শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২১
অনামিকা তাহসিন রোজা
শ্রাবণ আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। গ্রামে ধারা কে পাশে নিয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে এমন এক অভ্যাস হয়েছে যে ফট করে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাছাড়া মনের কথা উগলে দেয়াতে আরো ভালো ঘুম হয়েছে তার। নাহলে পেটে ব্যাথা হতো, বুকে দলা পাকাতো অব্যক্ত কথাগুলো।
অথচ এদিকে বেচারি ধারার ঘুমটা কেড়ে নিয়েছে শ্রাবণের এমন অদ্ভুত কথাবার্তা। পুরোপুরি চমকে দিয়েছে তাকে। ধারা বড় বড় করে চোখ করে সারারাত তাকিয়ে থেকেছে সিলিং ফ্যানের দিকে, মাঝে মাঝে আড়চোখে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে, যা হচ্ছে তা সত্যি কিনা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সারারাতই ভেবেছে মেয়েটা। প্রথমে ভেবেছে লোকটা বোধহয় পাগল-টাগল হয়ে গেছে। নাহলে যেই লোক তাকে বাসর রাতে ঘর থেকে বের করে দিতে পারলে বাঁচে, সে কিনা সাত দিনের মাথায় কোলে করে তাকে ঘরে তুলল? এটা কোনো কথা? কেও শুনলে আদৌও বিশ্বাস করবে? আবার বলে কিনা ভালোবাসে? বিশেষ করে ভালোবাসার কথাটা এখনো ধারার কানে বাজছে। ভালোবাসে? আসলেই? এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ভালোবাসলো? অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা মাথায় দড়ির মত পাকালো, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। এক মুহুর্তের জন্য ভাবল স্বপ্ন দেখেছে। তাই চিমটি কাটলো নিজেকেই। কিন্তু ব্যাথা পেতেই ঠোঁট উল্টালো, বুঝলো এটা মোটেই স্বপ্ন নয়।
সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়ে ধারা ভোরে নামায পড়তে উঠলো। এরপর আবার শুয়ে পড়লো। এতদিন পর নিজের ঘর, নিজের বিছানা পেয়ে শ্রাবণ গভীর ঘুমে। তাই ধারাও তাকে আর ডাকলো না। বিড়ালের মত গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো শ্রাবণের পাশে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই ঘুমিয়েও পড়লো।
নামায পড়া শেষ করে সামিউল শেখ কেবল বিছানায় বসলেন। তখনি হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন সালমা বেগম। সামিউল শেখ কে দেখে ভাবসাব নিয়ে বললেন,
—” তুমি গতরাতে ছেলে কে কী এমন ডোজ দিলে বলোতো?”
সামিউল শেখ পা উঠিয়ে বিছানায় বসলেন। স্ত্রীর কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—” কী আর ডোজ দেব বলো? শুধু একটু বুঝিয়ে বলেছি যেন আমার সম্মান টা রাখে!”
সালমা বেগম হাসলেন। গিয়ে স্বামীর পাশে বসে গর্ব করে বললেন,
—” গত রাতে ঘরের জগে পানি ছিল না। আমি পানি আনতে রান্নাঘরে গিয়েছিলাম। ফিরে আসার সময় সিঁড়ির কাছে আসামাত্রই এক কালজয়ী ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখেছি। যদিও দেখে লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল। তবে পাইনি, কারন, আমার কথা কিন্তু হাড়ে হাড়ে ফলেছে। বলেছিলাম না তোমাকে? যেই ধারা কে আমি পাশের ঘরে শিফট করছি, সেই ধারাকেই তোমার ছেলে দুহাতে কোলে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে যাবে! বলেছিলাম কিনা বলো?”
ভদ্রলোক স্ত্রীর এহেন কথায় রীতিমতো হতবাক হয়ে যন্ত্রের মত মাথা নেড়ে বললেন,
—” হ্যাঁ বলেছিলে। তাহলে গতরাতে কি….
মুখের কথা কেড়ে নিলেন সালমা বেগম। টেনে টেনে বিদ্রুপ করে বললেন,
—” জ্বি হ্যাঁ, গতরাতে তোমার সুযোগ্য ছেলে ধারাকে বাচ্চাদের মত কোলে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছে। আমি দুচোখ বড় বড় করে সেই দৃশ্য দেখেছি। দেখেছো তো? বলেছিলাম না? বংশের রক্তের টান দেখো! যেমন বাপ-দাদা, তেমনই ছেলে আমার!”
