শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৫
অনামিকা তাহসিন রোজা
নীলের হয়তো কোনো পাপই ছিল এ জনমে। নইলে কেও কি এত আশ্চর্যজনক শ্যালক ও মামাশ্বশুর পায়? বিয়েতে রাজি হয়েছে। পাকা কথা খতম। আগামী সপ্তাহে বিয়ে হবে বলা হয়েছে। অথচ এশার পাশে দাঁড়ালে, তার সাথে কথা বললেই এখনো তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নীরব হুমকি দিচ্ছে। নীল মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল একবার বউটা তার হয়ে যাক, তারপর সে এশাকে কোলে করে নিয়ে তার হিটলার মামা-ভাইয়ের সামনে গিয়ে তাকধুম করে নেচে আসবে,
—” দেখ শালা দেখ, নে দেখি, এবার বল কী বলবি! আমার বউ আমি নিয়েছি। এবার সাহস থাকলে মুখ খোল দেখি। একদম টিকটিকি গুঁজে দেব অশভ্যের দল!”
বিষয়টা ভেবেই পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করল নীল। কিন্তু বড় করে শ্বাস নেয়ার আগেই সে টের পেল এশা তার পা নিজের পরনে থাকা হিল জুতো দিয়ে চেপে ধরেছে। আবারো নিজের ভাগ্য নিয়ে সন্দিহান হলো নীল। এক মুহুর্তের জন্য ভাবলো এই হিটলার রক্তের বংশের মেয়েকে বিয়ে করলে পরে পস্তাতে হয় কিনা। কিন্তু ভালোবাসা কোনো বাঁধা মানে না। ফোঁস করে শ্বাস ফেলল নীল। এশার দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দিল সে মুখ ফঁসকে কোনো কথা বলবে না।
এশার মামা তুহিন চৌধুরী চোখের চশমা ঠিক করে সামিউল শেখের দিকে তাকিয়ে সুলভ হেসে বললেন,
—” তাহলে আজ আসি ভাইজান। ”
সালমা বেগম বললেন,
—” সে কি! তা কী করে হয়? রাতের খাবারটা খেয়ে যান। ”
এশার ভাই আফরিদ এবারে গম্ভীর মুখে ভদ্রতার সাথে বলল,
—” না আন্টি, আজ থাক। অন্য কোনো দিন। এখন তো যাওয়া আসা লেগেই থাকবে। আর প্রচুর কাজ রয়েছে। বিয়ের মাত্র সাতদিন বাকি। কতকিছু কেনাকাটা বাকি। একটু তো সময় লাগবেই।”
নীল মনে মনে বাঁকা হাসল। এইতো শালারা লাইনে আসছে। আফরিদ এবারে এশার দিকে তাকিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল,
—” চল এশা। বেরিয়ে পড়ি।”
শেখ বাড়ি থেকে এশাদের গাড়িটা বেরিয়ে পড়তেই বড় গেট দিয়ে শ্রাবণের গাড়ি ঢুকলো বাড়িতে। সালমা বেগম সদর দরজা বন্ধ করতে গিয়ে ছেলের গাড়ির শব্দে আবারো উঁকি দিলেন। বললেন,
— ” ওইতো শ্রাবণও চলে এসেছে।”
সামিউল শেখও বিশ্রাম নেয়ার উদ্দেশ্যে উঠে পড়েছিলেন। স্ত্রীর কথা শুনে আবারো সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন তিনি। কথাবার্তা শেষ হোক তবে। প্রচন্ড রকম লজ্জা নিয়ে ধারা কোনোমতে বাড়িতে ঢুকলো। সালমা বেগম হেসে বললেন,
—” এসেছিস মা? আয়। যা সোফায় বোস তো। বাংলো পছন্দ হয়েছে?”
ধারা হেসে মাথা নাড়ল,
—” হুম, অনেক সুন্দর। ”
—” মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে ঘুরে আসবি তোরা। দেখবি ভালো লাগবে। পরিবেশটাও শান্ত ওখানে। গেলেই মন ভালো হয়ে যায়। তোর শ্বশুরের সাথে ঝগড়া হলে ওখানে যেতাম আমি। ”
সামিউল শেখ অসহায় নেত্রে তাকালেন। বউমার সামনে মান সম্মান আর রাখল না তার স্ত্রী। ধারা হেসে আবারো মাথা নাড়ল। এরপর সোফায় সামিউল শেখের সামনে গিয়ে বসল।
—” আপনি দুপুরে ঔষধ খেয়েছেন বাবা?”
