Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫
‎আফীফা আফনান

‎​হুমার সুবিন্যস্ত ও পরিপাটি ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে তখন হালকা আলোর নরম আবেশ।
‎​হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে দুজন পাশাপাশি গিয়ে বসল সোফায়। ট্রলি থেকে ধোঁয়া ওঠা দুটো কফির কাপের মধ্যে একটি মেহুলের দিকে এগিয়ে দিতে দিতেও হুমার মাথায় কেবল আরমানের সেই বিষাক্ত দম্ভ আর মেহুলের জীবনের করুণ পরিণতিটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল।
‎​হুমা কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে মেহুলের চোখের দিকে একদম সোজাসুজি তাকাল। ওর কণ্ঠে ফুটে উঠল একরাশ কৌতুহল আর সীমাহীন ব্যাকুলতা—
‎​”তোর কথাগুলো আমার কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না মেহু! তুই এতটা সিওর কীভাবে যে তুই কখনো মা হতে পারবি না? ডাক্তার হিসেবে তো তোর ভালো করেই জানার কথা—মেডিকেল সায়েন্সে অলৌকিক বলে অনেক কিছু হয়! তোর কি কোনো জন্মগত শারীরিক জটিলতা আছে? নাকি কখনো কোনো বড় রোগ হয়েছিল তোর? অথবা পেটে বা জরায়ুতে কখনো কঠিন কোনো আঘাত পেয়েছিস?”

‎​হুমার একের পর এক প্রশ্ন আর উদগ্রীব আকুতি শুনে মেহুল বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং তার চেহারায় এক চরম নির্লিপ্ত ও বরফশীতল স্বাভাবিকতা খেলা করে গেল।
‎​মেহুল কফির কাপটা হাতে নিয়ে ঠোঁটে ফিকে হাসি ফুটিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল—
‎​”জন্মগত কোনো সমস্যা ছিল না হুমা। তবে হ্যা আমি একবার এক্সিডেন্ট করেছিলাম। ঘটনা ঘটেছিল আমি যখন হাইস্কুলে পড়ি… তখন।”

‎​হুমা উৎসুক হয়ে একদৃষ্টিতে মেহুলের দিকে চেয়ে রইল।
‎​মেহুল একটা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীতের সেই কালো দিনটার কথা মনে করে বলতে লাগল—
‎​”স্কুল থেকে ফেরার পথে মারাত্মক একটা রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল আমার। প্রায় বেশ কিছুদিন তার জন্য আমাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। সেদিন গাড়ির ধাক্কায় আমার পেট আর কোমরের অংশে ভয়াবহ আঘাত লেগেছিল। শরীরের ওপরের ক্ষতগুলো তো ধীর ধীরে শুকিয়ে গেল, আমি সুস্থও হয়ে উঠলাম। কিন্তু সেই সুস্থ হওয়ার পর থেকেই মাঝে মাঝেই আমার পেটের তলদেশে তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণা হতো। সহ্য করতে না পেরে কত যে কেঁদেছি!”

‎​একটু থেমে মেহুল আবার বলতে শুরু করল—
‎​”আমার ওই যন্ত্রণা দেখে একদিন সুমনা ফুপি আর মিনারা মণি আমাকে চট্টগ্রামের এক বড় হসপিটালে নিয়ে যান। সেখানে একটার পর একটা টেস্ট, আল্ট্রাসনোগ্রাম আর জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হলো। রিপোর্টগুলো হাতে আসার পর ডাক্তার সরাসরি আন্টিদের জানান—সেই কঠিন অ্যাক্সিডেন্টের ভেতরের আঘাতেই আমার ইন্টারনাল প্রজনন অঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। যার কারণে আমি আর কখনো মা হতে পারব না…”

‎​মেহুল অত্যন্ত সাধারণ একটা অভিজ্ঞতার মতো কথাগুলো বলে থামল। যেন নিজের এত বড় এক করুণ নিয়তির কথা বলতেও আজ তার বুক আর কাঁপে না!
‎​মেহুলের এমন শান্ত ও স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনে হুমা ভেতরের সব অনুভূতি হারিয়ে মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল! তার হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম। তার হাসিখুশি, চঞ্চল বান্ধবীর ওপর দিয়ে যে এত বড় ঝড়ের তোলপাড় বয়ে গেছে, তা ভেবে হুমার নিজের বুকটাই যেন এক তীব্র বেদনায় মুচড়ে উঠল! কিন্তু তারপরেও সেই সাথে হুমার মন যেন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। তাই সে কফির কাপটা সামনের টি-টেবিলে রেখে মেহুলের দিকে আরো কিছুটা ঝুঁকে বসল। হুমার চোখদুটো তখন গভীর সংশয় আর খটকায় ভরপুর।

‎”আচ্ছা মেহু, তুই কি আর কখনো নিজ থেকে কোনো ডাক্তার দেখিয়েছিস?”
‎​মেহুল কফিতে শেষ চুমুক দিতে দিতে শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল, “না।”
‎​ভ্রু কুঁচকে হুমা বলে উঠল, “কেন? এত বড় বোকামি কেন করলি তুই? তোর অন্তত নিজের স্বার্থেই একবার ডাক্তার দেখিয়ে সবটা কনফার্ম হয়ে নেওয়ার দরকার ছিল না?”

