অবিশ্বাস মিশিয়ে শ্রাবণ বলে উঠলো,

—” মানে.. শুধু ফুফুর জন্যই? ওয়াও!”
ধারা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ। ফুফা বলেছিল, জীবনে কারো মুখের হাসি মুছে গেলে সেটা ফিরিয়ে আনার জন্য যদি নিজের সবটুকু দিতে হয়, তাতেও কোনো ক্ষতি নেই।”
শ্রাবণ একটু সময় নিয়েই তাকালো ধারার মুখের দিকে। জ্বলজ্বল করছে মেয়েটার মুখ। ঘটনাটা যেন তার সাথেই ঘটেছে এমন ভাবে বলছে। একটু ভেবে যন্ত্রের মত বলল,
—” তোমারও লিচু পছন্দ বুঝি?”
ধারার মুখটা আরো জ্বলজ্বল করলো,

—” হ্যাঁ হ্যাঁ, ভীষণ পছন্দ। ফুফা আমাকেও ওই বাগান থেকে লিচু দিত। জানেন, একবার পাঁচশ লিচু আমায় দিয়েছিল। একাই সব খেয়েছিলাম!”
চোখ বড় করে তাকালো শ্রাবণ,
—” বাপরে! একাই সব খেয়েছিলে?”
ধারা মাথা দুলিয়ে বলল,
—’ জ্বি! ”

শ্রাবণ চুপ করে গেল। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সকালের আলো এখন পুরোপুরি ঘরে ঢুকে পড়েছে, বাতাসে কেমন মিষ্টি গন্ধ, হয়তো ভিজে ঘাসের বা দূরের গাছের পাতার। কিন্তু তার মন চলে গেছে অন্য কোথাও। ভাবছে সেই একটা লিচুর বাগানকে নিয়ে, যেটা ভালোবাসা দিয়ে রোপণ হয়েছিল।
ধারা কিছুক্ষন পর হালকা কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল শ্রাবণকে,
—” আচ্ছা, আপনি কারো জন্য এমন কিছু করেছেন কখনো?”
শ্রাবণ চমকে তাকাল। ধারার চোখেমুখে একটুও দ্বিধা নেই। বরং একরাশ কৌতূহল। শ্রাবণ তাকিয়েই রইলো, কিন্তু সে কথার উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

—” হয়তো…কখনো যদি করে থাকি, বলব তোমাকে।”
এই বলে সে বিছানা থেকে উঠে বসল, হাত-পা টেনে হাই তুলে নিল। ধারা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। তার মনে হলো, এই মানুষটার ভেতরে হয়তো আরও অনেক গল্প আছে, যেগুলো শোনার জন্য সময় লাগবে, কিন্তু প্রতিটাই হয়তো লিচুর বাগানের গল্পের মতোই আলাদা আর গভীর।
শ্রাবণ এবার বলল,

—” এখনি চলো। একটু ঘুরে আসি বাগান থেকে!’
ধারা নিজেও শোয়া থেকে উঠে বসলো। জিজ্ঞেস করল,
—” এখনি? চা-মুড়ি খেয়ে যান। নাস্তা না করে গেলে খারাপ লাগবে!”
চা-মুড়ি শুনে মুখ কোঁচকায় শ্রাবণ। তার কাছে সবচেয়ে অপছন্দের জিনিস হলো মুড়ি। একমাত্র ঝালমুড়ি ছাড়া মুড়ির কিছুই তেমন পছন্দ না তার। কিন্তু পরক্ষণেই অবাক হয়ে বলল,
—” এত সকাল সকাল চা বানাবে কে? ফুফুকে ডাকার দরকার নেই!”
ধারা দুহাত দিয়ে না না ভঙ্গি করে বলল,

—” না না, ফুফুকে ডাকব না। আমিই বানাচ্ছি। চলুন। আগে চা খাবেন, তারপর নিয়ে যাব। এখান থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। বাগান টা একটু ভেতরের দিকে।”
শ্রাবণ একটু বিরক্ত গলায় বলল,
—” ঠিক আছে, কিন্তু চা বানাতে বেশি সময় নিও না। আমি একবার ঠিক করে বেরোতে চাইলে, দেরি হলে সহ্য করতে পারি না।”

