Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২
অনামিকা তাহসিন রোজা

প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা শ্রাবণের অভ্যাস। তাই বরাবরের মত আজও ভোরের আলো ফুটতেই তার চোখ মেলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ ঘুমের রেশ কাটিয়ে উপুড় হয়ে শুলো সে, এরপর ধীর গতিতে চোখ জোড়া খুলতেই দেখতে পেল এক মনোহর দৃশ্য। জানালার ফাঁক গলে আসা ভোরের ক্ষীণ আলোতে ফুটন্ত এক কিশোরীর মুখশ্রী স্নিগ্ধতার সাথে আলো ছড়াচ্ছে। এক সেকেন্ডের জন্য কিছু বুঝলো না শ্রাবণ। খানিক সময় পরেই তার সবকিছু মনে পড়ল। আর মনে পড়তেই তৎক্ষনাৎ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শ্রাবণ। আবারো মনে মনে অসন্তুষ্ট হলো বাবা মায়ের উপর। কি দরকার ছিল এত ছোট একটা মেয়েকে তার সাথে বিয়ে দেয়ার! চোখ বুঁজে এসব চিন্তায় কাহিল হলে আবারো চোখ মেলে তাকালো শ্রাবণ। গভীর দৃষ্টি ফেলল সোফায় কোনোমতে ঘুমোতে থাকা ধারার দিকে। ধারার গালে পড়ে থাকা এক গোছা এলোমেলো চুল, নিঃশ্বাসের সাথে হালকা দোল খাচ্ছে। ঠোঁটজোড়া আধখোলা, নিঃশব্দ নিঃশ্বাস টা টের পাচ্ছে শ্রাবণ। সে আরো দেখলো মেয়েটার চোখ বন্ধ থাকার পরও সেই কাজলে ঘেরা পাপড়িগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে গতরাতের থমথমে নীরবতা।

শ্রাবণ গতরাতে তাদের মধ্যে হওয়া কথোপকথন মনে করল, আর বুঝলো, মেয়েটা অনেক সহজ-সরল। নইলে এক কথাতে সোফাতে শুতে রাজি হবে কেনো? আর শ্রাবণের অদ্ভুত আচরণে অবাক হবেই বা না কেনো? ধারার তো পৃথিবীকে চেনার, জীবনের মানে বোঝার বয়স হয়নি। অথচ এখন সে তার স্ত্রী! কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতর কিছু একটা ছটফট করে উঠল শ্রাবণের। এই যে বিয়ে, এই যে রাত, সবকিছুই যেন ধারার ওপর এক নির্মম বোঝা হয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও, মেয়েটির মুখের প্রশান্তি দেখে শ্রাবণ একটু হালকা বোধ করল। মনে হলো, হয়তো মেয়েটা একটু স্বস্তিতে ঘুমাচ্ছে, অন্তত এখন। হয়তো এই মুহূর্তটা তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ ঘুম। আর সেটা যদি হয়, তবে সে কিছুটা সান্ত্বনা পেতে পারে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ধারা বেশ জড়োসড়ো হয়ে সোফার দিকে ঘেঁষে ঘুমোচ্ছে, হয়তো আগে কখনো এমন ভাবে এমন জায়গায় ঘুমোয়নি। এক মুহুর্তের জন্য মায়া হলো শ্রাবণের। এভাবে মেয়েটাকে সোফায় ঘুমোতে বলা কি অনুচিত ছিল? তারই বা কী করার! মেয়েটাকে বউ হিসেবে মানতে ইচ্ছে করছে না যে। শ্রাবণ নিঃশব্দে উঠে বসল, খুব ধীরে যেন একটা পাতা নাড়ানোর শব্দও না হয়। তারপর চুপচাপ জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। চোখে তখন এক নতুন ভাবনার ছায়া,
—” এই কিশোরী এখন আমার দায়িত্ব..আমি চাইলেও এখন আর নির্বিকার থাকতে পারি না। এখন আমার উচিত হবে তাকে আগলে রাখা, তাকে বড় হতে দেওয়া, সময়ের মতো ধীরে ধীরে। কিন্তু..!”