‎​মেহুল হাতের কফির কাপটা টেবিলে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকচাপা কষ্টটা এবার যেন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে।
‎​সে ম্লান কণ্ঠে বলল, “নাহ দরকার ছিলো না, কারন এই একটা ‘বাচ্চা’ শব্দটা নিয়ে আমার জীবনে যে পরিমাণ তিক্ততা আর অভিশাপ নেমে এসেছে, এরপর আর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাহস হয়নি রে! জানিস, এই একটা ‘বন্ধ্যা’ তকমা আমার সমস্ত যোগ্যতা, আমার সম্মান, আমার পরিচয়—সবকিছু যেন কেড়ে নিচ্ছে। কত মানুষের অপমান আর কটু কথা যে আমাকে হজম করতে হয়েছে! আর সবচাইতে বড় কথা, এই চরম তিক্ততাগুলো আমাকে আমার কাছের মানুষগুলোই উপহার দিয়েছে। তাই আর কখনো সাহস হয়নি, ইচ্ছেও করেনি। সত্যি বলতে কী হুমা… আমি আর কোনো বাচ্চা-কাচ্চা বা এসবের ঝামেলায় জড়াতে চাই না। যেমন আছি, একাই দিব্যি ভালো আছি। এভাবেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।”

‎​মেহুলের এই কথাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর ক্ষত আর নিঃসঙ্গতার রূপটা হুমা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারল। সে আর জোর করে মেহুলকে বেশি কিছু বলল না। কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে অতিরিক্ত বোঝাতে গেলে মেহুলের ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলো আরও উথলে উঠবে। ​তাই হুমা আর কথা বাড়াল না, হালকা পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল রাতের খাবারের আয়োজন করতে।
‎হুমা যেতেই ​মেহুল ড্রয়িংরুমে বসে কফি শেষ করে কাপটা সাইড টেবিলে রাখল। তারপর আরাম করে হেঁটে হুমার পুরো ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।
‎​শহরের এক অভিজাত ও সুন্দর সোসাইটির ১২ তলা বিশিষ্ট আধুনিক বিল্ডিংয়ের আট তলায় হুমার এই ফ্ল্যাটটি অবস্থিত। এটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব কেনা বাড়ি। এত বড় একটা ফ্ল্যাটে মেয়েটা একা থাকে, অথচ একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় সে কতটা নিখুঁত ও গুছিয়ে থাকতে ভালোবাসে।

‎লিভিং রুমের কর্নারে ইনডোর প্ল্যান্টস, দেওয়ালে নান্দনিক সব পেইন্টিং, ড্রয়িংরুমের মার্বেল ফ্লোর থেকে শুরু করে প্রতিটা কোণ পরিপাটি করে সাজানো। কোথাও একচিলতে অযত্ন বা অবহেলার ছাপ নেই। একা থেকেও মেয়েটা নিজের জগতটাকে কত সুন্দর আর চমৎকার করে গুছিয়ে রেখেছে—তা দেখে মেহুলের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে গেল।

‎হুমার পরিপাটি ঘরগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে মেহুল একসময় ড্রয়িংরুম ঘেঁষা বিশালাকার ঝুলন্ত বারান্দাটার দিকে পা বাড়াল। কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা সরাতেই এক পশলা হিমশীতল বাতাস এসে তার চুলে, মুখে আছড়ে পড়ল।
‎​আট তলার এই উঁচুতে হালকা ঝিরঝিরে হাওয়ার পরশ যেন মেহুলকে মুহূর্তের মধ্যে আচ্ছন্ন করে ফেলল। সে একহাতে বারান্দার রেলিংটা শক্ত করে ধরে ওপর থেকে আলোয় ঝলমল করা রাজশাহী শহরের নৈশরূপটা উপভোগ করতে লাগল।
‎​রাতের নিস্তব্ধতায় মায়াবী এই শহরের সৌন্দর্য যেন এক অন্য মাত্রায় রূপ নেয়। ওপর থেকে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোর সারি, শান্ত পদ্মা নদীর অবাধ্য বাতাসের দোলা আর শান্ত স্নিগ্ধ এই পরিবেশ মেহুলের বিষাদগ্রস্ত মনকে এক পরম প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল। সে এক বুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখ বুজে সেই স্নিগ্ধ হাওয়া নিজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুষে নিতে লাগল।

‎​মেহুল যখন আট তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের রাজশাহীর মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে আছে, তখন সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না—ঠিক নিচে, রাস্তার এক কোণে ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কুচকুচে কালো মার্সিডিজ গাড়িটির ভেতর বসে এক জোড়া উন্মাদের মতো প্রখর চোখ অপলক দৃষ্টিতে কেবল তাকেই দেখে যাচ্ছে! ​মার্সিডিজের ড্রাইভিং সিটে হেলান দিয়ে বসে ছিল সালমান শাহ নেওয়াজ।
‎​তার চোখের লেন্স তখন নিচ থেকে সোজা আট তলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের আলো-আঁধারিতে মিশে থাকা অবয়বটার দিকেই স্থির হয়ে ছিল। ​বারান্দার মৃদু আলোতে বাতাসে মেহুলের চুলগুলো উড়ছিল, ওড়নার আঁচল বাতাসে কাঁপছিল। আর সেই দৃশ্য দেখে যেন সালমানের বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল!