ধারা হেসে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। পায়ের কাছে রাখা ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। শ্রাবণ বিছানায় বসে কিছুক্ষণ ওর পায়ের শব্দ শোনার চেষ্টা করল। একা, শান্ত ঘরে সেই খসখস শব্দটা যেন অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। শ্রাবণ এখনো ভেবে পায় না, শাড়ির উপর আবার ওড়না পড়ার কী প্রয়োজন! এখানে এসে কষ্ট করে শাড়িই পড়ছে ধারা। কিন্তু কেনো যেন শাড়ির উপরে পাতলা একটা ওড়নাও জড়িয়ে নিচ্ছে। বিষয়টা খুবই উইয়ার্ড লাগলো শ্রাবণের কাছে। সে এবার পুকুর পাড় থেকে মুখ হাত ধুয়ে আসলো। সুইচ অফ হয়ে যাওয়া ফোনটা চার্জে দিল।।গামছা দিয়ে হাত পা মুছে বসে পড়তেই পাঁচ মিনিট পেরোলো, আর কিছুক্ষণ পরেই ধারা ফিরে এলো , হাতে ধোঁয়া ওঠা একাপ চা। কাপটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,

—” নিন, খেয়ে দেখুন তো, আপনার পছন্দ হবে কিনা!”
শ্রাবণ কাপটা নিয়ে এক চুমুক দিল। ভ্রু সামান্য উঠল, কিন্তু কিছু বলল না। ধারা জিজ্ঞেস করল,
—” কেমন?”
শ্রাবণ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
—” খারাপ না।”
তবে কথাটা বলার সময় চোখে কেমন যেন একঝলক নরম ভাব ছিল, যা ধারা বুঝে ফেলল কিনা কে জানে। চা শেষ করে শ্রাবণ দাঁড়িয়ে পড়ল,
—” চলো, আর দেরি নয়।”
ধারা তৎপর হয়ে গামছা আর ছোট একটা ব্যাগ তুলে নিল। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” ব্যাগ কেন?”
ধারা মিষ্টি হেসে বলল,

—” বাগান দেখতে যাচ্ছেন তো, লিচু না থাকলেও গাছের ডাল পাতা থাকবে। ভেঙে যাওয়া ডাল পাতা গুলো আনব!”
শ্রাবণ চোখ সরু করে তাকাল, চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আজব! ওসব আনবে কেনো?”
ধারা সামান্য থমকে গিয়ে চোখ নামিয়ে নিল,
—” বাগানটাও পরিষ্কার থাকবে। আর ওগুলো চুলোয় আগুন জ্বালাতেও দরকার হবে!”
শ্রাবণ আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে থাকলো। ধারা বুঝলো ব্যাপার টা শ্রাবণের পছন্দ হয়নি। তাই ঠিক জায়গায় ব্যাগটা আবারো রেখে দিল। সে বরাবরই বাধ্য মেয়ে। দুজনেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সকালের রোদ্দুর তখন গাঢ় হচ্ছে, বাতাসে কেমন যেন নতুন দিনের গন্ধ। বাগানের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শ্রাবণ মনে মনে ভাবছিল, মেয়েটার সঙ্গে যতই কথা হয়, ততই যেন এক অদ্ভুত অজানা জায়গায় টেনে নিয়ে যায় সে, যেটা সে বুঝতেও পারে না, কিন্তু ছেড়েও আসতে চায় না।

গত দুদিন ধরে জিহানের জ্বালানিতে অতিষ্ট হয়ে নেতিয়ে পড়া মুনিরা ব্লক করে রেখেছিল জিহানের দুটো নাম্বারই। কিন্তু অভিনয়ে নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত জিহান কান্নার এক কালজয়ী অভিনয় করে ইনস্টাগ্রামে পাঠিয়ে মুনিরাকে ইমোশোনালি ব্ল্যাকমেইল করে ফেলল। আর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে যাওয়া মুনিরা আইসক্রিমের মত গলে গিয়ে আনব্লক করলো, লাভ ইউও বলল। তবে বান্দর আর জিহানের লেজ সোজা হবেনা। সকাল সকাল মুনিরার মাথা আবারো খারাপ হলো। এই জিহান আবারো সকালবেলা মাথার পোকা খেতে কল করেছে মুনিরাকে। বেচারি মুনিরা বাধ্য হয়ে ঘুমের ঘোরেই কলটা ধরে কানে গুঁজে নিল। ঘুমঘুম স্বরে বলল,

—” তোর মাথায় পাখির গু পড়ুক জিহানের বাচ্চা! সকাল সকাল কেনো কল দিয়েছো হ্যাঁ! ”
আবারো কষ্টে বুকটা ফেটে খানখান হয়ে গেলো জিহানের। হৃদয়ে টান পড়া গলায় বুকে এক হাত রেখে সে বলে উঠলো,
—” তুমি..তুমি এভাবে বলতে পারলে জান। গত রাত থেকে আমি তোমায় পাগলের মত মিস করছি বিশ্বাস করো। মিস করতে করতে আমি নিজেই কিসমিস হয়ে চুপশে গেছি। তুমি জানো আমি তোমায় কখন কখন মিস করেছি?”
বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে মুনিরা মুখ কুঁচকে তাকালো। তবুও চাপা স্বরে বলল,
—” কখন কখন করেছ?”
জিহান এবার বড় করে একটা শ্বাস নিল। এরপরে কল্পনার রাজ্যে ডুবে গিয়ে আবেগে আপ্লূত হয়ে বলতে শুরু করল,

