Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩০

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩০

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩০
জাবিন ফোরকান

আমি একজন পতিতার জন্ম দেয়া সন্তান।
এটাই আমার ডিভোর্সের প্রধান কারণ।
আমার ড্যাড তাকদীর হুসেইন, তার গল্পটা কোনোদিন আমার সামনে উপস্থাপন করেননি। জন্ম থেকে আমি জন্মদাত্রীহীন বড় হয়েছি। ‘মা’—বলতে যে পরিবারে কেউ থাকেন, তাও ছিল আমার ধারণার অতীত। আমি শুধু আমার ড্যাডকে চিনতাম। তিনিই ছিলেন আমার একমাত্র পরিবার, আমার গোটা জগৎ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকে নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল আমার মনে। কয়েকবার ড্যাডকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। কিন্তু কখনোই সদুত্তর পাইনি। উল্টো মায়ের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেই ড্যাড কেমন যেন উদাস হয়ে যেতেন। সেই উদাসীন মনোভাব থাকত বেশ কয়েকদিন, কখনো বা মাস অবধি। আমার পরিবারের একমাত্র মানুষটাকে আমি কষ্টে দেখতে পারতাম না বিধায় আর কখনো জিজ্ঞেস করিনি। কি দরকার? না জেনে, না বুঝে আমি কি খারাপ ছিলাম?

মায়ের সম্পর্কে আমি জেনেছিলাম, বেশ নাটকীয়ভাবেই। আমার মতন অহংকারী, প্রতিবাদী ও চিরস্বাধীন মেয়েকে কি এত সহজেই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে বাধ্য করা গিয়েছিল? শুধুমাত্র ড্যাডের ইচ্ছায় নেচে নেচে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা আমার মতন মেয়ের সঙ্গে বেমানান। বিয়ের তিনদিন আগে বাড়ি থেকে পালানোর সকল পরিকল্পনা অবধি সেরে ফেলেছিলাম আমি। অথচ ড্যাড আমায় বেঁধে ফেললেন এক অমোঘ প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে।
“সাবিন, তুমি যদি এই বিয়েতে সম্মতি দাও, তবে আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাব।”
ড্যাড ওয়াদা করেছিলেন। এত বৃহৎ এক সুযোগকে পায়ে ঠেলা আমার মতন উশৃঙ্খলের পক্ষেও অসম্ভব ছিল।
তাকদীর হুসেইন এক কথার মানুষ এবং দৃঢ় ওয়াদাশীল হিসাবে ব্যবসায়ী মহলে পরিচিত ছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সেই গুণের চর্চা করতেন বহুলভাবে। তিনি নিজের কথা রেখেছিলেন। যেখানে সকলেই মনে করত, আমার মা বেশ ছোট থাকতেই পরলোকের যাত্রী হয়েছিলেন, সেখানে বিয়ের এক মাস পর ড্যাড আমায় নিয়ে গেলেন মায়ের দুয়ারে।

পতিতালয়ের কুঠিতে।
জীবনে প্রথম এতটা বিস্ময় আমাকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দিয়েছিল। জগতের সামনে যেখানে আমি এক অভিজাত বংশের সন্তান, সেখানে বাস্তবে আমার মা একজন দে*হ বি*ক্রি করা নারী, মানতে পারছিলাম না।
ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠেছিল রীতিমত। আমি প্রথমবার ভেতরে ঢুকতেও চাইনি। মুখ ঘুরিয়ে চলে আসছিলাম। কিন্তু একটা ডাক আমায় আজীবনের জন্য বেঁধে ফেলেছিল।
“আমার আম্মা!”
আমার জননী, সাবিনা, যার নামটা অবধি আমার আত্মপরিচয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তার এমন মধুর ডাক উপেক্ষা করা একজন সন্তানের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিলনা। ঘৃণা, উপেক্ষা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, লজ্জা সবকিছু গায়েব হয়েছিল সাবিনার অশ্রুজলের সামনে সেদিন। আমাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন তিনি। যেন প্রাপ্তবয়ষ্ক কন্যাকে নয়, বরং সদ্য জন্ম দেয়া নবজাতক কন্যাকে নিজের মাঝে আগলে নিয়েছেন প্রথমবারের মতন। আমাকে বুকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেছিলেন,