নরম ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ এই কিন্তুতেই আটকে গেলো। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের আলোর রেখাটিকে চোখে মেখে নিতে চাইল, ভেতরের ধাঁধাটে ভাবনাগুলোকে স্পষ্ট করান চেষ্টা করল। কিন্তু যতই ভাবছিল, মনের ভেতর ততই গুটিয়ে আসছিল এক অসম্পূর্ণ বাস্তবতা। এই মেয়েটা তার স্ত্রী? তার ঘরে, তার জীবনে? সে তাকে কোথায় দাঁড় করাবো? এই প্রশ্নগুলো ঘূর্ণির মতো তার মাথায় পাক খাচ্ছিল শ্রাবণের। বন্ধুদের মুখ ভেসে উঠল চোখে, তাদের হাসি, ব্যঙ্গ, অবিশ্বাস! তারা নিশ্চয়ই বলবে, তুই কি না এক কিশোরী বিয়ে করে এনেছিস? কোনো মেয়ে ছিল না যে একেবারে স্কুলপড়ুয়া মেয়েটাকেই নিয়ে এলি? শ্রাবণের কপাল কুঁচকে উঠলো। গলা শুকিয়ে গেল। মনে হলো, শরীরের রক্ত যেন গলায় এসে জমাট বেঁধে আছে।

ঘুমন্ত ধারার মুখের দিকে আর একবার তাকাল শ্রাবণ, নিষ্পাপ মুখটা দেখে মায়া আর বিরক্তির মাঝে দুলতে লাগল তার অনুভব। আমি কীভাবে এই মেয়েটাকে পাশে নিয়ে সমাজে দাঁড়াবো? আমার পরিচিত পরিসরে? এটা তো এক অদ্ভুত দৃশ্য হবে! কেবল হাসির খোরাক নয়, একধরনের অসম্মান! নিজেকে অদ্ভুত এক বেদনার মাঝে টেনে আনতে লাগল শ্রাবণ। মনের কোণে রাগ জমছিল, বাবার উপর, এই অবুঝ পরিস্থিতির উপর, এমনকি নিজের উপরও। তার মুখ শক্ত হয়ে এলো, চোয়াল আঁটসাঁট। একরকম আক্রোশে নিজের নিঃশ্বাস টেনে নিল সে।

— ” না, এটা ঠিক না। আমি এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে ফেলিনি, এটা আমার বেছে নেওয়া জীবন নয়।”
চোখ সরিয়ে নিয়ে এবার পেছনে তাকাল শ্রাবণ, সোফায় ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে নয়, বরং তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এক অসমতাল সম্পর্কের দিকে।
তারপর মনে মনে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলো শ্রাবণ। সিদ্ধান্ত নিল, সে এই মেয়েটার সাথে এক ঘরে স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকবে না। না পারবে ভালোবাসতে, না পারবে অধিকার ফলাতে! আলতো করে চোখ বুজে, নীচু স্বরে বিড়বিড় করল শ্রাবণ,
—” মানুষ হিসেবে মায়া দেখানো যাবে, কিন্তু বউ হিসেবে কোনো অনুভূতি আসবে না এই মেয়ের উপর!”

শ্রাবণের বাবা সামিউল শেখ প্রাইমারী স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক। তিনি নিজের সততা, বিচক্ষণতা, মহানুভবতার কারনে পুরো এলাকায় বেশ সমাদৃত। খুব বেশি বড়লোক না হলেও পুরো পরিবার নিয়ে দু’বেলা মাছ ভাত খাওয়ার মত উপার্জন আছে তার। একমাত্র ছেলে শ্রাবণ ও স্ত্রী সালমা বেগমের সাথে তিনি বেশ ভালোই আরামে আয়েশে দিন কাটান। সারাদিন স্কুলে থেকে বিকালে বাড়ি ফেরেন। এরকমই এক বিকেলে তিনি বাড়ি ফিরে জানতে পারেন, গ্রামে তার মামাতো বোন শিলা ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ছোট থেকে খেলাধুলা করে একসাথে বড় হয়েছিল তারা। তাই ছোটবেলার সেই খেলার সাথী, সম্পর্কে মামাতো বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন মোহনপুর গ্রামে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি আরো এক করুণ দৃশ্য দেখলেন। শিলার ভাতিজি ছিল ধারা। মানে শিলা ছিল ধারার ছোট চাচি। আর গ্রামে গিয়েই সামিউল সাহেব ধারাকে দেখে জানতে পারেন মেয়েটাকে তার এই বড় চাচা-চাচি মারাত্মক ভাবে অত্যাচার করে।

ফুলের মত স্নিগ্ধ এই মেয়েটাকে দেখে তিনি আবেগে আপ্লূত হন। নিজের কোনো মেয়ে নেই সামিউল সাহেবের। অথচ মনে মনে পুষে রাখা কন্যার বাবা হওয়ার লোভটা আবারো জেগে উঠলো ধারাকে দেখে। তিনি ধারার চাচা-চাচি কে প্রস্তাব দেন যে তিনি ধারার সমস্ত ভরনপোষণের দায়িত্ব নিতে চান। অথচ ধারাকে দিয়ে বাড়ির কাজ করানো তার চাচি নাকোচ করেন। শেষে বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে ধারাকে নিয়ে এসেছিলেন সামিউল সাহেব। ধারাও ছোট থেকে অন্যের উপর নির্ভর হয়ে চলে বলে কোনো আপত্তি করেনি। নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে ভাগ্যের সমুদ্রে। আর শহরে আসার পর শ্রাবণের দেশে আসার খবর শুনেই সামিউল সাহেবের মাথায় দারুণ বুদ্ধি জেগে উঠে। ধারাকে এমনিতেই মেয়ে হিসেবে ভীষণ পছন্দ হয়েছিল তার, তাই ছেলেন বউ বানাতে একবিন্দুও ভাবলেন না। ছেলে দেশে আসার সাথে সাথে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে পড়িয়ে দিলেন।
সবকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সামিউল সাহেব। তিনি আসলেই জানেন না যে তিনি ঠিক করেছেন কিনা। কিন্তু যা করেছেন ভালোর জন্যই। চোখে আঙুল বুলিয়ে আবার চশমাটা পরে নিলেন তিনি। তার সামনে থাকা জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। ফজরের নামায পড়া শেষ! তারপর মনটা যেন একটু শান্ত হলো। কিছুটা ধীরতায় নিজেকে বোঝাতে লাগলেন,

—” ভুল হোক বা শুদ্ধ, আমি অন্তত ওকে নরক থেকে উদ্ধার করেছি। ছেলেটা যদি বুঝে, সময়ের সাথে যদি ধারা নিজের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, তবে এটা হয়তো ঠিক সিদ্ধান্তই হয়ে উঠবে।”
সামিউল সাহেব জানেন, তিনি সমাজের একজন শিক্ষক, শত শিশুর হাতে বই তুলে দিয়েছেন। কিন্তু এই এক মেয়েকে জীবনের সুযোগটা তুলে দিতে চেয়েছেন।
তিনি হঠাৎ খুব দৃঢ় কণ্ঠে নিজেকে বললেন,
—”ভবিষ্যৎ তো কেউ জানে না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ যদি নিয়ত ভালো দেখেন, তাহলে ফল কখনো মন্দ হয় না। আজকের অস্বস্তিই হয়তো কালকের আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।”
বুকের গভীরে জমে থাকা সংশয়ের মেঘ একটু সরলো যেন। চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন সামিউল সাহেব।

