সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৮
জাবিন ফোরকান
অনুভূতি।
অত্যন্ত সহজ একটি শব্দ। হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ, রাগ, অভিমান নানান ধরণের অনুভূতি রয়েছে মানুষের। মানুষ অনুভূতি অনুভব করতে বাধ্য, এটাই মানুষের স্বকীয়তা। অথচ, জায়দানের মতন কিছু মানুষ পৃথিবীতে রয়েছে যাদের কাছে এই সহজ ব্যাপারটাই অত্যন্ত জটিল। অনুভূতিহীনতার মাঝে অনুভূতির জাগরণে মানুষগুলো যেন বড়ই অপারগ।
জায়দানের চোখের মাঝে যে জলোচ্ছ্বাস আমি দেখতে পেলাম, তা ঠিক অশ্রু, যন্ত্রণা, হাহাকার নাকি অন্যকিছু বোঝার আগেই শীতল আবরণে ঢেকে গেল ক্ষীণ ওই অনুভূতিটুকু। আমার পানে একরাশ স্তব্ধতা নিয়ে শুধু চেয়েই রইল সে। নিজেকে কেমন যেন তুচ্ছ মনে হয় ওই দৃষ্টির সামনে। যেন আমি কাঠগড়ার আসামী।
দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করলাম। জানি, আমি যা প্রকাশ করতে চাইছি তাতে উত্তেজিত হলে চলবেনা। হৃদয়ের কথা হতে হয় ভাবগম্ভীর।
“আমি জানি, আমার কথাগুলো হয়ত তোমার কাছে বোকার মতন লাগছে।”
অবশেষে শুরু করলাম,
“আমি এটাও জানি অতীতে আমি তোমার কোনো বিশেষ সুখের কারণ হতে পারিনি। আমাদের মাঝে যা ছিল এবং যেভাবে সবকিছু শেষ হয়েছে সবটাই অপ্রত্যাশিত।”
জায়দানের মাঝে অনুভূতি পাওয়া যাবেনা জানা সত্ত্বেও অত্যন্ত আশা নিয়ে তাকালাম আমি। প্রাক্তনের মাঝে একটুখানি টান দেখার ইচ্ছা আমার। সেই টান যেন হয় আমার প্রতি, অন্য কারো প্রতি নয়।
“জায়দান…”
গলা কাঁপলো আমার। স্বীকার করে নিলাম,
“আমার সঙ্গে এরকম আর কখনো হয়নি। আহান ভাইয়ার সাথেও নয়। দেখো না, আজ আমি ওই লোকটাকে কতটা ঘৃণা করি! তার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করতে আমার রাগ হয়! অথচ তুমি! এতকিছুর পরেও আমি তোমায় ভুলতে পারলাম না। তুমি আমায় কম কষ্ট দাওনি, অথচ সেই কষ্টগুলো আমার কাছে তুচ্ছ মনে হচ্ছে আজ। যেমন করে মাছ ডাঙায় ছটফট করে নদীতে ফিরতে চায়, তেমন করেই আমার অন্তর ছটফট করছে। আমি হয়ত তেমনি একটা বোকা মাছ, যে নদীর মূল্য টের পাইনি।”
জায়দান ওই একই রকম, নির্বাক। তার চেহারায় স্থিরতা, যেন কোনো পাথরের ভাস্কর্যের সঙ্গে কথা বলছি আমি। এগিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে জায়দানের বুকের উপর রাখলাম, ঠিক যেখানে তার হৃদযন্ত্র স্পন্দিত হচ্ছে, সেখানটায়। আমার নয়নজোড়া সিক্ত হয়ে উঠল আবেগের স্রোতে।
“আজকাল তোমার বুকে কান পেতে তোমার হৃদস্পন্দন শুনতে ভীষণ ইচ্ছা হয় আমার।”
জায়দান আমাকে বাঁধা দিলোনা। স্পর্শ করতে দিল। একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করলাম। আঙুলে বুলিয়ে গেলাম টি শার্টের অন্তরালে থাকা ত্বক, জোরালোভাবে বারকয়েক স্পন্দিত হয়ে যেন আমার ছোঁয়াকে উৎসাহ জানাল ওই হৃদয়। মুচকি হাসলাম।
“তোমার হার্টবিটও জানে তুমি কি চাও।”
“কি চাই আমি?”
