সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২
জাবিন ফোরকান
“ ছেলেটাকে কেমন লাগলো? ”
বাসার দরজা দিয়ে প্রবেশমাত্রই নিজের মায়ের মুখের প্রশ্নটা শুনে আরওয়া বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। একপাশের মোড়ায় বসে পরনের হিলজোড়া খুলে নিয়ে শু ক্যাবিনেটে রাখতে রাখতে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো।
“ ভালো। ”
আরওয়ার মা, রুশমি, মেয়ের জবাব শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“ শুধুই ভালো? অন্য কিছু নয়? ”
আরওয়া বিরক্তভরে ক্যাবিনেটের দরজা আটকে উঠে থপথপ পা ফেলে বাড়ির ভেতরে এলো। লিভিং রুমের কাউচে হ্যান্ডব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে খানিক ক্লান্ত গলায় জানালো,
“ আমরা মাত্র একবার দেখা করেছি, মম। ভালোমত চেনাজানা এখনো বাকি। বিয়ে শাদী তো আর ছেলেখেলা নয় যে মুখ দেখে পছন্দ করে সেরে ফেললাম! ”
রুশমি সন্তানের কথা শুনতে শুনতে ডাইন ইন টেবিলের পাশে চেয়ারে বসলেন। আরওয়া নিজের গলা থেকে ওড়না সরিয়ে রেখে টেবিলের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে পান করলো। তারপর সেটি ঠক করে আবার টেবিলে রেখে দিয়ে বললো,
“ তাছাড়া, উনি ডিভোর্সড। কেমন যেনো হয়ে গেলোনা? যখন জিজ্ঞেস করলাম, প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে কি সমস্যা হয়েছিল, কিছুই বললো না। এমন অসৎ হলে তো তার সঙ্গে সংসার করা যায়না। ”
“ বলেনি কারণ নিতান্তই ভদ্র ছেলেটা। আর আগের বউটা? একেবারে ডাইনি ছিলো। ”
রুশমির কথায় আরওয়া চমকালো। মায়ের চেহারায় তীব্র বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলনা। জায়দানের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা ওঠার কারণটা হলো ছেলের মায়ের এবং রুশমির বন্ধুত্ব। দুইজনই নাকি বাল্যকালের বান্ধবী ছিলেন। একসাথেই স্কুল কলেজ পার করেছিলেন তারা। পরবর্তীতে রুশমি নেদারল্যান্ডস চলে যাওয়ায় আর অহরহ যোগাযোগ ছিলোনা। ছেলের দ্বিতীয়বার বিয়ের জন্য প্রথম পছন্দ হিসাবে আরওয়াকেই মনে ধরেছে ভদ্রমহিলার।
চেয়ার টেনে মায়ের মুখোমুখি বসলো আরওয়া। না চাইতেও অস্পষ্ট এক আগ্রহ ঘিরে ধরলো তাকে। রুশমিকে তাই জিজ্ঞেস করলো সে,
“ মানে? পরকীয়া টাইপ কিছু? ”
“ ধুর। সেসব হলে তো তাও মেরেধরে টাইট দিয়ে ঠিক করা যায়। ওই মেয়ে সাক্ষাৎ ইবলিশ ছিলো বুঝেছিস? রগে রগে শুধু আগুন ঝরতো। তুই তো দেখিসনি। আমি আর তোর বাবা গিয়েছিলাম না, আফটার ওয়েডিং সারমোনিতে? তখন এক দেখায়ই বুঝে গিয়েছিলাম এই সংসার টেকার নয়। ”
ডিভোর্সের কারণটা কি তাহলে? প্রশ্নটা হৃদয়ে উত্থাপিত হলেও ঠিক উচ্চারণ করতে পারলোনা। অন্য কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে তার বিবেকে বাঁধছে। তবে বিবেকের দোহাই দিয়ে লাভ কি? যদি এই ছেলের বাঁধনেই বাঁধা পড়তে হয়, তবে তার সবটা জেনে নেয়া উচিত নয় কি?