—’ গতরাতে যখন খাবার খেতে বসে প্লেটের মধ্যে গরুর মাংস দেখলাম, তখন তোমার তুলতুলে গালটার কথা মনে পড়েছে জান। যখন হাত ধুতে গেলাম, তখন বেসিন থাকা হ্যান্ডওয়াশ দেখে তোমার পরিষ্কার হৃদয়ের কথা মনে পড়েছে। টিভিতে কুসু কুসু গানের নোরা ফাতেহিকে পেট বাকিয়ে নাচতে দেখে, তোমার কিউট ভুড়ির কথা মনে পড়েছে। আমার পোষা বিড়ালটা যখন পটি করতে গিয়েছিল, তখনও ওর কিউটনেস দেখে তোমার কান্নার কথা মনে পড়েছে। বাথরুমে গিয়ে যখন ঝরনার দিকে তাকালাম, তখনও তোমার চোখের পানির কথা মনে করেছিলাম। বিশ্বাস করো জান, প্রতিমুহূর্তে তোমার কথা মনে পড়েছে। আর এখন আমি পটি করতে এসেছি, এখনো তোমার কথা তীব্র গতিতে মনে পড়ছে। আই মিস ইউ জান!”
মুনিরার চোখ যেন আগুন জ্বলতে লাগল। ঘুমঘুম মুখে একদম ফুঁসে উঠল সে। ফোনের অপরপ্রান্তে জিহান হয়তো ভেবেছে, আহা, কি রোমান্টিক আবেগে ভাসছে সকালবেলা! কিন্তু না, বাস্তবে এখানে এক রাগী আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চেতে গিয়ে মুনিরা চিল্লিয়ে বলতে শুরু করল,

—” হারামি কোথাকার! কুত্তার দুই নাম্বার নানা, বেয়াদ্দপ পোলা। তোরে আমি শীলপাটা দিয়ে পিষে লবণ মরিচ দিয়ে মাখিয়ে যদি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে না পেরেছি, তবে আমার নামও মুনিরা না। ইয়াকক! তুই শালা বাথরুমে গিয়ে পটি করতে করতে আমাকে কল দিয়েছিস? পটি করতে করতে আমাকে মনে পড়ছে? তোর প্রেমের সীমা এত নিচে নেমে গেছে? অশভ্য, টিকটিকি! মানে তুই আমায় ভালোবেসে প্যান্টে বসে ভাবছিস, আমি বোধহয় রুপালী পরী হয়ে তোর বাথরুমে নেমে আসব? হায় আল্লাহ! জিহানের বাচ্চা, তুই কমোডে পড়ে মর!”
জিহান কষ্টে মরে গিয়ে কণ্ঠ নরম করল,

—” আরে জান, এটা মানে… মানে ইমোশনাল কানেকশন…”
—” কানেকশন তোর মাথায় পড়ুক কুত্তা! তুই পটি করতে করতে যদি আমার কথা ভাবিস, একদিন ভুল করে আমাকে ভিডিও কল দিয়ে দিবি, তখন কি আমায় দেখাবি যে তুই সিংহাসনে বসে রাজ্য শাসন করছিস? আরে শিমের গাছ, প্রেম মানে গোলাপ-চাঁদ-তারকা, ক্যান্ডেল লাইট, গান…তোর পটি নয়! আমি তোর জীবনে ল্যাকটোস ইনটলারেন্টের মত বিপদ হয়ে থাকব, যদি আর একবার আমার সাথে এরকম কথা বলিস! বেয়াদ্দপ পোলা, দুরে গিয়ে মর! তোর মত একটা হিরো আলমকে আমি যে কোন কুক্ষণে ভালোবাসতে গেলাম! শেইম অন মি!”
জিহান এবার গম্ভীর স্বরে বলল,

—” জান, তুমি আসলে বিষয়টা বুঝতে পারছো না, আমার ভালোবাসা এত পবিত্র যে…”
মুনিরা কথার মাঝেই কেটে দিল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, এতই পবিত্র যে তুই শালা বাথরুমে গিয়ে পটি করতে করতে আমার কথা মনে করিস।”
ফোনের ওপাশে হঠাৎই চুপ হয়ে গেল জিহান। মনে হলো, দুনিয়ার সব চপ্পল একসাথে তার আত্মায় আছড়ে পড়ছে। না জানি তার প্রিয়তমা এসব গালি কোথা থেকে শিখেছে।
মুনিরা শেষমেশ ধমক দিয়ে বলল,

