Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩১

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩১

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩১
অনামিকা তাহসিন রোজা

রেস্টুরেন্টটা আসলেই বেশ বড়সড়। সামিউল শেখ কফিতে চুমুক দিয়ে অবাক হয়েই তাকালেন। এরপর জিহানের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালে জিহান মেকি হাসে। এদিকে অস্বস্তিতে ঘেমে যাওয়া সালমা বেগম শুকনো ঢোক গিলে নীলের দিকে ফিরে তাকালেন।
—” হ্যাঁ রে নীল? তুই কি সত্যি সত্যিই…
নীল বেশ ভাব নিয়ে বলল,
—” তো তুমি কী ভেবেছো আমি মজা করছি? উপকারটা করে দাও খালামনি। সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব! ”
সামিউল শেখ এবারে মুখ খুললেন,
—” নীল?”
তটস্থ হলো নীল,
—” জ্বি খালু।”
—” ঘটনা তাহলে সত্য?”
—” জ্বি।”
—” আমি তো ভেবেছিলাম মস্করা করছো! হয়তো চাকরি পেয়ে ট্রিট দিতে এনেছো।”
নীল এবারে দুদিকে সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

—” না না খালু। সত্যিই। একটু পরেই এশার ভাই আর মামা চলে আসবে। আমার শুধু তোমাদের কাছে একটাই অনুরোধ, বিয়েটা ঠিক করে দাও। এশার সাথে আমার তিন বছরের সম্পর্ক। বিয়ে করলে ওকেই করব। ওর বাবা-মা মোটামুটি রাজি আছে। আমাকে বেশ পছন্দ করে। কিন্তু তার মামা এই শহরেই থাকে তো, আবার ওর বড় ভাইটা একটা খাডাশ, ব্যাংকে চাকরি করে। খুঁতখুঁতে মনোভাব। সে আমাকে পছন্দ করে না। আজই শেষ সুযোগ। তারা আমার সাথে দেখা করতে আসছে। এবারে রাজি হলেই বিয়ে পাক্কা, নইলে সারাজীবন আইবুড়ো থাকতে হবে আমায়।”
সালমা বেগম চোখ পিটপিট করে তাকালেন,
—” তাই বলে তুই আমাদের সাতসকালে উঠিয়ে এভাবে তুলে আনবি? তাও আবার এত বড় রেস্টুরেন্ট৷ শ্রাবণকেও তাহলে আনতে হতো। কথাবার্তা বলতে পারতো পাত্রীর ভাইয়ের সাথে।”
জিহান বিড়বিড় করল,

—” তেমন হলে তো এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারতাম না।”
নীল এবারে একটু হতাশ হলো। বলল
—” খালামনি, ভাইজান আর ভাবির সম্পর্ক এখনো ঠিক হয়নি। তাদের বিয়েটাও তোমরা ঘটা করে দাওনি। তাই উনারা কেও জানে না। এই অবস্থায় ভাইজান আর ভাবিকে আনলে ওনারা কিছু যদি মনে করতো। আমি আসলে ভেবে পাইনি কি করব।”
সামিউল শেখ মাথা নাড়ালেন,
—” এটা ভালো বলেছো। তবে আমি খুব শীঘ্রই গেট টুগেদারের আয়োজন করব। আগে থেকেই পরিকল্পনা করা আছে।”
সালমা বেগম এবারে সামিউল শেখকে বললেন,
—” হ্যাঁ গো! আমরা কী কথা বলব বলোতো। কিছু জানিনা, বুঝিনা, হুট করে পাত্রীর মামা ভাইয়ের সাথে কী আলাপ করব? আমার তো ভয় লাগছে। হ্যাঁ রে নীল? তোর মাকে বলেছিস? জানে?”
নীল মেকি হেসে বলল,

