Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৪

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৪

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৪
অনামিকা তাহসিন রোজা

মুখ ফুলিয়ে বসে আছে ধারা। মনে মনে চরম ভয়ানক এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। আগামী দুই ঘন্টা শ্রাবণের সাথে কথাই বলবে না। বলবে না মানে বলবেই না। এর অবশ্য একটা বড়সড় কারন রয়েছে। ধারা চেয়েছিল সে বিকালে গিয়ে সবার সাথে মেহেদী হাত সাজাবে। কিন্তু শ্রাবণ বিকালে না গিয়ে বের হয়ে সন্ধ্যায়। কারন শ্রাবণ আবার ধারার সাথে একান্ত সময় কাটাতে চেয়েছিল। বেচারা এখন নিজেই ভুগছে। একূলও গেলো, অকূলও গেলো। বউয়ের সাথে মিষ্টি সময় কাটানো তো হলোই না, উল্টো বোম হয়ে বসে আছে তার মিষ্টি বউটা। শ্রাবণের ভীষন আফসোস হলো। ট্রাফিক জ্যামে আটকেছে তারা। শ্রাবণ আড়চোখে তাকালো ধারার দিকে। আয়হায় রে! এ কি সর্বনাশ! মেয়েটা এখনো লুচির মত ফুলছে? শ্রাবণ কি ভয় পেলো। পেলো হয়তো খানিকটা। তাই গলা খাঁকারি দিয়ে ডেকে উঠলো মিষ্টি সুরে,

—” বউউ…!”
ফট করে ভ্রু কুঁচকে তাকালো ধারা। চোখ দেখে ভয় পেলো শ্রাবণ। কিন্তু রাগ ভাঙানোর উদ্দেশ্যে সাফাই গাইতে বলল,
—” আরেহ বাবা, ওরা তো তোমার জন্যে মেহেদী রেখেছে। তুমি গিয়ে হাত সাজিয়ে নিও। সারাটা রাতই তো আছে। ”
মুখ ভেঙচিয়ে জানালার বাইরে তাকালো ধারা। শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ট্রাফিক জ্যাম ছাড়তেই তড়িঘড়ি করে গাড়ি চালানো শুরু করলো। পৌঁছাতে বেশিক্ষণ লাগলো না। মুনিরাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতেই ধারা ধড়ফড় করে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। শ্রাবণ বুঝলো তার কপালে শনি আছে। আজ রাতে আর বউ জড়িয়ে ধরে ঘুমানো হবে বলে মনে হয় না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

হুট করেই কনিকার ভীষন রকম জ্বর এসেছে। গা এক পুড়ে যাচ্ছে তার। সাদিক দুপুরে এসে কনিকা কে ঘুমোতে দেখে ভেবেছিল মেয়েটা বিশ্রাম নিচ্ছে। পরবর্তীতে কি যেন ভেবে সে কপালে হাত রাখলো। তৎক্ষনাৎ চমকে উঠলো সে। আগুন জ্বলছে যেন কনিকার কপালে। সাদিক তড়িঘড়ি করে কনিকাকে জাগানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কনিকার কোনো হুঁশ নেই। একটুও চোখের পাতা নড়ল না। সাদিক বুঝলো জ্বরের মাত্রা অনেক বেশি। তাই সে দেরি করলো না। পাশে বসে জলপট্টি দেয়া শুরু করলো। এরমধ্যে বাজার থেকে সাধারন কিছু ঔষধও এনে রাখলো। সন্ধ্যার আযান পড়তেই নামায পড়তে বসে পড়লো। আজ আর মসজিদে গেলো না। কনিকা কে একা রেখে যেতে পারবে না সে। জরিনা খাতুন বাড়িতে নেই, কোথায় যেন গিয়েছেন।