কথাখানা সালমা বেগম এমন ভাবে বললেন যেন সব দোষ বেচারা সামিউল শেখের বংশের। এদিকে ছেলের এমন কান্ডের কথা শুনে হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন সামিউল শেখ। তিনি ভাবতেও পারেন নি যে, ভোরবেলা এমন একটা কথা শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়বেন। মুহুর্তের মধ্যে সামিউল শেখ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি শ্রাবণের ডিএনএ টেস্ট করবেন। এ ছেলে মোটেই তার পূত্র হতে পারেনা, উহু হতেই পারে না। কারন এ বংশের পুরুষেরা বউয়ের ক্ষেত্রে একটুআকটু নির্লজ্জ থাকলেও এমনভাবে কোলে তুলে নিয়ে যাবে, তাও আবার মায়ের সামনে দিয়ে! এই কাজ তো তিনি কখনো করেন নি! তাহলে তার ছেলে করল কেনো? কি একটা অবস্থা!
ভোরের নির্জনতা ফুরিয়ে এসেছে। সূর্য মামা উঁকি দিয়েছে ধরনীর এ প্রান্তে। জানালার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলো এসে শ্রাবণের চোখে পড়ল। ঘুমের মধ্যে এমন রোধ পেয়ে মুখ কুঁচকে ফেলল শ্রাবণ শেখ। কোনোমতে ঘুমের ঘোরেই এপাশে মুখ ফিরিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকালো। ঘুম আধোআধো ভাঙছে তার। অথচ বিছানায় তারই পাশে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য নিয়ে থাকা ঘুমন্ত রমণীকে দেখতেই সব ঘুম উড়ে গেলো শ্রাবণের। কোত্থেকে যেন একরাশ মুগ্ধতা তার চোখে-মুখে উঁকি দিল। ঘুমন্ত চোখেই তাকিয়ে রইলো ধারার দিকে। দেখে মনে হলো একটা স্নিগ্ধ পদ্মফুল তার বিছানায় জায়গা পেয়েছে। তিড়তিড় করে কাঁপা ঠোঁটদুটো নিজেদের মত করেই কাঁপছে, আলতো শ্বাসের গতি, বদ্ধ চোখজোড়া এখনো মায়া ছড়াচ্ছে, কপালের কাছে চুলগুলোর কিছু অংশ খেলা করছে। আর বালিশে গাল চেপে খানিকটা ফুলে গেছে গালের ওপাশ! কত সুন্দর লাগছে দেখতে! কি মিষ্টি লাগছে মেয়েটাকে! শ্রাবণের হুট করে মনে পড়লো এই সুন্দর পদ্মফুলের মত মেয়েটা তার বউ! তার বিয়ে করা বউ। তার ঘরণী! তৎক্ষনাৎ গর্বে খুশিতে বুকটা ফুলে উঠলো শ্রাবণের। এক বুক শ্বাস নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। কখনো ভাবেওনি যে দেশে ফিরে এভাবে অমূল্য এক রত্ন পেয়ে যাবে!
শ্রাবণ বিছানায় আধশোয়া হয়ে ঘুমন্ত ধারার দিকে তাকিয়েই থাকলো। এত কাছে থেকেও এতদিন কীভাবে সে মেয়েটাকে উপেক্ষা করে গেছে? বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন জাগল তার। মনে হলো, এই মেয়েটাই তো তার ঘর, তার জীবন। একরাশ মায়া নিয়ে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। সাহস হয়নি স্পর্শ করতে, কেবল বাতাসেই ঝুলে রইল হাতটা। দুর থেকেই ছোঁয়ার ভান করে মনে মনে স্পর্শ করে ভাবল,
—” এই মুখটার ভেতর কত কষ্ট, কত না-বলা অভিমান জমে আছে। অথচ আমি-ই ছিলাম সবচেয়ে বড় শত্রু ওর। কিন্তু আর না। এখন থেকে এ মুখে শুধু হাসি থাকবে, শুধু শান্তি থাকবে। আমি সব ভুলিয়ে দেবো। সব অতীত ধামাচাপা দিয়ে দেব!”