— “দেখা যাক… সময়ই বলবে আমি একজন দায়িত্ববান বাবা ছিলাম, নাকি নিছক এক আবেগপ্রবণ মানুষ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ধারার ভাগ্যে এখনো অনেক ভালো কিছু লেখা আছে। শুধু একটু সময় লাগবে!”
সালমা বেগম হাতে চায়ের পাত্রটা নামিয়ে বারান্দার দিকে এলেন। চোখেমুখে কিছুটা ক্লান্তি, কিছুটা চিন্তার রেখা। ফজরের নামাজ পড়ে উঠেই দেখেছেন, স্বামী জায়নামাজে বসে অনেকক্ষণ গম্ভীর হয়ে ছিলেন। ভেবেছিলেন, নামাজ শেষে উঠে যাবেন, কিন্তু তিনি তখনো বসে, চোখে একটা স্থিরতা, যেন ভেতরে কোথাও এক দ্বন্দ্ব চলছে। সামিউল সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবনার সাগরে ডুবে ছিলেন ঠিক তখনই সালমা বেগম হালকা গলায় বললেন,
— “ঘুম হলো না বুঝি?”
সামিউল সাহেব ধীরে মুখ ফেরালেন স্ত্রীর দিকে, হালকা হাসি ফুটে উঠলো মুখে।

— ” ঘুম তো হয়, কিন্তু মন কি সবসময় ঘুমায়, বলো?”
সালমা পাশে এসে বসলেন, গলার স্বর একটু থমথমে হয়ে উঠল তার, তিনি বেশ চিন্তিত মুখে বলেন,
— ” তুমি ভালো করেই জানো, আমি কিছু বলিনি, কখনো তোমার সিদ্ধান্তে বাঁধা দিই না আমি। কিন্তু সত্যি করে বলো তো, এই বিয়ে.. এটা কি আমাদের ছেলের জন্য ঠিক হলো? ও কি আদৌও মেনে নেবে?”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি আবার বললেন,

— ” শ্রাবণ এখনো কিছু বলে না মানে এই না যে সে মেনে নিয়েছে। আর মেয়েটা… সে তো ছোট্ট এক কিশোরী! একজন মায়ের চোখে আমি বুঝতে পারি, ও এখনো বোঝেই না সে কী হয়ে গেছে, কোথায় এসে পড়েছে!”
সামিউল সাহেব স্ত্রীর কথাগুলো শুনে চুপ করে গেলেন কিছুক্ষণ। তারপর নিচু স্বরে বললেন,
— ” জানি, তোমার ভয়টা অমূলক নয়। আমিও ভাবিনি যে সব এত জটিল হয়ে যাবে। কিন্তু একটা কথা বলো তো, যদি আমি ওকে না আনতাম? ওই বাড়িতে মার খেয়ে, কাজ করে, অবহেলায় মরেও যেত মেয়েটা। আমি ওকে শুধু আশ্রয় দিইনি সালমা, একটা সম্ভাবনা দিয়েছি, নতুন জীবনের সম্ভাবনা। যদি শ্রাবণ একটু বুঝে, যদি সময়টা ওদের দুজনকে গড়ে তোলে, তাহলে এটাকে ভুল বলা যাবে না। ওদের বয়সের পার্থক্য টাও খুব বেশি না। তোমার – আমার মতোই।”
সালমা বেগম নীরবে শুনলেন। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু ঝরল না ঠিকই, কিন্তু ভেতরের ভীতি ও মাতৃত্ব যেন প্রতিটি কথার মাঝে মুখ ফুটে উঠছিল। তিনি ফিসফিস করে বললেন,