সাদিক নামায পড়তে শুরু করলেই নিভু নিভু চোখ মেলে তাকায় কনিকা। চোখ খুলতেই নামাযরত সাদিককে দেখে অবাক হয়। মাথা টা ভীষন ভার লাগছে, চোখের পাতা খুলে রাখা দায়। কোনো কিছু ভালো লাগছে না। নিজের অবস্থা টা বুঝতে পারলো কনিকা। কেনো যেন কান্না পেলো। প্রচুর মাথা ব্যাথা করছে। এসব সহ্য করতে পারে না সে। ছোট থেকেই জ্বরে কাবু হলে ভীষন কষ্ট হয় তার। ঠোঁট চেপে কান্না আটকালো কনিকা। সাদিককে বাড়িতে নামায পড়তে দেখে মনে মনে ভেবেই নিলো লোকটা বুঝতে পেরেছে যে সে অসুস্থ। কনিকা আবারো চোখ বুঁজে ফেললো। নিজেকে পাগল পাগল লাগছে তার। নাক মুখ কুঁচকে চোখ বুঁজে রইলো সে। সাদিক নামায শেষ করে কনিকার পাশে বসে পড়লো। মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে সূরা পড়ে ফু দিলো মেয়েটার গলায় আর মুখে। আবারো সূরা পড়ে কপালে হাত বুলিয়ে দিলো। কনিকা কোনোমতে এবারে চোখজোড়া খুলে তাকালো সাদিকের দিকে। সাদিক মলিন হেসে জিজ্ঞেস করলো,

—” খুব বেশি খারাপ লাগতাছে?”
কনিকা দুদিকে মাথা নাড়ালো ক্লান্ত ভঙ্গিতে,
—” উহু। কিন্তু মাথা ব্যাথা করতাছে!”
সাদিক অস্থির হলো। দুহাতে কপালে বুলিয়ে দিতে থাকলো, আলতো করে টিপতেও শুরু করলো। ব্যাথা উপশম করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। কনিকা ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ বুঁজে ফেললো। ফট করে ওভাবেই ডেকে উঠলো,
—” শুনেন।”
সাদিক নরম স্বরে বলল,
—” কও । ”
কনিকা মনে হয় একদমই হুঁশে নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ফট করে বিড়বিড় করে বলল,

—” আমি আপনারে ভালোবাসি।”
কণিকা হুঁশে নেই। জ্বরের ঘোরে তো মানুষ অনেক কিছু বলে, অনেক কিছুই করে। সেই হিসেবেই হুঁশ হারিয়ে মনের কথা উগলে দিয়ে আবারো জ্ঞান হারালো কণিকা। কিন্তু চমকালো সাদিক। থমকে গিয়ে বিশাল বড় চোখ বড় করে তাকালো। হাত দুটো হিমশীতল হয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলো কণিকার কপালে। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলালো। সে কি ভুল কিছু শুনলো? নাকি সত্যিই শুনেছে তা নিশ্চিত হতে অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
—” ক—কী কইলা?”
কিন্তু এবারে আর কণিকা সাদিকের বুকে ঝড় তুললো না। জ্ঞান হারিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে রইলো। কিন্তু সাদিক তো অস্থির, অধৈর্য, পাগলাটে প্রেমিক। সে আবারো শোনার জন্য মরিয়া হলো। নড়েচড়ে বসে কণিকার গালে হাত রেখে ডাকতে থাকলো,

—” কণা! ও কণা! কও না কী কইলা মাত্র? আরেকবার কও শুনি একটু। কও না বউ।”
কিন্তু কণিকা বেয়াদবের মত চুপ রইলো। হুঁশটুঁশ হারিয়ে ফেলে ঘুমিয়েই পড়লো বোধহয়। ইশ! বড্ড অন্যায় হলো বেচারা সাদিকের সাথে। এত বড় অন্যায় টা করা মোটেও উচিত হয়নি। এভাবে ঝড় তুলে দিয়ে চলে যাওয়া উচিত হয়নি কণিকার। এমন অন্যায়ের শাস্তিও হয়না। শাস্তি থাকলে সাদিক মোটেই বসে থাকত না। এভাবেই চমকে থমকে গিয়ে তাকিয়ে থাকত না।

