সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৪
জাবিন ফোরকান
ছোট ছেলে আয়দানের অপহরণের খবর জেসমিনকে জানানো হয়নি। মাইনর স্ট্রোকের রোগীর এমন সংবাদ শুনলে যে কি হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। তিনি নিজের ভ্রমে বসবাস করছেন। জানেন, আয়দান বরাবরের মতোই হঠাৎ কোনো ট্যুরে চলে গিয়েছে। মিথ্যা নাটকটা সাজানো হয়েছে আপাতত জেসমিনকে ভুলিয়ে রাখার জন্য। তবে খুব শীঘ্রই কোনো হেস্তনেস্ত না হলে যে ব্যাপার জটিল আকার ধারণ করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
পেরিয়ে গিয়েছে ১৫ ঘণ্টা।
নেওয়াজ পুলিশ টিমের নেতৃত্বে পুরোদমে খোঁজ শুরু করে দিয়েছে। তবে এখনো বিশেষ কোনো সূত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মীরা যে গাড়ির নাম্বার দিয়েছিল, তা এক চোরাইখানা থেকে পাওয়া গিয়েছে। নম্বরপ্লেট যে নকল, সে সন্দেহ নেওয়াজের আগেই হয়েছিল। ইনভেস্টিগেশন এবং সার্চ টিম সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। তবে ঠিক কোথা থেকে শুরু করবে তা নিয়ে দ্বিধায় পরে যাচ্ছে। কারণ সাবিন কিংবা আয়দানের সঙ্গে এমন কে বা কারা করতে পারে, সেই সন্দেহের তালিকায় নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। মিসির অবশ্য নেওয়াজকে ব্যক্তিগতভাবে ডেকে একটা নাম বাৎলে দিয়েছে। সেই নাম অভিজাত এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দরুণ একেবারে সরাসরি সন্দেহের তালিকায় ফেলা সম্ভব না। নেওয়াজ তাই ব্যাপারটা বন্ধুর অনুরোধে চেপে রেখেই কাজ করছে।
জায়দানের ফ্ল্যাট।
বেশি আসবাব না থাকা ছিমছাম স্থানটি বর্তমানে অতি চিন্তিত কিছু মানুষে পরিপূর্ণ। হলঘরের সোফায় বসে আছে মীরা, তার বিপরীত প্রান্তের সোফায় জাফর। জায়দান ডাইন ইন টেবিলে, নিজের ল্যাপটপের পর্দায় মশগুল। এত গুরুতর অবস্থায়ও সে কাজ ছাড়েনি। কিছুক্ষণ আগেই দুটো অনলাইন সেশন শেষ করেছে। জাফর খুব একটা অবাক না হলেও মীরা তাকে হতবাক হয়ে দেখছে। সাবিন আর আয়দান অপহৃত হওয়ার পর থেকে সে একটা সেকেন্ডও জায়দানকে প্রযুক্তি থেকে দূরে দেখেনি। সবসময় তার হাতে স্মার্টফোন, আইপ্যাড নয়ত ম্যাকবুক – ল্যাপটপ ছিলোই। কারো সাথে সে অতিরিক্ত কথা বলেনি, না কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেছে। এতে জায়দানকে রীতিমত পাষাণ মনে হচ্ছে, যে এতকিছুর পরেও নিজের কাজে মশগুল আছে। অথচ মীরা উপলব্ধি করতে পারছে,
জায়দান ভিন্ন কিছু পরিকল্পনা করছে।
সবজি এবং চিকেন দিয়ে সহজে ঘন একটা স্যুপ রেঁধে ফেলেছে মিসির। বাটিভর্তি করে নিয়ে সে কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো। মীরা এবং জাফর উভয়ের সামনে সেগুলো রাখলো। মীরার দিকে চেয়ে বলল,
“অনেকটা সময় পেরিয়েছে। প্লীজ, খাবো না, ইচ্ছা নেই এই ধরণের নাটকগুলো এখন করোনা। আমি জানি কারোরই ইচ্ছা নেই, কিন্তু শরীরের জন্য দরকার, ওকে?”
