Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৪

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৪

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৪
‎আফীফা আফনান

‎​মেহুল তখন রোগী দেখতে ভীষণ ব্যস্ত। এক মুহূর্তের জন্যও মাথা তোলার ফুরসত নেই তার। গলায় স্টেনোস্কোপ ঝুলিয়ে, ফাইল সামনে নিয়ে সে নিখাদ মনোযোগ সহকারে কথা শুনছে তার সামনে এসে বসা বিভিন্ন বয়সের ও পেশার মানুষগুলোর।
‎​কারও দীর্ঘদিনের রক্তস্বল্পতা, কারও প্রসূতিকালীন জটিলতা, আবার কোনো বয়োবৃদ্ধার বাতের ব্যথার উপশম দরকার। একেকজনের একেক সমস্যা, একেক রকমের আকুতি। মেহুল ধৈর্য ধরে সবার প্রতিটি কথা শুনছে, ফাইল নোট করছে এবং যত্ন নিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছে। আর পাশে দাঁড়ানো তার সহযোগী শান্তা দ্রুত হাত চালিয়ে রোগীদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, কোন কাউন্টার থেকে তারা এই ফ্রি ওষুধগুলো সংগ্রহ করবে।

‎​এভাবেই দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা গড়িয়ে পুরো দুপুর পার হয়ে গেল!
‎​টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা একনাগাড়ে চেয়ারে বসে কাজ করে চলেছে মেহুল। এক মিনিটের জন্যও বিশ্রামের সুযোগ নেয়নি সে। একটানা রোগী সামলানোর দরুন বর্তমানে তার কাউন্টারের লাইনে অন্যান্য বুথগুলোর তুলনায় রোগীর চাপ বেশ কমে এসেছে। মাত্র জন ছয়েক রোগী এখন লাইনে বাকি।
‎​ঠিক তখনই মেহুলের বুথের সামনে এসে দাঁড়ালেন চট্টগ্রামের সিনিয়র গাইনোকোলজিস্ট ডক্টর আনোয়ার।
‎​তিনি মেহুলের ব্যস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে স্নেহমাখা হাসিতে বললেন, “ডক্টর মেহুল, দুপুর আড়াইটা বেজে গেছে। তুমি তো সকাল থেকে একঘণ্টার জন্যও চেয়ার ছেড়ে ওঠোনি! টিম ক্যান্টিনে লাঞ্চ দেওয়া শুরু হয়েছে, এসো লাঞ্চটা সেরে নাও। বাকিটুকু এসে করবে।”

‎​মেহুল কলমটা টেবিলে রেখে কপালে জমা হালকা ঘামটুকু টিস্যু দিয়ে মুছে নিল। অতঃপর বিনীত ও মিষ্টি এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “আপনি গিয়ে লাঞ্চ সেরে নিন, স্যার। আমার লাইনে আর মাত্র পাঁচ-ছয়জন রোগী আছেন। এদের শেষ করেই আমি আসছি। ওদের ফেলে এখন উঠে গেলে দূর থেকে আসা এই মানুষগুলোর কষ্ট হবে।”
‎​ডক্টর আনোয়ার মেহুলের সেবামূলক মনোভাব আর দরদ দেখে প্রসন্ন মনে মাথা নাড়লেন, “বেশ, বেশি দেরি কোরো না কিন্তু!”
‎​তিনি চলে যেতেই মেহুল আবার সামনের রোগীর ফাইলে মনোযোগ দিল।
‎​পরের ফাইলটি জমা পড়তেই মেহুলের সামনে এসে বসলেন এক সত্তরোর্দ্ধ বৃদ্ধা। গায়ে সামান্য একটা সুতির চাদর জড়ানো, মুখে বয়সের বলিরেখা আর ধুলোবালির ছাপ।
‎​মেহুল পরম মমতায় বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি ভাষায় বলল, “আসুন দাদী, বসুন। বলুন তো, আপনার কী সমস্যা হচ্ছে?”

‎​বৃদ্ধা মেহুলের দিকে ঝাপসা চোখে তাকালেন। তরুণী ডাক্তারের এমন নম্র আর আপন করে নেওয়া ব্যবহার দেখে তাঁর মুখের ভাঁজে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। রাজশাহীর আঞ্চলিক টানে তিনি গলার কাঁপন সামলে বলতে লাগলেন—
‎​”কী কবো মা রে! শরীলটা যে আর বইছে না। এই কোমর থ্যাকে পা পর্যন্ত সগঘল জায়গায় যেন আগুন জ্বলে! রাতি ঘুমাইবার পারিনা গো মা। মাথাডাও কেমন যেন চক্কর মারে!”
‎​মেহুল ডায়েরিতে নোট করতে করতে পরম যত্নে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা দাদী, আপনার এই ব্যথাটা কি অনেক দিন ধরে? আর আপনি কি ঠিকমতো খাবার খান? নাকি খালি পেটে থাকেন সারাদিন?”
‎​বৃদ্ধা চোখ দুটো বড় বড় করে অনুযোগের সুরে বলে উঠলেন, “প্যাট খালি থুবো ক্যা মা? ওই ছাওয়ালডা যা এনে দেয়, দুটা ডাল-ভাত খাই তো! কিন্তুক কয়েকদিন ব্যাকে পেটডা কেমন জানি খামচা মারে। ভাত দেখলে আর রুচি হয় না। খালি বমি বমি লাগে!”

‎​মেহুল প্রেসক্রিপশন প্যাড এগিয়ে নিয়ে বৃদ্ধার পালস চেক করতে করতে আশ্বস্ত করে বলল—
‎​”আমি বুঝতে পেরেছি দাদী। আপনার শরীরে রক্তের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে, আর রক্তচাপও কিছুটা কম। আর পেটে মোচড় দেওয়া কিংবা বমি ভাবটা কিন্তু গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্যই হচ্ছে। তবে ডাক্তার হিসেবে আপনাকে একটা কড়া নির্দেশ দিচ্ছি—সকালে কিংবা রাতে কোনোভাবেই খালি পেটে থাকা চলবে না। ভাত খেতে ইচ্ছে না করলেও অন্তত একটু দুধ বা হালকা কোনো খাবার খেয়ে নেবেন, ঠিক আছে?”
‎​কথাটা বলেই মেহুল চটপট কয়েকটা দরকারি ট্যাবলেটের নাম আর একটা আয়রন সিরাপের নাম লিখে দিল। তারপর ডায়াগনোসিস শেষ করে বৃদ্ধার দুটো হাত নিজের দু-হাতের মুঠোয় চেপে পরম আদরে স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে বলল—
‎​”এই যে দেখুন, আমি প্রেসক্রিপশনে সব লিখে দিয়েছি। একটা গ্যাসের ওষুধ, আর একটা শরীরে শক্তি পাওয়ার সিরাপ। পাশের পাঁচ নম্বর কাউন্টারে গিয়ে এই কাগজটা দেখালেই একদম বিনামূল্যে সব ওষুধ পেয়ে যাবেন। প্রতিদিন সকালে আর রাতে নিয়ম করে খেয়ে নেবেন, একদম ফাঁকি দেওয়া চলবে না কিন্তু!”

