সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৭ (২)
জাবিন ফোরকান
কেরানীগঞ্জ কারাগার।
সড়কের পাশে এসে থামলো সাবিনের রেঞ্জ রোভার। গাড়ির দরজা খুলে যেতেই ভেতর থেকে জারিনকে আস্তে করে নিচে নামিয়ে দিলো মীরা। সাবিন ড্রাইভিং সিট থেকে বেরিয়ে এলো। নিজের মেয়ের কাছে এসে ভেতরে বসা মীরার দিকে উঁকি দিলো। সময় ক্ষেপন না করে মীরা টিফিন বক্সের ব্যাগ সাবিনের হাতে ধরিয়ে দিলো। সেটা নিয়ে সাবিন প্রশ্ন করলো,
“তুই সত্যিই ভেতরে আসবি না?”
“না। একবার তো বলেছি। বারবার একই প্রশ্ন কেন করিস?”
“তুই প্রতিবার রান্না করে নিয়ে আসিস। গাড়ির ভেতর বসে থাকিস। ভেতরে যাস না। এটা কেমন আচরণ?”
উত্তর দিলোনা মীরা। সাবিন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মীরার কাঁধে একটি হাত রেখে বলল,
“আর কত মীরা? ওর কি তোকে দেখতে ইচ্ছা হয়না? আমি জানি। তুইও ভালো নেই। আর কতদিন নিজেকে এভাবে শাস্তি দিবি?”
মীরার ঠোঁটে মলিন এক হাসি ছুঁয়ে গেলো। মাথা ঝাঁকিয়ে সে উত্তর করলো,
“সাবিন, যা ভেতরে যা।”
এরপর আর বলার কিছু থাকেনা। সাবিনও কিছু বলতে পারলোনা। মীরার কাঁধ সামান্য ঝাঁকিয়ে দিয়ে গাড়ির দরজা আটকে সরে এলো। এক হাতে জারিনের হাত ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করলো।
কম্পাউন্ডের ভেতরে আসতেই জেল সুপারকে চোখে পড়ল। এই বান্দা সাবিনের পরিচিত। তাকে দেখে বিস্তৃত হাসি মেখে ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“মিসেস হুসেইন আরেফিন, এসে পড়েছেন দেখছি। ভালো আছেন?”
“জি। আপনাদের দোয়ায় দিনকাল ভালো যাচ্ছে।”
“সেই তো। আপনাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সপ্তাহে একবার চর্চা না হলে তো মনে হয় আপনার জীবনটাই বৃথা।”
সাবিন হালকা হাসলো। কথোপকথনের মাঝে মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই জারিন গুটিগুটি পায়ে কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে করিডোর ধরে ছুটতে শুরু করলো। আশেপাশে থাকা পুলিশ সদস্যগণ ফিরে ফিরে দেখলো ছোট্ট একটি ফুটফুটে শিশুকন্যা নিজের ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হেলতে দুলতে দৌঁড়ে যাচ্ছে কোনো এক নাড়ির টানে। সাবিন পিছন থেকে ডেকে উঠল তৎক্ষণাৎ,
“মামণি, দাঁড়াও! মাম্মাম আসছি!”
দ্রুত জেল সুপারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাবিনও ছুট দিলো। জারিন ততক্ষণে স্থানমত পৌঁছে গিয়েছে। আগেও বেশ কয়েকবার আসায় এখানকার পথ তার পরিচিত। গুটিকতক কয়েদী রয়েছে, এদিক সেদিক বিভিন্ন কাজে লিপ্ত তারা। কেউ করিডোরে সাজানো টবে পানি দিচ্ছে। কয়েকজন আবার কম্পাউন্ডের ভেতরে করা বাগানে হওয়া আগাছা তুলছে। জারিন ছুটতে ছুটতে দুহাত নেড়ে চেনা মুখগুলোকে চিৎকার করে বললো,
“আততালামু আলাইকুম আংকেললা! জা-ইন তলে এতেতে, বালো আতেন?”