— ” তা ঠিক বলেছো। বয়সে সমস্যা নেই। কিন্তু আমি শুধু আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি… ওর ভালোটা চাই। ও যদি কখনো আমাদের দোষ দেয়…”
সামিউল সাহেব স্ত্রীর হাত ধরে বললেন,
— ” সে যদি কিছু বোঝে, একদিন ঠিক বুঝবে, আমরা ওর ক্ষতি চাইনি। আমি নিজের আত্মজ সন্তানের জন্য যেমন ভাবি, ঠিক তেমনি ধারার জন্যও আমার মন কাঁদে। মেয়েটা আমাদের ঘরের ছায়ায় থাক, বড় হোক, মানুষ হোক,এটাই চেয়েছি আমি। বাকি পথ… আল্লাহ ঠিক করবেন।”
সালমা একটু হালকা হাসলেন, যদিও চিন্তার রেখাগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি। স্বামীর কথায় একটা দৃঢ়তা ছিল, সেই দৃঢ়তায় আবার একটু ভরসা খুঁজলেন তিনি।
— ” আচ্ছা, তোমার বিশ্বাস থাকলে আমিও রাখি। কিন্তু আল্লাহ যেন দুজনকেই বুঝ দেয়, একসাথে চলার শক্তি দেয়।”
সামিউল সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
— “অবশ্যই… সময়ই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।”

ভোরের অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে পুরোপুরি সূর্যের দেখা মিলতেই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো ধারা। সারারাত এক ফোঁটা না ঘুমিয়ে ক্লান্তিতে রাতের শেষে তার চোখ লেগে এসেছিল, তাই বোধহয় এত দেরিতে ঘুম ভাঙলো তার। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই তার চোখ ছানাবড়া, কিছু্টা চমকে বুকে থুথু দিলো ধারা। আয়হায়! এ কোথায় সে? কার ঘর এটা? চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতেই তার হৃৎস্পন্দন একটু থেমে যেন আবার নতুন করে শুরু হলো। ক’সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থাকার পর, হঠাৎই রাতের দৃশ্যপট চোখের সামনে খেলা করতে লাগল। মনে পড়ে গেল — কার ঘর, কেন এখানে, কীভাবে সব কিছু। সবকিছু মনে পড়তেই নিজেকে সামলে সোফায় সোজা হয়ে বসলো ধারা। তার এখন ঠিক কী করা উচিত ভেবে পেলো না। নিজেকে গুছিয়ে সোফার এক কোণে চুপচাপ বসে গেল ধারা। কিন্তু এখন? তার করণীয় কী? এই নীরব সকালে। ভেতরে চলছিল একরাশ চিন্তার ঘূর্ণিপাক।

ধারা যখন আকাশ পাতাল নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন, ঠিক তখনই খট করে বাথরুমের দরজা খোলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। ধারা সতর্কতার দৃষ্টিতে তাকাতেই চোখে পড়ল সদ্য গোসল সেড়ে বেরিয়ে আসা এক পুরুষ অবয়ব। প্রথমেই বিছানায় রাখা ফোনটা হাতে নিল সে, তারপর নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে হেঁটে বেড়াতে লাগল। এক হাতে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে শুরু করল শ্রাবণ আর অন্য হাতে মোবাইল ধরে কী যেন দেখছিল। সাদা ট্রাউজার পরা সেই শরীরের উপরে কোনো পোশাক নেই, ভেজা গা থেকে গড়িয়ে পড়ছিল পানির কণা, অদ্ভুত এক ঘোর লাগা দৃশ্য! শরীরজুড়ে জলকণার চিকচিক ছটা। সূর্যের কিরণে ভেজা চুল ও বুক যেন ঝিলমিল করছে। ধারার চোখ আটকে গেল সেই দৃশ্যপটে। ভেতরে কোথাও যেন কিছু কেঁপে উঠলো, এভাবে কোনো পুরুষকে প্রথমবার দেখছে সে। শ্রাবণের ভেজা বুকের দিকে কেনো যেন খুব লজ্জা লাগলো তার। বুকের ভেতর লজ্জা আর অস্বস্তির গুমোট জমে উঠলো। নিঃশ্বাস আটকে গেল। আবিষ্কার করল লোকটা অনেক সুন্দর, মারাত্মক ফর্সা! ঠিক তখনই শ্রাবণ চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। এক সেকেন্ডের জন্য চোখে চোখ পড়ে গেল। ধারা যেন হঠাৎ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
অথচ বিরাট স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শ্রাবণ জিজ্ঞেস করল,