‎​বৃদ্ধা মেহুলের এমন পরম মমতা আর আপন মানসিকতায় যেন মুগ্ধ হয়ে গেলেন! তিনি হাত দুটো তুলে মেহুলের মাথায় হাত রেখে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে দোয়া করে দিয়ে বললেন—
‎​”সোনার চাঁদ মা আমার! আল্লা তোকে লম্বা হায়াত দিক, অনেক বড় করুক! তোর মতো ভালো ডাক্তার যেন হরেক হাসপাতালে থাকে রে মা!”
‎​মেহুল পরম তৃপ্তিতে মুচকি হাসল। বৃদ্ধা লাঠি ভর দিয়ে ধীরপায়ে উঠে যেতেই, মেহুলের বুকটা এক গভীর আত্মতৃপ্তিতে ভরে উঠল।
‎বৃদ্ধা মহিলাটি চলে যেতেই মেহুল আবার ফাইল গুটিয়ে পেশেন্ট দেখায় মনোযোগী হলো।
‎​একটানা কাজ করতে করতে, দেখতে দেখতে বুথের সামনে আর বেশি ভিড় রইল না। মেহুল তার দুই সহযোগী নার্স শান্তা আর মরিয়মকে ডেকে হালকা ক্লান্ত হেসে জিজ্ঞেস করল, “আর কয়জন রোগী বাকি আছে দেখো তো?”

‎​শান্তা বুথের পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের লাইনে ভালোভাবে নজর বুলিয়ে বলল, “প্রায় শেষ, ম্যাম! আর মাত্র একজনই বাকি আছেন।”
‎​মেহুল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শান্তা আর মরিয়মকে উদ্দেশ্যে করে বলল, “তাহলে তোমরা দুজন আর দেরি কোরো না, যাও ক্যানটিন থেকে লাঞ্চটা সেরে নাও। আমি এই শেষ পেশেন্টটাকে দেখেই ব্যাগে ফাইল গুটিয়ে উঠছি।”
‎​মেহুলের কথা শুনে শান্তা আর মরিয়ম বিনয়ের সাথে সম্মতি জানিয়ে বুথ ছেড়ে লাঞ্চের দিকে চলে গেল।
‎​মেহুল তার শেষ রোগীকে ডেকে ভেতরে আনল। যত্ন নিয়ে তার শারীরিক সমস্যার কথা শুনে যথাযথ প্রেসক্রিপশন লিখে তাকে বিদায় দিল সে। টানা কয়েক ঘণ্টার মানসিক আর শারীরিক চাপের পর অবশেষে সব রোগী দেখা শেষ!
‎​মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়েই হালকা কুঁকড়ে গেল। একটানা এক জায়গায় বসে কাজ করায় তার ঘাড় আর কোমরে তীব্র ব্যথা জমেছে। সঙ্গে পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা মোচড় দিয়ে উঠছে। আর এক মুহূর্ত বসে থাকলে হয়তো কোমর একদম লক হয়ে যাবে!

‎​সে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে নিজের হ্যান্ডব্যাগ আর মোবাইলটা গুছিয়ে নিতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক অদ্ভুত সুন্দর, স্নিগ্ধ ও মিষ্টি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো—
‎​”এক্সকিউজ মি ডক্টর…!”
‎​মেহুল কারো কন্ঠ পেয়েও পেছনে ফিরল না, কারণ শরীর তখন চরম ক্লান্ত। সে ফাইল ব্যাগ গুছাতে গুছাতেই বেশ শান্ত কণ্ঠে বুঝিয়ে বলার মতো বলল, “পেশেন্ট দেখা আপাতত শেষ। আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে আর শরীরটাও ভালো লাগছে না। আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে, লাঞ্চ ব্রেকে খেয়ে এসে আপনাকে দেখব।”
‎​কিন্তু আগন্তুক মেয়েটি বেশ বিনয়ের সাথে অনুনয় করে বলে উঠল, “ডক্টর, প্লিজ! আমার খুব জরুরি তাড়া আছে। আপনি যদি দয়া করে এখনই একটু দেখে দিতেন… খুব উপকার হতো!”

‎​মেহুল হ্যান্ডব্যাগের জিপ টানতে টানতে হালকা বিরক্তি না দেখিয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বলল, “আমার পক্ষে এখন সত্যি বসা সম্ভব হচ্ছে না। আপনি এক কাজ করুন, আপনার সিরিয়ালের স্লিপটা আমাকে দিন। আমি পাশের বুথের ডাক্তারের নামে ট্র্যান্সফার করে সাইন করে দিচ্ছি, উনি আপনাকে এখনই আগে দেখে দেবেন।”
‎​কিন্তু মেয়েটি যেন নাছরবান্দা! সে বেশ জেদ ধরে মিষ্টি সুরে আবার বলে উঠল, “উহু! আমি পাশের কোনো ডাক্তারের কাছে যাব না। আমি আপনার কাছেই দেখাব, ডক্টর!”
‎​মেয়েটির এমন অদ্ভুত একগুঁয়েমি দেখে মেহুল না পেরে আবার একরাশ ক্লান্তি নিয়ে চেয়ারটায় বসে পড়ল। মুখে মৃদু বিরক্তির ছাপ থাকলেও কোমল কণ্ঠে হাত বাড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে, দিন আপনার স্লিপ। জলদি করুন।”
‎​মেয়েটি মেহুলের বাড়িয়ে দেওয়া খোলা হাতের তালুতে তার সিরিয়ালের স্লিপটা রাখল।
‎​মেহুল ক্লান্ত চোখে স্লিপের ওপর চোখ বোলাল। রোগীর নামের জায়গায় লেখা—’হুমা কায়সার’।
‎​মেহুল বিড়বিড় করে নামটি প্রথমবার উচ্চারণ করল, “হুমা কায়সার…”

‎​কিন্তু শব্দটা মুখ থেকে বের হতেই মেহুলের মস্তিষ্ক যেন এক লহমায় কেঁপে উঠল! বুকের ভেতর হঠাৎ কালবোশেখা ঝড়ের দোলাচল! সে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে স্লিপের দিকে আবার প্রখর দৃষ্টিতে তাকাল।
‎​হুমা কায়সার! নামটা মেহুলের হৃদয়ের অতল গহ্বরে খোদাই করা এক অতি পরিচিত, অতীত আর পরম ভালোবাসার নাম! ​মেহুল এবার ধীর গতিতে, অবিশ্বাস্য চোখে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাল।
‎​চোখ তুলতেই তার চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো এক হাস্যোজ্জ্বল, অপূর্ব সুন্দরী রমণীর পরিচিত মায়াবী মুখ! মেয়েটির ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে এক রাজকীয়, প্রাণখোলা চেনা হাসি!