জায়দানের শীতল কন্ঠস্বর আমার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ খেলিয়ে দিল। মুখ তুলে ওই বাদামী প্রান্তরে নিজের দৃষ্টি মেলালাম। হন্যে হয়ে খুঁজলাম আবারো, এক টুকরো আবেগ। কিন্তু পেলাম না কিছু, বরফশীতলতা ছাড়া।
“তোমার কি মনে হয়? আমাদের এত সময় বাদে দেখা হওয়াটা কাকতালীয়? সমাপ্তির পরেও আমার ভাগ্যের সঙ্গে তোমার জড়িয়ে যাওয়াটা শুধুই কোনো দৈবিক ঘটনা? ভাগ্যের ইশারা নয়? নতুন সূচনার ইঙ্গিত নয়?”
“তিলকে তাল রূপে না দেখাই শ্রেয়।”
ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল আমার। ভীষণ হতাশা টের পেলাম। এক ঝটকায় জায়দানকে কাছে টেনে তার শরীরজুড়ে নিজের বাহু জড়িয়ে ফেললাম। বেশ লম্বা হওয়ার দরুণ আমায় ঘাড় টানটান করে তার সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে বিধায় কোনো পরোয়া ছাড়াই তার চেলসি বুট পরিহিত প্রশস্ত-দীর্ঘ দুই পায়ের উপর নিজের পায়ের পাতা রেখে উঁচু হয়ে দাঁড়ালাম। জায়দান আমাকে দূরে ঠেললো না, বরং দুখানা হাত আলতো করে রাখলো আমার কোমরে, যেন ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে না পড়ি।
“তিলকে তাল? তাই মনে হয় তোমার জায়দান? তবে জবাব দাও তো, তুমি কেন আয়দানকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে নিয়ে এসেছিলে? কেন আমাকে সাহায্য করেছিলে? মেনে নিলাম, তোমার ন্যায়ের অন্তর তোমাকে এমন করতে বাধ্য করেছে। তবে অন্য একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সেদিন রাতে তুমি ঢাকা মেডিকেলে আমায় দেখতে গিয়েছিলে কেন?”
জায়দানের দৃষ্টি খানিকটা প্রসারিত হলো। ওইটুকুই তার বিস্ময়, আমি জানি। মৃদু হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়লো আমার ঠোঁটে। নিজেকে আরো খানিকটা কাছে নিয়ে ভরাট আবেগী গলায় বললাম,
“ক্রিড আভেন্টাস, একদম স্নিগ্ধ, আপেল আর লেবুর মিশ্রিত একটা সুবাস আসে গায়ে মাখলে। তুমি কি ভেবেছিলে? আমি তোমার পারফিউম চিনতে পারবোনা?”
অনুভব করলাম আমার কোমরজুড়ে জায়দানের উভয় হাত শক্তভাবে চেপে বসেছে। যদিও মুখভঙ্গি স্বাভাবিক আছে, তাতে বিচলনের লেশমাত্র নেই। আমার চেহারায় করুণ এক ভাব ফুটে উঠল,
“আর সেদিন মিসিরের অ্যাপার্টমেন্টে যা হয়েছে তা দেরিতে হলেও মনে পড়েছে আমার। এই সবকিছু কি শুধুই তোমার দয়া? করুণা? আমার জন্য কি তোমার অন্তরে কিছুই নেই?”
উত্তরহীন জায়দান। চশমার আড়ালে চোখজোড়া এখন সামান্য কাঁপছে। ব্যাকুল কন্ঠে তার পিঠ আঁকড়ে বলে উঠলাম,
“কিসের ভয় পাচ্ছ তুমি জায়দান? কে তোমাকে ঠেকিয়ে রাখছে? সমাজের নিয়ম কানুন? পুঁথিগত নিষ্ঠার বাঁধন? পারিবারিক পিছুটান?”