শ্রাবণের এবার মনে হলো যে তার এ বাড়িতে না আসাটাই উচিত ছিল। সে যদি জানতো যে এসে নিজের বউকে হারিয়ে একা রাত্রী যাপন করতে হবে। তাহলে সে আসতোই না। মুনিরা দের বাড়িতে পা রাখার পর সে জানতে পেরেছে, আজ নাকি মুনিরা, ইকরা, ধারাসহ আরো কয়েকজন মেয়ে, যারা মুনিরার কাজিন, সবাই একসাথে থাকবে। সারারাতই আড্ডা দেবে মেয়েরা। তাই শ্রাবণকে নাকি একা একা থাকতে হবে৷ এটা কোনো কথা? শ্রাবণ প্রথমে রাজি ছিল না। চোখ পাঁকিয়ে বারবার ধারাকে ইশারা দিয়ে বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু উৎফুল্লতার তোপে ধারা পাত্তা দেয়নি স্বামীর কথা। এই প্রথম অবাধ্য হলো ধারা। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে সবার নাটক দেখলো।
ছাদে মেহেদীর আয়োজন করা হয়েছিল। ধারার আসতে দেরি হচ্ছিল বলে মুনিরার হাতে ইতোমধ্যে মেহেদী দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইকরা বসেছিল, অপেক্ষা করছিল ধারার জন্য। কারণ ধারার হাত সাজানোর পরেই সে নিজে মেহেদী দেবে। এই কারণে ওরা আসার পর পরই ধারা ছাদে সবার সাথে যোগ দিয়েছে আর শ্রাবণ নিচে মুরুব্বিদের সাথে বসে রয়েছে। হাত সাজানোর কার্য চলমান। মেহেদী দেয়ার এক পর্যায়ে ইকরা থমকে যায়, শুকনো ঢোক গিলে ঠোঁট কাঁমড়ে হেসে ধারার দিকে তাকিয়ে বলে,

—” তোমার হাতে কি S লিখে দেব?”
ধারা অবাক হলো,
—” কেনো?”
মুনিরা ফিক করে হাসলো। তারপর নিজের হাত দেখিয়ে বলল,
—” দেখো, আমি এইযে হাতের তালুতে ওই বলদের নামের প্রথম অক্ষর লিখেছি। জিহানের J। এ জন্যই বলছিল তুমি চাইলে শ্রাবণ ভাইয়ের নামের প্রথম অক্ষরও লিখে নিতে পারো।”
ধারা অবাক হয়ে শুনলো। এরপর মুনিরার হাতে একবার তাকিয়ে নিজের হাতে তাকালো। জিজ্ঞেস করলো,
—” এতে কী হবে? কেনো এমন করতে হয়?”
ইকরা ফট করে বলল,

—” এমনিতেই। কিছুই হবেনা। তুমি চাইলে নাও করতে পারো। কিন্তু অনেকে ভালোবেসে করে আর কি।”
ধারা কিছুক্ষণ ভাবলো বোধহয়। এরপর ঠোঁট কাঁমড়ে মিনমিন করে বলল,
—”পুরো নাম লেখা যায় না?”
ইকরা মুগ্ধ হয়ে হতবাক হলেও মুনিরা ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল,
—” কেনো কেনো? ভালোবাসা কি অতিরিক্ত বেশি? ”
বলেই হেসে ফেললো মুনিরা। বাকিরাও তাল মিলিয়ে হাসলো। ধারাও তাদের সাথে একটুখানি হাসলো। একমাত্র হয়তো ইকরাই বুঝতে পারলো ধারার মন টা। তাই সে তাচ্ছিল্য করে হাসলো না। মুচকি হেসে ধারার হাত এগিয়ে নিয়ে বলল,
—” অবশ্যই লেখা যাবে। আরো বেশি সুন্দর হবে।”
বলেই সাজিয়ে দিতে থাকলো।