‎​আকস্মিক চেহারাটা সামনে দেখে মেহুল মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ ও জমে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল! তার হাত থেকে প্রেসক্রিপশনের কলমটা খসে পড়ল টেবিলে। চোখের কোণে জমে উঠল একবুক বিস্ময় আর না বলা অজস্র অনুভূতির জল!
‎​কিন্তু পরক্ষণেই, স্তব্ধতা কাটিয়ে মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিরপ্রশান্তি আর আনন্দের মুক্তোঝরা হাসি!
‎​মেহুল এক সেকেন্ডও আর দেরি করল না! ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে টেবিলটা টপকে এক প্রকার দৌড়েই মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেল। মেয়েটিও হাসিমুখে দু-হাত মেলে দিতেই, মেহুল নিজের সমস্ত ক্লান্তি, অভিমান আর ব্যাকুলতা ভুলে হুমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল!
‎​যেন বহুকাল পর নিজের মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির দেখা পেয়েছে সে! দুই সখীর এই পরম ভালোবাসার আলিঙ্গনে বুথের ভেতরের বাতাসটুকুও যেন নিমিষেই এক অদ্ভুত আবেগে ভারী হয়ে উঠল!

‎মেহুল হুমাকে বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চেপে রাখল বেশ কিছুক্ষণ। কত দিন, কত বছর, কত মাস পর এই চেনা ছোঁয়া! বুকের ভেতর জমা হয়ে থাকা সব ক্লান্তি, হতাশা আর একাকীত্ব যেন এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।
‎​হুমাও মেহুলকে সমান আকুলতায় জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে হেসে উঠল, “আরে ডক্টর সাহেবা! বুকটা ভেঙে চুরে চুরমার করে দিবি নাকি? এত জোরে জড়িয়ে ধরছিস কেন!”

‎​মেহুল অবশেষে বাঁধন হালকা করল। কিন্তু হুমার দুটো হাত তখনও ছাড়েনি; পরম মমতায় নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে রাখল। চোখে জল আর ঠোঁটে হাসির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন নিয়ে হুমাকে আপাদমস্তক দেখে নেওয়ার মতো করে তাকাল সে।
‎​”তুই! তুই সত্যি এখানে?”—মেহুলের গলায় তখনও ঘোর আর চরম বিস্ময়।

‎​”না তো, আমার ভূত এসেছে তোকে ভয় দেখাতে!”—হুমা ডান চোখটি টিপ মেরে হাহা করে হেসে উঠল।
‎​মেহুল হুমার কাঁধে আলতো একটা চাপড় দিয়ে বলে উঠল, “ফাজিল একদম আগের মতোই আছিস! একটুও বদলাসনি। কিন্তু তুই হঠাৎ রাজশাহীতে কীভাবে?”
‎​হুমা মেহুলের হাত ধরে দুলিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে গাল ফুলিয়ে বলল, “সারপ্রাইজ দেব বলেই তো নামটা স্লিপে লিখে আড়ালে দাঁড়িয়েছিলাম! তা ছাড়া তুই তো মহা ব্যস্ত ডক্টর ম্যাডাম, মিষ্টি মিষ্টি কথায় অন্য রোগীদের আদর করছিলি আর আমাকে বলছিস—’পরে আসুন, এখন লাঞ্চ ব্রেক!’ তোর এই ভাবটা দেখার জন্যই তো এত নাটক করা!”

‎​কথাটা শুনে মেহুল খিলখিল করে হেসে ফেলল। কতদিন পর এমন মুক্তঝরা হাসি হাসল সে, নিজেই জানে না! হুমার দেখা পাওয়া যেন ওর পুরো দিনের বিষাদ এক লহমায় কাটিয়ে দিল।
‎​অতঃপর মেহুল হুমার গালে আলতো হাত ছুঁইয়ে আন্তরিক গলায় বলল, “কিন্তু সত্যি বলছি হুমা… তোকে দেখে আমার বুকের ভেতরের ভারটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। কতদিন পর তোর মুখটা দেখলাম বল তো? কতদিন তোর সাথে বসে একটু মন খুলে আড্ডা দেওয়া হয় না!”

‎​হুমার চোখের চাহনিও মুহূর্তের মধ্যে নরম হয়ে এলো। বন্ধুত্বের সেই পুরনো গভীরতা আর ভালোবাসা ঝরে পড়ল ওর চোখে। সে মেহুলের টিস্যু দিয়ে মোছা শুকনো গাল আর থমথমে চোখের কোণে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎​”আমি জানি মেহু… হয়তো আমরা কখনোই একে অপরের থেকে দূরে যেতাম না যদি না সেদিন….!
‎হুমার কথার মাঝেই ​মেহুল চটপট মুখে চঞ্চল হেসে বলল, “বাদ দে ওইসব!চল, অনেক হয়েছে বুথের ভেতরে ইমোশনাল কথা! পেটে এখন চরম ক্ষুধা। তুই কিন্তু আমার সাথে লাঞ্চ করবি, কোনো কথা শুনব না!”
‎​”তোর সাথে না খেয়ে যাচ্ছি কোথায়?” হুমা মেহুলের হাত চেপে ধরে দুষ্টুমি করে বলল, “তোর লাঞ্চের পুরো খাবারের অর্ধেক কিন্তু আজ আমিই খাব, বলে দিলাম!”
‎​দুই প্রিয় সখীর এমন প্রাণবন্ত হাসি আর খুনসুটিতে বিষাদমাখা দুপুরটা নিমিষেই আলোয় ঝলমল করে উঠল। দুজনে হাত ধরাধরি করে ক্যানটিনের দিকে পা বাড়াল—বহুদিন পর পুরনো বন্ধন নতুন করে খুঁজে পাওয়ার আনন্দে।

‎​ক্যানটিনের এক কোণে দুটো চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসল মেহুল আর হুমা। ছয় বছর পর দেখা, তাই খাবারের প্লেটে হাত চালানোর চেয়ে যেন কথা বলার ব্যাকুলতাটাই বেশি!
‎​মেহুল এক লোকমা ভাত মুখে দিয়ে উৎসুক চোখে হুমার দিকে তাকাল। গালে হাত দিয়ে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা হুমা, তুই জানলি কীভাবে যে আমি রাজশাহীর এই ক্যাম্পেইনে এসেছি?”

‎​হুমা গ্লাসে পানি ঢেলে এক চুমুক দিয়ে খেতে খেতে বলল, “আরে! গত পরশু আমার বাড়ির ওদিকের মোড়ে তোদের এই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের একটা বড় পোস্টার দেখেছিলাম। পোস্টারটা দেখে মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। আসবো আসবো ভাবছিলাম, কিন্তু শোরুমের ঝামেলার কারণে গত দুদিন আর একদম সময় হয়ে ওঠেনি। আজ ভাবলাম যেমন করেই হোক একবার ঢুঁ মেরে আসি। মাঠে ঢুকতেই গেটের কাছে তোদের পুরো ডক্টরস টিমের একটা বিশাল ব্যানার দেখলাম। ব্যানারে অন্যান্য ডাক্তারদের সাথে তোর ছবি দেখে তো আমি পুরোপুরি অবাক! নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না! তারপরই আর এক সেকেন্ড দেরি না করে তোকে খোঁজা শুরু করলাম, আর অবশেষে তুই আমার সামনে!”