—” শোন, আজ থেকে তোর প্রেমের সাথে টয়লেটের কোনো যোগ থাকবে না। না হলে তুই জীবনে লাভ ইউ নয়, শুধু ফ্লাশ ইউ শুনবি আমার কাছ থেকে!”
জিহান এবার সত্যি সত্যি ফ্লাশ করে বাথরুম থেকে বের হতে হতে বলল,
—” এমন করে না জান! আলাবু তো!”
মুনিরা মুখ কুঁচকে বলল,
—” তোর আলাবুর গুষ্টির শষ্টি! এই জিহানের বাচ্চা, পচা চৌবাচ্চা! কথা শোন, বিয়ে করব না আমি। তোকে কোনো ভাবেই বিয়ে করবো না আমি। তোর মত একটা হারামির সাথে আমি জীবনে সংসার করতে পারবো না। কল দিবিনা তুই আমাকে। ঘুমাইতে দে!”
মুখের উপর কল কেটে দেয়াতে আবারো দুঃখ পেলো জিহান। তবে এবার আর থামলো না। প্রতিশোধ নিতে কল দিল শ্রাবণের নাম্বারে। তবে সুইচ অফ দেখালো তারও নাম্বার, যা দেখে আবারো ডিপ্রেশনে চলে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো জিহান। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুনিরার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নিল সহসা। নইলে তার এত দিনের ভেবে নেয়া কিউট বউটাকে আর বিয়ে করা হবেনা!

সকালের কাঁচা রোদে গ্রামের ভেতরের সরু পথ দিয়ে হাঁটছে শ্রাবণ আর ধারা। দূরে গাছের মাথা পেরিয়ে উঁকি মারছে বিশাল সবুজ চাঁদোয়া, যেন আকাশের এক টুকরো নেমে এসেছে মাটিতে। কাছে আসতেই শ্রাবণের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। চোখের সামনে অসীম বিস্তৃত লিচুর বাগান, সারি সারি গাছ, পাতায় জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা রোদের আলোয় ঝিকিমিকি করছে। বাতাসে হালকা টক-মিষ্টি গন্ধ, যদিও এখন লিচুর মৌসুম না, তবুও পাতার গন্ধ, মাটির গন্ধ, আর সেই বাগানের ইতিহাস যেন মিলে এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছে। শ্রাবণ হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—” বাহ! বেশ সুন্দর তো! এ যেন অন্য এক জগৎ.. অবিশ্বাস্য সুন্দর!”
ধারা মৃদু হাসল, চোখে গর্বের ঝিলিক। মিষ্টি করে বলল,

—” দেখছেন তো, ফুফা শুধু বাগান করেননি, গাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতো আগলেছেন। শীত-গ্রীষ্মে প্রতিটা গাছে পানি দিয়েছেন, সার দিয়েছেন। ফুফু এখনো বলেন, এই গাছগুলোর পাতায় নাকি ফুফার ভালোবাসা জমে আছে। কত বছরের খাটনির পরে এই বাগান হয়েছে!”
শ্রাবণ গাছের গুঁড়ি ছুঁয়ে দেখল। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ শব্দ করছে, মাথার ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর পাখির ডাক মিশে যাচ্ছে সেই শব্দে। ধারা পায়ের স্যান্ডেল একপাশে খুলে রেখে খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করল। গ্রামের মাটিতে খালি পায়ে হাঁটার অন্যরকম এক আনন্দ রয়েছে৷ ধারা শ্রাবণকে নিয়ে একেকটা গাছের কাছে গিয়ে থামল, পুরনো দিনের গল্প শোনাতে লাগল। কোন গাছটা প্রথম লাগানো হয়েছিল, কোনটার সাথে ফুফুর বিশেষ স্মৃতি জড়ানো, আর কোনটার ছায়ায় বসে গ্রামীণ মেলা দেখেছিল তারা ছোটবেলায়। একসময় ধারা ইশারা করল এক কোণের দিকে,