মেয়ের দ্বিধাদ্বন্দ্ব স্পষ্ট পড়তে পারলেন রুশমি। ঝুঁকে এসে নিজের বয়সের ভারে হালকা চামড়া কুঁচকে আসা হাতটাকে আরওয়ার কোলে গুছিয়ে রাখা হাতের উপর রেখে নরম কন্ঠে বললেন,
“ যে মেয়ে নিজের শ্বাশুড়ির গায়ে হাত তুলতেও কার্পণ্যবোধ করেনা,তার সঙ্গে সংসার করা যায়না মা। ”
আরওয়া থমকে গেলো। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো রুশমির নয়নমাঝে। যেন তার মা এক্ষুণি বলে উঠবেন, এতক্ষণ মজা করছিলেন তিনি। অথচ রুশমি তেমন কিছুই করলেন না। উল্টো তার দৃষ্টি ভারী হয়ে উঠলো।
“ তোর মম ড্যাড তোর জন্য খারাপ কোনো সম্বন্ধ দেখেনি। এটুকু বিশ্বাস করিস তো? একটা সুযোগ দিয়ে দেখ। হয়ত তোরা একে অপরের মনকে সুস্থ করে তুলতে পারবি। ”
রুশমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। তবে আরওয়া ঠাঁয় বসে রইলো। সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে গিয়েছে সে। তবে জায়দানের ডিভোর্সের কারণ কি এটাই? তার প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা হয়নি? কিন্তু তাই বলে একটা মেয়ে এভাবে গুরুজনের গায়ে হাত তুলবে? এই দেশের ভদ্র সমাজের হিসাবে খানিক অবিশ্বাস্য তা। এজন্যই কি জায়দান তাকে নিজের প্রাক্তনের সম্পর্কে কিছুই বলেনি? হাজারো প্রশ্ন মাছের মতন ছলাৎ করে উঠলো আরওয়ার হৃদসাগরে।
মেয়ে আর কিছু বলবেনা ভেবে রুশমি চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। কাজের মেয়ে দুটোকে বলতে হবে, আজকে যেন বেশি ঘি দিয়ে পোলাও রান্না করে। তবে তিনি লিভিং রুমের বাইরে যাওয়ার আগেই হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো আরওয়ার কন্ঠস্বর।
“ মম? এসব তোমাকে জেসমিন আন্টি বলেছেন? ”
রুশমি থামলেন। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে মাথা দোলালেন। আরওয়া তার দিকে দীর্ঘ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শেষমেষ বলে বসলো,
“ কিন্তু তার কথা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? ”
চরম বিস্মিত হলেন রুশমি। রীতিমত চোয়াল ফাঁক হয়ে গেলো তার। হাহাকার মেশানো কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেন,
“ জেসমিনকে অবিশ্বাস করছিস? ”
“ উঁহু। কাউকে অবিশ্বাস করছি না, মম। তবে একটা কথা কি জানো তো? এক হাতে কখনোই তালি বাজেনা। ”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আরওয়া। একদম স্তব্ধ হয়ে মেয়ের পানে চেয়ে রইলেন রুশমি। চোখ পিটপিট করলেন অস্বস্তিতে।
“ শুধুমাত্র এক পক্ষের কাহিনী শুনে কখনো আরেক পক্ষকে বিচার করা উচিৎ নয়। উস্কানি না পেলে গুরুজনের উপর হাত তোলার মতন জঘন্য অপরাধ কোনো মেয়ের দ্বারা সম্ভব বলে আমার মনে হয়না। মুদ্রার অপর পিঠের ভিন্ন একটা কাহিনী থাকা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ”
এটুকুই। নিজেকে আর ব্যাখ্যা করলোনা আরওয়া। পায়ে পায়ে হেঁটে লিভিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। পেছনে ফেলে গেলো নিজের ওড়না এবং হ্যান্ডব্যাগ। জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ রুশমি মনে মনে ভাবলেন, আধুনিকতার নামে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে আরম্ভ করেছে বর্তমান প্রজন্ম। তাদের কাছে আজ বেঠিকটাই সঠিক।