—” হ্যাঁ সবাই জানে ওদিকে। তোমাদেরকেই সব করতে বলেছে। আমি তো তোমাদের আরেক ছেলেই!”
সামিউল শেখ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। কফির কাপটা হাতে নিয়ে সামনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে মাথার ভেতর অন্য হিসাব চলছে। লোকটার চেহারায় এমন ভাব যেন দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভাবছেন, অথচ ভেতরে ভেতরে হিসাব হচ্ছে, ছেলেটা সত্যিই প্রেম করে নাকি নাটক করছে? শেষে তিনি ধীরে ধীরে কাপ নামালেন।
—” সত্যিই তিন বছর?”
নীল বাধ্য ছাত্রের মত সোজা হয়ে বসল,
—” জ্বি খালু।”
—” তিন বছর ধরে প্রেম করছো আর আমাদের বলার প্রয়োজন মনে করো নি? তোমার বাবা-মাকেও তো বলোনি আগে।”
নীল গলা নামিয়ে বলল,
—” আসলে প্রথমে সিরিয়াস ছিলাম না। পরে সিরিয়াস হলাম। এরপর ভয় পেলাম। এরপর সাহস পেলাম না। এরপর ভাবলাম পরে বলব। এরপর..
জিহান শুকনো গলায় বলল,

—” এরপর এখন পাত্রীর লোকজন আসছে দেখে প্রাণ বাঁচাতে আমাদের অপহরণ করে নিয়ে এসেছে।”
সালমা বেগম মুখ চেপে হাসলেন। কথা মিথ্যে নয়। তবে নীলের বাবা মা নিতান্তই সহজ সরল মানুষ। তাই অনেক ক্ষেত্রে তারা শেখ পরিবারকেই ভরসা করে। নীল কষ্ট পাওয়া কন্ঠে বলল,
—” তোমরা বন্ধু না শত্রু বুঝি না।”
সামিউল শেখ হেলান দিলেন চেয়ারে,
—” মেয়েটা কেমন?”
নীলের মুখ একদম জ্বলে উঠল। খুব লাজুক কন্ঠে বলল,
—” খুব ভালো। খুবই ভালো। বেশি কথা বলে না। রাগ কম। আমার সব পাগলামি সহ্য করে। আমার চাকরি না হওয়া পর্যন্তও ওয়েট করেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার উপর বিশ্বাস করে। উমম. খানিকটা আপনাদের বউমার মত। তবে তার মত আবার এত ইন্ট্রোভার্ট না।”
শেষ লাইনটা বলার সময় ছেলেটার মুখটা একটু নরম হয়ে গেল। সামিউল শেখ সেটা খেয়াল করলেন। ভ্রু তুলে বললেন,

—” হুম। বুঝেছি। ভালোই তো। তাহলে সমস্যা কোথায়?”
নীল নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—” ওইযে বললাম, সমস্যা হলো ওর ভাই। উনি মনে করেন আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন, বাচ্চা, ফাজিল এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর।”
জিহান গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল,
—” উনি মিথ্যা বলেননি।”
—” জিহান ভাই?”
সালমা বেগম এবার হেসে ফেললেন,
—” আচ্ছা আচ্ছা। ভয় পাস না। আমরা আছি। দেখি কি করা যায়।”
নীল এমনভাবে তাকাল যেন কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে তার পাশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছে
—” সত্যি খালামনি?”
সালমা বেগম মাথা নাড়লেন,
—” হ্যাঁ। তবে আগে মানুষগুলোর সাথে দেখা হোক। পছন্দ হলে বাকিটা দেখা যাবে।”
সামিউল শেখ আবার কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,

—” আরেকটা কথা।”
সবাই তাকাল তাঁর দিকে। ভদ্রলোক খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
—” বিয়ে হলে বাইরে কোথাও না। গ্রামেও না। শেখ বাড়ি থেকেই হবে।”
নীল প্রথমে বুঝতেই পারল না। তারপর চেয়ার থেকে প্রায় উঠে গেল।
—” কী? মানে…মানে খালু… এখানে? তোমাদের বাড়িতে? এ কী করে হয়?”
সামিউল শেখ বিরক্ত হয়ে বললেন,
—” এত অবাক হচ্ছো কেন? তুমি তো নিজেই বললে তুমি আমাদের আরেক ছেলে। তাহলে ছেলের বিয়ে বাইরে করাব কেন?”
নীলের মুখ হাঁ হয়ে গেল। জিহান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাতে লাগল। সামিউল শেখ এবার গম্ভীর গলায় যোগ করলেন,
—” তবে একটা শর্ত আছে।”
নীল তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসল। সামিউল শেখ দুঃখ প্রকাশ করে বললেন,

