Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৪

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৪

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৪
জাবিন ফোরকান

“আমার মনে হয় আমাদের লুকিয়ে পড়া উচিৎ। এদিকে আসো, সাবিন।”
আমার কব্জি পাকড়াও করে মিসির টানলো। কিন্তু একচুল নড়লাম না আমি। বরং অপর হাতে মিসিরের হুডি আঁকড়ে ধরে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলাম,
“লোকাবো কেন? তুমি আর আমি কি চোর না ডাকাত?”
“সাবিন…”
“তুমি আমার আজকের ডেট মিসির। কথা শেষ। এখন তুমি যেই হওনা কেন, আই ডোন্ট কেয়ার। ওকে?”
মিসিরের চেহারায় ভীষণ বিস্ময় ফুটলো। বেচারা কাচুমাচু মুখে সংকোচ নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু সম্ভব হলোনা। উৎফুল্ল মেয়েলী কন্ঠস্বরটি আমাদের মাঝে বাঁধ সাধলো।

“আরে, সাবিন?”
আরওয়ার গলার স্বর চিনতে আমার একটুও সমস্যা হলোনা। অন্তিম বারের মতন মিসিরের দিকে তাকালাম। চোখের ইশারায় শাসালাম লোকটাকে। অতঃপর ঠোঁটে মহা উৎসাহের হাসি ফুটিয়ে পিছনে ঘুরে দাঁড়ালাম। একেবারে মুখোমুখি দন্ডায়মান আরওয়া এবং জায়দান।
“মিস আরওয়া! ম্যাম, কি কাকতালীয় দেখা আমাদের!”
“হ্যাঁ। আমি তো আপনাকে দেখে চমকেই গিয়েছি। শুরুতে বিশ্বাসই হতে চায়নি। কেমন আছেন?”
“এইতো, অসাধারণ। আপনিও নিশ্চয়ই ভালো আছেন। ওয়েল দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ডেটে এসেছেন বুঝি?”
মৃদু হাসলো আরওয়া। জায়দানের বাহুতে হাত গলিয়ে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো।
“জ্বি। আপনিও বুঝি? দিস হ্যান্ডসাম ম্যান হেয়ার…”
মিসিরের বাহু টেনে ধরে তাকে সামনে এনে উজ্জ্বল হাসলাম আমি। এক হাতে ডালিয়ার তোড়া শক্তভাবে চেপে দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিলাম,

“উনি আমার ডেট, মিসির ইকবাল।”
জায়দানের চিবুকজুড়ে তীক্ষ্ণ এক ভাঁজ পড়লো। সরাসরি না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম, দাঁতে জিভ কামড়ে ধরেছে সে। নিগূঢ় বাদামী নয়নের মাঝে অস্বাভাবিক এক ঘূর্ণিপাক খেলে গেলো তার। দৃষ্টি আমার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিক্ষিপ্ত মিসিরের দিকে। প্রফেসরের বন্ধুর যে মানসিক অবস্থা, তাতে ভাবলাম এই বান্দা বুঝি জায়দানের দৃষ্টিতেই মূর্ছা যাবে। অথচ আমায় হতবাক করে দিয়ে মিসির সামনে এগোলো। এক লহমায় যেন সমস্ত শঙ্কা, ভয়, আতঙ্ক এবং সংকোচ উধাও হয়ে গিয়েছে। এর পরিবর্তে তীক্ষ্ণ চেহারায় নেমে এলো বাস্তবতার প্রলেপ। নিজের ডান হাত আরওয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো মিসির।
“নাইস টু মিট ইউ, মিস আরওয়া। জানতাম না, সাবিনের সঙ্গে আপনার দূর্দান্ত পরিচয় রয়েছে। বায় দ্যা ওয়ে, আমার কিন্ত আরো একটা পরিচয় আছে। আমি আপনার উড বি ফিয়ন্সের চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড। এমনিতেও সামনে আমাদের পরিচয় অনিবার্য ছিলো, রাইট, জায়দান?”
নীরব দৃষ্টি বিনিময় হলো উভয় পুরুষের মাঝে। জায়দানের সুগভীর শান্ত নয়নমাঝে সূক্ষ্ম পরিবর্তন, অপরদিকে মিসিরের কালো দৃষ্টিতে স্থিরতা। উভয়ের মাঝে যেন অদৃশ্য তড়িৎ তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে। যার আঁচ আমার গায়ে এসেও লাগছে। শিরশির করছে সমস্ত শরীর। ভারী একটা চাপে বুঝি নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চালানো দায়। আরওয়া এই অনুভূতি টের পাচ্ছে কি?

