Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে বিশেষ পর্ব

সমাপ্তির ওপাড়ে বিশেষ পর্ব

সমাপ্তির ওপাড়ে বিশেষ পর্ব
জাবিন ফোরকান

সাবিন এবং জায়দানের ডিভোর্সের কয়েক মাস পূর্বে:-
কাউন্টারের উপর স্যানিটারি প্যাড, ট্যাম্পন এবং মেন্সট্রুয়াল কাপের প্যাকেট লক্ষ্য করে ক্যাশিয়ার খানিকটা বিস্মিত হলো। এমন নয় যে জিনিসগুলো আগে কখনো সুপারশপ থেকে কেনাকাটা হয়নি। বরং এজন্য যে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতা একজন পুরুষ। এমন চিত্র আধুনিক রাজধানীতেও দূর্লভ বটে।
ক্যাশিয়ার জিনিসগুলো সুন্দর মতন কাগজের মোড়কে মুড়িয়ে প্যাকেট করতে করতে কাউন্টারের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জায়দান নিজের ফরমাল প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালো। তার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। ড্যাবড্যাব চোখ মেলে খানিক বিতর্কিত দৃষ্টিতে কাউন্টারের উপরের জিনিসগুলো দেখছে সে।
জায়দান মাথা কাত করে মহিলার দিকে তাকালো। শান্ত কন্ঠে শুধাল,

“কোনো সমস্যা, ম্যাম?”
ধরা পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে মহিলা দ্রুতই সামান্য হেসে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও আড়চোখে ক্ষণে ক্ষণে দেখতে লাগল জায়দানকে। তাতে অবশ্য বিশেষ কিছু আসে যায়না অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর সাহেবের।
“আর কোনো কিছু লাগবে, স্যার?”
ক্যাশিয়ার বিল স্ক্যান করতে করতে জায়দান হঠাৎ মাথায় এসেছে এমন ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“ওহ, রাইট। ওয়েট আ সেক…”
দ্রুত লম্বা পা ফেলে সুপার শপের আইলের আড়ালে চলে গেল জায়দান। ভীষণ লম্বা হওয়ার দরুণ আইলের অপর প্রান্তে তার মাথার খানিকটা অংশ চোখে পড়ছে। কিছু সেকেন্ডের মাঝেই ফিরে এলো সে। হাতে এক বক্স চকলেট এবং প্রিঙ্গেলস। ক্যাশিয়ার সবগুলো স্ক্যান করে প্যাকেট করে দিতেই পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল জায়দান।
“ধন্যবাদ স্যার, আবার আসবেন।”
পেমেন্ট ক্লিয়ার হতেই ক্যাশিয়ারের প্রতি হালকা মাথা নেড়ে প্যাকেট হাতে নিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলো জায়দান। এসির বাতাস ছেড়ে সড়কে পা রাখতেই ভ্যাপসা গরমের ঝাঁপটা এসে লাগল তার চোখেমুখে। সবকিছু উপেক্ষা করে জলদি এগোলো সে। দীর্ঘ পদযুগল এগিয়ে কিছু মুহূর্তের মাঝেই সুপার শপের বিপরীত দিকের সড়কে অবস্থানরত অভিজাত রেস্তোরাঁয় গিয়ে পৌঁছাল সে।