‎​মেহুল একচিলতে শান্ত ও তৃপ্তির মুচকি হাসি হাসল, “বিশ্বাস কর, আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি তোর সাথে এভাবে আচমকা দেখা হয়ে যাবে!”
‎​হুমা খাবার চিবোতে চিবোতে হেসে বলল, “আই অলসো মেহু! আমিও ভাবিনি। তবে যা হয়, সব ভালোর জন্যই হয় বল?”
‎​খাবারের মাঝেই মেহুল আবার জানতে চাইল, “তা বল, তোর কী খবর? তুই হঠাৎ করে রাজশাহীতে কী করছিস? এখানে তোর জীবন কেমন কাটছে?”

‎​হুমা প্লেটে একটু ঝোল মাখাতে মাখাতে একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল, “বিগত দু-বছর ধরে আমি স্থায়ীভাবে এই রাজশাহীতেই আছি। তোকে তো আগেই বলেছিলাম, আমার নানুর বাড়ি এখানে। তাই এখানেই চলে আসি। বর্তমানে রাজশাহীতে আমার নিজের একটা বুটিক হাউস আছে। ওটা নিয়েই বেশ ভালো কেটে যাচ্ছে দিনগুলো।”
‎​মেহুল উৎসুক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “আর আঙ্কেল-আন্টি কেমন আছেন? উনারা কোথায়? একসাথে আছিস তো?”

‎​মেহুলের এই প্রশ্নটা শুনতেই হুমার চঞ্চল চেহারায় এক লহমায় বিষাদের কালছায়া নেমে এলো। খাবারের হাতটা প্লেটেই থমকে গেল তার।
‎​হুমা নিচু গলায়, ভাঙা কণ্ঠে বলল, “বাবা তো আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন রে মেহু… আর মা-ও সহ্য করতে পারেননি। এখানে আসার পর বছর দেড়েক আগে মা-ও মারা যান। মা-বাবা দুজনেই আজ আর নেই। তাই স্মৃতিঘেরা এই শহর ছেড়ে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না, এখানেই একা থেকে গেছি।”

‎​কথাটা শুনে মেহুলের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। খাবারের প্লেট থেকে হাত সরিয়ে সে দ্রুত টেবিলের ওপর থেকে হুমার হাতটা নিজের দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরল।
‎​মেহুলের নিজের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সে ব্যাকুল ও কোমল কণ্ঠে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “আই অ্যাম সো সরি হুমা… আমি সত্যি জানতাম না। আল্লাহ আঙ্কেল-আন্টিকে জান্নাতবাসী করুন। তুই একা এত কিছু সামলে নিয়েছিস, ভাবতেই পারছি না রে!”

‎​হুমা নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে কৃত্রিম এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল। মেহুলের হাতের ওপর উল্টো চাপ দিয়ে পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করল সে।
‎​হুমা এবার চোখ দুটো ছোট ছোট করে মেহুলের দিকে তাকিয়ে চেনা চঞ্চলতায় জিজ্ঞেস করল, “ছাড় তো আমার কথা! তোর খবর বল। তোর জীবন কেমন চলছে? আর আরমান? আরমানের কী খবর বল? সে তো তোর সাথে চট্টগ্রামেই আছে তাই না? বিয়ে সাদি করে নিয়েছিস কি”

‎কাছের বন্ধু হিসেবে আরমান আর মেহুলের গভীর প্রেম সম্পর্কে হুমা সব জানত। আরমান যে মেহুলকে কতটা ভালোবাসত, কতটা পজিসিভ ছিল—সবটাই হুমার চোখের সামনে ঘটেছিল।
‎​হুমানের মুখে ‘আরমান’ নামটা শুনতেই মেহুলের হাসিখুশি চেহারাটা নিমিষেই থমকে গেল। চোখে নেমে এলো একরাশ ক্লান্তি আর তিতা বিষাদ।
‎​মেহুল একটা তাচ্ছিল্যের মুচকি হাসি হেসে চোখ সরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “আরমান আর আমার সাথে নেই হুমা। ও আমাকে চিট করেছে। বিয়েটা ভেঙে গেছে আমাদের।”
‎​”কী বলছিস তুই?!” হুমা চোখ দুটো গোল গোল করে চরম ধাক্কা খেল, “আরমান তোকে চিট করেছে?! এ কীভাবে সম্ভব!”
‎​মেহুল করুণ হেসে বলল, “হ্যাঁ। ওর নাকি আমাকে এখন বয়স্ক নারীদের মতো লাগে! আমার পাশে চললে নাকি ওকে বেমানান দেখায়… তাই শেষ মুহূর্তে এসে বিয়ে করতে সোজা মানা করে দিল।”

‎​হুমার যেন কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না! সে একদম হতবাক ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। যে আরমান একসময় মেহুলকে নিয়ে এতটা উন্মাদের মতো পজিসিভ ছিল, যে মেহুলের একচিলতে হাসির জন্য পুরো দুনিয়া একপাশে সরিয়ে রাখতে পারত—সেই আরমান এতটা নিচে নামল কীভাবে?
‎​হুমা প্রায় চেঁচিয়ে ওঠার মতো গলায় বলে উঠল, “আরমান এমনটা কেন করল মেহু?! ও তো তোকে নিয়ে পাগলের মতো পজিসিভ ছিল! এত বছরের সম্পর্কটা ও এভাবে এক পলকে শেষ করে দিল?”

‎​মেহুল ঠোঁটের কোণে এক বিষাদের হাসি ফুটিয়ে হুমাকে বললো, মেহুল, ”ভালোবাসা হলো একটা মরণব্যাধি হুমা, যে পাওয়ার জন্য নিঃশ্বাসের মতো আকুল হয়, সে পায় শুধু শূন্যতা; আর যে কখনো পাওয়ার চেষ্টাও করে নি, তার ওপর অনায়াসেই ঝরে পড়ে ভালোবাসার শ্রাবণ। তাই দিনশেষে যে চায় সে পায় না, আর যে পায় সে চায় না।”

‎”আর সত্যি বলতে কি হুমা আমি এখন আর চাইনা। বিশ্বাস আর ভরসা ভালোবাসা শব্দটা থেকে উঠে গেছে আমার।”
‎”তাই বলে তুই এভাবেই ওই সয়তানটাকে ছেরে দিবি। হুমা প্রশ্ন করলো।”
‎এতোক্ষনে মেহুল বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো, “কে বলেছে ছেড়ে দিয়েছি। আমি ছার দিয়েছি ছেড়ে দেই নি।”
‎মেহুল আরো কিছু বলতে যাবে—ঠিক তখনই তাদের টেবিলের পাশে তড়িঘড়ি করে এসে দাঁড়াল মেহুলের সহকারী এক নার্স।
‎​নার্সটি বেশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ডক্টর মেহুল! আপনাকে এখনই একবার মেইন অ্যাডমিন বুথে যেতে হবে। ক্যাম্পের প্রধান সিনিয়র ডাক্তার স্যার আপনাকে জরুরি ডেকে পাঠিয়েছেন।”