মীরা সত্যিই প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, তবে মিসিরের এমন বক্তব্যের পর কিছু বলতে পারলোনা। নিঃশব্দে, বিষন্ন মনে কিছুটা স্যুপ মুখে দেয়ার চেষ্টা করলো।
অন্তিম বাটি তুলে নিয়ে মিসির জায়দানের কাছে গেলো। চশমার লেন্সের আড়ালে বাদামী নয়নজোড়া স্ক্রীনের দিকে আবদ্ধ। মিসির বাটিটা আস্তে করে রাখলো।
“একটুখানি খেয়ে….”
কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার অশুভ ধ্বনি। মিসির টেরটুকুও পায়নি, বিদ্যুৎ গতিতে কি হয়েছে। সে শুধু লাফিয়ে পিছিয়ে যেতে পারল খানিকটা। স্যুপের বাটিটা মেঝেতে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উষ্ণ স্যুপ লেপ্টে গিয়েছে সমস্ত মেঝেতে। জায়দান তখনো একইভাবে বসে তাকিয়ে ল্যাপটপের পানে, শুধুমাত্র তার ডান হাতটা যে স্থানে মাত্রই বাটিটা ছিল সেখানে রাখা।
“ফাক অফ, মিসির!”
জায়দানের কন্ঠস্বর এতটা গম্ভীর, ভারী এবং নিষ্প্রাণ শোনালো যে সকলে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। মিসির নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলোনা আর, ভ্রু কুঁচকে খেঁকিয়ে উঠলো,
“বাড়াবাড়ি করছিস এবার তুই, জায়দান!”
জায়দান অবশেষে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল মিসিরের দিকে। বাদামী শীতল নয়নজোড়ায় চাপা আগুন জ্বলছে যেন।
“তোকে শুধু একটা অনুরোধই করেছিলাম। অ্যান্ড ইউ ফেইল্ড ইট মিসারেবলি।”
জমে গেলো মিসির। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল জায়দানের দিকে। তবে কি তার বন্ধুটা সব জানে?
বেশ কিছুদিন আগে সাবিন যখন মিসিরের কাছে নিজের বাবার গুলশানের জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল, তখন মিসির তাকে আশ্বাস দিয়ে রেখেছিল সে খতিয়ে দেখবে। পরে জেনেছেও। সাবিনের সন্দেহ সত্যি ছিল। জমির মালিকানা ব্যাংকের নয়, বরং ছিল সাবিনের চাচা তাকবীর হুসেইনের। যিনি সেটা মিসিরের বর্তমান ক্লায়েন্টের কাছে বিক্রি করেছিলেন কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে। তথ্যটা সাবিনকে জানিয়েছিল সে। মানাও করেছিল উত্তেজিত কোনো কাজ করে না বসতে। সাবিন সেদিন হালকা হেসে তাকে একটা ধন্যবাদ দিয়েছিল। এটুকুই।
ওই সামান্য ঘটনার যে আজকের সৃষ্ট বিপদে বিশাল অবদান আছে তা বুঝতে মিসিরের মতন বুদ্ধিমান লোকের কোনো সূত্রের প্রয়োজন নেই। নেওয়াজকে সে তাই সাবিনের চাচার সম্পর্কে সতর্ক অবধি করেছে। তবে জায়দান বিষয়টা আমলে নিতে পারে সে ভাবেনি।
জায়দান কি তবে সাবিনের পরিণতির জন্য মিসিরকে দায়ী করছে?
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো মিসির।
“দেখ জায়দান। আমার হাতে কিছু ছিলনা। শি ডিজার্ভড দ্যা ট্রুথ।”
“অ্যান্ড ইউ ডিজার্ভ টু শাট দ্যা ফাক আপ অ্যান্ড গেট লস্ট ফ্রম বিফোর মাই আইজ!”
“জায়দান ভাইয়া।”
মিসিরের করুণ অবস্থা লক্ষ্য করে সাহায্যার্থে এগিয়ে এলো মীরা। দ্রুত জগ থেকে ঢেলে এক গ্লাস পানি ভর্তি করে নিয়ে এসে সে দাঁড়ালো জায়দানের টেবিলের পাশে।
“আমরা নাহয় একে অপরকে পরে দোষারোপ করবো। আপনি চিন্তা করবেন না, কেউ আপনাকে কিচ্ছু খেতে জোর করবেনা। নিন, খানিকটা পানি পান করে নিন।”
চট করে মীরার এগিয়ে দেয়া পানির গ্লাসের দিকে তাকালো জায়দান। অতঃপর পুনরায় নিজের দৃষ্টি ল্যাপটপে ফিরিয়ে নিয়ে বলে উঠলো,
“তুমি কি আমাকে গ্যারান্টি দিতে পারো যে ওকে ওখানে কিছু খেতে পান করতে দেয়া হয়েছে?”