‎​পুরো রাজশাহী শহরের সৌন্দর্য নাকি অন্য কোনো রূপকথা—সালমানের কাছে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। তার তীব্র, মাতাল করা মুগ্ধ চোখের মণিকোঠায় এখন বিশ্বজগতের একমাত্র সত্য ও সমস্ত সৌন্দর্য কেবল মেহুলের অবয়বেই বিদ্যমান! মেহুলের এই শান্ত, রূপসী রূপ সালমানকে যেন প্রতি মুহূর্তে আরও বেশি দেওয়ানা আর অপ্রকৃতিস্থ বানিয়ে তুলছিল!
‎হঠাৎ ​সালমান ঠোঁটের কোণে বাঁকা ও স্নিগ্ধ ভালোবাসার হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে উঠল—
‎​”আমার অপ্সরা… শহরের সৌন্দর্য দেখছ? দেখ মন ভরে দেখ! অথচ তুমি জানোই না, তোমার এই উপস্থিতির কাছে পুরো শহরের রূপ কতটা মলিন;ও ফিকে হয়ে উঠেছে!”

‎এদিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাতাস উপভোগ করার মাঝেই হঠাৎ মেহুলের রিফ্লেক্স যেন সচেতন হয়ে উঠল। ঘাড়ের পেছনের সূক্ষ্ম লোমগুলো শিহুরে উঠল এক অজানা অস্বস্তিতে।
‎​তার স্পষ্ট অনুভব হলো—কেউ একজন চরম প্রখর আর উন্মাদের মতো দৃষ্টিতে তাকেই অবিরত দেখে চলেছে!
‎​মেহুল চমকে উঠে বারান্দার চারদিকে চোখ বোলাল। পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দাগুলো খাঁ খাঁ করছে, আশেপাশে কেউ নেই। অস্বস্তিটা কাটাতে না পেরে সে একটু ঝুঁকে সোজা আট তলার বারান্দা থেকে নিচের রাস্তার দিকে তাকাল।
‎​কিন্তু নিচে আবছা আলোর ভিড়ে সাধারণ কিছু গাছপালা আর দু-একটি পার্ক করা গাড়ি ছাড়া আর কিছুই তার চোখে পড়ল না। কোনো মানুষকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল না।

‎​বারান্দা থেকে মেহুলকে এভাবে উদগ্রীব হয়ে নিচে তাকাতে দেখে গাড়ির ভেতরে বসে সালমান ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক বাঁকা হাসি ফুটাল। তার অপ্সরী যে তার ছায়াটাকেও অনুভব করতে পারছে—এই সত্যটা সালমানের উন্মাদনাকে যেন এক লাফে আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল!

‎​মেহুল নিচে নেমে আসা অন্ধকার আর স্থির পরিবেশ দেখে ভেবেছিল হয়তো তার মনের ভুল। তাই সে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ঘটল অদ্ভুত ঘটনাটা! ​নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সারিবদ্ধ গাড়িগুলোর মধ্যে একটা কুচকুচে কালো বিলাসবহুল গাড়ির সামনের তীব্র হেডলাইট দুটো হঠাৎ জ্বলে উঠল! তারপর একেবারে হিসাব কষে—ঠিক দুই সেকেন্ড পর পর হেডলাইট নিভছে আর জ্বলছে!
‎​ব্লিংক… ব্লিংক… ব্লিংক…

‎​অদ্ভুত! ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য মানবীকে সংকেত দেওয়া হচ্ছে! সংকেতের বার্তা খুব স্পষ্ট—’আমি নিচে দাঁড়িয়ে আছি, তোমাকেই দেখছি!’
‎​মেহুল ভ্রু দুটো ভীষণভাবে কুঁচকে ফেলল। নিস্তব্ধ মাঝরাতে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে একটা গাড়ি এভাবে অদ্ভুত নিয়মে লাইট অন-অফ করছে কেন? কেউ কি ইচ্ছে করে এমনটা করছে। নাকি কাউকে দেখানোর জন্য বা কাউকে আকর্ষণ করার জন্য এমনটা করছে? বুকের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কার তোলপাড় শুরু হলো মেহুলের।
‎​ঠিক তখনই ঘর থেকে হুমার চঞ্চল ও হাঁকডাক ভেসে এলো—
‎​”মেহু! কোথায় তুই? জলদি আয়, টেবিলে খাবার রেডি! না খেয়ে কি গাঁয়ে বাতাস লাগিয়েই রাত পার করবি নাকি?”

