সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৯
জাবিন ফোরকান
এক সপ্তাহ। সাত দিন।
মাত্র সাত দিনই যথেষ্ট ছিলো পাতাল থেকে আমায় তুলে আসমানে নিয়ে ফেলতে।
স্যোশাল মিডিয়ার ভাইরালের ক্ষমতা কতটুকু সেটা আমার নিজের উপর দিয়ে না গেলে আমি কখনোই বিশ্বাস করতাম না। আমার স্পেশাল “বেয়াদব বেয়াল্লিশ” কম্বো এখন তুমুল আলোচিত – সমালোচিত বিষয়। ইউটিউবার, টিকটকার এবং সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারগণ গণহারে চ্যালেঞ্জের নামে ভিউ কামাতে আমার ব্র্যান্ড ব্যবহার করছে। তাতে আমার লাভ বই ক্ষতি তেমন কিছুই হচ্ছেনা। মানুষ হাসাহাসি, সমালোচনা করছে ঠিকই, কিন্তু তাতে আমার কি? আমার ব্যবসা হুহু করে বাড়ছে। হচ্ছে বিনা পয়সার প্রচার। তাছাড়া পজিটিভ রিভিউয়ের কল্যাণে চিত্র হুহু করে পাল্টাতে আরম্ভ করেছে। দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশনের সার্ভিস নাকি সকলের মন জয় করে নিচ্ছে। সবকিছুর প্রসার ঘটছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। এতটাই যে আমি এবং মীরা তাল সামলাতে না পেরে দুজনকে সাহায্যের জন্য রাখা সত্ত্বেও আমাদের চার জনের দলটাকেও অর্ডার এবং ডেলিভারি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মীরা এখন আর আলাদাভাবে নিজের কেইক বিজনেস করছেনা। আমাদের দুজনের বিজনেসই মিলিয়ে বড় করে একটা প্রতিষ্ঠান দেয়ার কথা ভাবছি আমরা সামনে।
গতকাল নতুন একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্কুটি ভাড়ায় নিয়েছি। আমি একা ডেলিভারি দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারিনা। আজকের জন্য দুজন ডেলিভারি ম্যান রাখা হয়েছে। মীরা সব কাজ সামলাচ্ছে। আমি এসেছি একটা খুবই জরুরী ব্যক্তিগত কাজে।
আমার ধূসর বর্ণের স্কুটি যখন প্রশস্ত এক বাংলোবাড়ির সামনের লনে ঢুকলো, তখন দুপুর তিনটে। ডিসেম্বরের শীতের সূর্য ইতোমধ্যে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তে শুরু করেছে। সাদা মারবেল পাথর সদৃশ স্থাপত্যে তৈরী বাড়ির আঙিনায় থামালাম নিজের স্কুটি। ধবধবে দেয়ালের স্বর্ণালী নেমপ্লেটে খচিত—হুসেইন নিবাস।
বাইরের দারোয়ানদের আমার মুখ চেনা বিধায় কোনো বাঁধা পেলাম না। রাজমহলের মতন দেখতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপার এক মিনিটের মাথায় দরজা খুলে গেলো। নিঃশব্দে আমন্ত্রণ জানালো কাজের সহযোগী এক মেয়ে। আমি ভেতরে ঢুকলাম। বিশাল লিভিং রুমের অভিজাত ঘ্রাণ মুহূর্তেই নাকে এসে ঠেকলো। সারাদিনের ব্যস্ততা এবং খাটাখাটনির ফলে আমার শরীর খানিক ঘর্মাক্ত – মলিন। নিজেকে বড্ড বেমানান লাগলো এই অভিজাত জগতে। ড্যাড চলে যাওয়ার পর থেকে আভিজাত্যের সঙ্গে আমার অস্তিত্বের সম্মেলন যেন যায়ই না।
কোনো কথা না বলে চুপটি করে বসে পড়লাম সোফায়। সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন এক কর্কশ, ভারিক্কি বয়স্ক মহিলার কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
“ ইশ! কিম্ভুতকিমাকার লাগছে। সোফার কভার কালকেই ওয়াশ করানো হয়েছে। ওকে রান্নাঘর থেকে কাঠের চেয়ারটা এনে দে তো করিমা….”
