Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৩

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৩

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৩
‎আফীফা আফনান

‎রাজশাহী শহরটা মেহুলের কাছে একেবারেই নতুন। বলতে গেলে জীবনের এতোগুলো বছরে এই প্রথমবার তার পা পড়ল এই সিল্ক সিটি আর পদ্মাপাড়ের মাটির বুকে! কিন্তু প্রথম বার এসেও তার মনে হলো শহরটার প্রতিটি কোণে কেমন যেন এক চিরচেনা আপনত্ব ছড়িয়ে আছে।

‎​স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন আর সুবিন্যস্ত এক শান্ত শহর! ইট-কাঠের খাঁচা কিংবা যানবাহনের কানফাটা কোলাহল নেই বললেই চলে। প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন রাস্তাগুলোর দুই পাশ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব পুরনো অশ্বত্থ, নিম আর আমগাছ। ভোরের বাতাসে পাতাগুলোর খসখস শব্দে যেন এক শান্তিময় সুর ভেসে আসছে। দূর থেকে বয়ে আসা পদ্মার হাওয়া আর আমবাগানের সবুজ পাতার ঘ্রাণ সব মিলিয়ে যেন এক অপূর্ব আবহাওয়া চারপাশটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

‎চট্টগ্রাম থেকে বাস ছাড়ার পর প্রায় দীর্ঘ বারো থেকে চৌদ্দটা ঘণ্টা পরে সবাই রাজশাহী এসে পৌছায়।
‎​সুদীর্ঘ আর ক্লান্তিকর সফর! বাসের অধিকাংশ সহযাত্রী ও সহকর্মী চিকিৎসকেরা যখন রাতের নীরবতায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো, তখন মেহুল জানালার কাঁচ ঘেঁষে বিন্দুমাত্র চোখের পাতা এক করেনি। পুরো জার্নিতে সে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমায়নি। চোখে ঘুম তো দূরের কথা, ক্লান্তি পর্যন্ত ভিড়তে পারেনি ওর ভেতরে!
‎​কারণ, বাসের জানালার ওপাশে নিশুতি রাতের ঘোর কেটে যখন ভোরের আলো ফুটছিল, মেহুলের হৃদয়জুড়ে তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন। এ যে তার শেকড়ের অভিমুখে যাত্রা! এই পথ, এই প্রান্তর, এই মাটির সুবাসের সাথেই তো লুকিয়ে আছে তার বংশপরিচয় আর জন্মের আদি রূপকথা! তাই মেহুল চেয়েছে প্রতিটি মাইল, ধুলোবালি আর প্রতিটা দৃশ্যপট নিজ চোখে প্রাণভরে উপলব্ধি করতে।
‎​অবশেষে মেয়াদঘেরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাসটি যখন পদ্মা পার হয়ে রাজশাহী শহরে প্রবেশ করল, সকালের স্নিগ্ধ রোদে ঝলমল করে উঠল চারপাশ।

‎​গাড়ি থেকে নিচে পা রাখতেই মেহুল এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।
‎​চোখ দুটো বন্ধ করে সে এক বুক দীর্ঘশ্বাস টেনে নিল। বুক ভরে গ্রহণ করল রাজশাহী শহরের সতেজ বাতাস আর এই পবিত্র মাটির সোঁদা সুবাস!
‎​এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল ওর প্রতিটি ধমনীতে। বহু বছর পর যেন এক কন্যা তার আপন ভিটেয় ফিরে আসার প্রশান্তি খুঁজে পেল!
‎​মেহুল চোখ খুলে স্মিত হেসে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
‎”অবশেষে তোমার মাটিতে আমি পা রাখলাম… স্বাগত আমাকে আমারই শেকড়ের শহরে!”

‎​তবে মেহুল জানত না, শান্ত আর স্নিগ্ধ এই রাজশাহী শহরের পরিচ্ছন্ন হাওয়ায় ইতিমধ্যেই মিশে আছে আরও এক উন্মাদের ছায়া—যে কি না তার প্রতিটা পদে পদে নজর রেখে চলেছে এক গভীর আবেশ আর উন্মাদনা নিয়ে!

‎এদিকে গাড়ি থেকে নেমে পুরো মেডিকেল টিম সোজা চলে এলো তাদের জন্য বরাদ্দ করা কোয়াটারে। রাজশাহীর স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পের ডাক্তারদের থাকার জন্য বেশ পরিচ্ছন্ন ও নিরিবিলি এই আবাসন ব্যবস্থার আয়োজন করেছে। ​নিজের নির্দিষ্ট কক্ষে ব্যাগ রেখে মেহুল প্রথমেই ফোনটা হাতে নিল। এত দীর্ঘ জার্নির পর বাবা নিশ্চয়ই চিন্তায় অধীর হয়ে আছেন!
‎​স্ক্রিনে ইকবাল সাহেবের নম্বর ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে এক রিং হতেই ফোন রিসিভ হয়ে গেল। যেন এতোক্ষণ ইকবাল সাহেব মেহুলেরই কলের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে ছিলেন।
‎​”বাবা, আমি একদম ঠিকঠাক পৌঁছে গেছি,” মেহুল শান্ত কণ্ঠে বাবাকে আশ্বস্ত করল।
‎​ওপাশ থেকে ইকবাল সাহেবের চিন্তিত স্বর মুহূর্তেই স্বস্তিতে বদলে গেল, “ভালোয় ভালোয় পৌঁছেছিস শুনে বাঁচলাম মা। নিজের খেয়াল রাখিস, আর একটু বিশ্রাম নিয়ে নিস।”