‎​খাবারের মাঝেই এমন জরুরি ডাক পেয়ে মেহুল কথা থামিয়ে দিল। চটপট গ্লাসের পানিতে হাত ধুয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নিল সে।
‎​তারপর হুমার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু আন্তরিক গলায় বলল, “হুমা, স্যার ডাকছেন, আমাকে যেতে হচ্ছে। তুই প্লিজ কোথাও যাস না, আমার বুথে গিয়ে একটু বস। আমি কাজটা সেরেই আসছি, বাকি কথা ওখানে বসে হবে।”

‎​হুমা বিষাদ আর বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে না পেরে কেবল ধীরগতিতে মাথা নেড়ে সায় দিল, “ঠিক আছে মেহু, তুই যা… আমি তোর বুথেই অপেক্ষা করছি।”
‎​মেহুল আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত পদক্ষেপে প্রধান ডাক্তারের ডাকের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল।

‎মাঠের ঠিক বাইরে, কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় পার্ক করে রাখা গাঢ় কালো মার্সিডিজ গাড়িটির ভেতর তখন থমথমে নীরবতা।
‎​ড্রাইভিং সিটের পেছনের অংশে হেলান দিয়ে বসে ছিল সালমান শাহ নেওয়াজ। তাঁর হাতে থাকা একটি বিশেষ হাই-টেক রিমোট কন্ট্রোল স্ক্রিন। খালি চোখে দেখা যায় না, একেবারে একটি সাধারণ মাছির মতো ক্ষুদ্র ও অদৃশ্য এক ড্রোন ক্যামেরা তখন আকাশে ঘুরে বেড়াল এবং তার লেন্স দিয়ে মেহুলের প্রতিটি মুহূর্তের দৃশ্য সোজা ফুটিয়ে তুলছিল সালমানের স্ক্রিনে।
‎​গত কয়েক ঘণ্টা ধরে এই মাছির মতো ক্ষুদ্র ড্রোনের ক্যামেরায় কেবল একটি রূপসী প্রতিচ্ছবিই বন্দি হচ্ছিল—মেহুল!

‎​মেহুলের রোগীদের প্রতি গভীর মনোযোগ, বৃদ্ধার মাথায় হাত রাখা, কপালের ঘাম মোছা থেকে শুরু করে ওর প্রতিটা মিষ্টি এক্সপ্রেশন সালমান গিলে খাচ্ছিল তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো। মেহুলের এই কোমল রূপটাই সালমানের বিষাক্ত হৃদয়ে এক অন্যরকম উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়। ​কিন্তু হঠাৎ করেই সালমানের হাতের স্ক্রিনের দৃশ্যপট বদলে গেল!
‎​লাঞ্চ ব্রেকে মেহুল যখন ক্লান্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এক অচেনা মেয়ে বুথে ঢুকে মেহুলের সাথে কথা বলতে শুরু করল। অনুনয়-বিনয়, আর তারপর… হঠাৎ করেই অচেনা মেয়েটার দেওয়া স্লিপটা পড়া মাত্রই মেহুলের দৌড়ে গিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরা!
‎​স্ক্রিনের ওপাশে দৃশ্যটা দেখা মাত্রই সালমানের প্রখর চোখের চাহনি কঠিন হয়ে উঠল। যে মেয়ে নিজের ছায়াকেও সহজে কাছে ভিড়তে দেয় না, সে এই অচেনা মেয়েটাকে দেখে কতটা চঞ্চল আর আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরল! মেহুলের মুখে সেই মেয়েটার জন্য মুক্তোঝরা মিষ্টি হাসি দেখে সালমানের কৌতুহলের আর কোনো সীমা রইল না।

‎”কে এই মেয়ে? মেহুলের এত কাছের মানবী হয়ে হঠাৎ মাঝপথে উড়ে এসে জুড়ে বসল কে?”
‎​সালমান এক ঝটকায় হাত থেকে রিমোটটা ড্যাশবোর্ডে ছুঁড়ে মারল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবি সালমানের এই গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ রূপ দেখে মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে গেল।
‎​সালমান চোখ দুটো ছোট ছোট করে, ঠাণ্ডা বরফশীতল কণ্ঠে আদেশ ছুড়ল—
‎​”রবি! ওই মেয়েটা কে, অপ্সরার সাথে ওর কী সম্পর্ক, চৌদ্দগোষ্ঠীর ঠিকানাসহ সব বায়োডাটা যেন আজ রাতের মধ্যে আমার টেবিলের ওপর থাকে! একটা তথ্য যেন মিস না হয়!”

‎​রবি মাথা নিচু করে বিনীত গলায় বলল, “জি ভাই, আজ রাতের মধ্যেই সব ইনফরমেশন পেয়ে যাবেন।”
‎​ঠিক তখনই সালমানের আইফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোন বেজে উঠল। পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সালমানের বিরক্তির চরম সীমায় মুখটা কুঁচকে গেল। ​স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠেছে—’মহামান্য এমপি সাহেব’ (বাবা)!
‎​সালমান কয়েক সেকেন্ড রিং হতে দিল। কলটা কেটে দেবে নাকি রিসিভ করবে—দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকে অবশেষে বিরক্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ক্রিনটা সোয়াইপ করে কানে ধরল।
‎সাথে সাথেই ​ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে মিনহাজ শাহ নেওয়াজের কন্ঠ ভেসে উঠলো, “জলদি অফিসে আসো!

‎পার্টি অফিসে দ্রুত উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ পেতেই সালমান আর এক মুহূর্ত সহ্য করল না। সে ওপাশের কথা শেষ হওয়ারও সুযোগ দিল না—হুট করে এক ঝটকায় কলটা কেটে দিল! ​মোবাইলটা আবার পকেটে গুঁজতে গুঁজতে সালমান গাড়ির বাইরে থাকা তার লোক কবিরের দিকে একঝলক প্রখর দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর গম্ভীর ও কড়া কণ্ঠে নির্দেশ দিল—
‎​”কবির! তুই এখানেই থাকবি। এক মুহূর্তের জন্যও যেন মেহুলের ওপর থেকে নজর না সরে! মেহুল বুথ থেকে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে কথা বলছে—প্রতি সেকেন্ডের আপডেট আমার চাই। আর যদি কোন কিছুর নড়চড় হয় তবে…..!”

