শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৮
আফীফা আফনান
মেহুলের জীবনের ধূসর আকাশে যখন সদ্য ফোটা একমুঠো বাসন্তী রোদের আগমন ঘটতে শুরু করেছিল। তখন মেহুল কেবল ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। মা হারিয়ে বাবার পরম আদরে ও সুশাসনে শান্তশিষ্ট, মৃদুভাষী এক চুপচাপ বালিকা হিসেবেই বেড়ে উঠছিল সে। দুনিয়াদারির কুটিলতা কিংবা ঘরোয়া কোনো প্যাঁচাল তখনও তার কচি মনে এক ফোঁটাও ছায়া ফেলতে পারেনি। ঠিক তেমনই এক রোদেলা বিকেলে সুমনা বেগমের সাথে গায়ে একখানা সাদামাটা গেঞ্জি আর হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা থ্রি-কোয়ার্টার পরা, লম্বাটে এক ছেলের আগমন ঘটেছিল তাদের বাড়িতে।
মেহুল সেদিন জানতে পেরেছিল বাবা, মনি বাদেও এই জীবনে তার আরো কেউ আছে—এই যে সম্মুখের সেই হাসিখুশি মহিলাটি তার ফুফু, আর তার পাশের সেই উজ্জ্বল ছেলেটি অন্য কেউ নয়, তার ফুফাতো ভাই, আরমান!
মাতৃহীন মেহুলের নিঃসঙ্গ একলা জীবনে সুমনা আর আরমানের এই শুভসূচনা যেন মুহূর্তেই এক নতুন ফুলের বাগানের মতো সুরভিত হয়ে উঠেছিল। শুরুতে পরিচয়টা কেবল ফুফাতো ভাইতেই সীমাবদ্ধ ছিলো; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই পরিচয় রূপ নিয়েছিল এক গভীর ও চিরন্তন অমলিন বন্ধুত্বে। বাড়ির সবাই যখন মেহুলকে রেখে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকত, তখন আরমান আর মিনার ছিল মেহুলের ছায়ার মতো সঙ্গী।
পড়াশোনার ঝক্কি থেকে শুরু করে কিশোরী মেহুলের মনের সব ছোটখাট ইচ্ছা—সবকিছুতেই আরমানের অনবদ্য আর শক্ত সাপোর্ট ছিল মেহুলের সবচেয়ে বড় ভরসার ছাতা।
তারপর… জীবনের এক রঙিন বসন্তে নিঃশব্দে আগমন ঘটেছিল মেহুলের মনের গহীনে প্রথম প্রেমের অনির্বচনীয় দোলাচলের। কৈশোর পার হয়ে যৌবনের সোপানে পা রাখতেই মেহুলের হৃদয়ে আরমানের জন্য জন্ম নিয়েছিল এক মায়াবী অনুভূতির। যার ফলে আরমানকে দেখলেই তার বুকের ভেতর মৃদু কম্পন তৈরি হতো, যেন দূর থেকে আরমানের মিষ্টি হাসিটাই মেহুলের থমকে থাকা পৃথিবীর একমাত্র চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর মেহুল রোজ রোজ একটু একটু করে ডুবতে থাকে সেই অলৌকিক প্রেমের গভীরে।
আর ঠিক তেমনই এক সোনাঝরা বিকেলে, আরমান নিজেও যখন মেহুলের চোখে চোখ রেখে থমকে যাওয়া কণ্ঠে নিজের জমানো ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করল—সেদিন মেহুলের মনে হয়েছিল, সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সমস্ত সুখ আর আনন্দ যেন এক নিমেষে তার নিঃস্ব কোলে এনে ঢেলে দিয়েছেন! মেহুলের মতে দিনটি ছিল তার জীবনের সেরা ও শ্রেষ্ঠতম দিন। আর সেই মধুর স্মৃতির রেশ ধরে মেহুলের জীবনের ১৮তম জন্মদিনটা এক চরম আবেগ ও পরম ভালোবাসায় রাঙিয়ে তোলার মহা-পরিকল্পনা করেছিল আরমান।
মেহুল সবসময় একটু শান্ত, খোলামেলা আর প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া নিরিবিলি স্থান পছন্দ করত। মেহুলের সেই পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে শহরের এক কোণে, মেহগনি গাছের সারি ঘেরা এক নিঝুম, ছায়াসুনিবিড় জায়গায় মেহুলকে নিয়ে গিয়েছিল আরমান। চারপাশে মৃদু হাওয়া, গাছের ঝরা পাতার মিষ্টি মর্মর ধ্বনি আর শেষ বিকেলের নরম সুবর্ণ আলো—সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় মায়াজাল!
সেই মায়াবি মুহুর্তে পকেটে হাত গুঁজে ধীরপায়ে মেহুলের একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল আরমান। মেহুলের গাঢ় কালো দুই চোখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে, হৃদয় নিংড়ানো গভীর ব্যাকুলতায় সে সেদিন বলে উঠেছিল—
”আমি তোকে খুব ভালোবাসি মেহুল। বউ হবি আমার…?”