জারিনের মতন ছোট্ট শিশুর কাছ থেকে এমন আদুরে আবেদনে সবার মুখেই কোমলতা নেমে এলো। স্নেহ নিয়ে তাকালো প্রত্যেকে। জারিন ছুটতে ছুটতে নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে এসে পড়তেই দুজন পুলিশের মুখোমুখি হলো। তাকে দেখেই একজন ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“এই বাচ্চাটা কে?”
প্রশ্নটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে জারিন ঘুরে চেয়ে বলে উঠলো,
“জা-ইন আলেপিন। ডতার অব জায়লান আলেপিন!”
পুলিশ দুজন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। এমন মুহূর্তেই সাবিন এসে পড়ল। খপাৎ করে মেয়ের হাত ধরে ফেলে সে নরম গলায় শাসালো,
“বারণ করেছি না মাম্মামের হাত ছাড়িয়ে কোথাও যেতে? কথা শোনো না কেনো আমার?”
“তলি মাম্মাম, আমি তাত্তুর কাতে দাততিলাম।”
“হ্যাঁ। নিয়ে যাচ্ছি তো আমি। প্রমিস করো, এভাবে আর কক্ষনো ছুটবে না।”
“পমিশ!”
মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে শেষমেষ সাবিন এগোলো। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা তার নাম, পরিচয়, তারিখ ইত্যাদি নোট করে রাখলো। সঙ্গে আনা খাবার এবং টুকিটাকি জিনিসপত্র ভালোমত পরীক্ষা করে ফেরত দেয়ার পরেই সাবিন ভেতরে প্রবেশের ছাড়পত্র পেলো।
কেরানীগঞ্জ জেলের সাক্ষাৎকার ঘরটা মাঝারি। দুটো ভাগ করা মাঝ বরাবর। দুইদিকেই বসার জন্য মুখোমুখি চেয়ার। মাঝে লোহার গ্রিল দিয়ে পৃথক করে রাখা। সাবিন গিয়ে চেয়ারে বসলো। মেয়েকে তুলে টেবিলের উপর বসিয়ে দিলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ওপাশ থেকে একজন পুলিশ নিয়ে এলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে।
গ্রিলের ওপাশে দেখা মিললো আয়দানের। পরিধানে শুভ্র ফতুয়া এবং পায়জামা। বুকের দিকটায় জেল কর্তৃপক্ষের লোগো। সাবিন গভীর দৃষ্টিতে দেখলো। কতগুলো বছর পেরিয়ে এই ছেলেটা ঠিক কতখানি বদলে গিয়েছে! সেই তেজ, সেই অহংকার, সেই দেমাগের ছিটেফোঁটাও নেই এই পুরুষটির মাঝে। নির্মল এক প্রশান্তি তার অবয়বজুড়ে। ঘন কালো ঝাঁকড়া চুলের পাশাপাশি দাড়ি গজিয়েছে চোয়ালে। জেলখানায় থাকলেও নিজেকে বেশ সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখেছে সে। আগের আয়দানের মাঝে তপ্ত এক সৌন্দর্য ছিল, এই আয়দানের মাঝে রয়েছে শান্ত পুরুষত্ব। সৌন্দর্যটাও প্রকাশিত হচ্ছে অন্যভাবে। বাদামী দৃষ্টিতে অদ্ভুতুড়ে এক জ্যোতি।
আয়দান গ্রিলের ওপাশের চেয়ারে এসে বসলো। পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছে। সাবিন কিছুই বলতে পারলোনা। এর আগেই জারিন লাফিয়ে উঠলো,
“তাত্তু!”
আয়দানের সমস্ত চেহারায় দারুণ এক ঔজ্জ্বল্য ফুটে উঠল। গ্রিলের ভেতর থেকে হাত গলিয়ে সে জারিনের ছোট্ট হাত দুখানা ধরে নিজের কপালে ঠেকালো।
“আসসালামু আলাইকুম, মা।”
“ওয়াতালাইকুম তালাম!”
মুচকি হাসলো আয়দান। জারিনের একটি হাত নিজের ঠোঁটে ছুঁয়ে শুধরে দিলো,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
“ওয়া তাতালাইকুম তালাম!”
এবার আর শুধরে দিলোনা আয়দান। বরং জারিনের নরম গাল দুটো সামান্য চেপে দিয়ে বললো,
“আমার মা টা কেমন আছে?”
“কুব বালো। দানো তাত্তু? জা-ইন ইংলেজি লাইম তিকতে।”
“রাইম?”
“হু। তোমাকে তুনাই। তুইংকেল তুইংকেল লিতল স্টাল…”
জারিনের হাজার কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো আয়দান। এর মাঝেই পকেট থেকে একটা বইয়ের ছিঁড়া কাগজ বের করে নিলো সে। সাবিন নিঃশব্দে দেখলো নিজের সন্তান এবং দেবরের মধ্যকার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। আয়দান জারিনের আধো আধো বুলিতে ছড়া শুনতে শুনতে কাগজ দিয়ে একটা তারা বানালো। সেটা জারিনকে উপহার দিতেই ভীষণ খুশি হয়ে রীতিমত লাফাতে লাফাতে সেই তারাটা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো জারিন। বিরাট এক আবিষ্কার পেয়েছে সে।
অবশেষে সাবিনের দিকে ফিরল আয়দান।
“ভাইয়া কেমন আছে?”
একটি নিঃশ্বাস ফেলে সাবিন সোজা হয়ে বসলো।
“আগের মতোই। না উন্নতি, না অবনতি।”
প্রায় চারটা বছর পেরিয়ে গেলেও আয়দানের সঙ্গে পুরোপুরি সহজ হয়ে উঠতে পারেনি সাবিন। কেন, সেটা নিজেও জানেনা। তাদের অতীত সম্পর্কটা এমনি ঝাঁঝালো ছিলো যে একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলতে দুজনেরই যেন বাঁধে। আয়দানও কেমন যেন কথা হারিয়ে ফেলে। সাবিন নিয়মিত দেখা করতে এলেও তাদের মাঝে জায়দানকে ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে বিশেষ কথাবার্তা হয়না।
“তুই ভালো আছিস?”
সাবিন প্রশ্ন করলো। আয়দান মাথা দোলালো,
“সৃষ্টিকর্তা আমাকে যতটা ভালো রাখা সম্ভব ততটাই রেখেছেন। লাইব্রেরিতে কাজ পেয়েছি এবার, সময়টা একদম দারুণ কাটছে।”
ভ্রু কুঁচকে ফেললো সাবিন।
“তোর সঙ্গে যতবারই কথা বলি না কেনো, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনা আমার মুখোমুখি বসে থাকা মানুষটা আসলেই তুই।”
মিষ্টি করে হাসলো আয়দান। সে সাবিনের দিকে চেয়ে নেই। তার গোটা মনোযোগ নিজের ভাতিজির দিকে, যে এখন তার বানিয়ে দেয়া কাগজের তারাটা নিয়ে উৎসাহে মেতে আছে।
“বিশ্বাস করবি কিভাবে? তুই তো একটা মাথামোটা।”
আয়দানের এমন মন্তব্যে কেঁপে উঠলো সাবিন। ঠোঁট ফুলিয়ে পুরাতন ক্রোধ নিয়ে বললো,
“আর তুই তো খুব বোঝদার তাইনা? ওরে আমার বুঝের পাহাড় পর্বত রে!”
“এই খবরদার, খোটা দিবিনা। ক্যারেকটার বদলালেও আমি সেই আয়দানই। বলেছিলাম না, দুনিয়ায় সবকিছু উলোট পালট হয়ে গেলেও তোর সঙ্গে আমি কখনো আপোষ করব না!”
“আমার মেয়েকে ধরছিস কেন তাহলে?”
“ইশ! বললেই হলো? ও আমার মা! তোর একার নাকি? ভাইয়ারও ভাগ আছে। ভাইয়ার ভাগ মানে আমার ভাগ।”
“তোকে দেখলেই মনটা চায় গলা টিপে উপরে পাঠিয়ে দেই।”
“দিতে পারিস। সেক্ষেত্রে আল্লাহ তোর কাছেই হিসাব চাইবে। জাহান্নামে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
“তোকে জেলের মানুষগুলো কিভাবে সহ্য করে? আমি হলে প্রথম দিনই তোকে টয়লেটে বেঁধে রেখে চাবি কমোডে ফ্লাশ করে দিতাম।”
“তোকে দিয়েই সেই চাবি কমোড থেকে আমি তুলিয়ে নিতাম।”
“বস্তাপঁচা জ্ঞানের ভান্ডার কোথাকার!”
“বদমেজাজি বদনা কোথাকার!”
“পোকায় খাওয়া বইয়ের পৃষ্ঠা কোথাকার!”
“নষ্ট ব্লেন্ডার মেশিন কোথাকার!”
আয়দান ভেবেছিল প্রতিবারের মতো সাবিন তর্ক বিতর্ক জারি রাখবে। অথচ পুরাতন নামটায় সম্বোধন করার পরপরই একদম হঠাৎ করে সাবিন চুপ করে গেলো। গ্রিলের ওপাশে টেবিলের উপর রমণীর দুহাত শক্তভাবে মুঠো পাকিয়ে গেলো। ঝুঁকে এলো সে। রীতিমত ফিসফিস করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“আর কতদিন অন্যের অপরাধের ঘানি নিজের কাঁধে চেপে টানবি? আর কত দিন? আর কত মাস? আর কত বছর?”
ক্ষণিকের জন্য জমে গেলো আয়দান। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে দ্রুত আশেপাশে তাকালো। পুলিশ সদস্যরা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ফিসফিস করে বলায় তারা তেমন শুনতে পায়নি, বিশেষ মনোযোগ নেই। ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে একটি হাত গলিয়ে সাবিনের মুখের একপাশ ছুঁয়ে দিয়ে জোর করে তাকে নিজের দিকে ঘোরালো আয়দান। বরাবর সাবিনের চোখের দিকে তাকালো সে, তীক্ষ্ণ বাদামী নয়নে চেয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বললো,
“আমি আমার কর্মফল ভোগ করছি।”
সাবিন জোরে জোরে মাথা নাড়তে চাইলেও আয়দান জোর করে তাকে ধরে রাখলো। দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করলো,
“একদম চোখ সরাবি না। আমার দিকে তাকা। ওদেরকে আমি খু*ন করেছি, সাবিন। বল, কে খু*ন করেছে ওদের?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো সাবিন। দুহাতে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো মাঝখানের গ্রিল। তাকে ছাড়লোনা আয়দান। ব্যথাদায়ক পর্যায়ে পৌঁছালো তার হাতের আঙুলের বাঁধন, সাবিনের চোয়ালজুড়ে গেঁথে আছে তা। ঝাঁঝালো কর্কশ কণ্ঠে আয়দান আবারো শুধালো,
“বল সাবিন। কে খু*ন করেছে ওদের?”
“আ…”
“সাবিন! কে খু*ন করেছে আহান আর ওর বাপকে?”
“তুই।”
অবশেষে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলো সাবিন। উঁহু, জবাব দিতে বাধ্য হলো। আয়দানের ঠোঁটে হাসি ফুটলো এবার। হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে এলো,
“গুড গার্ল।”
একজন পুলিশ এগিয়ে আসতেই আয়দান দ্রুত সাবিনকে ছেড়ে দিলো। সাবিন নিজেও মুখে হাত বুলিয়ে অভিব্যক্তি লুকিয়ে ফেললো মুহূর্তেই।
“আর দুই মিনিট সময় আছে।”
পুলিশ সদস্য জানাতেই মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ালো সাবিন। সঙ্গে নিয়ে আসা টিফিন বক্সের ব্যাগটা গ্রিলের ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঠেলে দিয়ে বললো,
“তোর জন্য খাবার। আজকের মধ্যেই খেয়ে নিস। কালকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।”
প্রতিবারের মতোই মোলায়েম হেসে বক্সটা গ্রহণ করে নিলো আয়দান। অতঃপর জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকালো সাবিনের দিকে।
“ও গাড়িতে বসে আছে, তাইনা?”
একটি ঢোক গিলে দৃষ্টি লুকিয়ে ফেললো সাবিন। কোনো উত্তর করতে পারলোনা। আয়দানও এর বেশি কিছু বললোনা। জারিনকে আদর করে দিলো। বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে বুঝতে পেরে ততক্ষণে গ্রিল আঁকড়ে ধরেছে জারিন।
“তাত্তু! তাত্তু দাবো না!”
“মা। এইতো, আর কিছুদিন। খুব তাড়াতাড়ি আবার আমার তোমার সাথে দেখা হবে। আমি তোমার জন্য আরও অনেকগুলো স্টার বানিয়ে রাখবো, ঠিক আছে?”
ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় জারিন শেষমেষ সম্মতি জানালো,
“আততা। জা-ইনও তাত্তুর দন্য কিতু নিয়ে আতবে।”
“কি আনবে আমার মা?”
“তালপ্লাইদ!”
“ওলে বাবা লে, সারপ্রাইজ? ঠিক আছে। চাচ্চু দিন গোণা শুরু করলো, তোমার সারপ্রাইজের অপেক্ষায়।”
সাবিন মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। পুলিশ সদস্য এলো আয়দানকে নিয়ে যেতে। মেয়ের হাত তুলে ধরে সাবিন বললো,
“চাচ্চুকে টাটা দাও?”
“তাতা তাত্তু! আলা বিউ! উম্মাহ!”
একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিলো জারিন। পুলিশের সঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে এক হাতে ক্যাচ ধরার ভঙ্গি করে সেটা পাকড়াও করেছে এমন ভাব দেখিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরলো আয়দান। বিস্তৃত হাসলো। সাবিন মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেলো দৃশ্যটি ঘোলাটে দৃষ্টিতে, যতক্ষণ না আয়দানের অবয়ব তার চোখের আড়ালে চলে যায়।
মীরা গাড়ির ভেতর বসে থাকতে থাকতে শেষমেষ বাইরে এসে দাঁড়ালো। হেলান দিয়ে দূরের আকাশের মাঝে দৃষ্টি ফেলে নিজের কল্পনার জগতে বিচরণ করছে সে। কেন যায়নি সে আয়দানের কাছে? আর কত বছর খেলবে সে এই লুকোচুরি খেলা? তার কি অভিমান হয়েছে? ওই মানুষটা এত সহজে সবকিছু ছেড়ে দিলো? একবারও তার কথা ভাবলো না? এই বিরাট পৃথিবীতে এভাবে একা ছেড়ে দিতে পারলো সে মীরাকে? মানুষটা তো বরাবর এমনই করে এসেছে। সে কি আদৌ কারো পরোয়া করে?
মীরা নিজের অন্তরকে বুঝ দিতে চাইলেও সে খুব ভালোমত জানে, তার কারাগারের ভেতরে না যেতে চাওয়ার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষটাকে সে লোহার গরাদের ওপাশে দেখতে পারবেনা। তার শরীরে জড়ানো কয়েদীদের পোশাক দেখার আগে মীরা নাহয় নিজের দূরত্বকেও শ্রেয় মনে করবে।
মীরা কতক্ষণ নিজের ভাবনায় ডুবে ছিলো জানেনা। হঠাৎ করে তার পাশে এসে এখন দাঁড়ানোয় তার চিন্তায় ছেদ পড়ল। ঘুরে তাকিয়ে সে দেখলো মিসিরকে।
“আজ এতটা জ্যাম ছিলো যে মাঝপথে আটকে গেলাম। সাবিন নিশ্চয়ই ভেতরে চলে গিয়েছে?”
“হুম।”
“আজ তাহলে আর আমার দেখা হলোনা।”
মিসির একটি নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর আবার মীরার দিকে ঘুরে তাকালো।
“সোশ্যাল মিডিয়ার খবর রেখেছ?”
মীরা সায় জানালো।
“জি। রাখা হচ্ছে। আরিয়ান হান্নানের মানহানির মামলার কথা বলছেন নিশ্চয়ই?”
“হ্যাঁ। আরও একবার সাবিন হুসেইন আলোচনা সমালোচনার শীর্ষস্থান দখল করে ফেললো।”
“যাদের যা ইচ্ছা করতে দিন। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ চলবে না। মানুষের কাজই হলো বিচার করা।”
“সাবিন পরিস্থিতি আরেকটু বোঝদার হয়ে সামাল দিতে পারতো। অন্তত আমাকে ইন্টারফেয়ার করতে দিলে হতো।”
মীরা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো মিসিরের দিকে।
“আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? সাবিন ভুল?”