জবাবেরা যেন নির্বাসিত আজ। চোখ দুটো টলটল করে উঠল আমার,
“নাকি সবকিছু আমার ভুল, বলো? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে ভুল ভুলে ভালো থাকা যায়?”
অবশেষে জবাব এলো, এক শীতলতায় মোড়া উপাখ্যান হয়ে।
“মানুষের মস্তিষ্ক ২৫০০ টেরাবাইট তথ্য ধরে রাখতে সক্ষম। কিন্তু আফসোস! আমার মস্তিষ্কে তোমার ভুলেদের জায়গা থাকলেও, তোমার জায়গা নেই।”
বুকের ভেতর ধারালো এক তীর আঘাত হানল যেন। ক্ষত বিক্ষত করে দিল অভ্যন্তর, এক ঝটকায়। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল আমার। ভুল, আমার সকল ভুল, আমার সকল অভিযোগ, অনুযোগ, ক্রুরতা আমি যেন আমার প্রাক্তনের ওই বাদামী নয়নপটজুড়ে ভাসতে দেখলাম। বহুদিন বাদে, আমি তাকে স্মৃতিচারণ করতে দেখলাম।
কালবৈশাখীর ঝড় বইছে বাইরে। ঝোড়ো হাওয়ায় উন্মাতাল শহরতলী। এর মাঝেই গাড়ি ছুটিয়ে জেসমিনকে দেখতে এসেছেন পারিবারিক ডাক্তার। ব্যক্তিগত বেডরুমে চিকিৎসা চলছে তার, সঙ্গে আছেন জাফর।
সমস্ত আরেফিন বাড়ি নিস্তব্ধ। যেন আজ এই বাড়িতে শ্বাস ফেলাও দায়। জায়দান টের পাচ্ছে হাত পা কাঁপছে তার। হলের সোফায় বসে থাকা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে যেন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছে। কিছুতেই শান্ত থাকা সম্ভবপর হচ্ছেনা, দুরুদুরু কম্পমান বুক। পা দুলিয়ে যাচ্ছে জায়দান, আঙুলের কর গুণে গুণে আরবী উচ্চারণে একটি বিপদমুক্তির দোয়া পাঠ করে যাচ্ছে সে। বহু বছর আগে শিখেছিল, খুব বেশি অস্থির হলে এমনটা করে সে। এই অস্থিরতা জীবনে ঠিক কত বছর আগে হয়েছিল সেটা মনে করার ক্ষমতা জায়দানের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের নেই।
বাইরে প্রচন্ড জোরে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। মনে হলো, যেন বজ্রপাতটি বাইরে নয় বরং ঘরের ভেতরে হয়েছে কোথাও। জায়দান চশমা খুলে নিয়ে দুই তলার সিঁড়ির দিকে তাকালো। সেখানে দন্ডায়মান অগোছালো একটা অবয়ব দেখা গেল। বারকয়েক টানা বজ্রপাতের ঝলকানিতে সেই অবয়বকে দেখালো ভূতুড়ে।
“আমার ডিভোর্স চাই।”
ধ্বনিত হলো শীতল কন্ঠস্বরটি। যেন মানুষ নয়, কোনো অশরীরী কথা বলছে। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল জায়দান। খানিকটা কাঁপতে থাকা হাতেই চশমা চোখে দিল। আলো আঁধারি ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো সাবিন। পরনে একটা কুর্তি, যার বোতামগুলো খোলা। বুকের উপরের দিকটা উন্মুক্ত, অগোছালোভাবে সেথায় ছড়িয়ে আছে মাথার চুল। সাক্ষাৎ কোনো প্রেতাত্মার ন্যায় দেখাচ্ছে সাবিনকে এই মুহূর্তে। জায়দান মুষ্টি পাকিয়ে ফেলল নিজের দুহাত। সাবিন আবারো বললো,
“আমার ডিভোর্স চাই, এক্ষুণি!”
নিজের ৩০ বছরের জীবনে প্রথমবার নিয়ন্ত্রণ হারালো জায়দান। তার গলা চড়াও হয়ে উঠলো,
“ইউ হিট মাই মাদার! অ্যান্ড নাউ, ইউ আর ডিমান্ডিং আ ডিভোর্স! হাউ ডেয়ার ইউ!”