শ্রাবণের ঠোঁটে অজান্তেই একটুকরো হাসি ফুটল। বুকের ভেতর ভারি মমতা টের পাওয়া গেলো। বারবার বিড়বিড় করে আওড়ালো,
—”আমার বউ। আমার নিজের বউ।”
এই ভাবনায় যতটা গর্ব, ততটাই প্রশান্তি এলো তার মনে। ঠিক তখনই ধারা একটু নড়েচড়ে উঠল। চোখের পাতা কাঁপল খানিকটা। আস্তে আস্তে ভাঙল ঘুম। শ্রাবণ তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার ঘুম ভাঙার দৃশ্য উপভোগ করতে থাকলো। চোখ সরানোর কথা ভুলেই গেলো। ঘুমন্ত ধারার ঘুম কিছুটা হালকা হলেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জেগে ওঠে তার। বুঝতে পারে কারো অমোঘ দৃষ্টি। তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টি উপলব্ধি করতে পেরে ফট করে ধারা দুচোখ মেলে তাকালো। প্রথমেই চোখে পড়লো শ্রাবণের গভীর দৃষ্টি। চমকে উঠল ধারা। চোখ ঘষে ঘুমের রেশ কাটিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে ফিসফিস করে বলল,
—”আপনি…উঠে পড়েছেন? কিছু লাগবে?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মেয়েটা কি তাকে ব্রিটিশ বা দখলদারি স্বার্থপর ইংরেজ মনে করে নাকি! সবসময় তাকিয়ে থাকলে বা ডাকলেই ভাঙা মেশিনের মত বলতে থাকে, কিছু লাগবে? কিছু লাগবে? কেনো? শ্রাবণ কি দরকার ছাড়া মেয়েটার দিকে তাকাতে পারে না? ডাকতে পারে না? আজব কারবার! মনে মনে ইডিয়ট বলল শ্রাবণ। তবে স্নিগ্ধ মুখটা দেখে নরম হলো তার মনোভাব, গলে গেলো রাগ। ধারা হয়তো শ্রাবণের দৃষ্টি বুঝলো? শ্রাবণ ঠোঁটে মৃদু হাসি রেখেই বলল,
—” আপাতত কিছুই লাগবে না। কয়েকদিন পর তোমাকে লাগবে।”
ধারা পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—’ কেনো?”
শ্রাবণ এবার সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
—” কারন তোমার মাথা!”
ধারা সংকুচিত হলো। ভাবলো আগের কথাটা ঠিকঠাক শোনেনি, বা বোঝেনি। ঘুমের ঘোরে পাত্তা দিল না। গুটিয়ে গিয়ে মিনমিন করে শুধালো,
—” তাকিয়ে ছিলেন যে? বলুন না কিছু লাগবে? পানি খাবেন?”
শ্রাবণ ফট করে জবাব দিল,
—” নাহ!”
ধারা এবার ভ্রু কুঁচকালো,
—” তাহলে কী দেখছিলেন?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ ভাবলো। মনে মনে বিরক্ত হলো। এই মেয়েটা বোকা, নাকি সে-ই গাধা! কি দরকার ইচ্ছে করে মেয়েটার সাথে এসব আজগুবি কথাবার্তা বলার। ভেবে পেলো না শ্রাবণ। মুখ ফঁসকে বলে উঠলো,
—” তেমন কিছু দেখছিলাম না। শুধু দেখছিলাম, তুমি কীভাবে ঘুমিয়ে থাকো!”
ধারা চোখ নামিয়ে ফেলল। বুকের ভেতর ধকধক করছে তার। এতটা নিবিড় দৃষ্টি, সে কোনোদিন পায়নি। এভাবে তাকিয়ে থাকার কারনটা খোলাসা করে বুঝলো না। সঠিক কোনো জবাব খুঁজে না পেয়ে শুধু শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়িয়ে নিলো। আশ্চর্য! আজকাল তার ঠোঁটও ফটাফট চলছে, আবার ক্ষনে ক্ষনে অকারনে লজ্জাও পাচ্ছে। কারনটা খুঁজে পেলো না বেচারি।
শ্রাবণ ওর চুপ থাকা দেখে মৃদুস্বরে বলল,
—” আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি!”
ধারা বেশ আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করল,
—” কীসের সিদ্ধান্ত?”
শ্রাবণ অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,
—” চোখের ডাক্তার দেখাবো!”
অবাক হলো ধারা। পরক্ষণেই গুরুতর বিষয় মনে করে অনেক উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” সে কি? কেনো?”
