শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৫
আফীফা আফনান
”ভাইয়া মেহুল আপুকে বিয়ে করেনি দেখে ইকবাল মামা যদি রেগে আমাদের এই বাড়ি থেকে বের করে দেয় আম্মু, তখন আমরা কোথায় যাবো? আমি কিন্তু আগেভাগেই বলে দিচ্ছি, আমি এই বাড়ি ছেড়ে একদম কোথাও যাবো না। আমার নিজের এসি রুমটা ছাড়া আমার কিন্তু অন্য কোথাও একটুও ঘুম আসে না!”
— সোফায় বসে নিজের পলিশ করা নখ গুলোর দিকে তাকিয়ে, নাক-মুখ কুঁচকে নিজের মা সুমনা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল আরমানের ছোট বোন কেয়া।
কেয়ার কথায় তাল মিলিয়ে তার ঠিক পাশেই বসা শিরিনা বেগম একটু চিন্তিত মুখে সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ আপা, কেয়া মামনি কিন্তু ঠিকই বলছে। এই নিয়ে আপনি কিছু ভেবেছেন কি? মেহুল যেভাবে বাড়াবাড়ি শুরু করেছে, ইকবাল ভাই যদি সত্যিই আপনাদের সবাইকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেন?”
শিরিনা বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই আনিকা পাশ থেকে মুখ বাঁকিয়ে ফোঁড়ন কাটলো, “বললেই হলো নাকি! আমার শাশুড়ি ফুফার বোন হন। রক্তের একটা টান আছে না? সামান্য একটা ওলটপালট আর ছোট একটা কারণে ভাই কি কখনো নিজের বোন আর ভাগ্নেদের ঘর থেকে বের করে দিতে পারে? অসম্ভব!”
সবার ভেতরের এই চাপা ভয় আর উৎকণ্ঠা দেখে সুমনা বেগম নিজের ঠোঁটের কোণে এক চতুর, আত্মবিশ্বাসী ও কুটিল হাসি ফুটিয়ে তুললেন। অত্যন্ত আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে তিনি চড়া গলায় বললেন, “ওরা যদি মনেপ্রাণে ও চায় , তবুও আমাদের এই বাড়ি থেকে বের করতে পারবে না। ইকবাল শিকদার খুব ভালো করেই জানে, সে যদি আমাদের গায়ে হাত দেওয়ার বা এই বাড়ি থেকে তাড়ানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ক্ষতিটা শেষমেশ তারই হবে! শিকদারদের এমন কিছু নাড়িভুঁড়ির খবর আমার জানা আছে, যা প্রকাশ পেলে ওদের মান-ইজ্জত সব ধুলোয় মিশবে। তাই বলছি, এত টেনশন নেওয়ার কিচ্ছু নেই। যেমন চলছে, সবকিছু তেমনই চলবে।”
সুমনা বেগমের এই মারপ্যাঁচ আর আত্মবিশ্বাসী আশ্বাসবাণীতে ঘরের বাকি সবার মুখে যেন স্বস্তির নিশ্বাস নামল। কেয়া আর শিরিনা বেগম একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
এদিকে, ওই একই রুমের বিশাল জানালাটার গ্রিলে হাত ঠেকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল আরমান। পেছনের সবার প্রতিটি কথাই তার কানগোচর হচ্ছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বা ইকবাল শিকদারের রাগ নিয়ে তার মনে কোনো বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, তার মায়ের মাথায় যে পরিমাণ চতুরতা আর বিষাক্ত বুদ্ধি আছে, তা দিয়ে তিনি অনায়াসেই সব পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নেবেন।
আরমানের আসল ভাবনা এখন অন্য কিছুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তার চোখ দুটো জানালার ওপারে এক অদ্ভুত শূন্যতায় স্থির। সে মনে মনে কোনো এক গভীর ও মারাত্মক পরিকল্পনা শেষ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করছে, যা এই শিকদার পরিবারের পায়ের নিচের মাটি আজীবনের জন্য কাঁপিয়ে দেবে।
এমন সময় আনিকা সোফা ছেড়ে উঠে এসে আরমানের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার বাহুতে আলতো করে নিজের হাত রেখে আহ্লাদী সুরে বলল, “বেবি, আমাদের হানিমুনের ব্যাপারে কী ভাবলে? কবে যাচ্ছি আমরা?”