“আই ডেয়ার মাচ!”
জায়দানের বুক বরাবর সজোরে ধাক্কা দিয়ে পাল্টা চিৎকার করে উঠল সাবিনও। দাঁতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করল,
“ইওর মাদার ইয আ বিচ্! বেশ করেছি ওনাকে চড় মেরেছি! সুযোগ পেলে আবার মারব!”
“সাবিন!”
ভীষণ ক্রোধ দমনে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরল জায়দান। ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠলো,
“তুমি আমার স্ত্রী, এই চরম সত্যটা ভুলে যেতে আমায় বাধ্য করোনা!”
এগিয়ে এলো সাবিন, ধ্বংসমূর্তির ভঙ্গিতে। জায়দানের বুকে হাত ঠেকিয়ে ঠেলে দিলো পিছনে, একবার, দুবার, অসংখ্যবার।
“ভুলে যাও, তুমি তোমার বউকে ভুলে মায়ের সাথে সংসার পাতো কেমন? রেহাই দাও আমাকে। তোমার স্ত্রী হওয়ার চাইতে অপমানের আর কিছু আমার জীবনে কোনোদিন হয়নি এবং হবেও না!”
একটি ধাক্কা,
“মেরুদন্ডহীন!”
আরো একটি ধাক্কা,
“অনুভূতিহীন!”
তৃতীয় ধাক্কা,
“কাপুরুষ!”
চতুর্থ ধাক্কাটা সাবিন দিতে পারলনা, তার দুইহাত শক্তভাবে চেপে ধরে ফেলল জায়দান। খানিক যাতনায় হিসিয়ে উঠল সাবিন, সেটি লক্ষ্য করে বাঁধন নমনীয় করলেও তার হাত ছেড়ে দিলোনা স্বামী। ঝুঁকে এলো নিচে, দৃষ্টিতে মেলালো দৃষ্টি। এক পার্শ্বে যখন আগুন, পৃথিবীর অন্য পার্শ্বে তখন বরফ।
“ডিভোর্স চাও তুমি?”
“মুক্তি চাই। তোমার নামের বাঁধন থেকে মুক্তি চাই!”
জায়দানের ঠোঁটজুড়ে অত্যন্ত সূক্ষ্মতর এক পরিতাপের হাসি ফুটল, সাবিনকে কাছে টেনে নিল সে। ভীষণ এক বজ্রপাত হলো ঠিক কাছে কোথাও, অথচ এক চুলও টললোনা কেউ। একে অপরের দৃষ্টিমাঝে আবদ্ধ দুজন।
“বেশ তবে। আজ আমি তোমায় মুক্তি দিলাম, সাবিন। আমার অভিশাপ থেকে মুক্তি।”
বাঁকা হাসলো সাবিন। ওই হাসি যেন অন্তর্জ্বালা ধরিয়ে দেয় সমস্ত অস্তিত্বে।
“শেষমেষ তুমি তাহলে নিজের মাকেই বেছে নিলে, ব্যক্তিত্বহীন পুরুষ! আমি ঠিকই ধরেছিলাম, তুমি আহান ভাইয়ার নখের যোগ্যও নও। স্বামী নামের কলঙ্ক তুমি, আর তোমার এই গোটা পরিবার একটা জানোয়ারের জঙ্গল! এই পরিবার নিয়েই থাকো তুমি, এদের অবহেলায়ই তোমার মরণ হোক! সেদিন আমার নাম নিয়ে যতই আফসোস করো না কেন, আমি দূর থেকে তোমার দুর্গতি দেখব আর মনের সুখে হাসবো!”
সাবিন থামল না, যেন সকল অভিযোগ, অভিমানের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে আজ,
“তোমার মতন একটা মানুষ ভালো কিছুর যোগ্যই না! যে হাসতে জানেনা, লড়তে জানেনা, অনুভূতি দেখাতে জানেনা তার আবার কিসের সুখ – শান্তি? তোমার জন্য এই অভিশাপের জীবনটাই শ্রেয়। তুমি ডিজার্ভ করো স্রেফ অবহেলা, উপেক্ষা আর জগতের সবথেকে নিকৃষ্ট যাতনা। তাতেও বা কি? অনুভূতি বলতে তো কিছুই নেই তোমার মধ্যে। তুমি শুধু মানুষ নামের একটা খোলস, জায়দান!”