পারিবারিক ডিনারে জাফর, জেসমিন, কয়েকজন ব্যবসায়িক সহযোগী এবং শ্বশুড় তাকদীর হুসেইনের সঙ্গে এই রেস্তোরাঁয় এসেছিল সে এবং সাবিন। এর মাঝেই এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে ভাবেনি কেউ।
অদূরে, রিজার্ভ টেবিলে সকলে বসে আছে। ব্যবসায়িক আলাপ করছে কোনো। জায়দান টেবিল পেরিয়ে রেস্টরুমের দিকে এগোলো। লেডিস ওয়াশরুমের সামনে আসতেই দুজন মহিলাকে লক্ষ্য করে খানিক গলা খাঁকারি দিলো সে।
“এক্সকিউজ মি। কিছু মনে না করলে এগুলো একটু আমার ওয়াইফকে দেবেন? ও ভেতরেই আছে।”
একজন মেয়ে সাগ্রহে তার হাত থেকে প্যাকেট নিয়ে ভেতরে চলে গেল। জায়দান বাইরে এসে প্রবেশপথ থেকে খানিকটা সম্মানসূচক দূরত্ব রেখে দাঁড়াল। দেয়ালে হেলান দিয়ে ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে। চশমার লেন্সের আড়াল থেকে চেয়ে দেখল চারপাশ।
কিছুক্ষণ বাদে রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে এলো সাবিন। সোনালী বর্ণের মারমেইড বডিকোণ গাউন পরনে তার। হিলজোড়ার কারণে উচ্চতায় খানিকটা দীর্ঘ দেখাচ্ছে। মুখটা হালকা ভেজা, চুলগুলো কপালের উপর ছড়িয়ে আছে। এক হাতে শপিং প্যাকেট। জায়দানের সামনে এসে থামল সে, ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“তোমাকে শুধু পিরিয়ডের কথা বলেছি, তুমি পুরো দোকান শুদ্ধ তুলে এনেছ কেন? একটা প্যাড আনলেই চলতো।”
জায়দান দেয়ালের হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সাবিনের কাছে সরে এসে আলতো করে তার তলপেট ছুঁয়ে দিল। স্ত্রীর পূর্ববর্তী বক্তব্য উপেক্ষা করে শুধাল,

“ব্যথা করছে?”
সাবিন শিশুসুলভ ভঙ্গিতে মাথা দোলালো। সামান্য গুঙিয়ে বলল,
“খুব।”
“বাসায় চলো। ওয়ার্ম ওয়াটার ব্যাগ আছে, সেঁক দিলে আরাম লাগবে।”
সাবিন দ্বিমত করলনা। জায়দানের বাহুতে হেলান দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে টেবিলের কাছে এলো যেখানে পরিবারের সবাই বসে আছে। নিজের বাবার সিটের কাছে ঝুঁকে মৃদু গলায় কিছু বলল জায়দান, বিপরীতে নিজের শ্বশুড়কে নীরবে সম্মতি জানাতে দেখল সাবিন। এরপরই জায়দান টেবিল থেকে সিটের কাছে রাখা সাবিনের হ্যান্ডব্যাগ তুলে নিয়ে অপর হাতে তার হাত ধরে ধীরে ধীরে রেস্তোরাঁর বাইরের দিকে এগোল।
খানিকটা দূরে যেতেই সাবিন দাঁতে ঠোঁট কামড়ে বিব্রতবোধ থেকে জানালো,
“আমি এতটা অসচেতন নেই। আমার সাইকেল ডেট অনেক পরের। এর আগে কখনো এক মাসে দুইবার হয়নি বিধায়…”

“আই আন্ডারস্ট্যান্ড। আগামীকাল ডক্টরের কাছে নিয়ে যাব।”
“এত বড় কিছুও হয়নি যে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।”
“হোয়াটএভার সিম্পটম ইট ইয, বেটার সেইফ দ্যান সরি।”
সাবিন চুপ করে গেল। নিজের স্বামীকে মনোযোগী নয়নে দেখতে দেখতে এগোল। তার পদক্ষেপ সামান্য টালমাটাল লক্ষ্য করে জায়দান থামল, জিজ্ঞেস করল,
“পায়ে ব্যাথা লাগছে?”
“ওই, হিলজোড়া নতুন তো। তাই।”
জায়দান খানিকটা সময় নিঃশব্দে সাবিনের মুখপানে তাকিয়ে রইল। অতঃপর এক হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে বসল। বিস্মিত স্ত্রী তার খানিকটা লাফিয়ে উঠল।
“আরে! কি করছ?”
“পা দেখি।”
সাবিন প্রতিবাদ করার সুযোগ পেলনা। জায়দানের প্রশস্ত আঙুল জড়িয়ে গেল তার গোড়ালীজুড়ে। পা তুলে নিজের উরুর উপর রেখে এক এক করে হিলজোড়া খুলে নিল জায়দান। সাবিন খালি পা মেঝেতে ঠেকাতেই হিসিয়ে উঠল,
“এখন খালি পায়ে এগোব নাকি?”

