Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৪

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৪

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৪
jannatul firdaus mithila

সিকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমে একপ্রকার হৈ-হুল্লোড় জমেছে! পুরুষগণ জমিয়েছেন আড্ডার আসর। এদিকে গৃহিনীরা মিলে একসাথে খাবার সাজাচ্ছেন টেবিলে। জুবাইদা বেগম,রাফিয়া বেগম যেচে পড়ে হাতে হাত লাগাচ্ছেন টুকটাক!তা দেখে সায়মা বেগমের সে-কি অভিমান! বেয়ানরা এসে না-কি কাজে হাত বাটাবেন? এ-ও দেখতে হবে তার? সায়মা বেগম বারকয়েক ভীষণ অভিমান নিয়ে বলেছেন মানুষ দু’টোকে তারা যেন আর কাজ না করে! তবে মিশুক জুবাইদা বেগম আর রাফিয়া বেগম, সায়মা বেগমের এহেন কথা একপ্রকার হেঁসেই উড়িয়ে দিয়েছেন।

অগত্যা বেয়ানদের সাথে কথাবার্তায় আর পেরে না উঠে, চুপ করে রইলেন সায়মা খাতুন।এতো মিশুক মনের বেয়াই বাড়ির মানুষজন পেয়ে, ইতোমধ্যেই মনে মনে বারকয়েক শুকরিয়া আদায় করে নিয়েছেন তিনি। গৃহিণীদের টুকটাক কাজকর্ম এবং কথাবার্তা যখন চলমান, ঠিক তখনি ডাইনিং এ এসে উপস্থিত হলেন গম্ভীরমুখো এক রমণী। রমণীর গায়ে জড়ানো মোটা পাড়ের ঘিয়ে রঙা টাঙ্গাইল শাড়ী। দু-হাতে শোভা পাচ্ছে মোটা মোটা বালা।কানে গলাতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পাতলা অথচ দামী দামী গহনা। কাজের একফাঁকে সায়মা খাতুনের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো গম্ভীর মুখো রমণীর পানে। তৎক্ষনাৎ মুখভঙ্গিতে পরিবর্তন ঘটলো তার! তিনি একগাল হাসি দিয়ে সদ্য উপস্থিত হওয়া রমণীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ ভাবি! ভালোই হলো তুমি এসেছো।আমিতো মাত্রই তোমার ঘরে যেতাম তোমাকে ডেকে আনতে। যাকগে… এই দেখো কে এসেছে!”
বলেই সায়মা খাতুন জুবাইদা বেগমের দিকে নজর দিলেন। পরক্ষণে তাকে দেখিয়ে ফের রমণীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ এই যে! উনিই আমার রুহির আম্মু। আর এই যে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আমার সুন্দরী বেয়ান।”
রাফিয়া বেগম মুচকি হাসলেন এহেন সম্বধনে। এদিকে রমণী গম্ভীর মুখে খানিক জোরপূর্বক হাসলেন মনে হয়।সায়মা খাতুন এবার তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে জুবাইদা বেগমকে বলে ওঠেন,
“ আপা! উনি আমার ফুপাতো ভাইয়ের বউ। শারমিন মির্জা! কয়েক মাস আগেই সাউথ কোরিয়া থেকে এসেছেন। গোটা কয়েক মাস থাকবেন দেশে।”

মির্জা পদবীর নাম শুনেই মুখ থেকে হাসি সরে গেলো রাফিয়া বেগমের। জুবাইদা বেগমেরও তো তাই। দু’জন আড়চোখে একপলক নিজেদের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। রাফিয়া বেগমের চোখেমুখে স্পষ্ট বিভ্রান্তি।হয়তো তিনি ভাবছেন, “ এ-ই মির্জা আবার সে-ই মির্জা নয় তো?”
গম্ভীর মুখো রমণী এবার নিজের গম্ভীর কন্ঠ প্রকাশ করলেন। মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে ভীষণ ব্যাক্তিত্বের ভাব ফুটিয়ে সালাম দিলেন সকলকে।পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে আলতো হাসির রেশ টেনে বললেন,
“ ভালো লাগলো আপনাদের সাথে দেখা হয়ে। আসলে আমি একটু অসুস্থ! গতকাল ঠান্ডা লেগেছে একটু। তাই সারাদিন ঘরে শুয়ে ছিলাম বলে আপনাদের সাথে নিজে থেকে এসে কথা বলতে পারিনি।আশা করি এ নিয়ে… ”
বাকিটা আর শেষ হলোনা বলা।তার আগেই জুবাইদা বেগম হাসিমুখে বলে ওঠেন,
“ না না! আমরা কিছু মনে করিনি। তা বলি কী ভাই, আপনি কী এখন সুস্থ বোধ করছেন?”
শারমিন বেগম হাসলেন একটুখানি। মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ! আগে থেকে বেটার!”