‎​মেহুল চমকে পেছনে ফিরে ঘরের দিকে তাকাল। তারপর হালকা কণ্ঠে জবাব দিল, “আসছি হুমা!”
‎​কথাটা বলেই মেহুল আবারও চটপট নিচে সেই গাড়িটার দিকে চোখ বোলাল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—এখন আর গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে না! অন্ধকার গাড়ির অবয়বটা রাস্তার কোণে একেবারে নিঃশব্দ, নিথর হয়ে পড়ে আছে। যেন একটু আগের আলো-আঁধারির খেলাটা মেহুলের শুধুই দৃষ্টিভ্রম ছিল!
‎​মেহুল আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে স্লাইডিং ডোরটা টেনে ঘরের ভেতর চলে গেল।
‎এদিকে ​বারান্দা থেকে মেহুলের অবয়বটা মিলিয়ে যেতেই গাড়ির ভেতর এক নারকীয় ও রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি হলো। সালমান ঠোঁটের বাঁকা হাসিখানি বজায় রেখে সিটের সাথে মাথা হেলিয়ে দিল।
‎​চোখ দুটো বুজে সে আবার সেই হেডলাইটের বোতামটা নিজের শক্ত আঙুলের স্পর্শে চেপে ধরে বিড়বিড় করল—
‎”​তোমাকে জ্বালাতে খুব মজা লাগে অপ্সরা? তোমার এই ভয় পাওয়া চঞ্চল রূপটা… আহ্! আমাকে দিনে দিনে আরও পঙ্গু করে দিচ্ছে তোমার প্রেমে!” বলেই সে গাড়ি স্টার্ট দিলো, ​রাতের অন্ধকার রাত গলিয়ে রাতের রাজপথ ধরে আবার যেন ছুটে চলল এক উন্মাদ প্রেমিকের অভিসার!

‎​ভোরের হালকা কুয়াশা আর মিঠে রোদের ছোঁয়া কেটে যাওয়ার আগেই হুমার বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো মেহুল। হুমাই নিজের গাড়িতে করে তাকে সোজা রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দিল। যাওয়ার আগে বন্ধুর গালে হাত রেখে অজস্র ভালোবাসা আর সাবধানে থাকার কড়া তাগিদ দিল হুমা।
‎​স্টেশনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই মেহুল দেখল—তার চার সদস্যের মেডিকেল টিম আর প্রয়োজনীয় সব ওষুধপত্রের ভারী কার্টন নিয়ে সহকারীরা আগে থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। মেহুলকে দেখেই সবার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র বাঁশি বাজিয়ে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল ট্রেন। ধোঁয়া উগড়ে স্টেশনে থামা ট্রেনের সংরক্ষিত বগিতে চড়ে বসল মেহুল ও তার পুরো টিম।
‎​ট্রেনের জানালার পাশে বসে বাইরে তাকাল মেহুল। ট্রেন চলতে শুরু করার সাথে সাথেই শহরের ইট-কাঠের অট্টালিকাগুলো পেছনে ফেলে ট্রেন ধেয়ে চলল গ্রামের দিকে। প্রায় পৌনে চার ঘণ্টার এক রোমাঞ্চকর জার্নি! সবুজ ধানের খেত, আমবাগান, কাঁচা মেঠো পথ আর ছোট ছোট দিঘি পেরিয়ে ট্রেন একসময় গিয়ে থামল ‘আড়ানী’র মফস্বল এক ছোট্ট স্টেশনে।
‎​ট্রেন থামতেই স্টেশনের কাঠের প্ল্যাটফর্মে মেহুলরা পা রাখল। অমনি প্ল্যাটফর্মের এক কোণ থেকে হাত তুলে উৎফুল্ল গলায় হেসে উঠলেন সেই চেনা মানুষটি—দাস বাবু! তাঁর সাথে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ও গামছা মাথায় গ্রামের আরও চার-পাঁচজন কৌতূহলী ও অমায়িক মানুষ।

‎​”আসুন ডাক্তার মেডাম ! আসুন স্যাররা! আপনাদের জন্যই ইষ্টেশনে ব্যাকুল হইয়া বসে আছিলাম!”—দাস বাবু হাত দুটো জোড় করে বিনীত ভঙ্গিতে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন। গ্রামের বাকি মানুষগুলো বড় বড় ব্যাগ আর মেডিকেল কিটগুলো বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজেদের কাঁধে আর হাতে তুলে নিল। তাঁদের আন্তরিক বরনে পুরো টিমের বুক যেন এক পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল।
‎​স্টেশনের বাইরে আসতেই দেখা গেল তাঁদের যাতায়াতের বাহন—দুটো নতুন সাজানো বড় সাইজের টমটম। একসময় কাঁচা ও মেঠো পলিমাটির আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি দুটো এগিয়ে চলতে লাগল। চারপাশের বাঁশঝাড়, মাটির ঘর আর আম-কাঁঠালের গাঢ় ছায়াবেষ্টিত নিবিড় গ্রামটির স্নিগ্ধ গন্ধ মেহুলের শহরঘেরা মনের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ করে দিল।

‎প্রায় ​পঁয়তাল্লিশ মিনিটের এক মেঠো পথের যাত্রা শেষে টমটম দুটো এসে থামল গ্রামের একদম শেষ প্রান্তের ‘শান্তিনীড় অনাথ ও বৃদ্ধাশ্রম’-এর প্রাঙ্গণে।
‎​গাছগাছালিতে ঘেরা মস্ত বড় এক উঠোন। আর তার মাঝখানে একটি পুরনো আমলের রাজবাড়ির মতো প্রকাণ্ড একতলা দালান। প্রাঙ্গণে পা রাখতেই মেহুলরা বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়ে গেল! দাস বাবু যেন সত্যিই জাদুকর! তিনি আগেই সবকিছু পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছেন।
‎​উঠোনের একপাশে চট বিছিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে বসার বেঞ্চ। অন্য পাশে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে চমৎকার দুটো সামিয়ানা টাঙিয়ে অস্থায়ী ডক্টরস বুথ বানানো হয়েছে। আশ্রমে থাকা ধবধবে চুল-দাড়ির অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কোলে অবুঝ শিশু নিয়ে বসে থাকা গর্ভাবস্থার প্রসূতি মা আর একঝাঁক ছোট ছোট এতিম বাচ্চা—সবাই নতুন ডাক্তারদের আগমনে উৎসুক ও আনন্দিত চোখে তাকিয়ে আছে। পরম মমতায় তাঁদের এই প্রস্তুতি দেখে মেহুলের যেন বিষম খাওয়ার উপক্রম হলো।