এ পর্যায়ে একটু রেগে গেলো শ্রাবণ। খ্যাপাটে স্বরে ধারার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
—” কারন আমার চোখে সমস্যা হয়েছে। আজকাল চোখের সামনে যা-ই দেখছি, সেটা একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। প্রতিদিন সৌন্দর্যের মাত্রা বাড়ছে। নতুন নতুন রূপে নতুন ভাবে সুন্দর লাগছে! যেটা আমি নিতে পারছিনা!”
একটু থেমে শ্রাবণ আরেকটু রাগান্বিত গলায় বলল,
—” একটা জিনিস সুন্দর! ঠিক আছে মানলাম। সেটা যেমন আছে তেমনই থাকা উচিত তাইনা? অথচ সৌন্দর্যের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে কেনো? কেনো প্রতি মুহুর্তে একেক-রকম সৌন্দর্য দেখিয়ে মানুষকে লোভ দেখাতে হবে? কেনো এত সুন্দর লাগবে? কেনো?”
অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুর ইঙ্গিত পেয়ে ধারার বুকটা যেন আরও জোরে কেঁপে উঠলো। ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না। শুধু একচিলতে লজ্জা-মাখা বিস্ময় ঝরে পড়ল তার দৃষ্টি থেকে। তবে শ্রাবণের শেষ কথাগুলো শুনে ধারা একেবারেই স্তব্ধ হয়েছে বটে। বুঝলো না, এটা কি ঠাট্টা, না কি সত্যিই কোনো গভীর মানে আছে ভেতরে। বুকের ভেতর কেমন এক চাপা শিহরণ বয়ে গেল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো শ্রাবণের দিকে। কণ্ঠ শুকিয়ে এলো, তবু জিজ্ঞেস করল,
—” সুন্দর লাগছে মানে?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো। এবার সে নিজেরই বলা কথার জবাব খুঁজে পাচ্ছে না। কিছু সময় চুপ থেকে হঠাৎ উঠে বসল। মুখে গম্ভীরতা এনে বলল,
—” মানে কিছু না। আমি সকাল সকাল তোমার সঙ্গে এসব আজগুবি কথা বলতে চাইছিনা । কারন তুমি পিউর গাধা! আমি আসলেই ডাক্তার দেখাবো।”
ধারা সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবলো, লোকটা কী আসলেই পাগল নাকি? তাকে কোনো কারন ছাড়া গাধা বলল কেনো? আবার এভাবে কথা ঘোরায় কীভাবে? তবু ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে বলে ফেলল,
—” আপনার চোখে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা…!”
শ্রাবণ সাথে সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। ভ্রু উঁচিয়ে বলে উঠলো,
—” সমস্যা কী?”
ধারা ঢোক গিলতে গিলতে কেঁপে ওঠা গলায় বলল,
—” সমস্যা হয়তো…সেই জিনিসটার মাঝেই, যেটা আপনার কাছে দিনকেদিন সুন্দর হয়েই যাচ্ছে! ”
শ্রাবণ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। চোখ সরু করে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল । তবে সে আর এগোল না। সরাসরি স্বীকার করে ফেলার মতো সাহস তার হলো না। বরং হালকা হেসে ধারা থেকে চোখ সরিয়ে নিলো,
—” যাকগে…তুমি বরং ওঠো, সকাল হয়ে গেছে।”
শ্রাবণ বলেই এক দমকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠোঁটে চাপা হাসি, কিন্তু চোখে ভীষণ সিরিয়াস চাহনি। যেন নিজেরই কথায় নিজে ধরা পড়ে গেছে। ধারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে তার। গলা শুকিয়ে এলো। মাথা নিচু করে আঁচলের কোণা আবারো আঙুলে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কিছু বলতে পারল না।
শ্রাবণ এবার চোখ সরাল না। একদৃষ্টে তাকিয়েই থাকল। মৃদু স্বরে আবার বলল,
—” একটা কথা বলি?”
ধারা চোখ উঁচিয়ে তাকালো। মুখে মিনমিন কন্ঠ নিয়ে বলল,
—” বলুন!”
শ্রাবণ এবার ঝুঁকে পড়ল ধারার দিকে। বিছানায় হাতে ভর দিয়ে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। এরপর অন্যরকম কন্ঠে বলে উঠলো,
—” যতবার দেখি, ততবার নতুন করে সুন্দর মনে হয়। যতবার তাকাই, ততবার একেক রূপে খু*ন হয়ে যাই আমি। না চাইতেও নির্লজ্জ মনে নিষিদ্ধ অনুভূতিরা জেগে ওঠে। এটা কি আমার দোষ, নাকি যে এসবের জন্য দায়ী, তার দোষ?”