ড্রয়িং এ চলছে বেশ রমরমা আড্ডা! এরইমধ্যে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকলেন একজন মধ্যবয়স্ক সুপুরুষ। সকলের নজর গিয়ে পড়লো তার ওপর। সুপুরুষটি ভড়কালেন একটু।ক্ষুদ্র চোখে নিজের দিকে দৃষ্টিপাত করে হঠাৎ কেমন সন্দিহান গলায় বলে ওঠেন,
“ মুনজেগা ইন্নায়ো?”
(কোনো সমস্যা?)
ভদ্রলোকের মুখে এহেন ভিন্ন ধরনের ভাষা শুনে খানিক দ্বিধায় পড়লেন এহসান বাড়ির মানুষজন। ওদিকে ওসমান সিকদার হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“ আরে না ভাই! তেমন কিছু না। কাম কাম,জয়েন আস!”
ভদ্রলোক বোধহয় ভারি মিশুক প্রকৃতির! এক ডাকেই কেমন চলে এলেন তৎক্ষনাৎ। গিয়ে বসলেন কবির সাহেবের পাশে।পরক্ষণে হালকা ঘুরে নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দিলেন কবির সাহেবের দিকে। বলেন,
“ হেলো! আমি তৌকির! তৌকির মির্জা!”
পুরোটা শুনে খানিক থতমত খেলেন কবির সাহেব। এতক্ষণ সুপুরুষটিকে ভিন্ন দেশি ভেবে তবে ভুল করেছেন তিনি। নিজের অপ্রকাশিত ভুলখানা মনের সঙ্গোপনে লুকিয়ে রেখে খানিক সময় নিয়ে হাতে হাত মিলিয়ে সৌজন্যমূলক হেসে বলেন,

“ জ্বি! আমি কবির এহসান।”
তৌকির সাহেব আলতো গা দুলিয়ে হাসলেন। ওদিকে সাব্বির সাহেবের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠল যেন! তিনি পাশ থেকে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠেন,
“ আচ্ছা.. আপনি কী তৌসিফ মির্জার…!”
“ হ্যা! তিনি তো আমার বড় ভাই।আপনি চিনেন নাকি ওনাকে?”
তৌকির সাহেবের এরূপ কথায় তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বসলেন এহসান বাড়ির সদস্যরা! তৌসিফ মির্জাকে কী আর ওতো সহজে ভোলা যায়? সে’বার অরিনকে স্বপরিবারে দেখতে এসেছিলেন বলে রৌদ্র কী অপমানটাই না করলো বেচারাকে! সে কথা কি আর ভুলেছেন কেউ? হঠাৎ সকলকে ওমন গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে ভ্রু গোটান তৌকির সাহেব। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“ আপনারা আমার ভাইয়াকে চেনেন না-কি?”
কবির সাহেব সম্বিত ফিরে পেলেন তৎক্ষনাৎ! পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর মুখে বলেন,
“ হ্যা! আমার বিজনেস পার্টনার ছিল একসময়!”
তৌকির সাহেব ঠোঁট গোল করে শব্দ করলেন একটু। তাদের আলাপচারিতা শেষ হতেই ওসমান সিকদার মুখ খুললেন। তৌকির সাহেবের কাছে খানিক উৎসাহিত হয়ে জানতে চাইলেন,
“ মুগ্ধ কোথায় ভাই? ও আসবেনা লাঞ্চে?”