আজকে ডেলিভারি বেশি নেই। অথচ এটুকুতেই কেনো এতটা ক্লান্ত লাগছে আমি বুঝতে পারছিনা। গত কয়েকদিন যাবৎ রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছেনা। অদ্ভুতুড়ে দুঃস্বপ্ন আমায় তাড়া করে বেড়ায়। সেই স্বপ্নে আমি ড্যাডকে দেখি। তার মুখজুড়ে থাকে তীব্র ব্যথার কুঞ্চন। কেমন যেন ছটফট করে আমার সামনে। হাজার চাইলেও একটু জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিতে পারিনা তাকে। এই দুরূহ মানসিক অবস্থাই হয়ত বর্তমানে আমার শারীরিক দূর্বলতার কারণ।
নভেম্বরের প্রকৃতি হালকা শীতল হতে আরম্ভ করেছে। তবে এখন ভরদুপুর হওয়ার মাথার উপরে সূর্যমামা গনগনে আগুন ঢালছে। স্কুটির উপর হেলমেট পরে থাকা সত্ত্বেও হেলমেটের আবরণ ভেদ করে মাথার তালুকে ছুঁয়ে যাচ্ছে উত্তাপ। একেবারে চান্দি গরম হয়ে যাওয়া যাকে বলে। তার উপর পেটে ভীষণ ক্ষুধার জ্বালা। আজকে সকালে কিছু মুখে না দিয়েই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। মীরাও একদম ভোরে ভার্সিটি চলে গিয়েছে। সে থাকলে একটু ধমকে হলেও আমাকে খাওয়ায়।
সড়কের ধারে স্কুটি পার্ক করলাম। পাশেই একটা ভাসমান টং দোকান। দুইজন লুঙ্গি পরিহিত মধ্যবয়স্ক পুরুষ এবং এক যুবক বেঞ্চে বসে চা পান করছে। মধ্যবয়স্করা রাজনৈতিক কোনো আলাপ করছে। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তাদের বিস্তর চিন্তা। স্কুটি ছেড়ে নিজের গায়ের জ্যাকেট খুলে হ্যান্ডেলে জড়িয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। কোনো অস্বস্তি ছাড়াই দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম,
“ মামা এক পিস বনরুটি আর দুটো কলা দেবেন। ”
অর্ডার জাহির করেই ধপাস করে বেঞ্চে যুবক ছেলেটার পাশে বসে পড়লাম। সকলে আমার দিকে কেমন যেন অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকালো। এমন দৃষ্টি আমার জন্য মোটেও নতুন নয়। এদেশে রাস্তার ধারের টং দোকানে মেয়েদের আনাগোনা শূন্যের কোঠায়। মাঝে মধ্যে ভার্সিটির ছেলেপেলেরা অনেক শখ করে যায় অবশ্য। তবে আমার মতন কেউ নির্দ্বিধায় একলা এসে বিনা চিন্তায় বেঞ্চ দখল করতে পারে, এমনটা হয়ত তারা আগে দেখেনি কিংবা ভাবেনি। আমি অবশ্য তাতে খুব একটা মনোযোগ দিলাম না। দোকানদার বনরুটি এবং কলা এগিয়ে দিতেই প্যাকেট দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খাবারে মনোনিবেশ করলাম।
“ আপনি কি ডেলিভারি গার্ল? ”
বনরুটি চিবুতে চিবুতে পাশের যুবকের প্রশ্ন শুনে আমি মাথা দোলালাম। ভ্রু তুলে নিজের স্কুটির দিকে নির্দেশ করলাম যেখানে এখনো এক বক্স পিৎজা রাখা আছে। যুবক নিজের হাতের লাল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দ্বিতীয় দফায় বললো,
“ কিছু মনে করবেন না। আসলে এইরকম প্রফেশনে মেয়েদের খুব কম দেখা যায় তো, তাই জিজ্ঞেস করেছি। ”
“ ইটস ওকে। ”
এক কামড়ে একটি কলার অর্ধেক নাই করে দিয়ে কিছুক্ষণ আপনমনে চিবুলাম। তারপর খাবারটুকু গিলে নিয়ে বললাম,
“ আমার একটা অনলাইন বিজনেস আছে। হোমমেড পিৎজা সেল করি। সেটার ডেলিভারি আমিই দেই। ”