‎টুকিটাকি বিষয় নিয়ে ​বাবার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রাখতেই মেহুল ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল। ভ্রমণক্লান্তি কাটাতে সামান্য পুষ্টিকর খাবার খেয়ে ছায়ায় ঘেরা রুমটায় ঘণ্টাখানেকের জন্য একটু হালকা জিরিয়ে নিল সে। কারণ অলস বসে থাকার মতো সময় একদমই নেই—সামনে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব!
‎তইতো ​বিকেল গড়াতেই মেহুল প্রস্তুত হয়ে বের হয়ে পড়ল আগামীকালের বড় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনের তোড়জোড় ও প্রস্তুতি তদারকি করতে।
‎​তাদের আবাসন কোয়াটার থেকে ঠিক বিশ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত এক সুবিশাল হাইস্কুল মাঠ। মেহুল মাঠে পৌঁছাতেই তার চোখ জুড়িয়ে গেল—একদম সুশৃঙ্খল ও বিশাল পরিসরে বিশাল সব শামিয়ানা ও তাবু খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে পৃথক পৃথক বুথ। সাধারণ রোগীদের চেক-আপ, গাইনোকোলজি বিভাগ, শিশু বিভাগ, ইমার্জেন্সি প্রাইমারি কেয়ার এবং ফ্রিতে ওষুধ বিতরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কাউন্টারগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

‎​ক্যাম্পের মূল মঞ্চের সামনেই উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী স্থানীয় হাসপাতালের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট ও বেশ ক’জন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক। তাদের দেখেই মেহুল পেশাদার ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে তাঁদের সাথে সালাম ও কুশল বিনিময় করল।
‎​”তোমাদের ডেডিকেশন দেখে সত্যি খুব ভালো লাগছে ডক্টর মেহুল! এত দূরের জার্নি করে এসেও তোমরা যেভাবে মাঠে নেমে পড়েছ, তা প্রশংসার দাবি রাখে,” স্থানীয় প্রধান চিকিৎসক প্রসন্ন হেসে মেহুলদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

‎​মেহুলও নম্রভাবে হেসে সবাইকে নিয়ে কাজের তদারকিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বুথগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন, ব্যান্ডেজ, বেসিক ইমার্জেন্সি মেডিসিন আর যন্ত্রপাতির স্টোর ঠিকঠাক পৌঁছাল কি না—একে একে সব ফাইল চেক করে নার্স, ভলেন্টিয়ার ও অন্যান্য সদস্যদের নিখুঁত নির্দেশ দিতে শুরু করল সে।
‎​পুরো মাঠ জুড়ে তখন আগামীকালের বিশাল ক্যাম্প সফল করার এক চরম তোড়জোড় ও ব্যস্ততার সুর বাজছে!

‎এদিকে চট্টগ্রাম থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাজশাহীতে পৌঁছাতেই বেলা গড়িয়ে দুপুর পার হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর এসে বিশ্রাম না নিয়ে সোজা মাঠে নেমে তদারকি করার দরুন পুরো টিমের ডাক্তার আর ভলান্টিয়ারদের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামীকালের মহাব্যস্ত দিনটার কথা চিন্তা করে ক্যাম্পের স্থানীয় প্রধান চিকিৎসক হাসিমুখে সবাইকে রেস্ট নেওয়ার তাগিদ দিলেন।
‎অতঃপর ​সবাই যার যার মতো কোয়াটারে ফিরে এলো। ক্লান্তি এতটাই চেপে বসেছিল যে, রাতে মেসে কোনোরকমে দুটো ডাল-ভাত পেটে চালনা করেই যে যার রুমে গিয়ে এলিয়ে পড়ল।

‎​মেহুলও সবার সাথে রাতের খাবার শেষ করে নিজের রুমে চলে এলো। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ট্রাভেল ব্যাগ আর খাটের ওপর ল্যাপটপের ব্যাগটা রেখে জিপ টেনে ল্যাপটপটা বের করে নিল সে। আজকের ক্যাম্পের ফাইনাল পেশেন্ট লিস্ট আর মেডিসিন ইনভেন্টরির টুকিটাকি হিসাবগুলো চটপট ফাইলে আপডেট করে নিল। মেহুল যখন কাজে মগ্ন তখন ​কাজ করার ফাঁকেই তার ফোনের টুংটাং নোটিফিকেশনে স্ক্রিন জ্বলে উঠছিলো। সে তাকাতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল মিনারের একের পর এক মেসেজ!
‎​’পৌঁছেছিস?’
‎’খাবারের মান কেমন ওখানে?’
‎’রুমে কি এসি আছে? মশারি টাঙিয়েছিস নাকি মশা কামড় খাচ্ছিস?’
‎’ঘুমিয়ে পড়, সকালে ফোন দিয়ে উঠিয়ে দেব তোকে?’
‎যেন ​প্রতি সেকেন্ডের আপডেট চাচ্ছে মিনার!