ধারা হকচকিয়ে গেল। মনে হলো বুকের ভেতর এক ঝড় বইছে। কিন্তু কী জবাব দেবে কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু ঠোঁট কামড়ে রইল। শ্রাবণ মেয়েটার অস্থিরতা লক্ষ্য করল। ঠোঁটে হালকা হাসি খেলল। পাশ ফিরে আরেকটু কাছে সরে এলো, তবে স্পর্শ করল না। তারপর শান্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—” হয়তো ডাক্তার দরকার নেই…আসল সমস্যা আমার চোখে নয়, সমস্যাটা আমার মনে! তাই না?”
ধারা কেঁপে উঠল। চোখ তুলে এক মুহূর্তের জন্য শ্রাবণের দিকে তাকাল, তারপর আবার তাড়াতাড়ি নামিয়ে নিল। গলা শুকিয়ে গেলে ফিসফিস করে বলল,
—” আমি উঠব!”
শ্রাবণ এবার মজা করে হাসল। সরে আসলো খানিকটা। আর জ্বালাতে চাইলো না। বিছানায় হেলান দিয়ে হাত দুটো মাথার পেছনে নিল। বলল,
—” তো ওঠো! আমি কি তোমায় বিছানায় বেঁধে রেখেছি নাকি!”
ধারা আর কিছু বলল না। লজ্জায় কান গরম হলো! গুটিসুটি মেরে একটু শুয়ে রইল। কিন্তু বুকের ভেতর তার ধপধপানি আরও বেড়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না, এ লোকটা আদৌ সিরিয়াস, নাকি শুধু খুনসুটি করছে। কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে উঠে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
গোসল করতে করতে একটা জিনিস আবিষ্কার করল শ্রাবণ। সে আজ সকালবেলা নিতান্তই অকারণে অপ্রয়োজনে, একটা গুরুত্বহীন কথোপকথন সাড়লো ধারার সাথে। তবে এটা যে কথা বলার একটা অযুহাত মাত্র, সেটা ঘুমের রেশ পুরোপুরি কেটে গেলে বুঝেছে সে। কিন্তু যতই যা হোক না কেনো, এটা সত্যি যে দিনদিন ধারাকে অনেক সুন্দর লাগছে। কেনো যেন শ্রাবণের চোখে মেয়েটার মোহ ছড়িয়ে যাচ্ছে বিক্ষিপ্তভাবে। এটা কি ভালোবাসার জন্যেই হচ্ছে.? মনে মনে একটা বড়সড় সিদ্ধান্ত নিলো শ্রাবণ।
আজ শ্রাবণ কে অফিসে যেতে হবে। তাই ডাইনিং টেবিলে সকালটা মোটামুটি বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। বড় ট্রেতে ভাত, ভাজি, ডাল আর মাংস, রুটি সাজানো। সামিউল শেখ গ্লাসে দুধ ঢালছে, রুটি ছিঁড়ছে। সালমা বেগম ব্যস্ত পরিবেশন করছেন, আবার মুখে চাপা হাসি। গত রাতের সেই দৃশ্য বারবার মনে পড়ছে, শ্রাবণ কীভাবে কোলে করে ধারাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। ভাবতেই তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি ভরা একরাশ হাসি খেলে যাচ্ছে।
শ্রাবণ গোসল করে এসেছে। শার্ট প্যান্ট পড়ে এসেই সে চেয়ার টেনে বসল। এক হাত ঘড়ির দিকে, অন্য হাতে কলার ঠিক করছে। অফিসে যাবার তাড়া তার চোখেমুখে স্পষ্ট। ধারা মাথা নিচু করে চুপচাপ খাবার তুলছে প্লেটে। কারো চোখে চোখ রাখছে না। ভেতরে ভেতরে এখনো লজ্জার উত্তাপ ছড়িয়ে আছে তার গালে। কারন একটু আগে, মানে শ্রাবণের আসার আগে সামিউল শেখের সাথে এক গুরুতর কথোপকথন হয়েছে তার। যেখানে তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক ভয়ানক প্রশ্নের! বাধ্য হয়ে তো কিছু প্রশ্নের মিথ্যে জবাবও দিয়েছে ধারা!