‎এদিকে মেহুলরা আসতেই ​দাস বাবু তড়িঘড়ি করে এক থালা তাজা ডাবের পানি আর বাতাসা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আগে একটু ঠাণ্ডা পানি মুখে দেন ডাক্তার ম্যাডামরা। তারপর আপনাদের ক্যাম্প শুরু কইরেন।” ​মেহুল ডাবের পানিতে চুমুক দিয়ে এক চিলতে মুক্তোঝরা মিষ্টি হাসি ছড়াল। তারপর স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে, অ্যাপ্রনটা গায়ে চাপিয়ে সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলল, “টিম, আর এক মুহূর্তও দেরি নয়! চলুন, আমাদের আসল কাজ শুরু করা যাক।”

‎​গাছের ছায়ায় সুশীতল বাতাস, পাখির কলকাকলি আর অসহায় মানুষগুলোর আশার আলো মাখা চোখের সামনে শুরু হলো ডক্টারদের ও টিমের চিকিৎসা সেবা ক্যাম্প।
‎ক্যাম্প শুরুর পর থেকেই সময় যেন পাখির ডানায় ভর করে উড়তে লাগল। দেখতে দেখতে পুরো বেলাটা চরম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কেটে গেল।
‎​মেহুল আর তার টিমের ডাক্তাররা নিঃশ্বাস ফেলারও অবকাশ পাচ্ছিলো না। প্রসূতি মায়েদের শারীরিক পরীক্ষা, অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের রক্তচাপ ও জটিলতা পরীক্ষা, আর ছোট ছোট বাচ্চাদের ভালোবেসে গায়ে হাত বুলিয়ে ওষুধ বুঝিয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে বুথে বুথে চলেছে অবিরাম চিকিৎসা সেবা।
‎​আর এই পুরোটা সময় জুড়ে ছায়ার মতো পাশে থেকে সবার খেয়াল রেখে গেছেন একজন মানুষ—দাস বাবু! কারও একটু পানির তৃষ্ণা পেয়েছে কি না, কোনো ডাক্তারের আবার বেশি গরমে কষ্ট হচ্ছে কি না, কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের কোনো বিশৃঙ্খলা হচ্ছে কি না—সবকিছু নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করেছেন তিনি।
‎এভাবেই ​ঠিক সন্ধ্যার মিহি আলো ধরণীতে নেমে আসার আগে আগে তাদের সব কটি বুথের শেষ পেশেন্ট দেখার পর্ব শেষ হলো। সারাদিনের প্রতিটি মুহূর্তে গ্রামের এই অমায়িক মানুষগুলোর কাছ থেকে মেহুলরা যে পরিমাণ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আপ্যায়ন পেয়েছে—তা সত্যি কল্পনাতীত! মেহুল দাস বাবুর এমন আন্তরিক আতিথেয়তায় গভীরভাবে অভিভূত। শহরের কৃত্রিম আদব-কায়দার ভিড়ে এই মেঠো পথের মানুষগুলোর সহজ-সরল রূপটা তার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

‎​দাস বাবু শুধু সারাদিন সেবা আর আতিথেয়তা করেই ক্ষান্ত হননি! কাজ শেষে বিদায়বেলায় মেহুলদের পুরো টিমের জন্য চমক হিসেবে সাজিয়ে রেখেছিলেন রাজশাহীর বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী খাঁটি রেশমি সিল্কের চাদর আর রসালো মিষ্টির হাঁড়ি। পরম মমতায় উপহারের ডালা মেহুল ও তার সহকর্মীদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি হেসে বললেন, “আমদের এই গরীবের গাঁয়ে আপনাদের আর কী-ই বা দেওয়ার আছে ডাক্তার সাহেবরা ! এই সামান্য উপহারটুকু নিয়া আমাদের মুখ রক্ষা কইরেন।”

‎​মেহুল চোখে একরাশ আবেগ নিয়ে বলল, “দাস বাবু, আপনি আমাদের যা ভালোবাসার উপহার দিলেন, তার কাছে এই সব কিছু তুচ্ছ। এই স্মৃতি আমি সারাজীবন মনে রাখব।”
‎​অবশেষে এলো বিদায়ের চিরন্তন পালা। আশ্রমের বুড়ো মানুষগুলো ডাক্তারদের মাথায় হাত রেখে মন খুলে দোয়া করে দিলেন, অনাথ বাচ্চারা মিষ্টি হেসে হাত নাড়ল। মেহুল সবার কাছ থেকে মায়ামাখা বিদায় নিয়ে টিমের সবাইকে সাথে করে সেই সাজানো টমটমে চেপে বসল। ​দাস বাবু নিজে তাঁদের সাথে স্টেশনে এলেন তাঁদের নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
‎​মফস্বল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যখন ট্রেনের তীব্র হুইসেল বেজে উঠল, মেহুল আবেগাপ্লুত হয়ে দাস বাবুর চরণে সালাম জানিয়ে বিদায় চাইল। দাস বাবু পরম মমতায় মেহুলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “সুখে থাইকো মা, বারবার ফিরে এসো এই গাঁয়ে।”