‎মেসেজগুলো পড়ে মেহুলের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। ভাই হিসেবে বরাবরই মিনারের এমন বাচ্চাদের মতো কেয়ারিং ট্রিটমেন্ট দেওয়াটা মেহুলের বড্ড ভীষণ ভালো লাগে। মাইনর হলেও মিনার যেন মেহুলের এক শক্ত ছাতা! অতঃপর মেহুল মিনারের সব মেছেজে রিপ্লাই করলো। এরপরে​ সব কাজ শেষ করে মেহুল ল্যাপটপ বন্ধ করল। ঘড়িতে তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। সে খাটে শুয়ে পড়ে ক্লান্তি কাটাতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুক স্ক্রল করতে শুরু করল।

‎​হঠাৎই নিউজফিডে ভেসে এলো অর্ণবের একটি নতুন অ্যালবাম পোস্ট।
‎​ক্যাপশনে লেখা—’পারিবারিক মুহূর্তসমূহ।’
‎​মেহুল আঙুল দিয়ে ছবিগুলো সোয়াইপ করতে লাগল। গতকাল প্রতিমা সিনহাদের বাড়ির সাধের অনুষ্ঠানের বাঁধভাঙা আনন্দের ঝলক স্পষ্ট ছবিগুলোতে। অর্ণব, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী স্নেহা, প্রতিমা সিনহা এবং মিনারা বেগমের একসাথে তোলা একখানা অপূর্ব সুন্দর ছবি সামনে এলো। ছবিটিতে মিনারা মণিকে ভারী মিষ্টি আর উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ​স্ক্রোল করতে করতে একটা ছবির কোণায় মেহুলের নিজের আবছা ছবিও চোখে পড়ল—যেখানে সে হাসি মুখে প্রতিমা সিনহার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
‎​কিন্তু পরের ছবিতেই মেহুলের চঞ্চল আঙুল দুটো একদম থমকে গেল! ​স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে একটা দলবদ্ধ ছবি—যেখানে আনিকা, সুমনা বেগম এবং গতকালের সেই কটূক্তি করা মহিলাগুলো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাসছে!

‎​ছবিটা দেখা মাত্রই গতকালের সেই বিষাক্ত মুহূর্তগুলো কালবোশেখা ঝড়ের মতো মেহুলের মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ল—
‎​”যে মেয়ে নিজেই বন্ধ্যা… এমন অলক্ষুণে মেয়ের ছোঁয়া লাগলে তো পেটের বাচ্চার বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে!”
‎​অপমানের সেই দাহ, তীব্র সেই কটূক্তির হুল যেন নিমিষেই মেহুলের হৃৎপিণ্ডটাকে চেপে ধরল! ফেসবুকের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মেহুল সেখানেই জমে স্তব্ধ হয়ে রইল—চোখে থমকে যাওয়া এক আকাশ বিষাদ নিয়ে!

‎কিন্তুপর মুহূর্তেই মেহুল নিজেকে সামলে নিল। বুকের ভেতর থেকে উতলে ওঠা অপমানের সেই তীব্র দাহ আর বিষাদকে শক্ত হাতে দমন করল সে। অতীতের কালছায়া বা পরশ্রীশকাতর মানুষের কটূক্তি নিয়ে ভেবে নিজেকে ভেঙে ফেলার মেয়ে সে আর নেই! সে কারো কথায় দুর্বল হবে না। এগিয়ে যাবে একা, আর জীবনে সফল হয়ে দেখাবে। সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিবে। অপূর্ণ থেকেও পূর্ণতা পাওয়া যায়।

‎অতঃপর ​মোবাইল স্ক্রিনটা এক ঝটকায় অফ করে দিয়ে পাশে রাখল মেহুল। তারপর ঘরের লাইটটা নিভিয়ে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। কালকের সূর্য ওঠার সাথে সাথে এক নতুন যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে—অগণিত অসহায় মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার মহৎ দায়িত্ব অপেক্ষা করছে তার জন্য। সেই ব্যস্ত ও চ্যালেঞ্জিং দিনটার জন্য নিজের শরীর আর মনকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করাটাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। ​চোখ দুটো বুজতেই ধীরে ধীরে রাজশাহী শহরের সেই শান্ত হাওয়ায় মেহুলের চোখের পাতায় নেমে এলো এক গভীর, নিস্তব্ধ ঘুম।