সালমা বেগম একবার ছেলের দিকে, একবার বউমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” আরে বাবা, এত তাড়া কীসের? একটু আরামে খা না বাপ!”
শ্রাবণ গম্ভীর মুখে জবাব দিলো,
—” অফিসে দেরি হয়ে যাবে মা!”
এই জবাব শোনার পর সালমা বেগম মুখ টিপে হাসলেন। বললেন,
—” তা তো হবেই। রাতে তো কত কাজ করেছিস তুই!”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো, কিন্তু কিছু না বলে খাবার মুখে তুললো। ধারা আরো বেশি সংকুচিত হয়ে গেলো। মনে হলো যেন সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে স্ত্রীর কথা শুনে বিষম খেলেন সামিউল শেখ। কিছু বললেন না মুখে। কিন্তু মনে মনে ভীষণ অবাক হয়েছেন। তার পরিবারের সদস্যদের হয়েছে টা কি? সবাই এমন লাগামছাড়া হলো কেনো ভেবে পেলেন না ভদ্রলোক!
হুট করে সালমা বেগমের মনে পড়লো, তিনি সামিউল শেখের ওষুধ আনতে ভুলে গেছেন। ধারার মাত্র খাওয়া শেষ হলো। তাই সে সালমা বেগম কে যেতে না দিয়ে ভদ্রতার সহিত বলল,
—” আমিই আনছি মা। আপনি থাকুন!”
এরপর হাত ধুয়ে উপরে চলে গেল।
ধারার অনুপস্থিতিতেই সুযোগ পেলেন সামিউল শেখ। তিনি এই পরিবেশ টাই চাইছিলেন। সালমা বেগমের দিকে ইশারা করে নিশ্চিত হয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে শ্রাবণকে বললেন,
—” কাল রাতে ধারা কোথায় ছিল শ্রাবণ?”
একটুও বিচলিত হলো না শ্রাবণ শেখ। অপ্রস্তুত হতেও দেখা গেলো না। সে নির্লিপ্ত ভাবে রুটি খেতে খেতে বলল,
—” আমার ঘরে!”
—” কেনো?”
সামিউল শেখের প্রশ্ন করার ভঙ্গিটাই অস্বাভাবিক লাগলো শ্রাবণের। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কেনো মানে? এটা কোনো প্রশ্ন করলে তুমি বাবা? মা তোমার সাথে এক ঘরে থাকে না? আমি কি কখনো কেনো থাকে জিজ্ঞেস করেছি নাকি?”
হতবাক হয়ে নড়তে ভুলে গেলেন সালমা বেগম। চোখ রসগোল্লার মত হয়ে গেলো তার। হা হয়ে তাকিয়ে থেকেই বললেন,
—” তুই কবে থেকে এমন লাগামছাড়া হলি বাপ আমার?”
সামিউল শেখও তব্দা খেয়েছেন। মুখে খাবার থাকলে নিশ্চিত বিষম খেতেন। কারনও আছে। ছোট থেকেই শ্রাবণ শেখ একদম লাজুক প্রকৃতির, নম্র, সভ্য, ভদ্র একটা বাচ্চা ছেলে ছিল। এমনকি সে নিজের ভদ্রতা, লাজুকতার জন্য স্কুলে কলেজেও সুনাম পেয়েছিল। সামিউল ও সালমাও জানেন তাদের ছেলে প্রচুর লাজুক ও চাপা প্রকৃতির। অথচ আজ এই মুহুর্তে তাঁরা নতুন শ্রাবণ কে আবিষ্কার করে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন।
তাদের অবাক হওয়ার রেশ না কাটতেই শ্রাবণ জুসে চুমুক দিয়ে আবারো বলল,
—” স্বামী-স্ত্রী এক ঘরে থাকতে হয়। জোর করে বিয়ে দিয়েছো, এখন তো আর পিচ্চি মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারিনা। যতই হোক, বউ আমার! তাই আমার বউও আমার সাথে থেকেছে, ইভেন এখন থেকে পার্মানেন্টলি আমার ঘরেই থাকবে!”
সামিউল শেখ নিজেকে সামলে নিলেন। ছেলের কথায় মূর্ছা না গিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাসম্ভব কঠোর গলায় জানালেন,
—” কিন্তু ধারা তো তোমার সাথে থাকতে চায় না!”