—” শ্রাবণের মত সাতদিন গায়েব হয়ে প্রেমের উপলব্ধি করতে পারবে না। বিয়ের আগে যা করার সামনে সামনে করবে। পরে এসে কেউ যদি বলে ‘খালু আমি বুঝতে পারিনি। এখন আমি ওকে ভালোবাসি না’ তাহলে বাড়িতে ঢুকতে দেব না।”
সালমা বেগম এবার সত্যি সত্যি হেসে ফেললেন। জিহান টেবিলে চাপড় মেরে বলল,
—” শিক্ষা নিয়েছে আঙ্কেল। এমন হবে না আর।”
নীল বুক চেপে আবেগী গলায় বলল,
—”আমি কাঁদব কিন্তু।”
সামিউল শেখ চোখ সরু করে তাকালেন,
—” আগে মেয়ের মামা- ভাইয়ের সামনে গিয়ে মানুষ হও। তারপর কাঁদো।”
ঠিক তখনই রেস্টুরেন্টের কাঁচের দরজা খুলে কয়েকজন ভেতরে ঢুকল। নীল সোজা হয়ে বসল। ফিসফিস করে জানাল,
—” ওরা এসেছে খালু।”

বেশ অনেকটা সময় চেষ্টা করেছে শ্রাবণ। সবকিছু বাদ দিয়ে ধারার পিছু পিছুও করেছে। কিন্তু কিছু করতে পারেনি। মনে মনে যা পরিকল্পনা করেছিল, তা করার জন্যও আগাতে পারছে না। শেষে ক্লান্ত হয়ে শ্রাবণ সোফায় বসে পড়ল। এরপর চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিল। বেশি অনেকটা সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থেকে শ্রাবণ ফট করে চোখ জোড়া খুলল। এইতো আইডিয়া পেয়েছে! ধারা কোনো কাজ না পেয়ে অস্বস্তি লুকোতে সামিউল শেখের ঘর থেকে একটা পুরোনো বই এনে সেটা নেড়েচেড়ে দেখছিল। হুট করে শ্রাবণ তড়িঘড়ি করে ধারার কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
—” ধারা, দ্রুত তৈরী হয়ে নাও। তাড়াতাড়ি করো। আমাদের যেতে হবে।”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকাল। শ্রাবণের এমন অস্থির প্রতিক্রিয়া দেখে ভয়ও পেল।
—” কী? কী হয়েছে?”
—” তুমি জানো না মা-বাবা কোথায়?”
ধারা আঁতকে উঠে দুদিকে মাথা নাড়াল,
—” না তো। কোথায় উনারা? আমাকে কল করে বলেছিল গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে গেছে।”
শ্রাবণ এমন ভান করল যেন ধারাকে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। সে ধারার দিকে না তাকিয়ে হতাশ কন্ঠে বলল,
—” থাক, মন খারাপ কোরো না। হয়তো তুমি মন খারাপ করবে বলে বলেনি। এখন দ্রুত তৈরী হয়ে নাও। আমাদের যেতে হবে।”

—” কো- কোথায়? মা -বাবা যেখানে আছে, সেখানে?”
শ্রাবণ দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ! ”
দুশ্চিন্তা ভর করল ধারার মনে। এক পা এগিয়ে এসে কাঁদো গলায় বলল,
—” উনারা ঠিক আছেন তো? বলুন না। কোথায় উনারা?”
শ্রাবণ মলিন ভঙ্গিতেই মাথা নেড়ে বলল,
—” চলো গিয়ে দেখি।”
ধারা তাড়াহুড়ো করল
—” হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন। আমি শুধু ড্রেসটা চেন্জ করে আসছি। ”
দশ মিনিটের মধ্যে গাড়িতে করে রওয়ানা দিল তারা। ধারা দুশ্চিন্তায় প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। হুট করে কী থেকে কী হলো সে বুঝতে পারছে না। তাই বসে বসে গাড়ির জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলছে। পাশে ড্রাইভিং সিটে থাকা শ্রাবণ আড়ালে বিজয়ের খুশিতে আনন্দিত। বাইরে থেকে মলিন মুখভঙ্গি করে রাখলেও মনে মনে নিজেকে বাহবা দিয়েছে সে। পরিকল্পনা সফল! ধারাকে নিয়ে বাইরে বের হতে পেরেছে সে। কিছুক্ষণ পর পরিকল্পনা অনুযায়ী গাড়ি চালাতে চালাতেই শ্রাবণ কল দিল সালমা বেগমকে। এরপর কথোপকথন চালাল স্ক্রিপ্ট অনুসারে,