সহসাই সাবিনকে ছেড়ে এক পা পিছনে সরে দাঁড়াল জায়দান। হিমশীতল কাঠিন্য নিয়ে ঘোষণা করল,
“গেট লস্ট অ্যান্ড নেভার কাম ব্যাক ইন মাই লাইফ!”
সাবিনের খিলখিলে হাসি ছাড়িয়ে গেল বাইরের ভীষণ ঝড়ের শব্দকেও। সকল বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো ওই অশরীরী ধ্বনি।
“অ্যায ইফ আই উইল এভার কেয়ার ফর ইউ অ্যান্ড ইওর ড্যাম লাইফ!”
বর্তমান।
জায়দান অবলীলায় আমায় নিজের পায়ের উপর থেকে তুলে মেঝেতে নামিয়ে রাখল। সরে দাঁড়াল খানিকটা দূরে, সৃষ্টি করল এক দূরত্ব আমাদের মাঝে। এই দূরত্বের সেতু পার করা আমার পক্ষে আর কোনোদিন সম্ভব হবে কি? আমার জানা নেই।
এক দীর্ঘ নীরবতা ভর করল আমাদের মাঝে। অতঃপর জায়দানের অতি শান্ত কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো,
“প্রেম এবং সুখ পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক। একটি বাড়লে অপরটি কমে।”
নিঃশ্বাস আটকে গেল আমার। ধরা গলায় বললাম,
“অনুভূতি গণিতের সূত্র নয়।”
“আফসোস, আমি গণিত বুঝলেও অনুভূতি বুঝলাম না।”
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম। প্রত্যাখ্যান অনেক রকমের হয়। অথচ এই ধরণেরও হতে পারে, নিজে অনুভব না করলে কি কোনোদিন টের পেতাম। জায়দান নিজের চশমা ঠিকঠাক করে ব্যক্ত করল,
“আমার হিসাব এবং বিশ্লেষণ বলছে, তোমার স্বীকারোক্তি হাস্যকর। সামাজিক নিয়মের পরিপন্থী উপরন্তু আমার অহংবোধের অপমানজনক। এতে কোনো ভবিষ্যত নেই। বত্রিশ বছর বয়সে আমার ভবিষ্যত ছাড়া কোনো গতি নেই। সঠিক হবে এটাই, তুমি তোমার মতন করে ভালো থাকো, আর আমি আমার মতন করে। সেটাই তো তুমি চেয়েছিলে, আমার নামের বাঁধন থেকে মুক্তি।”
হয়ত ইদানিং আমি খুবই বেহায়া হয়ে গিয়েছি। তাইতো অতি আকাঙ্ক্ষায় হাত বাড়িয়ে জায়দানের একটি হাত আঁকড়ে ধরলাম,
“তুমি কি আমায় সেদিনের জন্য শাস্তি দিচ্ছ? আমার কথায় তোমার সত্যিই কষ্ট হয়েছিল?”
জায়দান হাসলো। সত্যিই হাসলো! নিঃশব্দে ঘেরা এক হাসি। ঠোঁটের কোণ দুটো উদ্ভাসিত হলো তার। অস্বাভাবিক সেই হাসির সহিত সে জানালো,
“আমি তো মানুষ নামের খোলসমাত্র। আমার কষ্ট বলে কোনো অনুভূতি নেই।”
নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল জায়দান। পিছিয়ে দাঁড়াল, এবার অনেকখানি। অসহায় চোখে শুধু তাকিয়ে দেখলাম আমি।
“আর শাস্তি? যদি এই ভেবে শান্তি পাও, তবে ভেবে নাও আমাদের মাঝে যা কিছু হয়েছে সবটাই আমার পূর্ব পরিকল্পনা, যেন আমি তোমার নাজুক অন্তরকে ভয়ানকভাবে ভেঙেচুরে প্রতিশোধ নিতে পারি। কে বলতে পারে? হয়ত এটাই তোমার জীবনে নতুন করে আমার আগমনের কারণ?”