কথাটা কানে পৌঁছাতেই মেহুলের বুকের ভেতরের স্পন্দন যেন থমকে গিয়েছিল! থরথর করে কেঁপে উঠেছিল তার গোলাপি দুটি ঠোঁট। খুশির এক অলৌকিক জোয়ার যেন মেহুলের সমস্ত শরীর বেয়ে বয়ে গিয়েছিল। আনন্দ আর আবেগের প্রাবল্যে তার দু-চোখ জলে টলমল করে উঠেছিল সেদিন। মেহুল কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনি; ছলছল চোখে আরমানের অপলক চাহনির দিকে চেয়ে আলতো করে শুধু মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সম্মতি জানিয়েছিল।
মেহুলের সেই লাজুক ‘হ্যাঁ’ শুনে আরমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল এক অপূর্ব মায়াবী হাসি। সে এক কদম এগিয়ে এসেছিল মেহুলের আরেকটু কাছে। পরম যত্নে, ধীর গতিতে নিজের দুটি উষ্ণ হাত রেখেছিল মেহুলের মায়াবী দু-গালে। আঙুলের পরম সোহাগে মেহুলের চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা নোনাজলটুকু মুছে দিয়ে আরমান গম্ভীর ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কণ্ঠে বলেছিল—
”আমি ওয়াদা করছি মেহু, সারা জীবন তোকে পৃথিবীর সব আঘাত আর কষ্ট থেকে আগলে রাখবো। এই আরমান বুকে বুক দিয়ে ঢাল হয়ে থাকবে, কখনো কেউ তোর দিকে চোখ তুলেও তাকাতে পারবে না!”
মেহুল চোখ তুলে আরমানের সেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ চেহারার দিকে চেয়েছিল। বুকচেরা এক আবেগ আর পূর্ণ ভরসায় প্রশ্ন করেছিল—
”সবসময় এমন ভালোবাসবে তো, আরমান ভাই? কখনো মাঝপথে হাতটা ছেড়ে দেবে না তো?”
আরমান মেহুলের দুহাত নিজের হাতের মুঠোতে নিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে আলতো করে ছোঁয়া দিয়ে অত্যন্ত শক্ত ও নিখুঁত আবেগে জবাব দিয়েছিল—
”পাগল নাকি তুই! এই আরমান তোর হাত ছাড়ার জন্য ধরেনি ! তোর হাসিতেই তো আমার সকাল হয়, আর তোর চোখেই আমার রাত নামে। যতদিন এই বুকে নিঃশ্বাস চলবে, এই পৃথিবী উল্টে গেলেও আমি শুধু আর শুধুই তোরই থাকব। তোকে যদি কখনো কষ্ট দিই, সেদিন যেন খোদা আমার জীবনটাই কেড়ে নেন!”
আরমানের গলার সেই ভেজা সুর, চোখের সেই কৃত্রিম সততা আর ঠোঁটের সেই মায়াবী বয়ানে সরল মেহুল বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি—এই অপরিসীম ভালোবাসার নাটকের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল চরম কোনো বিষাক্ত চক্রান্ত! বিষধর সাপ যেমন মিষ্টি ছলে কাছে এসে সময় সুযোগ বুঝে ছোবল মারে, আরমানের এই সাজানো ভালোবাসাও ঠিক তেমনই ছিল!
মানুষকে ধ্বংস করার সবচেয়ে মারাত্মক উপায় হলো তাকে রূপকথার মতো ভালোবাসায় ডুবিয়ে হঠাৎ এক লহমায় সেখান থেকে টেনে নিচে ফেলে দেওয়া। আরমানও ঠিক সেটাই করেছিল! মেহুলকে অন্ধ ভালোবাসায় ভাসিয়ে, তার বিশ্বাসের শেষ সীমাটুকু নিজের নামে লিখে নিয়ে, একদিন ঠিক সেভাবেই মেহুলের বুক চিরে তাকে উপহার দিয়েছিল আজীবনের নিদারুণ এক রক্তক্ষরণ আর নিঃশ্বাসের অপমান!
ভালোবাসার এই বিষাক্ত ছলনা যে মানুষকে কতটা তিলে তিলে মেরে ফেলতে পারে, মেহুল আজ তার প্রতিটা পল-অনুপলে হাড়হাড়ে টের পাচ্ছে!
বিকেলের রক্তিম আলো যখন ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে সন্ধ্যার কালচে আঁধারে। বারান্দার ঠান্ডা ফ্লোরে হাঁটু দুটো বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে এতক্ষণ ধরে মেহুল এসব পুরনো স্মৃতির বিষাক্ত বিষবাষ্প নিয়েই ভাবছিল।
দিনের আলো নিভে যাওয়ার এই নীরব মুহূর্তটায় মানুষের বুকের ভেতরের হাহাকারগুলো যেন আরও বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। মেহুল গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দূরের দিগন্তের দিকে চেয়ে রইল। মানুষ কত সহজে একজনের জীবনে এসে একমুহূর্তের জন্য জীবনটাকে স্বর্গীয় রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখাতে পারে! কত অবলীলায় মিথ্যে ওয়াদা আর ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে পুরো জগতটাকে রঙিন করে তুলতে পারে! আর ঠিক ততটাই নিষ্ঠুরভাবে, সুযোগ বুঝে একদিন সেই আলো ঝলমলে জীবনটাকে এক লহমায় নিছিদ্র কালচে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে!
হঠাৎই মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময়, করুণ হাসি। হাসিটা নিজের করা অতীতের অজস্র বোকামিগুলোর জন্য, হাসিটা নিজের রূপকথার মতো সাজানো কিন্তু কাঁচের মতো ভেঙে যাওয়া ভাগ্যের ওপর! জীবনে চলার পথে সে কত গল্প পড়েছে, কত মানুষের রূপ দেখে কত শিক্ষাই না পেয়েছে। কিন্তু জীবন তাকে এভাবে এত চরম ও নির্মম শিক্ষা দেবে—তা হয়তো কোনোদিন তার কল্পনার অতল সীমানাতেও ছিল না!
ঠিক তখনই, মেহুলের এই শূন্য ভাবনার জাল ছিন্ন করে ভেতরে রুমের দিক থেকে ভেসে এলো এক মিষ্টি নরম আওয়াজ—
”উঁউঁ… আঁ… আঁ!”