‎​স্টেশনে ট্রেন এসে থামতেই রঙিন সব মিষ্টি ও স্নিগ্ধ স্মৃতি বুকের ভাঁজে জমা করে মেহুল আর তার দল ট্রেনে চড়ে বসল। ধোঁয়া উগড়ে ট্রেন যখন রাজশাহী সদরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল, জানালার বাইরে তাকিয়ে আজকের সকল কিছুতে মেহুলের মনটা যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে রইল।

‎গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর বুকভরা ভালোবাসা আর অমায়িক আতিথেয়তা শেষে মেহুলরা যখন ফিরতি ট্রেনে চেপে বসেছিল, তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় রাত সাতটা। মফস্বল স্টেশন থেকে ধীরগতিতে চলা ট্রেনটি রাজশাহী সদরে এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত বারোটা পার হয়ে গেল।
‎​ট্রেনের কামরা থেকে নিজেদের ডাক্তারি ভারী যন্ত্রপাতি, কিট আর জিনিসপত্র নামিয়ে মেহুলরা যখন প্ল্যাটফর্মে নামল, তখন চারপাশটা একদম সুনসান, নিঝুম। স্টেশনের চারদিকের বাতিগুলোর আলো ফিকে হয়ে এসেছে। প্ল্যাটফর্মের এদিক-সেদিক দু-একজন ভবঘুরে মানুষ পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে ছাড়া আর কোনো জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই।

‎এদিকে জিনিসপএ নিয়ে ​স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে তারা দেখল, বাইরের রাজপথও গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। তাই সবাই যার যার যায়গায় পৌছাতে গাড়ির জন্য স্টেশনের বাহিরেই অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনের মুখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর মাএ একটা খালি ট্যাক্সি পাওয়া গেল।
‎রাত অনেক হওয়াতে ​মেহুল তার মেডিকেল টিমের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলল, “তোমরা সবাই এই ট্যাক্সিটায় উঠে পড়ো। সোজা কোয়াটারে চলে যাও।”

‎​কিন্তু সহকর্মীরা মেহুলকে এমন গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় একা রেখে যেতে রাজি হলো না। টিমের এক তরুণ জুনিয়র ডাক্তার বলে উঠল, “ম্যাম, এত রাতে আপনাকে একা রেখে আমরা কীভাবে যাই? তার চেয়ে আপনি ট্যাক্সিতে উঠুন, আমরা আপনাকে আগে বাসায় পৌঁছে দিই।”
‎​মেহুল আলতো হেসে বারণ করে বলল, “তার একদমই প্রয়োজন হবে না। আমাকে নামাতে গেলে তোমাদের উল্টো পথ হবে আর অনেক লেট হয়ে যাবে। সারাদিনের ধকলের পর আমরা সবাই ভীষণ ক্লান্ত, তার ওপর কাল সকালেই কিন্তু আবার ফ্রি ক্যাম্পেইনে ডিউটি আছে! তাই বলছি তোমরা আর দেরি করো না, চলে যাও। কোয়াটারে পৌঁছে আমাকে একটা কল করে জানিয়ে দিয়ো কিন্তু।”

‎​মেহুলের জেদের কাছে হার মেনে অবশেষে সহকর্মীরা বিদায় নিয়ে ট্যাক্সিতে চড়ে রওনা হয়ে গেল। এদিকে ​মেহুল একা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল আরেকটি রিকশা বা গাড়ির আশায়। পাশে একটা ছোটখাটো টং দোকান তখনও খোলা ছিল, তাই মেহুল সেটির পাশেই দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টি বোলাতে লাগল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলেও শুনসান রাস্তায় কোনো রিকশা বা যানবাহনের দেখা মিলল না।
‎​অতঃপর দোকানদার লোকটি যখন তার ঝাঁপ বন্ধ করতে যাচ্ছিল, তখন মেহুলকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে উঠল, “আপা! এই নিঝুম রাস্তায় খালি মুখে দাঁড়ায়ে থাকলে তো গাড়ি পাবেন না। তার থ্যাকে একটু সামনের দিকে আগান দিকি, মোর মনে হয় ওই মোড়ে কিছু পাইতে পারেন।”
‎​মেহুল লোকটির কথায় আস্বস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোন দিকে গেলে গাড়ি পাওয়া যাবে ভাই?”