“মিসির একজন আর্কিটেক্ট, কিন্ডারগার্টেন থেকে আমাদের বন্ধুত্ব।”
জায়দানের অতীব শীতল কন্ঠস্বর অবশেষে ধ্বনিত হলো। আরওয়া নীরবে সামান্য হেসে মিসিরের সঙ্গে করমর্দন করলো। প্রসারিত নয়ন মেলে দৃশ্যপট দেখলাম আমি। সমস্ত শরীর একেবারে হঠাৎ করেই কাটা দিয়ে উঠলো। মাথা কাত করে তাকাতেই দেখলাম, জায়দান আমার দিকে সুচারু নজরে চেয়ে আছে।
“দেখা যখন হয়েই গিয়েছে, তখন আজ একসাথেই বসা যাক? ডু ইউ মাইন্ড, মিস সাবিন?”
প্রাক্তনের অবিশ্বাস্য অনুরোধে জমে গেলাম। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলাম। জায়দানের মুখ যথারীতি নির্বিকার। একটুও বোঝার উপায় নেই সে এই মুহূর্তে কি ভাবছে। আমার এবং মিসিরের সম্মতির অপেক্ষা সে করলোনা। টেবিলের প্রান্তের একটি চেয়ার টেনে আরওয়ার উদ্দেশ্যে বললো,
“বসুন।”
“থ্যাঙ্কস।”

বসলো আরওয়া। আমি এবং মিসির পরস্পরের দিকে তাকালাম। জায়দানের এরূপ নির্লিপ্ততা এবং হঠাৎ আমাদের টেবিলে দখলদারিত্ব বিশ্বাসযোগ্য নয় যেন। তবুও দুজন মুখে কুলুপ এঁটে অপর প্রান্তে বসলাম। আমার ঠিক বিপরীতে মুখোমুখি চেয়ারখানিতে বসলো জায়দান নিজে।
ওয়েটার অর্ডার নিতে আসতেই যখন সবাই নিজেদের পছন্দের অর্ডার দিচ্ছে, তখন আমি একপাশে তাকিয়ে মাথায় হাত দিয়ে নতুন করে আরো একবার ভাবলাম, একটা মানুষ এতটাও অনুভূতিহীন কি করে হয়? মিসিরকে প্রথম দেখার পর জায়দানকে খানিকটা সংকোচিত মনে হয়েছে, আশঙ্কা কিংবা বিস্ময় ছিল হয়তো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে। কিন্তু এখন তার অস্বাভাবিক শীতল অভিব্যক্তি দেখে কিছুতেই বুঝতে পারছিনা বান্দা ভাবছে টা কি? তাহলে কি আমি যাই করিনা কেন, যার সঙ্গেই ডেটে যাইনা কেন, এমনকি যদি মানুষটা জায়দানের নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডও হয়, তবুও তার কিছু যায় আসেনা?

উপলব্ধিটি আমায় আশ্বস্ত করার কথা। অথচ, অন্তরে অসম্ভব এক ব্যথা ছাড়া কিছুই টের পেলাম না। আসলে কি চেয়েছিলাম আমি? নিজের জন্য জীবনে এগিয়ে যেতে? নাকি শুধুমাত্র জায়দানকে ঈর্ষান্বিত করতে যেমনটা আমি হয়েছিলাম তাকে আরওয়ার সঙ্গে দেখে? আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় এমন খারাপ লাগছে কি? আমার প্রাক্তনের আমার প্রতি কোনো টান নেই, উপলব্ধিটি আমায় শান্তনা দেয়ার বদলে ভীষণ রকমের অশান্ত করে তুললো। জায়দানকে বোঝা তো দূরের কথা! আমি যে নিজেকেই নিজে বুঝে উঠতে পারছিনা!
নিজের ভাবনায় এতই ডুবে ছিলাম যে ওয়েটার অর্ডারের জন্য আমায় বেশ কতক্ষন যাবৎ ডাকছে খেয়াল হলোনা। যখন হলো, তখন টের পেলাম আমার পক্ষ থেকে মিসির বলছে,