ক্ষুদ্র কোনো বাচ্চার আধো-আধো স্বরে ডেকে ওঠার আওয়াজ! মেহুল বারান্দার ফ্লোর থেকে ঈষৎ উঁকি দিল রুমের ভেতরে। আওয়াজটা থামল না, বরং ক্রমাগত বেড়েই চলল! যেন অধৈর্য হয়ে কেউ নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে।
মেহুল ধীরপায়ে বারান্দার ঠান্ডা ফ্লোর ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভেতর থেকে আসা অদৃশ্য এক অদ্ভুত টানে পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেল রুমের এক কোণে রাখা সেই স্থির হয়ে থাকা লোহার দোলনাটার সামনে।
দোলনার ঠিক পাশে এসে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মেহুল।
তার স্থির ও করুণ দৃষ্টি গড়িয়ে পড়ল দোলনার নরম তোশকের ওপর। ছোট্ট গোলাপি কাঁথার ভেতর থেকে দুটো পুঁচকে হাত আর পা ক্রমাগত শূন্যে ছুড়ছে একরত্তি ছানাটি! কচি দুটি হাত ছটফট করছে, আর আধো-আধো শব্দ তুলে গোলাপি ঠোঁট দুটো নেড়ে নেড়ে বাতাস ভরিয়ে তুলছে!
মেহুল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই নিষ্পাপ মুখখানার দিকে। গতকাল রাতের সেই হাড়হিম করা বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের পর থেকে মেহুলের বুকের ভেতর এক গভীর ভীতি চেপে বসেছিল। সেই অশুভ সমাজ আর কুসংস্কারের শব্দগুলো যেন তাকে তাড়া করছিল—’তুই বন্ধ্যা! তুই অপয়া! তোর ছোঁয়ায় বাচ্চার ক্ষতি হবে!’
এই বিষাক্ত অপরাধবোধের ভয়ে মেহুল সকাল থেকে আর সাহস করেনি বাচ্চাটিকে ছোঁয়ার, কিংবা হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেওয়ার। সারাদিন সে দূরত্ব বজায় রেখে এক কোণে থমকে ছিল।
কিন্তু এখন? এখন এই নিষ্পাপ ছানাটি যেন তাকেই রীতিমতো ডেকে চলেছে!
বাচ্চাটিকে সেদিন বাড়িতে আনার পর থেকে মেহুল তাকে শুধুই পরম শান্তিতে ঘুমোতেই দেখেছে। কিন্তু আজ সকাল থেকে মেহুল যতবার এই গেস্ট রুমে পা রেখেছে, ততবারই শিশুটি ঘুম ভেঙে বা আধো-ঘুমে এভাবে হাত-পা ছুড়ে শব্দ করে উঠছে।
বাচ্চাটা যেন অবুঝ ভঙ্গিতে কেবল মেহুলকেই কাছে চাইছে! কোনো ভাষা না জেনেও, নিজের ক্ষুদ্র কন্ঠের অস্পষ্ট কাঁপনে মেহুলকে প্রতি মুহূর্তে জানিয়ে দিচ্ছে—এই অচেনা বাড়িতে তার এই পুঁচকে অস্তিত্বের কথা!
এদিকে বাচ্চাটার ব্যাকুল ডাক আর গোলগোল চোখের অবোধ আকুলতা মেহুলের জমানো সব ভয় আর দ্বিধার শক্ত দেয়ালকে যেন একটু একটু করে গুঁড়িয়ে দিতে লাগল।
অতঃপর লোহার দোলনাটার ভেতরে তোশকের ওপর হাত-পা ছুড়তে থাকা ছোট্ট ছানাটির দিকে মেহুল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। বাচ্চাটার অবোধ চোখের তারায় কোনো ভয় নেই, কুসংস্কারের কোনো কালো ছায়া নেই—কেবল আছে এক অকৃত্রিম আকুলতা।
মেহুল ধীরপায়ে দোলনাটার আরও একটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর সামান্য ঝুঁকে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে একরাশ অবাক আর অভিযোগ মাখা নরম কণ্ঠে শুধাল—
”এভাবে কী দেখছো তুমি…?”
মেহুলের কণ্ঠে শব্দ ফুটে উঠতেই দোলনার ভেতর থেকে আবার সেই মিষ্টি আওয়াজ ভেসে এলো—
”আাঁ… উঁউঁ!”
মেহুল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ফিকে হাসি ফুটিয়ে এবার হাত দুটো বুকের কাছে বেঁধে ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে গম্ভীর হওয়ার ভান করল। যেন কোনো বয়স্ক মানুষের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে, অতঃপর সে আবার বলে উঠল—
”তুমি কি আমাকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করছো? ভাবছো এভাবে কিউট এক্সপ্রেশন দিলে আমি গলে যাব?”
কথাটা শেষ হতেই খুদে রাজকন্যা যেন মেহুলের সব কথার স্পষ্ট উত্তর দিতে চাইল! সে নিজের পুঁচকে ফর্সা হাত দুটি হাওয়ায় সজোরে দুলিয়ে, কচি দুটো পা শূন্যে ছুড়ে খিলখিল ছলে যেন আবার জবাব দিল—
”আঁকা… উঁ!”