জমে গেলো মীরা। বিষণ্ন গলায় উত্তর করল,
“না।”
“তাহলে ভাবলে কি করে যে আমি আয়েশ করে একটাও দানা পানি মুখে তুলবো?”
অত্যন্ত শান্ত কন্ঠস্বর। অথচ ওই কণ্ঠের অন্তরালে গোপনে ঢেকে রাখা নিদারুণ যাতনার পরত বড়ই প্রশস্ত। জায়দান আর কারো প্রতি কোনো নজরপাত না করে সম্পূর্ণরূপে নিজের ল্যাপটপে মনোনিবেশ করল। মীরা এবং মিসির দুইজনই পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলো তার কাছ থেকে।
অদূর থেকে ছেলের পাথরের মতন মুখটার পানে নিঃশব্দে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন জাফর।
একটা ময়লা পাটাতনের উপর পা ছড়িয়ে বসে কলা খাচ্ছি আমি। অন্য হাতে লাস্ট ডেটের শক্ত হয়ে যাওয়া একটা বিশাল পাউরুটি। অর্ধেকটা পানি ছাড়া শুধু কলা দিয়ে চিবিয়ে বহু কষ্টে গিলেছি। মনে হচ্ছিল যেন কন্ঠনালী বেয়ে ক্যাকটাস গাছ নেমে গেলো! ক্ষুধা লাগলে মানুষ কত কীই না সহ্য করে!
অদূরে আয়দানের বাচ্চাটা কুকুরের মতন এদিক সেদিক কি যেন শুঁকে শুঁকে বেড়াচ্ছে। নিজের ভাগের কলা পাউরুটির অর্ধেক সবার করে বেচারা হাঁপিয়ে গিয়েছে। বাকিটা বিসর্জন দিয়েছে আমার কোলে। আমি অবশ্য খাইনি, কুকুরে মুখ দেয়া খাবার মানুষ খায়? পাপ হবে!
আমাদেরকে ঘরের ভেতর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। আমার আর আয়দানের ফোনগুলোও কেড়ে নেয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে যখন খাবার দিয়ে গেলো, তখন দেখেছি, নিজেদের ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় আমার ফোনটায় বেশ আয়েশ করে ইউটিউব ভিডিও দেখতে দেখতে খিলখিল করে হাসছে প্রাণীগুলো।
এই ঘরটা আবদ্ধ একটা কক্ষ। ধাতব দেয়াল। খানিকটা কন্টেইনারের মতন। একটা লোহার দরজা ছাড়া কিছু নেই। ভেতরে একটাই চেয়ার, যেখানে কিছুক্ষণ আগে অবধি আমি এবং আয়দান বাঁধা ছিলাম। ময়লা মেঝে জুড়ে ছড়ানো খড়কুটো। তেল – গ্রীজের চ্যাটচ্যাটে পদার্থ। কেমন যেন গা গুলিয়ে আসে। ওইসবের মধ্যে আয়দান যে কি ঘাঁটাঘাঁটি করছে!
“কুত্তার স্বভাব যায়নি এখনো? প্রাণীর বিষ্টা খাওয়ার শখ হয়েছে?”
আমার প্রশ্নে বেজায় তেঁতে উঠলো আয়দান। কোমরে দুহাত দিয়ে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“তোর পাথরের মতন রুটি তুই খা, তোর তো গলা না ব্লেন্ডার মেশিন!”
আরেকটু এগোলো সে।
“আর খেতে খেতে আয়েশ কর। তোর ওই সাইকো নাগরের হাত থেকে বাঁচার রাস্তা আমি একাই খুঁজব। তারপর তোর আম্মোকে আসসালামু আলাইকুম দিয়ে সটকে পড়ব। শালী তোর জন্যই আমাকে এখানে ফাঁসতে হয়েছে!”