পায়ের তলায় আর জোর পেলাম না আমি। মনে হলো, যেন গোটা পৃথিবী বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করেছে আমার চোখের সামনে। জায়দান অপেক্ষা করলনা, বিনা দৃষ্টি ব্যয়ে উল্টো ঘুরে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল প্রাইভেট রুমের বাইরে।
ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লাম আমি। অশ্রু গড়ালো না এক ফোঁটা। যেন বিদ্রোহ জুড়েছে তারা। অশ্রু বইতে পারলে হয়ত কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো। অথচ, সবটাই এখন বুকের ভেতর চাপা পড়ে গিয়েছে। বিরহ এবং উপলব্ধি। নিজের বুক নিজের খামচে ধরলাম, ব্যথা হচ্ছে ভীষণ, নাকি আমার কল্পনা? কে জানে? এই সবকিছু কি আমার পাপের শাস্তি? এতটাই ক্রুর ছিলাম আমি? হয়ত হ্যাঁ। জীবন আমায় আরো এক ঘায়ে আজ দেখিয়ে দিল, অহংবোধের পরিণাম এবং নিয়ন্ত্রণহীন কথার প্রভাব। আজ আরো এক শিক্ষার অধ্যায় যুক্ত হলো আমার এই ভাঙাচোরা ভুলে ভরা জীবনটায়।
দুই নয়ন তুলে তাকালাম আমি, জায়দানের ফেলে যাওয়া পথের পানে। তার শারীরিক সুবাস এখনো রুমের বাতাসজুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে। নাকি শুধু আমিই এই সুঘ্রাণ টের পাচ্ছি? কান্না এলো আমার খুব, অথচ কাঁদতে পারলাম না। অস্ফুট স্বরে শুধু বেরোলো,
“আমায় ভাঙতে তোমার এত সাধের আয়োজন?”
যে ফাঁদে পড়েছি, সেই ফাঁদ থেকে এই ভুলভাল সাবিনটার আর কোনো মুক্তি নেই।
নিজের বাড়িতে জায়দান পৌঁছাল গভীর রাতে। প্রায় আড়াইটা বাজে তখন। অনেক গল্পে পড়া, মানুষের মুখে শোনা, ছেলে মেয়ে দেরী করে বাড়িতে ফিরলে নাকি মায়েরা পাত পেড়ে অপেক্ষায় থাকেন সন্তানের। অথচ, এই বাড়ি ধূ ধূ ফাঁকা মরুভূমি। কোথাও কেউ নেই শুধুমাত্র অস্তিত্বহীন ছায়া বাদে। সে ফিরেছে কি ফেরেনি, সেই নিয়ে বাড়ির মানুষের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। রান্নাঘরে নিশ্চয়ই খাবার রেখে দেয়া আছে, রোজিনা মেয়েটা এমন করে, হটপটে রেখে দেয়। তবে জায়দানের আজ সেসবের প্রতি বিশেষ আগ্রহ নেই।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৭ (2)
পায়ে পায়ে দুই তলায় উঠে গেল জায়দান। সে ভার্সিটিতে যায়নি, দেখা করেনি বাবার বলে দেয়া ক্লায়েন্টদের সঙ্গেও। অথচ আসেনি একটাও ফোন। কেউ জিজ্ঞেস করেনি সে কোথায় ছিল। ভালোই হয়েছে।
নিজের রুমে এসে দরজা আটকে ধপাস করে কফি টেবিলের সামনে বসে পড়ল জায়দান। বসেই রইল, দীর্ঘক্ষণ, একেবারে কোনো কারণ ছাড়া। অতঃপর আজ আবারও খুলল নিজের ডায়েরীর পাতা। হাতে তুলে নিল কলম। বাহির থেকে তাকে দেখালো অত্যন্ত শান্ত, কোথাও কোনো অস্থিরতার চিহ্নটুকু নেই। অথচ ডায়েরীর পাতাজুড়ে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লিখিত হলো,
“অতঃপর আমি বুঝলাম কষ্টের অনুভূতি কেমন হয়।”