নিজের বড় চাচী মাসুমা আক্তারের কন্ঠ চিনতে আমাকে বেগ পোহাতে হলোনা। সটান সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম, এর পরিবর্তে টি টেবিলের উপর পা তুলে নিজের জিন্স থেকে ইচ্ছাকৃত ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে হতচকিত দাঁড়িয়ে থাকা করিমার উদ্দেশ্যে বললাম,
“ তার কোনো দরকার নেই, করিমা। আমি তো আর ষাট বছরের বুড়ি বেটি না, আমার বাতের ব্যথা নেই। আই ক্যান স্ট্যান্ড হাই অ্যান্ড টল! আনলাইক সাম, চাঁদের বুড়ি। ”
দুই তলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে থাকা মাসুমা চাচী স্পষ্টত বিব্রত হলেন স্পষ্ট খেয়াল করলাম। গোলগাল রসগোল্লার মতন শরীরটা তার টকটকে লাল হয়ে উঠলো চাপা ক্রোধে। বুড়ি আমি তাকেই ডেকেছি। কিন্তু যেহেতু আমি নাম সম্বোধন করিনি, তাই বুঝতে পারা সত্ত্বেও সেই দায় নিজের ঘাড়ে নেয়ায় অনাগ্রহী চাচী শুধু হনহন করে নিচে নেমে আসতে পারলেন। গোল কোমরে হাত ঠেকিয়ে ফোলা মুখে কট্টর চেয়ে বললেন,
“ পানি সাধার দরকার আছে? তুমি তো বাপু ওসব খাও টাও না। তোমার তো ব্র্যান্ডি না হলে আবার দিন যায়না। নবাবজাদীর ফরমায়েশ কি, শুনি? ”
বুকে দুবাহু ভাঁজ করে রেখে তীর্যক হাসলাম আমি। বেচারী করিমা দুই ট্রেনের সংঘর্ষের মাঝে ফেঁসে গিয়েছে এমন ভঙ্গিতে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“ ব্র্যান্ডি? জানতাম চাচী, তোমার টেস্ট তেমনটাই রয়ে গিয়েছে, নিচু জাত কিনা! ওল্ডেস্ট ফাইন ওয়াইন তোমার নিম্নবিত্তের গলা দিয়ে নামবে না। কি বলো তো? বস্তির পলিথিনের ঘরে তো বাংলা মদ ছাড়া কিছু পাওয়া যায়না! ”
“ সাবিন! ”
মাসুমা চাচী চেঁচিয়ে উঠে হাত তুলতে উদ্যত হলেন। আমি খিলখিল করে হেসে তার কব্জি পাকড়াও করে ফেললাম। চাপ দিয়ে ধরতেই চাচী ককিয়ে উঠলেন।
“ বানরের গলায় মুক্তার মালা পড়ালেও বানর বানরই থেকে যায়। ঠিক তেমনি, তোমার ছোটলোকি স্বভাব ছোটলোকিই থেকে গিয়েছে। এই টাকা, এই বড় ঘর আর সম্পদ তোমার ছোটলোকি মনকে বড় করতে পারেনি। ”
“ আর তুই কি? রাস্তার মেয়ে একটা! ”
“ মাসুমা! ”
পুরুষালী গম্ভীর কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো চারিপাশে। দুজনেই ঘুরে তাকালাম। সিঁড়ির গোড়ায় দন্ডায়মান ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরনে মানুষটি। মাথাভর্তি আধপাকা বাবরি চুল, চিবুকে চাপ দাড়ি।
আমার বড় চাচা, তাকবীর হুসেইন।
ধীরপায়ে, সুস্থির ভঙ্গিতে তাকবীর চাচা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি ঝট করে মাসুমা চাচীর হাত ছেড়ে দিলাম। ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলাম। চাচা নিজের স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন,
“ তোমাকে না ডাক্তার স্ট্রেস নিতে বারণ করেছে মাসুমা? যাও, ঘরে যাও, ঘুমাও। আমি আসছি, মাথায় হাত বুলিয়ে দেবো। ”