‎​লোকটি হাতের ইশারায় ডানদিকের মোড়টা দেখিয়ে দিল। মেহুল লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যাগটা কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরে ধীরপায়ে সামনের দিকে এগোতে লাগল।
‎​কিন্তু খানিকটা পথ এগোতেই মেহুলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। তার মনে হলো—পেছন থেকে যেন কতগুলো ভারী পায়ের শব্দ তাকে অনুসরণ করছে!
‎তাই ​মেহুল আড়চোখে পেছনে তাকুতেই আঁতকে উঠল। একদল মাতাল লোক হেলেদুলে তার পিছু নিয়েছে! বিপদ বুঝতে পেরে মেহুল তৎক্ষণাৎ নিজের হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। কিন্তু লোকগুলো তার গতি টের পেয়ে পিছু ছাড়ল না, বরং আরো চ্যাঁচামেচি করে কুরুচিকর আর আজেবাজে কথা ছুড়তে লাগল—
‎​”আরে পারাপারি করো ক্যা গো সুন্দর? থামো না একটু! এত রাইতে একা কই যাও?”

‎​রাস্তা একদম জনমানবহীন, দোকানপাট সব বন্ধ, বিপদে সাহায্য চাওয়ার মতো একটা মানুষও আশেপাশে নেই। ভয়ে মেহুলের বুকের ভিতর হাতুড়ির পেটন পড়তে লাগল। প্রাণ বাঁচাতে সে আর এক মুহূর্ত চিন্তা না করে দৌড় লাগাল এবং রাস্তার পাশের অন্ধকার এক সরু গলির ভিতর ঢুকে প্রকাণ্ড এক ডাস্টবিনের পেছনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ল।
‎মেহুলকে দৌড়াতে দেখে ​মাতাল লোকগুলো তার পিছু নিলো গালমন্দ করতে করতে গলির মুখের কাছাকাছি চলে এলো—
‎​”শা*লা! মা*গী গেল কই? ভেলকি দেখায় নাকি! ধুর, কোনদিকে পালাইল রে!”

‎​তাদের অকথ্য গালিগালাজ আর গলার আওয়াজে মেহুল আরো জড়োসড়ো হয়ে বসলো। কিন্তু একসময় বকতে বকতে তাদের গলার আওয়াজ আস্তে আস্তে সামনের দিকে মিলিয়ে যেতে লাগলো। যা বুঝতে পেরে মেহুল বুকের ওপর হাত রেখে ঘন ঘন শ্বাস নিতে লাগল। অতঃপর বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মেহুল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ডাস্টবিনের পেছন থেকে বেরিয়ে এলো।
‎​নিজের জামাকাপড়ে লাগা ধুলোবালি ঝেড়ে আশেপাশে সাবধানে তাকাতেই হঠাৎ এক সূক্ষ্ম, করুণ শব্দে থমকে গেল সে!

‎​একটি ছোট্ট শিশুর কান্নার মৃদু শব্দ তার কানে ভেসে এলো!
‎​ওয়াঁ… ওয়াঁ…
‎​এত রাতে, এমন শুনসান অন্ধকার গলিতে একটি বাচ্চার কান্না শুনে মেহুল গা ছমছম করে উঠল। এমনিতেই রাত বারোটা পার হয়ে গেছে, তার ওপর একটু আগের মাতালদের ঝামেলা—সব মিলিয়ে এই অবুঝ কান্নার শব্দটা যেন মনের ভেতর চরম এক আতঙ্কের জন্ম দিল! মেহুল ভাবল আর এক সেকেন্ডও এখানে না দাঁড়িয়ে জলদি স্থান ত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

‎​কিন্তু সে পা বাড়াতেই আবারও সেই মিহি, কাঁপাকাঁপা কান্নার শব্দ আবার ভেসে এলো।
‎যা শুনে ​মেহুল নিজের ভয়টা একমুহুর্তের জন্য চেপে ধরে বড় একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। একজন চিকিৎসক হিসেবে তার মন তাকে আটকে দিল। সে কান খাড়া করে কান্নার উৎস খোঁজার চেষ্টা করল।
‎​অনুসন্ধানী চোখে চারদিকে তাকাতেই মেহুল আবিষ্কার করল—শব্দটি আর কোথাও থেকে নয়, ঠিক তার কয়েক হাত দূরে থাকা দুর্গন্ধময় ময়লার ডাস্টবিনটার ভেতর থেকেই আসছে!
‎​মেহুল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এত রাতে ডাস্টবিনের ভেতর বাচ্চার কান্না?! প্রথমে সে ভাবলো হয়তো কোনো বিড়ালের বাচ্চা হবে। কিন্তু পরক্ষণেই অভিজ্ঞতা আর মনের অনুভূতি তাকে জানিয়ে দিল—না, এই কান্না কোনো বিড়ালের বাচ্চার হতে পারে না! এটা রক্তমাংসের এক মানব শিশুরই আকুল কান্না!

‎তাই ​মনের সন্দেহ দূর করতে মেহুল সব ভয়-সংকোচ দূরে ঠেলে ডাস্টবিনটার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ডাস্টবিনের ভেতরে ওপরের দিকে কতগুলো নোংরা, ভাঙা সাদা ককশিট ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে। আর তার সাথে ভেসে আসছে পচা আবর্জনার এক অসহ্য কটু দুর্গন্ধ!
‎​মেহুল নাকে-মুখে রুমাল চেপে ধরে চোখ-মুখ কুঁচকে ককশিটগুলোর দিকে হাত বাড়াল—এক পরম অজানা আর বিস্ময়কর আবিষ্কারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে!