—” কোনো সমস্যা?”
ধারা যেন নিজের নিঃশ্বাস খুঁজে ফিরছে। এই মুহূর্তটা স্বপ্ন না বাস্তব, বোঝার মতোও সময় পেলো না। তবুও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলল,
— ” জ্বি হ্যাঁ… না মানে, জ্বি না!”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সে এক ঝলকে পুরো ধারাকে পর্যবেক্ষণ করল। আরো বেশি বিরক্ত হলো খানিক! শাড়িটা এলোমেলোভাবে পেঁচিয়ে বসে আছে, তাতে সে যেন আরও ছোট, আরও বেখাপ্পা লাগছে। শাড়ি যদি পড়তেই না পারে, তাহলে পড়ে কী দরকার? মনে মনে বিরক্ত হলো শ্রাবণ। এইযে বাচ্চাদের মত শাড়ি পেঁচিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে, এসবের মানে হয়? আরেকটা বিষয় ওর চোখে পড়ল, অতিরিক্ত সাজগোজ করেছে পিচ্চিটা। মুখে ফাউন্ডেশনের পুরু আস্তরণ, ঠোঁটে টুকটুকে লিপস্টিক। এমন করে সাজার দরকারটা কী ছিল? আর কাল রাতে ফ্রেশ হয়নি কেনো মেয়েটা?
ভেতরে ক্রমশ জমে উঠা চরম বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা নিয়েই মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে শ্রাবণ হঠাৎ বলে উঠল,

— ” তোমার কি কোনো সালোয়ার-কামিজ বা গাউন এমন কিছু নেই?”
ধারা এক মুহুর্তের জন্য বুঝলো না। হুট করে এমন প্রশ্ন আশা করেনি যে। এরপর একটু সময় নিয়ে বলল,
—” সালোয়ার কামিজ আছে.. কিন্তু ওগুলো তো পুরোনো!”
দ্বিতীয় বাক্যটাকে গুরুত্ব দিলো না শ্রাবণ, সাথে সাথে খ্যাক করে বলে উঠলো,
—” এই মুহুর্তে বাথরুমে যাও। গোসল করে সালোয়ার কামিজ পড়বে তুমি, আর খবরদার কোনো সাজগোজ করবেনা। কথা বুঝতে পেরেছো?’
ধারা বাধ্যের ন্যায় উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল বুঝেছে। শ্রাবণ এবার টি শার্ট পড়ে নিল। ধারা এক পলক সেদিকে তাকিয়ে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১

—” আমি কি চুড়ি, নুপুরও খুলে ফেলব?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে ধারার হাত ও পায়ের দিকে তাকালো। সরু চোখে তাকিয়ে গভীর বিরক্তিতে আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—” হ্যাঁ অবশ্যই। চুড়ি আর নুপুরের শব্দ অসহ্য লাগছে!”
ধারা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো শ্রাবণের দিকে। তাকে তো বলা হয়েছিল স্বামী রা সাজগোছ পছন্দ করে। এই লোক বুঝি পছন্দ করেনা? কিছু একটা ভেবে হঠাৎই উঠে দাঁড়ালো ধারা। শরীরে এখনো অবশ, মাথায় যেনো হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে,তবুও সে স্থির চোখে তাকালো বাথরুমের দিকে। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো সে। শ্রাবণের গা থেকে আসা বেলী ফুলের গন্ধ, ঘরের ভেজা বাতাস, আর আয়নার সামনে ঝুলতে থাকা তার কয়েকটা টি-শার্ট, সবকিছু মিলিয়ে বাতাসটা ভারী লাগছে তার কাছে। একটু অসস্তি হচ্ছে!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