“ ওহ। ইন্টারেস্টিং। ভার্সিটিতে পড়েন? ”
“ উঁহু। পড়ালেখা শেষ। ”
যুবককে খানিক বিস্মিত মনে হলো। সরু দৃষ্টিতে আমায় আপাদমস্তক দেখলো। পাতলা ফিনফিনে শরীরে জড়ানো ওভারসাইজড টি শার্ট আর ট্রাউজার দেখে বোধ হয় সে আমার বয়স আন্দাজ করতে পারেনি। শুধু মাথায় শক্ত তেলতেলে খোঁপা বাঁধা চুল না থাকলে আমায় অনায়াসে ছেলে বলে চালিয়ে দেয়া যেতো হয়ত। আমার অবশ্য তাতে বিশেষ বাতিক নেই। বনরুটি খতম করে ফেলেছি। হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ট্রাউজারের পকেট থেকে একশো টাকার নোট বের করে দোকানদারকে দিয়ে যখন আশি টাকা ফেরত নিলাম, তখনি বিকট এক শব্দে রীতিমত আকাশ বাতাসে কেঁপে উঠলো।
সটান করে উল্টো ঘুরলাম। টং দোকানের অন্য মানুষগুলোও লাফিয়ে দাঁড়ালো আমার পিছনে। মনে হলো যেন চোখের সামনে নিজের পৃথিবীটাকে থমকে যেতে দেখলাম। আমার স্কুটিটা রাস্তার উপর উল্টে পরে আছে। সামনের অংশটা একেবারে দুমড়ে গিয়েছে। পিছনের চাকা উপরে উঠে আছে, বনবন করে ঘুরছে যেন আহত আর্তনাদ প্রকাশে। পিৎজার বক্স চাপা পড়ে থেঁতলে গিয়েছে সড়কের পিচে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বলে একটা প্রক্রিয়া আছে, তাই ভুলে গেলাম ক্ষণিকের জন্য। আমার চোখে ভাসলো শুধু দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া একটা স্বপ্ন।
ঠিক সামনেই থমকে দাঁড়িয়ে আছে কটকটে লাল বর্ণের দানবটি। ল্যাম্বরগিনি অ্যাভেন্টাডর এস ভি জে। গাড়ির মডেল চিনতে আমার একটুও অসুবিধা হলোনা। কারণ, একটা সময়ে এই দানবকে আমিও চালাতাম। সড়ক ধরে ছুটে যেতাম পাগলা ঘোড়ার মতন, যেন বাংলাদেশের যানজট বাঁধা ভাঙাচোরা সড়ক নয়, এফ এসের রেসিং ট্র্যাক বেয়ে ছুটছি। ল্যাম্বরগিনির বনেটে চির ধরেছে, বর্ণহীন ধোঁয়া বের হচ্ছে ফাঁক গলে। কি হয়েছে বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হলোনা।
আশেপাশে মানুষের ভীড় জমে গিয়েছে ততক্ষণে। উৎসাহী জনগণ আশেপাশের ফুটপাথ মার্কেট থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে কাহিনী। ল্যাম্বরগিনির দরজা অত্যন্ত বেখেয়ালী ভাবে খুলে গেলো। ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো এক ছ ফুট দুই ইঞ্চির দানব। আসলেই উচ্চতা এমন, নাকি পরনে হেভি বুট থাকায় বেড়ে গিয়েছে তা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। তুলতুলে চেহারাটা এতটাই ভদ্রগোছের যে অ্যাঞ্জেলরাও বুঝি এর চেহারা দেখে দ্বিধায় পরে যাবে, সেখানে এথায় তো সবাই মানুষ! আমি নিশ্চিত, এ এমন গড়নের পুরুষ যে সামান্য সময় রোদের নিচে থাকলেই টুকটুকে লাল হয়ে যায়। কিন্তু তার চেহারার নিষ্পাপ ভাব, সঙ্গে মনের মধ্যে জেগে ওঠা একটা বাক্য, ‘ একে আগে যেন কোথায় দেখেছি?’ কিছুই আমাকে আটকাতে পারলোনা। আমার মাঝে তখন অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে। বহুদিন বাদে আমি নিজের মধ্যে সেই চিরায়ত ভয়ানক রাগের অস্তিত্ব টের পেলাম। এই রাগ জলোচ্ছ্বাসের মতন। সামনের সবকিছুকে অত্যন্ত অবহেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় অবলীলায়।
লোকটি কালো লেদার প্যান্টের ভেতর হাত ভরে এগিয়ে এসে বাজখাঁই কন্ঠে খেঁকিয়ে উঠলো,
“ হুয ফাকিং স্কুটি ইয দিস? হু ইয দ্যাট শিট? ”
নিয়ন্ত্রণের যেটুকু সুতো অবশিষ্ট ছিল, তাও এক টানে ছিঁড়ে গেলো। লম্বা পদক্ষেপে এগোলাম আমি। ফুটপাথ থেকে সড়কে নামার আগে পা থেকে নেভী ব্লু বর্ণের স্নিকার্স খুলে হাতে নিলাম। ভীড় ঠেলেঠুলে ভেতরে ঢুকলাম। লোকটা তখন সবেমাত্র আমার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুটিতে লাথি হাঁকিয়ে ফিরে দাঁড়িয়েছে। চোখের মাঝে আগুন জ্বললো আমার। বিদ্যুৎ গতিতে বাড়ালাম নিজের হাত। ছ ফুটি দানবের কলার খুঁজে পেতে একটুও বেগ পেতে হলোনা। কলার টেনে তাকে ঝুঁকিয়ে হাতের স্নিকার্স জুতোটা সটান বসিয়ে দিলাম তার তুলতুলে গাল বরাবর। সপাসপ দুইটি জোর জুতোর বাড়ির সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাম,
“ আই অ্যাম দ্যাট ফাকিং শিট, ইউ মাদারফাকার! ”
প্রথমবার এই অঞ্চলের উৎসাহী ভীড়কে অবধি স্তব্ধ করে দিলো আমার আচরণ। চোখের কোণে স্পষ্ট দেখলাম, কয়েকজনের হাতে উঠে এসেছে মোবাইল ফোন। কিন্তু তখন আমার বিচার বিবেচনাবোধ বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমার আঘাতে এতটাই জোর ছিলো যে লোকটির মাথা ঝুলে পড়লো একপাশে। সে তখন ফিরে তাকালো, তখন তার বাদামী বর্ণের চোখের মাঝে অদ্ভুতুড়ে এক ঝিলিক দেখতে পেলাম। ওই নয়নের বাদামীর খেলা দেখে ক্ষীণ মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। আবারো মনে হলো, এহেন আলোড়ন আমি আগেও দেখেছি!
লোকটির ঠোঁটের কোণে গুটিকতক র*ক্তবিন্দু জমেছে। সেটি অবলীলায় নিজের জিভের ডগায় চেটে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তীর্যক হাসলো সে।
“ আ প্রিটি লি’ল ক্রিয়েচার, আরে’ন্ট ইউ? ”
তার তীক্ষ্ণ চোখ আমার সমস্ত শরীরে ঘুরপাক খেলো বিনা দ্বিধায়। এত লোকের সামনেও নিজের দৃষ্টির মাঝে জ্বলজ্বল করা লোভী হায়নাকে লোকানোর কোনো আগ্রহ দেখা গেলোনা তার মাঝে। উন্মত্ত হয়ে উঠলো আমার অন্তরাত্মা। তার কলার ধরে জোরে জোরে ঝাঁকিয়ে বললাম,
“ কথায় কথায় ইংলিশ মারিয়ে বোঝাতে চাস তোর বাপের অনেক টাকা? কুত্তার অওলাদকে সোজা ভাষায় কি বলে জানিস? কুত্তার বাচ্চা! ”
এই প্রথম তার বাদামী নয়নজুড়ে লোভের বদলে ক্রোধ দেখতে পেলাম। ক্ষিপ্ত হয়ে আমার গলা নিজের প্রশস্ত দুই হাতে সজোরে চেপে ধরলো সে। বায়ু আদান প্রদানের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দিলো, চাপ প্রয়োগ করলো একেবারে শ্বাসনালী বরাবর। দাঁতে দাঁত পিষে চিবিয়ে চিবিয়ে জোর দিয়ে উচ্চারণ করলো,
“ বারোব্যাটারি কোথাকার! তোর অসহায়ত্ব দেখে অলমোস্ট দয়া করে ফেলছিলাম। কিন্তু ভুলেই গিয়েছিলাম, ওয়ান্স আ বিচ, অলওয়েজ আ বিচ! ”
“ তোর দয়ার খাতায় আগুন! রাস্তাকে পারিবারিক সম্পত্তি ভাবিস? রেসিং ট্র্যাক বানিয়ে রেখেছিস ইমপোর্টেড কারের জন্য? খ…ক্ষ্ক! ”
অক্সিজেনের অভাবে আমার মুখ লাল হয়ে উঠতে লাগলো। কাশতে শুরু করলাম। তাতে মজা পেয়ে এক হাতে গলা চেপে অন্য হাতে গাল ছুঁয়ে দিলো লোকটি। ঘিনঘিন করে উঠলো আমার সমস্ত শরীর।
“ হ্যাঁ। এই রাস্তা আমার বাপ দাদার সম্পত্তি। তুই ফকিন্নি বেজায়গায় পার্ক করেছিস কেনো? মনে হয় তুই জানতি আগে থেকেই, যে আমি আসবো? তোর প্ল্যান নয়তো? বড়লোক মাছ জালে ফাঁসানোর? ভেবেছিস মেয়ে বলে গায়ে হাত দিতে পারিনা? ”
আমার মন মস্তিষ্ক কোনোটাই আর ক্রোধের চাপ সইতে পারলোনা। মাথা দিয়ে সজোরে ঠুকে দিলাম তার কপাল। ককিয়ে উটে লোকটা আমার গলায় ঢিল দিয়ে পিছনে সরে যেতেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম শিকারী পশুর মতন। গাড়ির বনেটে ওটাকে আছড়ে ফেলে লাথি হাঁকিয়ে দিলাম সপাসপ। কোথায় গিয়ে লাগলো খেয়ালই করলামনা। দরকার নেই! পাশে পড়ে থাকা স্নিকার্স টা আবারো তুলে নিয়ে পিঠ বরাবর বাড়ি দিতে দিতে পাগলের মতন চিৎকার ছুঁড়লাম,
“ তুই ফকিন্নি! তোর চোদ্দ গুষ্টি ফকিন্নি, ফকিন্নির বাচ্চা! গিয়ে কাঁদিস তোর আব্বার কাছে! বলিস, এই বিচের জুতার বাড়ি খেয়ে বাসায় ফিরেছিস। শালা কাপুরুষ একটা! ”
“ আপা, আপা থামেন! ”
আশেপাশের লোকজনের যেন হঠাৎ করেই শুভবুদ্ধির উদয় হলো। তাই আমায় এসে ধরলো কয়েকজন। দুজন পুরুষ এবং এক বয়স্ক মহিলা আমাকে টেনে সরিয়ে নিলো তার কাছ থেকে। বেচারা তখনো গাড়ির বনেটে উৎপটাং হয়ে পড়ে আছে। আমি স্নিকার্স উঁচিয়েই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হুমকি দিলাম,
“ আরেকবার পাবলিকের রাস্তাকে বাপের রেসিং ট্র্যাক মনে করার আগে একশো চুয়ান্নবার ভাববি, জাউরা! ”
লোকটি বনেট থেকে মাথা তুলে সামান্য পিছন ঘুরে তাকালো। বাদামী নয়নজুড়ে ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। মুখে কিছুই উচ্চারণ করলোনা সে। কিন্তু এমন দৃষ্টির অর্থ বুঝতে আমার একটুও বাকি রইলোনা। ‘ তোর শেষ আমি দেখে নেবো! ’
পুলিশের টহলগাড়ির উপস্থিতির কারণে ঝামেলা এরপর তেমন এগোলনা বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, আমার ক্ষতিপূরণ বলতে আমি কিছুই পেলাম না। পুলিশ সদস্য আমাকে বলল, চুপচাপ এই স্থান ত্যাগ করতে। তাদের যে টাকায় কেনা হয়েছে বুঝতে বাকি রইলনা আমার। ওই মুহূর্তে কারো সঙ্গেই বিন্দুমাত্র তর্ক করার শক্তি কিংবা মনোভাব আমার মাঝে আর ছিলোনা। আমি টং দোকানের সেই যুবকের সাহায্যে আমার দুমড়ে যাওয়া স্কুটিটা টেনেই কাছের এক গ্যারাজের দিকে যাত্রা করলাম।
সাবিন চলে যেতেই পুলিশে ঘিরে থাকা লোকটি রুমালে নিজের র*ক্তবিন্দু লেপ্টে থাকা মুখ মুছতে মুছতে আশেপাশে তাকালো। ভীড়ের মাঝে দাঁড়ানো পুরাতন মডেলের আইফোন হাতে এক তাগড়া ছেলেকে চোখে পড়লো তার। খানিক মাস্তান টাইপের দেখতে। সিগারেট ফুঁকছে ঠোঁটে। লোকটি এগিয়ে গেলো তার দিকে, অমায়িক এক হাসি মেখে। ছেলেটি তাকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, চোখে ফুটলো খানিকটা ভয় এবং কৌতূহলবোধ।
“ আইফোনে অনেক সুন্দর স্ট্যাবল ভিডিও হয়, জানিস? ”
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১
ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। লোকটি হাসলো বেশখানিক। তারপর পকেট থেকে নিজের কমলাভ আইফোন সেভেন্টিন প্রো ম্যাক্স বের করে বললো,
“ যেটা রেকর্ড করেছিস, সেটা সুন্দর করে আমার ফোনে ট্রান্সফার কর তো বাচ্চা। বেনসনের দশটা প্যাকেট আজ তোর হবে। ”