জবাব এলোনা স্বামীর পক্ষ থেকে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই জায়দান সাবিনের লিকলিকে কোমরে নিজের বাহু জড়িয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। সাবিনের হাতজোড়া জড়িয়ে গেল তার ঘাড়ে।
“বাইকে ওঠা ঠিক হবেনা। গাড়িতে করে ফিরছি আমরা।”
বাকরুদ্ধ সাবিন কোনো শব্দ উচ্চারণ করার আর শক্তি পেলনা। নীরবে স্বামীর ঘাড়ে মুখ গুঁজে পরে রইল। অজান্তেই গ্রহণ করতে লাগল তার অস্তিত্বে জড়ানো অনন্য সুবাসটুকু।
গাড়ির ভেতরে সাবিনকে সাবধানে বসিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে এলো জায়দান। ড্রাইভার গাড়িটাকে সড়কপথে নামিয়ে মধ্যম গতিতে এগোতে লাগল। সাঁই সাঁই যানবাহনের ভিড়ে রাজধানীর সড়ক ধরে অগ্রসর হলো তাদের বাহন।
সিটে এলিয়ে চোখ বুঁজে রইল সাবিন। হঠাৎ করে তলপেটে ব্যথাটা একটু বেশিই হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুঝি চিনচিনে তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে শরীরের কোষজুড়ে। তার পাশে বসে থাকা জায়দান নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষণ করল।

“চকলেট খাবে?”
ঝট করে সাবিনের চোখজোড়া খুলে গেল। মিটমিট করে তাকাল জায়দানের দিকে। এই অবস্থায়ও জিভ বের করে খানিকটা ঠোঁট চেটে বলল,
“কোথায় পাবো?”
জায়দান নীরবে গাড়ির সিটের পাশ থেকে চকলেট এবং প্রিঙ্গেলসের বক্স বের করতেই রীতিমত হামলে পড়ল সাবিন। একসঙ্গে তিনটে চকলেটের মোড়ক খুলে চিবুতে চিবুতে উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল,
“থ্যাংক ইউ!”
জায়দান কোনোকিছু আর উচ্চারণ করলনা। নিজের একটি হাত বাড়িয়ে সাবিনের তলপেটজুড়ে আলতো করে বুলিয়ে দিতে থাকলো স্পর্শ। এতে যদি স্ত্রীর ব্যথা খানিকটা উপশম হয়, তবে ক্ষতি কি?

আজ বেশ দেরী করে ঘুম ভেঙেছে সাবিনের। এর কারণ, আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন, শুক্রবার। সাধারণত এমনিতেও ১০ টার আগে তার চোখ খোলেনা। আজ কয়টা বেজেছে কে জানে! ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। কোনোমতে ঘুমের পোশাক বদলে বিছানার উপর আগে থেকে ভাঁজ করে রাখা জায়দানের একটা শার্ট গায়ে জড়িয়ে সে নিচে নেমে এসেছে। হলরুমে পা রাখতেই রান্নাঘর থেকে একটা সুঘ্রাণ নাকে এসে ঠেকলো। টক – মিষ্টি – ঝালের মিশ্রণ। রমণী মাত্রই এমন ঘ্রাণ ভীষণ রকম টানে।
গুটিগুটি পায়ে রান্নাঘরে পৌঁছে উঁকি দিতেই চুলার কাছে শ্বাশুড়ি জেসমিনকে দন্ডায়মান দেখল সাবিন। খুন্তি হাতে অত্যন্ত মনোযোগী ভঙ্গিতে কড়াইয়ে রেঁধে চলেছেন তিনি। পাশেই সাহায্যার্থে দাঁড়িয়ে রোজিনা।
“বাহ্! শুক্রবারের সকাল সকাল আমার শ্বাশুড়ি জান রসুই ঠেলছেন? কোন মহৌষধ প্রস্তুত হচ্ছে শুনি?”
সাবিনের প্রশ্নে জেসমিন কোনো প্রতিক্রিয়া না করলেও রোজিনা সামান্য হেসে জানাল,
“তেঁতুল বরইয়ের আঁচার। ছোট ভাইজানের জন্য বিদেশ পাঠানো হইব, কুরিয়ারে।”
“আঁচার!”

জিভে বুঝি পানি এসে গেল সাবিনের। থপথপ পা ফেলে তক্ষুণি একটি বাটি হাতে নিয়ে সে এগোল। অতঃপর জেসমিন এবং রোজিনা উভয়কে চমকে দিয়ে চুলার ঠিক পাশেই পা ঝুলিয়ে উঠে বসল। নির্লজ্জের মত বাটি পাতল,
“আমাকে এখনি একটু আঁচার দিন আম্মু! টেস্ট করে দেখি, আপনার আঁচারের স্বাদ কত!”
জেসমিন রীতিমত হা করে তাকিয়ে রইলেন পুত্রবধূর দিকে। তারপরই খেঁকিয়ে উঠলেন,
“রোজিনা! এই লোভীটাকে এখান থেকে ভাগতে বল তো! যাকে তাকে আমি আমার আঁচার দেইনা!”
“লোভী? বেশ। লোভ দিয়ে নষ্ট করে দেই আপনার সাধের ছেলের আঁচার? পরে এসব খেয়ে বিদেশে বসে পেট খারাপ হলে তাকে কে দেখবে?”
খুন্তি থেমে গেলো জেসমিনের। সাবিন কড়াইয়ের দিকে এমন ভঙ্গিতে ঝুঁকে আছে যেন চোখের দৃষ্টিতে পেট খারাপের অভিশাপ বর্ষণ করছে। পারলেন না জেসমিন এই মেয়ের সাথে। কবেই বা পেরেছিলেন? আস্ত একটা নখরাবাজ মেয়ে!
জেসমিন ইশারা করতেই রোজিনা মাথা নেড়ে কিছুক্ষণ আগেই ঠান্ডা হওয়ার জন্য নামিয়ে রাখা তেঁতুলের আঁচার নিয়ে এলো। চামচ দিয়ে খানিকটা তুলে দিল সাবিনের বাটিতে।

“আরে মরা, পনেরো ইঞ্চির পেট, এইটুকুতে ভরে? আরো দে!”
বাটি ভরে সন্তুষ্ট হয়ে শেষমেষ পা ঝোলাতে ঝোলাতে খানিকটা মুখে দিল সাবিন। টক মিষ্টি স্বাদে শিউরে উঠল,
“উম! আপনার স্বভাব চুন্নির মতন হলেও হাত দুটোর শক্তি কিন্তু লা জওয়াব, শ্বাশুড়ি আম্মু!”
“থাপড়ে তোমাকে মেঝেতে ফেলার আগে আমার চোখের সামনে থেকে যাও তুমি!”
খিলখিল করে হেসে উঠল সাবিন। আরো এক চামচ ভর্তি করে আঁচার মুখে দিল। জেসমিন ভ্রু কুঁচকে কড়াইয়ের বরইয়ের আঁচার নাড়তে নাড়তে হঠাৎ সুর পাল্টে শুধালেন,
“কোনো সুখবর আছে নাকি?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে মুখের চামচ মুখেই রয়ে গেল সাবিনের। গালভর্তি আঁচার চিবুতে চিবুতে সে জেসমিনকে দেখল প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে। জেসমিন চোখ ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন। বড় ছেলের ঢিলেঢালা শার্টের অন্তরালে ঢেকে থাকা বউয়ের ফিনফিনে শরীরের পেটের উপর থামল তার নজর।
“হঠাৎ আঁচারে আগ্রহ যে?”