মাসুমা চাচী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার চাচাকে অতঃপর আমাকে দেখলেন।
“ বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে, ঢং যত্তসব! ”
চাচী হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। পিছনে দৌঁড়ে দৌঁড়ে গেলো করিমা। দৃশ্যপট শান্ত হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। তাকবীর চাচা সুচারু দৃষ্টিতে আমায় খানিক পর্যবেক্ষণ করলেন।
“ ভালোই বিজনেস ইউনিফর্ম বানিয়েছ দেখছি। ”
মন্তব্যটি আমার মনোযোগ কেড়ে নিলো। নিজেকেই নিজে ঘুরে ঘুরে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলাম। বিজনেস রি ওপেনিংয়ের সময় নতুন করে ইউনিফর্ম বানিয়েছি। কালো নাইলনের জ্যাকেটের পিছনে বড় বড় অক্ষরে লিখিত—দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশন, স্যাভেজ সাবিন। নিচে অন্ধকারের মাঝেও হাইলাইটিং কালারে জ্বলজ্বল করা লোগো। তাকবীর চাচাকে নিজের পিঠ দেখালাম। বাঁকা হেসে বললাম,
“ সুন্দর না? ”
চাচা কোনো মন্তব্য করলেন না আর। সুস্থির চেয়ে পরবর্তীতে জিজ্ঞেস করলেন,
“ আজ উদয় হওয়ার কারণ? আবারো টাকা লাগবে? দেখো সাবিন, আমার মনে হয় যতটুকু সম্ভব ততটুকু সাহায্য তোমায় করা হয়েছে। ”
আমার ঠোঁটের কোণের হাসিটি সামান্য ম্রিয়মাণ হলো, তবে মুছে গেলোনা। নিজের জিন্সের পকেট থেকে একটা এনভেলপ বের করলাম। সেটা টি টেবিলের উপর রেখে দিয়ে জানলাম,
“ তোমার দেয়া টাকা, উইথ ইন্টারেস্ট। আমি আর ঋণী থাকলাম না। গুণে নিও। ”
তাকবীর চাচা চোখ ঘুরিয়ে এনভেলপার দিকে তাকালেন।
“ বাহ্। মাত্র কয়েকদিনেই পুঁজি উঠে গিয়েছে? ভালোই ব্যবসা করছো তাহলে। ”
“ বিজনেসের বি আয়ত্বে একটু হলেও এসেছে বৈকি। ”
“ বিজনেসের বি এর কামাল, নাকি ভাইরালের? ”
ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলাম। চাচার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজুড়ে বয়সের ভারত্ব, সঙ্গে এক অব্যক্ত বহিঃপ্রকাশ। একটি নিঃশ্বাস ফেলে পরক্ষণে কোমরে হাত দিয়ে তাকালাম, বরাবর ওই কালো চোখের মাঝে। মাথা উঁচু করে শক্ত গলায় জানালাম,
“ হোয়াটএভার ইট ইয, দ্যা ওয়ান মেইক ইট হ্যাপেন, ইয মি, সাবিন হুসেইন। এবার আমার কৃতিত্বের কোনো ভাগ তুমি অন্য কাউকে দিতে পারবেনা, আংকেল। ”
তাকবীর চাচার ঠোঁটে সূক্ষ্ম এক হাসির রেখা ফুটলো। মাথা ঝাঁকিয়ে তিনি মোলায়েম গলায় বললেন,
“ বসো, তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমি কাউকে জুস দিতে বলছি। ”
“ ইটস ফাইন। তোমার বউয়ের খোটায় পেট ভরে গিয়েছে। তুমি শুধু আমার শেষ আরেকটা উপকার করো। ”
“ কি? ”
“ আমার একটা জায়গার প্রয়োজন। বনানীর আশেপাশে হলে ভালো হয়। কোনো রুম বা প্লেস ভাড়ায় পেলেও চলবে। ”
“ তোমার পিৎজা বিজনেসের জন্য? আর ইউ সিরিয়াস? অনলাইনের ব্যবসা এত বড় কখন হলো যে তুমি দোকানের কথা ভাবছো? এত টাকা পাবে কোথায় শুনি?”
চাচার ভ্রু জোড়ার মাঝে তীব্র কুঞ্চন পড়লো। আমি শুধু সামান্য হাসলাম।
“ সেটা আমার বোঝার বিষয়, আংকেল। তোমার জানাশোনা থাকলে জানিও, নাহলে আমি নিজের পথ নিজে খুঁজে নিতে খুব ভালো করেই জানি। আসি, আসসালামু আলাইকুম। ”
কেন যেন আর দাঁড়াতে ইচ্ছা হলোনা। উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে দরজার দিকে এগোলাম। নিজের পিঠে তাকবীর চাচার গভীর দৃষ্টিপাত স্পষ্ট অনুভব করলাম। এলোমেলো হয়ে আসা চুলের গোছা কানের পিছনে গুঁজে বাইরে পা রাখতে যাব ঠিক তখনি বাড়ির গ্যারাজে এসে থামা একটি গাড়ির উপর আমার নজর আটকে গেলো।
রেইঞ্জ রোভার, ব্ল্যাক।
আমার ড্যাডের সবথেকে পছন্দের গাড়ি। নাম্বারপ্লেট অবধি হুবহু এক।
মনে হলো বুঝি হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছে আমার। পিছনে তাকবীর চাচা এসে দাঁড়িয়েছেন, টের পেলাম। আমার দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো।
“ আমি জানতাম ড্যাডের গাড়ি ব্যাংক নিলামে তুলেছিল? ”
চাচার কন্ঠস্বর মন্থর শোনালো।
“ তুলেছিল। তাকদীরের স্মৃতিচিহ্ন হাতছাড়া করতে চাইনি। তাই কিনে এনেছি। ওটা এখন আহান ব্যবহার করে। চোখের সামনে থাকে। দেখতে ভালো লাগে। ”
জানিনা কেন, চাচার দিকে ফিরে তাকানোর মনোবাঞ্ছা আর হলোনা। সুস্থির চেয়ে রইলাম অদূরে পার্ক করা গাড়িটার দিকে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রিপড জিন্স আর হুডি পরনে সুঠাম শরীরের এক যুবক। চাচাতো ভাই আহানকে দেখার পর আর কেন যেন এই বাড়ির ত্রিসীমানায় থাকার ইচ্ছাও হলোনা। ধপাধপ পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। লনে পার্ক করে রাখা আমার ভাড়ার স্কুটিটা যখন টেনে সরিয়ে আনতে লাগলাম, তখনি পিছন থেকে আবেশিত কন্ঠস্বরটি ভেসে এলো।
“ বেবিগার্ল! ”
স্কুটির হ্যান্ডেলে চেপে বসলো আমার উভয় হাত। পিছনে ফিরে তাকালাম না। বুকের ভেতর দুরুদুরু করছে আমার। ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে এই স্থান থেকে পলায়ন করি। অথচ পারছিনা। শিকড়ের ন্যায় কিছু একটা বুঝি আমায় ভূমির সঙ্গে আবদ্ধ করে রেখেছে।
নিজের দুই কাঁধে পুরুষালী স্পর্শ টের পেলাম। তারপরই কোমর জুড়ে জড়িয়ে গেলো বাহুদ্বয়। ঘাড়ে মাথা গুঁজে গভীর প্রশ্বাস টেনে আহান বিড়বিড় করলো,
“ ইওর স্মেল, ফাকিং ইন্টক্সিকেটিং। ”
শিরশিরে তরঙ্গ খেলে গেলো শিরদাঁড়া বেয়ে। সমস্ত শরীর মোচড় দিয়ে উঠলো তীব্র ঘৃণায়। জোরালো একটা ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। গর্জে উঠলাম,
“ লজ্জা করেনা তোমার? আমার গায়ে হাত দাও কোন সাহসে আহান ভাইয়া? ”
আহানের তীক্ষ্ণ চেহারাজুড়ে এক অব্যক্ত ঝিলিক খেলে গেলো। ঝুঁকে এলো বান্দা। দুহাতের মাঝে আলতোভাবে চেপে ধরলো আমার গ্রীবাদেশ, গালে নাক ঘষে ফিসফিস করে বললো,
“ ইউ লাইক ইট, হোয়েন আই টাচ্ ইউ বেবিগার্ল, আই নো ইউ ডু! ”
“ নো! আই ডোন্ট! ”
আরেক দফায় ঝটকা দিয়ে উঠলেও এবার এত সহজে মুক্তি পেলাম না। আমার গলা খানিকটা শক্তভাবে চেপে আহান চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসলো। তিরতির করে কাঁপতে থাকা আমার ঠোঁটজোড়ায় দৃষ্টি বুলিয়ে পরক্ষণে তাতে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল চেপে জানালো,
“ রাগ করছিস কেন বেবিগার্ল? আমি জানি, তোর আজকাল আদরের বড্ড অভাব। ট্রাস্ট মি, আই স্টিল ওয়ান্ট ইওর বডি। আই ড্রিম অব দোয কার্ভস, এভরি নাইট! আই ড্রিম অব ফাকিং ইউ, অ্যাগেইন্সট দ্যা বেডরুম ওয়াল…”
“ মুখের উপর চল্লিশ লাখ টাকা ছুঁড়ে দেয়ার পরেও এমন কথাবার্তা, নিজেকে ডগ ইন হিট জাহির করতে চাইছো বুঝি, মিস্টার আহান হুসেইন? ”
আহানের চোখজুড়ে ভেসে ওঠা মাদকীয় দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে হয়ে গেলো। ঠোঁটে তীর্যক হাসি ফুটিয়ে জড়ানো কন্ঠে সে বলল,
“ তোর রাগ আজ আছে, কাল নেই আমি জানি। বছর তো পেরিয়ে গেলো, আর কত কালই বা? দিনশেষে তোকে আমার দুয়ারে আসতেই হবে বেবিগার্ল। তুই চাইলেই তোর একটা সুখের দুনিয়া হবে। তুই হবি, আমার মিস্ট্রেস। যার কাছে গিয়ে আমি গভীর রাত্রিতে সুখের আশ্রয় খুঁজবো। ট্রাই মি….”
“ ইউ আর নট সিক্স পয়েন্ট থ্রি দোও…”
এই প্রথম আহানের মাঝে পরিবর্তন দেখা গেলো। ঘোলাটে দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে তাতে তীক্ষ্ণতা ভর করলো। ঝট করে আমায় ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। ভ্রু কুঁচকে অত্যন্ত ক্রোধ নিয়ে চেয়ে বলে উঠলো,
“ হোয়াট? ”
তীর্যক হাসি ফুটলো আমার অধরে। পকেট থেকে টিস্যু বের করে এমনভাবে নিজের গ্রীবাদেশ মুছতে লাগলাম যেন ওই স্পর্শ আমায় অপবিত্র করে দিয়েছে।
“ তুমি যেটা শুনেছ আমি সেটাই বলেছি। ইউ থিংক ইউ ক্যান হ্যান্ডেল মি? দ্যান ইউ ডোন্ট নো জায়দান ইয়েট!”
নিজের চুলে আঙুল চালিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলো আহান। গালে দুটো গভীর টোল পড়লো তার। একেবারেই অপ্রয়োজনীয় সৌন্দর্য্য।
“ সিরিয়াসলি বেবিগার্ল? সত্যিই আমাকে তোর এক্সের সাথে তুলনা করলি? তুই? আসলেই তুই? ”
জবাব দিলাম না আমি। কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। আহান তাতে আবারো কাছে সরে এলো। তবে এবার আমায় স্পর্শ না করে ঝুঁকে গলা খাদে নামিয়ে বললো,
“ ইয নট হি আ জেন্টলম্যান? ইউ লাইক ব্যাড বয়য। ”
কাঁপা একটা নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। পরক্ষণে জ্বলজ্বলে গভীর দৃষ্টিতে আহানের নয়ন বরাবর চেয়ে বললাম,
“ জেন্টলম্যান? নট ইন বেড। ”
বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়লো আহানের। ডাহা মিথ্যাচার করেও মনে মনে বিজয়ীর হাসি হাসলাম আমি। সুযোগ পেয়ে দ্রুত নিজের স্কুটিতে চেপে বসলাম। ইঞ্জিন চালু করে শেষবারের মতন আহানের স্থবির মুখপানে চেয়ে জানালাম,
“ কম্পিটিশনে নামার আগে বুঝেশুনে নামা উচিৎ, তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী কে! ”
আহান বুকে দুবাহু ভাঁজ করে রেখে আমায় চলে যেতে দেখলো। আটকানোর আর কোনো লক্ষণ দেখলনা। বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে যখন বাইরের সড়কে এসে নামলাম, তখনি পিছন থেকে চাচাতো ভাইয়ের জোরালো কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“ ইন কেইস ইউ নিড মি, ইউ নো হোয়্যার টু ফাইন্ড মি বেবিগার্ল!”
“ মাদারফাকার বাস্টার্ড! ”
স্কুটির হ্যান্ডেল অপ্রয়োজনীয়ভাবে চেপে বিড়বিড় করলাম আমি। অমোঘ ক্রোধতরঙ্গ থেকে থেকে কম্পন খেলিয়ে দিলো আমার সমস্ত শরীরজুড়ে।
বিকাল সাড়ে চারটা।
বনানীর কাছাকাছি এক অভিজাত আবাসিক এলাকায় এসে থামলো আমার স্কুটি। ফোন বের করে ভালোমত পরীক্ষা করে দেখলাম। না, এই ঠিকানাই। অর্ডারের নোটে ফেসবুক আইডির নাম জ্বলজ্বল করছে।
আরওয়া এহসান।
স্কুটি পার্ক করে নামলাম আমি। পিছনের সিটে রাখা একটি লার্জ পিৎজার বক্স, মীরার নিজের হাতে তৈরী ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক এবং একটি মাঝারি সাইজের গোলাপের তোড়া। নিজের ইউনিফর্ম ঠিকঠাক করে মাথায় ক্যাপ চড়িয়ে সযত্নে জিনিসগুলো হাতে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে এগোলাম। একটি একতলা বাগানবাড়ির মতন দেখতে। আশেপাশের জায়গাজুড়ে গাছপালার অস্তিত্ব। একপাশে ফুলের বাগান, অন্যপাশে ছোট কয়েকটি কৃত্রিম ঝর্না। কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহ। বেশ রুচিশীল বলেই মনে হলো স্থানটি। গেটের দারোয়ানের কাছে ডেলিভারির জন্য এসেছি পরিচয় দিয়ে সদর দরজার দিকে হাঁটা দিলাম। ঠিক তখনি দরজা খুলে বেরিয়ে এলো এক লাস্যময়ী রমণী।