মুরুব্বি রা গল্পসল্প করে সকলেই বাজারে গিয়েছে খাবার কিনতে। আজ রাতের আয়োজনের জন্য আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন। তাই সবাই চলে গিয়েছে। শ্রাবণ ধপ করে হেলান দিলো সোফায়। মাথা এলিয়ে চোখ রাখলো উপরের ঝাড়বাতির দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হুট করেই পকেটে থাকা ফোনটা ঝংকার তুলে বেজে উঠলো। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে ফোন টা চোখের সামনে নিয়ে দেখলো জিহান কল করেছে। অবাক হলো শ্রাবণ। ভ্রু কুঁচকে রেখেই ফোনটা কানে নিয়ে নিতেই জিহানের অস্থির কন্ঠ ভেসে আসলো,
—’শ্রাবণ রে। বন্ধু আমার। বাঁচা ভাই আমারে। আমি তো ফাঁইসা গেছি।”
শ্রাবণ নাকমুখ কুঁচকে বলল,
—” মানেহ?”
জিহানের কাঁদো কাঁদো স্বর ভেসে আসলো,
—” বন্ধু রে! প্রেমের জালে আটকাতে এসেছিলাম, প্রাচীরের তারকাটায় আটকে গেছি। আআআ! পাঞ্জাবি ছোটাতে পারছি না। একটু বাঁচা আমাকে। হেল্প কর ভাই। ঝুলে আছি কোনোমতে।”
শ্রাবণ মুখ কুঁচকেই বিরক্ত হলো। জিহানের কথার আগামাথা বুঝলো না। তাই জোরগলায় বলল,
—” মানেহ! আরেহ! আমি কীভাবে কী করব? আমি তো তোর শ্বশুর বাড়িতে।”
জিহান এবারে ঠোঁট চেপে কিড়মিড় করে বললো

—” আমিও আমার শ্বশুড়বাড়িতেই রে শ্রাবণের বাচ্চা। শ্বশুড় বাড়ির দেয়াল টপকাতে গিয়ে তারকাটায় আটকে গেছি।”
এবারে চোখ বড় করে তাকালো শ্রাবণ। হতবাক হয়ে বলল,
—’ হোয়াট?”
জিহান কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

—” হ্যাঁ রে ভাই। তাড়াতাড়ি আয় না বাপ। বাড়ির পেছনের দিকে আছি।”
শ্রাবণ এবারে ফোন কেটে বিড়বিড় করে গালি দিলো জিহানকে। এরপর দৌঁড় দিলো বাড়ির পেছনের দিকে। ছুটে এসে দেখলো নীলরঙা পাঞ্জাবি পরিহিত জিহান মোটামুটি ঝুলন্ত ব্রিজের মত দেয়ালের সাথে দুলছে। তারকাটায় আটকে গিয়ে খুব বিশ্রী ভাবে ফেসে গেছে ছেলেটা। শ্রাবণ কোঁমড়ে হাত রেখে ইচ্ছেমতো খিস্তি দিলো জিহানকে। এরপর এগিয়ে এসে কোনোমতে ছাড়িয়ে নিলো তারকাটা থেকে। দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে নামলো জিহান। শ্রাবণকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
—” ধন্যবাদ বন্ধু! তুমি না থাকলে আজ আমাকে সারারাতই -‘দোল দোল দুলুনি, কালা মাথায় পেতনি’ এসব করেই কাটাতে হতো।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে জিহানকে উপরনিচ দেখে বলল,
—” তোর শ্বশুড়বাড়ির একটা ইয়া বড় সদর দরজা থাকতে তুই শালা পেছন থেকে চোরের মত এন্ট্রি নিয়েছিস কেনো? কোনো কুমতলব আছে তাই না?”
জিহান আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে শ্রাবণের কানের কাছে এসে বলল,