‎রাজশাহী শহরের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশের বুক চিরে প্রাচীন আমবাগান ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রকাণ্ড রাজকীয় অট্টালিকা—’নেওয়াজ মঞ্জিল’।
‎​বাইরে থেকে একপলক তাকালে মনে হবে, এটি কেবল কোনো আধুনিক আবাসন নয়; বরং ইতিহাসের পাতায় ঘুমিয়ে থাকা কোনো এক পরাক্রমশালী রাজার বিশাল প্রাসাদ! চওড়া চুন-সুরকির উঁচু সীমানা প্রাচীর, তার ওপরে অ্যান্টিক ডিজাইনের পেতলের লণ্ঠন আর মূল ফটকে খোদাই করা বিশাল দুটো রাজকীয় সিংহের ভাস্কর্য শুরুতেই যেকোনো পথচারীকে থমকে দিতে বাধ্য করে।
‎​আসলে এটি এককালের ঐতিহ্যবাহী ‘শাহ নেওয়াজ রাজবাড়ি’। প্রপিতামহের আমলে ব্রিটিশ শাসনের সমসাময়িক সময়ে এই পরিবারের সদস্যরা ছিলেন রাজশাহীর প্রতাপশালী জমিদার। বিশাল জমিদারির শাসন আর প্রজাদের খাজনা আদায়ের সেই যুগ আজ আর নেই ঠিকই, কিন্তু কালের আবর্তে এই বাড়ির প্রভাব-প্রতিপত্তি বিন্দুমাত্র কমেনি। জমিদারির ঐতিহ্য লালন করা এই রক্তে এখন বইছে আধুনিক রাজনীতির ধারালো স্রোত!

‎​বর্তমানে এই রাজপ্রাসাদ সমতুল্য বাড়িটি কেন্দ্র করে চালিত হয় পুরো রাজশাহী শহরের রাজনৈতিক অঙ্গন। কারণ এই প্রাসাদের বর্তমান চালিকাশক্তি আর কেউ নন—রাজশাহীবাসীর প্রাণের মানুষ, জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্য (এমপি) মিনহাজ শাহ নেওয়াজ ! ​​বর্তমানে তিনিই এই বাড়ির কর্তা।

‎​প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই এই প্রাসাদের বিশাল সামনের চত্বরে শত শত সাধারণ মানুষ, স্থানীয় নেতাকর্মী আর বিচারপ্রার্থীদের ভিড় জমে যায়। বিশাল দরবার হলের মতো ড্রয়িংরুমে ঝুলে থাকা খাঁটি স্ফটিকের তৈরি প্রকাণ্ড ঝাড়বাতির নিচে বসে এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ শোনেন জনগণের দুঃখ-কষ্টের কথা, দেন তাৎক্ষণিক সমাধান। ​সেই সাথে সারি সারি আধুনিক কালো এসইউভি ও কড়া পুলিশি পাহারার উপস্থিতি একদিকে যেমন এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিশালত্ব তুলে ধরে, অন্যদিকে রক্তে মিশে থাকা জমিদারির সেই আভিজাত্য আর প্রভাবের হুঙ্কার রাজপ্রাসাদের প্রতিটা ইটে ইটে আজও সমানভাবে ধ্বনিত হয়!
‎​আর এই অসীম ক্ষমতা ও আভিজাত্যের অন্দরমহলেই শিকড় গেড়ে বসে আছে আরেক উন্মাদের রাজত্ব— সালমান শাহ নেওয়াজ যে এখন নিজের সাম্রাজ্যের সাথে সাথে এবার নিজের ‘অপ্সরী’কে বন্দি করার চূড়ান্ত ছক কষছে!

‎রাত তখন বারোটা পেরিয়েছে, ঠিক সেই সময় নেওয়াজ মঞ্জিলের বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে একপ্রস্থ তীব্র ব্রেক চেপে থামল গাঢ় কালো মার্সিডিজ বেঞ্জটা! ​গাড়ির চেনা নম্বরপ্লেট আর গর্জন দেখেই গেটে থাকা সশস্ত্র দারোয়ান দ্রুততম সময়ে রাজকীয় গেটটি খুলে দিল। সাথে সাথে মার্সিডিজটি এক প্রকার ঝড়ের বেগে ধুলো উড়িয়ে শ্বেতপাথরের প্রকাণ্ড উঠোন পেরিয়ে একদম প্রধান তোরণের সামনে এসে থামল।
‎​গাড়ির লক খুলতেই চালকের সিট থেকে রবি তড়িঘড়ি করে নেমে এসে পেছনের দরজাটা খুলে ধরল। ঠিক পরক্ষণেই মার্সিডিজের গহ্বর থেকে বেরিয়ে এলো সুঠাম দেহসৌষ্ঠবের সেই পুরুষ—সালমান শাহ নেওয়াজ!

‎​পরনে তার গাঢ় রঙের নিখুঁত ফিটিং স্যুট, প্রখর চাউনি আর রাজকীয় দাপুটে চালচলন। হাতে থাকা দামি রোদচশমাটা স্যুটের পকেটে গুঁজতে গুঁজতে সে এক পলক বাড়ির উঁচু গম্বুজের দিকে প্রখর দৃষ্টি হানল, অতঃপর দাপুটে কদমে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
‎​ঠিক তখনই দু-তলার খোলা উন্মুক্ত বিশাল ব্যালকনি আলিশান স্পেসটায় বসে ছিলেন এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ। জায়গাটা বিশেষভাবে তৈরি—এখানে মাঝে মাঝে তিনি নিজ রাজনৈতিক দলের প্রধান কর্মকর্তা ও হেভিওয়েট নেতাদের নিয়ে জরুরি মিটিং সারেন। নিচে গাড়ির শব্দ আর ছেলের চেনা পদচারণ দেখে তিনি এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে সালমানকে দেখলেন। তবে মুখে কোনো ভাবাবেগ না ফুটিয়ে, শান্ত মুখে আবার নিজের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে মনোযোগ দিলেন।