পরনে হালকা কমলা বর্ণের লং ফ্রক। অরগাঞ্জার ওড়না ঝুলছে কাঁধে। লাবণ্যময়ী মুখজুড়ে হালকা মেকআপ, ঠোঁটজুড়ে চিকচিকে গ্লস। মসৃণ চুলের গোছা নদীর ঢেউয়ের ন্যায় ছড়িয়ে রয়েছে পিঠ এবং কপালের চারিদিকে। খানিক ঝুঁকে পায়ের হিলের বেল্ট বাঁধছে। মুখটা দেখে চিনতে বেগ পোহাতে হলোনা আমার। ফেসবুক আইডিতে এই মুখেরই ছবি ছিল। অতএব এই রমণীই, আরওয়া।
নিজের পিছনে দরজা আটকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো আরওয়া। কাঁধের অরগাঞ্জা এবং স্লিং ব্যাগ ঠিকঠাক করতে করতে এগোলো সে, সামনে দন্ডায়মান আমাকে দেখেই থমকে গেলো। প্রথমটায় ভাবলাম, রমণী আমায় চিনবে না। তবে আমায় বিস্মিত করে দিয়ে তার ঠোঁটে খেলে গেল এক মোলায়েম হাসি। উষ্ণতা এবং মুগ্ধতায় ঘেরা।
“ আরে! আমার দুয়ারে আজ সেলিব্রিটি দেখছি! ”
আরওয়ার উচ্ছ্বাস বুঝি সংক্রমণ রোগ। হাসির ছোঁয়া আমার ঠোঁটকেও ছুঁয়ে গেলো। কয়েক পা এগোলাম।
“ হাই। নাইস টু ফাইনালি মিট ইউ, মাই বিলাভড কাস্টমার। ”
“ বিলাভড? ”
কৌতূহলী হয়ে আরওয়া উচ্চারণ করতেই ফুলের তোড়াটা তার হাতে দিলাম। রমণী তা গ্রহণ করে গভীর প্রশ্বাস টানলো, সুঘ্রাণে তার চোখজোড়া বুঁজে এলো।
“ আমার রি ওপেনের পর প্রথম কাস্টমার আপনি, ম্যাম। ”
আরওয়া মুচকি হেসে আমার দিকে তাকাতেই পিৎজা এবং কেকের বক্স বাড়িয়ে ধরে জানালাম,
“ তখনো আমি নিজেকে ক্লিয়ার করিনি। কেউ আমাকে বিশ্বাস করছিলো না। ইনবক্সজুড়ে শুধু মানুষের কটু কথা এবং গালাগাল। অথচ একটা মেসেজে শুধু আমার নজর নয়, অন্তর আটকে গিয়েছিল। একটা পিৎজার অর্ডার, সঙ্গে নোট –সবসময় চোখের দেখা সত্যি হয়না। ম্যাম, আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম। তাই অর্ডার নিয়ে পৌঁছাতে খানিক দেরী হয়ে গেলো। ”
রমণী আমার পানে বিমুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলো। পরক্ষণে পিৎজার বক্সটা খুলে একটা স্লাইস মুখে তুলে কামড় দিয়ে স্বাদ আস্বাদন করে ব্যক্ত করলো,
“ উম্। স্যাভেজ সাবিন শুধু নামে না, কামেও সেরা! ”
খিলখিল করে হেসে উঠলাম আমি। সঙ্গে হাসলো আরওয়াও। মেয়েটা কে আমি জানিনা। আগে কখনো দেখাও হয়নি। অথচ তার সঙ্গে মাত্র কয়েক মুহূর্তের আলাপে অদ্ভুতুড়ে এক উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছে অন্তরে। আরওয়া পিৎজা এবং কেক দারোয়ানের মাধ্যমে ঘরে পাঠিয়ে দিলো। তারপর আমার দিকে ফিরে বললো,
“ আসলে আমি খুবই দুঃখিত সাবিন। আমার আপনাকে ঘরে আমন্ত্রণ জানানোর খুব ইচ্ছা। কিন্তু আজ বিশেষ একটা কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে তাই…”
“ না না ম্যাম। ইটস ফাইন। আমারও এমনিতে ফিরতে হবে, কাজ বাকি প্রচুর। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পেরেই খুশি। ঘরে নাহয় আরেকদিন বসবো। ”
“ অবশ্যই। আমি কিন্তু এখন থেকে আপনার রেগুলার কাস্টমার! আপনার বিলটা…”
“ না ম্যাম, প্লীজ। আমি তো আগেই বললাম, আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। গিফট ধরে নিন। বিল নাহয় পরের অর্ডারে নেয়া যাবে। ”