হেঁচকি উঠে গেল সাবিনের তৎক্ষণাৎ। রোজিনা দ্রুত ছুটে গিয়ে পানি নিয়ে এলো তার জন্য। ঢকঢক করে সমস্ত গ্লাস নিঃশেষ করে সেটি শক্ত হাতে ধরে রেখে সাবিন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বিস্মিত হাসি ফুটল তার অধরে।
“ওয়াও। আপনার বুদ্ধি হাঁটুতে জানতাম, আজ দেখছি সেই বুদ্ধি মাথায় উঠে গেছে। সে গোবর মাথাতেই সুন্দর।”
“জায়দান! তোমার বউ আমাকে কি বলছে শুনে যাও তুমি…!”
জেসমিন জোর গলায় বলতে চাইলেও সাবিন দ্রুতই বাঁধ সাধলো। কাউন্টার থেকে লাফিয়ে নেমে দুষ্টুমিমাখা চেহারায় বলল,
“কিছু হলেই খালি স্বামী ছেলেকে বিচার দিতে ওস্তাদ আপনি!”
“বিচার দেব না? তোমাকে একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি, আর তুমি কিনা…”
“প্রশ্নটা আপনার গুণধর বড় ছেলেকে জিজ্ঞেস করবেন। আপাতত আমার পেটে শুধু তেঁতুলের আঁচার কেন? বরইয়ের আঁচারের জন্যও কয়েক কাঠা জায়গা আছে!”
চোখের পলকে এত দ্রুত ঘটনাটি ঘটল যে জেসমিন কিংবা রোজিনা কেউই প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ পেলনা। খুন্তি দিয়ে খাবলা খাবলা করে ইতিমধ্যে ভর্তি বাটির ভেতরে আরো খানিক আঁচার স্তূপ করে নিয়ে ভো দৌঁড় দিলো সাবিন। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা জেসমিনের চিৎকার শুনতে পেলো। সঙ্গে রোজিনার শান্তনা।

“হায় হায়! আমার আদরের বাবুটার সব আঁচার কেড়ে নিয়ে গেল রাক্ষসটা!”
“আম্মা আফনে শান্ত হন, এই নেন পানি খান। আমি আপনারে আরো বরই কাইটা দিতেছি, বানাই নিমু আমরা আরো।”
আপনমনে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বেডরুমে পৌঁছাল সাবিন। দরজা আটকে ভেতরে পা ফেলতেই স্বামীকে দেখতে পেল। কফি টেবিলের পাশে বসে আছে জায়দান। টি শার্ট আর ট্রাউজার পরনে। শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। পাশেই একগাদা টেস্ট পেপার রাখা। ঠোঁটের ভাঁজে কলম গুঁজে রাখা। চোখের চশমায় প্রতিফলিত হচ্ছে ল্যাপটপের স্ক্রীন। সাবিন ভেতরে আসতেই মুখ তুলে তাকাল সে। স্ত্রীকে মুচকি মুচকি হাসতে দেখে ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল,
“নিচ তলা থেকে গোলমাল শুনলাম মনে হলো। আম্মুকে আবার কিছু বলেছ?”
“উফ!”
খানিক বিরক্তিসূচক শব্দ তুলে সাবিন ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল। কফি টেবিলের নিকট ঝুঁকে স্বামীর বাদামী নয়নমাঝে দৃষ্টি ফেলে বলল,
“খালি আম্মু আম্মু আম্মু! একটু ক্ষমা দাও। এই নাও, তোমার জন্য কি জিনিস এনেছি দেখো।”
“কি?”
“তেঁতুল আর বরইয়ের আঁচার।”
“কিঃ? কিন্তু ওসব তো আম্মু আয়দানের জন্য…উম!”

সম্পূর্ণ করতে পারলনা জায়দান। এর আগেই সাবিন চামচে বেশ খানিকটা আঁচার তুলে তার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিলো। জমে গেল সে। জিভে মায়ের অতি পরিচিত, অতি পুরাতন, অতি চাহিদার আঁচারের স্বাদ ঠেকতেই সবকিছু যেন থমকে গেল ক্ষণিকের জন্য। স্বামীর নয়নমাঝে ফুটে ওঠা শীতলতার অন্তরালে অতি ক্ষীণ এক অব্যক্ত অনুরক্তি দেখে সাবিনের বুকের ভেতর উষ্ণতা ভরে উঠলো। মোলায়েম হাসলো সে। হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলে জায়দানের ঠোঁটের কোণে লেপ্টে যাওয়া আঁচারের তেল মুছে নিল। নিষ্পলক চেয়ে রইল জায়দান তার উদ্দেশ্যে।
বৃদ্ধাঙ্গুল ফিরিয়ে নিয়ে নির্দ্বিধায় সেটি জিভে লেহন করে নিয়ে সাবিন জায়দানকে অপর হাতে ধরে রাখা আঁচারভর্তি বাটিটা দেখালো।
“বেশ খানিকটা আছে। বয়ামে রেখে দেব স্ন্যাক্সবারে। তোমার যখন যখন ইচ্ছা হবে তখন তখন খেও, কেমন?”
জায়দানকে কোনোপ্রকার প্রতিক্রিয়ার সুযোগও দিলনা সাবিন। তক্ষুণি উঠে গেল কার্যসিদ্ধিতে। পিকলসের একটা খালি জার তুলে নড়াচড়া করতে লাগল, বোধ হয় ওটাই ব্যবহার করার কথা ভাবছে। তার দিকে অদূর থেকে অপলক নয়নে চেয়ে রইল জায়দান।

