সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৩
jannatul firdaus mithila
“ অভিনয়ে আপনি সেরা রেহহহ ডাক্তার সাহেব!!! ”
মনে উত্থাপিত হওয়া এমন সাহসী বাক্যটা কেমন গলা অব্ধি এসেই থেমে গেলো অরিনের।কন্ঠ ফুঁড়ে বাকিটা আর বেরুলো তখনো! রৌদ্র চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে পাশে। অরিন ঘাবড়াচ্ছে তা দেখে।এতক্ষনে একা পেলে রৌদ্র যে তাকে নিশ্চিত কাঁচা চিবিয়ে ফেলতো,এতে মোটেও সন্দেহ নেই অরিনের! অরিন বারকয়েক শুকনো ঢোক গিলে এক কদম পিছিয়ে দাঁড়ায়। রৌদ্র এবার বুক টানটান করে পকেটে দু’হাত গুঁজল। গম্ভীর কন্ঠে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“ তা ডেট কবেকার?”
তাশরিক সাহেবের অন্ধকার মুখে এক ছটাক দীপ্তির দেখা মিললো তক্ষুনি। মানুষটা তৎক্ষনাৎ জোরালো পায়ে এগিয়ে আসেন কিছুটা।হাত বাড়িয়ে টিকেটগুলো রৌদ্রের সামনে এগিয়ে ধরে বললেন,
“ আগামীকালকের!”
রৌদ্র খানিক ভ্রু গোটায়। কিয়তক্ষন চুপ থেকে ফের বলে,
“ কালকের? তা এতো তারাতাড়ি বললে যে? একেবারে আগামীকালকেই নাহয় বলতে ।”
থতমত খেলেন তাশরিক সাহেব। বেচারার হাসিমুখটা কেমন চুপসে গিয়ে এইটুকুন হয়ে গেলো! তিনি তো সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন ছেলে দুটোকে।অথচ রৌদ্রের এহেন বাঁকা কথায় সারপ্রাইজ দেওয়ার আমেজটা কী আর রয়েছে? তাশরিক সাহেব সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠেন। হাতের টিকিট গুলো রৌদ্রের হাতেঁ আলগোছে গুঁজে দিয়ে চাপা স্বরে বললেন,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ ইনজয় ইউর সেকেন্ড হানিমুন বাঘের বাচ্চা!”
ঘাড় বাকিয়ে সরু চোখে তাকায় রৌদ্র। সন্দিহান গলায় একইভাবে চাপা সুরে বলল,
“ সেকেন্ড মানে?”
তাশরিক সাহেব বাঁকা হাসলেন।একদফা ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখে নিলেন কোনোরকম। সবাই নিজেতে মত্ত।এদিকটায় কারো কোনো খেয়াল নেই। এই সুযোগটাই যেন কাজে লাগালেন তাশরিক সাহেব। এগিয়ে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ালেন রৌদ্রের পাশ ঘেঁষে। মুখের সামনে গোটা-তিনেক আঙুল ঠেকিয়ে কেমন চাপা স্বরে বলতে লাগলেন,
“ যে ছেলে ফেমিলি ছাড়াই তলে তলে বিয়ে করে রাখতে পারে,সে-ই ছেলে বিদেশে গিয়েও এখন অব্ধি হানিমুন সারেনি — এসব আমার বিশ্বাস হয়না! এতদিনে তোকে এটলিস্ট এটুকু হলেও চিনতে পেরেছি আমি।”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো রৌদ্র। এক আঙুল দিয়ে খানিক ঘাড় চুলকে ঠোঁট কামড়ে হাসলো কিয়তক্ষন। পাশ থেকে তাশরিক সাহেবও হাসছেন একযোগে। তবে নিঃশব্দে,মুখের ওপর হাত ঠেকিয়ে।
বারান্দায় লুকিয়ে আছে অরিন। বুকটা কেমন দুরুদুরু করে কাঁপছে তার! বোধহয় রৌদ্রের ভয়েই মেয়েটার ওমন হাল! প্রায় আধঘন্টা পর,গম্ভীর মুখে ঘরে ঢুকে রৌদ্র।দরজার কাছে দাঁড়িয়েই শূন্য ঘরে একপলক সর্তক দৃষ্টি ফেলে পরক্ষনে কেমন বাঁকা হাসলো ছেলেটা।নিঃশব্দে লাগালো ঘরের দোর। পায়ে তেমন শব্দ না তুলে একটু একটু করে এগিয়ে গেলো বারান্দার দিকে। বারান্দার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে খানিক উঁকি দিতেই তার চোখ গিয়ে আটকালো অদূরে মেঝেতে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা অরিনের পানে। রৌদ্র স্মিত হাসলো। ভরাট কন্ঠে তক্ষুনি বলল,
“ কিরে? ওখানে কী?”