—” হ্যাঁ হ্যাঁ মা। কী বললে? ওও তোমরা বেরিয়ে পড়েছো। আচ্ছা, কাজ হয়ে গেছে। ঠিক আছে! হ্যাঁ ধারাও পাশে আছে। আমরা তো ভেবেছিলাম আমাদের দরকার হবে। ওহহো! কিন্তু আমরা তো বেরিয়ে পড়েছি। কী বললে? এখন বাড়িতে যাওয়া যাবে না? উনারা বাড়িতে যাচ্ছে? আচ্ছা যাব না। না ঠিক আছে, আমরা কোথাও একটা থেকে যাব। রাতেই ফিরব না হয়। হ্যাঁ? কথা বলবে? হ্যাঁ হ্যাঁ কথা বলো ধারার সাথে! ”
বলেই শ্রাবণ ধারার দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” কথা বলো মায়ের সাথে।’
ধারা বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে ফোনটা হাতে নিয়ে কানে গুঁজলো। ওপাশ থেকে সালমা বেগম প্রথমে মুখ কুঁচকে আহাম্মকের মত তাকিয়ে রইলেন ফোনের দিকে। তার ছেলে কি পাগল হয়ে গেছে? অনবরত নিজের মত করে কী বলল এসব? ব্যাপার টা বুঝতে সময় লাগল তার। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ফোনটা কান নিলেন। এরপর সালমা বেগমের কথা ভেসে এলো,

—” হ্যাঁ ধারা?”
—” জ্বি মা? আপনারা কোথায়?”
—” ঠিক আছি আমরা। শোন, তোর নীল ভাইয়ের জন্য পাত্রীপক্ষের লোক দেখতে এসেছে বুঝলি। তার পছন্দের মেয়ে ছিল। আমরা সকালে জেনেছি। সেখানেই এসেছিলাম। এতক্ষণ রেস্টুরেন্টে কথা বললাম তাদের সাথে। বেশ ভালো লেগেছে। হয়তো পাকা হয়েই গেছে। এখন তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি বুঝলি? একটু আতিথেয়তা না করে তো পাঠানো যায়না! কিন্তু শ্রাবণ যে বিয়ে করেছে এটা এখনো তারা জানে না, তাই তোরা দুজন রাত পর্যন্ত বাইরে একটু থেকে যা। নীলের বিয়ে হওয়ার আগে তোদের পরিচয় করিয়ে দেব তাদের সাথে। আপাতত আগে পাকা কথা হয়ে যাক। বিয়ের ডেইট ফিক্স করি,বুঝেছিস মা?”
চোখ পিটপিট করে কানে ফোনটা নিয়েই শ্রাবণের দিকে তাকাল ধারা। শ্রাবণ নিশ্চিন্তে গাড়ি চালাচ্ছে। ধারা মলিন কন্ঠে বলল,

—” রাত পর্যন্ত কোথায় থাকব মা?”
সালমা বেগম স্বান্তনা দেয়ার সুরে বললেন,
—” শ্রাবণকে বলে দিয়েছি আমি। একটু ঘুরে বেড়াস। এরপর রেস্ট নিতে হলে আমাদের বাংলোতে নিয়ে যাবে। অনেক সুন্দর জায়গা ওটা। আগে তো কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি। ওটাও আমাদের বাড়ি। আপাতত ওখান থেকে ঘুরে আয়।”
ধারা কয়েক সেকেন্ড ফোনটা কানে ধরে চুপ করে বসে রইল। তার মুখে সেই অদ্ভুত ধরনের দ্বিধা। যেতে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু কারণও খুঁজে পাচ্ছে না। নীলের বিয়ের কথা শুনে তার ভালোই লাগছে। ছেলেটা এতদিন ধরে সত্যিই সিরিয়াস ছিল তাহলে। ওপাশ থেকে সালমা বেগম আবার ডাকলেন,
—” ধারা?”
ধারা সম্বিৎ ফিরে পেল,
—” জ্বি মা?”
—” মন খারাপ করিস না মা। আর আমার ছেলেটার সাথে খারাপ ব্যবহার করিস না। ছেলেটা সাতদিনে যা করেছে, আরেকটু করলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হতো।”
ধারা তৎক্ষণাৎ কাশল। পাশে বসা শ্রাবণ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাল। সালমা বেগম আবার বললেন,

