Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৩
জাবিন ফোরকান

পুলিশ স্টেশন।
নেওয়াজের সামনে বসে নিজের জবানবন্দী দিচ্ছে মীরা। কিভাবে কি হয়েছে, সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সে জানাচ্ছে, খামতি নেই কোনো তথ্যে।
সাবিন মীরার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যার থেকে দূরে থাকলেও তাকে ভুলে থাকা অসম্ভব। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল মীরা, সবকিছু থেকে। কারণ, সে নিজেকে গুছিয়ে নিতে চাইছিল। দূর্বল নয়, শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিল সে সাবিনের দুয়ারে। নিজের জীবনের একমাত্র কাছের মানুষটির কাছ থেকে সে দূরে গিয়েছিল নিজেদের মাঝে মতভেদের কারণে। অস্বীকার করার উপায় নেই, সাবিন তাকে দোষারোপ করায় মীরা ভীষণ মনঃকষ্ট পেয়েছিল। যদিও মীরা অবগত, দোষটা আসলেই তার নিজের ছিল। বোধবুদ্ধি খেয়ে সে এক তরুণকে বিশ্বাস করে ফেলেছিল, এতটাই অন্ধ বিশ্বাস যে নিজের প্রাণের বান্ধবীকেও তার সম্পর্কে এক আনা সত্য কোনোদিন বলেনি। সাবিনের রাগ জায়েজ ছিল। কিন্তু ওই মুহূর্তে, অমন ভগ্ন অবস্থায় সামান্য দোষারোপটুকুও মীরার গায়ে ছিটেছে বিষের মতন। সে উপলব্ধি করে, সাবিনের কাছাকাছি থাকলে তাদের মাঝে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। জীবনের সবথেকে আস্থাভাজন বোনের মতন মেয়েটাকে মীরা হারাতে চায়নি। তাই নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। দূরত্ব নাকি ভালোবাসা বাড়ায়? যদি তাই হয়, তবে সে আবারও একদিন সাবিনের কাছে গিয়ে দাঁড়াবে, এক নতুন, শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী মীরা হয়ে।

এই কারণেই সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ঢাকায় ফেরার পরেও সে সাবিনের সঙ্গে যোগাযোগ না করে জায়দানের কাছে সাহায্য চেয়েছে। যদি সাবিনের কাছে ওইদিন সে ফিরে যেতো, তবে এই দূরত্বের কোনো অর্থ থাকতো না। জায়দান আয়দানের বড় ভাই, সাবিনের প্রাক্তন স্বামী। এত ভয়ংকর পরিচিতি মীরার কার্যকলাপের প্রতি যথেষ্ট সন্দেহের কারণ হতে পারতো। কিন্তু মীরা কোনকিছুই জাগতিক অসামাজিকতা দিয়ে চিন্তা করেনি। হয়ত তার চিন্তাধারা অন্যান্য মানুষের কাছে কটু কিংবা ভুল হতে পারে, তবে নিজের অন্তরের কাছে যে শুদ্ধ, তাকে রোখে সাধ্য কার? জায়দানকে যে মীরা ঠিক বিশ্বাস করে তা নয়। তবে সাবিনের যে টান, যে মায়া সে মানুষটার প্রতি দেখেছে, তাতে তার খানিকটা হলেও আস্থা তৈরী হয়েছে। লোকটা ভরসাযোগ্য ছিল।
এতকিছুর পরেও মীরা নিজের প্রাণের বান্ধবীর কাছ থেকে দূরে থাকতে পারেনি। ঢাকায় ফেরার পর বহু দিন নিজেকে রুখে রাখলেও এমন কিছু দিন ছিল, যে দিনগুলোতে সে দূর্বলতার কাছে হার মেনেছে। নিজেকে লুকিয়ে সে পৌঁছে যেতো সাবিনের ক্যাফের কাছে। কখনো বা পুরাতন বাসার নিচে। সাবিনকে দেখতে পেতো বহুদূর থেকে। ওইটুকুই তার অন্তরের প্রশান্তি ছিল। সাবিনের জীবনে হয়ত তার অস্তিত্ব ছিলনা, কিন্তু তার পদচারণা রুখেনি কোনোদিন।
গত রাতেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল।