তৎক্ষনাৎ রুটি ছিঁড়তে থাকা শ্রাবণের আঙুলগুলো থামলো। স্তব্ধ হলো ভ্রু জোড়া। অবাক হয়ে তাকালো সামিউল শেখের দিকে, ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
—” কীহ?”
সালমা বেগম আর সামিউল শেখ একে অপরের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে একসাথে উপরনিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালেন। শ্রাবণ হতভম্ব হয়ে দুজনের দিকে তাকালো। এরপর বলল,
—” ও এটা নিজে বলেছে তোমাদের?”
—” তুই ডাইনিং এ আসার একটু আগেই বলল!”
সামিউল শেখের কথায় প্লেট থেকে হাত সরালো শ্রাবণ। একবার উপরের ঘরের দিকে তীর্যক দৃষ্টি ফেলে জিজ্ঞেস করল,
—” তবে কি ও ডিভোর্স চায়?”
সালমা বেগম ঠোঁট উল্টিয়ে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” নাহ, সেটা তো বলেনি।”
মেজাজ চরম লেভেলের খারাপ হলো শ্রাবণের। হাত ঝেড়ে চেয়ারে রাখা তোয়ালে তে হাত মুছে সিড়ির দিকে পা বাড়ালো। আজ একটা বিহিত করতেই হবে। গতরাতে নিজের সমস্ত আত্মসম্মান কে বিসর্জন দিয়ে শ্রাবণ শেখ নিজের মনের কথা বলেছে ধারা কে। ভালোবাসার কথাটা স্বীকার করেছে। অথচ মেয়েটা কিনা এভাবে পল্টি খেল? কেনো? তার ভালোবাসার কি কোনো দাম নেই? নাহ! এসব আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। চরম বিরক্তিতে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো শ্রাবণ।
ভাগ্য সহায় হলো। একই সময়ে ধারাও কেবল ঘর থেকে বের হলো নিচে যাওয়ার জন্য। ভেতরে পুষে থাকা রাগটা তড়তড় করে জেগে উঠলো শ্রাবণের। তড়িঘড়ি করে ধারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হুট করে তার এমন আগমনে চমকে গেলো মেয়েটা। তবে তার চমকপ্রদ মুখটা স্বাভাবিক না হতেও শ্রাবণ মোটামুটি ধমকে বলে উঠলো,
—” তোমার সমস্যা টা কী হ্যাঁ? কী চাইছো তুমি? খোলামেলা বলোতো আমাকে!”
ধারা বুঝলো না। তবে আঁচ করতে পারল নিচে বাধ্য হয়ে বলা কথাগুলো ফাঁস হয়ে গেছে। ভয় পেলো খানিকটা। তবে স্বীকার করল না। আসলে সামিউল শেখ এবং সালমা বেগম এমন ভাবে ধারাকে প্রশ্নগুলো করেছে যে, ধারা যদি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিত, তাহলে সেটা ভীষণ লজ্জার হয়ে যেত। এজন্য লজ্জা থেকে বাঁচতে সে মোটামুটি মিথ্যে কথাই বলেছে। তবে শেখ পরিবারের এই লোককে কথাটা ভালো করে বোঝাবে কে?
ধারার নীরবতা আরো বিরক্ত করল শ্রাবণকে। সে আরো খ্যাপাটে স্বরে বলল,
—” আমার সাথে থাকবেও না, আবার ডিভোর্সও দেবে না? চাইছো কী তুমি? তামাশা করছো?
শ্রাবণের তীক্ষ্ণ কথায় ঠোঁট কাঁমড়ে খানিক চোখ কুঁচকালো ধারা। কোথা থেকে যেন সাহস এলো তার। মুখ ভেঙচিয়ে মাথা নিচু করল, মিনমিন করে বলল,
—” একই কথা তো আমিও বলতে পারি। আপনি তামাশা করছেন?”
চোখ সরু করল শ্রাবণ। মিনমিন করে বলা কথাটা শুনে রাগ খানিকটা কমলেও গম্ভীর রইলো। দুহাত বুকে গুঁজে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—” আমি তামাশা করলে তুমিও করবে?”
ধারা বাচ্চাদের মত মাথা নেড়ে বলল,
—” হুম!”
আবারো ভ্রু উঁচালো শ্রাবণ,
—” আমি যা করব, তুমিও তাই করবে?”