বিয়ের পর প্রথম ঈদ সাবিনের।
রমজানের দিনগুলো কেটেছে ভালো খারাপের মিশেলে। কিছু দুঃসহ স্মৃতি জমেছে বুকের কোণে। কিছু নয়, অসংখ্য। অথচ আজকের পবিত্র এবং উৎসবমুখর দিনটাতে সেসব মনে করার ইচ্ছা নেই তার।
সকালটা কেটেছে স্বাভাবিকভাবেই। তাকদীর হুসেইন এবং চাচার বাড়ির সকলের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। তবে কেমন যেন মুষড়ে ছিল সে সারাটা সকাল। ব্যাপারটা হয়ত জায়দান খেয়াল করেছে। বিধায়, বিকাল হতেই তৈরি হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়েছে একান্ত কিছু সময় যাপনে।
হাতির ঝিল এলাকায় ঈদের দিনে দারুণ ভিড়। রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিস্তৃত নদীর টলটলে পানির পানে চেয়ে আছে সাবিন। ঈদের দিন হওয়ার সাজগোজ করেছে বেশ। বিয়ের পরের প্রথম ঈদে শ্বশুড়, বাবা, বড় চাচা এমনকি আহানের তরফ থেকেও উপহার পেয়েছে সে ঢের। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সে আজ পড়েছে চাঁদরাতে জায়দানের কিনে নিয়ে আসা মেরুন বর্ণের আঘানূর। বাঙালিয়ানার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ না থাকা সত্ত্বেও আজ হাত ভর্তি করে পড়েছে কাঁচের চুড়ি, ছেড়ে রাখা লম্বাটে চুলে ছোট্ট একটি টিকলি। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে জায়দান। এই বান্দাকে বিয়ের দিন ছাড়া কখনো ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দেখেনি সাবিন। আজও দেখলনা। যথারীতি শার্ট এবং ক্রপস্যুট পরনে। তবে আজ স্যুটের কালো বর্ণ বদলে ধারণ করেছে ধূসরতা।
দুজনের অস্তিত্বের মাঝে পিছনের ভিড়ভাট্টা যেন বিলীন। একদম নীরব দুটি মানুষ। কথা না বললেও একে অপরের নিকট উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে তারা দারুণভাবে। দুজনের দৃষ্টিই দিগন্তের পানে আবদ্ধ।
অবশেষে দীর্ঘ নীরবতা ভেদ করে মুখ খুলল সাবিন।

“আমায় ঈদের সালামি দেবেনা, আরেফিন টাওয়ার?”
মুখ ঘুরিয়ে পাশে তাকাল জায়দান। সাবিনের চেহারায় পড়ন্ত বিকালের সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হচ্ছে। শান্ত গলায় বলল সে,
“কি সালামি চাও?”
“তোমার জান টা লিখে দাও।”
“ইদানিং খুব বেশি ফেসবুকের উপন্যাস পড়ছ মনে হয়।”
“তুমি কিভাবে জানলে ফেসবুকে উপন্যাস লেখা হয়? তুমি না সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই?”
“তোমার থেকে দেখেছি।”
“তুমি কি আবার আমার মোবাইল হ্যাক করেছ?”
“না।”
চশমা ঠিকঠাক করে পুনরায় নদীর দিকে দৃষ্টি ফেরালো জায়দান। সাবিন রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রাণভরে দেখল স্বামীকে। আশেপাশের বেশকিছু মানুষ ঘুরে ঘুরে জায়দানকে দেখছে। কারণ, তার উচ্চতা। হয়ত সুদর্শনাতাও? বিষয়টা কেন যেন সাবিনকে ঈর্ষায় ফেললো! গুঙিয়ে সে বলে উঠল,

“বাদ দাও। জান যখন দিতে চাচ্ছো না, তখন অন্য কিছু দাও।”
“আচ্ছা। কি দেবো?”
“একটা চুমু দাও।”
থমকালো জায়দান। চশমার অন্তরালে জ্বলজ্বলে বাদামী জহরতজোড়া সাবিনকে দেখল প্রশান্ত নয়নে।
“সে তো প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে দেই।”
“উঁহু। ওটা চুমু না। ঠোঁটে দাও।”
“আমার চুমু তোমার ভালো লাগে জানতাম না।”
“কেন লাগবে না?”
“এর চেয়েও ভালো কেউ আছে হয়ত তোমার জীবনে।”
“আছে। কিন্তু তাতে কি? আমার তোমারটাই লাগবে।”
“কেন?”
“কারণ, তুমি আমার প্রথম চুমু।”

একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করল জায়দান। সাবিন যে ধরণের মেয়ে, তাতে সে এমন কিছু সত্যিই আশা করেনি। নাকি করেছিল? প্রত্যেক স্বামীরই তো সুপ্ত বাসনা থাকে পবিত্রতম স্ত্রী লাভের। কিন্তু তার তো ইচ্ছা বলতে কিছু নেই। তবে একটা ভালো লাগা কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে কেন?
জায়দান নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে কখন সাবিন তার কাছে সরে এসেছে খেয়ালই করলনা। যখন করল, তখন আদুরে স্ত্রী তার ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি মেখে। তাকে গভীর নয়নে তাকাতে দেখেই সাবিন ঠোঁট ফুলিয়ে আবারো বলল,
“চুমু দাও।”
“মাই ওয়াইফ, উই আর ইন পাবলিক।”
কখন কন্ঠ খানিকটা কাঁপলো জায়দান টের পেলনা। সাবিন বাঁকা হাসলো,
“সেজন্যই তো।”
“মাই…উফ্!”

জায়দানের ঠোঁটের মাঝে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে অত্যন্ত দ্রুতবেগে চুমু খেলো সাবিন। আশেপাশে যারা ফিরে ফিরে এতক্ষণ তার স্বামীর দিকে তাকাচ্ছিল, তাদের উদ্দেশ্যে বিজয়ীর এক হাসি মেখে জায়দানের ঠোঁটে দ্বিতীয় চুমু ছুঁয়ে সাবিন আবেশিত গলায় ফিসফিস করল,
“মানুষ এক আজব প্রাণী। অন্যের জিনিসের প্রতি নজর দিতে খুব পছন্দ করে।”
সম্পূর্ণ স্থির হয়ে রইল জায়দান। পরক্ষণেই সাবিনের কব্জি চেপে ধরলো। কোনোপ্রকার ব্যাখ্যা না দিয়েই রেলিংয়ের কাছ থেকে নেমে এগোতে শুরু করল। সাগ্রহেই তাকে অনুসরণ করল স্ত্রী। ব্রীজ পেরিয়ে অনেকদূর এসে সড়কের ধারের এক পুরাতন বিল্ডিংয়ের চাপা গলির ভেতর ঢুকে পড়ল জায়দান। পাথুরে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল সাবিনকে। বিস্মিত স্ত্রী তার গলা জড়িয়ে ধরলো।
“জায়দান!”
“সালামি চাই তোমার, তাইনা?”
একটি ঢোক গিললো সাবিন। জায়দানের কন্ঠস্বর অত্যন্ত গভীর এবং খানিকটা আবেশিত শোনাচ্ছে।
“আমি…”
“চাই নাকি?”
“চাই।”