দুজন কথা বলতে বলতে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে গেটের বাইরে এলাম। ঠিক তখনি বুঝি আমার ভাগ্যাকাশে ঘূর্ণিঝড়ের গুমোট ছায়ার দেখা পেলাম। হাসিমাখা অধর থেকে মুহূর্তেই হাসি মুছে গেলো আমার। স্থির দাঁড়িয়ে পড়লাম। পদযুগল বিদ্রোহ ঘোষণা করলো, তাদের আর নড়ার সক্ষমতা নেই।
গেটের বাইরে সড়কের ধার ঘেঁষে পার্ক করা বি এম ডব্লিউ। ভেতরে ড্রাইভার রয়েছে। বাইরে গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দন্ডায়মান ছ ফুট সাড়ে তিনের বাদামী সমুদ্র।
জায়দান আরেফিন।
পরিধানে ক্যাজুয়াল উইন্টার শার্ট, আইভোরি ফরমাল এবং শ্যানেল রেডবুট। চোখের চশমার অন্তরালে দৃষ্টি আবদ্ধ দিগন্তের পানে। যেখানে সূর্য অস্ত যাওয়ার আয়োজন সাজাচ্ছে। হালকা বাতাসে কপালের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। অনন্য এক আভা যেন ঘিরে রেখেছে সমুদ্রতুল্য স্থির অবয়বটিকে।
আরওয়া দুই কদম এগিয়ে গেলো। অতঃপর মোলায়েম কন্ঠে আমায় এমন এক সংবাদ জানালো যে সংবাদ কোনোদিন না শুনলেই বোধ আমি সবচেয়ে খুশি হতাম।
“ মাই উড বি ফিয়ন্সে…ওনার সাথেই ডেট ছিল আজ।”
আওয়াজ মৃদু হলেও জায়দান বোধ হয় অদূর থেকেও শুনতে পেলো। তাই মাথা সামান্য হেলিয়ে ফিরে তাকালো। ওই নিগূঢ় বাদামী সাগরমাঝে মিলিত হলো আমার অবরুদ্ধ জ্বলজ্বলে দৃষ্টি।
জীবনে প্রথমবারের মতন আমি জায়দানের নির্লিপ্ত চেহারায় বিস্ময়ের ছোঁয়া দেখলাম। হয়ত অতি সামান্য, কিংবা আদতে বিস্ময়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। সবটাই আমার কল্পনা।
শনশনে বাতাস খেলে গেলো। উড়িয়ে নিলো আমার চুল। চোখের ভেতর লেগে তা যাতনার জ্বলন ছড়িয়ে দিলো। অথচ আমি নিষ্পলক।
আরওয়া বেশ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো। জায়দানের স্থবির অবয়বের সামনে দাঁড়াতেই বোধ হয় ঘোর থেকে বেরোলো লোকটি। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবার দেখলাম। তার অপর হাতে রিবনে মোড়া চকলেট বক্স এবং টেডি বিয়ার। আরওয়ার ভ্রু উঁচু হলো, মহা উৎসাহে সে জিনিসগুলো নিয়ে বলল,
“ ওয়াও! আমার জন্য? থ্যাংকস আ লট! ”
জায়দান সূক্ষ্মভাবে মাথা দুলিয়ে পুনরায় দৃষ্টি ঘুরিয়ে চাইলো আমার দিকে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে আরওয়া বলে উঠলো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৮
“ ওহ! নিশ্চয়ই চিনতে পারছেন? দ্যা ভাইরাল গার্ল, সাবিন। আর সাবিন উনি….”
বুঝলাম না কিসের টান অনুভব করলাম। কয়েক কদম দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেললাম। মুখোমুখি দাঁড়ালাম প্রাক্তনের। টলটলে অনুভূতি ঘেরা নয়ন এবং ঠোঁটে পরিহাসের হাসি নিয়ে আরওয়া সমাপ্ত করার আগেই বলে বসলাম,
“ নাইস টু মিট ইউ…মিস্টার আরেফিন। ”