‎​কথাটা শেষ করেই সালমান গাড়ির পেছনের সিটে বসল। দরজার লক আটকে ড্রাইভারকে গাড়ি পার্টি অফিসের দিকে ছোটানোর নির্দেশ দিল। কয়েক সেকেন্ডর মাঝেই ​মার্সিডিজটি ঝড়ের বেগে ধুলো উড়িয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সালমান গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল—বাবার ডাকে পার্টি অফিসে যেতে হলেও তার চিন্তা ও মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখন কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে তার সেই নির্দিষ্ট ‘অপ্সরা’।
‎​হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়াই সালমান খিলখিল করে হেসে উঠল! এমন ঠান্ডা মাথার, রুক্ষ স্বভাবের একজন মানুষের মুখে এই আকস্মিক হাসি দেখে ড্রাইভিং সিটে বসা রবি রীতিমতো বিষম খেলো! সে গাড়ি চালাতে চালাতে চমকে পেছনের দিকে তাকাাল, আর সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসা ধ্রুবও এক পলকে ঘুরে তাকাল সালমানের দিকে।

‎হঠাৎ ​তাদের আরও একধাপ অবাক করে দিয়ে সালমান গুনগুন করে গেয়ে উঠল—
‎​”তোকে একার দেখার লুকিয়ে কি মজা
‎সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না
‎তোকে চাওয়ার পাওয়ার নয় রে সোজা
‎সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না।”

‎​সালমানকে সবাই চেনে এক শক্ত, মজবুত, কাঠখোট্টা মানুষ হিসেবে—যার কথা, ব্যক্তিত্ব আর চোখের ভাষা সামনে থাকা মানুষের প্যান্ট ভেজাতে যথেষ্ট। কিন্তু আজ সেই মানুষটা একটা মেয়ের জন্য দিনে দিনে যেভাবে উন্মাদ হয়ে উঠেছে, তা যেন তার খোলসটার সাথে বিন্দুমাত্র যায় না। কোন মেয়ের জন্য সে আজ নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে এসব পাগলামি করছে, তা ভাবলেই রবি আর ধ্রুবর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে!
‎​অতঃপর একসময়ে সালমান চোখ খুলল। দেখল, রবি রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে আছে আর ধ্রুব হা করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
‎​সালমান বাঁকা একটা ভ্রু উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ সুরে ইশারা করল, “কী ব্যাপার?”

‎​ধ্রুব হকচকিয়ে নিজের চোখের চশমাটা ঠিক করে তড়বড় করে বলে উঠল, “আ… মানে ভাই, আপনি গুলি চালানো বাদ দিয়ে কবে থেকে গান গাওয়া শুরু করলেন?”
‎​সালমান ঠান্ডা চোখে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “কেন? তোর কি এখনই গুলি খাওয়ার সাধ জেগেছে নাকি?”
‎​ব্যাস! ওই এক বাকিতেই ধ্রুবর কুলুপ এঁটে গেল। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে সটকে সোজা হয়ে নিজের সিটে চুপটি মেরে বসে পড়ল।
‎​গাড়ির ভেতর ফের পিনপতন নীরবতা নেমে এল। কিন্তু বেশিক্ষণ সেই নীরবতা টিকল না। একটু পরেই ধ্রুব কেমন যেন অস্বস্তি নিয়ে আবার গলা ঝেড়ে বসল।
‎​”ভাই… একটা প্রশ্ন করি?”

‎​সালমান তখন গাড়ির ডার্ক শেডের কাঁচের বাইরে তাকিয়ে আনমনা। সে সিটে হেলান দেওয়া অবস্থাতেই উদাসীন গলায় বলল, “হু বল।”
‎​ধ্রুব একটু ইতস্তত করে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনার কাছে ভালোবাসা মানে আসলে কী?”
‎​সালমানের মুখটা আবার কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল। সে মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ নীরব হয়ে রইল। চোখের পলকহীন দৃষ্টি বাইরের ধূসর রাস্তার দিকে স্থির।
‎​পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, রহস্যময় বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে ভারী ও গম্ভীর গলায় বলল—
‎​”ভালোবাসা হলো এমন এক প্রার্থনা, যেখানে সমর্পণে মিলবে জয়, আর ত্যাগ করলেই ঘটবে নিশ্চিত পরাজয়। তাই ভালোবাসায় ত্যাগী নয়, চির-সমর্পিত হই।”
‎​কথাটা শোনার পর রবি আর ধ্রুব দুজনেই আর একটি টু শব্দও করল না। সালমানের এই অদ্ভুত ফিলোসফি আর উন্মাদনা যে সামনে এক ভয়ানক ঝড়ের আভাস দিচ্ছে, তা তারা বেশ ভালোই টের পাচ্ছিল!

‎মেহুল মেইন অ্যাডমিন বুথে গিয়ে পৌঁছাতেই দেখল, সেখানে সিনিয়র ডাক্তারের সাথে মেডিকেল টিমের আরও ক’জন ডাক্তার উপস্থিত আছেন। তাঁদের মাঝে বসে আছেন এক মাঝবয়সী লোক—পরনে সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে গামছা, আর চোখেমুখে সহজ-সরল গ্রামের মানুষের অমায়িক ছাপ। দেখে মনে হয় রাজশাহীর কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের মাতব্বর গোছের কেউ।
‎​মেহুল ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রধান ডাক্তার হাসিমুখে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “এসো ডক্টর মেহুল! ইনি হলেন আমাদের দাস বাবু। পাশের প্রত্যন্ত এলাকার চেনা মুখ।”

‎​মেহুল স্বভাবসুলভ বিনীত ভঙ্গিতে নমস্কার জানিয়ে বলল, “শুভ অপরাহ্ন, দাস বাবু।”
‎​প্রধান ডাক্তার টেবিলের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, “মেহুল, উনি মূলত একটি বিশেষ আরজি নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন।”
‎​”কীসের আরজি, স্যার?” মেহুল উৎসুক চোখে প্রশ্ন করল।
‎​ডাক্তার স্যার দাস বাবুর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “উনি কী চান, বরং ওনার মুখ থেকেই শুনে নাও।”
‎​মেহুল দাস বাবুর দিকে তাকাতেই তিনি বিনয়ের সুরে হাত দুটো জোড় করে আর্জি জানানোর মতো বলে উঠলেন—
‎​”মা গো! আমি বড় আশা নিয়া শহর থ্যাকে ডাক্তারবাবুদের কাছে আইছি। আমাদের গ্রামটা রাজশাহী শহর থ্যাকে প্রায় তিন-চার ঘণ্টার দূরের পথ। গাঁয়ে একটা আশ্রম চালাই গো মা, যেখানে অনেক অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, ছোট ছোট ছাওয়াল-মেয়ে আর গর্ভাবস্থার প্রসূতি মায়েরা আছে। এত দূরে থ্যাকে ওদের পক্ষে এই শহরে এসে চিকিৎসা নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব লয় মা! আপনারা যদি আপনাদের মেডিকেল টিমের ছোট একটা অংশকে আমাদের ওই প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠান, তবে ওখানকার শয়ে শয়ে অসহায় মানুষগুলা চিকিৎসা পাইত!”