সাবিন উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁটে আছড়ে পড়ল জায়দানের ঠোঁট। গুঙিয়ে উঠে তার পিঠের শার্ট খামচে ধরল সাবিন। চোখজোড়া বুঁজে এলো শক্তভাবে, তীব্র ভালোলাগার আবেশে। নিজের জিভের ডগায় স্বামীর জিভের ডগার অস্তিত্ব টের পেল সে। সমস্ত শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলো লম্বাটে বাহুর বাঁধনের মাঝে। নিঃশ্বাস আটকে এলো সম্পূর্ণ। তবে আফসোস নেই। আক্ষেপ নেই কোনো। সাবিনের ঘাড় শক্তভাবে ধরে তার মাথাটা বাঁকা করে আরো খানিক গভীরভাবে তার অধরের স্বাদ নিতে লাগল জায়দান। অদূরে সড়কের যানবাহনের আওয়াজ, মানুষের হাঁকডাক আর যেকোন সময় এখানে কারো চলে আসার ভয়, কোনোকিছু আজ তাকে রুখতে পারলনা।
সাবিনের অক্সিজেন প্রয়োজন টের পেয়ে তার ঠোঁট ছেড়ে ঈদের মেহেদী রাঙা হাতে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে লাগল জায়দান। শিউরে উঠল সাবিন। কাঁধের জড়ানো ওড়না হটিয়ে তাতে ঠোঁট ছুঁয়ে আলতো এক কামড় বসালো স্বামী তার।
“আহ্! জায়দান!”
আঙুলের মাঝে জায়দানের চুল আঁকড়ে ধরল সাবিন। তার ঠোঁট থেকে নির্গত অস্ফুট আওয়াজ জায়দানকে ক্রমশ উন্মত্ত করে তুলল। প্রশস্ত হাত দুখানা কোমর বেয়ে উঠে গেল উপরে, পাঁজরের দিকে। ছুঁয়ে দিল পাঁজরের পাশ, অতঃপর গভীরে আরো। জিভের ডগায় সাবিনের কাঁধ থেকে গ্রীবা অবধি লেহন করে নিতেই রমণী সইতে পারলনা আর।

“উম…জায়…আহ্হঃ…!”
জমে গেল জায়দান। মস্তিষ্কে একটি স্মৃতি তাজা হয়ে উঠল। বাসর রাতের স্মৃতি। যখন এই একই রমণীর হাতজোড়া তাকে ঠেলে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আর্জি জানিয়েছিল থামবার উদ্দেশ্যে। বিবাহিত স্ত্রী তাকে তার অধিকার চর্চায় বাঁধা দিয়েছিল। তবে আজ, আজ কিভাবে সে সুযোগ নিতে পারছে এই রমণীর ক্ষীণ মুহূর্তের দূর্বলতার? ঠিক আগামীকালই সাবিন বদলে যাবেনা, আরো একবার তার চাচাতো ভাইয়ের বাহুতে ছুটে যাবেনা, তার নিশ্চয়তা কতটুকু?
জায়দানের কি আদও অধিকার রয়েছে নিজের বিবাহিতা স্ত্রীর উপর?
এক টানে ওড়নাটা টেনে ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠতে থাকা কামড়ের চিহ্নটুকু ঢেকে ফেলল জায়দান। সাবিনের হালকা এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল এবং পোশাক ঠিকঠাক করে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
“দুঃখিত। আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সাবিন। যেন অত্যন্ত আবেগ নিয়ে কিছু বলতে চায়। অথচ শেষমেষ কি যেন ভেবে আর কিছুই বললনা। মুহূর্তেই সরে গেল জায়দানের কাছ থেকে। নিজেকে গুছিয়ে আশেপাশে চেয়ে বলল,
“সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাসায় ফেরা উচিৎ।”

এবার ওই কণ্ঠের মাঝে আর কোনো উষ্ণতা, আবেগ, অনুভূতির খোঁজ পেলনা জায়দান। তবে তার সন্দেহই ঠিক ছিল। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে, অথচ তা দৃশ্যমান হলোনা। চুলে আঙুল চালিয়ে গলির বাইরে বেরোলো জায়দান, তাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করল সাবিন, একটি হাত বাড়িয়ে ধরল স্বামীর হাত, জায়দানের তরফ থেকে এবার বাঁধা এলোনা।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২১

গোধূলী লগ্নে গাছের ছায়ায় স্বর্ণালী আলোর জগৎ পেরিয়ে যখন কপোত কপোতীযুগল এগিয়ে চলেছে পাশাপাশি, তখনো তাদের মাঝে কেউই কল্পনা করতে পারেনি শীঘ্রই তাদের এই ধরে রাখা হাতদুটোকে ছেড়ে দিতে হবে,
আজীবনের জন্য।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here