আঁতকে ওঠে অরিন। তড়িৎ চোখ তুলে চাইলো দরজার নিকট। রৌদ্রকে গম্ভীর মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা কেমন ঢোক গিললো সামান্য। আমতাআমতা করে বলল,
“ না মানে..এমনিতেই!”
রৌদ্রের দৃষ্টি ক্ষুদ্র। কিয়তক্ষন পলকহীন চোখে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে আসে পরমুহূর্তেই। অরিন নড়েচড়ে বসলো এবার।হাঁটুর কাছের পাজামার অংশটা খানিক খামচে ধরে বসে রইলো পাথরের ন্যায়।রৌদ্র মেয়েটার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। কোমরের দু’ধারে হাত ঠেকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ ওঠ!”
এককথাতেই ত্রস্ত পায়ে উঠলো অরিন। মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পুতুলের ন্যায়।রৌদ্র এবার আলগোছে মেয়েটার একহাতের কব্জি চেপে ধরে আলতো করে। অতঃপর কোনরূপ কথাবার্তা না বলে তাকে নিয়েই হাঁটা ধরলো ঘরের ভেতর। অরিনের গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ এমুহূর্তে! বুকে চলছে আতঙ্কের ঢেউ!মেয়েটা নিজেকে বেশ কায়দা করে তৈরি করছে রৌদ্রের বিশাল ধমক সহ্য করতে। প্রায় মিনিট দুয়েক লাগলো বারান্দা থেকে ঘরে আসতে। রৌদ্র বেশ যত্ন করে অরিনকে বিছানার এককোণে বসায়। তারপর নিজেও বসলো মেয়েটার মুখোমুখি। অরিনের দৃষ্টি নত।ভয়ে চোখের পাতা কেমন টিমটিম করে কাঁপছে তার। রৌদ্র আলতো করে অরিনের মাখনের ন্যায় মসৃণ পাদু’টোয় হাত ছোঁয়ালো। এহেন হুটহাট স্পর্শে মেয়েটা খানিক গুটিয়ে যেতে চাইলেই বাঁধ সাধলো রৌদ্র। খামচে ধরল অরিনের কোমল পায়ের ত্বক। বোধহয় নখড়ও বসেছে এক-দু জায়গায়। অরিনের ঠোটেঁর ফাকঁ গলিয়ে তক্ষুনি অস্ফুটে বেরিয়ে আসে এক চিলতে ব্যাথাতুর শব্দ!
“ আহ!”
রৌদ্র রয়েসয়ে চোখ তুললো ওপরে। কিছুক্ষণ আগেই মেয়েটার পায়ের ত্বকের নখ দাবিয়ে দেওয়া অঞ্চলে রৌদ্র এবার আলতো করে মালিশ করতে লাগলো। মেয়েটার নুইয়ে রাখা চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হুট করেই বলল,
“ মাঝেমধ্যে আমার কী ইচ্ছে করে জানো বউজান?”
চোখ তুলে অরিন।জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তাক করে মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,
“ কী?”