মেহুল একদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষুদেটার এই রূপসী ভাবভঙ্গি পরখ করতে লাগল। ঘরের ভেতরের কালচে আলোয় এই একরত্তি প্রাণের চঞ্চলতা দৃশ্যটাকে যেন এক অনাবিল মায়ায় মুড়িয়ে দিল।
ঠিক তখনই ছানাটি তার ক্ষুদে হাতটা নিজের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে তুলতুলে বুড়ো আঙুলটা চুষতে শুরু করল। নিজের দুই ঠোঁটের ফাঁকে আঙুল পুরে চোষার ফাঁকেই আবার নড়েচড়ে উঠে মিষ্টি এক শব্দ করে উঠল—
”উঁউঁ… উঁউঁ…”
এদিকে সেই করুণ অথচ মিষ্টি দৃশ্যটা দেখে মেহুলের পা দুটো যেন আর স্থির থাকতে পারল না। দোলনার একদম কিনারে দুই হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল সে। তুলতুলে মুখখানার এত কাছে এসে মেহুলের চোখের কোণ দুটো আবার আর্দ্র হয়ে উঠল। হৃদয়ের অতল থেকে এক ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। মেহুল বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠে অত্যন্ত করুণ সুরে ফিসফিস করে বলে উঠল—
”আমার জীবনে তোমার আগমন কেন বলো তো? কেন এলে তুমি আমার এই চরম বিষাদপূর্ণ আর অভিশপ্ত জীবনে…? নামহীন, পরিচয়হীন এক ছোট্ট ছানা তুমি! কি আদর তোমার মাঝে। কিন্তু তোমাকে ছুঁতে যে বড্ড ভয় করে … খুব ভয় হয়! যদি আমার এই ছোঁয়ায় সত্যি তোমার কোনো অনিষ্ট হয়ে যায়…?”
মেহুলের বিষাদমাখা আকুতি আর কান্নার সুর ভরা কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যেতেই—যেন এক অলৌকিক জবাবে—ক্ষুদে ছানাটি নিজের মুখের ভেতর থেকে আঙুলটা এক ঝটকায় বের করে আনল!
তারপরেই পরম আবেশে নিজের কচি দুটি হাত আবার শূন্যে বাড়িয়ে দিল মেহুলের দিকে! যেন সব কুসংস্কার আর অশুভ অপবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, হাত নাড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্র গলায় অভয় বাণী শুনিয়ে জানান দিয়ে গেল—
’কিচ্ছু হবে না… তোমার ছোঁয়ায় আমার কিচ্ছু হবে না!’
বাচ্চাটার সেই অবোধ অভয়দান আর ব্যাকুল ছটফটানি দেখে মেহুলের চোখের বাঁধ ভাঙা অশ্রু টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ল ক্ষুদুটার কাঁথার ওপর। এরপরেই মেহুলের মনের ভেতরের সব জমাট বাঁধা ভয় আর দ্বিধার দেয়াল এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল!
দোলনার কিনারে বসে থাকা মেহুলের চোখের কোণ বেয়ে নামা অশ্রুর ঝিলিক নিষ্পাপ ছানাটির নরম মুখে এসে পড়তেই, মেহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
সব দ্বিধা আর মনের জমানো ভীতিকে দূরে ঠেলে দিয়ে মেহুল ধীরে ধীরে নিজের দুটি হাত বাড়াল দোলনার ভেতরের দিকে। পরম মায়ায়, একদম পাখির পালকের মতো আলতো করে কচি তুলতুলে ছানাটিকে নিজের বুকের কাছে তুলে নিল সে।
বাচ্চাটিও মেহুলের উষ্ণ বুকের ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই অদ্ভুত এক শান্তিতে এক মুহূর্তে চঞ্চলতা থামিয়ে দিল। নিজের পুঁচকে দু-হাত মেহুলের জামার কলার শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা মেহুলের ঘাড়ে গুঁজে দিল! যেন কতকালের চেনা এক অভয় আশ্রম খুঁজে পেয়েছে এই একরত্তি প্রাণ!
মেহুল বাচ্চার তুলতুলে গাল আর নরম চুলে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস ভেসে এলো কচি গা থেকে, যা মেহুলের সারাদিনের সমস্ত মানসিক ক্লান্তি আর বিষাদকে মুহূর্তের মধ্যে ধুইয়ে মুছে এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল।
মেহুল ধীরপায়ে হেঁটে ঘরের কাঁচের জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। কোলে রাখা ছানাটিকে হালকা দোল দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল—
”তুমি কি আমাকে চিনতে পারো?”
বাচ্চাটি যেন মেহুলের কথা বুঝতে পারলো, মেহুলের ঘাড়ে মুখ রেখে “উঁহু” করে শব্দ করল। মেহুলও হালকা হেসে তার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগল। দৃশ্যটি যেন ক্যানভাসে আঁকা এক অপরূপ মাতৃত্ব আর ভালোবাসার ছায়াবিবি!
কিন্তু পরম শান্তির এই সুন্দর মায়াবী মুহূর্তটি স্থায়ী হলো খুব অল্প সময়!
হঠাৎ করেই ঘরের শান্ত বাতাসে ভেসে এলো এক তীব্র ও বিশ্রী দুর্গন্ধ! মেহুল রিতিমত ভ্রু দুটি কুঁচকে নাকের কাছে হাত নিয়ে এলো, “উফ! কিসের এত বাজে গন্ধ আসছে হুট করে?”
মেহুল ছানাটিকে কোলে নিয়েই ঘরের চারপাশের টেবিল, দোলনা আর মেঝের দিকে তাকাতে লাগল—কোথাও কিছু পড়েছে কি না দেখতে। কিন্তু ঘরে তো বাজে কিছু ফেলার মতো কেউ নেই!
গন্ধটা যখন আরও তীব্র হয়ে মেহুলের নাকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাড়ি মারতে শুরু করল, ঠিক তখনই কোলের একরত্তি ছানাটি হঠাৎ নিজের মুখটা মেহুলের ঘাড় থেকে সরিয়ে আনল!
তার ফর্সা পুঁচকে মুখটা নিমেষে লাল হয়ে উঠল, আর দুই চোখ ছানাবড়া করে মুখের ভাবভঙ্গি চরম অদ্ভুত বানিয়ে সে বিকট শব্দে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল—
”ওয়্যাঁ… ওয়্যাঁ… আঁআআআ!”