ছেলের কথা শুনতেই ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। মাথাটা দু’ধারে নাড়িয়ে কেমন উদাস মুখে বলে ওঠেন,
“ নাহ মেবি! কিছুক্ষণ আগে আমায় কল দিয়ে জানালো, তার কোন ফ্রেন্ডের সাথে না-কি লাঞ্চ করবে।আচ্ছা বলেন তো ভাইজান, ছেলে আমার জন্মের পর থেকে থাকলো কোরিয়ায়।তার যত ফ্রেন্ড -কলিগ আছে সব হচ্ছে কোরিয়ান। তবে বাংলাদেশে এসেছে আজ গুণে গুণে তিনমাস মাত্র! এরইমধ্যে তার না-কি আবার ফ্রেন্ডও হয়েছে! উফফ!এই ছেলেপেলে গুলোও না!যেখানেই যায় সেখানেই সঙ্গ পাতায়!”
ভদ্রলোক নাক কুঁচকালেন বলতে বলতেই। তার ওমন মুখভঙ্গি দেখে মুখ টিপে হাসছেন সকলে। তবে গম্ভীর মুখে চিন্তায় পড়লেন সাব্বির সাহেব। অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ বর্তমানে না আবার পড়ে বসে!

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে অরিন। সামনে মেলে রেখেছে নোট খাতা। হাতের আঙুলের ভাঁজে কলম,তা নড়ছে চড়ছে কোনোরকম!খাতার একপাশে ফোন। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে আছে গোটা গোটা অক্ষরে তৈরি সাজেশনটা। অরিনের মনোযোগী চোখদুটো ভীষণ মনোযোগের একবার ফোন দেখছে, আরেকবার দেখছে খাতার মসৃণ পৃষ্ঠ! কলম চালিয়ে টুকে নিচ্ছে তা মসৃণ পৃষ্ঠের গায়ে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর লেখালেখির ইতি টানলো অরিন।নরম ঠোঁট দুটোর ভাঁজে কলম চেপে সরু চোখে তাকিয়ে রইল খাতার দিকে।তার সর্তক দৃষ্টি আপাতত লেখার মাঝে ভুল খুঁজতে ব্যস্ত। তবে আজ বোধহয় ভালো লিখে ফেলেছে মেয়েটা! পুরো লেখা জুড়ে একটাও ভুল নেই! যদিওবা পুরোটা দেখে দেখেই পুরোটা লিখেছেন মহারানী, তবুও নিজের এহেন কার্যে বড্ড আপ্লুত তিনি! খুশিতে উপুড় অবস্থাতেই পাদু’টো উঁচু করে দোলাতে লাগলো দারুণভাবে! ফলে পরনের লিনেন স্কার্টটা উঠে গেলো খানিকটা ওপরে। দৃশ্যমান হলো ফর্সা মসৃণ পাদু’টো। সে-ই সাথে রিনিঝিনি শব্দ — নুপুর পড়া পাদু’টোর। অরিন গুনগুন করে গান গাইছে।গান বহাল রেখে আঙুলের ভাঁজে নাচাতে থাকা কলমখানা দিয়ে, খানিক দুষ্টুমি করে খাতার একপাশে ছোট্ট করে লিখে বসলো,
“ Orin Loves her Doctor shaheb ”

লেখাটা টুকে সে-কি আনন্দ মেয়েটার! ঠোঁটের কোণ থেকে হাসি যেন সরছেই না মেয়েটার। হুটহাট তার এমন পাগলামি গুলো যে বড্ড পছন্দের তার! কিয়তক্ষন বাদে অরিন নিজের মুখটা সামান্য নিচু করে লেখার জায়গাটায় চুমু বসালো আলতো করে। আরেকটা বসাবে তার আগেই তার ডাক পড়লো ওয়াশরুম থেকে! প্রায় আধঘন্টা আগে শাওয়ার নিতে ঢুকেছিল রৌদ্র। এখনো নিয়েই যাচ্ছেন মহারাজ! ওদিকে রুহির বাড়িতে যেতে তাদের যে লেট হয়ে যাচ্ছে সেদিকে কী আর খেয়াল আছে মহাশয়ের? ওয়াশরুমের দরজাটা হালকা ফাঁক করে তাকিয়ে আছে রৌদ্র। মেয়েটার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,

