Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৯

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৯

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৯
জাবিন ফোরকান

গাঢ় নিস্তব্ধতা এহসানদের বাড়িজুড়ে। একমাত্র পারিবারিক আত্মীয় বাদে প্রত্যেক মেহমানকেই ক্ষমা চেয়ে বিদায় জানানো হয়েছে। শুধুমাত্র পরিবারের গুরুজন এবং সদস্যরা রয়েছে বসার ঘরজুড়ে।
একপাশের সিঙ্গেল সোফায় নিঃশব্দে বসে আছে জায়দান। হাত দুটো তার হাঁটুর উপর রাখা, ভদ্র ভঙ্গিতে। পাথুরে মুখজুড়ে সামান্যতম অনুভূতিরও বড্ড অভাব। তার সোফার সাথে লাগোয়া আর্মরেস্টের উপর পা ঝুলিয়ে বসেছে মিসির। ভীষণ উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে দেখছে চারপাশ। একটি হাত জড়ানো বন্ধুর কাঁধের উপর। নীরব ভরসাস্বরুপ যেন।
বিপরীত দিকে বসে আছে বাকি সকলে। আরওয়া, তার বাবা মা। আরেক প্রান্তে জেসমিন, জাফর এবং তাদের পিছনে বুকে দুবাহু বেঁধে দন্ডায়মান আয়দান। ঠোঁটের কোণার দিকটা সামান্য ফুলে আছে রমণীর জোরালো ঘুষির কারণে। একটি দাঁতও নড়ে গিয়েছে খুব সম্ভবত। কিন্তু সেসব এখন মুখ্য বিষয় নয়।
অস্বস্তিকর এক গাঢ় নিস্তব্ধতা সমস্ত ঘরজুড়ে। যেন কেউই কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সম্পর্কে মুখ খুলতে নারাজ। সকলের বিহ্বল পরিস্থিতি লক্ষ্য করে সবার প্রথমে কন্ঠ পরিষ্কার করে মুখ খুললেন জাফর।

“এহসান সাহেব।”
আরওয়ার পিতা মুখ তুলে তাকাল তৎক্ষণাৎ। জাফর খানিক দ্বিধা ঝেড়ে শেষমেষ বললেন,
“আজকের অপ্রত্যাশিত সকল ঘটনার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি আমার পরিবারের তরফ থেকে।”
“না না। এসব কি বলছেন আরেফিন সাহেব? আমাদের দিক থেকেও অনেক খামতি ছিল। আপনারা বড় মন দেখিয়ে এখনো শান্তশিষ্ট হয়ে আমাদের সাথে আছেন, এটাই তো অনেক বড় পাওনা।”
“হুম। যদিও একটা বাঁধা পরে গিয়েছে, আমার মতে শুভ কাজে খুব বেশি দেরী করা সমীচীন নয়। বরং, আমাদের কিছুটা দ্রুততা এবং সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য।”
রুশমি এবং তার স্বামী একে অপরের দিকে তাকালেন। বুঝি ইশারায় অনুভূতি বিনিময় হলো তাদের। জাফরের কথার পিঠে জেসমিন কঠোর গলায় জানালেন,
“আমি আমার বউমা কে আংটি পরিয়ে তবেই বাড়ি ফিরছি আজ।”
সকলে খানিক হতচকিত হলো। জেসমিনকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। আগের সেই মোলায়েম এবং অসুস্থতার ভাবটুকু আর নেই। চেহারায় ভর করেছে অদ্ভুতুড়ে এক স্থিরতা। তিনি সরাসরি তাকালেন আরওয়ার দিকে,

“তোমার কি কোন আপত্তি আছে, মা? যদি থেকে থাকে, এখনি বলে দাও। আমি সময় নষ্ট করতে ইচ্ছুক না। ছেলের জন্য আমি অন্য মেয়ে দেখব।”
আরওয়ার নয়নজোড়া প্রসারিত হলো। ভ্রু তুলে সে দেখল সমগ্র আরেফিন পরিবারকে, এক এক করে প্রত্যেককে। ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো তার কিছু প্রকাশের উদ্দেশ্যে। অথচ তার আগেই রুশমি তার কাঁধে হাত চেপে যেন নিজের মুখের কথা প্রতিস্থাপিত করলেন মেয়ের মাঝে।
“অবশ্যই। আপত্তি কেন থাকবে? বিয়ে শাদীর ব্যাপার যত তাড়াতাড়ি করা যায়, ততই মঙ্গল। তোরা আংটি পড়াতে চাইলে আমাদের একদম আপত্তি নেই।”
জেসমিন এবং জাফর দুজনই সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন। তবে হঠাৎ করেই সমস্ত ঘর খিলখিল এক হাসির ধ্বনিতে ছেয়ে গেল। সবাই ভীষণ বিস্ময় নিয়ে দেখল আর্মরেস্টে বসে থাকা মিসিরকে। মৃদু শব্দ তুলে হাসছে সে। উজ্জ্বল বাদামী ত্বকের মাঝে ফুটে উঠেছে ছোট্ট এক টোলের চিহ্ন।
“হাসছ কেন এভাবে, মিসির ভাইয়া?”
আয়দান খানিকটা বিস্ময় এবং অনেকখানি বিরক্তি মাথা কন্ঠে শুধালো। মিসির মাথা দুলিয়ে ব্যক্ত করল,

“হাসছি মানুষের মনের স্ফূর্তি দেখে। আমরা মানুষেরা কতই না ডোন্ট কেয়ার মাইন্ডে চলি তাইনা? এত্ত বিশাল কাহিনী করে একটা মেয়েকে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করার পরেও কি সুন্দর আনন্দ অনুষ্ঠানের দিকে সহজভাবে ধাবিত হচ্ছি! যেন কিচ্ছু হয়নি!”
উপস্থিত সকলের মুখে কালো ছায়া পড়ল যেন। জাফর গম্ভীর আওয়াজে বলে উঠলেন,
“এতই যখন অনিচ্ছা, তখন এখানে বসে আছো কেন? কেউ তোমাকে জোর করছে না মিসির, দরজা খোলা আছে, তুমি আসতে পারো।”
মিসিরের হাসি থামল, অথচ চোখমুখ থেকে তাচ্ছিল্যের ভাবটুকু গেলনা।
“জায়দান এখানে না থাকলে আমি সাবিনের পিছু নিতে দুই সেকেন্ড চিন্তা করতাম না, আংকেল। ট্রাস্ট মি!”
“ওই মেয়ে কি তোকেও বশ করে ফেললো নাকি?”
ভয়ানক ক্রোধ চেপে দাঁতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করলেন জেসমিন। মিসির নিবিড় দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে,
“কেউ আমাকে বশ করেনি, আন্টি। সাবিনের বদলে অন্য কোনো মেয়ে হলেও আমি একই কথা বলতাম। আফটার অল, আই অ্যাম নট লাইক ইওর পাপেট সন!”
জায়দান শোনার পরেও কোনো প্রতিক্রিয়া করলনা। সে তখন থেকে একই ভঙ্গিতে বসে আছে। যেন এখান থেকে বহু দূরে ভিন্ন কোনো জগতে বসবাস তার। আয়দান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভাইয়াকে এতই খারাপ লাগলে তার জন্য তোমাকে এখানে থাকতে বলেছে কে?”
“খারাপ হোক কি ভালো, বন্ধু তো আমার! আর আয়দান, প্লীজ, তুই মুখ খুলিস না। তোর মুখে জ্ঞানের বুলি বড্ড বেমানান।”

মিসিরের তীব্র দৃষ্টির বিপরীতে চুপ করে যেতে বাধ্য হলো আয়দান। পরিস্থিতি সামলাতে হস্তক্ষেপ করলেন আরওয়ার পিতা।
“আচ্ছা, আমরা আর নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা না করি। একটা অঘটন ঘটে গিয়েছে আমাদের সকলের অনিচ্ছায়। সেসব ভুলে আসুন, আমরা আমাদের আনুষ্ঠানিকতাটুকু সমাপ্ত করি।”
মুহূর্তেই পরিবেশ বদলে গেলো। মিষ্টি, চা, নাস্তা, ফল, হরেক রকমের পিঠা পরিবেশন করা হলো অতিথিদের জন্য। জাফর আর জেসমিন কার্যক্রম শুরু করলেন নিজেদের। ছোট্ট একটি মখমলি বাক্স খুললেন জেসমিন, দেখালেন ভেতরের উজ্জ্বল হীরের আংটি।
“পছন্দ হয়েছে, মা?”
আরওয়া খানিকটা উদাসীন ভঙ্গিতে বসেছিল। মাথা হেলিয়ে বস্তুটি দেখে সে বিশেষ আগ্রহবোধ না করলেও মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো।
“খুব সুন্দর, আন্টি।”
“হাহা, এখন থেকে আম্মু বলে ডাকার অভ্যাস করো।”