বাচ্চাটির সেই অদ্ভুত ও বিকৃত কান্নার মুখভঙ্গি আর সাথে সাথেই ভেসে আসা গন্ধের উৎস টের পেয়ে মেহুলের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! সে এক মুহূর্তে বুঝে গেল—এইমাত্র তার কোলে উঠেই এই খুদে রাজকন্যা মহা-কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেলেছে! অর্থাৎ, নিচ দিয়ে একদম হলুদ কালারের পানীয় ছেড়ে ভাসিয়ে দিয়েছে!
এদিকে বাচ্চাটি যেন কাজটি করে নিজে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে, আর সেই অপরাধবোধ থেকেই মুখ উঁচিয়ে মেহুলের দিকে চেয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে চলেছে! যার ফলে এতক্ষণ ধরে চলা গম্ভীর, বিষাদময় আর মায়াবী পরিবেশটা মুহূর্তে যেন এক হাসির নাটকে পরিণত হলো। পটি করে বাচ্চাটির সেই অদ্ভুত ভয়ার্ত চোখের চাহনি আর কান্নার চেহারা দেখে মেহুল নিজের ঠোঁট চেপে রাখতে পারল না।
সারাদিনের জমে থাকা সমস্ত দুঃখ আর কষ্ট ভুলে গিয়ে মেহুল হুট করেই খিলখিল করে হেসে উঠল!
”ওহ খোদা! তুমি তো দেখি মহা দুষ্টু! এতক্ষণ এত প্রেম দেখিয়ে আমাকে কোলে তুলে নিতে বাধ্য করে এখন এই কাজটা করলে!”—মেহুল হাসতে হাসতে শব্দ করে বলল, আর ছানাটি তখনো তার দিকে চেয়ে ক্ষুদ্র গলায় কেঁদে চলেছে!
বাচ্চাটার সেই নিষ্পাপ দুষ্টুমি আর আকুল কান্না কানাগলি পেরিয়ে মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফোটা হাসিটা তখনো মিলিয়ে যায়নি। তাই সে হাসতে হাসতেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আলতো হাতে খুদে রাজকন্যাকে বিছানায় শায়িত করল। প্যাম্পারস বদলে তাকে ভালো করে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার তোড়জোড় শুরু করতেই খাটের ওপর রাখা মেহুলের ফোনটা সুর তুলে বেজে উঠল।
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই মেহুলের মুখে মৃদু স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। কারন কলটি করেছে মিনার!
মেহুল ফোনটা রিসিভ করে স্পিকার অন করে হাত বাড়িয়ে পাশে টেবিলে রাখল, যাতে হাত দুটো খালি রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়। ওপাশ থেকে মিনারের হাঁসফাঁস করা আকুল কণ্ঠ ভেসে এলো—
”অ্যাই মেহু! কেমন আছিস রে তুই? সত্যি বলছি, তোকে ছাড়া এই বাড়িটা একদম খাঁ খাঁ করছে! কখন ফিরবি বল তো? আমার তো আর ধৈর্য কুলাচ্ছে না!”
মেহুল আলতো করে বাচ্চাটির পরনের ভেজা কাপড়টা ছাড়াতে ছাড়াতে নরম গলায় জবাব দিল, “আরে শান্ত হ মিনার! আর মাত্র দুটো দিন… দুই দিন পরই তো ক্যাম্প শেষ করে ফিরছি আমি।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বিছানার ওপর থেকে ছানাটি হুট করে নড়েচড়ে উঠল! তার কচি দুটি ঠোঁট নেড়ে গম্ভীর এক আওয়াজ করে উঠল—
”উঁউঁ… আঁ!”
মেহুল চমকে উঠে সাথে সাথে বাচ্চাটার দিকে তাকাল। অবাক কাণ্ড! কচি মুখখানা এক নিমেষে একদম লালচে হয়ে উঠেছে, আর গোলগোল চোখ দুটো মেহুলের দিকে স্থির করে সে হঠাৎ উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল—
”ওয়্যাঁ… ওয়্যাঁ… আঁআআআ!”
আকস্মিক এই কান্ডে মেহুল যেন একদম তাজ্জব হয়ে গেল! বাচ্চাটি কি তবে মেহুলের কথা বুঝতে পেরেছে? মেহুল যে আর মাত্র দু-দিন পর চলে যাবে—এই বিদায়ের আভাস পেয়েই কি তার এই বিষম কান্না!
এদিকে ফোনের ওপাশ থেকে মিনারের ভ্রু জোড়া নিমেষে কুঁচকে গেল। বাচ্চার তীব্র কান্নার আওয়াজ পেয়ে সে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “অ্যাই মেহু! বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কোত্থেকে আসছে রে! তুই কার বাচ্চা নিয়ে বসে আছিস?”
মেহুল কথা বাড়ানোর সময় না পেয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে ভিডিও কল স্যুইচ অন করে বাচ্চাটিকে আলতো করে নিজের কোলে তুলে নিল।
ভিডিও স্ক্রিনে মেহুলকে দেখতেই মিনার হাসতে যাবে, ঠিক তখনই মেহুলের কোলে পরম মমতায় চেপে থাকা সেই একরত্তি ফুটফুটে ছানাটিকে দেখতে পেয়ে মিনারের চোখ এক মুহূর্তে চড়কগাছ হয়ে গেল! মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে গেল তার!
সে কয়েক সেকেন্ড মেহুল আর সেই বাচ্চার দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। তারপর আকস্মিক তাজ্জব হয়ে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়তে শুরু করল—”ওরে বাবারে! এটা কার বাচ্চা মেহু! তোর কোলেই বা এলো কোত্থেকে?