“ইউজুয়াল কফি…”
“ক্যাপুচিনো উইথ এক্সট্রা হুইপড ক্রিম অ্যান্ড কোকোয়া ওভার দ্যা টপ।”
ওয়েটার থমকে গেলো। একবার মিসির অতঃপর হঠাৎ হস্তক্ষেপ করা জায়দানের দিকে তাকালো। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বান্দা। আমি চোখ পিটপিট করে তাকালাম। জায়দান আমার কফি প্রেফারেন্স মনে রেখেছে?
মিসির কন্ঠ পরিষ্কার করে বললো,
“জ্বি, ও যেটা বলেছে সেটাই দেবেন।”
ওয়েটার সম্মতি জানিয়ে মাথা হেলিয়ে চলে গেলো। আমি আড়চোখে আরওয়াকে দেখলাম। মেয়েটাকে যথেষ্ট স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। নিশ্চুপ হয়ে নিজের ফোনে কিছু দেখছে। তার কি একটুও সন্দেহ হয়নি? নাকি সে জানে যে আমি জায়দানের প্রাক্তন?
“সো…”
চেয়ারে সোজা হয়ে বসলো জায়দান। দুই বাহু ভাঁজ করে রাখলো টেবিলের উপর। তার প্রশান্ত দৃষ্টি মিসিরের উপর।
“কতদিন ধরে ডেট করছিস তোরা? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ফাইনালি জীবনে বিগ ডিসিশন নিয়েছে আর আমি জানলাম না? শুড আই বি হার্ট?”
মিসির শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলো। আড়চোখে আরওয়াকে সাবধানে একবার দেখে নিয়ে বললো,
“বেশিদিন নয়। আমাদের প্রথম দেখা হয়েছে একটা ব্লাইন্ড ডেটে। তোকে বলার মতন পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি তাই বলা হয়নি।”
“আই সি।”

আমি নিশ্চিত, মিসিরের জায়গায় আমি থাকলে এতক্ষণে দমবন্ধ হয়ে অক্কা পেতাম। অথচ ছেলেটা ভালোই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বিষয়টাকে। উপরন্তু সত্যগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করছে আরওয়ার সামনে।
অর্ডার চলে এলো। সবাইকে কফি এবং পেস্ট্রি সার্ভ করে ওয়েটার চলে গেলো। আমি সবার প্রথমে ক্যাপুচিনোতে চুমুক দিলাম।
“সাবিন। আপনার ব্যবসার কি খবর? আপনি তো এখন বেশ ভালই ভাইরাল। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে আশা রাখি।”
আরওয়ার মিষ্টি কণ্ঠের প্রশ্নে মৃদু হেসে জবাব দিলাম।
“জ্বি অবশ্যই। আল্লাহর কুদরতে ব্যবসা ঠিকঠাক চলছে। খুব শীঘ্রই একটা আউটলেট ওপেন করতে পারবো বলে বিশ্বাস রাখছি।”
“ওমা তাই? এটা তো খুব ভালো খবর। কংগ্র্যাটস!”
মাথা দুলিয়ে নিজের পেস্ট্রি সামান্য কেটে মুখে দিতেই স্বাদটা অস্বাভাবিক লাগলো। বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলোনা আমার। একই ফ্লেভারের দুটো পেস্ট্রি অর্ডার দেয়ায় হয়ত ওয়েটার অর্ডার গুলিয়ে ফেলেছে। অভ্যাসবশত আমি আমার পিরিচ ঠেলে সামনে বসে থাকা জায়দানের দিকে এগিয়ে দিলাম, তার সামনে রাখা পিরিচটাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বলে বসলাম,

“এটা ডায়াবেটিক…”
স্তব্ধ হয়ে গেলাম। নিজের জিভে নিজে কামড় দিয়ে চুপ করে গেলাম। আরওয়ার সুচারু দৃষ্টি আমার উপর নিবদ্ধ। অপরদিকে মিসির নিজের চেয়ারে নড়েচড়ে বসেছে।
“ওয়াও। আমি জানতাম না আপনার ডায়াবেটিস আছে।”
রমণীর প্রশ্নে জায়দান আমার কিংবা মিসিরের মতন কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। বরং আমার এগিয়ে দেয়া পিরিচ থেকে খানিকটা পেস্ট্রি মুখে দিলো নিঃশব্দে। হতবাক চেয়ে রইলাম আমি। চামচও বদলানোর সময় দেয়নি এই লোক! আমারটাই….! টের পেলাম, আমার কান বেয়ে ইতোমধ্যে ধোঁয়া বেরোতে আরম্ভ করেছে।
“ডায়াবেটিস নেই। আই সিম্পলি অ্যাভয়েড সুগার।”
শান্ত গলায় উত্তর করলো জায়দান। যেন এক অচেনা অজানা প্রায় মেয়ে সে মিষ্টি পছন্দ করেনা ব্যাপারটা নিজের হবু স্ত্রীর সামনে প্রদর্শন করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা!
ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয়ার হাস্যকর একটা প্রচেষ্টা চালালো মিসির।

“ওহ, আসলে কি বলুন তো? আমিই সাবিনকে কথায় কথায় বলেছিলাম আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সুগার এড়িয়ে চলে, হেহেহে…”
আরওয়ার মুখ শান্তই দেখালো। মেয়েটা আর কিছু জিজ্ঞেস না করে নিজের কফিতে চুমুক দিলো। এই মেয়ে যদি এরপরও কিছু আন্দাজ করে না থাকে, তাহলে বলতেই হবে সে চরম অথর্ব!
নিজেকে যদি মাটিতে গেঁড়ে ফেলা যেত, তবে আমি এই মুহূর্তে তাই করতাম!
খুব বেশিক্ষণ এই প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা সহ্য করতে পারলাম না। ধরাম করে উঠে পড়লাম চেয়ার থেকে।
“আমি, এহেম! আমি একটু রেস্টরুম থেকে আসছি।”
কারো দিকে না তাকিয়ে মিসিরের হাতে নিজের হ্যান্ডব্যাগ গছিয়ে দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে এলাম টেবিল থেকে। চোখমুখ যে হারে গরম হয়ে উঠছে, ঠান্ডা পানি ঢালা প্রয়োজন।

সাবিন চলে যেতেই টেবিলের নিস্তব্ধতা যেন আরো প্রসারিত হলোনা। জায়দান কিছু বলছে না, চুপচাপ পেস্ট্রি খেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে আরওয়াও নীরবে কফিতে চুমুক দিচ্ছে। একমাত্র মিসিরই শান্তিমত না কফি পান করতে পারছে, না তার গলা দিয়ে পেস্ট্রি নামছে। অগণিত বারের মতন কন্ঠ পরিষ্কার করে সে অবশেষে প্রশ্ন করেই বসলো,
“বিয়েটা কবে নাগাদ হচ্ছে?”
এতক্ষণে যুগলের মনোযোগ পাওয়া সম্ভব হলো। মিসির যুক্ত করলো,
“আই মিন, প্ল্যান কি? এঙ্গেইজমেন্ট এরপর বিয়ে? নাকি সব একসঙ্গে?”
“এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা এখনো একে অপরকে চেনা জানার পর্যায়ে আছি।”
উত্তর করলো আরওয়া। মিসির মাথা দুলিয়ে নিজের কফিতে লম্বা একটা চুমুক দিলো। রমণী তাকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে তারপর প্রশ্ন করলো,

“হোয়াট অ্যাবাউট ইউ?”
“হুম? অ্যাবাউট মি?”
“সাবিনকে ডেট করছেন। কিছু মনে করবেন না, জায়দানের বন্ধু হিসাবে ধরে নিচ্ছি আপনারা সমবয়সী। এখন নিশ্চয়ই খেলে বেড়ানো কিংবা এক্সপেরিমেন্টের সময় নয়? ডেটিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাবিনকে বিয়ে করার মেন্টালিটি আছে আশা রাখছি।”
টাং!
জায়দানের হাত থেকে সিলভারের চামচটি খানিকটা শব্দ করে খালি পিরিচের উপর পড়লো। কারো প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ না করেই চেয়ার ছেড়ে সহসা উঠে দাঁড়ালো জায়দান।

“আমার একটু জরুরী কল করতে হবে একজন কলিগকে। ইউ গাইয ক্যারি অন।”
জায়দান রেস্টরুমের দিকে চলে গেলো। সেখানে বারান্দার মতন করিডোর ব্যবস্থা থাকায় নীরবে কথা বলা সহজ। বিষয়টি তাই কাউকে সন্দেহে ফেললোনা।
টেবিল থেকে এক এক করে দুজন চলে যাওয়ার পর আরো একবার গাঢ় নৈঃশব্দ্য ছেয়ে গেলো চারপাশ। শুধুমাত্র আশেপাশের টেবিল থেকে গুঞ্জন ভেসে আসছে। মিসির কোনো কথা বলায় আগ্রহ না দেখিয়ে নিজের কফি শেষ করতে লাগলো। তার বিপরীত প্রান্তে আরওয়া চামচ দিয়ে পেস্ট্রি নড়াচড়া করতে করতে হঠাৎ বলে উঠলো,
“আমি খুশি হয়েছি।”
জমে গেলো মিসির। ভ্রু তুলে দ্বিধা নিয়ে আরওয়াকে দেখলো। রমণী টেবিলে দুবাহু ভাঁজ করে রেখে খানিকটা ঝুঁকে এলো। মৃদু গলায় ব্যক্ত করলো,
“তুমি ফাইনালি আমার আশা ছেড়ে মুভ অন করার চিন্তা করছো, ব্যাপারটা ভালো লাগলো।”
মিসির কোনো জবাব দিলোনা। কফির মগে তার হাতের আঙ্গুলগুলো এতটা শক্তভাবে চেপে বসলো যে তা ক্রমশ ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করলো।

লেডিস রেস্টরুমে আমি ব্যতীত অন্য কোনো মেয়ের উপস্থিতি নেই। তাই বেশ শান্তি লাগছে। বেশ খানিকটা সময় ধরে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত করলাম। অতঃপর পায়ে পায়ে সিংকের কাছে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিজের মুখটা যেন এক চুপষানো টমেটো! ভ্রু কুঁচকে নিজেকে নিজে গালমন্দ করতে করতে মুখে পানির ঝাঁপটা দিলাম।
“টাওয়ারের বাচ্চা টাওয়ার একটা! খবিশের ঘরের খবিশ! বেয়াদব চুয়াল্লিশ! ছয় ফুটি কুলাঙ্গার!”
বিড়বিড় করে কতক্ষন যাবৎ পানি দিয়েছি খেয়াল নেই। একটুর জন্য শুধু গোসলটুকু বাকি ছিলো। অবশেষে ক্ষান্ত দিলাম নিজেকে। টিস্যু বক্স থেকে এক খাবলা তুলে মুখে ঘষতে লাগলাম খানিক আক্রোশ নিয়েই।
মৃদু একটা শব্দ শুনেই থমকে গেলাম। টিস্যু চেপে রাখায় চোখ খুলতে না পারলেও বুঝলাম দরজা লক করার শব্দ। সহসাই ফিরে তাকালাম।
“এটা পাবলিক লেডিস রেস্টরুম! বাপের সম্পত্তি নাকি লক করছে….!”
জমে গেলাম নিজের জায়গায়। দরজার সামনে দন্ডায়মান ব্যক্তিটি কোনো রমণী নয়! বরং আমার সাধের টাওয়ার, জায়দান!
এতটাই হতবিহ্বল আমি যে মুখ থেকে আর কোনো শব্দ বের হলোনা। দরজা ভালোমত লক করা হয়েছে নিশ্চিত হয়ে জায়দান ঘুরে দাঁড়ালো। কলারের ভেতর তর্জনী ঢুকিয়ে টেনে শার্ট এবং টাই উভয় ঢিলে করে নিলো। ড্যাবড্যাব করে দৃশ্যটি দেখলাম আমি।

“তুমি! চোখে আরেকটা চশমা দেবো নাকি? লেডিস ওয়াশরুম শব্দের বানান জানোনা?”
আমি মৃদু গলায় খেঁকিয়ে উঠতেই জায়দান ধীরে ধীরে আমার দিকে এগোতে লাগলো।
“এক্স হাজব্যান্ডের বেস্ট ফ্রেন্ডকে ডেট করতে নূন্যতম সংকোচ এবং লজ্জাবোধের প্রয়োজন।”
নিজের জায়গায় স্থির হয়ে রইলাম। জায়দানের একটামাত্র ঠান্ডা কথা আমার সমস্ত শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিলো। কোমরে দুহাত রেখে দাঁড়ালাম। ভ্রু কুঁচকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি ফেলে বললাম,
“তুমি নিজেকে কি মনে করো, জায়দান? ভদ্র, সুশীল? তোমার ভদ্রতা আর সুশীলতা নিজের ঝোলায় ভরে রাখো! সংকোচ তুমি তোমার হবু স্ত্রীর সাথে গিয়ে দেখাও, যাও! তোমার লজ্জা লাগছেনা লেডিস ওয়াশরুমে এসে পরনারীর সঙ্গে আলাপ জুড়তে? এখন সংকোচ কি গরু চড়াতে গিয়েছে?”
“অভদ্র লোকের অভদ্রতা সহনীয়, ভদ্র লোকের অভদ্রতা তোমার পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির দেহ সহ্য করতে পারবে তো, সাবিন?”
দৃষ্টি সরু হয়ে এলো আমার। জায়দানের দিকে তীব্র নজরে চাইলাম,
“শব্দের খেলা খেলছো? রসিকতা করছো আমার সাথে?”
লম্বা পা ফেলে অতি ধীর গতিতে শিকারীর ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো জায়দান। তার বাদামী বর্ণের চোখের মাঝে জ্বলজ্বলে অদ্ভুতুড়ে দৃষ্টি আমার অন্তরাত্মা অবধি কাঁপিয়ে দিলো। আনমনে পেছাতে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম।

জায়দান আপাদমস্তক আমায় পর্যবেক্ষণ করলো। মনে হলো ওই দৃষ্টি শুধু আমার অবয়ব নয়, চামড়ার আস্তরণ ভেদ করে পৌঁছে যাচ্ছে আরো গভীরে। শক্ত একটি ঢোক গিললাম, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে আমার।
“নায়ক সুশীল, খলনায়ক অশ্লীল। আমায় নায়ক থেকে খলনায়কে রূপান্তর স্বাস্থ্যের জন্য হানিকারক।”
হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমার সামনে জায়দান দাঁড়িয়ে আছে এবং তার কন্ঠ বেয়ে এমন সব বাক্য উচ্চারিত হচ্ছে বিশ্বাস করতে পারলাম না। লোকটা খুব কাছে এসে পড়েছে, ঠেলে সরিয়ে পালাতে চাইলাম দ্রুত।
“জায়দান, সামনে থেকে সরো, প্লীজ। নাহলে আমি চিৎকার করে লোক জড়ো করবো।”
আমার হুমকিতে জায়দানের সুবিস্তৃত ঠোঁটে বাঁকা এক সূক্ষ্ম অনুভব ফুটলো। একচুল নড়লোনা বান্দা। বরং আমার দুই কব্জি পাকড়াও করে ঠেলে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরলো। অত্যন্ত কাছে এসে পড়লো, আমাদের শরীরের মাঝে কোনো ব্যবধান এখন নেই বললেই চলে। অস্থির তাকিয়ে রইলাম আমি, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো ক্রমশ।
জায়দান অতি ধীরে নিজের ফরমাল প্যান্টের পকেটে হাত ভরলো, ওই বাদামী নয়নজোড়া বরাবর আমার মাঝে নিবদ্ধ। প্রাক্তন বের করে আনলো একটি ক্যান্ডি। ভালোমত দেখে বুঝতে পারলাম, ওটা মিন্ট ক্যান্ডি। সেটা ঠোঁটের মাঝে রাখতেই আমি না পারতে চেয়ে রইলাম। ওই মসৃণ ঠোঁটের ভাঁজে রাখা ক্যান্ডি এই চরম শীতের মাঝেও আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম বইয়ে দিলো। হৃদস্পন্দন হলো সীমানাহীন। অতি ধীরে সময় নিয়ে ক্যান্ডি নিজের মুখে পুরলো জায়দান, পর্যবেক্ষণ করলো আমার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া, অতঃপর জিভে ঠোঁট লেহন করে নিয়ে অসম্ভব গভীর গলায় বললো,

“চিৎকার করবে?”
শক্ত একটি ঢোক গিললাম আমি। জায়দানের ঠোঁট আমার খুব কাছে। এতটাই যে চাইলেই ছুঁয়ে দেয়া সম্ভব। সামান্য নড়লেও বিপদজনক কিছু ঘটে যেতে পারে। আমতা আমতা করে জবাব দিলাম,
“হ্যাঁ!”
“দ্যান, স্ক্রিম লাউডার! সো এভরি ড্যাম সোল হেয়ার্স মাই নেইম, অন ইওর লিপস।”
সম্মোহিত হয়ে গেলাম আমি সম্পূর্ণ। ঝুঁকে এলো জায়দান। আমার নাকে ছুঁয়ে গেলো তার নাকের প্রান্ত।
“আমিও শুনি, তোমার চিৎকারে জায়দান নামটা কেমন শোনায়, মাই ডিয়ার সাবিন।”
আমার হাঁটু কাঁপতে লাগলো। সোজা দাঁড়িয়ে থাকাই যেন দায়। আঁচ করতে পেরে জায়দান নিজের দুবাহু আমার কোমরে জড়িয়ে ফেললো। কাছে টেনে নিলো নিজের। মিশিয়ে ফেললো আমাদের একসঙ্গে।
“প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করছো? করতেই পারো।”
জায়দানের আঙুল আমার চুলের গোছা গুঁজে দিলো কানে। তার ঠোঁটের স্পর্শ ছুঁয়ে গেলো কানের প্রান্তে, খামচে ধরলাম তার শার্টের বুকের অংশ।
“প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকে ধ্বংস করোনা। বিকয, অনলি আই হ্যাভ দ্যা রাইট টু ডেস্ট্রয় ইউ!”
জায়দানের শীতল নিঃশ্বাস স্পর্শ বুলিয়ে গেলো আমার গালে। কেঁপে উঠলো সমস্ত শরীর তীব্র এক চাহিদায়। ক্রোধ, কামনা, বাসনা এবং অনুভবের সংমিশ্রণ। দাঁতে দাঁত চেপে আগ্রাসী ভঙ্গিতে ফিসফিস করলাম,
“ফাক ইউ!”
“হোয়েন?”

এমন জবাব আমার সমস্ত নিয়ন্ত্রণকে চুরমার করে দিলো যেন। চোখের সামনে আঁধার দেখলাম। ঘন আঁধার। কি হলো বুঝতে পারলাম না। জায়দানের টাইয়ে পেঁচিয়ে ফেললাম নিজের হাত। একটা জোরালো ঝটকা। ওই পাপীষ্ঠ ঠোঁটের মাঝে ডুবিয়ে দিলাম নিজের ঠোঁট। ভাবলাম, প্রাক্তন নিশ্চয়ই আমায় সরিয়ে দেবে। অথচ বিপরীতে জায়দানের উভয় বাহু আরো জোরে চেপে বসলো আমার কোমরজুড়ে। নখর গেঁথে গেলো আমার নরম ত্বকে। কেঁপে উঠলাম আমি। জিভে মিন্ট ক্যান্ডির স্বাদ পেলাম।
“রগচটা বোকা মেয়ে!”
সামান্য একটু বিরতি দিয়ে একটানে নিজের চোখের চশমা খুলে নিলো জায়দান। আমি পাল্টা তাকে কাছে টেনে ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট ছুঁয়ে বিড়বিড় করলাম,
“নির্লিপ্ত মিথ্যাবাদী পুরুষ!”
জায়দান আমার ঘাড় চেপে ধরলো। নিজের ঠোঁটের ভেতর তার মিন্টে শীতল হয়ে আসা জিভের অস্তিত্ব টের পেলাম। গুঙিয়ে উঠে আঁকড়ে ধরলাম তার চুল। প্রগাঢ় নিষিদ্ধ আবেগের বিচরণ। কামড়ে ধরলাম ঠোঁটের প্রান্ত, গভীর আওয়াজে গুঙিয়ে উঠলো জায়দান। আমার পরনের ফ্রক মুঠো পাকিয়ে আঁকড়ে ধরলো নিয়ন্ত্রণে।
“ভেতরে কেউ আছেন? দরজা লক করেছেন কেন?”

সম্মোহনের ঘোর কেটে গেলো এক লহমায়। ঝরঝর করে ভেঙে পড়া আয়নার মতন টুকরো টুকরো হয়ে গেলো সবকিছু। রেস্টরুমের বাইরে থেকে আসা মেয়েলী কন্ঠস্বর আমাদের উভয়কে জমিয়ে দিলো। নিজেদের দিকে তাকালাম রুদ্ধশ্বাস নয়নে। দেখলাম একে অপরের বিদ্ধস্ত দশা।
জায়দান প্রথম দূরে সরে দাঁড়ালো। নিজের চুলে আঙুল চালিয়ে ঠিকঠাক করে চশমা চোখে দিলো। আমি ফ্রকের উপর হাত চালিয়ে কুঁচকে ওঠা অংশ ঠিক করে দ্রুত হাতে কয়েকটা টিস্যু তুলে নিলাম।
“ঠোঁটে লিপস্টিক লেপ্টে গিয়েছে…”
কথাটা বের করতে অসম্ভব লজ্জাবোধ হলেও সংকোচ ফেলে দ্রুত জায়দানের ঠোঁট মুছে দিলাম, মুছে নিলাম নিজেরটাও। দ্বিতীয়বার লোকটার দিকে তাকানোর শক্তি আমার আর নেই। ছুট দিলাম দরজার দিকে। খুলে দিতেই বাইরে কয়েকজন মেয়েকে দেখতে পেলাম।
“স…সরি!”
আমার অবস্থা ভীষণ নাজেহাল। এর বেশি কিছু বলা বর্তমানে অসম্ভব। দৌঁড়ে চলে গেলাম করিডোর বেয়ে। বুকের ভেতর ভীষণ রকমের দৌরাত্ম্যে মেতে থাকা হৃদযন্ত্র। একবারও আর পিছন ফিরে দেখলাম না। সাহস নেই!

সাবিন দৌঁড়ে যেতেই জায়দান ধীরে সুস্থে বের হলো লেডিস ওয়াশরুম থেকে। কোনো মেয়ের দিকে না তাকিয়েই কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে করিডোরে পা রাখতেই ডাক এলো পিছন থেকে,
“প্রফেসর!”
থমকে গেলো জায়দান। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো নিরুপমাকে। সঙ্গে ক্লাসের আরো দুজন মেয়ে। প্রত্যেকেই তার স্টুডেন্ট। নিজেদের প্রফেসরকে লেডিস ওয়াশরুম থেকে বেরোতে দেখে প্রত্যেকের ব্রেইন সার্কিট নষ্ট হয়ে গিয়েছে বুঝতে পি এইচ ডির রিসার্চের প্রয়োজন পড়লোনা জায়দানের। ঘুরে দাঁড়ালো সে। নিজের শিক্ষার্থীদের দিকে চেয়ে বললো,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৩

“দুঃখিত। একজনের আমার বিশেষ সাহায্যের দরকার ছিলো তাই। আশা করি বুঝতে পারছো। কিছু মনে করোনা।”
“জ্বি জ্বি অবশ্যই প্রফেসর। দৌঁড়ে যাওয়া আপুটা আপনার…”
“মাই ওয়াইফ।”
মাথা দুলিয়ে কথোপকথন সমাপ্ত করে জায়দান করিডোর ধরে হেঁটে চলে গেলো। নিরুপমা এবং বাকিরা স্থির চেয়ে দেখলো তাদের প্রফেসরকে, যে এর আগে কোনদিন নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কখনোই কারো সামনে মুখ খোলেনি।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here