—” জ্বি জনাব ঠিকই ধরেছেন। ”
আবারো চোখ বড় করে তাকালো জিহানের দিকে। জিহান এবারে আরো সতর্কতার সাথে বলতে থাকলো,
—” ভাই শোন, হবু বউকে সারপ্রাইজ দিতে চাইছি। একটু পুতুপুতু করেই চলে যাব। তবে ওকে এখনো বলিনি যে আসব। এজন্য পেছন থেকে এসেছি যেন ডিরেক্ট বউয়ের ঘরে এন্ট্রি নিতে পারি। বুঝলে কিনা! তুমি আবার কাওকে বোলো না, কেমন?”
শ্রাবণ বাঁকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,

—” হুম হুম বুঝেছি। দাঁড়া তোর শ্বশুর কে খবরটা দিই।”
বলেই ফোন বের করতে থাকলো শ্রাবণ। জিহান আঁতকে উঠে শ্রাবণের ফোন চেপে ধরে বলল,
—” এমন করে না বন্ধু। জিগড়ি দোস্তের প্রেমেতে বাঁধা দিতে নেই, নইলে নিজের সংসারে আগুন লাগে। বুঝলে কিনা।”
গলা খাঁকারি দিয়ে কলার ঝাঁকালো শ্রাবণ। এ নিয়ে সে অবশ্য বেশ সতর্ক। মোটেই নিজের সংসারে আগুন লাগানোর মত কাজ সে করবে না। তাই জিহানের কথা রাখতে তাকেই সাহায্য করতে হলো জিহানকে পাইপ বেয়ে উপরের ঘরে পাঠাতে।

জিহানকে তার গন্তব্যে পাঠাতে সাহায্য করার পর বাড়িতে ঢুকলো শ্রাবণ। আর ঢোকার সাথে সাথেই কোথা থেকে যেন উড়ে এসে সামনে দাঁড়ালো ধারা। শ্রাবণ চমকে তাকালো খানিকটা। ধারাকে দেখে ধমক দিয়ে বলল,
—” এভাবে ফড়িং এর মত লাফালাফি করছো কেনো তুমি? আবারো হোঁচট খাওয়ার ইচ্ছে আছে? একটা অঘটন না ঘটালে কি শান্তি লাগে না?”
ধারা যতটা খুশিখুশি মনে এসে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক ততটাই মিইয়ে গেলো। তার মুখ অন্ধকার হতে দেখে শ্রাবণ এবারে সতর্ক হলো,
—”আ-আরেহ আমি তো— এমনিই বলছিলাম। বকিনি তো। মন খারাপ কোরো না।”
ধারা মাথা নিচু করে ফেলেছিল। পেছনে লুকিয়ে রাখা দুহাতই থমকে রেখে দিল। মন খারাপের রেশ ধরে মিনমিন করে বলল,

—” আচ্ছা আমি যাই।”
চমকালো শ্রাবণ। তড়িঘড়ি করে বলল,
—” আরেহ না। কোথায় যাচ্ছো? আগে বলো, কী বলতে চাইছিলে?”
ধারা ঠোঁট চেপে কোনমতে মলিন হেসে বলল
—” নাহ কিছু না.!”
অস্থির হলো শ্রাবণ। ধারার গালে হাত রেখে বলল,
—’ নাহ, অবশ্যই অনেক কিছু। বলো কী বলতে চাইছিলে? বলো না বউ। সরি তো। আমি বকিনি তোমায়। সত্যি! আমি তো শুধু বলছিলাম। তুমি হুটহাট পড়ে গেলে কি আমার ভালো লাগবে বলো? এইজন্য বলছিলাম। সত্যি। বকিনি। রাগ কোরো না।”
ধারা এবারে চোখ তুলে তাকালো। মাথা নেড়ে বলল,
—” আচ্ছা রাগ করবনা!”
এই এক সমস্যা ধারার। কখনোই রাগ টা করতে পারলো না। এই মানুষটার উপরে রাগ করে থাকাটাই মুশকিল ব্যাপার স্যপার। প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। কারন ধারাই পারে না। এবারেও তা-ই হলো। শ্রাবণ হেসে বলল,
—” বলো কী বলবে?”
ধারা লাজুক লালিমায় হাসলো। পেছনে রাখা হাত দুটো শ্রাবণের সামনে এনে তুলে ধরলো। মেহেদী তে সাজানো হাত দুটো দেখানোর ক্ষুদ্র প্রয়াস। মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,