একের পর এক প্রশ্নে মেহুল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অতঃপর মেহুল আর লুকোচুরি না করে গম্ভীর ও থমথমে গলায় ডাস্টবিনের পাশ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করে থানার সমস্ত ঘটনার বিস্তারিত মিনারকে খুলে বলল।
এদিকে সবটা শোনার পরে ফোনের ওপাশে মিনার যেন চরম এক অদ্ভুত আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল! তার চোখ-মুখের বিস্ময় নিমেষে বদলে গেল এক অনাবিল খুশিতে।
”ভেরি গুড সিস্টার। তোর কাজে আমি খুব খুশি, খুশিতে আমার ঘাড় একদম জিরাফের মতো লম্বা হয়ে গেছে দেখ।” মিনার রীতিমত ঘাড় উচিয়ে দেখাতে লাগলো।
যা দেখে মেহুল ভ্রু কুঁচকালো, কিন্তু মিনার তাকে পাত্তা না দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে মুখ আরেকটু এগিয়ে এনে একদম আহ্লাদী গলায় বাচ্চাটির দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠল—
”আরে পরিটা, আমার পুতুল রানী! এতো দেখছি একদম আমার ভাগ্নি! ওরে আমার গোলুগোলু মামা বল তো… মামা বল! মামা তোর জন্য কত সুন্দর সুন্দর খেলনা নিয়ে আসবে দেখিস!”
মিনার এমন উল্লাসে বাচ্চার দিকে তাকিয়ে ডাগর ডাগর চোখে মামা মামা বলে ডাকতে লাগল, যেন বাচ্চাটা অন্য কারো নয়—একেবারে মেহুলের নিজেরই একরত্তি রক্ত! মিনারের সেই পাগলামি আর বাচ্চার অবোধ চাহনি দেখে মেহুলের বুক চিরে গড়িয়ে এলো এক অদ্ভুত, মায়াবী আর উষ্ণ অনুভূতির জোয়ার!
মিনার যখন স্ক্রিনের ওপাশ থেকে মুখ বাকিয়ে পরম আহ্লাদে বাচ্চার দিকে চেয়ে একের পর এক “মামা… মামা…” করে ডেকে চলেছিল, ঠিক তখনই রুমের খোলা দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল হুমা।
হুমার পরনে ক্যাজুয়াল ঘরের পোশাক, চুলগুলো ওপরে খোঁপা করা। সে হাতে বাচ্চার ফিডার আর দুধের কোটা নিয়ে রুমে ঢুকতেই মিনারের সেই গগনবিদারি আর বিকট সাউন্ডের মামা ডাকা তার কানে গিয়ে ধাক্কা মারল!
হুমা মিনারের দিকে খেয়ালই করেনি। সে ঢুকেই নিজের কান দুটো এক হাত দিয়ে সামান্য চেপে ধরে মেহুলের দিকে চেয়ে খুব বিরক্তি আর বিস্ময় মাখানো মুখে বলে উঠল—
”অ্যাই মেহু! এত রাত-বিরাতে ঘরের মধ্যে কে এমন ছাগলের মতো ব্যাঁ ব্যাঁ করে ডাকছে রে?! কান তো একবারে ঝালাপালা করে দিল!”
কথাটা বলা মাত্রই ভিডিও কলের স্ক্রিনে ভেসে থাকা মিনারের মুখাবয়বটা নিমেষে দেখার মতো হয়ে গেল!
তার গলার আওয়াজ এক মুহূর্তে মাঝপথেই থমকে গেল। চোখ দুটি চড়কগাছ হয়ে গোল হয়ে এলো, আর ফোলা ফর্সা গাল দুটো অপমানে ও বিষম খেয়ে একদম লাল হয়ে উঠল। মিনার সাথে সাথে বুঝতে পারল—হুমার এই মোক্ষম ‘ছাগল’ উপাধিটি আর কাউকে নয়, সোজা তাকেই উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়েছে! সে বিষম খাওয়ার মতো করে কয়েকবার মুখের আবহাওয়া বদলালো, যেন নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারছে না!
এদিকে মেহুল পুরো দৃশ্যটা দেখে নিজের ঠোঁট চেপে রাখতে পারল না। তার এতক্ষণের থমথমে মুখে এক গাল বাঁধভাঙা হাসি ফুটে উঠল। সে হাসি চেপে কোনোমতে কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে স্ক্রিনের দিকে ইশারা করে হুমাকে উদ্দেশ করে নরম গলায় বলল—
”হুমা… ছাগল ! তবে রক্তমাংসের।”
মেহুলের কথাটা কানে পৌঁছাতেই হুমায় যেন বিদ্যুৎ চমকে উঠল! সে তড়িঘড়ি করে নিজের নজর ঘুরিয়ে মেহুলের হাতের ইশারা অনুযায়ী ফোনটির স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
আর তাকাতেই দেখতে পেল—স্ক্রিনে এক সুদর্শন, ফর্সা যুবক চোখ-মুখ খিঁচিয়ে একদম হা করে তার দিকেই বোকার মতো চেয়ে আছে!
এক সেকেন্ডের মধ্যে পরিস্থিতিটা অনুধাবন করতে পেরে হুমার চেহারার সব তেজ যেন এক লহমায় ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। চরম লজ্জায় আর অস্বস্তিতে হুমার ফর্সা গাল দুটি এক মুহূর্তে টকটকে লাল হয়ে উঠল! সে হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে এক পা পিছিয়ে গেল, “ওহ মাই গড! আই আম সো সরি! আমি একদম দেখতে পাইনি…”
এদিকে মিনারের অবস্থা তখন আরও বেগতিক! এক সুন্দরী মেয়ের মুখে এমন সামনাসামনি জঘন্য উপাধি খেয়ে সে এতটাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল যে আর এক সেকেন্ডও সেখানে লাইভে থাকার সাহস পেল না। কোনো কথা না বলে, এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে মিনার ধপাস করে ভিডিও কলের লাল বোতামটা চেপে ফোনটা এক ঝটকায় কেটে দিল!