“ সানশাইন! আমার তোয়ালেটা একটু দিবি? আমি আনতে ভুলে গিয়েছি।”
অরিন কিছুক্ষণ ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে রইল। তখনকার ঘটনাটা কী আর ওতো সহজে ভুলেছে সে? শুধু শুধুই লোকটা তাকে কাঁদালো! কী দরকার ছিল তখন ওকে সেদিনকার এক্সিডেন্টের ঘটনাগুলো মনে করানোর? এসব ভাবতে ভাবতেই মেয়েটা কেমন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল।পরক্ষণে রৌদ্রের দিকে মুখ ভেংচি কেটে নিজের কাজে মত্ত হয়ে ঠেস মে’রে বললো,

“ নিজে এসে নিয়ে যান! আমি পারবোনা দিতে।”
রৌদ্র মোটেও রাগ করল না মেয়েটার এহেন কাঠখোট্টা জবাবে। উল্টো মুচকি হেসে আবারও বললো,
“ দে না হানি! নাহলে তোয়ালে ছাড়াই এখন বের হয়ে যাবো কিন্তু!”
অরিন মুখ কুঁচকায়।চোখ নিজের খাতার পানে নিবিষ্ট রেখে ঝাঁঝ নিয়ে বলে,
“ বের হলে বের হবেন।এতে এতো ঘটা করে বলার কী আছে? এমন একটা ভাব ধরছেন না… যেন ফার্স্ট টাইম দেখছি হুহ্! নতুন করে দেখার মত কি’বা আছে শুনি?”

মুখ ফসকে কথাগুলো বলে পরমুহূর্তে নিজেই লজ্জায় পড়ল বেচারি। তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত কেটে মুখ লুকালো খাতার ভাঁজে। ইশশ্! সে-ও কী তবে পুরোপুরি নির্লজ্জ হয়ে গেলো? গায়ে তবে সত্যিই লেগে গেলো রৌদ্রের নির্লজ্জতার আভাস? ওদিকে রৌদ্রও যে হতভম্ব বনে গেছে মেয়েটার ওমন লাগামহীন কথায়। বেচারা হতভম্বতায় চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেলো যেন। প্রায় মিনিট দুয়েক লাগলো তার হতভম্বতা কাটতে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কেমন গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,

“ ঘাড়ত্যাড়ামির সাথে সাথে ইদানিং দেখছি জিভ টাও লাগামহীন হচ্ছে তোর! ঠিক আছে ব্যাপার নাহ! আমি আবার লাগামহীন ঘোড়ার লাগাম টানতে বেশ জানি।”
লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়াটাই বোধহয় আপাতত বাকি অরিনের। বেচারি এখন কীভাবে বলবে, আবেগে মুখ ফসকে ওসব বেরিয়ে গেছে! সে-কি আর ওতো বেফাস কথাবার্তা বলে না-কি? তবুও আজ কেমনে যে বলে ফেললো…. অরিনের ভাবনার মাঝেই আবারও ডাক পড়লো রৌদ্রের। আগের তুলনায় আরও খানিকটা গম্ভীর এবং ভরাট কন্ঠে,
“ তোয়ালেটা দেওয়ার কথা কী এখন মাইকিং করে বলতে হবে?”
তৎক্ষনাৎ উঠে বসল অরিন। একলাফে খাট থেকে নেমে চলে গেল কাবার্ডের কাছে। সেখান থেকে সাদা তোয়ালেটা হাতে নিয়ে আবারও ছুটে এলো ওয়াশরুমের কাছে। তবে দরজা থেকে মাঝে কিছুটা দুরত্ব নিয়ে দাড়ালো কেন যেন। রৌদ্র এখনো আগের ন্যায় ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।অরিন চোখ এবং মাথা দুটোই নুইয়ে রেখে রৌদ্রের দিকে তোয়ালেটা বাড়িয়ে দেয়।কাঁপা কাঁপা স্বরে ভয়ার্ত ঢোক গিলে বলে,
“ এই নিন!”