‎​এদিকে সালমান ড্রয়িংরুম পেরিয়ে অন্দরমহলের সুবিশাল ডাইনিং হলের দিকে পা বাড়াল। সেখানে তখন সালমানের মা, এই বাড়ির কত্রী বিপাশা শিকদার বাড়ির সারভেন্টদের আগামীকালের সকালের নাস্তার টেবিলে কী কী পদের আয়োজন রাখা হবে, তা নিয়ে কড়া নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
‎​সারভেন্টরা দূর থেকেই ছোট সাহেব সালমানকে আসতে দেখে সতর্ক হতে যাচ্ছিল, কিন্তু তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সালমান ঠোঁটে আঙুল দিয়ে অত্যন্ত চটপটে ভঙ্গিতে তাদের একদম চুপ থাকার ইশারা করল!

‎​তারপর বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে পেছন থেকে ধীরগতিতে এগিয়ে গিয়ে পরম আদরে নিজের মায়ের গলার চারপাশ দু-হাতে জড়িয়ে ধরল!
‎​এমন হঠাৎ কাণ্ডে বিপাশা শিকদার বিন্দুমাত্র বিচলিত বা চমকে উঠলেন না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন—পুরো রাজশাহী যার ভয়ে কাঁপে, এই বাড়িতে একমাত্র তার সুঠাম ছেলেই পারে মায়ের সাথে এমন পাগলামি করতে!
‎অতঃপর ​বিপাশা শিকদার ঠোঁটের কোণে মৃদু ও প্রশান্তির হাসি ঝুলিয়ে রাখলেন, তবে কণ্ঠে কৃত্রিম রাগ ঝলকে দিয়ে বলে উঠলেন, “এতক্ষণে সময় হলো মায়ের সাথে দেখা করার? মাঝে মাঝে তো মনে হয় তুই বোধহয় আমাকে একদম ভুলেই গেছিস, শিশির!”

‎​সালমান মায়ের মান-অভিমানের রূপটা বুঝতে পারল। তাই সে মায়ের কাঁধ থেকে হাত ছড়িয়ে নিয়ে বিপাশা শিকদারকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। তারপর মায়ের বিষাদময় গালে পরম ভালোবাসায় হাত রেখে বেশ মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে বলে উঠল—
‎​”তোমাকে ভুলে যাওয়া কি আদৌ কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব, মাই ইয়াং লেডি? ইউ আর দ্য ওনলি কুইন অফ দিস কিংডম, অ্যান্ড দ্য হোল্ড অফ মাই হার্ট!”

‎​সালমানের এই এক উক্তি আর চোখেমুখে উপচে পড়া ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় বিপাশা শিকদার ভেতরের সমস্ত রাগ যেন এক লহমায় উবে গেল। তবু তিনি কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে শুধালেন, “তাহলে এতদিন কোথায় ছিলি শুনি?”
‎​সালমান অত্যন্ত চটপটে মুখে কাজের দোহাই দিয়ে বলল, “বিরাট ব্যস্ততা ছিল মা! কাজের চাপে একদম দম ফেলার ফুরসত ছিল না।”
‎​বিপাশা শিকদার এবার চোখ ছোট ছোট করে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বললেন, “আমার জানামতে তুই তো আরো তিন দিন আগেই দেশে পা রেখেছিস! আগে তো কখনো এমন হয়নি যে বাংলাদেশে এসে রাজশাহী না ঢুকে অন্য কোথাও তুই টানা তিন দিন কাটিয়ে দিবি? এবার কী এমন রাজকার্য ছিল, হ্যাঁ?”

‎​সালমান হালকা এক চিলতে শয়তানি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে চোখ মেরে বলে উঠল, “তোমার জন্য ‘ বউ’ খুঁজতে গিয়েছিলাম!”
‎​বিপাশা শিকদার ভাবলেন ছেলে নির্ঘাত আবার তার সাথে ঠাট্টা করছে! তিনি দুষ্টুমি ভেবে সালমানের সুঠাম বাহুতে আলতো করে একটা চাপড় মেরে হেসে বললেন, “ছেলেমানুষিগুলো আর গেল না তোর, তাই না? মায়ের সাথে কথা বলার আদব-কায়দা কি সব ভুলে গেছিস?”
‎​সালমান অমনি মায়ের গলাটা আবার মিষ্টি করে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল, “তুমি তো শুধু আমার জন্মদাত্রী নও, ইয়াং লেডি! তুমি আমার লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ডও! দুষ্টুমি তোমার সাথে করব না তো কার সাথে করব, বলো?”
‎​কথাটা বলেই সালমান পেটে হাত দিয়ে বাচ্চার মতো হাঁক ছাড়ল, “এবার থামো তো মা! চরম খিদে পেয়েছে, জলদি খাবারের বন্দোবস্ত করো!”