সামিউল শেখ হাসলেন,
—” হ্যাঁ মা, খেয়েছি। তুমি দেখি তোমার শ্বাশুড়ির মত কথা বলছো। না খেলে নিশ্চয়ই এখন একগাদা জ্ঞান দেবে।”
বলে হো হো করে হাসলেন ভদ্রলোক। নীল চেক শার্ট বদলিয়ে করে টি শার্টটা পড়ে এলো ঘর থেকে। আর ভদ্রভাবে থাকা যাচ্ছে না। সারাদিন খুব ভদ্রের বেশে ছিল। নিচে নেমে ধারাকে দেখে হাসল নীল,
—” হেই ধারা…সরি সরি ভাবি! গেস হোয়াট? আমার বিয়ে হচ্ছে। একটু পরে আমার বউয়ের ছবি দেখাচ্ছি। অনেক সুন্দর, জাস্ট লাইক ইউ।”
ধারা ঠোঁট চেপে হেসে কিছু বলার আগেই সামিউল শেখ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
—” তোর কি লজ্জা-শরম নেই বাপ? তোর মত বিয়েপাগলা দুটো দেখিনি! ”
নীল লজ্জা পেল না এবারেও। বরং বেশ সাহস নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—” তোমার ছেলের মনে হয় খু্ব লজ্জা-শরম?”
তখনই শ্রাবণ গাড়ির চাবি আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বাড়িতে ঢুকলো। যতটাই চিল মুডে সে হেঁটে এসেছিল, নিজ শ্রদ্ধেয় পিতার কথা শুনে ততখানি চুপসালো সে। সামিউল শেখ খোঁচা দিয়ে ডাকলেন,
—” এইযে বাছাধন, এদিকে এসো বাবা। সোফায় বসো দেখি। গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। ”
নীল এমনভাবে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে ভাবখানা নিল যেন সে বিশ্বজয় করেছে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে শ্রাবণও সামিউল শেখের থেকে একটুখানি দুরে বসল। চোখেমুখে ভদ্রতা এনে কৌতূহলী হয়ে তাকাল। সালমা বেগম এসে তাড়া দিল,
—” আহহা, তাড়াতাড়ি বলো কথাটা। ওরা বাইরে থেকে এসেছে। বিশ্রাম নেবে না?”
সামিউল শেখ এবারে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন,
—” ধারা ও তোমাকে নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
শ্রাবণ তটস্থ হলো। সোজা হয়ে বসল। মনে মনে দোয়াপাঠ করছে সে। আর যা-ই হোক, যেন আলাদা থাকতে না বলে। সেই আশায় জল ঢেলে সামিউল শেখ চোখের চশমা খুলে বললেন,
—” আগামী সপ্তাহে নীলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। এ বাড়িতেই সব যাবতীয় আয়োজন হবে। কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হবে। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটা নয়, আগামী সপ্তাহে একই সাথে দুটো বিয়ে হবে। নীল-এশা আর তুমি-ধারা।”
শ্রাবণ প্রথমে ঠিক শুনেছে কিনা, সেটাই বুঝতে পারল না। সে কয়েকবার চোখ পিটপিট করল। তারপর ধীরে ধীরে সামিউল শেখের দিকে তাকাল।
—” আ-আবার… বিয়ে?”
সামিউল শেখ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই মাথা নাড়লেন,
—” হ্যাঁ। সমস্যা আছে?”
শ্রাবণ এমনভাবে মাথা নাড়ল, যেন ঘাড় আলাদা হয়ে যাবে,
—” না! না বাবা! কোনো সমস্যা নেই। একদমই নেই।”
বলেই নিজেকে সামলাতে গিয়ে কাশি দিয়ে গম্ভীর মুখ করে বসে রইল। কিন্তু মুখের কোণে যে হাসিটা বারবার উঁকি দিচ্ছে, সেটা লুকোনোর সাধ্য তার নেই। নীল পাশ থেকে সব দেখে মুখ কুঁচকালো। মনে মনে তার প্রিয় খালুর উদ্দেশ্য বিড়বিড় করল,
—” সে তুমি তাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত না নিলেও তোমার ছেলে আবারো বিয়ে করতো। এদিকে অলরেডি প্রপোজ করে বসে আছে।”
কথাটা মনে করতেই নীল ধারার হাতে নজর রেখে আংটি খুঁজলো, যেটা সে আর শ্রাবণ একসাথে কিনেছিল। বাম হাতের অনামিকায় আংটিটা দেখে নীল মুচকি হাসল। তাহলে ওদিকে সব ঠিক হয়েছে।
সামিউল শেখ আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
—” ভেবে বলছো তো? নাটক কিন্তু এখানেই শেষ। এ-ই লাস্ট নিজের ছেলের বিয়ে দেব। এরপর কিন্তু কিছু হলে আর আমি সামলাব না।”
শ্রাবণ অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল বাবার দিকে। তাঁর কথার মানে বেশ বুঝেছে বেচারা। সালমা বেগমও ঠোঁট চেপে হাসলেন। ভাবতেই ভালো লাগছে, দু-দু্টো বিয়ে হবে বাড়িতে। আনন্দের শেষ থাকবেনা। সামিউল শেখ এবারে ভ্রু কুঁচকে শ্রাবণকে বললেন,
—” কী? ভেবেছো তো? সমস্যা আছে?”