রৌদ্র বাঁকা হাসলো এপর্যায়ে।দরজার ফাকঁ দিয়ে একহাত বাড়িয়ে তোয়ালের পরিবর্তে খপ করে চেপে ধরে অরিনের হাত।অরিন হকচকিয়ে ওঠে। হাতখানা মোচড়াতে মোচড়াতে বলে,
“ আহা! আমার হাত ধরলেন কেনো আবার? আমি কিন্তু গোসল করে নিয়েছি।ছাড়ুন আমায়।”

কে শোনে কার কথা! রৌদ্রের কানের ধারে কাছেও যেন কথাটা ভিড়লোনা।উল্টো সে একটানে মেয়েটাকে ঢুকিয়ে নিলো ওয়াশরুমের ভেতর। ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারি হতভম্ব! চোখের পলক পড়ার আগেই রৌদ্র ঘটালো আরেক কান্ড! চট করে অরিনের চোয়াল চেপে মেয়েটার নরম ওষ্ঠপুট দখল করে নিলো আলগোছে। এদিকে একের পর এক হুটহাট ঘটনায় বেচারির নিশ্বাস ফেলবার জো নেই! রৌদ্রের চুম্বন গাঢ় হচ্ছে। হাতদুটো তার লেগে পড়েছে নিজেদের চিরায়ত কাজে। ফলস্বরূপ লজ্জায় বারংবার কেঁপে কেঁপে ওঠছে অরিন! সর্বাঙ্গে তার বয়ে যাচ্ছে এক মৃদু ঝংকার। রৌদ্র থামছেনা।উল্টো একহাতে অরিনের মাথার ওপর দেয়ালের দিকে লাগিয়ে রাখা শাওয়ার সুইচটা অন করে দিলো।মুহুর্তেই দু’জনা গা ভিজে গেলো ঝমঝমিয়ে ঝড়ে পড়া পানির ফোঁটায়। এবার যেন নিশ্বাস আঁটকে আসছে অরিনের। সে খানিক ছটফট করতেই রৌদ্র ছেড়ে দিলো তার ওষ্ঠপুট। মেয়েটার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগলো সে ও। ওদিকে অরিনটা রীতিমতো হাঁপাচ্ছে! বুকে দু’হাত চেপে চোখবুঁজে আছে মেয়েটা।রৌদ্র একপলক তাকালো সেদিকে। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসির রেশ টেনে বলতে লাগলো,

“ আই নো হানি,আমাতে দেখার মতো নতুন কিছুই নেই। সবটাই এখন তোর জন্য পুরাতন!”
এটুকু বলে একমুহূর্তের জন্য থামলো রৌদ্র। নিজের মুখটা ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে এলো অরিনের কানের কাছে। অতঃপর কেমন হাস্কি স্বরে ফের বলল,
“ বাট ইউ নো না হানি? ওল্ড ইজ গোল্ড!”
কথাটা শেষ করেই মেয়েটার কান বরাবর আলতো করে দাঁত বসালো রৌদ্র। সে স্পর্শে বেসামাল অরিন তৎক্ষনাৎ খামচে ধরে রৌদ্রের উম্মুক্ত বক্ষ! নরম চামড়ায় মুহুর্তেই দেবে যায় তার সদ্য এক্সটেনশন করিয়ে আনা নখগুলো।