‎​ছেলেকে এতদিন পর কাছে পেয়ে বিপাশা শিকদার আর কথা বাড়ালেন না। চটজলদি নিজ হাতে রান্নাঘরে গিয়ে গরম গরম খাবার থালায় সাজিয়ে পরিবেশন করতে লেগে পড়লেন। ​মিনিট দশেকের মধ্যেই বিশাল শ্বেতপাথরের ডাইনিং টেবিলে ধোয়া ওঠা সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হয়ে গেল। সালমান ততক্ষণে রুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে এসে বসে পড়েছে। তার একপাশে আছে রবি, আর ঠিক পাশে হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে আয়েশ করে বসে পড়েছে সালমানের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ধ্রুব !

‎​সালমান প্লেটে খাবার নিয়ে প্রথম লোকমাটা মুখে তুলবে, ঠিক তখনই ওপরের ব্যালকনি থেকে এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ এবং তাঁর দলবলের কয়েকজন রাজনৈতিক হেভিওয়েট কর্মকর্তা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন।
‎​পার্টির লোকেরা দরজার দিকে যাওয়ার পথে সালমানকে টেবিলে খেতে দেখে থমকে দাঁড়াল। অত্যন্ত সম্মান ও কুশলতার সাথে জিজ্ঞেস করল, “আরে সালমান! কেমন আছো বাবাজান? কতদিন পর দেখলাম!”

‎​সালমান মুখে খাবার রেখেই বেশ স্বাভাবিক ও সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে তাদের সালাম ও সম্ভাষণের জবাব দিল। ​এদিকে এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ গম্ভীর মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাঁর এই বেপরোয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে রলেন। ততক্ষণে পার্টির বাকি কর্মকর্তারা সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।

‎​বাবাকে অতক্ষণ ধরে সিঁড়ির গোড়ায় স্থির হয়ে তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকতে দেখে সালমান খাবারের প্লেট থেকে মুখ না তুলে বেশ উচ্চস্বরে রসিকতার ভঙ্গিতে বলে উঠল—
‎​”এভাবে হা করে তাকিয়ে আছেন কেন, হে মহামান্য এমপি সাহেব? আমি জানি আমি বড্ড বেশি সুদর্শন! আমার মতো হ্যান্ডসাম পুরুষ তোমার পুরো বংশ খুঁজে একটাও পাওয়া যাবে না… তাই বলে কি বখাটেদের মতো এভাবে আমার দিকে নজর ফেলবে? নজর লেগে গেলে আমাকে আবার বিয়ে করবে কে, বলো তো!”

‎​সালমানের এমন চরম বেপরোয়া আর অভাবনীয় কথাবার্তা শুনে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা কাজের মেয়েরা মুখের ওপর ওড়না চেপে ফিক করে হেসে উঠল! অপরদিকে ​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সর্বদা গম্ভীর ও থমথমে চেহারার রবিও মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসল। ​আর সালমানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ধ্রুব? সে তখন মুখে প্রকাণ্ড একটা খাসির মাংসের টুকরো নিয়ে চিবোচ্ছিল! সালমানের এমন ডায়লগ শুনে সে না পারছে হাসতে, না পারছে মুখের খাবারটা গিলতে—চরম বিষম খাওয়ার উপক্রম হয়ে তার চোখ দুটো তখন একদম কপালে উঠে গেল!

‎এদিকে ছেলের মুখে এমন চরম বেপরোয়া, ফাজিল ও অসৌজন্যমূলক উত্তর শুনে মিনহাজ শাহ নেওয়াজের ধীরস্থির গম্ভীর চেহারায় নিমেষে একরাশ বিরক্তি ফুটে উঠল। তিনি যে শহরের অন্যতম প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, পুরো জেলা যার ইশারায় উঠবস করে—সেই নিজের বাড়িতেই নিজ ছেলের কাছে তার কোনো কদর নেই!
‎​তিনি গম্ভীর মুখে দুটো পা সামনে বাড়িয়ে ধীরপায়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখেমুখে শাসনের কঠোরতা আর ব্যক্তিত্বের দাপট স্পষ্ট।
‎​ডাইনিং চেয়ারের পেছনের অংশে দু-হাত দিয়ে ভর দিয়ে মিনহাজ শাহ নেওয়াজ কড়া গলায় বলে উঠলেন—
‎​”নিজের ফাজিলমো আর ঔদ্ধত্যগুলো কি সারাজীবন এই নেওয়াজ মঞ্জিলেই দেখিয়ে যাবে সালমান? রাজনীতি আর পাবলিকের সামনে যেভাবে গম্ভীর ও কাজের মানুষের মুখোস পরে থাকো, সেই বুদ্ধিমত্তার চার আনাও কি তোমার বাবার সাথে কথা বলার সময় বজায় রাখা যায় না?”

‎​সালমান প্লেটে থাকা চিকেন লেগপিসে এক কামড় বসিয়ে পরম তৃপ্তিতে চিবোতে চিবোতে চোখ তুলে তাকাল। বাবার কড়া শাসনকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে একগাল তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল—
‎​”রাজনীতি হলো ধোঁকাবাজির ব্যবসা, মহামান্য এমপি সাহেব! সেখানে তো মুখোশ পরতেই হবে। কিন্তু এই প্রাসাদে ঢুকে যদি বাপের সামনেও অ্যাক্টিং করতে হয়, তবে তো নাটকের থিয়েটারে গিয়ে নাম লেখানোই ভালো ছিল, তাই না?”