—” ওখানে ছোট্ট একটা কুয়া আছে। তখন তো ফুফা পানি তোলার জন্য কুয়োর পাশেই বসে থাকতেন, যাতে গাছের যত্নে কোনো কমতি না হয়।”
শ্রাবণ ধীরপায়ে কুয়ার কাছে গেল, ঝুঁকে ভেতরে তাকাল। কুয়োর জল এখনো স্বচ্ছ, তলার ইটগুলো দেখা যাচ্ছে। মনে হলো, এ শুধু একটা বাগান নয়, এ এক প্রেমের গল্পের জীবন্ত সাক্ষী। বেশ ভালো লাগলো শ্রাবণের। চোখ তুলে শ্রাবণ হেসে বলল,
—” জানো, সিনেমায় এমন দৃশ্য থাকলে আমি বলতাম, অতিরঞ্জিত! অথচ, এটা বাস্তব! আর এর সৌন্দর্য কোনো ক্যামেরায় ধরা যাবে না।”
ধারা মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ, কিছু জিনিস শুধু চোখে আর মনে ধরে রাখা যায়, ছবিতে নয়।”
শ্রাবণ আর ধারা লিচুর গাছের নিচে হেঁটে হেঁটে গল্পে মশগুল। পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে তাদের ওপর, বাতাসে কেমন এক হালকা উষ্ণতা। ঠিক তখনই ধারা হঠাৎ থেমে কেঁপে উঠল। মুখটা কুঁচকে গেছে, এক পা বাতাসে তুলে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রাবণ চমকে গেল,

—” কী হলো?”
ধারা মুখ বিকৃত করে বলল,
—” মনে হচ্ছে কাঁটা ফুটেছে… উফ্!”
শ্রাবণ নিচে তাকাল, শুকনো পাতা সরাতেই দেখা গেল এক টুকরো শুকনো ডালের ধারালো অংশ। ধারা খালি পায়ে হাঁটছিল, তাই সরাসরি গেঁথে গেছে পায়ের তলায়। শ্রাবণ সাথে সাথে ধমকালো,
—” আশ্চর্য! তুমি খালি পায়ে হাঁটছিলে কেনো?”
ধারা মুখ কুঁচকে থেকেই বলল,

—” এমনিতেই! ”
শ্রাবণ বিরক্ত হলো। হাঁটু গেড়ে বসল,
—” দাঁড়াও, নড়বে না।”
ধারা চমকে তাকিয়ে বলল,
—” না না, ঠিক আছে। পায়ে হাত দেবেন না!”
শ্রাবণ আবারো রামধমক মারতেই থেমে গেল ধারা। একটু লজ্জা পেলেও দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। শ্রাবণ সাবধানে পা দুহাত দিয়ে ধরল, শুকনো পাতার কণা সরিয়ে ছোট্ট কাঁটাটুকু টেনে বের করল। তারপর হাতের তালু দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে রক্ত বের হওয়া থামাল। ধারা ব্যাথা পেলেও এই মুহুর্তে অবাক হয়ে শুধু শ্রাবণকেই দেখতে থাকলো।
শ্রাবণ কন্ঠে চিন্তার সুর এনে বলল,

—” এখন হাঁটতে পারবে?”
ধারা সামান্য হাসল, যদিও ব্যথা এখনো লাগছে। মিনমিন করে বলল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই পারব..তেমন কিছু তো হয়নি।”
শ্রাবণ ভ্রূ কুঁচকে বলল,
—” তেমন কিছু না আবার! তুমি কি পুরো বাগানটা লাফিয়ে ঘুরবে নাকি? এসো, বসি ওই গাছের নিচে।”
ধারাকে একপাশের ঘাসে বসিয়ে সে নিজের রুমাল বের করে পায়ের তলায় হালকা চাপ দিয়ে বেঁধে দিল। ধারা কিছু বলছিল না, শুধু তাকিয়ে ছিল তার দিকে। অদ্ভুতভাবে শান্ত, অথচ ভেতরে কোথাও এক নতুন অনুভূতির ঢেউ খেলছে। শ্রাবণ বেঁধে দিয়ে মাথা তুলে বলল,

—” খালি পায়ে আর হাঁটবে না, ঠিক আছে?”
ধারা মৃদু হেসে ফিসফিস করল,
—” ঠিক আছে….!”
শ্রাবণ এবার পাশে বসে পড়লো। গাছের নিচে ছায়াতে বেশ ভালো লাগছে এখন। অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। আসলে গ্রামের পরিবেশ টাই একদম মনোরম, শান্তি দেয়ার মত। তার উপর গাছের নিচের শীতল ছায়া তো প্রশান্তিতে বুক ভরিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ পর ধারা বলে উঠলো,