পিচ ঢালা সরু রাস্তাটিতে একা একা হাঁটছে মাহিরা। গায়ে জড়িয়ে রাখা পাতলা একটা শাল। বছরের শেষ সময়,ইদানিং ঢাকার বাতাসে কেমন উত্তুরে হাওয়ার উপস্থিতি! দিনের বেলাতেও বেশ ভালোই ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব পড়ে। বাড়ির সবাই গেছে তার রুহিপুর বাড়ি। তবে সে যায়নি কোনো এক কারণে। মা থেকে শুরু করে বাড়ির সকল সদস্যদের একপ্রকার জোরাজোরিতেও টলেনি মাহি।নিজের সিদ্ধান্তে গো ধরে বসেছিল মেয়েটা। বিকেলের দিকে রৌদ্র এবং অরিনও গিয়েছে সে বাড়িতে। মাহি জানতো,রৌদ্র তাকে না নিয়ে অবশ্যই যেতে চাইবেনা।তাইতো সে একপ্রকার মিথ্যা বলল,সে না-কি তার বান্ধবীর বাসায় যাবে গ্রুপ স্টাডি করতে। স্টাডি না ছাই! মাহি’র আবার ফ্রেন্ড আছে নাকি? একে-তো সে মারাত্মক ইন্ট্রোভার্ট,তার ওপর ভীতু।এমন মানুষ কী আর ওতো সহজে কারো সাথে মিশতে পারে? তার বন্ধু বলতে সে-তো আহিই আছে।তবে আহিও ইদানিং মাহিকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। সদ্য প্রেমে পড়েছে কী না! এসময় এমন টুকটাক অবহেলা করবেই!

মাহি যদিও এসব মনে রাখেনা।শুধু শুধু বুকের খাচাঁয় কষ্ট পুষে কী-বা লাভ? সে-ই তো মানুষগুলো সুখেই আছে, সেক্ষেত্রে তার ওমন মনে মনে মনবিবাগী হয়ে পড়ে থাকার কোনো দরকারই নেই! মাহি ইদানিং বেশ ভালো আছে।গত তিনমাসে নিজেকে বড্ড শক্ত করেছে মেয়েটা। এখন আর আগের মত লুকিয়ে -চুরিয়ে কাঁদে না সে। শিখে গেছে বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করতে।

মাহি ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে। পেটটা কেমন চো চো করছে তার।বোধহয় আবারও খুদা লেগেছে তার।যদিও দুপুরে খেয়েছিল সে, তবে খুব একটা নয়। ফুলি রেঁধেছে টুকটাক। খুব একটা অসাধারণ নাহলেও পাতা নেওয়ার অযোগ্য ছিলোনা যদিও। মাহি হাঁটার একপর্যায়ে থামলো। আশেপাশে নজর বুলিয়ে দেখে নিলো আপাতত কোথায় আছে সে। পরবর্তীতে বুঝলো,বাসা থেকে হাটতে হাটতে প্রায় অনেকটাই দূরে চলে এসেছে সে। আরেকটু এগোলেই চৌরাস্তা। রাস্তার ওপারে একটা নতুন চিকেন চাপ রেস্তোরাঁ খুলেছে। লোকমুখে ইতোমধ্যেই সেখানকার চিকেন চাপ উইথ তন্দুরি রুটির বেশ নামডাক শুনেছে সে।আজ নাহয় সেগুলোই একটু টেস্ট করা যাক! তাই যে-ই ভাবনা সে-ই কাজ। মাহি আবারও পায়ের গতি বাড়ালো সামনের দিকে। চেনাজানা রাস্তা, এখানে রাত-বিরেতে হাঁটতেও খুব একটা সমস্যা হয়না তার।তাছাড়া অতিপরিচিত ডিসির মেয়ে সে!তার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাধ্যি আছে কোনো বাপের ব্যাটার?

প্রায় মিনিট দশেক পর মাহি চলে এলে চৌরাস্তার মোড়ে। আশেপাশে সর্তক দৃষ্টি ফেলে সে ধীরে ধীরে রাস্তা পার হচ্ছে। তবে দেখো ভাগ্য! কিছুটা পথ এগোতেই কোত্থেকে যেন ভীষণ স্পিড নিয়ে ছুটে এলো এক মোটরবাইক। বাইকটা নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে ছুটতে ছুটতে মাহিরার বাহাতের একদম পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। মেয়েটার হাতের কনুইয়ে একটুখানি ব্যাথা লাগলেও ভাগ্যক্রমে খুব একটা লাগেনি তার।মাহিরা তৎক্ষনাৎ থেমে গেলো মাঝ রাস্তায়। বুদ্ধি করে বাইকটার পেছনের নম্বর প্লেটটা দেখে নিলো একবার। মনে মনে ভেবে নিলো — বাড়িতে একবার যা-ই মনা! বাবাকে বলে তোমায় এমন টাইট দিবোনা।একদম জন্মের মত বাইক চালানো ঘুচে যাবে দেখো।