ধারা দুহাত কচলাতে কচলাতে আবারো বাচ্চাদের মত মাথা নাড়ালো,
—” হুম অবশ্যই! ”
বাঁকা হাসলো শ্রাবণ। এই তো সুযোগ! কোনো কথাবার্তা ছাড়াই ফট করে ধারার গালে ছোট করে চুমু খেলো। সেকেন্ডের মধ্যে ঠোঁট সরিয়ে এনে গাল এগিয়ে দিল, নির্লিপ্ত স্বরে আবদার করল,
—” নাও, এবার তুমিও আমার গালে চুমু খাও!”
হা হয়ে তাকালো ধারা। চোখ দুটো বেরিয়ে আসার অতিক্রম হলো মেয়েটার। মুখটা দেখে মনে হলো কেও পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যকর জিনিস তাকে দেখিয়েছে। অজান্তেই এক হাত উঠে এলো গালের সেই স্থানে। মেয়েটাকে থমকে থাকার সময়টাও দিল না শ্রাবণ। ভীষন তাড়া দিয়ে বলল,
—” কী হলো? খাম্বার মত দাঁড়িয়ে আছো কেনো? তাড়াতাড়ি দাও!”
শ্রাবণের আচরণে আর কথায় ধারা একেবারেই হতবাক হয়ে গেল। যেন বজ্রাঘাতে অবশ হয়ে গেছে। গালে চুমুর উষ্ণতা এখনো লেগে আছে, সেই জায়গাটা হাত দিয়ে আড়াল করল সে। মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে, বুকের ভেতর যেন তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কোনোমতে জড়সড় গলায় ফিসফিস করে বলল,
—” আ…আপনি পাগল নাকি?”
শ্রাবণ চোখ কুঁচকে ধীর ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
—” হুম, তাই-ই। এখন পাগলামিই করব। যেটা করলাম, সেটা তুমিও করবে। নইলে বুঝব তোমার কথার কোনো দাম নেই!”
ধারা শ্বাস বন্ধ করে ফেলল। কী করবে, বুঝতে পারছিল না। একদিকে ভয়, নিচে কেউ ডাকতে পারে, যদি কেউ উপরে উঠে আসে! আরেকদিকে লজ্জা, এতটা কাছে থেকে লোকটা! ধারা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা যেন বাইরেও শোনা যাচ্ছে। হাতদুটো আঁচলের কোণে গুটিয়ে রেখেছে, চোখ একবারও তুলছে না। শ্রাবণের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন তাকে গিলে খাচ্ছে।
শ্রাবণ ভ্রু উঁচু করে আবারও তাড়া দিল,
—” কী হলো? আমাকে নকল করবে বলেছিলে, তাই না? এবার করো দেখি।”
ধারা চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠোঁট কাঁপছে, হাত কাঁপছে, শরীর যেন জমে গেছে। কোনোভাবে সাহস জোগাড় করে ফিসফিস করে বলল,
—” আমি…আমি পারব না।”
শ্রাবণ হালকা বাঁকা হাসল, গম্ভীর গলায় বলল,
—” পারতেই হবে। আমি চাই না তুমি আমার থেকে ভিন্ন কিছু করো। নাও নাও, ফাস্ট!”
ধারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর ঢাকের মতো ধপাধপ শব্দ হচ্ছে। কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে আরো অসহায় হয়ে পড়ল। কিন্তু শ্রাবণের চোখে এমন দৃঢ়তা, এমন দাবিদার স্বভাব, দেখেই যেন মনে হলো, পালাবার কোনো পথই খোলা নেই।
কোনোভাবে এক পা সামনে বাড়ালো ধারা। গাল থেকে হাত নামিয়ে শ্বাস আটকে কাছে এলো। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ আধবোঁজা। মনে হলো সত্যিই এবার কিছু একটা করবে। শ্রাবণও প্রস্তুত, ঠোঁটে বিজয়ের হাসি খেলে গেল। কিন্তু হঠাৎই ধারা চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে ফেলল। দুহাতে আঁচলটা শক্ত করে ধরে হুট করে একপাশ ঘুরে গেল। এক দৌড়ে সিড়ি বেয়ে নেমে গেল নিচে।
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২০
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ হতবাক হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটল। তার সাথে বেইমানি! এই মেয়ে কি নিজের পরিণাম টের পাচ্ছে? মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলল,
—” পালাতে চাইলেই কি লাভ হবে ধারা? যেখানেই যাও না কেনো, আমি তো সেখানে আছিই…!”