—” চলুন, এবার ফিরে যাই৷ ফুফু চিন্তা করবে!”
শ্রাবণও মাথা নেড়ে বলল,
—” ঠিক আছে চলো।”
বলেই উঠে দাঁড়ালো। ধারাও উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু পায়ের সুঁচের মত ব্যাথা টা এখনও অনুভব করল। বেশ ভালোই গভীরে কাঁটাটা ফুটেছে তাহলে।
ধারাকে খোঁড়াতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। থেমে গেলো সহসা। ধারা শ্রাবণকে থামতে দেখে চোখ পিটপিট করল। লোকটা থামলো কেনো? কী ভাবছে? কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল শ্রাবণ। কি হলো কে জানে। শার্টের হাতা গোটালো হঠাৎ। এরপর কিছু না ভেবেই ফট করে কোলে তুলে নিল ধারাকে। অপ্রস্তুত ছিল ধারা। সে যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, মুখে বিস্ময় আর হালকা অবিশ্বাসের মিশেল। নিজেকে সামাল দিতে ফট করে সেও চেপে ধরল শ্রাবণের টি শার্টের গলার কাছটা। অবাক নয়নে তাকালো লোকটার গালের দিকে। হতবাক হয়ে বলল,

—” আপনি… আপনি কি করছেন!”
ধারার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। শ্রাবণ একচুলও না তাকিয়ে হাঁটা শুরু করল, যেন বিষয়টা খুব স্বাভাবিক। গম্ভীর স্বরে বলল,
—” বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মত ঢঙ করবে না। হাঁটার অবস্থা নেই তোমার। বেশি কথা বলো না, নাহলে ফেলে দেব।”
ধারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। হালকা লজ্জা, কিছুটা অসস্তি, আবার ভেতরে কোথাও অদ্ভুত উষ্ণতা। মুখ ফিরিয়ে ছোট্ট গলায় ফিসফিস করে বলল,
—” আমি নিজে হাঁটতে পারতাম তো….!”
শ্রাবণ হালকা চোখ ঘুরিয়ে তাকাল, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রুপের হাসি টেনে বলল,
—” হুম খুব পারো তুমি। পারো বলেই তো হাঁটছিলে না, খোঁড়াচ্ছিলে। এখন চুপচাপ থাকো, নইলে গ্রামজুড়ে ঘোষণা দিয়ে ফেলব কিন্তু যে তুমি বাগানে এসে পায়ে কাঁটা ফুটিয়ে বসেছো।”
ধারা গালে রঙ চড়ে যাওয়া ঠেকাতে মুখ ফিরিয়ে নিল। হালকা বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ে এসে লাগল শ্রাবণের কাঁধে। পায়ের ব্যথা যেন ভুলেই গেল সে। মনে হচ্ছে, এই পথটুকু হাঁটার চেয়ে কোলে চুপচাপ বসে থাকা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অন্যরকম একরকম ভালোও লাগছে।

সামিউল শেখ যদি পারতেন, তাহলে নিজের স্ত্রীকে তুলে আঁছাড় মারতেন। সালমা বেগম যেরকম বোকামি টা করেছেন, সেটার ফল তাকে এখন ভুগতে হচ্ছে। এইযে সকাল বেলাই তন্নি নিজের বাপ তরিকুল ইসলাম কে নিয়ে হাজির হয়েছে শেখ বাড়িতে। তন্নির মা কিছুদিনের জন্য বিদেশে গিয়েছে, যা শুনে সুকরিয়া আদায় করেছেন সামিউল শেখ। কারণ ওই মহিলা আরও বেশি ভয়ংকর। এদিকে সালমা বেগম কোনো মতে কাচুমাচু হয়ে সোফায় বসে আছেন, আর বারবার স্বামীর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন।
সামিউল শেখ নিজেও খুব বিরক্ত। তিনি এবার তরিকুলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
—” দেখো জামাইবাবু। আমি আগেও বলেছি, আমার স্ত্রী যে কথাটা দিয়েছিল, সেটা নিতান্তই মুখের কথা ছিল। সেই সময়ের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল… আর এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। শ্রাবন তো ইতোমধ্যে বিয়ে করেছে, সে এখন বিবাহিত। এখন তো চাইলেও কোনো কিছুই হওয়া সম্ভব না!”

পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক টি নিজের চোখের চশমা ঠেলে দিয়ে গুরুগম্ভীর ভাবে বললেন,
—” এটা আপনাদের আগে ভাবা উচিত ছিল ভাইজান। যখন কথা রাখতেই পারবেন না, তখন কেনো কথা দিয়েছিলেন? আমার মেয়েকে কেনো স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন?”
এ পর্যায়ে থেমে থাকলেন না সালমা বেগম। তিনি এবার একটু কথা কটাক্ষ করে বললেন,
—” আমরা তো আর জানতাম না যে আপনার মেয়ে আগে থেকেই আমার ছেলেকে পছন্দ করে। সে তো নাকি ছোটবেলা থেকেই শ্রাবণকে পছন্দ করে। কিন্তু আমার ছেলে তো তাকে ছোট বোনের মতোই দেখে!”
এবারে রাগে ফুঁসতে থাকা তন্নি বলে উঠলো,

—” মোটেই না মামি। আপনার ধারণা ভুল। শ্রাবণ ভাই মোটেও আমাকে বোনের মত দেখেনা। আমার বিশ্বাস, উনিও আমাকে খুব পছন্দ করে, আর আপনারা যদি জোর করে ওই গাইয়া মেয়েটার সাথে শ্রাবণ ভাইয়ের বিয়ে না দিতেন, তাহলে উনি আমাকেই বিয়ে করতেন। আর এখন সুযোগ পেলেও বিয়ে আমাকেই করবে!”
সালমা বেগম বিরক্তিতে মুখ কুঁচকালেন। এমন বেলাজ বেহায়া মার্কা মেয়ে সে এই জীবনে দেখেননি। আগে তো মেয়েটা ভালোই ছিল। এখন হুট করে রূপ বদলে ফেলল কীভাবে সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। সামিউল শেখ এবার হাত উঠিয়ে বললেন,

—” আহহা, তোমরা থামো।”
এরপর তরিকুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” দেখো জামাই বাবু, তুমিই বলো, কী করতে চাইছো এখন? মানে তোমাদের আশা টা কী? ”
তরিকুল ইসলাম এবার সোজা হয়ে বসে বলতে শুরু করলেন,
—” ভাইজান শুনুন, আমরা তো ঘরেরই লোক বলুন। চাইলেই বিষয়টা খুব সহজেই মিটমাট করে নেয়া যায়। তন্নির মায়ের কাছে শুনলাম শ্রাবণ নাকি ওই গ্রামের মেয়েটাকে মেনেই নেয়নি। ওরা নাকি এক ঘরেও থাকেনি এখনো। তাই তাদের কে তো আর দম্পতি বলা যায়না। যেহেতু শ্রাবণ নিজেই বিয়ে মানে না তখন চাইলেই খুব সহজে আমরা ওই গেঁয়ো মেয়েটাকে তাড়াতে পারি, তাই না বলুন? তাই আমার মতে, বাইরের মেয়ের জন্য ঝামেলা বাদ দিয়ে দ্রুত ডিভোর্স টা করিয়ে দিন। আমরা এদিকে বিয়ের আয়োজন করি। আমার মেয়ের কোনো আপত্তি নেই।”
চোখ বড় করে তাকালেন সালমা। কিছু বলতে চাইলে সামিউল শেখ থামিয়ে দেন। তিনি বেশ অভিজ্ঞ সুরে বললেন,

—” বাহ! বেশ ভালো সিদ্ধান্ত! আর ধারার মানে শ্রাবণের বউয়ের কী হবে?”
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে তাকালো তন্নি।
—” উফ মামা, ওই মেয়েটাকে নিয়ে আমরা অত চিন্তা ভাবনা কেনো করব? আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যেহেতু শুধুই মেয়েটাকে একটা আশ্রয় দিতে চাইছো, তাহলে আমি না হয় ওকে এ বাড়িতে আশ্রয় দিব। কাজের মেয়ে হয়ে থাকবে এ বাড়িতে, একটা ছাদ পেলেই তো হলো। দুবেলা খাবার, আর মাথার উপরে ছাদ, ব্যস! ওর আর কি দরকার! আমি এটুকু কম্প্রোমাইজ করতেই পারি!”
সালমা বেগম এবার আর দমে থাকতে পারলেন না। বাঁকা হেসে হতবাক হয়ে তরিকুল ইসলাম কে বললেন,

—” বাহ জামাইবাবু! বাহ! আপনার মেয়ের মন মানসিকতা দেখে আমি সত্যিই খুব অবাক হয়ে যাচ্ছি। এত সুন্দর চিন্তা ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর! এখন বুঝতে পারছি আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আপনার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে না দিয়ে যে কত বড় ভালো কাজ করেছি, সেটা এখনই টের পাচ্ছি!”
তন্নি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল,
—” মহিলা বেশি কথা বলে!”
সামিউল শেখ এবারও থামিয়ে দিলেন সালমা বেগমকে। কিছুক্ষণ চুপ রইলেন তিনি। দুহাত মুঠো করে ভাবনাতে ব্যস্ত হলেন। তরিকুল আবারো বললেন,

—” আমি আশা করব, আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন ভাইজান। আমার মেয়েটা শ্রাবণকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছে আর আপনারা যেহেতু প্রথমে আমার মেয়েকে বউ বানাতে চেয়েছেন, তাই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলাটা আপনাদের ভুল ছিল। আমার মেয়ে শ্রাবণকে ভালোবাসে আর আমি যতটুকু জানি, আমার মেয়েকেও শ্রাবণ পছন্দ করে। তাই শুধু শুধু একটা বাইরের মেয়েকে তাও আবার গ্রামের মেয়েকে তাদের মাঝে ঢুকিয়ে দেয়াটা আপনাদের উচিত হয়নি!”
সালমা বেগম চিন্তিত হলেন স্বামীর নীরবতা দেখে। অনেকক্ষণ সময় কাটলো। বেশ কিছুক্ষণ পর সামিউল শেখ মাথা উঠালেন। এরপরে বেশ অভিজ্ঞ সুরে বলতে শুরু করলেন,

—” ঠিক আছে। আমার স্ত্রী যখন কথা দিয়েছিল, আমি সেই কথা রাখছি। আমি তোমাদেরকে সুযোগ দিচ্ছি জামাই বাবু। আমার ছেলে যদি নিজের মুখে বলে যে সে ধারাকে ছেড়ে দিয়ে তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে আমি নিজ হাতে ওদের ডিভোর্স করিয়ে তোমার মেয়েকে আমার ছেলের সাথে বিয়ে দেব। কিন্তু ওই একটাই শর্ত, আমার ছেলেকে নিজ মুখে বলতে হবে যে, সে তোমার মেয়ে তন্নিকে পছন্দ করে, এবং বিয়ে করতে চায়!”
খুশিতে আটখানা হলো তন্নি। গদগদ হয়ে বলে উঠলো,
—” আপনি শুধু দেখবেন মামা। শ্রাবণ ভাই নিজ মুখেই বলবে। কারন উনারও কোনো ইচ্ছে নেই একটা গেঁয়ো মেয়ের সাথে জীবন কাটানোর, নিতান্তই আপনাদের জোরে বিয়ে করেছে!”
সামিউল শেখ ঠোঁট উল্টে বললেন,
—” হুম ঠিক আছে। বললামই তো, আমার ছেলে চাইলে সব হবে। আর তিন দিন বাদে আসবে ওরা। তারপরই যা হবার হবে। আজ তোমরা আসতে পারো!”

তরিকুল ইসলাম এবং তন্নি বাড়ি থেকে চলে গেলেন। এ পর্যায়ে অনেক বেশি বকাবকি করলেন সামিউল শেখ। নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রী কে কথা শোনালেন একটা মাত্র ভুলের জন্য। সালমা বেগম চুপচাপ শুনলেন। এরপরে বললেন,
—” সবই বুঝলাম। কিন্তু তুমি ওমন একটা কথা বললে কেনো? শ্রাবণ চাইলেই সত্যি সত্যি তুমি ওদের বিয়ে দিয়ে দেবে?”
এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সামিউল শেখ,
—” তারমানে তুমি বলছো, তোমার ছেলে ধারাকে ছেড়ে ওকে বিয়ে করতে চাইবে? তোমার সো কোল্ড হীরের টুকরোর ছেলের এত রুচির দুর্ভিক্ষ হয়েছে?”
সালমা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,

—” আরে বাবা সেটা না। ও বিয়ে করতে না চাইলেও ধারাকে ছাড়তে তো চাইবে। মানে ও তো এখনো মেনেই নেয়নি। হয়তো ধারাকে ছাড়ার জন্য রাজি হবে। আর ওটা হলেই তো…!”
সামিউল শেখ এবার সন্দিহান দৃষ্টি ফেলে বললেন,
—” চিন্তা কোরো না। আরো তিন দিন আছে ওরা গ্রামে। তুমি দোয়া করো, যেন, এই তিন দিনে তোমার হীরের টুকরো ছেলে ধারার মায়ায় পড়ে যায়, সোজা বাংলায় যেন খুব ভালোবেসে ফেলে। একবার মায়ায় পড়লে আমাদের কিছু করতে হবেনা। ”
একটু থেমে সামিউল শেখ খুব গর্বের সাথে বললেন,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১২

—” নিজের রক্তের প্রতি বিশ্বাস আছে আমার। আমার বংশ একটুখানি যত্ন পেলেই বউয়ের প্রেমে পড়তে বাধ্য। আমিও তো বিয়ের আগে তোমায় না মানলেও সাতদিনের মাথায় তোমার প্রেমে পড়েছিলাম। তাই তোমার হীরের টুকরো ছেলে যদি আমার রক্ত পেয়ে থাকে, তবে নিজের তিন কবুল পড়া স্ত্রীর উপর পিছলাবেই। এটা বংশ পরম্পরার মধ্যে পড়ে!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৪