তার ভাবনার ঘোর কাটলো পেছন থেকে ভেসে আসা গাড়ির হর্ণে।এহেন শব্দে হকচকিয়ে ওঠে মাহি।গাড়ির দিকে না তাকিয়েই তৎক্ষনাৎ সরে গেলো অন্যদিকে। ওদিকে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা একজোড়া বাদামী চোখ চকচকে দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে, সে খবর কি আর আছে তার? মাহি চলে এলো সে-ই রেস্তোরাঁয়। খুঁজে খুঁজে একটা কর্নারের টেবিলে গিয়ে বসলো হাঁফ ছেড়ে। ওয়েটার এলে তার কাছে পছন্দসই খাবার অর্ডার দিয়ে বসে রইল খাবারের অপেক্ষায়। মিনিট পাঁচেক বাদেই একজন ওয়েটার গরম গরম দুটো থালা এনে রাখলেন মাহির সামনে। খাবারের সুঘ্রাণে নাক ধরে গেলো মেয়েটার। সে তৎক্ষনাৎ ধীরেসুস্থে শুরু করল খাওয়া।

খাওয়া যখন মাঝপথে, তখনি কেমন পেট থেকে গলা অবধি ভরে গেল মাহির। পেটে আর জায়গা নেই তার।অথচ প্লেটে এখনো অর্ধেক খাবার বাকি! মাহি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ চোখে তাকিয়ে রইল খাবারগুলোর দিকে। পরক্ষণে নিজের মনকে বুঝিয়ে শুনিয়ে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো আলগোছে।ওয়েটারকে ডেকে বিল দিয়ে চলে গেল রেস্তোরাঁ থেকে। বাড়ির দিকের রাস্তা ধরে এগোচ্ছে মাহি।বিকেল পড়ে এসেছে! আরেকটু পর সন্ধ্যা নামবে।মেয়েটা নিজের পায়ের গতি বাড়ালো। গায়ের শালটা আরও খানিকটা টেনেটুনে জড়িয়ে হাঁটতে লাগলো দ্রুত কদমে। প্রায় মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর,হঠাৎ একটি কালো রঙের চকচকে বিএমডব্লিউ গাড়ি এসে দাঁড়ালো রাস্তার পাশে। মাহি প্রথমে ভয়ে সিটিয়ে গেলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে হাঁটতে লাগলো দ্রুত। ওদিকে তক্ষুনি গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে মুগ্ধ। গায়ে কালো রঙা হুডি যুবকের,হুডির গলার কাছে আঁটকে রাখা কমলা রঙের গগলস। মুগ্ধ পায়ের গতি বাড়িয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে আসে। তবে মাহি ভয় পেয়ে পেছনে না তাকিয়েই সামনে হাঁটতে থাকে জোরালো পায়ে। রাস্তার চারিপাশ ঠিকঠাক মত না দেখেই হাঁটছে সে।কয়েক পা সামনেই হা করে খুলে রাখা মেনহোলের ঢাকনাটা! প্রাণের দেশ বলে কথা, আশেপাশে তেমন কোনো সর্তক চিহ্ন অবধি নেই। তবে মুগ্ধের নজর এড়ায়নি তা। ছেলেটা তা দেখা মাত্রই মাহিকে পেছন থেকে ডেকে ওঠে বলে,