রুটি একটু বাকি আছে। সেটুকু গিলে উঠলাম। হাত ঝাড়া দিয়ে বলে উঠলাম,
“তো আমি তোকে আসতে বলেছি নাকি রে? ইশ! বাংলার জনসিনা এসেছিলেন। দামড়া খাস কি ভূষি? শরীরে শক্তি নেই? একটা মাইরেই মাথা ফাটিয়ে সর্বনাশ? বেশ হয়েছে, এসেছিস কেন তুই!”
“মীরা যদি তোর পরাণের কিডনিটাচিং বান্ধবী না হতো তাহলে আমি কেন, এডিস মশাও তোর রক্তে মুখ দিয়ে দেখত না! যে বিষাক্ত তুই, তোর থেকে রক্ত খেলে এডিস মশারও এইডস হবে!”
ক্ষেপে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তবে থমকে গেলাম। মীরা? তবে কি এই আয়দান আসলে মীরার খোঁজ পাওয়ার জন্য আমাকে অনুসরণ করছিল? ভেবেছিল আমি সত্যিই জানি কিন্তু ইচ্ছা করে তাকে বলছিনা? ভাবনাটার সত্যতা যাচাই করার সময় পেলাম না।
লোহার দরজাটা আবারও খুলে গেলো। তবে এবার কোনো পুষ্পার দেখা পাওয়া গেলনা। এলো পুষ্পার এক চ্যালা। এর নাম জানিনা, ডাকি পাটকাঠি। কারণ এতই পাতলা শরীর যে হাফ প্যান্টের নিচে পা দুটো মনে হচ্ছে যেন পাটকাঠির ডগা। হালকা বাতাস আসলেই উড়ে যাবে।
পাটকাঠি উঠেই বিচ্ছিরি এক গলায় রীতিমত হুকুম তামিল করলো,
“এই পোলা, আমার লগে চল।”
পোলা বলতে সে যে আয়দানকে বুঝিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা উভয়েই ভীষণ অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালাম। আয়দান শুকনো একটি ঢোক গিলে পাটকাঠির দিকে চেয়ে বাঁকা হাসলো,
“কেন? পুষ্পারাজের বুঝি মুখোমুখি ময়দানে নামার ইচ্ছা হয়েছে? বেশ তো, ওর পাছার লুঙ্গি মাথায় না তোলা অবধি আমি থামবো না, আই অ্যাম রিয়েলি গুড ইন ফাকিং আপ পিপল!”
পাটকাঠি ভ্রু কুঁচকে দেখলো। তার থেকেও না থাকার মতন শরীরে একটা মৃদু কম্পন খেলে যেতে দেখলাম। দ্রুতই হাফপ্যান্টের পকেটে বাঁশের কঞ্চির মতন হাত ভরে সে একটা পি*স্তল বের করল। ভড়কে না গেলেও খানিকটা আতঙ্কিত বোধ করলাম। জিনিসটা বরাবর আয়দানের দিকে তাক করে পাটকাঠি চেঁচিয়ে উঠলো,
“এই খানকীর পোলা চুপচাপ চল! নইলে ভইরা দিমু এক্কেরে!”
বাচ্চাদের মতন তীক্ষ্ণ কন্ঠে হাসি পেয়ে গেলেও পি*স্তলের মুখে চুপ থাকলো আয়দান। হাসি চেপে দুহাত তুলে সমর্পণের ভঙ্গিতে বললো,
“ওকে ওকে। কে কাকে ভরে সেটা তো দেখাই যাবে। চল ব্লেন্ডার মেশিন, দেখে আসি, পুষ্পা ভাই আমাদের তলব করলো কেন হঠাৎ।”
আয়দান আমার দিকে চিবুক তুলে ইশারা করে এগোতে নিলো, তখনি পাটকাঠি ভীষণ রেগে বললো,
“না। মাইয়াটা যাবে না, এইখানেই থাকবে। তুই একলা চল।”
আমি এগোচ্ছিলাম, তবে কথা শুনে থেমে গেলাম। বিস্মিত হয়ে আয়দান প্রশ্ন করলো,
“কেন? ও একা থাকবে কেন?”
বাঁকা একটা হাসি খেলে গেলো পাটকাঠির ঠোঁটে। পি*স্তল নাড়িয়ে খিলখিল করে বলে উঠল,
“তুই বাইর হইলেই এইখানে বাসর শুরু হইব!”