আরমান নিজের ভেতরের সব কুটিল চিন্তা এক লহমায় আড়াল করে আনিকার দিকে তাকিয়ে এক মিষ্টি, মায়াবী হাসি দিল। আনিকার গালে আলতো করে টোকা দিয়ে বলল, “তোমার পছন্দের জায়গা অলরেডি ডান, বেবি! সুইজারল্যান্ডের টিকিট আমি বুক করে ফেলেছি। অফিসের এদিকের কিছু জরুরি কাজ আজকের মাঝেই আমি সামলে নিচ্ছি, আমরা আগামীকাল রাতের ফ্লাইটেই রওনা হবো।”
আরমানের মুখে এই সুখবর শোনা মাত্রই আনিকার মুখে আনন্দের এক ঝলমলে জাদুকরী হাসি ফুটে উঠল। সে খুশিতে আরমানকে জড়িয়ে ধরতে যাবে, ঠিক তখনই সোফা থেকে কেয়া চেঁচিয়ে উঠল, “আমার জন্য কিন্তু ব্র্যান্ডেড গিফট আনতে হবে ভাইয়া! লিস্ট অলরেডি মোবাইলে তৈরি করে রেখেছি, আজ রাতেই তোমায় হোয়াটসঅ্যাপ করে দেবো।”
আরমানদের রুমের ভেতরে যখন বেইমানির পর এক পশলা আনন্দের ঝিলিক আর উৎসবের আমেজ চলছে, ঠিক তখনই সেই রুমের আধবোজা দরজার ঠিক পাশে, দেয়াল ঘেঁষে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল মেহুল।
মূলত সকাল সকাল তার ছোট মামা আজমল সাহেবের এক মাসের প্রয়োজনীয় ও দামি ওষুধের প্যাকেটটা মামি শিরিনা বেগমের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই সে মামিকে খুঁজতে খুঁজতে এই দিকটায় এসেছিল। কিন্তু দরজার কাছাকাছি আসতেই ভেতরের চড়া গলার কথোপকথন শুনে তার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ভেতরের সবটুকু কথা শুনল।
কেয়া, আনিকা কিংবা শিরিনা বেগমের সস্তা দেখনদারি কথাগুলোকে মেহুল মনে মনে চরম অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যের সাথে অগ্রাহ্য করলেও—সুমনা বেগমের বলা শেষ কথাগুলোর টোন আর আত্মবিশ্বাস মেহুলের হৃদয়ে যেন এক গভীর ও তীব্র সন্দেহের জন্ম দিল।
‘ক্ষতিটা ইকবাল শিকদারেরই হবে’—সুমনা বেগমের এই চতুর উচ্চারণ মেহুলকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। তার মানে আরমান আর সুমনা বেগম শুধু বেইমানিই করেনি, তারা শিকদার পরিবারের নেপথ্যে বড় কোনো ধ্বংসের ফাঁদ পেতে রেখেছে!
মেহুল নিজের হাতের ওষুধের প্যাকেটটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের মণি দুটো মুহূর্তের মধ্যে ক্ষুরধার হয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের সময় নষ্ট করল না। কোনো রকম শব্দ না করে, অত্যন্ত নিঃশব্দে সে আরমানদের দরজার পাশ থেকে সরে এলো।
মেহুল যখন হাঁটতে হাঁটতে সুমনা বেগমের সেই চতুর ও আত্মবিশ্বাসী কথাগুলোই ভাবছিল। কী এমন কারণ থাকতে পারে যার জন্য তার বাবা চাইলেও সুমনা বেগমকে এই বাড়ি থেকে বের করতে পারবেন না? এই শিকদার পরিবারের এমন কী গোপন রহস্য ওনাদের জানা আছে? মেহুল বুঝতে পারছিল না এই বিষয়ে সে কাকে জিজ্ঞেস করবে, আর কে-ই বা তাকে সঠিক তথ্য দিতে পারবে।
ঠিক তখনই ড্রয়িং রুম পার হওয়ার সময় মেহুলের নজর গেল রান্নাঘরের দিকে। সেখানে দুপুরের রান্নার কাজে ব্যস্ত ফরিদা আর মেহুলের মনি মিনারা বেগম। চুলার গরমে মিনারা বেগমের কপাল ও চোখ-মুখে সারাদিনের কাজকর্মের ক্লান্তি আর ঘাম স্পষ্ট। মেহুল আর দ্বিধা না করে ধীরপায়ে রান্নাঘরে এগিয়ে গেল। গিয়েই সে পেছন থেকে আলতো করে মিনারা বেগমকে জড়িয়ে ধরল।
হঠাৎ এই তীব্র গরমের মাঝে মেহুলকে রান্নাঘরে দেখে মিনারা বেগম চমকে উঠলেন। তিনি মেহুলের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে স্নেহের সুরে বকলেন, “এখানে কেন এসেছিস মেহু? দেখেছিস কত গরম এখানে! যা তুই বাইরে গিয়ে ফ্যানের নিচে বোস। কিছু লাগলে আমাকে বল, আমি দিয়ে আসছি।”
মেহুল মিনারার কথা শুনল না, বরং আরও একটু লেপ্টে গিয়ে মিনারা বেগমের ঘাড়ের ওপর নিজের থুতনিটা রাখল। অত্যন্ত আদুরে গলায় আবদার করল, “আমার কিছু লাগবে না, আমার শুধু তোমাকে চাই মণি। তোমাকে কিছুক্ষণের জন্য ধার পাওয়া যাবে? কাজ শেষে আবার ফিরিয়ে দেবো।”
মেহুলের এমন বাচ্চাসুলভ ও মিষ্টি কথায় মিনারা বেগমের ক্লান্ত মুখে একটা সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। তিনি চুলার আঁচটা কমিয়ে মেহুলের দিকে ঘুরে বললেন, “পাগলী মেয়ে! আমাকে দিয়ে কী করবি তুই শুনি?”
”একটু আদর খাবো,” মেহুল এবার মিনারা বেগমের ঘাড়ে নিজের নাক ঘষে গভীর এক নিশ্বাস নিয়ে বলল, “তোমার ভেতর থেকে না একটা অদ্ভুত চেনা ‘মা’মা গন্ধ’ আসে মণি। ওই ওমটুকু আমার এখন খুব প্রয়োজন।”
আকস্মিক মেহুলের মুখ থেকে এই ‘মা’মা গন্ধ’র কথা শুনে মিনারা বেগমের হাতের নাড়াচড়া যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের কোণে এক লহমায় ভেসে উঠল এক গভীর আকুলতা ও স্নেহ। তিনি পরম মমতায় মেহুলের মুখের দিকে তাকালেন। অতঃপর নিজের এক হাত দিয়ে মেহুলের গালে আলতো করে আদর বুলিয়ে, তার থুতনিটা আলতো করে ধরে কপালে একটি স্নেহচুম্বন আঁকলেন। বললেন, “ঠিক আছে চল, আমার পরীটার যখন আদর চাই, তখন সব কাজ তোলা থাক।”
মেহুল মিনারা বেগমকে হাত ধরে টেনে নিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে বসল। বসার আগে সে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আশপাশটা ভালোভাবে লক্ষ্য করে নিল যে সুমনা বেগম বা আরমানদের কেউ আশেপাশে আছে কিনা। চারপাশ নিরাপদ দেখে সে মণির একদম কাছে ঘেঁষে বসল। তার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “আমাকে একটা সত্য কথা বলবে মণি?”
মিনারা বেগম মেহুলের চোখের সিরিয়াসনেস দেখে কিছুটা দমে গেলেন, তবুও মুখে স্বাভাবিকতা বজায় রেখে বললেন, “হ্যাঁ মা, কী জানতে চাস তুই?”
”এই পরিবারে বা আমার লাইফে এমন কোনো সত্য কি আছে যা আমি এখনো জানি না? কিংবা… যা আমাকে কখনো জানতেই দেওয়া হয়নি?”
হঠাৎ মেহুলের মুখে এমন এক জটিল ও অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন শুনে মিনারা বেগম ভেতরে ভেতরে ভীষণ চমকে উঠলেন। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলেও বাইরে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললেন, “আজ হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন করছিস মেহু? তোর থেকে কেন কেউ কিছু লুকাবে বল? তুই হলি আমাদের একমাত্র পরী, আর এই শিকদার বাড়িতে তোর আড়ালে লুকানোর মতো কী-ই বা থাকতে পারে!”
মেহুল খুব সূক্ষ্মভাবে মিনারা বেগমের চোখের পলক পড়া আর মুখের ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করছিল। সে নিশ্চিত হলো, তার মণি কিছু একটা লুকাচ্ছে যা সে প্রকাশ করতে চাইছে না। মেহুল মিনারের হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “তুমি না আমার মণি? তুমিই তো আমায় সর্বদা শিখিয়েছ যে কোনো পরিস্থিতিতেই সত্য কথা বলতে হয়। তাহলে আজ তুমি আমার সাথে মিথ্যে বলছ কেন? আমি নিজের কানে আজ ফুপুকে বলতে শুনেছি—বাবা চাইলেও নাকি ওনাকে কখনোই এই বাড়ি থেকে বের করতে পারবেন না। এটা করলে নাকি উল্টো বাবারই বড় ক্ষতি হবে! আমার জানামতে এই বাড়ি, এই ব্যবসা সবটাই বাবা নিজের রক্ত জল করা পরিশ্রমে অর্জন করেছেন, এখানে সুমনা ফুপু বা আরমানদের কোনো অবদান ছিল না। তাহলে ওনাকে তাড়িয়ে দিলে বাবার এমন কী ক্ষতি হবে, মণি? আমাকে বলো!”
মেহুলের এই অকাট্য যুক্তির সামনে মিনারা বেগম যেন একদম চুপসে গেলেন। তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এক ধরনের অজানা ও তীব্র আতঙ্ক তার চোখে-মুখে খেলা করতে লাগল। যে গোপন কথাটি তারা দীর্ঘ বছর ধরে, বহুমাত্রিক প্রাচীর তুলে মেহুলের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছিল—আজ কি তবে সেই সত্যের বাঁধ ভেঙে যাবে?
মিনারা বেগমকে চুপ থাকতে দেখে মেহুল এবার ব্যাকুল হয়ে উঠল। তার চোখে জল টলমল করে উঠল। সে বলল, “তোমাকে আমার কসম মণি! তোমার মনে যা আছে, যা জানো—সব আমাকে বলো। কী লুকিয়ে রেখেছ তোমরা আমার কাছ থেকে? আমি চাই না আমার জীবনের কোনো চরম সত্য আমি বাইরের কোনো মানুষের মুখ থেকে কটু কথা হিসেবে শুনি। আমি চাই আমার পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষটা আমাকে সেটা জানাক।”
”তোমাকে আমি সব সত্যটা বলছি, মেহু মা।”
আকস্মিক পেছন থেকে চেনা, গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বর শুনে মিনারা বেগম আর মেহুল দুজনেই চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। তারা দেখল, তাদের থেকে কিছুটা দূরে দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং জাবেদ ইকবাল শিকদার।
দুদিন ধরে মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া আরমানের বেইমানির ঘটনায় তিনি কিছুটা শোকাহত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকলেও, এই মুহূর্তে ওনার চোখে-মুখে সেই চিরচেনা রাজকীয় গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তা ফিরে এসেছে।
ইকবাল শিকদার মেহুলের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ অটল কণ্ঠে বললেন, “আমার সাথে এসো, মেহু।”
বলেই ইকবাল সাহেব আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। মেহুল আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের বাবার পিছু নিল, আর তাদের ঠিক পেছনে পেছনে এক বুক আতঙ্ক নিয়ে পা বাড়ালেন মিনারা বেগম।
একসময় মেহুল যখন তার বাবার শয়নকক্ষে প্রবেশ করল, সে দেখল ইকবাল সাহেব ঘরের বিশাল জানালার গ্রিল ধরে বাইরের দিগন্তের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার ডান হাতে একটি পুরনো, কিছুটা জীর্ণ কিন্তু সযত্নে রাখা ডায়েরি। মেহুল ধীরপায়ে গিয়ে তার বাবার পাশে দাঁড়াল।
ইকবাল সাহেব মেহুলের দিকে না তাকিয়েই, শূন্যে দৃষ্টি রেখে হাতের ডায়েরিটা মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। অত্যন্ত ভারী ও আবেগময় কণ্ঠে বললেন, “মোহনা মানে তোমার মায়ের ডায়রি। তোমার মনের ভেতর তোলপাড় করা সকল প্রশ্নের উত্তর… এই ডায়েরিটাতে আছে মেহু। সময় সুযোগ করে একা বসে এটা পড়ে নিও। আর হ্যাঁ…”
ইকবাল সাহেব এবার মেহুলের দিকে ফিরলেন। ওনার প্রবীণ চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত আর্দ্রতা।
মেহুলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “একটা বাবা হিসেবে শুধু এই আশাটুকুই রাখছি—এই ডায়েরিটার শেষ পাতাটা পড়ার পর, তুমি কখনো আমাদের ভুল বুঝবে না মা।”
মেহুল তার বাবার চোখের দিকে এক পলক তাকাল। ওনার চোখের সেই আকুতি মেহুলকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। এরপর সে দরজার সামনে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মিনারা বেগমের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই হাতের ডায়েরিটা শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে সে দ্রুতপায়ে ছুটে গেল নিজের রুমের দিকে—কোনো এক জটিল লুকিয়ে থাকা রহস্যের জাল ছিন্ন করতে।
মেহুল নিজের ঘরে চলে যাওয়ার পর মিনারা বেগম ধীরপায়ে ইকবাল সাহেবের ঘরে প্রবেশ করলেন। ওনার কাছাকাছি গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “সবকিছু জেনে মেহুল যদি কখনো আপনাদের ভুল বোঝে ভাইজান? ও তো এখনো ছোট। ওকে এত তাড়াতাড়ি এই সত্যিটা জানানো কি খুব দরকার ছিল?”
ইকবাল শিকদার জানালার বাইরে তাকিয়ে এক দীর্ঘ ও তপ্ত নিশ্বাস ফেললেন। ওনার কণ্ঠে তখন এক নির্মম বাস্তবতার সুর, “পরিস্থিতি যেভাবে পাল্টাচ্ছে বোন, তাতে এই সত্যটা মেহুলের সামনে আসতে আর খুব বেশিদিন বাকি নেই। আরমান আর সুমনা যেভাবে আমাদের ব্ল্যাকমেইল করার ছক কষছে, তাতে অন্যের মুখ থেকে কোনো বিকৃত বা কুৎসিত উপায়ে জানার আগে… আমি নিজেই আমার মেয়েকে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় আর চরম সত্যিটা জানিয়ে দিলাম। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।”
এদিকে মেহুল নিজের ঘরে এসে সশব্দে দরজাটা লক করে দিল। তার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রেখে সে ধপাস করে চেয়ারে বসল। কাঁপা কাঁপা আঙুলে সে ডায়েরির প্রথম পাতাটা উল্টাল। পাতা উল্টাতেই ভেতরের পুরনো কাগজের চেনা গন্ধ আর বাবার হাতের চেনা লেখাগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
মেহুল এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে পড়তে শুরু করল। সে জানত না, এই ডায়েরির প্রতিটি শব্দ তার চেনা পৃথিবীকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিতে চলেছে।
ডায়েরির পাতার পর পাতা উল্টে চলেছে মেহুল। সময়ের গতি যেন থমকে গেছে। মৃত মায়ের হাতের সেই চেনা অক্ষরে লিখে যাওয়া প্রতিটি গোপন ও লুকায়িত সত্য একে একে তার চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। মায়ের গভীর মমতা, লুকিয়ে রাখা কষ্ট আর ভেতরের তীব্র আর্তনাদ যেন শব্দ হয়ে মেহুলের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। মায়ের লিখে যাওয়া প্রতিটি লাইন তার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে যাচ্ছে।
আবেগ আর ভেতরের তীব্র ঝড় সামলাতে না পেরে মেহুলের চোখ দুটো ইতিমধ্যে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। অতঃপর, একসময় ডায়েরির শেষ পাতাটা পড়া সমাপ্ত হলো।
মেহুল দুই হাত দিয়ে ডায়েরিটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। যেন এই কাগজের বুকটা ছুঁয়েই সে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিজের জন্মদাত্রী মাকে একটু স্পর্শ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অতঃপর অশ্রুসিক্ত চোখে, শূন্য ঘরে আপন মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “তোমার প্রতিটি ইচ্ছে পূরণ হবে আম্মু।
আমি কথা দিচ্ছি… তোমার ডায়েরিতে লিখে যাওয়া প্রতিটি ইচ্ছে আমি অবশ্যই পূরণ করব।প্রমিচ!”
ডায়েরি পড়ার এই তীব্র নেশা আর মোহের ঘোরে মেহুলের বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল না যে কখন দুপুরের আলো ফুরিয়ে বিকেলের গোধূলি নেমেছে, আর কখন দিনের আলো ধুয়ে মুছে রাতের গাঢ় অন্ধকার ধরণীর বুকে ফুটে উঠেছে।
চারপাশ অন্ধকার দেখে মেহুল বিছানায় হাতড়ে বালিশের পাশ থেকে নিজের মোবাইল ফোনটি হাতে নিল। স্ক্রিনের আলো জ্বলতেই যখন টাইম দেখল, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা রাত নয়টার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে! মেহুল ধীরপায়ে খাট থেকে উঠল। রুমের লাইট জ্বালালো। এরপরেই ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে হালকা ফ্রেশ হয়ে নিল সে।
তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে অত্যন্ত স্থির ও শক্ত দৃষ্টিতে তাকাল সে। মেহুল জানে, সামনে তার অনেক কাজ। নিজের সাথে হওয়া অন্যায়ের চরম শাস্তি যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনই মায়ের শেষ ইচ্ছাগুলোও অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করতে হবে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিজে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “দুর্বল হওয়া চলবে না মেহুল! ভেঙে পড়লে চলবে না। সামনে এখনো অনেক বড় লড়াই বাকি।”
এদিকে ড্রয়িং রুমে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে অনবরত পায়চারি করছেন ইকবাল সাহেব। ওনার মাথার ভেতর তখন চিন্তার ঝড় বইছে। সত্যটা জানার পর মেহুল যখন নিচে নেমে আসবে, তিনি কীভাবে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন? মেহুল যদি তাকে প্রশ্ন করে—তবে সেই কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি কীভাবে দেবেন?
মিনারা বেগমের চোখে-মুখেও এক ধরনের থমথমে, থমকে যাওয়া আতঙ্ক। তিনি রান্নাঘর থেকে রাতের খাবারের বাটিগুলো এনে ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতে বারবার আড়চোখে সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন, মেহুল ওপর থেকে নেমে আসছে কিনা তা দেখার জন্য। পুরো বাড়িটায় তখন এক নিথর, দমবন্ধ করা নীরবতা।
ঠিক এমন থমথমে ও গম্ভীর পরিবেশের মাঝেই হঠাৎ বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে, গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে প্রবেশ করল মিনার!
তার পরনে একটা ঝকঝকে লাল জ্যাকেট, যার ভেতরের সাদা গেঞ্জিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কারণ জ্যাকেটের চেইনটা বুক অব্দি অর্ধেক খোলা। সাথে মানানসই স্টাইলিশ প্যান্ট আর পায়ে চকচকে লাল জুতো। সে নিজের মনেই নাচতে নাচতে গাইছে:
”খোকাবাবু যায় লাল জুতো পায়
বড় বড় দিদিরা সব উঁকি মেরে চায়
থেমে গেলো আড্ডা
কমে গেলো ঠান্ডা
জমে গেলো ফাঁন্ডা
কি দেখে ভাই….
বিঁজলি থেকে খোকা বিড়ি জ্বালায়
সেই বিড়ির ছাই সবাই হাত পেতে নেয়
উফফ… পারিনা না না না না…
জিও মামা… পারিনা ওরে জিও মামা!
দেখো রাজারা খোকাকে
এসে জুতো বেঁধে দেয়।…
মিনারের এই অসময়ের হাই-ভোল্টেজ গান আর জাঁকজমকপূর্ণ এন্ট্রি দেখে ড্রয়িং রুমের সেই থমথমে পরিবেশটা এক নিমিষেই যেন হাওয়া হয়ে গেল! ইকবাল সাহেব পায়চারি থামিয়ে মিনারের এমন উদ্ভট আচরনে কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, আর মিনারা বেগম হাতের বাটি টেবিলে রেখেই চোখ বড় বড় করে মিনারের এই কাণ্ড দেখতে লাগলেন।
ঠিক এমন সময়েই উপর থেকে শান্ত পায়ে নিচে নেমে আসে মেহুল। বসার ঘরের ঠিক মাঝখানে মিনারকে এভাবে রঙচঙে পোশাকে লাফালাফি করতে দেখে বিরক্তিতে তার নাক-মুখ কুঁচকে গেল। সকাল থেকে এই নবাবজাদার কোনো হদিস ছিল না! অথচ মেহুল তাকে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়েছিল। কাজটা সে আদেও করেছে কি না, তা নিয়ে মেহুলের মনে যথেষ্ট সন্দেহ জাগে। অতঃপর মেহুল নিচে নেমেই কোনো ভূমিকা ছাড়া দুম করে মিনারের পিঠে শক্ত একটা কিল বসিয়ে দিল। অতর্কিত এই হামলায় বেচারা মিনার নাচনকোঁদন ছেড়ে ব্যথায় পিঠ কুঁকড়ে ওহ্ করে উঠল।
তৎক্ষনাত মিনার নিজের সাফাই গেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মেহুল তাকে চোখ রাঙিয়ে ধমক দিয়ে বলে উঠল, “সারাদিন এমন ব্যাঙের মতো লাফালাফি করিস কেন বলতো? কাজকর্ম তো কিছু করতে পারিস! কোথায় ছিলিস সারাদিন তুই? তোকে সকালে কতগুলো ফোন করেছি আমি, একটাবার কি ফোনটা রিসিভ করে বলা যেত না তুই কোথায় আছিস?”
মেহুলের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ পেছন থেকে এক বিষাক্ত ও তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—”গণ্ডারের চামড়া তো! ফ্রি খেতে খেতে চর্বি বেশি বেড়ে গিয়েছে। তাই ভাবছে কাজ করলে যদি চর্বিগুলো একটু ক্ষয়ে যায়!”
কথার এই বিষাক্ত আবহাওয়া টের পেয়ে মিনার, মেহুল, মিনারা বেগম এবং ইকবাল সাহেব—সবাই একসাথে পেছনের দিকে তাকালেন। দেখা গেল আরমান অত্যন্ত ভাব নিয়ে আনিকার হাত ধরে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। আর তাদের ঠিক পেছনেই সুমনা বেগম, মামা আজমল সাহেবকে নিয়ে মামী শিরিনা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন।
সুমনা বেগম নিজের ছেলের এমন খোঁটা দেওয়া কথায় মনে মনে বেশ তৃপ্তি পেলেন। তিনি তার শকুন মার্কা চোখ দুটো মিনারের দিকে স্থির করে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, “এই বংশে তো একমাত্র আমার ছেলেই আছে, যে দিনরাত সবাইকে নিয়ে একটু ভাবে। নাইলে বাকিদের তো আর নাচানাচি-লাফালাফি করতে করতেই দিন চলে যায়! টেনশন নাই তো, তিনবেলা ফ্রি খাবার তো আর বন্ধ হচ্ছে না।”
মেহুল আড়চোখে মিনারের দিকে তাকাল। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, মিনারের চোখে-মুখে এই অপমানজনক কথায় বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তনের রেখা ফুটল না। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা ফাজিল মার্কা হাসিটা আগের মতোই অটুট রইল। সে সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে একটু শব্দ করে হেসে বলে উঠলো, “জি আন্টি আপনার ছেলে একটু বেশিই পরোপকারী তো তাই আরকি যেখানে সেখানে মুখ বসায়! সেই সাথে পিঠ পেছনে ছুঁড়ি মারাও ভালো অভিজ্ঞতা আছে ওনার।”
এরপরেই আরমানের দিকে তাকিয়ে নিজের আঞ্চলিক টোনে খাঁটি সিলেটি ভাষায় বলে উঠল, “সেম টু ইউ ব্রো! আমার চামড়া গণ্ডারের, তোমার চামড়াও গণ্ডারের। গণ্ডারে গণ্ডারে বনের মোষ তাড়ায়, বুঝলায় নি ভাইসাব? ওস্তাদ জামাইবাবু আমার, বেশি খেউরি করিও না!”
এদিকে মেহুল আর এই সস্তা কাদা-ছোড়াছুড়ির মাঝে নিজের সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে তার বাবার পাশের চেয়ারটা টেনে চুপচাপ বসে পড়ল। এদিকে মেহুলকে এতটা শান্ত ও স্বাভাবিক দেখে ইকবাল সাহেবের বুকের ভেতর চেপে থাকা ভয়টা যেন কিছুটা দূর হলো, মনে মনে একটু স্বস্তি পেলেন তিনি। অতঃপর তিনি খুব নিচু ও স্নেহার্দ্র কণ্ঠে মেয়ের কানের কাছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “ঠিক আছো তো মা?”
মেহুল খাবার প্লেটটা সোজা করতে করতে বাবার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে শান্ত হাসি উপহার দিল। অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “অবশ্যই বাবা। ঠিক না থাকার মতো কিছু হয়েছে নাকি?”
ইকবাল সাহেব মেয়ের এই শান্ত ও পরিণত জবাব শুনে আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেলেন না। এদিকে একে একে ডাইনিং টেবিলের বাকি সব চেয়ারে পুরো পরিবারের সবাই রাতের খাবার খাওয়ার জন্য বসে পড়ল।
মেহুলের ঠিক পাশের চেয়ারটাতেই এসে বসল মিনার। মিনার বসতেই মেহুল অত্যন্ত খেলছলে, চারপাশের সবার অলক্ষ্যে ফিসফিস করে তাকে জিজ্ঞেস করল, “আমার কাজটা করেছিস?”
মিনার মুখে কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু মেহুলের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে আলতো করে এক চোখ মারল।
মেহুল মিনারের এই চতুর ইশারা নিমেষেই বুঝে গেল এবং তার বুকের ভেতর একটা ভরসা পেল। এদিকে আরমান প্লেট থেকে খেতে খেতেই বারবার চোখ তুলে মেহুল আর মিনারের এই ফিসফিসানি লক্ষ্য করছিল। তাদের মধ্যে এই আকস্মিক সখ্যতা তার মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না।
এদিকে মেহুল খাওয়ার মাঝখানেই হঠাৎ ইকবাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “বাবা, তোমার সাথে আমার একটু কথা ছিল।”
ইকবাল সাহেব নিজের প্লেট থেকে চোখ তুলে বললেন, “কী কথা বলো মা, শুনছি।”
মেহুল একটু নীরবতা পালন করল, অতঃপর ডাইনিং টেবিলের সবাই যাতে স্পষ্ট শুনতে পায়—এমন এক চড়া ও দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল, “বাবা, আমি চাইছি মিনার কাল থেকে আমাদের অফিসে জয়েন করুক।”
মেহুলের এই আকস্মিক ও মারাত্মক প্রস্তাবে আরমান মুখের খাবার চিবানো এক ঝটকায় থামিয়ে দিল! সে স্তব্ধ হয়ে চামচ হাতে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ধূর্ত মস্তিষ্ক তখন বোঝার চেষ্টা করছিল মেহুল ঠিক কোন চালটা চালার চেষ্টা করছে।
এদিকে মেহুলের কথা শুনে মিনারা বেগমের মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কারণ পৃথিবীর প্রতিটা মা-ই চায় তার সন্তান জীবনে থিতু হোক, একটু উন্নতি করুক। তার ছেলের যে বাউণ্ডুলে চালচলন, তাতে সে জীবনে ভালো কিছু করবে বলে তো মা হিসেবে আশা করাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুধু মিনারা নন মেহুলের এই প্রস্তাবে ইকবাল সাহেবও মনে মনে ভীষণ খুশি হলেন। তিনিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে মিনার অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং প্রচণ্ড বুদ্ধিমান একটি ছেলে। যদি তাকে সঠিক গাইডলাইন দিয়ে বিজনেসে নামানো যায়, তবে সে জীবনে অনেক বড় কিছু করতে পারবে।
ডাইনিং টেবিলের এক পক্ষ যখন এই খুশির আমেজে ভাসছিল, তখন টেবিলের অপর পক্ষ অর্থাৎ আরমান ও সুমনা বেগম সহ অন্যরা যেন এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাদের চোখে-মুখে তখন ঈর্ষার আগুন। মেহুল আরচোখে তাদের ভেতরের এই ছটফটানিটা খুব ভালোভাবেই উপভোগ করল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে এক তীর্যক ও বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “তাহলে বাবা, আগামীকাল সকালে কোম্পানির যে গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড মিটিংটা আছে, সেখানে তুমি মিনারকেও সাথে করে নিয়ে যাও। ও সেখানে বসে বিজনেসের সবকিছু একটু দেখুক আর বুঝুক।”
মেহুল যখন এই কথাগুলো বলছিল, তখন মিনার প্লেটের দিকে তাকিয়ে আড়চোখে মেহুলকে গিলছিল! কারণ এই মুহূর্তে সে এই ঝামেলার মধ্যে একদমই জড়াতে চায় না। সে নিজের স্বাধীন জীবন নিয়ে ভালোই আছে। কিন্তু এই ভরা মজলিশে সবার সামনে মেহুলকে মুখের ওপর কিছু বলতেও পারছে না সে। তবে মিনার মনে মনে একটা ছক কষে নিল যে—আজ রাতে কোনোভাবে ইকবাল সাহেবের রুমে একা গিয়ে ওনাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কনভিন্স করে নেবে, যাতে ওনাকে বলতে পারে সে আপাতত অফিসে যাচ্ছে না।
একসময় সবার রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। মেহুল হাত ধুয়ে সবার আগে মিনারের ঘরের দিকে চলে গেল, কারণ মিনারের থেকে সেই গোপন তথ্যগুলো তার এখনই জানতে হবে। এদিকে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে প্রায় বাকি প্রত্যেকেই নিজ নিজ ঘরের দিকে রওনা দিল।
সবাই চলে গেলেও ড্রয়িং রুমের ফাঁকা জায়গায় তখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল আরমান। কারন মিনার কোন একটা দরকারে বাহিরে গিয়েছে। আর সে মিনারের জন্যই অপেক্ষাকৃত।
একটু পরেই মিনার বাহির থেকে ফিরে দরজা লক করে যেই না নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াবে ঠিক সেই মুহূর্তে আরমান তাকে উদ্দেশ্য করে পেছন থেকে চরম তাচ্ছিল্যের সুরে বিষ উগরে দিল, “বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা পরালেই কি বাঁদর কখনো জাতে উঠে যায় নাকি? নাকি এভাবে সবার নজরে তার গুরুত্ব হুট করে বেড়ে যায়? বাঁদরের একটা জিনিস মনে রাখা দরকার—বাঁদর সবসময় কিন্তু বাঁদরই থাকে, সে কখনো বনের রাজা হতে পারে না!”
মিনার থমকে দাঁড়াল। সে শান্ত পায়ে পেছন ফিরে আরমানের দিকে এক তীক্ষ্ণ ও ক্রুর দৃষ্টিতে তাকাল। মিনারকে এভাবে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরমান নিজের ভেতরের দম্ভ ও অহংকার নিয়ে আরও দু-পা তার দিকে এগিয়ে এলো। আঙুল উঁচিয়ে বলল, “আমার জায়গা নিতে চাস তুই? আমার চেয়ারে বসে আরমান শিকদার হতে চাস? মনে রাখিস, মিনার—তা তুই কোনোদিনও পারবি না। আরমান শিকদার একজনই, আমার কোনো রিপ্লেসমেন্ট হতে পারে না!”
মিনার এবার একটা শব্দহীন, চওড়া হাসি হাসল। তার চোখের মণি দুটো তখন শিকারি বিড়ালের মতো জ্বলছে। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “আমার আরমান শিকদার হওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই ভাইসাব। সারফারাজ মেহবুব মিনার… নিজের এই নামটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। আর আমার মতো একজন একা মানুষই তোর মতো ১০টা আরমানের ওপর ভারী হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর কী যেন বললি? আরমান শিকদার?”
মিনার তাচ্ছিল্য ভরে হাসলো, “তুই কি আদৌ ‘শিকদার’? নিজেকে কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটা করেছিস যে তুই আসলে কে? তোর আসল পরিচয়টা কী? আমার চেয়ে তো এই সত্যিটা তুই নিজেই খুব ভালো জানিস, তাই না?”
মিনারের মুখ থেকে নিজের বংশ আর পরিচয় নিয়ে এমন এক গোপন ও মারাত্মক ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে আরমান যেন এক লহমায় ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল। সে হঠাৎ করে প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল। একরকম হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, “মুখ সামলে কথা বল মিনার! অন্যের দয়ায় যার জীবন কাটে, অন্যের পয়সায় যে তিনবেলা বসে বসে গিলছে, তোর মতো একটা পরগাছার নিজের কি কোনো লজ্জাবোধ বলতে কিচ্ছু নেই? তুই আমাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলিস? আগে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ!”
মিনার নিজের লাল জ্যাকেটের চেইনটা স্টাইল করে আর একটু টেনে দিয়ে হালকা হেসে জবাব দিল, “আমি তো প্রতিদিনই নিজেকে আয়নায় দেখি ভাই। আর আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমি কতটা সুদর্শন আর ড্যাশিং! রাস্তাঘাটে বের হলে মেয়েরা যেভাবে তাকায়, তাতেই তার প্রমাণ রোজ পাই। ওটা নিয়ে তোকে টেনশন করতে হবে না।”
আরমান দাঁত কিড়মিড় করে নিজের মুঠো শক্ত করে বলল, “বেশি বাড়াবাড়ি করিস না মিনার, ঝড়ে কিন্তু বড় বড় গাছও উপড়ে পড়ে যায়!”
মিনার এবার একটু এগিয়ে এসে আরমানের কাঁধে আলতো করে একটা চাপ দিল। অতঃপর তার মুখের একদম কাছাকাছি গিয়ে এক রহস্যময় হেসে বলল, “সেম টু ইউ ব্রো! সেই সাথে তোকেও ফ্রিতে একটা খাঁটি উপদেশ দিয়ে যাই—’পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’। তোকে যে এই শিকদার বাড়ি থেকে চিরতরে বধ করবে, সে কিন্তু ইতিমধ্যেই ঘরের ভেতর নিজের ঘুঁটি সাজাতে বসে গেছে। তাই একটু সাবধানে থাকিস। কারণ তুই হয়তো জানিস না—ওস্তাদের মার কিন্তু সবসময় শেষ রাতেই হয়!”
দুজনের চোখের তীব্র চাবুক আর থমথমে ভাবভঙ্গি পুরো ড্রয়িং রুমের বাতাসকে যেন এক মুহূর্তের জন্য বরফ বানিয়ে দিল। আরমান স্তব্ধ হয়ে মিনারের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, আর মিনার শিস দিতে দিতে নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেল।
মিনারের শোবার ঘরের দরজা-জানালা সব শক্ত করে বন্ধ। বাইরের কোনো আলো বা শব্দ যেন এই ঘরের ভেতর প্রবেশ করার অনুমতি পায়নি। ঘরের মৃদু আবছা আলোয় খাটের ওপর মুখোমুখি বসে আছে মেহুল ও মিনার। দুজনেরই চোখে-মুখে তীব্র বিস্ময়, অপার গভীর অবাকতা আর আগুনের মতো জ্বলতে থাকা রাগ—এই তিনটি অনুভূতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
তাদের ঠিক সামনে, খাটের ওপর রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে দুজনেরই চোখ জোড়া স্থির। আর সেই স্ক্রিনে একের পর এক ভেসে চলেছে আরমানের বিগত কয়েক বছরের করা জালিয়াতি ও মারাত্মক সব ফ্রডের অকাট্য প্রমাণ।
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, আরমান কীভাবে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে কোম্পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদগুলো থেকে দক্ষ মানুষদের সরিয়ে, সেখানে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কিছু চামচাকে বসিয়েছে। আর তাদের সাহায্য নিয়ে পর্দার আড়ালে দিনের পর দিন একের পর এক কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি করে গিয়েছে। আরমান এই পুরো ছকটা এত সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে সাজিয়েছিল যে, সহজে সাধারণ কোনো অডিটের মাধ্যমে তা ধরা পড়ার কোনো উপায়ই ছিল না। কোনোদিন কেউ এটা ধরতেও পারত না, যদি না মেহুলের কথামতো আজ মিনার আরমানের ওই চক্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও প্রধান একজনকে হাতেনাতে চেপে ধরত! অবশ্য ওই লোকের মুখ থেকে সত্যি কথা বের করতে আর ল্যাপটপের এই গোপন ফাইলগুলোর অ্যাক্সেস পেতে মিনারকে বেশ ভালোই জোর খাটাতে হয়েছে, কিছুটা ‘মিনারি স্টাইলে’ পিঠের চামড়া তোলার ভয় দেখাতে হয়েছে।
ল্যাপটপের ডেটাবেস ঘাঁটতে ঘাঁটতে মেহুলের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। ইকবাল সাহেব আরমানকে নিজের ছেলের মতো বিশ্বাস করে যে পদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, আরমান সেটির এত নোংরা ও জঘন্য অপব্যবহার করেছে যে, পুরো কোম্পানি বর্তমানে ভেতরে ভেতরে নানা বিধ আইনি ও আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। বলতে গেলে, আরমান এই বিশাল শিকদার সাম্রাজ্যটাকে একদম ভেতর থেকে ঘুণে ধরিয়ে শেষ করে দিচ্ছিল।
মেহুল নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে কখনো দূরতম কল্পনাতেও আনতে পারেনি যে, এত বছর ধরে চোখের সামনে ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকা, দেখতে অত্যন্ত সাদাসিধে ও ভদ্র এই মানুষটার ভেতরটা এতটা নোংরা, এতটা জঘন্য আর বিষাক্ত হতে পারে!
ভাবতেই মেহুলের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো, চোয়াল কঠিন রূপ ধারণ করল। তার বাবার এত বছরের রক্ত জল করা পরিশ্রমের টাকা, শত কোটি টাকার এই সাম্রাজ্য—আরমান এভাবে উইপোকার মতো চিবিয়ে চিবিয়ে আত্মসাৎ করে চলেছে! ফাইল থেকে স্পষ্ট জানা গেল, আরমান বিগত দুই বছরেই শুধু কয়েক কোটি টাকার ওপর এদিক-সেদিক করেছে। কোম্পানির নাম ভাঙিয়ে, ভুয়া লোন দেখিয়ে বিভিন্ন বেনামী স্থানে বিঘার পর বিঘা জমি ক্রয় করেছে, যার বিন্দুমাত্র কোনো অফিশিয়াল রেকর্ড মূল কোম্পানির মেইন ফাইলে পর্যন্ত নেই!
সব সে নিজের আর তার মায়ের নামে করে রেখেছে।
কিন্তু আরমানের দুর্ভাগ্য, তার সেই অভেদ্য দুর্গের চাবি এখন মেহুল এবং মিনারের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এতদিনের লুকানো সব অন্ধকার সত্য এখন তাদের চোখের সামনে একদম পানির মতো পরিষ্কার।
মেহুল ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক হিমশীতল ও ভয়ংকর হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। তার চোখ দিয়ে তখন যেন আগুন ঝরছে। এখন আর আবেগের কোনো জায়গা নেই, এখন শুধুই সঠিক সময়ের অপেক্ষা। আরমানকে তার জীবনের চরমতম ও সবচেয়ে নির্মম শিক্ষাটা দেওয়ার জন্য মেহুল এবার মানসিক ও পারিপার্শ্বিক—সব দিক থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৪ (২)
মেহুল ল্যাপটপটা এক ঝটকায় বন্ধ করে মিনারের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন এক অন্যরকম ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা, “খেলার কেবল শুরু মিনার। ওস্তাদের মার যে শেষ রাতেই হয়—সেটা কাল সকালের মিটিংয়ে আরমান শিকদার নিজে হাড়ে হাড়ে টের পাবে! আজকের রাতটা শান্তিতে ঘুমাক সে কারন কালকের পর থেকে শান্তি নামক শব্দটাই তার জীবন থেকে আজীবনের জন্য মুছে দিবো আমি।”