“ হেই স্টপ! ডোন্ট মুভ।”
ঘাবড়ে গেল মাহি।এবার ছুটলো প্রাণপনে। তাকে ছুটতে দেখে মুগ্ধও ছুটলো তার পিছুপিছু।শত হলেও একজন দক্ষ এথলেট বলে কথা,সে-তো আগে পৌছাবেই! মুগ্ধ দৌড়ে এসে তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে মেয়েটার কোমর আঁকড়ে ধরে একহাতে। মুহূর্তেই মাহির পাদু’টো উঠে গেলো জমিন হতে। মেয়েটা কেমন ঝুলে রইলো মুগ্ধ হাতের বাঁধনে। ঘটনা যে এতদূর গড়াবে তা বুঝি স্বপ্নেও ভাবেনি সে। মেয়েটার চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে হতবিহ্বলতা।তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মুহুর্তখানেক বাদেই মাহি সামলায় নিজেকে। নিজের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে মুগ্ধের বুক বরাবর ঘুষি বসাতে থাকে অনবরত! কিন্তু সে প্রহারে মুগ্ধের গা-টা সামান্যখানি দুললোও না।ছেলেটার চোখেমুখে নেই কোনো প্রতিক্রিয়া। তবে ঠোঁটের কোণে লেগে আছে তাচ্ছিল্যের হাসি। প্রায় বেশ কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে চেচিয়ে কেঁদে উঠে মাহি। ওদিকে তার ওমন কান্না শুনে থতমত খেয়ে বসল মুগ্ধ। তৎক্ষনাৎ ভড়কে গিয়ে মেয়েটাকে নিজের হাতের মধ্যেই ঝাঁকিয়ে ওঠে একটুখানি। ভড়কে যাওয়া কন্ঠে হতবাক হয়ে বলে,

“ হেই চশমিস! কাঁদছো কেনো? আমি কী তোমায় বকুনি দিয়েছি? না-কি মেরেছি?”
এহেন কথায় কান্নার বেগ আরও বাড়লো মাহির।বেচারি কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে রীতিমতো। মুগ্ধের বুকটা কেমন হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে ওঠল।আশ্চর্য! এমন একটা ছিচঁকাদুনে মেয়েমানুষ কাঁদছে বলে তার মতো ওমন শক্তপোক্ত পুরুষের বুক তো কাঁপার কথা নয়! তবে কাঁপছে কেনো? মুগ্ধ এবার দাঁত খিচে দিল এক ধমক!
“ জাস্ট শাট আপ! স্টপ ক্রায়িং আদারওয়াইজ তুলে একটা আছাড় মারবো।”

এহেন শক্তিশালী ধমকে তৎক্ষনাৎ আঁতকে ওঠে মাহি। ছলছল চোখজোড়া নিয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইল যুবকের দিকে। এতক্ষণে যুবকের সুশ্রী মুখখানায় চোখ পড়লো তার।আরে! এ-তো সেই বাদামী চোখের লোকটা।কিন্তু তিনি ওকে এভাবে কোলে তুলেছে কেনো? আচ্ছা ওনার চরিত্রে সমস্যা নেই তো? মাহিকে আবার…. না না! আর ভাবতে পারলোনা মাহি। মেয়েটা কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিলল তৎক্ষনাৎ। গলা থেকে উপচে আসা কান্নাগুলো কোনমতে চেপেচুপে আকুতি ভরা কন্ঠে মুগ্ধকে বলতে লাগলো,
“ প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন।আমার ক্ষতি করবেন না প্লিজ! আমি মরে যাব সত্যি। আপনি আমায় মেরে ফেলুন, তবুও আমায়…”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৩

বাকিটা শেষ হবার আগেই তাকে নিজের পেশিবহুল হাতের বাঁধন থেকে নামিয়ে দিলো মুগ্ধ। মাহি কিছু বুঝে উঠবে তার আগেই তার গাল বরাবর পড়লো এক শক্তপোক্ত হাতের চড়! বেচারি তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো রাস্তায়। গালটা বুঝি এই খসে পড়বে তার! চোখদুটোর সামনেও কেমন আঁধার নেমে এলো হঠাৎ। কানের ভেতরটা কেমন ভো ভো করছে। এরইমধ্যে তার কানে এলো মুগ্ধের তেজি এবং শক্ত কন্ঠ! ছেলেটা কেমন দাঁতে দাঁত চেপে বলছে,
“ হাউ ডেয়ার ইউ থিংক অফ মি এজ আ রে পি স্ট? ব্লাডি ডাম্ব!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৫