নীল আবারো বিড়বিড় করল,
—”সমস্যা? সেটা আবার কীসের মূলা! ভিতরে ভিতরে ব্যাটা এখনই ডিজে বাজিয়ে ‘লুঙ্গি ডান্স’ শুরু করে দিয়েছে।”
মুখে অবশ্য ভীষণ ভদ্র ভাব এনে বসে আছে সে। সামিউল শেখ কড়া চোখে তাকাতেই নীল তাড়াতাড়ি মুখ সোজা করে ফেলল। মেকি হাসল।
ধারা চোখ পিটপিট করে সবার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শ্রাবণ যখন তাকে বিয়ের কথা বলেছে ধারা ভেবেছে কথার কথা। কিন্তু এদিকে যে সত্যি সত্যি বিয়ের আয়োজন হবে তা তো সে জানতো না। শ্রাবণ হঠাৎ খুব ভদ্র গলায় বলল,
—” আসলে… আমি বলতে চাচ্ছিলাম… সিদ্ধান্তটা খুব… খুবই ভালো।”
নীল মাথা নিচু করল। তার কাঁধ কাঁপছে। হাসি আটকাতে গিয়ে অবস্থা খারাপ। সালমা বেগম সন্দেহের চোখে বললেন,
—” নীল, তুই হাসছিস কেন?”
নীল তড়িঘড়ি করে মাথা তুলল,
—” না খালামনি। আমার খুব… খুব বেশি কষ্ট লাগছে।”
—” কষ্ট?”
—” জ্বি।”
মনে মনে আবার বলল,
” কষ্ট লাগবে না?ভাইজানের মুখটা দেখে হাসি চেপে মরছি!”
এদিকে শ্রাবণ প্রাণপণে নিজের মুখটা গম্ভীর রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার চোখদুটোই সব বলে দিচ্ছে। সামিউল শেখ এবার ধীর দৃষ্টিতে ধারার দিকে তাকালেন। কণ্ঠটা আগের চেয়ে অনেক নরম।
—” বউমা? তোমার মতামত দাও। ছাগলটাকে আরেকটা সুযোগ দেবে? তুমি ‘না’ করলে সব এখানেই শেষ। ক্যানসেল সব। চিন্তা কোরো না। তোমার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত। ”
ধারা আবারো বোকার মত সালমা বেগমের দিকে তাকাল। আজ ভদ্রমহিলা ছেলের পক্ষ নিয়ে ইশারায় হ্যাঁ করতে বোঝাল। ধারা আবারো শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ তাকাল না অবশ্য। কিন্তু ধারা অনেকটা সময় তাকিয়ে রইলো। এরপর আবারো সামিউল শেখের দিকে তাকাল। মিনমিন করে বলল,
—” বাবা? আবারো এসব করার দরকার কী? খরচার ব্যাপার আছে না? এমনিতেই নীল ভাইয়ের বিয়ে।”
সামিউল শেখ মাথা নাড়লেন,
—” আবারো কোথায়? তোমার বিয়ে হয়েছে নাকি? ওই সময় তো শুধু কাজি ডেকে কাজ সাড়তে হয়েছে। আত্মীয় স্বজন তো এখনো কেও ঠিকঠাক জানেনা হতচ্ছাড়াটার বিয়ে হয়েছে কিনা। তুমি শুধু বলো, তোমার কোনো আপত্তি আছে কিনা।”
ঘরটা আচমকা নীরব হয়ে গেল। ধারা চুপ করে বসে রইল। তার দৃষ্টি নিজের হাতের অনামিকায়। সেই আংটিটা, কয়েক ঘণ্টা আগেই যেটা শ্রাবণ নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাংলোর পুকুরপাড়, কৃষ্ণচূড়া, ফুলের তোড়া, হাঁটু গেড়ে বসে থাকা শ্রাবণ- “উইল ইউ এগেইন ম্যারি মি, ওয়াইফি?” অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই সে সেটা লুকিয়ে ফেলল।
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৪
আরেকবার আড়চোখে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুধু তার উত্তর শোনার অপেক্ষায়। ধারা আবার চোখ নামিয়ে নিল। কিছু বলল না। শুধু নীরবে বসে রইল। সেই নীরবতার মাঝেই সামিউল শেখ, সালমা বেগম, এমনকি নীলও বুঝে গেল- এই নীরবতা ‘না’-এর নয়। এটা শুধু লজ্জার, আর একটু সময় নিয়ে নিজের সুখটাকে বিশ্বাস করার নীরবতা। সময় নিয়ে ধারা দুদিকে মাথা নাড়ল, বলল—” আপনাদের যা ভালো মনে হয়।”