‎​”মুখ সামলে কথা বল, শিশির!” মিনাহাজ শাহ নেওয়াজ হালকা গর্জে উঠলেন।
‎​ঠিক তখনই বিপাশা শিকদার রান্নাঘর থেকে হাতে পায়েসের বাটি নিয়ে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলেন। স্বামী আর ছেলের এই চিরচেনা লড়াই দেখে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাটিটা টেবিলে রাখলেন।
‎অতঃপর ​বিপাশা শিকদার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে নরম গলায় বললেন, “আহা, ছেলেটা এতোদিন পর বাড়ি ফিরেছে! এসেই একটু শান্তিমতো দুটো ভাত মুখে তুলছে, আর তুমি শুরু হয়ে গেলে? একটু শান্ত হয়ে ওকেও খেতে দাও তো!”

‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একচিলতে আক্ষেপের হাসি হাসলেন, “তুমিই ওর মাথার ওপর এই প্রশ্রয়ের ছাতা ধরে ধরে ওকে এত বেপরোয়া বানিয়েছ, বিপাশা! ও কিন্তু আর ছোট বাচ্চা নেই। এখন অন্তত ওর নিজের দায়িত্বগুলো বোঝা উচিত।”
‎​অতঃপর তিনি আবার সালমানের দিকে চোখ ফেরালেন। এবার তাঁর কণ্ঠে রাজকীয় আদেশ আর গম্ভীর ভাব—
‎​”শোনো শিশির, কাল সকালে হাইস্কুল মাঠে যে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে, সেখানে শহর ও চট্টগ্রাম থেকে বড় বড় ডাক্তারদের টিম এসেছে। রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে সকালে ক্যাম্পের উদ্বোধনে আমাকে আর তোমাকে উপস্থিত থাকতে হবে। সকাল নয়টার মধ্যে রেডি থাকবে।”

‎​’চট্টগ্রাম থেকে ডাক্তারদের টিম এসেছে’—কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই সালমানের চিবোনো থমকে গেল!
‎​তার প্রখর, বাজপাখির মতো চোখ দুটোতে এক লহমায় এক অদ্ভুত পৈশাচিক খুশির ঝিলিক খেলে গেল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি।
‎​সালমান প্লেট থেকে হাত ধুয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বাবাকে বলল—
‎​”মেডিকেল ক্যাম্পের শুভ উদ্বোধন? বাহ্, চমৎকার আয়োজন! নিশ্চিত থেকো বাবা… কালকের এই ক্যাম্পেইনে তোমার সুযোগ্য ছেলে শুধু উপস্থিতই থাকবে না, বরং সেখানে গিয়ে এমন বিশেষ চমক দেবে যা পুরো শহরের সাথে সাথে তোমারও সারাজীবন মনে থাকবে!”

‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ ছেলের সেই গভীর, রহস্যময় চোখের ভাষা বুঝতে না পেরে কিছুটা কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রইলেন।
‎এদিকে ​সালমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ধ্রুব আর রবির দিকে একনজর ইশারা করে, বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঠোঁটের কোণে মেহুলকে নিয়ে এক চরম উন্মাদের আবেশ মেখে নিজের আলিশান রুমের দিকে পা বাড়াল।
‎কারন​ কালকের সকালটা যে শুধুই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন হবে না, বরং এক উন্মাদের তার অপ্সরীকে নিজের জালে বন্দি করার মহা চক্রান্ত হতে যাচ্ছে—তা কেবল সালমান আর তার গোপন হৃদয়ই জানে!

‎​পরদিন সকাল।
‎​সূর্য উদয়ের সাথে সাথেই হাইস্কুল মাঠের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেল! সকাল আটটা বাজতে না বাজতেই দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে মাঠে। কেউ কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে এসেছেন, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসার আশায়।

‎এদিকে নেওয়াজ মঞ্জিল’-এ তখন ব্যস্ততা চরমে পৌঁছাল। ​ঘরের ভেতরের সেই চপল, ফাজিল কিংবা বেপরোয়া ভাবটা নিজের রাজকীয় বেডরুমে ফেলে রেখে নেমে এলো সালমান। পরনে তার অত্যন্ত মার্জিত ও নিখুঁত ফিটিংয়ের নেভি ব্লু ব্লেজার, ভেতরের শুভ্র শার্ট আর চোখে এক কঠিন, গম্ভীর ও দাপুটে আভিজাত্য। ঘরের ভেতরে যে ছেলেটা মায়ের সাথে বিড়ালের মতো আদুড়ে কিংবা বাবার সাথে চরম ঠাট্টায় মেতে ওঠে, প্রাসাদের তোরণ পার হওয়ার মুহূর্তেই সে বদলে হয়ে গেল এক প্রতাপশালী রাজনীতিকের সুযোগ্য সন্তান—যার প্রতিটি পদক্ষেপে দাপট আর গম্ভীর ব্যক্তিত্ব উপচে পড়ে।

‎​সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজের সুবিশাল বহর রওনা দিল হাইস্কুল মাঠের উদ্দেশ্যে।
‎আগে- পরে বেশ কয়েকটি কড়া সাইরে বা পুলিশ স্কোয়াড ও কালো এসইউভি গাড়ির বহর নিয়ে যখন তারা হাইস্কুল মাঠের গেটে এসে থামল, তখন চারপাশের বাতাসে যেন এক অন্যরকম চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল!