স্ক্রিন কালো হয়ে যেতেই মেহুল আর নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না, সে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে সশব্দে হেসে উঠল। আর হুমা নিজের বোকা বনে যাওয়ার কাণ্ড দেখে লজ্জা আর অনুশোচনায় জিভ কেটে দোলনার পাশে গিয়ে বসে পড়ল!
ভিডিও কলটা কেটে গিয়ে স্ক্রিনটা একদম অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পরও রুমের পরিবেশজুড়ে এক আনন্দময় হাল্কা হাওয়া বইতে লাগল। মিনার যেভাবে কোনো কথা না বলে কাট করে পালিয়ে বেঁচেছে, সেই দৃশ্যটা বারবার মেহুলের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
মেহুল আলতো করে কোলে থাকা বাচ্চাটিকে আরেকটু উঁচিয়ে ধরে হুমার লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে সশব্দে হেসে উঠল—
”হুমায়রা… তোকে একটা সত্যি কথা বলি? জীবনে এই প্রথম মনে হয় কোনো মেয়ে আমার এমন হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং ভাইটাকে সামনাসামনি একদম ‘ছাগল’ ডেকে দিল! তুই যে ওর অহংকারে কী বড় একটা আঘাত হানলি, তুই তা ধারণাও করতে পারবি না রে!”
মেহুলের কথার বাঁধভাঙা হাসিতে পুরো রুম যেন মুহূর্তের মধ্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
এদিকে হুমা চোখ দুটো বন্ধ করে আকুল গলায় আবদার করার মতো সুর তুলে বলে উঠল—
”ধুর মেহু, থামবি তুই! আমি জানতাম নাকি যে ফোনের ওপাশে তোর ভাই ভিডিও কলে বসে এভাবে মুখ খিঁচিয়ে ডাকছে! তুই তো আমাকে আগে বলবি! অনাহুত এভাবে হুট করে ঢুকেই এমন এক কাণ্ড করে ফেললাম… ধুর, ভালো লাগে না আর! উনি নিশ্চয়ই এখন আমাকে বিদঘুটে মেয়ে ভাবছে, তাই না ?”
হুমার এমন কুণ্ঠিত আর লজ্জার এক্সপ্রেশন দেখে মেহুলের হাসি যেন থামতেই চাইছিল না। সে কোল থেকে বাচ্চাটাকে সাবধানে এনে বিছানায় নরম তোশকের ওপর শুইয়ে দিল। তারপর হুমার দিকে তাকিয়ে পিঠ চাপড়ে বলল—
”আরে ছাড় তো! মিনার ওইসব একদম মনে ধরে রাখবে না, হ্যাঁ তবে হয়তো লজ্জায় খাটের নিচে লুকিয়ে পড়বে! যেমন ছোটবেলায় করতো। বাদ দে তুই এখন এই পাজামাটা একটু পরিয়ে দে তো ছানাটাকে, দেখ কেমন গোলগোল চোখে তোকে পরখ করছে।”
হুমাও আর কথা না বাড়িয়ে লজ্জার রেশটুকু একপাশে সরিয়ে রেখে বিছানার পাশে এসে মেহুলের সাথে পুচকু রাজকন্যার নতুন প্যাম্পারস আর জামা পরানোর কাজে হাত লাগাল। কিন্তু দুজনের মনের ভেতরেই তখন এক চিলতে মিষ্টি আনন্দের রেখা ফুটে উঠেছিল—যা বিকেলের কালচে মেঘ আর গভীর রাতের বিষাদময় দুঃস্বপ্নকে মুহূর্তের জন্য হলেও ভুলিয়ে দিতে পেরেছিল!
”ভাই! ভাবিদের তো আর মাত্র দু-দিন ক্যাম্প আছে। এরপরেই নাকি ওনাদের পুরো টিমটা ব্যাগপএ গুটিয়ে ঢাকা চলে যাবে!”
কবির খবরটা বেশ উত্তেজনা নিয়ে এসে শোনাল সালমানকে। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে এই চমকপ্রদ খবর, তার চোখে-মুখে কোনো প্রকার ভাবান্তর বা উথাল-পাথাল উত্তেজনার আঁচটুকুও দেখা গেল না। বরং সালমান শাহ নেওয়াজ পরম আয়েশে বেতের একখানা আভিজাত্যপূর্ণ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার হাতের চিনা মাটির কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে—রাজশাহীর বিখ্যাত কালাইয়ের রুটি আর ঘন খাঁটি দুধের সুবাস ছড়ানো গরম চায়ের স্বাদে সে যেন আবেশে চোখ দুটো বুজে নিল।
কবির সালমানের এমন পাথর মার্কা নিথর নীরবতা দেখে একটু ইতস্তত করল। তারপর গলাটা সামান্য খাঁকারি দিয়ে আবারও মুখ খুলল—
”ইয়ে মানে ভাই… ভাবি যদি ঢাকা চলে যান, আপনিও কি আবার ওনার পিছু পিছু ঢাকা যাবেন?”
সালমান তখনও একবিন্দু নড়ল না। বরং চায়ের কাপে কালাইয়ের রুটিটি আরেকটু ডুবিয়ে মুখে পুরে ধীরেসুস্থে নিজের মনেই তার অনাবিল স্বাদ উপভোগ করতে লাগল।
সালমানের এই নীরবতার রহস্য ভেদ করতে না পেরে কবির অতিষ্ঠ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুবর দিকে সামান্য ঝুঁকে নিচু স্বরে কানে কানে ফিসফিস করে উঠল—”ধ্রুব ভাই! ভাই এমন টু মেরে থমকে বসে আছে কেন বলুন তো?! খবরটা শুনেও কোনো নড়াচড়া নেই যে!”