“আমি সাবিনকে দূর থেকে চোখের দেখা দেখতে গিয়েছিলাম। ক্যাফে বন্ধ করে রাতে যে রাস্তায় ও বাড়ি ফেরে, তার গলির ভেতরে, দেয়ালের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
নেওয়াজকে সবকিছু খুলে বললো মীরা।
“সাবিন আমাকে দেখতে পায়নি, আমি আড়াল থেকেই ওকে দেখছিলাম। ফুটপাথ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো। তারপরই শুরু হলো ধস্তাধস্তি।”
“আপনি আপনার বান্ধবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি?”
নেওয়াজের প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল মীরা।
“ওরা চারজন ছিল। যথেষ্ট স্কিল্ড, প্রোফেশনাল বলেই মনে হয়েছিল। আমি মেয়ে মানুষ। সাবিনের মতন অতোটা শক্তি আমার ছিলোনা। আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম, আমি হস্তক্ষেপ করলে আমাকেও তারা ধরাশায়ী করতে সময় নেবে না। সেক্ষেত্রে এই খবরটা আমি বাইরের কাউকে আর জানানোর সুযোগ পাবোনা।”
“কুইক থিংকিং। গুড।”

“গাড়ির নাম্বারটা টুকে নিয়েছিলাম। ইমারজেন্সি নাম্বারে ডায়াল করব, ঠিক তখনি কোত্থেকে একটা চিৎকার ভেসে এলো। দেখলাম, সড়কের অপর প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে আয়দান। কোনো চিন্তা না করেই ছেলেটা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ততক্ষণে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে তারা। একজন ভারী একটা ইট দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করলো। এরপর, আয়দানকেও গাড়ির ভেতরে তুললো। আমি আর দেখার সুযোগ পাইনি, গাড়িটা চলে গেলো। পিছু যে নেব, এমন পরিস্থিতিও ছিল না। কারণ সড়ক একদমই ফাঁকা ছিল।”
এটুকু বলে মীরা সামান্য ফুঁপিয়ে উঠল। দ্রুত নিজের ওড়না চেপে ধরে চোখ এবং নাক মুছে নিলো। তার ব্যাখ্যা সমাপ্ত হয়েছে, বুঝল নেওয়াজ। অতঃপর খানিকটা নরম গলায় সাহস দিয়ে বলল,
“আপনি দূর্দান্ত একটা কাজ করেছেন। আয়দানের মতন ভুলটা আপনি করেননি। দ্রুত চিন্তা করে গাড়ির নাম্বার অবধি টুকে এনেছেন। আমাদের অনেক সাহায্য হবে। থ্যাংকস।”

নেওয়াজের সঙ্গে কথা বলে যখন মীরা বেরোলো, তখন থানার অফিস রুমের সামনের ওয়েটিং লাউঞ্জে একদম পাথরের মতন চুপচাপ বসে থাকতে দেখলো সে জায়দানকে।
লোকটার বয়স যেন কয়েক ঘণ্টায় কয়েক বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। মুখটা কেমন পানসে হয়ে শুকিয়ে উঠেছে। ঠোঁটজোড়া রুক্ষ, যেন ফাটা চৌচির মরুভূমি। নিষ্প্রাণ বাদামী চোখজোড়া, চশমার লেন্সের আড়ালে সকল দ্যুতি হারিয়ে নিষ্প্রভ হয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র একটা টি শার্ট আর ফরমাল প্যান্ট পরনে। দুহাতে আকড়ে ধরে রেখেছে সে নিজের ফোনখানি। জায়দানকে সে আর কি বলবে, শান্তনা দেবে নাকি নিজেকে সামলাবে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেনা মীরা। চোখের সামনে সে যা দেখেছে, তারপর নিজেকে শান্ত রাখাও দুষ্কর। মীরা যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, ঠিক তখনি হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো মিসির।
ঘেমে গিয়েছে ছেলেটা। হাঁপানি দেখেই বোঝা সম্ভব কতটা তাড়াহুড়ো করে সে প্রাণপণ ছুটেছে বন্ধুর নিকট উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনে। ধপাস করে জায়দানের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল মিসির। ঝাঁকালো রোবটের মতন বসে থাকা বন্ধুকে।

“জায়দান? কি হয়েছে? বল আমাকে, প্লীজ?”
কোনো উত্তর এলোনা। এমনকি মিসিরকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল অবধি না জায়দান। তার মাঝে কেমন যেন একটা ঘোর লাগানো অনুভূতি। নিজের ভিন্ন জগতেই আছে প্রফেসর সাহেব, উপলব্ধি করে মিসির সরে এলো। তাকালো মীরার দিকে।
“তুমি অ্যাট লিস্ট খুলে বলো, কি হয়েছে?”
মীরা শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করে শেষমেষ জানালো,
“সাবিন আর আয়দানকে কারা যেন উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে।”
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা বিরাজমান রইলো সমস্ত স্থানজুড়ে। নির্বাক মিসির একদৃষ্টে চেয়েই রইলো মীরার দিকে। অতঃপর মিনমিন করে উঠল,
“ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন।”
মিসির অস্ফুট স্বরে বললেও মীরা কান খাঁড়া করে থাকার দরুণ স্পষ্টত শুনতে পেলো তার বাক্যটি। সঙ্গে সঙ্গে সে ধমকে উঠলো,

“সাবিন আর আয়দান কিডন্যাপড হয়েছে, মারা যায়নি!”
“জানি।”
“তাহলে এমন দোয়া করার অর্থ কি?”
“ওদের জন্য করছিলাম কে বললো?”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো মীরা। মিসির একটি নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কপাল ঘষতে ঘষতে জানালো,
“আমি কিডন্যাপারদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।”
মিসিরের সঙ্গে সরাসরি আলাপ এই প্রথম মীরার। আগে একবার যোগাযোগ হয়েছিল, সাবিনের ব্লাইন্ড ডেট সেট করার উদ্দেশ্যে। তখন অবশ্য সে জানতো না লোকটা সাবিনেরই প্রাক্তনের বেস্ট ফ্রেন্ড! তবে সবকিছু ছাপিয়ে মিসির নামক অদ্ভূত লোকটা এত বড় সংবাদের পরেও এতটা নির্ভার কিভাবে আছে সেটা মীরার মাথায় ঢুকলো না। মিসির বোধ হয় তার অভিব্যক্তি দেখে সবটা ধরতে পারলো। কপাল থেকে হাত সরিয়ে মীরার নয়নপানে চেয়ে সে বলল,
“কাজটা যেই করে থাকুক না কেন, তার পতনের শুরু এখানেই।”

ভ্রু তুলে জায়দানের দিকে নির্দেশ করল মিসির, মীরা অবাক নয়নে তাকালো। পাথরের মতন মানুষটা একদম ভাস্কর্যের ন্যায় বসে আছে। মীরা তাকে খবরটা জানানোর পর থেকে সে কিছুই বলেনি আর। সোজা পুলিশ স্টেশনে এসেছে তারা। মীরাই নেওয়াজের সঙ্গে সকল কথাবার্তা সেরেছে। জায়দান শুধু এক কোণায় নিজের ফোন নিয়ে বসেছিল। এখনো ওই একইরকমভাবে আছে। অন্যান্য স্বজনের মতন তার নেই কোনো আহাজারি, অতিরিক্ত ভয় কিংবা আশঙ্কার বহিঃপ্রকাশ। একটা সময়ে মীরা সত্যিই দ্বিধায় পরে গিয়েছিল, লোকটার আসলেই সাবিনের প্রতি কোনো অনুভূতি আছে কি?
মীরা নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতে পারলোনা। জায়দানের অবয়ব ভাসলো তার নয়নপটে, মিসিরের সুগভীর এক বাক্য ভেসে এলো তার কানে।
“পুলিশের আগে জায়দান সাবিনের খোঁজ বের করে ফেলবে, আমার কথা মিলিয়ে নিও, মীরা।”

কিছুদিন পূর্বে:-
আরেফিন বাড়ি।
নিজের পিতার মুখোমুখি বসে আছে আয়দান। ছোট একটা কফি টেবিল উভয়ের মাঝে। তাতে বরফভর্তি বাকেটে সজ্জিত কয়েক বোতল হুইস্কি। পিতা জাফর নিজের হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন, অন্য হাতে তার জ্বলন্ত সিগারেট। আয়দান নিজের গ্লাসখানি শক্ত করে ধরে বসে আছে। কফি টেবিলে হুইস্কির বোতল এবং গ্লাসের পাশেই রাখা বেশ কয়েকটি ফটো অ্যালবাম। উল্টে পাল্টে অ্যালবামের পাতাগুলো দেখছে আয়দান।
সমস্ত অ্যালবামের নব্বই ভাগ জুড়ে শুধু তার ছোটবেলার ছবি। হাজার খুঁজেও জায়দানের নিজস্ব কোনো ছবি উদ্ধার করা যায়নি। যা আছে, সবটাই আয়দানের সঙ্গে কোনো না কোনো খুনসুঁটির মুহূর্তের। কখনো নিজের পারিবারিক ইতিহাসে আগ্রহবোধ না করা আয়দানের মনে আজ হঠাৎ করেই প্রশ্ন জাগলো,
তার বড় ভাই এতটা অবহেলিত কেন? শুধুই তাকে সেদিন পাহাড় থেকে পড়ার পর বাঁচাতে পারেনি বলে?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত আজ সত্যিই সে লাভ করবে। কারণ, ছেলের সঙ্গে এই ওয়ান টু ওয়ান মুহূর্তের উদ্যোগ নিয়েছেন স্বয়ং জাফর আরেফিন। তিনি অবশ্য এখন অবধি কিছু বলেননি। আয়দান নিজে থেকেও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সে অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না পিতা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হন।
সিগারেটে দীর্ঘ এক টান দিয়ে তামাটে ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে দিলেন জাফর। অতঃপর হঠাৎ করেই খড়খড়ে গলায় বলে উঠলেন,

“আই মিস হিম।”
আয়দান কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা। জাফর খানিকটা মাতাল হয়ে গিয়েছেন সেটা তার জড়ানো ভাবলেশহীন কন্ঠে বোঝা যাচ্ছে। মাতাল না হলে তিনি কখনোই এমন কথা এতটা সহজভাবে বলতেন না।
“আই মিস মাই সন!”
আবারো বলে উঠলেন জাফর। পরিহাসের শুষ্ক হাসি হেসে সিগারেট সরিয়ে চুমুক দিলেন হুইস্কিতে।
“কিছু মনে করোনা। তুমিও আমার ছেলে আয়দান। কিন্তু তুমি আমার কাছে কোনোদিন জায়দান হতে পারবেনা। প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি নিয়ে যে আমার জীবনে এসেছিল, তার আসনটা সে না থাকলে ফাঁকাই থাকবে।”
নিজের পিতাকে কখনো এমন আবেগী কথা বলতে না শোনা আয়দান বেশ বিস্মিত হলো। জাফর একগাল হাসলেন। হুইস্কির ফাঁকা গ্লাস ছেলের উদ্দেশ্যে এগিয়ে দিয়ে ইশারা করলেন পুনরায় ভর্তি করে দেয়ার জন্য। আয়দান আজ্ঞা পালন করল।

“অবাক হচ্ছ? আমিও হচ্ছি। যতদিন ও কাছে ছিল, বুঝতে পারিনি। যেই ও দূরে চলে গেল, ওর অভাব আমায় ঘিরে ধরলো। প্রথমটায় শুধু কাজের ক্ষেত্রেই ওর অনুপস্থিতি আমায় অসুবিধায় ফেললো। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর শূন্যতা জেঁকে বসেছে অন্তরে। এই বাড়িটা বাড়ি কম, হোটেল মনে হচ্ছে আমার কাছে বেশি। তোমাদের ছেড়ে তো বহু দূরে দূরে থাকি, যেখানে তোমরা থাকো না, বাড়ি আসি কয়েক মুহূর্ত তোমাদের সাধনায় থাকতে। অথচ দেখো, আমার ছেলেটাই আজ ঘরছাড়া।”
“ভাইয়াকে সেই পথে তো আমরাই ঠেলে দিয়েছি, আব্বু।”
হুইস্কিপূর্ণ গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললো আয়দান। জাফর মাথা দুলিয়ে গ্লাস তুলে নিলেন। তবে চুমুক দিলেন না।
“রাইট। কারণ, ও থাকা না থাকা সমান ছিল আমাদের কাছে। অন্তত, আমরা তাই ভেবেছিলাম।”
চেয়ারে হেলান দিলেন জাফর। হুইস্কিতে লম্বা এক চুমুক দিয়ে বুঝি নিজের অবশিষ্ট বোধটুকুও বিলুপ্ত করে ফেললেন। অতঃপর বলতে শুরু করলেন,

“এই পরিবারের সঙ্গে আমি অনেক অন্যায় করেছি আয়দান। তোমার আম্মুর সাথে আমি অনেক অন্যায় করেছি। সেই পাপের ফলই বোধ হয় এই ভাঙাচোরা পরিবারটা। যেখানে শান্তি শুধু নামে আছে, মনে নেই।”
ভ্রু তুলে পিতাকে দেখলো আয়দান। সদা শক্ত সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাসী সুদীর্ঘ মানুষটাকে কেমন যেন অসহায় শিশুর মতন লাগছে দেখতে। জাফর একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলেন।
“তোমার আম্মু ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট থাকাকালীন আমি অন্য এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলাম।”
বাক্যটা বুঝি আয়দানের অন্তরে বি*স্ফোরণ ঘটালো। সমস্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। হতবাক দৃষ্টিতে সে চেয়ে রইলো পিতার দিকে, যিনি আজ সততার সকল স্তরকে ছাপিয়ে গিয়েছেন।
“জেসমিনকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করিনি। সবটাই ছিল পারিবারিক। আমি আদতে কোনদিন কাউকে ভালোবাসিনি। তবে জেসমিনের প্রতি দায়িত্ববোধ অনুভব করতাম অবশ্যই। কিন্তু আমার জীবন ঘুরপাক খাচ্ছিল শুধু ব্যবসা, অর্থ উপার্জনের মাঝে। নিজের কাজকে এতটাই গুরুত্ব দিতাম আমি যে পরিবার ভুলে যেতাম। এমনও দিন গিয়েছে যে আমি টানা দুই মাস বাড়িতে ফিরিনি, সেখানে জেসমিন একা বাড়িতে, শুধু কাজের লোকদের সঙ্গে।”
একটু থামলেন জাফর। কিছু ভাবলেন চোখ পিটপিট করে।

“বিবাহিত জীবন জেসমিন একাই বয়ে বেরিয়েছে। প্রবাসীদের মতন ছিল আমার জীবন। এক রাত দুই রাতের জন্য বাড়ি ফিরতাম। ওটুকুই যা দেখা হতো আমাদের। এলেই একেকবার একেক কার্ড ধরিয়ে দিয়ে যেতাম ওর হাতে। মনে করতাম, অর্থ তো দিচ্ছি, আর কি প্রয়োজন একজন নারীর?”
আয়দানের বুক কাঁপতে শুরু করলো। কারণ কাহিনীর বাকি অংশ সে ইতোমধ্যে আন্দাজ করতে পারছে।
“এরপর জেসমিন জায়দানকে গর্ভে ধারণ করলো। প্রথম প্রথম ও খুবই উত্তেজিত ছিল। কারণ ও ভেবেছিল এবার হয়ত আমি পরিবারমুখী হব। কিন্তু আমার তেমন কোনো অনুভূতি ছিলোনা। বউ আছে, সন্তানও একদিন না একদিন আসারই ছিল, অন্যথায় আমার সাম্রাজ্যের ভার বইবে কে? যেখানে আমার এই মুহূর্তে জেসমিনের পাশে থাকার দরকার ছিল, সেখানে আমি ব্যবসার চাপে আরো দুরে সরে গেলাম। জায়দান গর্ভে থাকার চার মাস একটানা আমি বাসায় আসিনি। ছিলাম বিদেশে বিদেশে, বিজনেস ট্যুরে। তবে হয়ত পুরুষ জাত বলেই আমার সুপ্ত চাহিদা ছিল। জেসমিন আমার স্ত্রী থাকলেও অতিরিক্ত কিছু আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার, যা ঠিক স্ত্রীর দ্বারা পূরণ সম্ভব নয়। এমনি এক নিষিদ্ধ সম্পর্কে আমি জড়িয়ে গেলাম, নিষিদ্ধ পল্লীর এক রমণীর সঙ্গে।”

জাফর বুকের ভেতর একটা ব্যথা টের পেলেন। ধীরে ধীরে বাড়ছে সেই যাতনা।
“দেশে ফেরার পরেও আমার সেখানে যাতায়াত ছিল নিত্য। আমার কাছে সেটা স্বাভাবিক কিছুই ছিল। কারণ আমার মতন সম্ভ্রান্ত পরিবারের পুরুষেরা এমনি। খেয়াল করে দেখবে, ইতিহাসে বহু নবাব রাজার ব্যক্তিগত হারেম ছিল। বোধ হয় সেই কু স্বভাব এখনো পুরুষ জাতির অনেকের মাঝেই পরিবর্তিত হয়নি। জেসমিন আমার এই যাতায়াতের সম্পর্কে জেনে যায় ছয় মাস গর্ভবতী থাকাকালীন। আমাদের মাঝে সেই সময়টায় তুমুল এক ঝামেলা হয়। এতটাই, যে ডিভোর্স পর্যন্ত প্রায় গড়িয়ে গিয়েছিল বিষয়টি। তবে শেষমেষ জেসমিন বেঁকে বসে, নিজের সন্তানের কথা চিন্তা করে। আমিও কিছুই বলিনি। ওকে বোঝাতে চেয়েছি, এসব স্বাভাবিক ঘটনা আর শুধুমাত্র শারীরিক চাহিদা। স্ত্রী তো সেই থাকবে আমার, আজীবন।”

হুইস্কির গ্লাসটা জাফরের হাত গলে মেঝেতে পড়ে গেলো। ভেঙে চুরমার হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো কাঁচ। অথচ উভয় পুরুষ নিজেদের স্থানে অটল। কারো মাঝে বিন্দুমাত্র নড়চড় নেই।
“আমি ততদিন বুঝতে পারিনি কি পরিণাম ডেকে এনেছি যতদিন না জায়দানের জন্ম হলো। জন্মের পরেও খুব বেশি কাছে থাকতে পারতাম না ছেলের। জেসমিনকে একাই সামলাতে হতো সবকিছু। আমার কাছে তখনো পরিবারের চাইতে অর্থ উপার্জন ছিল অত্যধিক জরুরী। আমেরিকায় গিয়েছিলাম, এক্সপোর্ট বিজনেসের কিছু কাজে। তখনি আমার কাছে প্রথম দেশ থেকে খবর আসে। আমার স্ত্রী নাকি আছাড় দিয়ে আমার ছেলেকে মে*রে ফেলতে চেয়েছিল!”

“আব্বু, আর বলতে হবেনা, প্লীজ!”
হঠাৎ করেই আয়দান বলে উঠলো। তার ইচ্ছা হচ্ছে নিজের কানে হাতচাপা দিয়ে রাখতে। শুনতে মন চাইছেনা এই ভয়াল কথাগুলো নিজের পরিবার সম্পর্কে। অথচ জাফর আজ থামলেন না। তার কন্ঠ বয়ে চলল নদীর অবাধ্য প্রবাহের মতন।
“তাড়াহুড়ো করে দেশে আসলাম। কিন্তু ততদিনে আমার হাত থেকে বিষয়টা সম্পূর্ণ বেরিয়ে গিয়েছে। জায়দান দেখতে শুনতে পুরোটাই আমার মতন হয়েছিল। ওর মুখ দেখলে সবাই বলত, ছোট্ট জাফর। বিষয়টা জেসমিন মানতে পারেনি। নিজের ছেলের স্থানে ও দেখত এক জঘণ্য স্বামীকে। সন্তানকে মনে করত নিষিদ্ধ পল্লীর পাপের সন্তান, কারণ ওর মাঝে আমার র*ক্ত বইছিল। জেসমিনের এমন পাগলাটে আচরণে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে জানা যায়, জেসমিন অতিরিক্ত মানসিক অবসাদে ভুগছে, যার আধুনিক নাম “পোস্টপার্টাম সাইকোসিস”।

বাকরুদ্ধ আয়দান। সহ্য করতে পারছেনা সে আর। বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে আসছে তার।
পড়াশোনাকালীন সময়ে রিসার্চের দরুণ এই বিষয়ে মোটামুটি জানতো সে। পোস্টপার্টাম সিন্ড্রোমস হলো নতুন মাতৃত্ব লাভের পর যথেষ্ট যত্নের অভাব, মানসিক চাপ এবং মাতৃত্বের ভারের ভয়ের কারণে সৃষ্ট হওয়া মানসিক সমস্যা। এক্ষেত্রে মা নিজের সন্তানের থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। পোস্টপার্টাম সিন্ড্রোমের সবথেকে দূর্লভ আর ভয়ংকরতম স্টেজ হলো পোস্টপার্টাম সাইকোসিস।
জাফরের দিকে তাকালো আয়দান। পিতার মুখমন্ডলজুড়ে যে গাঢ় অবসাদের ছায়া দেখা গেলো, সেই ছায়াটুকু আজকের পর থেকে দুঃস্বপ্ন অবধি তাড়া করে বেড়াবে আয়দানকে, সে নিশ্চিত।

“এরপর আর কিছুই কোনোদিন ঠিক হয়নি। জেসমিনের চিকিৎসা হয়েছে, কিন্তু সে আদও সুস্থ হয়েছে কিনা সেটা এখনো ধোঁয়াশা। আমি এরপর সকল কিছু করেছি। নিষিদ্ধ পল্লীতে যাতায়াত ছেড়েছি, পরিবারকে সময় দেয়ার চেষ্টা করেছি, নবজাতক ছেলেটাকে মায়ের কোল দিতে রীতিমত যুদ্ধ করেছি। লাভ হয়নি। মরার পরে ওষুধ খেলে কি আর লা*শ বেঁচে ওঠে? আমি নিজ হাতে অতি যত্ন নিয়ে পরিবারটাকে ভেঙে ফেলেছি আয়দান। তুমি এসেছিলে আমাদের জীবনে, তোমার মায়ের খুশি হয়ে। কারণ, আমাদের বৈশিষ্ট্য পেলেও তোমার মুখটা দেখতে জেসমিনের মতন। সে তোমার মাঝে আমার নয়, নিজের ছোঁয়া পেয়েছে বেশি। তাই তোমাকে আগলে নিতে তার কোনো সমস্যাই হয়নি। তোমার মধ্য দিয়ে একটু একটু করে ও আবারো যখন সুস্থ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, তখনি বান্দরবানের ঘটনাটা এমনভাবে সবকিছু ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিল, যে আমি অবধি হাল ছেড়ে নীরব দর্শক হয়ে গিয়েছিলাম, আজ পর্যন্ত তাই রয়ে গিয়েছি। আমার সেই কৃতকর্মের ভোগান্তি আজ অবধি ভুগে চলেছে, মাশুল গুণে চলেছে যে মানুষটা, সে আমার নিজেরই র*ক্ত, আমার বড় ছেলে, জায়দান আরেফিন।”
টুপ করে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে নামলো জাফরের ডান চোখের কোণ বেয়ে। অতঃপর সেই এক ফোঁটাকে অনুসরণ করলো আরো হাজারো ফোঁটা। ভিজিয়ে তুললো তার সমস্ত মুখ।
সেদিন প্রথমবারের মতন নিজের পিতাকে কাঁদতে দেখেছিল আয়দান আরেফিন।

মাথায় ঝিমঝিম করা একটা ব্যথা নিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকালাম আমি। প্রথমটায় কিছুই ঠাওর করতে পারলাম না দৃষ্টিতে। কেমন যেন ঝাপসা সবকিছু। অনেকটা সময় পর টের পেলাম অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা পরিবেশ। সঙ্গে কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। মাথা ঝাঁকি দিতেই সমস্ত শরীর টনটন করে উঠল আমার। নিজেকে নাড়াতে গিয়েই টের পেলাম, শরীরে জড়ানো দঁড়ি। এতটা শক্তভাবে বাঁধা যে একচুল নড়ার জো নেই। পিঠে শক্ত কোনোকিছুর অস্তিত্ব টের পেলাম। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই যা দেখলাম, তাতে আমার সমস্ত শরীর বুঝি জমে গেলো।
একই বেঞ্চের এদিক ওদিকে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে আমাকে এবং আয়দানকে! একে অপরের সঙ্গে পিঠ ঠেকানো আমাদের, সমস্ত শরীরে প্যাঁচানো বাঁধন। আয়দানের মাথাটা ঝুলে আছে। জমাট বাঁধা র*ক্তপ্রবাহের চিহ্ন নেমে গেছে তার কপালের পাশ গড়িয়ে ঘাড়ের দিকে।
আমার সঙ্গে আয়দান কি করছে? এলো কিভাবে এই বান্দা? ধড়ফড় করে উঠলো বুকের ভেতরটা। এত এত মানুষ থাকতে আয়দানই কেন?