‎​দাস বাবুর আকুল মিনতি শুনে উপস্থিত দু-একজন সিনিয়র ডাক্তার একটু অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে উঠলেন—
‎​”কিন্তু এত দূরে এই মফস্বল এলাকায় কীভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব বলুন তো? গ্রামটা তো অত্যন্ত দুর্গম! শুনেছি ওদিকে ট্রেন ছাড়া যাতায়াতের কোনো ভালো ব্যবস্থা বা রাস্তাঘাট পর্যন্ত নেই। গাড়ি নিয়ে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই সেখানে। এত ঝুঁকি নিয়ে টিম পাঠানো কী ঠিক হবে?”

‎​সবাই যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, প্রধান ডাক্তার তখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যেষ্ঠ ডাক্তারের সাথে একটু পরামর্শ করে মেহুলের দিকে ফিরলেন। সিনিয়র ডাক্তার মেহুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
‎​”ডক্টর মেহুল, তুমি কি তোমার দল নিয়ে ওই প্রত্যন্ত গ্রামে যাওয়ার দায়িত্বটা নিতে পারবে? তুমি রাজি থাকলে তবেই টিম পাঠানো সম্ভব।”

‎​মেহুল একমুহূর্ত থমকে দাস বাবুর দিকে তাকাল। লোকটার চোখেমুখে অসহায় মানুষের সেবা পাওয়ার আকুল আবেদন। ডাক্তারির পেশায় আসার প্রথম দিনেই শপথ নিয়েছিল—মানুষের জীবন বাঁচানো আর নিঃস্বদের পাশে দাঁড়ানোটাই সবকিছুর ওপরে, পরম ধর্ম। সেই আদর্শ মনে রেখেই মেহুল দ্বিধাহীন কণ্ঠে, স্পষ্ট গলায় জবাব দিল—
‎​”অবশ্যই স্যার! আমি আমার টিম নিয়ে দাস বাবুর গ্রামে যেতে একদম প্রস্তুত। মানুষের সেবার চেয়ে বড় তো আর কিছু হতে পারে না।”

‎​মেহুলের ইতিবাচক উত্তর শুনে দাস বাবুর চোখ দুটো খুশিতে ছলছল করে উঠল। কিন্তু ​প্রধান ডাক্তার তখন দাস বাবুকে সতর্ক করে হেসে বললেন, “শুনুন দাস বাবু, আমাদের তরুণ ডাক্তাররা কিন্তু আপনার সাথে যাচ্ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসা শেষে ওদের সবাইকে সম্পূর্ণ সহি-সালামতে, নিরাপদে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু আপনার!”

‎​দাস বাবু বুকে হাত রেখে সহাস্যে ওয়াদা করলেন, “আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না ডাক্তারবাবু! আমার জান থাকতে ডাক্তার মা-বোনদের কোনো ক্ষতি হইতে দেব না। আমি সব ব্যবস্থা সামলে নেব।”
‎​অতঃপর দাস বাবু ডাক্তারদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন।
‎​মেহুলও প্রধান ডাক্তারের সাথে জরুরি বিষয়গুলো বুঝে নিয়ে আবার নিজের কাজের জায়গায় ফিরে এলো। দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যার কোঠায় পৌঁছাল। একনাগাড়ে রোগী দেখতে দেখতে বেলা শেষ।
‎​হুমা প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা আগেই মেহুলকে জানিয়ে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল। তবে যাওয়ার আগে কড়া ভাষায় বলে গেছে সে আবার ফিরে আসবে, কারণ মেহুলকে সে কিছুতেই সরকারি কোয়াটারে থাকতে দেবে না; নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে নিজের ঘরেই রাখবে! মেহুল বহুবার বারণ করেছিল যে তাকে সুন্দর কোয়াটার দেওয়া হয়েছে, অহেতুক ঝামেলা করার দরকার নেই। কিন্তু হুমায়ূনের মেয়ে হুমা কি কারো কথা শোনে? ছয় বছর পর বেস্ট ফ্রেন্ড তার শহরে আসবে আর সে কোয়াটারে রাত কাটাবে—এ কথা হুমা কোনোভাবেই মেনে নিতে নারাজ! অবশেষে বন্ধুত্বের ভালোবাসার কাছে মেহুলকে মাথা নত করতেই হলো।

‎​সব রোগী দেখা শেষে মেহুল আজকের মতো কাজ গুটিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ডায়াস থেকে বের হয়ে এলো। মাঠের তোরণের কাছে আসতেই দেখল, একটা সুন্দর প্রাইভেট কারের ভেতরে বসে হুমা তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে!
‎​মেহুল হাসিমুখে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। গাড়ির কাছাকাছি হতেই হুমা ভেতর থেকে লক খুলে দরজাটা মেলে ধরল।
‎​মেহুল প্যাসেঞ্জার সিটে বসতেই হুমা গাড়ি স্টার্ট দিল। মেহুল সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আগে কিন্তু কোয়াটারের দিকে চল, আমার ব্যাগপত্র সব তো রুমে রাখা আছে। ওগুলো নিয়ে তবে তোর বাড়ি যাব।”

‎​হুমা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল, “একবার পেছনের সিটে তাকিয়ে দেখ তো, ডক্টর সাহেবা!”
‎​মেহুল অবাক হয়ে পেছনের সিটে তাকাতেই দেখে—তার সব ট্রাভেল ব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগ সুন্দর করে রাখা আছে!
‎​মেহুল চোখ গোল গোল করে হুমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে! এগুলো তুই কখন আনলি? আমার রুমের চাবি তো আমার কাছে ছিল!”

‎​হুমা মুচকি হেসে চটপটে গলায় বলল, “তুই যখন দুপুরে রোগী দেখতে ব্যস্ত ছিলি, তখনই তোদের সহকারীর কাছ থেকে কোয়াটারের অ্যাড্রেস আর কেয়ারটেকারের ইনফো বের করে নিয়েছিলাম! ব্যাগে হাতও দিতে হয়নি, সব প্যাক করাই তো ছিল। তাই নিয়ে চলে এলাম! এখন আর কোনো অজুহাত চলবে না, সোজা আমার সাথে আমার ডেরায় যাবি। রাতে জম্পেশ একটা আড্ডা আর রিল্যাক্স ডে হবে!”

‎​মেহুল বন্ধুর এমন ছকে বাঁধা প্ল্যান দেখে হেসে ফেলল আর মাথা নাড়ল। সাথে সাথে ​হুমাও তার গাড়িটি মেইন রোডে তুলল। কিন্তু তারা কেউই টের পেল না, গাড়ির পেছনে কয়েক হাত দূরত্ব বজায় রেখে একটা ভারী ব্ল্যাক বাইকে চেপে বডিগার্ডের মতো পিছু নিয়েছে কবির! সালমানের কড়া নির্দেশ—প্রতি সেকেন্ডের আপডেট চাই। কবির যেন নিজের বসের আদেশের প্রতিটা শব্দ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার পণ নিয়ে ছায়ার মতো পিছু ধাওয়া করছে!