গুরুজনেরা মৃদু হাসল। তবে তরুণদের কেউই হাসিতে যোগদান করতে পারলোনা। জেসমিন বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে চায়ের কাপে কতক চুমুক দিয়ে এরপর ঘুরলেন বড় সন্তানের দিকে। বাড়িয়ে দিলেন আংটির বক্সটা।
“নাও জায়দান, পরিয়ে দাও তোমার স্ত্রীকে।”
দীর্ঘ স্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে বাদামী নয়নজোড়া উত্তোলিত হলো। চেয়ে দেখল মায়ের ধরে রাখা বক্সে জ্বলজ্বল করে দ্যুতি ছড়াতে থাকা হীরের আংটির দিকে। লম্বাটে হাত বাড়িয়ে শিরা উপশিরা পূর্ণ দীর্ঘকায় সরু আঙুলে সে তুলে নিল আংটিখানি। গুরুজনদের মুখে ফুটল হাসি। আরওয়াকে রুশমি ঠেলে দিলেন হাত এগিয়ে দেয়ার জন্য। রমণী খানিক দ্বিধাগ্রস্ত হলেও আজ্ঞা পালন করল। তবে অদ্ভুত সত্য, তার দৃষ্টি জায়দানের উপর থেকে সরে পড়ল পাশে থাকা মিসিরের দিকে। ছেলেটার মুখজুড়ে ফুটে থাকা অব্যক্ত মনোভাব বোঝা দায়। শুধুমাত্র কালো গভীর চোখজোড়া প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে থেকে থেকে, নক্ষত্রের মতন। এক লহমার জন্য মিলিত হলো দৃষ্টি তার, আরওয়ার সঙ্গে। বুকের ভেতর বুঝি একটা ভারী চাপ অনুভব করল উভয়ে। অজান্তেই আরওয়ার কানে বেজে উঠল বহুকাল আগের কথাগুলো,

“আমি তোমাকে খুব বেশি ভালোবাসি, আরওয়া। আমাকে একটা ছোট্ট সুযোগ দেয়া যায়? কথা দিচ্ছি, আমি একদম তোমার মনের মতন হয়ে উঠব।”
“আমি খুবই দুঃখিত, মিসির। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারবনা।”
সেই সময়কার তাগড়া তরুণ মিসিরের সঙ্গে আজকের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের আকাশ পাতালের তফাৎ রয়েছে। আগের মতন পাগলাটে হয়ে সে নিজের অনুভূতি জাহির করেনা। খুব সন্তপর্নে তা লুকিয়ে রাখতে জানে। তাই হয়ত তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও জায়দানকে কোনোদিন আঁচ পেতে দেয়নি নিজের অন্তরের ভঙ্গুরতার।
মিসির বেশিক্ষণ তাকালনা। দৃষ্টি সরিয়ে নিল নিজের। আরওয়ার নয়ন ঘুরে ফিরে স্থির হল জ্বলজ্বলে আংটির মাঝে। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড, এবং সে হয়ে উঠবে আরেফিন পরিবারের সদস্য।
“কি ব্যাপার? কতক্ষন ধরে হাত এগিয়ে আছে মেয়েটা, দেরী করছ কেন?”
জাফর শীতল গলায় খানিক দ্বিধা নিয়ে শুধালেন বড় ছেলেকে। আরওয়ার বাবা বলে উঠলেন,
“আরে বেয়াই সাহেব, সমস্যা নেই। গুরুতর মুহূর্ত তো, ছেলেটাকে সময় দিন। বাবা, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তুমি আস্তে ধীরে করো।”

নিশ্চুপ জায়দান। স্থির দৃষ্টি আংটির পানে আবদ্ধ। কেটে গেল আরো কতক দীর্ঘ মুহূর্ত। এবার অস্থির হয়ে উঠল সকলে। জেসমিন শিরদাঁড়া টানটান করে বসে সন্তানকে কিছু বলার উদ্যোগ নিলেন। তবে পারলেন না। ধ্বনিত হলো গম্ভীরতম এক কন্ঠস্বর। যেন গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসা কোনো অশুভ আওয়াজ।
“ভাবতাম, যতদিন আমি চুপ থাকব ততদিন সব ঠিক থাকবে।”
যেন কনকনে কোনো হাওয়া বয়ে গিয়েছে সমস্ত বাড়িজুড়ে, এমন অনুভূতি টের পেল সকলে। শিরশির করে উঠল খানিক অজানা অনুভবে। জায়দান আরওয়াকে আংটি পড়ানোর বদলে নিজের সোফায় হেলান দিয়ে বসল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাতের মাঝে এমন ভঙ্গিতে ছোট্ট বস্তুটি দেখতে লাগল যেন সেটা তার কোনো টেস্ট এলিমেন্ট।
“ভাবতাম, সব বুঝেও নীরব-নির্বিকার থাকাকে বলা হয় ভদ্রতা। মনে করতাম, এর বিনিময়ে বুঝি আমি গ্রহণযোগ্যতা পাব। ভালোবাসা পাব।”

চোখ তুলে বরাবর জেসমিনের নয়নমাঝে তাকাল জায়দান।
“কিন্তু কিছু মানুষ আমার ভদ্রতাকে টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নিয়ে ফেলেছে।”
ভ্রু কুঁচকে এলো জননীর।
“জায়দান। তুমি বিড়বিড় করে এসব কি বলছো?”
জবাব এলোনা। স্থির মূর্তির মতন চেয়ে রইল জায়দান। আরওয়া পিছিয়ে বসল খানিক। চোখজুড়ে চাপা আতঙ্ক এবং দ্বিধা। অপরদিকে তার বাবা মায়ের শংকিত দৃষ্টি বিনিময় হলো।
“জামাই বাবা…!”
এহসান সাহেব কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। হাত তুলে জায়দান তাকে থামিয়ে দিল।
“আমি আপনার জামাই নই, আর না কোনোদিন হবো!”
“কি বলছো এসব তুমি? কেন?”
“কারণ, আমি স্বার্থপর হওয়া শিখে গিয়েছি।”

হাতের মাঝে আংটিটা মুষ্টি পাকিয়ে ফেললো জায়দান। অতঃপর সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সেটি নিজের প্যান্টের পকেটে পুরে ফেলল। তাকে দেখাচ্ছে অতিরিক্ত শান্ত। যেন বরফের গুহায় শীতঘুমে থাকা হিংস্র সাদা ভাল্লুক। যাকে জাগ্রত করে তোলা ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
বড় ছেলের হঠাৎ এমন মত পরিবর্তন সহ্য করতে পারলেন না জেসমিন। দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলেন,
“তোমার মাথা ঠিক আছে?”
জায়দান চশমা খানিকটা ঠিকঠাক করে চুলে আঙুল চালিয়ে এলোমেলো করে নিলো। জবাব দিলো,
“আমার মাথা একদমই ঠিক আছে। ১৫৬ আই কিউ পাওয়ার, ঠিক না থাকার কোনো কারণ নেই।”
বিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকল সকলে। জায়দান এর আগে কখনো নিজের সম্পর্কে এমনভাবে মুখ খোলেনি, না তো কোনোদিন জাহির করেছে নিজ বুদ্ধিমত্তা। অথচ আজ, এতটা স্বাভাবিকভাবে সে উচ্চারণ করল, যেন ১৫৬ আই কিউ হওয়াটা মাঠ ঘাটের সাধারণ ব্যাপার।
জায়দানকে খানিকটা ভাবুক দেখাল। পকেটের ভেতর থাকা তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো এতটা শক্তভাবে যে নখর এবং আংটির ধাতু গেঁথে বিন্দু বিন্দু র*ক্ত জমলো তালুতে। অথচ কেউ দেখতে পেলোনা সেই ক্ষরণ। অস্ফুট আওয়াজে জায়দান যেন নিজের মনকেই বলল,

“অবশ্য, এই আই কিউ থেকেই বা লাভ কি যে আপন মানুষটাকে রক্ষা করার বুদ্ধি বের করতে পারলোনা?”
“জায়দান! বেয়াদবি করছ তুমি! তোমাকে এই শিক্ষা দেয়া হয়েছে?”
জেসমিনকে ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে পড়তে দেখে জাফর মুখ খুললেন। চোখ রাঙিয়ে বড় সন্তানকে শাসাতে চাইলেন। জায়দান নির্বিকার দেখল পিতাকে।
“শিক্ষা দিয়েছই বা কবে, আব্বু? আই এজুকেটেড মাইসেল্ফ। আর তোমাদের শিক্ষার আসল নমুনা ঐযে, ঐদিকে দাঁড়িয়ে আছে।”
একপাশে দাঁড়িয়ে দ্বিধাগ্রস্ত দৃষ্টিতে সবকিছু দেখতে থাকা আয়দানের দিকে ইশারা করল জায়দান। তৎক্ষণাৎ ক্রোধে ফেটে পড়লেন জেসমিন! তার শরীর কাঁপতে লাগল। গর্জে উঠলেন তিনি,
“ডানা গজিয়েছে তোর, তাইনা? মুখ ফুটে বুলি বের করার চেষ্টা করছিস? অবাধ্যতার পরিণাম জানিস না?”
সূক্ষ্ম এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল জায়দানের ঠোঁটজুড়ে। জননীকে দেখলো সে একদম শান্ত নয়নেই।
“বাধ্যতার পরিণাম যদি এমন হয় তবে অবাধ্যতাই সই।”

এক পা অগ্রসর হলো জায়দান। বাদামী দৃষ্টির গভীর নিশানা স্থাপিত হলো জেসমিনের নয়ন বরাবর।
“তুমি সন্তান জন্ম দাওনি আম্মু, জন্ম দিয়েছ একটা গোলাম।”
রীতিমত হৃদস্পন্দন থমকে এলো বুঝি সকলের। জেসমিন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। সন্তানের এমন সরাসরি কথা তিনি আশা করেননি কস্মিন কালেও। জাফর রীতিমত কাঁপতে কাঁপতে ক্রোধ চেপে বললেন,
“বেয়াদবির সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ তুমি, জায়দান!”
পিতার দিকে তাকাল। ঠোঁটজোড়া সামান্য বাঁকা হলো জায়দানের।
এই ছেলে কি এইমাত্র হাসলো? নাকি চোখের ভ্রম? জাফর বুঝতে পারলেন না। এর আগেই জায়দান বলল,
“বোধ হয় টাকার পিছনে ছুটতে ছুটতে বেয়াদবির সংজ্ঞাটা ভুলে গিয়েছ, আব্বু। ব্যাপার না, বুঝিয়ে দিচ্ছি আমি। স্টুডেন্টদের শিখানোর অভিজ্ঞতা ব্যাপক আমার।”

সকলকে হতবাক করে রেখে জায়দান একদম ধীরে সুস্থে নিজের পরনের স্যুট খুলে নিলো। টাই টেনে ঢিলে করে স্যুট জ্যাকেট কাঁধে জড়ালো। দুহাতে শার্টের হাতা গুটিয়ে তুললো কনুই অবধি। দৃশ্যমান হলো নীলচে শিরা উপশিরা। চশমাখানি ঠিকঠাক করলো সে। প্রতিটি কার্যক্রম এতটা ধীর, এতটা অভিজাত যে সম্মোহিত হয়ে গেল প্রত্যেকে। তাই ভাবতেও পারলোনা সেকেন্ডের মাথায় কি হতে চলেছে।
একেবারে হঠাৎ করেই ঘটল ঘটনাটি। চোখের পলকে দীর্ঘকায় পা তুলে জায়দান জোরালো এক লাথি হাঁকালো সামনের টেবিল বরাবর। কাচের টেবিল ছিটকে পরে ঝরঝর করে ভেঙে গেলো কাঁচ। সকল নাস্তা, খাবার, মিষ্টি, চায়ের কাপ টুকরো টুকরো হয়ে গড়াগড়ি খেলো মেঝেতে। খানখান হয়ে গেল সবকিছু বেপরোয়াভাবে। ধ্বংসযজ্ঞের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল দেয়ালজুড়ে, বিপদজনক সুরের ন্যায়।
আঁতকে উঠল সকলে। লাফিয়ে উঠে পড়ল নিজেদের জায়গা থেকে।
বরফের মাঝে আগুনের প্রভাব কবে ভর করল?

“এটাকে বলে বেয়াদবি!”
বাঁকা হাসি মাখা ঠোঁটে বলল জায়দান।
সত্যিই হাসছে সে! এবার কোনো সন্দেহ নেই!
চিন্তা ভাবনার সুযোগটুকুও হলোনা কারোর। জায়দান একদম ধীরে সুস্থে, নির্লিপ্ত -শান্ত ভঙ্গিতে রুমের কোণায় সজ্জিত সিরামিকের ফুলদানিগুলোর উপর ঘুষি বসালো। একটা একটা করে সবগুলো ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ঝরঝর করে ভেঙে পড়তে লাগল পাত্র। জোরালো আঘাতের কারণে জায়দানের হাতের ত্বক ফেটে গলগল করে র*ক্ত ঝরতে আরম্ভ করল মুহূর্তেই। তবুও ক্ষান্ত দিলোনা সে। মেঘের গর্জনের ন্যায় গুরুগম্ভীর, শীতল কন্ঠে উচ্চারণ করল,
“এটাকে বলে বেয়াদবি!”
বাগদানের জন্য আনা উপহার সামগ্রী সাজিয়ে রাখা ছিল সামনেই। সেসব তুলে মেঝেতে একদম শান্ত চেহারায় এক এক করে আছাড় দিতে দিতে আবারো বিড়বিড় করল সে,

“আর এটাকে বলে অভদ্রতা!”
“তোমার ছেলে পাগল হয়ে গিয়েছে!”
হাহাকার করে উঠলেন জেসমিন। বুক চেপে ধরেছেন তিনি। এই ছেলের এমন রুদ্রমূর্তি কাম্য নয় কারো। রীতিমত অবিশ্বাস্য। যে মানুষটা কোনোদিন প্রতিবাদ তো দূরে থাক, সামান্য মাথা উঁচু করে পর্যন্ত কড়া ভাষায় কথা বলেনি, সে কিনা এমন উন্মাদের ন্যায় কাজ করছে? বিশ্বাস করতে ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে সকলের।
আরওয়ার পিতা মাতা দুজন একত্রে প্রায় বলে উঠলেন,
“কি করছ তুমি বাবা? কি হয়েছে তোমার?”
“তুমি তো কখনো এমন ছিলে না, জায়দান!”

হতে যাওয়া শ্বশুড় শ্বাশুড়ির দিকে ভাবলেশহীন তাকাল জায়দান। হাত বেয়ে টপটপ করে র*ক্তবিন্দু গড়াচ্ছে তার, ভাঙাচোরা ছড়িয়ে থাকা মেঝেতে। অথচ পরোয়া নেই। বেপরোয়া আওয়াজে সে বলল,
“ইফ প্লেয়িং বায় দ্যা বুক ডায’ন্ট ওয়ার্ক এনিমোর, লেম্মি বার্ন দিস বুক অ্যান্ড প্লে বায় মাই রুলস্!”
হতবাক চেয়ে রইল সকলে জায়দানের দিকে। যার নিগূঢ় বাদামী নয়নমাঝে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধের লেশ নেই। কেউ এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরবে? তাকে থামাবে? তাই উচিৎ। কিন্তু এতটা বিস্ময়, এতটা শঙ্কা নিয়ে যেন এগোনো যায়না। বরফশীতল আবেশ তাদের ঘিরে ফেলেছে, নড়তে দিচ্ছেনা একচুল।
জায়দান কারো প্রতি বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে নিজের পিতা, জাফর আরেফিনের দিকে এগোল শিকারী জন্তুর ভঙ্গিতে। জাফর বুঝতে পারলেন না কি হল। অসাধারণ ক্ষীপ্রতায় তার বুকপকেট থেকে লাইটার এবং সিগারেটের প্যাকেট বের করে নিল জায়দান। সূক্ষ্ম এক অশুভ হাসির রেশ মেখে তাকাল সকলের উদ্দেশ্যে,
“স্টার্টিং নাউ…..”

ক্লিক!
লাইটার জ্বালানোর মৃদু নরম আওয়াজ। ঠোঁটে ডেভিডফ সিগার ছোঁয়ালো জায়দান। কুচকুচে খয়েরী সিগারের প্রান্ত জ্বলজ্বল করে উঠল, ছড়ালো তামাটে ধোঁয়া। দীর্ঘ এক টান, ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল চারপাশ। লাইটারটা ছুঁড়ে নিজের পিতাকে ফেরত দিয়ে উল্টো ঘুরল জায়দান। সুউচ্চ দীর্ঘদেহী অবয়বকে দেখাল অদ্ভুতুড়ে চমৎকার। ঠোঁটে সিগার, র*ক্তা*ক্ত হাত এবং সাইকোপ্যাথেটিক ভঙ্গিমা।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৮ (২)

চেয়ে রইল সকলে, কারো নয়নে তাচ্ছিল্যের ভাব নেই। আছে নিগূঢ় বিস্ময়।
এবং অদ্ভুতুড়ে এক সমীহ। নিজের চাইতে অধিক ক্ষমতাশালীর প্রতি অনুভব করা সমীহ।
সিগার র*ক্ত লেপ্টানো দুই আঙ্গুলে ঠেকিয়ে নিঃশব্দে মৃদু হাসল জায়দান।
“৩২ বছর ভদ্র হয়ে দেখলাম, ১ মিনিটের অভদ্রতায় আসল সম্মান।”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here