ঠক তখনি পেছন থেকে রবি গাম্ভীর্য বজায় রেখে কবিরের দিকে একনজর চোখ বাঁকিয়ে তাকাল। তারপর কবিরের কাঁধে এক হাত চেপে ধরে চাপা গলায় সতর্ক করে দিল—”তুইও চুপচাপ মুখ বন্ধ করে থাক কবির! অহেতুক বেশি কথা বললে পরে কিন্তু…..!”
রবির সেই হিমশীতল হুমকিতে কবির সাথে সাথে শুকনো ঢোক গিলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে বন্ধ করে ফেলল।
এদিকে সালমান নিজের আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে কাপের শেষ চুমুকটুকু পরম আয়েশে শেষ করল। পকেট থেকে ধবধবে সাদা টিস্যু বের করে আলতো হাতে নিজের ঠোঁটের কোণ দুটো মুছতে মুছতে অত্যন্ত শান্ত, বরফশীতল কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলে উঠল—
”খাওয়ার সময় আমার আড্ডাবাজি বা কথা বলা একদম পছন্দ না, কবির। সে কথা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন! এই শেষবার তোকে বলে দিলাম, এরপর যেন আর মনে করিয়ে দিতে না হয়।”
সালমানের শিতল কন্ঠ ভেসে উঠতেই কবির ভয়ে দ্রুত মাথা নেড়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিল, “জি ভাই… ভুল হয়ে গেছে।”
অতঃপর কিছুক্ষন নিরবতা, হঠাৎ ঝংকার তুলে রিং এর শব্দ হলো সালমান এক পলক তাকিয়ে টেবিল থেকে তার স্মার্টফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে এক পরিচিত নাম ভেসে উঠতেই সে কল বাটনে চাপ দিয়ে ফোনটা কানে ধরল। অপর প্রান্ত থেকে কল রিসিভ হতেই সালমানের সেই গমগমে, গম্ভীর আর কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠ ভারী হয়ে নেমে এলো—
”সময় হয়ে এসেছে। আপনি এবার আপনার কাজ শুরু করতে পারেন।”
ওপাশ থেকে ওয়ান-ওয়ে সংলাপে কেউ একজন সংক্ষিপ্ত জবাব দিতেই সালমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, কুটিল মুচকি হাসি। সে আর কোনো কথা বাড়াল না, ফোনটা আবার ধীরালয়ে কাঁচের টেবিলে রেখে চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল।
বর্তমানে সালমান দাঁড়িয়ে আছে রাজশাহীর পদ্মা রিভারভিউ আর লাগোয়া সুবিশাল পদ্মাদীঘির পাড়ে গড়া তার সবচেয়ে প্রিয় এক একান্ত নিভৃত কোণে—একটি সুদৃশ্য গোলঘরে। মাঝেসাঝে যখন মনের ভেতরের ঝড়গুলোকে একাকী সামলাতে হয়, তখন সে এখানে এসে একটু সময় কাটায়। একটু দূরেই একটি অভিজাত রেস্টুরেন্ট থাকলেও, সালমান শাহ নেওয়াজ যখন এই গোলঘরে পদার্পণ করে, তখন এই নির্দিষ্ট এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়!
সালমান ধীরপায়ে হেঁটে গোলঘরের খোলা খিলান আঁকা বারান্দার কাছে এসে দাঁড়াল। রাতের নিস্তব্ধতায় সুবিশাল দীঘির কালো জলে দূরের ছোট ছোট পর্যটক বোটগুলোর রঙিন আলোর ছায়া রূপকথার মতো নাচানাচি করছে। মৃদু রাতের হাওয়া সালমানের চুলগুলোকে আলতো করে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর কিছুক্ষণ দীঘির রূপের দিকে অপলক চেয়ে থাকার পর, সালমান পেছনে না ফিরেই গম্ভীর গলায় ডাকল—
”কবির।”
কবির চটজলদি এক পা এগিয়ে এসে বিনীত গলায় বলল, “জি ভাই!”
”কী যেন বলছিলি তুই একটু আগে?”—সালমানের গলায় জিজ্ঞেসা।
কবির শুকনো ঢোক গিলে সাবধানে কথা সাজিয়ে বলল, “ওই যে ভাই… বলছিলাম ভাবি তো দুই দিন পর পুরো মেডিক্যাল ক্যাম্পের টিম সহ ঢাকায় চলে যাবে।”
সালমান দীঘির জলের দিকে চেয়ে থেকেই ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, তীক্ষ্ম হাসি ফুটিয়ে হালকা করে মাথা নাড়ল—
”উহু! ভুল।”
কবির বিভ্রান্ত হয়ে চোখ গোলগোল করে শুধাল, “কী ভুল ভাই? আমি কি ভুল তথ্য এনেছি নাকি?”
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৭ (২)
সালমান ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার দুই হাত প্যান্টের পকেটে গোঁজা, চোখের তারায় এক একচ্ছত্র মালিকানার অপ্রতিরোধ্য যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল! অতঃপর সে ধীর ও ভারী গলায় বলে উঠল—
”মেডিক্যাল ক্যাম্পের টিম ঢাকায় ফিরে যাবে… এটা সত্য। কিন্তু তোর ভাবি নয়! ও এই রাজশাহীর মাটিতে পা রেখেছিল নিজের ইচ্ছেতে… কিন্তু এখান থেকে ও ফিরে যাবে শুধুমাত্র আমার ইচ্ছেতে!”