“ভুল বলছি না। তবে ও এখন একজন সি ই ও। এই ব্যাপারটা একটু মাথায় রাখা দরকার। আবু কাশিম বলছিল, হুসেইন গ্রুপের লস হয়ে যাচ্ছে বিরাট।”
“স্বামীর মর্যাদার সামনে নিশ্চয়ই লস কোনো বড় বিষয় নয়, তাইনা?”
মিসির এবার চুপ করে গেলো। আর কিছুই বলতে পারলোনা। মীরা পুনরায় দিগন্তের দিকে তাকালো। দীর্ঘ একটা সময় নিশ্চুপ থেকে তারপর বললো,
“আমাদের সমাজে একটি বিশেষ প্রোপাগান্ডা প্রচলিত আছে, জানেন?”
“কেমন প্রোপাগান্ডা?”
মীরার দিকে অবাক হয়ে তাকালো মিসির। জ্বলজ্বলে সূর্যের আভা প্রতিফলিত হয়ে চলেছে রমণীর স্বচ্ছ হরিণী চোখে।
“এটাই যে ছেলেদের মতন করে মেয়েরা কখনো ভালোবাসতে পারেনা। একটি ছেলে ভালোবাসা বুকে আগলে রেখে বছর বছর পার করে দিতে পারে, কিন্তু একটা মেয়ে সেটা পারেনা।”
মিসির ভ্রু তুলে ব্যক্ত করলো,
“ক্ষেত্রবিশেষে বিষয়টি আংশিক সত্যি। ছেলেরা সাধারণত স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বাধীন থাকে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে সক্ষম। মেয়েদের বেলায় অনেকটাই নির্ভর করে তার আশেপাশের পরিবেশ এবং পরিবারের উপর।”
“ঠিক বলেছেন। সেসব ভেবে যখন একটা মেয়ে জীবনে মানিয়ে নিতে চায়, তখন মেয়েটা জগতের কাছে হয়ে যায় বেঈমান। অপরদিকে ছেলেটি হয়ে দাঁড়ায় মহৎ প্রেমিক।”
মীরার ঠোঁটে কোমল এক হাসি ফুটলো। সে বলে গেলো,
“অথচ সবকিছুরই ব্যতিক্রম আছে।”
“ব্যতিক্রম?”
“সাবিন। সমাজের চোখে বেয়াদব, উশৃঙ্খল এবং দেমাগী মেয়েটি। অথচ দেখুন না, এক ভালোবাসার দহনে সে আজও ধিকিধিকি করে জ্বলছে।”
মিসিরের চেহারা কোমল হয়ে উঠলো।
“রাইট। শি ইজ….শি ক্যান নট বি ডিফাইন্ড।”
“অমতে বিয়ে হলো। জাহান্নাম তুল্য সংসারে জীবন ধ্বংস হলো। ডিভোর্স হলো, দূরত্ব এলো। অথচ সাবিন জায়দান নামক মানুষটিকে ছাড়তে পারলোনা। সমাপ্তির ওপাড়ে গিয়েও সে ওই একই মানুষের মায়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রইলো। সুখ এলো, বারবার সেই সুখ ছলনা দেখিয়ে ধ্বসে পড়লো। অথচ সে মানুষটার হাত ছাড়লোনা। দিন পেরোলো, মাস পেরোলো, বছর পেরোলো। মানুষটা শয্যাশায়ী হলো। অথচ আজও মেয়েটা তার বিছানার পাশে একটুখানি আশ্রয় খুঁজে বেঁচে আছে। এমন আত্মোৎসর্গকে কি নামে সংজ্ঞায়িত করা যায়?”
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৭
মিসির দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকলো। অতঃপর মুখ ফুটে বললো,
“হৃদয়ের বন্ধন। সমাপ্তি শুধু একটা নামমাত্র, এর ওপাড়ে বসবাস মুক্ত জীবন প্রান্তরের।”
একটু থেমে সে পুনরায় উচ্চারণ করলো,
“একজন পুরুষের ভালোবাসা আত্মনিবেদন, আর একজন নারীর ভালোবাসা—আত্মত্যাগ।”