“আহহহহ!”
হতাশা, ঘৃণা, ক্রোধ, আক্রোশ, শঙ্কার মিশ্র অনুভূতি আমার কন্ঠ বেয়ে বেরোলো তীব্র চিৎকার রূপে। কেঁপে উঠলো চারপাশ।
“শালী, জানোয়ার!”
গুঙিয়ে উঠল আয়দান। দূর্বল শরীর ছেলেটার ঝটকা দিয়ে উঠতেই দঁড়ির বাঁধনে টান খেলো। খেঁকিয়ে উঠলাম আমি,
“তুই জানোয়ার! তোর চোদ্দ গুষ্টি জানোয়ার!”
“আর তুই একটা অকৃতজ্ঞ বেঈমান হাগুর পোকা!”
“কি বললি তুই আমাকে? এখানে কেন এসেছিস তুই? আমাকে কবর পর্যন্তও জ্বালিয়ে মারবি?”
“হ্যাঁ, জলহস্তীর গু! যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর!”
“তুই চোর? তুই হচ্ছিস গিয়ে ডাকাত! একটা লুইচ্চা, ছ্যাঁচড়া ডাকাত! ঘসেটি বেগমের সৎ ছেলে কোথাকার!”
“আর তুই সিরাজউদ্দৌলার জুতো মাজুনি! নিজে তো ডুবেছেই, গোটা বাংলাকে নিয়ে ডুবেছে!”
“এই চোপ! একদম চোপ!”

কর্কশ পুরুষালী কঠোর চিৎকারে বুঝি ছাদটাই ভেঙে পড়ছিল আমাদের উপর। আমি এবং আয়দান দুইজনই আঁতকে উঠে তাকলাম। অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমটা অতর্কিতে আলোকিত হয়ে পড়ল। দরজা খুলে গিয়েছে। বাইরে থেকে জোছনার মতন আলো এসে ঢুকছে অভ্যন্তরে।
“মাগো মা! অজ্ঞান হওয়া থেকে জাগতে পারেনাই, আর আমগো সবার আত্মা হোগায় তুলে ফেলছে!”
এক গাট্টাগোট্টা ধরণের লোককে দেখা গেলো। তামিল মুভির সিনেমার মতন শার্ট আর সাদা লুঙ্গি পরনে, লুঙ্গি আবার গুটিয়ে রেখেছে কোমরে। তৈল চকচকে কালো শরীর, মোটা গোঁফ। আয়দান বিরক্তিসূচক শব্দ তুলে বলে উঠলো,
“তুই আবার কোন সিনেমার রাজনীকান্ত?”
বাঁকা হাসলো লোকটা। বলে উঠলো,
“পুষ্পা! আমার নাম…পুষ্পারাজ!”
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম আমি আর আয়দান। পরক্ষণেই আমাদের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল হাসির তোড়ে। পুষ্পা নামের লোকটা ঘাবড়ে গেল। জীবনে কাউকে কিডন্যাপ করার পর তাদের এমনভাবে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে দেখেনি সে কোনোদিন। আমি হাসতে হাসতে আয়দানকে কনুইয়ের গুতো দিয়ে বললাম,

“বাংলাদেশের আল্লু আর্জুন!”
“তুই দেখছিস নাকি? আমি তো একটা ভোটকা কেরোসিনে ডোবা হাতির বাচ্চা দেখতে পাচ্ছি!”
পুষ্পা বোধ হয় আমাদের অপমানে বেশ ক্ষেপে গেল। থপথপ করে পা ফেলে এগিয়ে এলো সে, এদিকে কিছুতেই আমাদের হাসি থামছে না।
“হাইসা নে, হাইসা নে আমার নাম শুইনা। আমার এমপ্লোয়ারের নাম শুনলে তো তোগো মুত বাইরাই যাইবো!”
কোনমতে হাসি চেপে খেক খেক করতে করতে বললাম,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩২ (২)

“আচ্ছা? কে আপনার সেই মহৎ এমপ্লোয়ার মিস্টার পুষ্পারাজ?”
বাঁকা হাসি খেলে গেলো পুষ্পার ঠোঁটে। কন্ঠস্বর গমগম করে উঠল আবদ্ধ কক্ষজুড়ে,
“হুসেইন। আহান হুসেইন।”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here