রৌদ্র হাসলো।ভাবলেশহীন গলায় আচমকাই বলল,
“ ইচ্ছে করে তোর ঠোঁটদুটো একত্রে সেলাই করে দিতে।”
থমকায় অরিন। হতবুদ্ধিভাব নিয়ে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের পানে।এদিকে রৌদ্রের চোয়াল শক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। চোখের দৃষ্টি হয়েছে কঠোর। সে এবার দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগলো,
“ তোর পেটে কোনো কথা হজম হয়না তাই-না?”
ঠোঁট উল্টায় অরিন।কাঁদো কাঁদো ভাব ধরতেই রৌদ্র ফের খেকঁ খেকঁ করে বলে,
“ চোখ থেকে একফোঁটা পানি পড়ুক শুধু! এক্কেবারে কান বরাবর চড়িয়ে লাল করে দিবো আজকে।”
তৎক্ষনাৎ ভাব ভঙ্গিমা পাল্টায় অরিন।দু’হাতের তালুতে চোখদুটো হুড়মুড় করে মুছে নিয়ে বসে রইলো মাথা নুইয়ে। রৌদ্র আর কথা বাড়ায়নি। কথা বাড়িয়েই বা কী লাভ? এ মেয়ে কী আর মনে রাখে অতো কিছু?
মেরুন রঙের শিফন জরজেটের থ্রিপিছ গায়ে জড়িয়েছে মাহিরা। গায়ে ওড়না দিয়েছে রাউন্ড করে। পিঠ সমান ঘন কালো স্ট্রেট চুলগুলোকে ছেড়ে রেখেছে পেছনে। একহাতে পড়েছে নিজের পছন্দের ব্রেসলেট, অন্যহাতে কাপড়ের মোটা ব্যান্ড।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট ঝুমকো কানের দুলগুলো পরতে পরতে মাহি একবার আড়চোখে তাকালো নিজের ফোনটার দিকে। মেয়েটা এ নিয়ে সাতবার তাকালো ফোনের স্ক্রিনে। তবে প্রতিবারই আশাহত হয়েছে সে।আহি বাসা থেকে বেরিয়েছে প্রায় দু’ঘন্টা আগে। যদিও সবাইকে বলে গিয়েছে — সে না-কি তার এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে নোটস আনতে যাচ্ছে।
তবে একমাত্র মাহি জানে আহি নোটস আনতে নয়,ইফতির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছে। এদিকে আহি’র চলে যাওয়ার পথে মাহি ঘটা করে বলে দিয়েছিল — জলদি বাসায় ফিরে আসতে।কেননা তার আজকে লাইব্রেরীতে যেতেই হবে।সে-ই মাসখানেক আগে ৯টা বই এনেছিল মেয়েটা সেগুলোই ফেরত দেবার লাস্ট ডেট আজকে। তবে আহি তো এখনো ফিরলোই না! একা একা কী আর ওতো দূরে যাওয়া ঠিক হবে?
বিষন্ন মুখে তৈরি হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো মাহি। হাতে একখানা বড় শপিং ব্যাগ।তাতেই গুছিয়ে রাখা বইগুলো। মাহি ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই তার চোখাচোখি হলো মায়ের সাথে।বড় সোফার একপাশে বসে জুবাইদা বেগমের মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন মাইমুনা বেগম। মেয়ের দিকে চোখ পরতেই তিনি কেমন সন্দিহান গলায় বলে ওঠেন,
“ কোথায় যাচ্ছিস?”
থামলো মাহি। মুখটা কাচুমাচু করে নিয়ে মিনমিনে স্বরে বলে,
“ লাইব্রেরিতে।”
মাইমুনা বেগম মেয়েকে একবার আপাদমস্তক পরোখ করলেন। পরক্ষণে বসা ছেড়ে উঠে এলেন মেয়ের কাছে। গম্ভীর মুখে বললেন,
“ আহি কোথায়? এখনো বাড়ি ফিরেনি? ও না যাবে বলেছিল তোর সাথে?”
গলায় শুকনো ঢোক গিললো মাহি। মায়ের কাছে এবার কোন অজুহাত দিবে তা ভাবতেই পেটে কেমন গুরগুটে ভাব শুরু হলো তার! মেয়েটা সময় নিলো খানিকটা। আমতা আমতা করে বলল,
“ আম্মু! আসলে.. আহি বলেছে ও তার ফ্রেন্ডের বাসা থেকে একেবারে লাইব্রেরীতে যাবে। আমি যেন এখান থেকে তারাতাড়ি চলে যাই।”
এটুকু বলতে গিয়েই পাঁচবার ঢোক গিলেছে মাহি।কথাগুলোও হয়েছে ছন্নছাড়া! মাইমুনা বেগম বিচক্ষণ মানুষ। তার নজর এড়ানো কী আর ওতো সহজ? তিনি কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। কিয়তক্ষন চুপ থেকে হঠাৎ চাপা স্বরে বললেন,
“ মিথ্যে বলার আগে এটলিস্ট মিথ্যে কীভাবে বলতে হয় সেটা শেখা জরুরী!”
থতমত খেলো মাহি।অপরাধীর ন্যায় চক্ষু ছানাবড়া করে তাকিয়ে রইলো শুধু। মাইমুনা বেগম শক্ত মুখে চলে গেলেন আগের জায়গায়। গম্ভীর কন্ঠে স্রেফ বললেন,
“ বাইরে গাড়ি দাঁড় করানো আছে। বেশি লেট করিস না। তোর বোনকে নিয়ে তারাতাড়ি ফিরিস!”
মাহির কলিজায় পানি এলো এতক্ষণে। মেয়েটা কেমন ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চটপট পা চালালো বাড়ির বাইরে। পেছন থেকে আড়চোখে সবটা দেখলেন মাইমুনা বেগম। কপালে চিন্তার ভাজঁ পড়েছে তার।মনে উঠেছে অজানা শঙ্কা। ভাবছেন — আহি কী তবে এ বয়সেই…
বাড়ি থেকে দু-কদম বেরিয়ে এসেছে মাহি।হাতে একগাদা বই নিয়ে হাঁটাটাও যেন বেশ মুশকিল হয়ে দাড়াঁচ্ছে তার জন্য। মাহি আর পা চালাতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানেই। অদূরে দারোয়ানের সাথে কথা বলছেন মফিজ নামক ড্রাইভার মহাশয়।মাহি ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে হাঁক ছেড়ে বলল,
“ মফিজ ভাই! গাড়ি বের করেন।”
হুকুম তামিল করলেন ড্রাইভার মহাশয়। তক্ষুনি কথাবার্তার ইতি ঘটিয়ে ছুটলেন পার্কিং লটে। প্রায় মিনিট তিনেকের মধ্যেই বাড়ির বাইরে দাড়ঁ করালেন গাড়ি।মাহি ছোট ছোট পা ফেলে হাঁটা ধরলো সেদিকে। অতঃপর গাড়িতে উঠে বসতেই ড্রাইভার স্টার্ট দিলেন গাড়িতে।
মির্জা বাড়ির পরিবেশ এখন ভীষণ গরম। কেননা সকাল থেকেই তৌসিফ মির্জার শরীর খারাপ করেছে। গা কাপিয়ে জ্বর উঠে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা মানুষটার! সকাল থেকে যে-যার মতো পানি ঢালছে তার মাথায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে অথচ লোকটার জ্বর নামছেই না গা থেকে। আকাশ বড্ড চিন্তিত বাবার এমন হাল দেখে।ছেলেটা ইতোমধ্যেই ডাক্তার এনেছে বাসায়।ডাক্তার রোগীর আগাগোড়া কিছুটা পরোখ করেও ধরতে পারলেননা — রোগীর হঠাৎ ওমন জ্বর আসার কারণ!
ডাক্তার ঔষধ দিয়েছেন তৌসিফ মির্জাকে।আপাতত তা খেয়েই ঘুম দিয়েছেন তৌসিফ সাহেব। অন্যদিকে, বাড়ির বাদবাকি সদস্যরা গোল মিটিং বসিয়েছে লিভিং রুমে। তৌকির মির্জা মিটিংয়ে উপস্থিত থাকলেও তার মন বোধহয় অন্য কোথাও। কেননা লোকটার চোখেমুখে স্পষ্ট অনিহা! তা আর কারো চোখে না পড়লেও শারমিন বেগমের চোখে পড়েছে ঠিকই। তিনি আগ বাড়িয়ে স্বামীকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন তার আগেই সকলের চোখ গেলো সিঁড়ির দিকে। কালো রঙা কটনের শার্টের সাথে অলিভ রঙের ঢিলেঢালা ট্রাউজার পরে, ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নামছে মুগ্ধ। পুরুষালী সুঠাম দেহ থেকে ভেসে আসছে মাইসুন ফ্র্যান্সিস পারফিউমের বেশ কড়া ঘ্রাণ।ডান হাতের কব্জি থেকে প্রায় খুলে খুলে যাচ্ছে সিলভার রঙের ব্র্যান্ডেড ঘড়িটি। মাথার চুলগুলো আজও কেমন এলোমেলো ভাবে বেঁধে রাখা। মুগ্ধ গটগট পা ফেলে লিভিং এ এসে বসলো। আকাশ ঘাড় বাকিয়ে তার পানে একপলক তাকিয়ে ফের নিজের বক্তব্যে মনোযোগী হলো। বলতে লাগলো,
“ আব্বুর নতুন কোম্পানিটা এখন একটু লসে যাচ্ছে যদিও তবে আমি শিওর আর ক’দিন পরে ঠিকই আমাদের কোম্পানি আবারও মুভ অন করবে।”
একটু দম নিলো আকাশ।দাঁত খিঁচে পরক্ষণে ফের বলতে লাগলো,
“ ঐ এহসানরা তো এখন উঠেপড়ে লেগেছে আমাদের পেছনে। বিদেশি নতুন প্রজেক্টটা নেওয়ার জন্য তারা যতই পায়তারা করুক না কেনো,সেটা আমরাই নিয়ে ছাড়বো। সোজাভাবে না পারলে বাঁকা ভাবে নিবো!”
এপর্যায়ে চোখ তুললেন তৌকির সাহেব। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ বাঁকা ভাবে বলতে?”
এহেন কথায় আকাশ কেমন পৈশাচিক হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। মুখোমুখি হয়ে বসে থাকা মুগ্ধের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে থেকে, হুট করেই খানিকটা এগিয়ে এসে হাত রাখলো মুগ্ধের পায়ের ওপর। রহস্যময় কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ সেটা আমরা বুঝবো! তাই-না ব্রো?”
মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে হঠাৎ করেই ফুটে উঠেছে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। ছেলেটার হঠাৎ কি হলো কে জানে! সে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে সজোরে থাপ্পড় বসালো আকাশের বা-গালে।মুহুর্তেই থমকে গেলো সকলে।পরিবেশ হলো থমথমে। হামিদা মির্জা তৎক্ষনাৎ রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন এহেন শব্দ পেয়ে। ওদিকে মাহা নিজেও হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে মুগ্ধের পানে। প্রায় মিনিট খানেক পর, আকাশ কেমন তেতে উঠলো! তৎক্ষনাৎ বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল,
“ তুই আমাকে মারলি কেনো? তুই ভুলে গিয়েছিস, আমি তোর বয়সে বড়?”
মুগ্ধ ভাবলেশহীন! পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে দাঁড়ালো বেশ সময় নিয়ে। অতঃপর কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
“ মশা বসেছিল তোর গালে। তাই মারলাম।”
দাঁত কিড়মিড় করছে আকাশ।কটমট চোখে মুগ্ধের পানে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ মিথ্যে বলছিস কেনো? এ অবেলায় মশা আসবে কোত্থেকে?”
মুগ্ধ ঠোঁট উল্টায়। দু’হাত পকেটে গুঁজে ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“ কে জানে!”