আয়দানের দৃষ্টি সরু হয়ে এলো। আমার দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হলেও বর্তমানে কিছু না বলে শুধু নীরব পর্যবেক্ষণ করছি। ঠিক এমন সময়েই পাটকাঠির পিছনে উদয় হলো এক ছায়ামানব। তার মোলায়েম মধুর মতন কন্ঠস্বর ধেয়ে এলো আমার দিকে, শিহরণ খেলিয়ে দিলো শিরদাঁড়া বেয়ে।
“বেবিগার্ল! ইউ রেডি ফর ড্যাডি?”
আঁধারের মায়া ভেদ করে বেরিয়ে এলো আহান। একদম পরিপাটি। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট এবং খাকী প্যান্ট। ঠোঁটে ঝুলছে বিরাট এক ঝকঝকে হাসি। হাতে একগুচ্ছ রক্তলাল গোলাপ। একটা সময় এই রূপ দেখে আমি অভিভূত হতাম। অথচ আজ, এই জন্তুটা আমার সমস্ত শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলো। ক্রোধ এবং আতঙ্কের।
আয়দানকে দেখে আহানের হাসিটা খানিক ম্রিয়মাণ হলো, তবে মুছে গেলোনা। শুধু ঠাণ্ডা গলায় সে বলল,
“ওহ, শিং উঁচিয়ে বিনা ইনভাইটেশনে ক্ষেতে ঢুকে পড়া গরুটা এখনো এখানেই?”
“শালা মাদার***দ!”
ভয়ানক এক অশ্রাব্য গালি দিলো আয়দান। তাতে আহান অট্টহাসি হেসে উঠলো।
“বিদেশে মুরগী বড় করলেও শিক্ষাটা দেখি খাস বাংলায় দিয়েছে আরেফিন গুষ্টি।”
হেলেদুলে অত্যন্ত আয়েশ করে ভেতরে এগোলো আহান। তার দৃষ্টি আবদ্ধ আয়দানের দিকে।
“সুযোগ থাকতে চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যা ভাই। তোর সাথে আমার কোনো লেনাদেনা নেই। স্রেফ গর্ধবের মতন এমন জায়গায় ঢুকে পড়েছিস যে জায়গায় তোর আসার কথা ছিলনা। যা, বাড়ি যা। দরজা খোলা আছে, কথা দিচ্ছি কেউ তোর একটা চুলও আর বাঁকা করবেনা।”
আয়দানকে ভীষণ দ্বিধান্বিত দেখালো। ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে দেখলো একবার। আহান দৃশ্যটা লক্ষ্য করে মৃদু হাসির সঙ্গে বলল,
“ওদিকে কি দেখছিস? ওটা আমার মাল। তোর মালটা শুনেছি গায়েব হয়ে গিয়েছে। সে, আমার হাত বহু দূর। তোকে একটা হিন্ট দেই। বাড়ি গিয়ে নিজের বড় ভাইকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস কর, সব উত্তর পায়ে যাবি। যাহ, এবার যা।”
সামান্য কেঁপে উঠলো আয়দান। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো আহানের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে। পাটকাঠি নীরবতায় বাঁধ সেধে পি*স্তল নাচিয়ে হুমকি দিলো,
“ওই পোলা, ভালো কথায় না নড়লে বু*লেট তোর…”
“যাচ্ছি আমি!”
দাঁতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করলো আয়দান। আহানকে দেখলো অশনির দৃষ্টিতে,
“যদি ভাইয়ার কাছে ওর খবর না পাই তাহলে তোকে দেখে নেব!”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালোনা ছেলেটা। আমাকে একলা ফেলেই হনহন করে এগোলো। খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে, অনুসরণে পাটকাঠি দরজাটা আটকে দিয়ে গেলো। স্তব্ধ হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। আহান মাথা ঝাঁকিয়ে হাসিমাখা চেহারায় ঘুরে তাকালো আমার অবিশ্বাস মাখা চেহারায়।
“কি ভেবেছিলি বেবিগার্ল? ওই ছেলে তোর দুই আনার হলেও পরোয়া করে? আসলে ঐ গুষ্টিটাই স্বার্থপর, বুঝলি? বেঈমানি ওদের রক্তে রক্তে! তাইতো বলি, আমার কাছে চলে আয়।”
আহানের তর্জনী স্পর্শ করলো আমার মুখ, গাল ছুঁয়ে নেমে গেলো গলায়। সমস্ত শরীর গুলিয়ে উঠলো বুঝি। তীব্র দৃষ্টিতে মোকাবেলা করলাম চাচাতো ভাইরুপী দানবটাকে।
“এক কুত্তা মারতে সাবিনের আরেক কুত্তার প্রয়োজন নেই!”
পেরিয়েছে গোটা ২৬ ঘণ্টা।
একেকটা ঘণ্টা, একেকটা মিনিট, একেকটা সেকেন্ড গুণেছে এক বিশ্রামহীন অন্তর।
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জায়দান। শুষ্ক দৃষ্টি বাইরের দিকে। গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে শহর। ফ্ল্যাটজুড়ে নীরবতা। তবে উপস্থিত কারো চোখেই ঘুম নামক কোনো অনুভূতি নেই। নেওয়াজ এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। আপডেট জানিয়ে গিয়েছে।
আপডেট এটাই যে এখনো কোনো আপডেট নেই। একটা লোকের সন্ধান পেয়েছে অবশ্য, কিন্তু সেই লোক আর তার দলের অবস্থানের খবর উদ্ধারে আরো সময়ের দরকার সন্দেহ নেই। কিন্তু জায়দান জানে, নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে পুলিশকে।
নিজের ভেতরে কিছুই অনুভব করছেনা জায়দান। কেমন যেন একটা ভয়ানক শূন্যতা। এত গভীর ফাঁপা অনুভব ভীতিকর। স্থির দাঁড়িয়ে আছে সে। যে কেউ তাকে দেখলে ভাববে কোনো অশরীরী।
টিং করে একটা শব্দ হলো।
এক সেকেন্ডও বুঝি দরকার হলোনা। ন্যানো সেকেন্ডের মাঝেই জায়দান ঝাঁপিয়ে পড়ল খোলা ল্যাপটপের উপর। ভ্রু কুঁচকে দেখলো স্ক্রীনে।
লোড করে রাখা সাবিনের গুগল অ্যাকাউন্টের ইউটিউব ওয়াচ হিস্টোরি আপডেট হয়েছে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই!
ক্ষণিকের জন্য পায়ে জোর পেলনা জায়দান। টলে উঠলেও শক্ত করে টেবিল আঁকড়ে ধরে নিজের পতন ঠেকালো। পরক্ষণে সকল কিছু উপেক্ষা করে কি বোর্ডে হন্যে হয়ে বয়ে চললো তার আঙুল।
দ্রুত অ্যাকাউন্টের রিসেন্ট অ্যাকটিভিটিতে গেলো সে। সাবিন নিজে ফোন ব্যবহার করছেনা সে নিশ্চিত। ফোন যদি তার কাছে থেকেই থাকে, তবে আগেই যোগাযোগ করতো। সাবিন আর আয়দানের নাম্বার ট্র্যাকিং করে পুলিশ পায়নি। অর্থাৎ, কিডন্যাপার সিম বদলেছে। কিন্তু অ্যাকাউন্ট লগ আউট করেনি।
“গুড! টু মাচ গুড!”
মনে মনে বিড়বিড় করল জায়দান। এবার তার দরকার শুধু নেটওয়ার্কের হদিস।
পরবর্তী ঘণ্টা জায়দানের কাটলো অস্বাভাবিক দ্রুততায়।
নেটওয়ার্ক টাইপ, ওয়াইফাই। এস এস আই ডি থেকে আনুমানিক এরিয়া রেঞ্জ বের করলো। ব্যক্তিগত ওয়াইফাই ব্যবহৃত হয়েছে। ভিডিও বাফারিংয়ের লেভেল থেকে ওয়াইফাইয়ের স্পিড বের করলো। এত ব্যান্ডউইথের ভেতরে এরিয়ার ভেতরে কোন কোন এলাকা আছে, গুগল ম্যাপ থেকে একটা একটা করে সবগুলো বের করলো জায়দান। সাধারণ কারো পক্ষে তার পদ্ধতিটা ধরা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, কিন্তু সে জানে সে কি করছে। মাত্র ৩২ এ প্রফেসরের তকমা তাকে তার চেহারা দেখে দেয়া হয়নি!
ঘণ্টাখানেক বাদে জায়দানের হাতে যা থাকলো তা হলো শহরের প্রান্তের দিকের কয়েকটা থানা আর উপজেলার নাম।
আর অপেক্ষা করলোনা জায়দান। ফ্ল্যাটে থাকা নিজের বাবা এবং মিসিরকে কিছু জানালো না অবধি। নিজের জ্যাকেট এবং বাইকের চাবি তুলে নিয়ে ছুটলো বাইরে। বাইক চালিয়ে সে সম্ভাব্য ৩ টা ট্রাফিক আইন ভেঙে যখন সে পুলিশ স্টেশনে ঢুকলো, তখন সাইবার টিম ব্যস্ত সন্দেহভাজন কিছু নাম্বারের অবস্থান ট্রেস করতে। ঘুমহীন নেওয়াজ কড়া এক মগ কফি নিয়ে একটা রিপোর্ট দেখছে। জায়দানকে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে দেখে বেজায় অবাক হলো সে।
“জায়দান তুই…”
“গাজীপুর এরিয়া। এই ওয়াইফাই নেম কোন এলাকার? ফোন কর, জলদি!”
নেওয়াজের মুখের উপর একটা কাগজ রীতিমত ঠেসে দিলো জায়দান। হতচকিত হয়ে গেলো নেওয়াজ। তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করা হলো থানাগুলোর সঙ্গে। শুধুমাত্র দুটো স্থানে মিল পাওয়া গেলো। সকল তথ্য পেয়ে নেওয়াজ জায়দানকে বলল,
“আমরা এক্ষুণি সার্চ টিম পাঠাচ্ছি। তুই চিন্তা করিস না।”
নেওয়াজ সমাপ্ত করার সঙ্গে সঙ্গে হতবাক করা একটি ব্যাপার ঘটলো। জায়দানের ক্ষীপ্র হাত এগিয়ে এলো, নেওয়াজের হোলস্টার থেকে সে বের করে নিলো রিভল*ভার! অনেক রাত, স্টেশনেও খুব বেশি মানুষ নেই। হাতে গোণা যে কয়জন রয়েছে, তারা বিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলো। বেপরোয়া জায়দান একটুও অপেক্ষা করলোনা। ম্যাগাজিন খুলে বু*লেট আছে নিশ্চিত হয়ে নিজের কোমরে গুঁজে জ্যাকেট দিয়ে ঢেকে নিলো।
“জায়দান!”
হাহাকার করে উঠল নেওয়াজ। তবে বন্ধুর কথায় ভ্রুক্ষেপই করলোনা প্রফেসর। লম্বা পা ফেলে এগোলো হনহন করে। ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলো বাইরে। পিছনে তখন তিনজন ফোর্স নিয়ে ছুটে এলো নেওয়াজ। জায়দান নিজের পার্ক করে রাখা বাইকের দিকে এগোচ্ছে। পিছন থেকে ডাক দিলো নেওয়াজ,
“তুই একজন সম্মানীয় শিক্ষক মানুষ, জায়দান। আইন নিজের হাতে তুলে নিস না!”
ভ্রুক্ষেপ অবধি করলোনা জায়দান। বাইকের হেলমেট মাথায় পড়লো। গ্লাভস ঠিকঠাক করে শেষ একবার তাকালো নেওয়াজের দিকে। তার অমিত কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো,
“প্রফেসর আমি আমার স্টুডেন্টদের জন্য। বাট ফর মাই ওয়াইফ, আই ক্যান বি আ বন্য!”
ক্ষণিকের জন্য সম্পূর্ণ জমে গেলো নেওয়াজ। নিজের বন্ধুর এমন অস্বাভাবিক রূপ সহ্য করতে পারলোনা। জায়দান চেপে বসলো নিজের ডুকাটিতে। ইঞ্জিনের মারাত্মক আওয়াজ রাতের নীরবতা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিলো। চাকার কর্কশ আর্তনাদ তুলে বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে গেলো জায়দানের বাইক, সড়ক ধরে ছুটে গেলো বায়ুর গতিতে। থ হয়ে থাকলো নেওয়াজ, যেন প্রতিক্রিয়া করাও ভুলে গিয়েছে।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৩
“স্যার, আমরা কি করবো?”
পিছন থেকে একজনের কথায় সম্বিৎ অবশেষে ফিরে পেলো নেওয়াজ। দ্রুতকন্ঠে আদেশ করলো,
“জ্বীপ রেডি কর। উই উইল ফলো হিম।”