‎​মেহুল আর এক মুহূর্তও ইতস্তত না করে পচা দুর্গন্ধ ও নোংরা উপেক্ষা করে ককশিটের টুকরোগুলো এক এক করে সরিয়ে ফেলল।
‎​ককশিট সরাতেই মেহুলের বুকটা যেন এক চরম ধাক্কায় কেঁপে উঠল! ময়লার স্তূপের মাঝে শুয়ে আছে এক ফুটফুটে, সদ্য জন্মানো বড়জোড় ১৫ দিন বয়সের এক নবজাতক কন্যাশিশু! শিশুটির শরীরে এক টুকরো সুতো পর্যন্ত নেই, আর সবচাইতে করুণ দৃশ্য হলো—তার নরম, লালচে কোমল শরীরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিষাক্ত পিঁপড়া! লাল পিঁপড়াগুলো খুদে শিশুটির কাঁচা চামড়ায় কামড় বসাচ্ছে, আর ব্যথায় অবুঝ শিশুটি নিপ্রাণে কেঁদে চলেছে।

‎​দৃশ্যটা দেখে মেহুল কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, স্তম্ভিত হয়ে গেল! এও কি সম্ভব? একটা সদ্যোজাত সন্তানকে কে এভাবে ডাস্টবিনের ময়লায় ফেলে রেখে যেতে পারে?
‎​পরক্ষণেই বাচ্চার তীব্র ও ব্যথিত কান্নার শব্দে মেহুলের চেতনা ফিরে এলো। সে আর এক পলকও দেরি না করে তাড়াহুড়ো করে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে শিশুটিকে ডাস্টবিনের পচা আবর্জনার মাঝ থেকে তুলে নিল। নিজের ডাক্তারির এপ্রন শরীর থেকে খুলে হাত দিয়ে পরম ব্যাকুলতায় বাচ্চার গায়ের প্রতিটা লাল পিঁপড়া ঝেড়ে ঝেড়ে ফেলে দিতে লাগল সে।
‎​বাচ্চাটি তখনও একনাগাড়ে কেঁদে চলছিল। তাকে শান্ত করতে মেহুল কোনো কিছু না ভেবেই অবচেতন মনে শিশুটিকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে জড়িয়ে আগলে ধরে ফুটপাতের একপাশে এসে দাঁড়াল। ​অলৌকিকভাবে, এতক্ষণ ধরে ডাস্টবিনের ঠাণ্ডায় আর ব্যথায় চিল-চিৎকার করা বাচ্চাটি যখনই মেহুলের তপ্ত বুকের উত্তাপ ও উষ্ণ ওম পেল—হঠাৎ করেই তার কান্নার ধার কমে এলো! ধীরে ধীরে শিশুটি শান্ত হয়ে মেহুলের বুকের সাথে লেপ্টে রইল।

‎​শিশুটিকে এভাবে বুকের ছায়ায় আগলে নেওয়ার সাথে সাথে মেহুলের হৃদপিণ্ড যেন এক অস্বাভাবিক দ্রুততায় স্পন্দিত হতে শুরু করল! ধক-ধক… ধক-ধক! মেহুলের মনে হলো, তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বন্ধ্যাত্বের বরফ জমে থাকা হৃদয়ের গভীর থেকে যেন আজ অচেনা এক মাতৃত্বের জোয়ার হুট করে জেগে উঠছে! একটা অচেনা, অদৃশ্যের আকুলতা ভেতরের সবকিছু নাড়িয়ে দিয়ে গেল।
‎​মেহুল দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না এই অবস্থায় তার কী করা উচিত! বাচ্চার শরীরে আর কোনো আঘাত বা সমস্যা হয়েছে কি না—তা পরীক্ষা করার জন্য সে শিশুটিকে বুক থেকে কিছুটা আলগা করে দেখতে চাইল।
‎​কিন্তু তখনই এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল! মেহুল সরতে চাইলেই শিশুটি তার ক্ষুদ্র, নরম আঙুল দিয়ে মেহুলের বুকের জামার অংশটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল! ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সেই মুঠো যেন মেহুলকে বার্তা দিচ্ছিল—’আমাকে ছেড়ে যেয়ো না!’ অবুজ শিশুর এই ব্যাকুল আকুতি মেহুল আরো বিচলিত হয়ে পড়লো।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৪

‎​ঠিক সেই পরম মুহূর্তেই একটি খালি সিএনজি এসে তাঁদের ঠিক সামনে থেমে দাঁড়াল। সাথে সাথেই ড্রাইভার ডেকে উঠল, “যাবেন নাকি আপা?”
‎​মেহুল যেন কোনো এক মায়াবী ঘোর আর ঘোরগ্রস্ততার মধ্য দিয়ে সিএনজিতে গিয়ে চড়ে বসল। কোলে সেই রক্তমাংসের ছোট্ট উপহারটিকে চেপে ধরে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল হুমার ফ্ল্যাটের ঠিকানায় গাড়ি ছোটানোর জন্য। ​রাত ১টা পার হয়ে যাওয়া নিঝুম রাস্তায় সিএনজি ধেয়ে চলল নিজের আপন স্পিডে, আর মেহুলের বুকে তখন এক নতুন জীবনের স্পন্দন আঁকড়ে ধরে এক অনাস্বাদিত না বলা দমবন্ধ করা অনুভূতি!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫ (২)