‎​রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন আর ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবকদের ভিড়ে পুরো মাঠ গমগম করে উঠল। “মিনহাজ শাহ নেওয়াজ জিন্দাবাদ” “সালমান শাহ নেওয়াজ জিন্দাবাদ” ধ্বনিতে মুখরিত হলো চত্বর।
‎অতঃপর ​গাড়ি থেকে নেমে এলেন এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ এবং তাঁর ঠিক পাশে সুঠাম দেহসৌষ্ঠবে প্রখর আভিজাত্য নিয়ে পা রাখল সালমান। সালমানের আগমনে উপস্থিত সবার দৃষ্টি যেন একমুহূর্তে তার দিকেই স্থির হয়ে গেল। বাহিরে সালমান এমনই—পরিমিত কথা, কঠিন চোখের চাহনি আর এক অদম্য ব্যক্তিত্বের প্রতীক। তারা আসতেই ​ক্যাম্পের মূল ডায়াসে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো।

‎অ্যদিকে স্টেজ থেকে একটু দূরে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল মেডিকেল টিমের চিকিৎসকেরা সাথে মেহুলও। তাই ভিড়ের মাঝে সালমানের বাজপাখির মতো প্রখর চোখ জোড়া মুহূর্তের জন্য খুঁজে নিল মেহুলকে। কিন্তু তার সামনে গেলো না।
‎এদিকে ​সাদা অ্যাপ্রন পরা, গলায় স্টেনোস্কোপ ঝুলানো মেহুল তখন অন্য এক ডাক্তারের সাথে ফাইলের কাগজ নিয়ে নিবিষ্ট মনে কথা বলছিল। যা দেখেই সালমানের ঠোঁটের কোণে এক লহমার জন্য এক চরম উন্মাদের মায়াবী হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, তবে মুখে ধরে রাখল চেনা সেই বরফশীতল গম্ভীর ভাব।

‎আয়োজন শুরু করার সময় হয়ে উঠেছে তাই ​মূল মঞ্চে উঠে এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ​উপস্থিত অগণিত জনতা আর চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর গম্ভীর ও প্রাঞ্জল কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন—
‎​
‎একটু পরেই ​সংক্ষিপ্ত ও জোরালো বক্তব্য শেষে তিনি ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে সাত দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। সাথে সাথেই ​হাততালির জোয়ারে ভেসে গেল পুরো মাঠ। ​শুভ উদ্বোধনের সমাপ্তি ঘটতেই মিনহাজ শাহ নেওয়াজ ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে সামনের দিকে পা বাড়ালেন। আর তাঁর ঠিক কয়েক কদম পেছনে ধীর, কিন্তু তীক্ষ্ণ পদক্ষেপে হাঁটতে শুরু করল সালমান—যার নজর এখন কেবলই নির্দিষ্ট এক ‘অপ্সরা’র দিকে নিবদ্ধ!
‎​
‎এদিকে ​মেহুল তখন ফাইল হাতে নিজের নির্দিষ্ট গাইনি ও জেনারেল কেয়ার বুথে এসে বসল।
‎​শুরু হলো এক মহাব্যস্ততা! একে একে পেশেন্ট দেখা, প্রেসক্রিপশন লেখা, রোগীদের মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং ফ্রি মেডিসিন কাউন্টারে তাদের পাঠানো—মেহুল নিখুঁত ও অত্যন্ত আন্তরিকভাবে নিজের কাজ সামলাতে লাগল। তার হাসিমুখ আর সহমর্মিতাপূর্ণ ব্যবহারে সাধারণ মানুষগুলো যেন অর্ধেক সুস্থ বোধ করছিল।
‎​ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে, চারপাশের গমগম করা শব্দ, শিশুদের কান্না আর মাইকের ঘোষণার মধ্য দিয়ে মেহুল সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে তার কাজ করে চলেছে।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১২

‎​কিন্তু সে জানত না, এই সুবিশাল মাঠের ঠিক বাইরে, রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা একখানা গাঢ় কালো কাঁচের গাড়ির ভেতর থেকে দুটো বাজপাখির মতো প্রখর চোখ তার প্রতিটা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে!
‎​সালমান গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে বাইনোকুলারে মেহুলের প্রতিটি ভঙ্গিমা দেখছে। ওর ব্যস্ত হাত, কপালের জমা হালকা ঘাম আর রোগীদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসা—সবকিছুই যেন প্রতি সেকেন্ডে সালমানের হৃদয়ে এক অদ্ভুত দোলাচল সৃষ্টি করছে।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৪