—” কেমন হয়েছে?”
শ্রাবণ এবারে ধারার হাত দুটো টেনে নিজের কাছে এনে মনোযোগ দিয়ে দেখলো। অনেকখানি হেসে ধারাকে বলল,
—” অনেক সুন্দর হয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে তো। আগে কখনো দেখিনি তোমার হাতে।”
ধারা ফট করে বলল,
—” আমিও না।”
শ্রাবণ বোঝেনি কথাটা,
—” হুম?”
ধারা হেসে বলল,
—” আমিও কখনো আমার হাতে দেখিনি।”
শ্রাবণের হাসির পরিধি কমলো। সে এবারে আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে ধারার কপালে চুমু খেলো। একটুখানি আদর পেয়ে আগের থেকেও বেশি লজ্জায় মিইয়ে গেলো ধারা। শ্রাবণ ধারার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে বলল,

—” ভীষন সুন্দর লাগছে।”
ধারা হাত গুটিয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই শ্রাবণের চোখে স্পেশাল জিনিসটা পড়েই গেলো। সেখানে চোখ আটকাতেই শ্রাবণ ধারার বাম হাতটা তুলে নিয়ে হাতের তালু তে লেখা নিজের নামটা বিড়বিড় করে পড়লো,
—” শ্রাবণ শেখ..? ”
ধারা আরো গুটিয়ে এলো। ছিটকে নিজের হাত লুকিয়ে ফেললো। শ্রাবণ এবারে চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
—” তুমি হাতে আমার নাম লিখেছো?”
ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে দুদিকে সজোরে মাথা নেড়ে বলল,
—” না না। লেখিনি তো।”
বলেই এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো।
শ্রাবণ ফিক করে হেসে ফেলল। বলল,
—” তবে কার নাম?”
ধারা ফট করে বলল,
—” ওটা তো আমার নাম!”
শ্রাবণ চিন্তিত ভঙ্গিতে ভেবে বলল,

—” না তা ঠিক আছে। কিন্তু সামনের মিসেস শব্দটা বাদ পড়ে গেছে। ওটা থাকলে তোমার নামই হতো। লাইক, মিসেস শ্রাবণ শেখ।”
ধারা এবারে চোরের মত এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে পালানোর রাস্তা খুঁজলো। মেয়েটার অবস্থা দেখে হাসি আটকালো শ্রাবণ। ঠোঁট কাঁমড়ে এক পা এগোতে চাইলে ফড়িং এর মত আবারো ছুটে উপরের দিকে চলে গেলো ধারা। যেতে যেতেই চেঁচিয়ে বলল,
—” আমি মোটেই আপনার নাম লিখিনি। একটুও লিখিনি। আপনি ভুল দেখেছেন!”
শ্রাবণও গলা উঁচিয়ে জানালো,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৩

—” আমিও তো তা-ই বলছি। নিজের নামই লিখেছো, তবে ভুল হয়েছে একটু। এখন গিয়ে মিসেস শব্দটা সামনে লিখে নাও, তাহলে হয়ে যাবে।”
অথচ কথাখানা কি শুনলো ধারা। শুনেছে অবশ্যই। তবে ফড়িং এর মতই চলে গিয়েছে। পালিয়েছে শ্রাবণের থেকে। এসব লজ্জা কি নেয়া যায় নাকি? ধারা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো সে আজ শ্রাবণের সামনেই যাবে না। উহু, যাবেই না!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৫