আকাশের মাথার তালু জ্বলছে এবার।কত্তবড় সাহস এই ছেলের? তার গায়ে হাত তুলে? আকাশ একবার তেড়ে আসতে চাইলেই মুগ্ধ জাস্ট ঘাড় বাকিয়ে তাকায় একপলক।এতেই কেমন দমে গেলো আকাশ! আগ বাড়িয়ে আর সাধ্যে কুলালো না মুগ্ধের সাথে একহাত করতে। মুগ্ধ বাঁকা হাসলো এবারেও।ঘাড় সোজা করে হাঁটা ধরলো বাড়ির সদর দরজার কাছে। এমন সময় পেছন থেকে ডেকে ওঠেন শারমিন বেগম। মুগ্ধ পায়ের গতি থামালেও পেছন ফিরে তাকায়নি তখনও। শারমিন বেগম নিজে থেকে এগিয়ে আসেন। মুগ্ধের থেকে একহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে বললেন,
“ কোথায় যাচ্ছো?”
মুগ্ধ অনুভুতিশূন্য কন্ঠে প্রতিত্তোর করল,
“ তা জেনে আপনার কী লাভ মিসেস মির্জা?”
“ মা ডাকলে কী তোমার জাত যাবে?”
মুগ্ধের চোখদুটো জ্বলে উঠল কেমন।চোয়াল ফুটে উঠেছে রাগে। শারমিন বেগম ভড়কান এহেন চাহনি দেখে। ভয়ে এক-কদম পিছিয়ে যেতেই মুগ্ধ কেমন কর্কশ গলায় বলে ওঠে,
“ যা নন তা শোনার এতো শখ কেনো আপনার?”
কন্ঠরুদ্ধ শারমিন বেগমের। চোখ দুটো ছলছল। বুকটা ফেটে কেমন খানখান হয়ে যাচ্ছে তার। মুগ্ধের কথাবার্তাতো এমনই। তবুও যে কেনো তার এতো খারাপ লাগে! এদিকে মুগ্ধ আর দাঁড়ালো না সেথায়।শক্ত মুখে গটগট পা ফেলে চলে গেলো বাইরে।
প্রায় আধঘন্টা পর, গাড়ি এসে থামলো লাইব্রেরীর সামনে। মাহি গাড়ি থেকে নেমে একাধারে কল করে যাচ্ছে আহির ফোনে।তবে মেয়েটার কী হয়েছে কে জানে! সে-তো ফোন তুলছেই না! মাহি এবার বেশ বিরক্ত। তেতে উঠে বিরবির করে বলল,
“ মানুষ প্রেম করলে এভাবে জ্ঞান বোধ হারিয়ে বসে আশ্চর্য! না আসতে পারলে একটাবার বলবে তো!”
ভীষণ বিরক্ত মাহি। একহাতে চোখের চিকন ফ্রেমের সাদা চশমাটা নাকের ওপর থেকে খানিক ঠেলে দিয়ে, বইগুলো নিয়ে নিলো হাতে।তারপর কেমন গটগট পায়ে চলে গেলো লাইব্রেরীর ভেতর।
চারদিকে মাগরিবের আজান পড়ছে। তা কানে যেতেই মাহির সম্বিৎ ফিরলো এতক্ষণে! মেয়েটা আবার বই পড়ুয়া কি-না! একবার বইয়ের পাতায় ডুব দিতে পারলেই হলো, দিন-দুনিয়া ভুলে একনাগাড়ে বসে থাকে বইয়ের কাছে। এখনো হলো তাই। আজানের সুমধুর ধ্বনি শুনতেই তড়িঘড়ি করে জিভে দাঁত কেটে ব্যাগপত্র গোছালো মাহি। মা বলেছিল তারাতাড়ি বাড়ি ফিরতে। অথচ সে এখনো লাইব্রেরি থেকেই বেরোয়নি! ওদিকে আহি এসেছে কি-না কে জানে।
ব্যাগ গুছিয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসে মাহি। হাতের ফোনটায় আহির চারটে কল এসেছে। মাহি কল ব্যাক করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে আহির কর্কশ কন্ঠ!
“ বই দেখলে আর উঠতে মন চায়না তাইনা?”
মাহি মুচকি হেসে পা চালাচ্ছে। ব্যস্ত সড়কের পাড়ে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেলে বলে,
“ কোথায় তুই?”
সড়কের ওপার থেকে হাত নাড়াচ্ছে আহি। এতক্ষণে তা চক্ষুগোচর হলো মাহির। মেয়েটা তক্ষুনি কান থেকে ফোন নামিয়ে হাঁটা ধরলো সেদিকে। আশেপাশে সর্তক দৃষ্টি ফেলে অবশেষে ব্যস্ত পথ পাড়ি দিতে সক্ষম মাহি। আহি দৌড়ে এলো মাহির নিকট। খপ করে মাহিরার একহাতের কব্জি চেপে ধরে বলে ওঠে,
“ চল!”
ভড়কায় মাহি।হাতের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে রেখে হকচকিয়ে বলে ওঠে,
“ কোথায়?”
আহি তৎক্ষনাৎ ব্যস্ত কন্ঠে জবাব দেয় —
“ ঐ যে সামনের ক্যাফে শপে! চল, আজকে আমার পক্ষ থেকে তোর জন্য ট্রিট রইলো!”
ফিক করে হেসে ওঠে মাহি। বোনের হাতটা শক্ত করে ধরে রেখে পা বাড়ায় আহির পিছুপিছু।
ব্যস্ত সড়কে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে এক যুবক। এদিক-ওদিক থেকে গাড়ি ছুটে এলেও ভয়ডর ছাড়াই ছুটছে সে। চারদিক থেকে মানুষজন হৈচৈ করলেও সেদিকে পাত্তা নেই তার। গায়ে একটা কালো হুডি জড়িয়ে ছুটছে সে। বুকের কাছটায় গভীর ক্ষত হওয়ায় এখনো সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ছে লহু! হুডির আবরনে আবৃত কপাল ফেটে গড়িয়ে পড়ছে লহু।চোখেমুখে অসম্ভব রকমের ভয়।যুবক ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যায় ধানমন্ডির এক বহুল চর্চিত ক্যাফে শপে। ভয়ার্ত অসহায় লোকটি চুপিচুপি গিয়ে বসলো ক্যাফের একদম কর্নারের টেবিলে। তার ভয়ার্ত চোখদুটো স্থির হয়ে আছে ক্যাফের দরজার পানে। এই বুঝি সেখান থেকে চলে এলো তার যমদূত!
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১২
প্রায় মিনিট পাঁচেক পেরুনোর পরও যখন কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির দেখা মিলেনি তখনি কেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো যুবক।ধরে নিলো পিছু নেওয়া ব্যাক্তি পথ হারিয়েছে হয়তো! যুবক স্বস্তির ঢোক গিলে যেইনা উঠতে যাবে ওমনি তার চোখ থমকালো ক্যাফের দরোজায়। এলোমেলো চুলের বলিষ্ঠদেহী যুবক।বাদামী চোখগুলোর তুখোড় দৃষ্টি তাক করে রেখেছে তারই পানে।যে দৃষ্টিতে চোখ পড়া মাত্রই বুক কেঁপে ওঠে আহত যুবকের। কপালে ছুটে যায় ঘাম! এদিকে বাদামী চোখদুটোর মালিক কেমন পৈশাচিক হাসছে তাকে দেখে। ঠোঁট কামড়ে হাত বাড়িয়ে কোমর থেকে নিজের রাশিয়ান মডেলের বন্দুকটা যেইনা বের করবে ওমনি তার দৃষ্টি পড়লো ক্যাফের সম্মুখ দরজার আয়নায়। যেথায় স্পষ্ট প্রতিবিম্বিত হচ্ছে মাহিরার হাসি মুখখানা। বাদামী চোখদুটোর মালিক থমকায়। কোমরের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে ফেলে তক্ষুনি। হতবিহ্বল কন্ঠে আওড়ায়,
“ চাশমিস!”