‎নিজেদের ঘিঞ্জি আর ছোটখাটো ঘরটার স্যাঁতসেঁতে খাটের ওপর নিথর হয়ে বসে আছে আরমান।
‎​দিনকাল তার একদমই ভালো ঠেকছে না। জীবনের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন নিয়ে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে কেবল আফসোসের দাহে পুড়তে হয় তাকে। কী ছিল তার জীবন, আর সে নিজের হাতে কী বানিয়ে ফেলল! একসময় মেহুলের ভালোবাসার সুশীতল ছায়ায় কত রাজকীয়, শান্ত আর পরিপাটি ছিল তার প্রতিটি দিন। আর আজ?
‎​সংসারের চাকা তো থমকেই গেছে, তার ওপর বাড়ির নিত্যদিনের মানসিক যন্ত্রণা যেন এখন কালসাপের মতো তাকে কামড়ে ধরেছে। মা সুমনা বেগম আর বউ আনিকার মধ্যে পারিবারিক অশান্তি প্রতিদিনের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেদের জাহির করতে দুজনে এমন ভাব করে, যেন শাশুড়ি-বউয়ের এমন মধুর সম্পর্ক দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই! কিন্তু ঘরের চৌকাঠ পার হলেই আসল চেহারার কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে। সারাদিন ঝগড়াঝাঁটি, কাদা ছোড়াছুড়ি আর কড়া গলার চিল-চিৎকার লেগেই আছে। ​এই যেমন এখনো! ড্রয়িংরুমে দুই নারীর চিৎকার-চেঁচামেচির পারদ চড় চড় করে উঠছে। আরমানের মেজাজ চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। মাথার ভেতরের রগগুলো যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম! মাঝে মাঝে আরমানের তীব্র ইচ্ছে করে—এই দুটো অপদার্থ, কুটিল মানুষকে নিজের হাতে খুন করে ফেলতে! কারন এদের প্ররোচনায় তো তার এমন দিন দেখতে হচ্ছে।

‎এদিকে ​বিগত তিন দিন ধরে হসপিটালের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় বসে থেকেও মেহুলের বিন্দুমাত্র দেখা মেলেনি। চাকরি-বাকরি সব গেছে, মাথায় এখন না আছে কোনো ভবিষ্যতের দিশা, না আছে একটা উপার্জনের পথ। শূন্য পকেট আর তছনছ হয়ে যাওয়া জীবন নিয়ে যখন সে অন্ধকার দেখছে, ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে সুমনা বেগমের তীব্র ও কটু কণ্ঠস্বর আছড়ে পড়ল—
‎​”কেন যে মরতে এই বেয়াদব, ঝগড়ুটে মেয়েটাকে ঘরে তুললি আরমান, সেটাই আমি ভেবে পাই না! রূপ দেখে কি আমি ধুয়ে পানি খাব? বাপের বাড়ি থেকে একটা ফুটো পয়সাও আনতে পারে না, অথচ মুখে তেজ কত্ত! আমার তো জীবনটাই তছনছ হয়ে গেল রে!”

‎​বলতে বলতে সুমনা বেগম গজরাতে গজরাতে আরমানের ঘরে এসে ঢুকলেন। ছেলের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে ত্যাক্ত-বিরক্ত গলায় বলে উঠলেন—
‎​” এরে বিয়ে করছিলি তো করছিলি, এর বদলে মেহুলকেই অন্তত আগে বিয়েটা করে নিতি! মেয়েটা না হয় তোর পছন্দ ছিল না, কিন্তু ওর বাবার অত বিশাল সম্পত্তিগুলা তো অন্তত হাতের মুঠোয় পাইতি! সম্পত্তি পকেটে পুরে ডিভোর্স দিয়ে না হয় পরে এই সাদা চামড়ার রূপবতীকে ঘরে তুলতি! একটু বুদ্ধি-শুদ্ধিও কি মাথায় জোটে না তোর?”

‎​সুমনা বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই ড্রয়িংরুম থেকে চণ্ডীর মতো তেড়ে এলো আনিকা!
‎​হাতে থাকা স্টিলের গ্লাসটা সশব্দে টি-টেবিলে আছাড় মেরে চিৎকার করে উঠল সে, “আসছেন আমার কুবুদ্ধির মহাসাগর! আপনার সোনা মানিক মেহুলকে বিয়ে করে, তার সম্পত্তি হাতিয়ে ডিভোর্স দিয়ে আবার আমাকে এসে বিয়ে করত? বাহ্! সবকিছু কি এতই সহজ মনে হয় আপনার, অ্যাঁ? আমাকে কি আপনার ওই বোকা, অবলা মেহুল মনে হয় যে সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে ছেড়ে দেব? আমার সাথে এমন শয়তানি করতে এলে হাড়গোড় একটাও আস্ত রাখতাম না! একদম জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বো”

‎​সুমনা বেগমও ছাড়ার পাত্রী নন! মুখ বাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “মুখ সামলে কথা বলবি আনিকা! বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই শিক্ষা তো তোর বাপের ভিটেয় ছিল না! তোকে ঘরে তুলে আমার সংসারটা আজ জাহান্নাম হয়ে গেছে!”
‎​আনিকা কোমর বেঁধে পাল্টা তোপ দাগল, “সংসার তো আপনার কুটিল মনটার জন্যই জাহান্নাম হয়েছে! নিজের ছেলেকে তো লোভী বানিয়েছেনই, এখন এসে আমার ওপর দোষ চাপাচ্ছেন?”

‎​একজন একটা কটু কথা বললে অন্যজন দশটা বিষাক্ত উত্তর ফিরিয়ে দিচ্ছে! ​মেঝেতে বসে মাথা চেপে ধরল আরমান। এগুলো শুনতে শুনতে সে এখন অভ্যস্ত, কোনো প্রতিবাদ করার শক্তিও তার অবশিষ্ট নেই। নিজের অহংকার, উপচে পড়া লোভ, আর কেবল নারী শরীরের বাহ্যিক রূপ ও মোহের পেছনে অন্ধ হয়ে দৌড়াতে গিয়ে সে যে নিজের হাতে নিজের সুন্দর জীবনটা বিষাক্ত নরকে পরিণত করেছে—তা ভেবে আজ নিজের ভাগ্যকেই গালি দিতে মন চায়।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৩

‎অতঃপর ​দুই বিষাক্ত নারীর চেঁচামেচি আর কুৎসিত লড়াই সইতে না পেরে আরমান ধড়ফড় করে খাট থেকে উঠে দাঁড়াল। ওদের দিকে একঝলক চরম ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে সে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে এক কাপড়ে ফুটপাতে নেমে গেল।
‎​নিজের তৈরি ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা এই চরম অপমানের জীবনটা এখন তাকে প্রতি পদক্ষেপে চাবুক মারছে—যা দেখলে হয়তো মেহুল নয়, নিয়তি নিজেও বুঝি একপাশে দাঁড়িয়ে উপহাসের অট্টহাসি হাসছে!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