—” আচ্ছা রাখি। আর শোন বাইরে কিছু খেয়ে নিস। খালি পেটে থাকবি না।”
—” আচ্ছা মা।”
কল কেটে গেল। ধারা কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে করে ফোনটা শ্রাবণের দিকে বাড়িয়ে দিল। শ্রাবণ ফোনটা নিয়ে খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল,
—” কী বলল?”
ধারা জানালার দিকে তাকিয়ে ছোট গলায় বলল,
—” কিছু না।”
—” হুম।”
—” নীল ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হচ্ছে।”
শ্রাবণ মাথা নাড়ল,
—” ভালো তো। আপদের ঘাড়ে বিপদ পড়বে।”
ধারা ভ্রু কুঁচকালো। আবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—” আমরা সত্যিই বাড়ি যেতে পারব না।”
শ্রাবণ ভেতরে ভেতরে আনন্দে পাঁচবার লাফ দিলেও বাইরে থেকে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” না। ওখানে মানুষজন থাকবে। অস্বস্তিকর হয়ে যাবে। তুমি তো আর আমার সাথে ভালো ব্যবহার করবে না। ওরা বিষয়টা খেয়াল করলে খারাপ হবে।”
ধারা মাথা নিচু করল। শ্রাবণ আড়চোখে তাকাল। ধরা পড়েনি। পরিকল্পনা সফল। সে আবার গম্ভীর সুরে বলল,

—” আমরা আগে খাওয়া করব নাকি..আচ্ছা শোনো, বাংলো এখান থেকে অনেকটা দুরে। তুমি যাবে?”
ধারা চোখ পিটপিট করল,
—” ওটা ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই?”
—” হোটেল আছে। ”
ধারা ঠোঁট কামড়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” বাংলোতেই যাই।”
শ্রাবণ সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত দ্রুত মাথা নাড়ল,
—” হুম। ওটাই ভালো।”
ধারা এবার সরু চোখে তাকাল,
—” আপনি এত খুশি কেন?”
শ্রাবণ তৎক্ষণাৎ কাশি দিল,
—” কোথায় খুশি? আমি? আমি তো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মানুষ।”
ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর সন্দেহের চোখে বলল,
—” আপনার মুখটা কেমন যেন লাগছে।”
শ্রাবণ দ্রুত মুখ শক্ত করল,
—” টেনশনে আছি।”

ধারা মাথা নাড়ল। বিশ্বাস করল না। তবুও কিছু বলল না। গাড়িতে আবার নীরবতা নেমে এলো। ধারা আশেপাশে রাস্তা লক্ষ্য করে সতর্ক কন্ঠে বলল,
—” আমরা তাহলে এখন কোথায় যাচ্ছি?”
শ্রাবণ ফট করে বলল,
—” আপাতত এখন ডেটে যাচ্ছি।”
ভ্রু কুঁচকে তাকাল ধারা,
—” কীহ? কোথায়?”
—” না মানে, রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি। আগে খেয়ে নিই। তারপর বাংলোতে যাই।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩০

ধারা বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল। কথাটা ভালোমত শোনেনি সে। নইলে বোধহয় বুঝলে গাড়ি থেকেই লাফ দিত। স্টিয়ারিং ধরে থাকা শ্রাবণ বিড়বিড় করল,
– “ধন্যবাদ নীল। ধন্যবাদ জিহান। ধন্যবাদ মা। ধন্যবাদ পৃথিবীর সব ষড়যন্ত্রকারী মানুষকে। সত্যি সত্যি প্রথম ডেট সফল হলে তোমাদের ট্রিট দেব।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩২