Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৩

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৩

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৩
jannatul firdaus mithila

চকচকে কালো রঙের গাড়ি দুটো রাস্তার ধুলো উড়িয়ে মাত্র এসে থামলো এহসান বাড়ির আঙিনায়। ধীরেসুস্থে সকলে বেরিয়ে আসেন গাড়ি থেকে। অরিন প্রথম গাড়িটায় বসেছিল সাব্বির সাহেবের সাথে। আর রৌদ্র এসেছে পেছনের গাড়িটায়। মেয়েটা তখন থেকে রৌদ্রকে এড়িয়ে চলছে একপ্রকার। যদিও রৌদ্র বারকয়েক আড়চোখে দেখেছে মেয়েটার কর্মকাণ্ড তবে মুখ ফুটে তেমন কিছু বলেনি সে। সাব্বির সাহেব মেয়ের হাত ধরে বাড়িতে ঢুকলেন। অরিন বাড়িতে ঢুকতেই সকলে একযোগে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটাকে। রাফিয়া বেগম তো মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আর ছাড়ছেনই না।পাশ থেকে জুবাইদা বেগম বারকয়েক সুযোগ খুঁজেছেন মেয়েটাকে আদর করতে, তবে রাফিয়া বেগম ছাড়লে তো! অন্যদিকে কিয়তক্ষন বাদে বাড়িতে ঢুকলো রৌদ্র। জুবাইদা বেগম ছেলেকে দেখামাত্রই হাতে বুঝি চাঁদ পেলেন আকাশের। তিনি তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।ছলছলে চোখে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন,

“ আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো আব্বা?”
রৌদ্র স্মিত হাসলো। মায়ের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে নরম কন্ঠে বললো,
“ নাহ!”
জুবাইদা বেগম চোখে হাসলেন খানিকটা। ছেলের সারা মুখে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন মানুষটা।এমন সময় ড্রয়িং এ এসে উপস্থিত হলো অনিক। তার পিছুপিছু লাজুক মুখে এসে দাঁড়ালো ইকরা। অরিন ভাইকে দেখে একছুটে চলে এলো ভাইয়ের কাছে। দু’হাতে ভাইকে ঝাপটে ধরে বললো,
“ আই মিসড ইউ ভাইয়া!”
অনিক বোনকে জড়িয়ে ধরে খানিকটা উঁচিয়ে তুললো জমিন থেকে।চোখবুঁজে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বোনকে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে পরক্ষণেই বললো,
“ আই মিসড ইউ টু বনু।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

প্রায় মিনিট বিশেক সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে অরিন পা বাড়ায় ঘরের দিকে। তবে রৌদ্রের ঘরের কাছে এসে দাঁড়াতেই হাত-পা ক্রমশ ঠান্ডা হতে লাগলো তার। লোকটা নিশ্চয়ই ঘরে আছে!অরিন তো এয়ারপোর্ট থেকে এ পর্যন্ত ছেলেটাকে রীতিমতো ইগনোর করে এসেছে। সেক্ষেত্রে এখন ঘরে ঢুকলে না জানি আবার কী বলে বসে লোকটা! অরিন দুরুদুরু বুকে পা ফেললো ঘরের ভেতর। মাথাটা সামান্য ভেতরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঘরটায় উঁকি দিলো এক-আধবার। চেয়ে দেখলো ঘরে রৌদ্র তো দূর,রৌদ্রের টিকিটা অবধি দেখা যাচ্ছে না। অরিন দুহাত বুকে হাত চেপে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো খানিকটা। সে ধরেই নিলো — রৌদ্র বোধহয় অন্য কোথাও আছে। অরিন বেশ খানিকটা স্বস্তি নিয়ে ঘুরে ঢুকলো।পেছন ফিরে ঘরের দোর দিয়ে দিলো আলগোছে। পরক্ষণে নিজের গা থেকে ক্রিম কালারের ওভার কোটটা একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুলে নিয়ে সেটা ফেললো খাটের ওপর। গলার কাছে ঝুলিয়ে রাখা হিজাবটাও খুলে ফেললো মুহুর্ত ব্যয়ে।তারপর কাবার্ড থেকে তোয়ালে এবং কাপড় হাতে নিয়ে পেছনে ফিরতেই একপ্রকার চমকে উঠে মেয়েটা।দেখে, রৌদ্র তার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে! আশ্চর্য! সে-তো খেয়াল করেছিল রৌদ্র ঘরে নেই, তবে এখন এলো কোত্থেকে? অরিন ভড়কে গিয়ে বলে বসে,

“ আপনি কোত্থেকে এলেন?”
রৌদ্র হাসলো ঠোঁট কামড়ে। নিজেদের মধ্যকার বেশ খানিকটা দুরত্ব নিজ দায়িত্বে ঘুচিয়ে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটার গালে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে হাস্কিটোনে বলতে লাগলো,
“ আকাশ থেকে টপকেছি বউজান।”
এহেন কথায় না চাইতেও হেসে ওঠে অরিন। দু’হাতে রৌদ্রের বুক বরাবর আলতো করে ঠেলে দিয়ে একপ্রকার মেকি তাড়া দেখিয়ে বললো,
“ দেখি সরুন! আমার ফ্রেশ হতে হবে।”
রৌদ্র আলতো করে চেপে ধরে অরিনের দু’হাত।মেয়েটার চোখের দিকে নিরেট চোখে তাকিয়ে থেকে বলে,
“ এতো দূর দূর করছিস কেনো জানবাচ্চা? অথচ কয়েকদিন আগেই এতবড় একটা দূর্ঘটনায় পড়ে তোর কাছ থেকে বেশ দূরে চলে গিয়েছিলাম আমি। তারপরও তোর টানে ফিরে এলাম কত কষ্টে।আর তুই কি-না শুধু দূরদূর করছিস আমায়?”

অগত্যা এমন কথায় মুহুর্তেই কেঁপে ওঠে অরিন। মনে পড়ে যায় সে-ই বিষাক্ত স্মৃতি গুলোর কথা।রৌদ্রের রক্তাক্ত মুখ, নিথর দেহ, টানা বিশ দিনের অচেতনতা! সবটাই কেমন দূর্বিষহ ছিলো অরিনের জন্য! মেয়েটা তো রোজ নিয়ম করে রৌদ্রের কেবিনে এসে নিঃশব্দে কাঁদতো।কখনো কখনো আপনমনে অচেতন রৌদ্রের সাথে কথা বলতো।সারাদিন কী করলো,না করলো সবটা বলতো।তবে রৌদ্র? সে-তো কোনো জবাব দিতো না। অতীতের মানসপটে বিষাক্ত স্মৃতিগুলো কড়া নাড়তেই চোখদুটোর কোটর ভরে ওঠে অরিনের। সে তড়াক করে ছলছল চোখেই শক্ত দৃষ্টি ফেললো রৌদ্রের ওপর। মুখভঙ্গি যথেষ্ট শক্ত রেখে রৌদ্রের বুক বরাবর দু’হাতে ধাক্কা দিয়ে বলতে লাগলো,
“ কী সমস্যা আপনার? এগুলো কেনো মনে করাচ্ছেন আপনি? আমায় কী একটু শান্তি দিতে ইচ্ছে করে না আপনার? আমাকে জ্বালিয়ে কী সুখ পান আপনি? আপনি… ”

বাকিটা শেষ হবার আগেই হু হু করে কেঁদে উঠে অরিন। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে অরিনের মাথাটা আলতো করে চেপে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে। মেয়েটার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলে ওঠে,
“ সরি সরি! আ’ম এক্সট্রিমলি সরি সানশাইন।আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর কখনো এসব বলবোনা।প্লিজ এবারের মতো আমায় ক্ষমা করে দে!”
অরিন থামলোনা।উল্টো গতি বাড়ালো কান্নার। তা দেখে আরেকধাপ অস্থির হলো রৌদ্র। সে তৎক্ষনাৎ খানিকটা সরে এসে নিজের কানদুটো হাত দিয়ে ধরে অপরাধী সুরে অরিনকে বলে ওঠে,
“ আচ্ছা সরি না বেইব! এই যে দেখ,আমি কানে ধরেছি। কথা দিচ্ছি আর কখনো এসব বলবোনা। তুই… তুই বললে আমি ওঠবস ও করবো সানশাইন! প্লিজ ফর গড স্যাক তুই কান্না থামা।”

কথাটা বলতে বলতেই কান ধরে ওঠবস করতে লাগলো রৌদ্র। দুটো ওঠবস দিতেই তার বুকে একপ্রকার ঝাপটে পড়লো অরিন। ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারা রৌদ্র মেয়েটার কোমর চেপে পিছিয়ে যায় দু-কদম। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলো আলগোছে। ওদিকে অরিন কেমন নাক টেনে ধরে আসা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ বিষাক্ত স্মৃতিগুলো ভুলে যেতে হয় ডাক্তার সাহেব! আপনি যখন আমার কাছে ছিলেন না, আমায় একটু চোখ মেলে দেখলেন না,আমায় একটু আদুরে গলায় ডাকলেন না।বিশ্বাস করুন, আমার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো সেসময়। রোজ রোজ একটা আশা নিয়েই চোখবুঁজতাম — এই বুঝি আপনি চোখ মেললেন।হাঁক ছেড়ে ডাকলেন — আমার সানশাইন! আমি অপেক্ষা করেছি আপনার ডাক্তার সাহেব! ভীষণ অপেক্ষা। যার প্রতিটি মুহুর্ত ছিলো বিষাক্ত কাঁটার যন্ত্রণার ন্যায় তীব্র। তবুও আমি হাল ছাড়িনি।”
রৌদ্র মনোযোগ দিয়ে শুনলো সবটা। হঠাৎ করেই তার চোখ বেঁয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা অশ্রু কণা। রৌদ্রের হাতের বাঁধন দৃঢ় হলো আরও কিছুটা। মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলে বললো,
“ আমায় মাফ করে দে জানবাচ্চা! আর কোনোদিন তোকে এভাবে একা ফেলে যাবোনা। কথা দিচ্ছি সানশাইন! কথা দিচ্ছি।”

সন্ধ্যা নাগাদ এহসান বাড়ির ড্রয়িং এ বেশ ভালো একটা আড্ডা জমিয়েছেন বয়োজ্যেষ্ঠরা।আড্ডার মধ্যমনি কবির সাহেব, বড় সোফার এককোনায় গা এলিয়ে বসে স্মৃতিচারণ করছেন ছোটোবেলার।তার পাশেই একগালে হাত ঠেকিয়ে সেসব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন সাব্বির সাহেব। তাশরিক সাহেব ও তায়েফ সাহেব বসেছেন বাম পাশের সোফাটায়। শাহিনুর বসেছেন তাদের মুখোমুখি। অন্যদিকে,বাড়ির গৃহিণীরা ব্যস্ত সন্ধ্যার নাস্তা তৈরীতে।খানিকক্ষণ বাদে ওড়নার কোণায় ভেজা হাত মুছতে মুছতে ড্রয়িং এ এসে উপস্থিত হলেন আমরিন বেগম। তিনি বোধহয় এতক্ষণ ভাবিদের কাজে টুকটাক সাহায্য করে এলেন। আমরিন বেগম এসে বসলেন স্বামীর পাশে। অতঃপর নিজেও মত্ত হলেন চলমান আড্ডায়।
দোতলার ড্রয়িং রুমে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে আহি। হাতে তার স্মার্ট ফোন, সেটায় আপাতত দক্ষ হাতে চলছে চ্যাটিং। কিয়তক্ষন বাদে সেথায় আগমন ঘটলো অরিনের। অরিনকে দেখেই আহি খানিকটা নড়েচড়ে বসলো। ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে দিলো আলগোছে। অরিন হাসিমুখে এগিয়ে এসে বসলো আহির পাশে।হাত উঠিয়ে মেয়েটার কাঁধ জড়িয়ে বললো,

“ কি ম্যাডাম? কী করছেন একা একা?”
আহি চটপটে কন্ঠে জবাব দেয়,
“ কই তেমন কিছু না। এমনিতেই বসে আছি।”
অরিন ঠোঁট গোল করে খানিকটা শব্দ করলো। আহির দিকে সন্দিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে হঠাৎ বললো,
“ প্রেম করছিস?”
থতমত খেয়ে বসলো আহি। মুখ হা করে তাকিয়ে রইলো অবিশ্বাস্য চোখে।চোর ধরা পড়ার ন্যায় কাচুমাচু ভঙ্গিতে মিনমিনিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ তুমি কীভাবে জানলে?”
অরিন ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটুখানি।চোর ধরেছে এমন একটা উচ্ছ্বাস দেখিয়ে তৎক্ষনাৎ আহির গাল টেনে দিয়ে বলতে লাগলো,

“ সিরিয়াসলি? আমি কিন্তু হাওয়ায় তীর ছুড়ছিলাম।ভাবিনি এভাবে লেগে যাবে! যাকগে বল বল কে সে?”
আহিরা খানিক দোনোমোনো করতে লাগলো নাম বলতে। অরিন তা দেখে কেমন মুখ কুঁচকে বলে বসে,
“ এতো নাটক করছিস কেনো ইয়ার! বলবি তো না-কি!”
আহি নিজের শুষ্ক অধরজোড়া জিভ দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে বললো,
“ ইফতি!”
নামটা শুনে যারপরনাই অবাক হলো অরিন।তাকিয়ে রইলো অবিশ্বাস্য চোখে। কানে বোধহয় ভুল শুনলো কি-না তা যাচাই করতে সে ফের জিজ্ঞেস করল,

“ কোন ইফতি? আমাদের ইফতি ভাই?”
আহিরা ওপর নিচ মাথা নাড়ায় আলতো করে। অতঃপর কিছুক্ষণ নিরবতা চললো দু’জনার মাঝে। তবে পরমুহূর্তেই অরিনটা কেমন উল্লাসীত কন্ঠে কিছুটা চেচিয়ে উঠলো আহিকে জড়িয়ে ধরে। আহি সঙ্গে সঙ্গে জিভ নিলো দাঁতের ভাঁজে। অরিনের হাতদুটো চেপে ধরে সর্তক কন্ঠে বললো,
“ কী করছো অরিপু! কেউ শুনে ফেললে নির্ঘাত কেলেঙ্কারি রটবে!”
অরিন তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলায়।নিজের বাঁধ ভাঙা উল্লাসগুলো একপাশে রেখে সে কেমন সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ বাট তোরা দুজন না একে অপরকে দেখতে পারতি না? তাহলে এতকিছু কেমনে কী?”
আহি মুচকি হাসলো। কিছুটা সময় নিয়ে বেশ বিজ্ঞতার সাথে বললো,
“ জানো অরিপু? দুটো বিপরীত মানুষ, একে-অপরকে যারা দু-চোখে সহ্য করতে পারেনা একটা সময়,প্রকৃতির অজানা নিয়মে এরা দুজনে ঠিক বাঁধা পড়ে এক নতুন অনুভুতিতে।যে অনুভুতি সবকিছুর উর্ধ্বে! যা একবার অনুভব করতে পারলে আজীবন আঁটকে পড়া যায়। এটা সেই অনুভুতি। এক ভিন্ন অনুভুতির নাম এই #সঙ্গীন_হৃদয়ানুভুতি।”

পরদিন…
রুহি মেয়েটা না-কি বেশ অসুস্থ! ভাই এসেছে শুনে আসতে চাইলেও ডাক্তার তাকে একদম নিষেধ করেছে কয়েকটা দিন জার্নি করা থেকে। অগত্যা এমন একটা পরিস্থিতিতে মেয়েটার মন বড্ড খারাপ। তাই এহসান বাড়ির সকলে আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রুহিকে দেখতে যাবে। তাইতো সকাল সকাল মেয়েটার জন্য এটা-সেটা রাঁধতে ব্যস্ত রমণীরা।বাড়ির ছোটো সদস্যরা ব্যস্ত তৈরি হতে।

মাহিরা গো ধরেছে, সে যাবেনা। কিন্তু কেনো? সেটা জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলছেনা মেয়েটা। গত একঘন্টা যাবত মাইমুনা বেগম মেয়েকে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন কারণ, তবে নাহ! মাহিরা বলছেই না কিছু। মাইমুনা বেগম একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হলেন।শক্ত মুখে মেয়েকে বিরবির করে বকতে বকতে চলে গেলেন ঘর থেকে। ওদিকে মা’কে যেতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মাহি। পাদু’টো বুকের কাছে উঠিয়ে চেপে ধরে বসে রইলো চুপচাপ। পরক্ষণেই তার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠলো — সেদিনকার দেখা সেই বাদামী চোখের মানুষটাকে।মাহিরা তৎক্ষনাৎ দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে তাকে ভোলার চেষ্টা চালায় তবে নাহ! কেন যেন সে বাড়ি থেকে এসেছে পর থেকে ঐ আগন্তুককে ভুলতে পারছেনা মাহি। আগন্তুকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে বড্ড ভয় পেয়েছে মেয়েটা।তাইতো তাকে দেখার পরেরদিনই একপ্রকার ছুটে চলে এসেছে বাড়িতে। আজ বোধহয় তার জন্যই ও বাড়িতে যেতে চাচ্ছে না সে।

বাড়ি ভর্তি মানুষজন! কেউ কেউ ব্যস্ত আড্ডায়, তো আবার কেউ কেউ মগ্ন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরিতে। দুপুরের লাঞ্চ টাইম, সিকদার বাড়িতে জমেছে বেশকিছু পরিচিত মানুষের ঢল। এহসান বাড়ির সদস্যরা মাত্রই এসে পৌঁছেছেন এ বাড়ি। এহসান বাড়ির গৃহিণীরা আগে আগে এসে পৌঁছালেও বাড়ির কর্তারা কেমন পিছিয়ে রইলেন এপর্যায়ে! অবশ্য শহুরের ব্যস্ত রাস্তা বলে কথা! যানজট যেন নিত্যদিনকার সঙ্গী এ শহরের!
জুবাইদা বেগমসহ বাকিরা সিকদার বাড়ির বড় ড্রয়িং রুমটায় পা রাখতেই তৎক্ষনাৎ তাদের নিকট ছুটে এলেন সায়মা খাতুন। মানুষটা এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন বেয়াইনকে। মুখে তার সে-কি উৎফুল্লতা! চোখ দুটো কেমন চকচক করছে খুশিতে। শুধু কী তিনি? জুবাইদা বেগমেরও যে খুশিতে গদগদ হয়ে যাবার মতো অবস্থা!কতদিন পর বেয়ানকে দেখলেন, খুশী হবেন না? মিনিট খানেক বেয়ানকে জড়িয়ে রেখে সায়মা খাতুন অবশেষে গদগদ কন্ঠে বলতে লাগলেন,

“ এতো দেরি কেনো করলেন আপা? সেই কখন থেকে বসে আছি আপনাদের জন্য!”
জুবাইদা বেগম মৃদু হাসলেন।সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠেন,
“ দেরি করে আসার জন্য দুঃখীত ভাই। তা বলছিলাম কী, রেহান আর রুহি কোথায়?”
কথাটা বলতে দেরি ওমনি জুবাইদা বেগমকে পেছন থেকে একজোড়া হাত এসে ঝাপটে ধরতে দেরি হলোনা। ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারি একপ্রকার হকচকিয়ে ওঠলেন যেন।তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ঘাড় বাকিয়ে পেছন ফিরে বললেন,

“ হুটহাট এভাবে চেপে ধরার স্বভাবটা তোর আর গেলোনা তাই না?”
পেছন থেকে রুহি মুচকি হাসলো। চারমাসের হালকা উঁচু পেটটা নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো মায়ের সামনে।ইদানীং মেয়েটার মুখে কেমন মাতৃত্বের একটা মিষ্টি আভা ফুটে উঠেছে!গালদুটোতে দেখা মিলেছে ঈষৎ লাল টকটকে ভাব। গায়ে বোধহয় খানিকটা মাংস জমেছে এ ক’দিনে।অবশ্য রেহান যা খেয়াল রাখে না মেয়েটার! শুধু কী আর খেয়াল? এ যে একপ্রকার চোখে হারানো যাকে বলে। জুবাইদা বেগম আলতো হেসে দুহাত বাড়িয়ে মেয়েকে বুকে টেনে ধরলেন। রুহির মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে খানিক পরিপাটি করে দিয়ে বললেন,
“ নানুভাই কেমন আছে?”
রুহি মায়ের বুকে নাক ঘষলো একটুখানি। পরক্ষণেই মিনমিনে স্বরে বললো —
“ আলহামদুলিল্লাহ! বেশ ভালো।”

ঘিয়ে রঙা চকচকে গাড়িটা মাত্র এসে থামলো সিকদার বাড়ির সামনে। গাড়ির ফ্রন্ট সিট থেকে বেরিয়ে এলেন সাব্বির সাহেব। নিজ উদ্যোগে তড়িঘড়ি করে ড্রাইভার মকবুল মিয়ার সাথে ছুটলেন গাড়ির ডিঁকির দ্বারে।সেখান থেকে অতি যত্নে একে একে নামিয়ে আনলেন মিষ্টির প্যাকেটগুলো। ওদিকে এতক্ষণে তাশরিক সাহেবসহ বাকিরাও বেরিয়ে এলেন আলগোছে। কবির সাহেব হাসিমুখে গাড়ি থেকে বেরোতেই ওসমান সিকদার ছুটে এলেন একপ্রকার। তারপর কেমন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সকলের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ে।
এদিকে গাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে ফোন ঘাঁটছেন তাশরিক সাহেব। ঘাঁটছে বললে ভুল হবে, তিনি তো একনাগাড়ে সেই কখন থেকে কল দিয়ে যাচ্ছেন অনিকের ফোনে।তবে ছেলেটা ফোন ধরলে তো! সে যে এতক্ষণ ধরে কী করছে কে জানে! অথচ বাড়ি থেকে বউ নিয়ে সবার আগে সে-ই বেরিয়েছে। গায়ে কালো রঙের কাতুয়া জড়ানো তাশরিক সাহেব যখন ফোনেতে মগ্ন তখনি তার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন তায়েফ সাহেব। দৃষ্টি তাশরিক সাহেবের ফোনের স্ক্রিনে নিবদ্ধ রেখে সন্দিহান গলায় বলে ওঠেন,

“ কী করছিস?”
তাশরিক সাহেব মুখ কুঁচকালেন তৎক্ষনাৎ। ভ্রু দ্বয়ের মাঝে গোটা কয়েক ভাজ ফেলে কাঠকাঠ কন্ঠে বললেন,
“ হাডুডু খেলি! খেলবা?”
তায়েফ সাহেব যেন বড্ড নাখোশ হলেন এহেন ত্যাড়া উত্তরে।তিনি কোমরের দু’ধারে হাত ঠেকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ হ্যা খেলবো। চল!”
তাশরিক সাহেব ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালেন এবার। কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে তায়েফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে হুট করেই ফিক করে হেসে ওঠেন মানুষটা।ভাইয়ের ডান-বাহুটার ভেতর দিয়ে নিজের হাতটা ঘুরিয়ে এনে,সামনের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন,
“ চলো তবে!”

“ কী খাবে?”
মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে এহেন হুটহাট প্রশ্নে ভড়কায় ইকরা। ওদিকে অনিকটা কেমন গভীর চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে! ইকরা কেমন ঢোক গিললো নিজ অজান্তে। অনিক হাসলো ঠোঁট কামড়ে। নিজ থেকে এগিয়ে আসে মেয়েটার দিকে। অতঃপর হিসহিসিয়ে বলে,
“ চলো পেছনে যাই!”
গলা শুকিয়ে এলো ইকরার। খানিক শুকনো ঢোক গিলে কেমন আমতাআমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেনো?”
অনিক একপলক নিরব চোখে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষণেই গালভর্তি চমৎকার হাসি টেনে দুষ্ট কন্ঠে বললো,
“ কানে কানে বলবো মেয়ে! চলো…!”

অতঃপর আর কি’বা করা? ইকরা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলো নিজ আসনে। অনিক প্রথমে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে পরক্ষণে ইকরাকেও গাড়ি থেকে বের করে আনে।তারপর আশেপাশের সরু রাস্তাটায় খানিক সর্তক চোখ বুলিয়ে, ইকরাকে নিয়ে আবারও ঢুকে পড়লো ব্যাক সিটে। গাড়ির সবগুলো ডোর ভেতর থেকে বেশ ভালোমতো লক করে মেয়েটার দিকে বাঁকা চোখে তাকালো অনিক।যে দৃষ্টির কবলে পড়ে লজ্জায় পড়লো ইকরা! তৎক্ষনাৎ মাথাটা নিচু করে নিলো লজ্জাবতী।তার গৌড় বরণ গালদুটোতে কেমন ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে লাল টকটকে আবরণ। অনিক মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো নিজের বউ নামক পরীটার দিকে। সময় পেরুলো বোধহয় কয়েক মিনিট, এরপর হুট করেই অনিক ইকরার একহাত টেনে এনে রাখলো নিজের বুকের ওপর। হাস্কি স্বরে বললো,

“ এ জায়গায়টা কেমন চিনচিন করছে মায়াবিনী! কেনো করছে হঠাৎ?”
ইকরা ভড়কে তাকায়। মুখে একরাশ চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে সে তৎক্ষনাৎ অস্থির হয়ে পড়লো অনিকের জন্য। খানিকটা এগিয়ে এসে অনিকের গালে একহাত রেখে জিজ্ঞেস করল,
“ কী হয়েছে আপনার? আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন না।আমার টেনশন হচ্ছে তো!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২

অনিক মুগ্ধ হাসলো মেয়েটার এহেন চিন্তা দেখে। সে তৎক্ষনাৎ মেয়েটার হাতখানায় টান বসাতেই ইকরা আছড়ে পড়লো অনিকের বুকের ওপর। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলো বেচারি। তড়িৎ চোখ তুলে অনিকের দিকে তাকাতেই অনিক কেমন বাঁকা হাসলো যেন। ইকরার নরম অধরযুগলের ওপর আঙুল চালাতে চালাতে হিসহিসিয়ে বললো,
“ আমার কেমন বড্ড প্রেম প্রেম পাচ্ছে মায়াবিনী! আজ নাহয় ঘোরাঘুরি বাদ। এসো প্রেমবিলাস করি!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৪