“আমি কোনোদিন তোমার জীবনে যামু না, আম্মা, তোমার সংসার তোমার আম্মুর বড় আদরের, তোমার সংসার আমি ভাঙতে দিমু না। শুধু তুমি মাঝে মাঝে আমার কাছে আইসো? আসবা তো?”
একজন মাতৃহীন বড় হওয়া সন্তানের পক্ষে এমন আবদার উপেক্ষা করা সম্ভবপর ছিলনা। বুকে তখন আমার কোনো সংসার, কোনো জীবনের ভয় ছিলোনা। শুধু প্রয়োজন ছিল আমার নতুন করে খুঁজে পাওয়া আম্মুর।
সাবিনার ব্যাপারটা বছর বছরের মতন বেশ ভালোভাবেই লোকায়িত রাখতে সফল হয়েছিলাম আমি এবং আমার ড্যাড। জীবন তেমনি চলছিল যেমন চলার ছিল। তবে যত দিন পেরোতে লাগলো, আমার না চাওয়া সংসারটার জন্য ভয় বাড়তে লাগলো। শেষের দিকে ঘুমহীন রাত্রিতে আরামকেদারায় দুলতে দুলতে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা স্বামী জায়দানের ঘুমন্ত মুখপানে চেয়ে ভাবতাম, যদি কোনোদিন সত্যিটা উন্মোচিত হয়, তবে কি এভাবে আর কোনোদিন তার সঙ্গে রাত কাটানোর সুযোগ থাকবে?
অথচ আমার ভয়টাই শেষমেষ সত্যি হয়েছিল। সাবিনার সম্পর্কে সর্বপ্রথম আঁচ করতে পারেন আমার শ্বাশুড়ি, জেসমিন। তিনি কিভাবে জেনেছিলেন, সেটা আজ অবধি আমার কাছে রহস্য। কিন্তু তার জানাটুকুই শুধু দরকার ছিল, জোড়াতালি দিয়ে আটকে রাখা সংসারটাকে খানখান করে ফেলতে।
অতঃপর এলো সেই ভয়াল, অভিশপ্ত রাত্রি—

“আম্মু, আমাকে সত্যি করে একটা কথা বলুন তো? জায়দান কি আসলেই আপনার সন্তান?”
বাইরে চলা বজ্রঝড়ের সঙ্গে আমার কন্ঠ যেন সঙ্গত করেছে আজ। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হলঘরে বসে চা পানরত জেসমিন মুখ কুঁচকে এমন ভঙ্গিতে আমায় দেখলেন যেন ঐ দৃষ্টি দিয়েই আমায় ধ্বংস করে ফেলতে চান। অথচ আমি দমলাম না। আজ দমে যাওয়া সম্ভব না। কোমরে দুহাত রেখে তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে কঠোর গলায় শুধালাম,
“আমার স্বামীর গায়ে হাত তুলেছেন কোন সাহসে?”
ঘণ্টা দুয়েক আগের কথা। বাইরে ঝড় চললেও ভার্সিটির সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় ডিউটি থাকায় জায়দান তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গিয়েছে। আজ সে শান্তই ছিল, আমায় তেমন কিছু বলেনি। কিন্তু সে তৈরী হওয়ার সময় তার কাঁধ বরাবর সরু লালচে যে দাগ দেখেছি, তাতে স্পষ্ট তাকে সেখানে বাজেভাবে খামচি দেয়া হয়েছে, নয়ত শক্ত লাঠির মতন কোনোকিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। জায়দান আমাকে কিছুই জানায়নি। নিঃশব্দে বেরিয়ে গিয়েছে প্রতিদিনকার মতন। তাছাড়া, বিগত কয়েকদিন ধরে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কটাও টালমাটাল হয়ে উঠেছে।
জেসমিন আমার এমন প্রশ্নে ভয়ানক রেগে গেলেন। চায়ের কাপ একপাশে ছুঁড়ে ফেললেন। ঝরঝর করে ভেঙে গেল কাপ। শব্দ পেয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো রোজিনা। অথচ মালকিনদের রুদ্রমূর্তি লক্ষ্য করে মাঝখানে এগোনোর সাহস করতে পারলনা বেচারী।

“গায়ে হাত তুলেছি? বেশ করেছি! কি করবে তুমি আমাকে?”
জেসমিনকে হঠাৎ ভীষণ পরিমাণে অস্বাভাবিকভাবে রেগে যেতে দেখে খানিকটা অবাক হলাম। তবে আজ পিছপা হলাম না।
“কি করব? যে হাত জায়দানের গায়ে উঠেছে, সেই হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব!”
দৃশ্যমানভাবে জোর আওয়াজ তুলে আঁতকে উঠল রোজিনা। রাগে কাঁপতে লাগলেন জেসমিন।
“তোমার এত্ত বড় সাহস মেয়ে! তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে বেয়াদবি করছ, জানো?”
“হ্যাঁ জানি। একটা ভয়ংকর মায়ের সামনে, যে মা হওয়ার যোগ্যই না! আমার এখনো মনে হয়, জায়দান আসলে আপনার সন্তানই না! সত্যি করে বলুন দেখি, আব্বুর কি বাইরে কোনো অ্যাফেয়ার ছিল? নাকি আপনি ওনার দ্বিতীয় ঘরের স্ত্রী?”

“খামোশ!”
রীতিমত পশুর মতন হুংকার দিয়ে উঠলেন জেসমিন। আজ আমাদের মধ্যকার সকল ক্রোধ, ঘৃণা সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দীর্ঘদিনের বিতৃষ্ণা জমা হতে হতে ফেটে পড়েছে।
“তুই আমার ইজ্জতে প্রশ্ন তুলিস, মেয়ে?”
জেসমিন তুই তুকারিতে নেমে গিয়েছেন। চিৎকার করে করে বলতে লাগলেন,
“আমি ভয়ংকর মা? হ্যাঁ? আর তোর মা কি? আসমানের ফেরেশতা? টাকার বিনিময়ে ইজ্জত বিকিয়ে বেড়ানো বেশ্যা একটা! বেশ্যার ঝি!”
চোখের সামনে বুঝি লাল বর্ণ দেখতে পেলাম। সমস্ত শরীরে অসহনীয় এক জ্বালা হলো। মস্তিষ্ক সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। এখানেই থেমে যাওয়া উচিত। জেসমিনের রাগ করাটা অস্বাভাবিক নয়। তার বিশ্বাস অনুযায়ী আমার ড্যাড তাদের পরিবারকে ধোঁকা দিয়ে আমার মতন মেয়েকে গছিয়ে দিয়েছে। তিনি ভুল নন। কিন্তু এমন বাজেভাবে জঘন্য ভাষা ব্যবহার করার অর্থ কি? কোনো সন্তান কি নিজের মায়ের অপমান সহ্য করতে পারে? সে যেমনি হোক না কেন!
“মুখ সামলে কথা বলুন, আম্মু! আপনি তো জানেন আমি কি কি করতে পারি! বিশ্বাস করুন, আপনাকে ছেঁচে ফেলতে আমার দুই সেকেন্ড লাগবেনা!”
পাল্টা হুংকার ছুঁড়লাম আমিও।

“বেশ্যার ঝির আবার দেমাগ!”
খেঁকিয়ে উঠলেন জেসমিন। আমার বরাবর এসে দাঁড়ালেন অসহনীয় ভঙ্গিতে। দৃষ্টিতে আগুন ঝরছে তার।
“তুই আমার গায়ে হাত দিবি? দে দেখি কত্ত বড় কলিজা তোর নাচনেওয়ালী! আমার বংশ নবাবের বংশ, তোর মায়ের মতন হাজারটা মাগী পালতো আমার দাদা পরদাদারা! আর তুই সেখানে কে যে আমার মর্যাদা, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলিস! আমার ছেলেকে আমি যেভাবে ইচ্ছা শাসন করব, প্রয়োজনে গ*লা টি*পে মে*রে ফেলব! তুই জবাবদিহি চাওয়ার কে? তোর পেট থেকে জন্ম নিয়েছে জায়দান? বেজন্মা কোথাকার!”
বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছি আমি। সহস্র জঘন্য শব্দ মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অথচ মস্তিষ্ক এতটাই তপ্ত, হৃদয় এতটাই ব্যথিত যে জেসমিনের চেহারার দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিনা। বাইরে যেমন বেড়েছে বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের জোর, তেমন করে বাড়ল জেসমিনের কণ্ঠের তেজ। প্রতিধ্বনিত হলো তা বাড়ির প্রত্যেক দেয়ালজুড়ে, বু*লে*টের মতন ক্ষত বিক্ষত, চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলল তা সবকিছু।

“আমার স্বামীকে নিয়ে কথা বলার তুই কে, বেজন্মা? তোর বাপকে নিয়ে আমি বলি? তোর বাপ একটা জানোয়ারের পয়দা, মাগীবাজ। বেশ্যাদের ওনার অনেক ভালো লাগে। একেক জনের সাথে একেক রাত কাটায় উনি। খচ্চর তো হবেই তোর বাপ! উঠে এসেছে তো মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে। তোরা জানিস আসল আভিজাত্য কি? দাদা পরদাদারা তো অফিসারদের জুতা পরিষ্কার করতো, পা চাটতো সবার দুটো টাকা বেশি ইনকামের জন্য। তোর বাপ আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেই কি সব অতীত মুছে যাবে ভেবেছিস? এক্কেবারে বাজিয়ে দিয়েছে না ওই বেশ্যাটাকে? পরিচয় দিয়েছে তাকে সমাজে? তোকে তুলে আনছে সম্পত্তি বাঁচাতে। নাহলে তোর বাপ তো তোরে চেটেও দেখত না, ওই কুঠির মধ্যেই বেশ্যাগিরির ব্যবসায় নেমে যেতি! সেই স্বভাব তো এখনো আছে তোর। ডিস্কো ক্লাবে যেয়ে পরপুরুষের সাথে ঢলাঢলি, আর কত কি যে করিস কে বলতে পারে! কয়লা ধুলে ময়লা যায় না, তুই সেটার আস্ত একটা জ্বলন্ত প্রমাণ!”

“তুই একটা চরম লেভেলের মানসিক রোগী!”
চিৎকার করে উঠলাম আমি! সম্ভব আর? উঁহু, সম্ভব না। কারণ আমি মুখ বুঁজে সয়ে যাওয়ার মতন ভদ্র মেয়ে নই। আমি চরম অভদ্র। আপনি বলে সম্মান দেব এরপরেও শুধু শ্বাশুড়ি বলে?
কোনোদিন না!
আঙুল তুলে গর্জে উঠলাম,
“তুই একটা ডাইনি, জেসমিন! তুই না পারিস কাউকে দয়া করতে, না পারিস কাউকে মায়া দেখাতে! তোর জন্যই এই সংসারের এই অবস্থা! শুনে রাখ, একদিন তুই এমন ভোগা ভুগবি, যে তোর দাদা পরদারাও এসে তোকে বাঁচাতে পারবে না। এটা আমার অভিশাপ তোর থু মার্কা মর্যাদার উপর! তোর গুষ্টির ইজ্জতে আমার লাত্থি!”
কানে শুধু চাপা আওয়াজ শুনলাম। রোজিনার আর্ত চিৎকার, অন্দরমহল থেকে ছুটে বেরিয়ে আসা শ্বশুড় জাফরের কঠোর ডাক। অথচ বাস্তবতায় না তো জেসমিন আছেন, না আমি।
পরক্ষণেই অতর্কিত ঘটল সব। জেসমিন নিজের হাত তুলে আমার চুলের মুঠি চেপে ধরে ঠেলে ফেললেন টেবিলের উপর। সমস্ত শরীরে বুঝি বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার। একের পর এক চপেটাঘাতে জর্জরিত হতে লাগল আমার মুখ। এতটাই জোর, যে মুখের ভেতর র*ক্তের নোনতা স্বাদ পেলাম।

“তোকে আমি আজকে মে*রেই ফেলব, বেজন্মা মাগী!”
যে সামান্য বোধটুকু আমায় বেঁধে রেখেছিল, সেটাও ছিন্ন হয়ে গেল। তড়িৎ গতিতে উঠলাম। সকলে জেসমিনকে ধরতে এসেছে। জাফর টেনে সরিয়ে নিচ্ছেন স্ত্রী কে, রোজিনা আমাকে ধরেছে। ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম। জাফর মাঝখানে বাঁধ সাধার আগেই আমার হাত এগোলো, তীব্র উত্তেজনায় আছড়ে পড়ল জেসমিনের গাল বরাবর।
আমার জীবনের সবথেকে শক্তিশালী থাপ্পড় ছিল সেটি।
গুরুজন? শ্বাশুড়ি? সংসার ভাঙা? স্বামী? স্বামীর অনুভূতি? বৈবাহিক সম্পর্ক? ইজ্জত? সামাজিক ভ্রুকুটি?
কোনকিছুর পরোয়া সেদিন হয়নি আমার।
কেউ যদি আজও আমায় জিজ্ঞেস করে সেদিন আমার শ্বাশুড়ি জেসমিনকে চড় দিয়ে আমি অনুতপ্ত কিনা? আমি এক বাক্যে উত্তর দেব।
—আমি অনুতপ্ত নই।

নিস্তব্ধপুরী এহসান পরিবারের বাড়ি। বাড়ির হবু জামাই হঠাৎ করে এমন রূপবদল দেখাতে পারে কেউ কল্পনাও করেনি। জায়দানের অবশ্য সকলের বিস্ময়ে খুব বেশি হেলদোল নেই। ধীরে সুস্থে সিগার ফুঁকতে ফুঁকতে সে এগোচ্ছে দরজার বাইরের দিকে। ঠিক তখনি পিছন থেকে ভেসে জেসমিনের হিমশীতল কন্ঠস্বর,
“তোর কি মনে হয়? আজকের পর আর কোনোদিন তুই আরেফিন বাড়িতে পা রাখতে পারবি?”
ক্ষণিক মুহূর্তের জন্য থামলো জায়দান। তবে পিছন ফিরে দেখল না। ঠোঁটে ঝুলতে থাকা সিগার আঙুলে নিয়ে একরাশ তামাটে ধোঁয়া ছাড়ল বাতাসে। অতঃপর খড়খড়ে ভঙ্গুর গলায় ঘোষণা করল,
“আমি, জায়দান আরেফিন, আমার পৌরুষের উপর প্রতিজ্ঞা করে বলছি, আমার গোটা পরিবার সাবিন হুসেইনের কাছ থেকে ক্ষমা না চাওয়া অবধি আমি আরেফিন বাড়ির চৌকাঠ মাড়াব না।”
জায়দানের কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে। হতবাক হওয়ার সকল সীমাও ছাড়িয়ে গিয়েছে আজ। ক্রোধে ফুঁসে উঠলেন জাফর,

“তোমার প্রাক্তন স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইবো?”
এবার জায়দান সামান্য মাথা কাত করে পিছনে তাকাল। তার নির্লিপ্ত দৃষ্টিজুড়ে দেখা মিললো এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গের।
“সাবিনকে চেনাতে আমার নামের পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। সাবিন হুসেইন ইয আ ব্র্যান্ড হারসেল্ফ!”
স্তব্ধ গোটা ঘর। যেন চেয়ে দেখা ছাড়া কারোই কিছু করার নেই। জেসমিনের সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল।
“দূর হবি তুই! ভালোই তো! তোর জন্য আমাদের কিছু আটকে থাকবে ভেবেছিস?”
“আমার জন্য কারো কিছু আটকে থাকবে না। না আমার, না তোমাদের, না সাবিনের।আমি অ্যাট লিস্ট তোমার ছোট ছেলের মতন বাপের হোটেলে বসে খাই না যে নিজের দায়িত্ব নিজে বইতে পারবনা। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।”
সামান্য একটু থামল জায়দান। অন্তিমবার গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
“যতদিন না তোমরা ওই মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইছ, ততদিন ভুলে যাও তোমাদের বড় সন্তানকে। এমনিতেও গিয়েছ, যতটুক খানিক র*ক্তের বন্ধন আছে, তাও ভুলে গেলে আমার কিচ্ছু যায় আসবেনা।”
প্রফেসর আর দাঁড়ালনা। সকলকে বাকরুদ্ধ করে রেখে লম্বা পা ফেলে হনহন করে এগোলো বাইরে। সবাই যখন নিস্তব্ধ, নিশ্চল, তখন বেশ পরোয়াহীন ভঙ্গিতেই হেঁটে বন্ধুর পথ অনুসরণ করল মিসির। দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগে সে থেমে পিছন ফিরে তাকাল,
“দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায়না। আপনারাও এতদিন বুঝতে পারেননি দাঁত কাছে ছিল বিধায়। এখন দেখা যাক, দন্তহীন হয়ে কতদূর দৌঁড়ায় এই আভিজাত্যের গাড়ি!”
আর তাকালোনা মিসির। বেরিয়ে গেলো বাইরে।

সেদিন রাতের বেলা।
মিসিরের অ্যাপার্টমেন্টজুড়ে প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। কিচেন টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে দুই বন্ধু। জায়দানের চেহারা নির্বিকার, অত্যধিক শান্ত। অপরদিকে মিসির ব্যস্ত তার হাতের ক্ষত নিরীক্ষণে। বহু কষ্টে র*ক্ত পড়া বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল সে। অনেকটা ঝরে গিয়েছে, জায়দানের চেহারাও সেই কারণে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে খানিক। উদ্বিগ্ন হয়ে সে বলেই বসল,
“তুই শিওর ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন নেই? কি বাজেভাবেই না র*ক্ত ঝরেছে! আমি এক্ষুণি ডক্টর মিনাকে…”
জায়দান নিজের ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটি মিসিরের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে নিঃশব্দে শুধু মাথা নাড়ল। আর কিছুই করলনা, বললো না। মিসির হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ারে বসে রইলো। বেশ দীর্ঘ নীরবতা। অতঃপর মিসির নরম সুরে বলল,

“দোস্ত? আম প্রাউড অব ইউ।”
জায়দান এবারেও কোনো প্রতিক্রিয়া করলনা। মিসির সামান্য হেলে বসে ব্যক্ত করল,
“আজ তুই একদম সুপুরুষের মতন একটা কাজ করেছিস। যদি আরো আগে করতে পারতি…”
“তাহলে আমার সংসারটা ভেঙে যেত না।”
একদম শান্ত গলায় বলল জায়দান। মিসির চুপ করে চেয়ে রইল বন্ধুর পানে। চোখ থেকে চশমা খুলে বাদামী নয়নজোড়া মেলে জায়দান খানিক অপ্রাসঙ্গিকভাবে হুকুম চালালো,
“ওটা আন।”
“কোনটা?”

দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করল মিসির। জায়দান নির্লিপ্ত উত্তর করল,
“তোর ফ্রীজে আছে, আমি জানি। নিয়ে আয়।”
দৃশ্যমানভাবে চমকালো মিসির। আমতা আমতা করতে শুরু করল,
“না, দোস্ত দেখ, তুই পারবি না। তুই আগে কখনো খাস নি!”
“ওটা। আন। মিসির।”
প্রত্যেক শব্দে আলাদা আলাদা জোর দিয়ে উচ্চারণ করল জায়দান। মিসির তবুও ঠাঁয় বসে রইল নিজের চেয়ারে বেশ খানিকক্ষণ। বন্ধুর তরফ থেকে পেছানোর কোনো আশা না দেখে শেষমেষ নিঃশব্দে নিজেকে খানিক গালমন্দ করতে করতে সে উঠে গেল।
ফ্রিজ থেকে গাঢ় সোনালী তরল ভর্তি টেকিলার বোতল, বরফ, লেবু, সোডা ক্যান এবং শট গ্লাস নিয়ে ফিরে এলো মিসির। টেবিলে এক এক করে সাজিয়ে রাখল সবকিছু। আড়চোখে দেখল বন্ধুকে, যে আজ নিজের সব ভদ্রতা বিসর্জন দিতে চলেছে।
চেয়ারে বসে দুটো শট গ্লাস তৈরী করল মিসির। জায়দানের গ্লাসে বেশি দিলো সোডা, লেবু এবং অল্প একটুখানি টেকিলা। অতঃপর এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি এখনো বলছি প্লীজ, রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে…!”
মিসির শেষ করতে পারলোনা। এর আগেই জায়দান সম্পূর্ণ গ্লাস নিজের গলায় ঢেলে দিলো। প্রথমবার ভয়ানকভাবে কেশে উঠল সে, চোখমুখ বিকৃত হয়ে গেল তীব্র ঝাঁঝে। মিসির কেঁপে উঠলো।

“জায়দান!”
“আম…ফাইন।”
হাত তুলে মিসিরকে থামিয়ে দিয়ে আরো খানিক কাশলো জায়দান। মনে হচ্ছে তার পাকস্থলী অবধি বোধ হয় জ্বলে যাচ্ছে। তীব্র অস্বস্তি। মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠল। মিসির নিজের শটটুকু আর নিতে পারলনা। হাত বাড়িয়ে সে জায়দানের কাছ থেকে বোতল ছিনিয়ে নিতে চাইলেও প্রফেসর জোরালো টানে সেটি নিজের কাছে নিয়ে নিল। কড়া চোখে তাকালো মিসিরের দিকে।
“খবরদার!”
দুই শট। তিন শট। বিরতিহীন। সোডা কিংবা পানি মেশানোরও প্রয়োজন বোধ করছেনা জায়দান। মিসির উঠে গিয়ে তাকে আটকাতে চাইলো। কিন্তু কেন যেন পারছেনা। বন্ধুর ঢুলতে শুরু করা দীর্ঘ অবয়ব তার চোখের সামনে বড্ড অসহায় লাগছে।
অবশেষে খানিক বিরতি দিলো জায়দান। চেয়ারে বসে থাকা শরীরটা দুলছে। মাথাটা বনবন করছে। চশমা খুলে ফেলেছে সে। পরনের টি শার্টের কলার টানছে ভীষণ গরমে। মুখটা কেমন লালচে হয়ে উঠছে ক্রমশ। মিসির দূর্বল গলায় অনুরোধ করল,

“দোস্ত, প্লীজ…”
“আমি… অনেক…অন্যায়…করেছি! ওকে আমি… ভীষওওওওণ কষ্ট দিয়েছি!”
হেঁচকি দিয়ে জড়ানো গলায় প্রলাপ বকতে আরম্ভ করল জায়দান। মিসিরের বুঝতে বাকি রইলোনা, বন্ধু তার সম্পূর্ণ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। জায়দান টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে হেল অভিযোগ দায়েরের ভঙ্গিতে,
“ও আমার কাছে এসেছিল…আমার ওকে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে…আবারও! আমি ওকে বোঝাতে পারিনা, আমি নিজেকে বুঝতে পারিনা, কি চাই আমি? সেদিন… সেদিন যদি ওর দুহাত ধরে জোর করে আমার কাছে রেখে দিতাম…যদি ডিভোর্স পেপারে সাইন না করতাম…যদি…যদি আরো আগেই আমি… আরো আগেই আমি বাড়ি ছাড়তে পারতাম…সব আমার দোষ!”

ভয়ানক একটা কান্ড ঘটালো জায়দান। অতর্কিতে টেকিলার বোতলটা চেপে ধরে সমস্ত বোতলটাই চেপে ধরলো মুখে! গ্লাসে ঢালার নাম নেই, ঢকঢক করে গিলে যাচ্ছে সে যেন পানি। আঁতকে উঠল মিসির। লাফিয়ে চেয়ার ছেড়ে ছুটে গেল। ধরল জায়দানকে,
“ছাড়! ছাড় বলছি! আর না! জায়দান!”
মিসির টেনে হিঁচড়ে বোতলটা সরাতে পারলেও জায়দান ততক্ষণে অর্ধেক খালি করে ফেলেছে। তরল বয়ে নামলো তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে। ভিজিয়ে ফেললো গলা। ঘামের ফোঁটা চিকচিক করে উঠলো সমস্ত শরীরে। ঢলে একপাশে হেলে পড়ে যেতে গেল জায়দান। মিসির ধরে ফেলল, ভ্রু কুঁচকে তীব্র কন্ঠে বলল,
“একটা আহাম্মক! ওঠ!”
জায়দানের ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠা ভারসাম্যহীন শরীরটা মিসির টেনে তুলল। লম্বাটে হাতজোড়া জড়ালো নিজের কাঁধে। নিয়ে চলল বন্ধুকে, বেডরুমের দিকে। জায়দান এলোমেলো পদক্ষেপে এগোলো, পড়ে যেতে যেতেও মিসির তাকে বাঁচিয়ে নিলো। হেঁচকি তুলছে সে বারবার, প্রলাপ বকে চলছে জড়িয়ে যাওয়া কন্ঠে,

“ও…আমাকে ঘৃণা করে! আমি…একটা মেরুদন্ডহীন। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে…এমনি হওয়া উচিৎ। আমি ওর যোগ্য নই। আমি কারো…ভালোবাসার যোগ্য নই। ও আমার জন্য অনেক করেছে। ওর মতন করে…কেউ কোনোদিন আমাকে…যত্ন করেনি। ওর মতন কেউ…আমাকে আমার পছন্দ অপছন্দ…জিজ্ঞেস করেনি।”
প্রলাপ শুনতে শুনতে বেডরুমে পৌঁছালো মিসির। শুধাল,
“তবে ওকে ছাড়লি কেন? নিজেকে কষ্ট দিলি কেন?”
জায়দান উদাসী হয়ে গেল। ঠোঁট ফুলিয়ে রইল খানিকক্ষণ। অতঃপর শিশুদের মতন করে বলল,
“ও চেয়েছিল! ভেবেছিলাম…দূরে থাকবে…ভালো থাকবে! আমার থেকে যত দূরে, তত ভালো! কিন্তু এরপরও…পারিনি…ওকে ছাড়তে পারিনি…সম্পূর্ণ… মাই…মাই ওয়াইফ…!”
বিছানায় আছড়ে পড়ল জায়দান। সিধিয়ে গেল একদম কম্বলের সাথে। চোখজোড়া নিমিষেই বন্ধ হয়ে গেল। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে। মিসির হাঁপাতে লাগলো। কম্বল টেনে ঢেকে দিতে চাইল বন্ধুকে। তবে হঠাৎ কি মনে হতেই যেন থমকে গেলো। জায়দানের বলা শেষ কথাটা।
ছাড়তে পারিনি…সম্পূর্ণ?
মানে কি? সাবিন আর জায়দানের তো ডিভোর্স হয়েছিল। সেই পেপারও সে দেখেছে।
ঝুঁকে এসে জায়দানের গালে আলতো চাপড় দিলো সে, বলল,

“এই? দোস্ত?”
“উমমম? ঘুমাতে দে!”
জায়দান ভ্রুকুটি করে উল্টো ফিরে শুতে চাইলেও মিসির দিলোনা।
“আচ্ছা আমি তোকে ঘুমাতে দেব। তার আগে বল, সম্পূর্ণ ছেড়ে দিসনি মানে কি?”
“মাই ওয়াইফ…আই নিড হার….”
“হ্যাঁ, বুঝেছি। কিন্তু ও তো এখন আর তোর ওয়াইফ নয়।”
হঠাৎ করেই তীর্যক এক হাসি ছুঁয়ে গেল জায়দানের ঠোঁটে। সদা নির্লিপ্ত বন্ধুর ঠোঁটে এমন অভিব্যক্তি মিসিরকে হতবাক করে দিল। জায়দান উত্তর না করে চোখ বুঁজে ঘুমের ভান ধরল। এবার সত্যিই মেজাজ বিগড়ে গেল মিসিরের। টি শার্ট চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে সে জায়দানকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তবে পারলোনা। হঠাৎ করে শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল এক অনুভূতি বয়ে যেতে অনুভব করল সে। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে জায়দানের বাদামী নয়নজুড়ে চেয়ে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৯

“জায়দান, তোদের তালাক হয়েছে? বায়েন তালাক?”
কিছুক্ষণ ভাবনার ভং ধরল জায়দান, যেন বহুদিন আগের কোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছে। তারপরই একেবারে বেখাপ্পা ভাবে রহস্যময় হাসলো। রীতিমত শব্দ করেই। শিশুদের মতন খিলখিলে কন্ঠে বলে উঠল,
“উমম…বলব না!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here