Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (৩)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (৩)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (৩)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ তোমার জন্য ওর এই হাল। খু*নি তুমি একটা। খু*ন করেছো তুমি। নিজের অংশকে… নিজের অংশ কে খু*ন করেছো। ‘
ঈশান সরু চোখে তাকালো দরজার দিকে। যেখানটায় তার বাবা দাড়িয়ে। রাহেলা অসহায় হয় বড্ড। স্বামীকে সরিয়ে নিতে মরিয়া সে। ডাক্তার সাহেবও বিরক্ত মুখে বেশ কয়েকবার আদেশ ছুড়লেন রুগীর কেবিন চটজলদি ফাঁকা করে দিতে। ঈশানকে এমন সফেদ ব্যান্ডেজে মোড়ানো দেখে ভদ্রলোকের হৃদয় কাঁপলো। তবে বাহিরে সদ্য তিতিরকে নিয়ে শুনে আসা সতর্ক বাণী কানে এসে বাজতেই পুনরায় কঠিন হলেন তিনি। স্ত্রী কে সরিয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। কঠিন গলাতেই বললেন,
—’ বাপ হচ্ছিলে ? এ কথা জানতে? তা সত্ত্বেও বউয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র সতর্কতা অবলম্বন করলে না। তার এই অন্ত্বসত্তা অবস্থায়, তাকে তোমার খেলার গুটি হিসেবে ব্যবহার করলে। তার ফল সরুপ? তোমাকে সফলই বলা চলে। গোটা দেশ জুড়ে শোরগোল পরে গিয়েছে। এক আন্ডারকভার অফিসারের হাতে মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল এরেস্ট হয়েছে। তোমার জয়গান সবখানে। ব্রেভো! ‘
ঈশান স্তব্ধ হয়ে বাবার কঠিন কথাগুলো শুনছে। ডাক্তার সাহেব বিরক্ত মুখে পাশে এসে দাড়ালেন। কঠিন গলায় বললেন,

—’ আপনি পেশেন্টের বাবা? এটা কি ধরনের ব্যবহার। রুগীর গতকালই একটা বড় অপারেশন হয়েছে। মানছি প্রাথমিক রিস্ক টা কেটে গিয়েছে। তাই বলে এতো রুড হতে পারেন না তার ওপর। আপনাদের ব্যাক্তিগত যে সমস্যাই থাকুক না ক্যানো। এখনও ওনাকে ইমারজেন্সি থেকে বের করিনি আমরা। আপনি দয়া করে বাহিরে যান। ‘
ভদ্রলোক একগুঁয়ের মতোই ঠায় দাঁড়িয়েই রয়। চোখজোড়া দিয়ে অনবরত নোনাজল গড়িয়ে পরছে। অসুস্থ ছেলেকে এই তিক্ত কথাগুলো শোনাতে যতটা কষ্ট হচ্ছে, তার থেকেও দ্বিগুণ ভয় হচ্ছে। তিতিরকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার ভয়! মাথা ঠিক আছে কি তার এখন? বোধহয় নেই। থাকলে নিজের কলিজার টুকরা ছেলেটাকে কখনও, তারই সন্তানের খু*নি বলে আখ্যায়িত করতে পারতেন কি? রাহেলা চাপা আর্তনাদ করে ওঠে। স্বামী আর ছেলের এই দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত সে। লোকটা আচমকাই এতোটা রুড হয়ে যাবে, অসুস্থ ছেলেটার ওপর– কল্পনাও করেননি তিনি। ঈশান দূর্বল গলায় বললো,
—’ তিতিরকে বাঁচাতে এতো কাহিনি, বাবা। ওর কথা আমি ভাবি না? ‘
—’ ভাবো না । ভাবলে আজ তোমার সন্তান ওর গর্ভে থাকতো। জীবিত… ‘
ঈশান বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো। শরীর কেমন যেনো ছেড়ে দিলো বোধহয়। বাবা রক্তিম মুখের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে রইলো। কি বললো তার বাবা এখন? জীবিত শব্দটা উচ্চারণ করলো কি? ঈশান সময় নিলো কিছুক্ষণ। কাঁপা কাঁপা গলায় শুধালো,

—’ জীবিত মানে? ‘
ভদ্রলোক ছোট বাচ্চাদের মতো ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। স্বামীর এহেন অসহায়ত্বে কখনো অভ্যস্ত নন রাহেলা। এ জীবনে কখনো কাঁদতে দেখেছেন কি? কে জানে! তবে আজকে দেখলেন। স্বামীর বাহু চেপে ধরে শাড়ির আঁচলে মুখচাপা দিলেন তিনি নিজেও। কান্না আটকালেন। কোনোমতে বললেন,
—’ বাচ্চার বাবা ও। আমাদের কষ্টের থেকে ওর কষ্ট টা আকাশছোঁয়া হবে। দোহাই তোমার। আমার ছেলেটাকে এতো বড় অপবাদ দিয়ো না। অন্তত নিজের সন্তানের খু*নির। ‘
রাইসুল সাহেব মাথা নিচু করে আছেন। ঈশান অস্থির হয় বড্ড। ব্যাগ্র গলায় শুধায়,
—’ কি হলো? বলছো না ক্যানো? জীবিত মানে কি? আমার তিতির? আমার বাচ্চা? কোথায় ওরা? মা? ‘
রাহেলা স্বামীর হাত ছেড়ে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ছেলের দিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু আঁকলেন ছেলের তপ্ত ললাটে। কান্না আঁটকে শান্তনা দিয়ে বললেন,

—’ খোদার ওপর ভরসা রাখো আব্বা। এই পৃথিবীর ওপর ঘটমান সব কিছুর সিদ্ধান্ত তিনি নেন। সবকিছুর… কে দুনিয়াতে আসবে, কে দুনিয়া ছেড়ে যাবে। সব তার হাতে। কিচ্ছু আমার-তোমার হাতে নয়। ‘
ঈশানের ভিতরটা এক মূহুর্তের জন্য ছটফট করে উঠলো। শরীরে বিন্দুমাত্র বল নেই। এটার যন্ত্রনা অন্যরকম। সে তো চাইছে ছুটে তিতিরের কাছে যেতে। কিন্তু সেটা তো দূর, সামান্য কথা বলতেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ধীরে ধীরে বোধশক্তি ফিরছে বোধহয়। সেইসাথে টের পাচ্ছে শারীরিক যন্ত্রণা। মায়ের এই হা হুতাশ আর শান্তনা বাণীতে ভয় জেঁকে ধরলো তাকে। মাকে উদ্দেশ্য করে শুধালো,
—’ মা ? বাবা কি বলছে? আমার তিতির কোথায়? ও ঠিক নেই? আর আমার বাচ্চা টা? আমি খু*নি? কার? আমার অংশের! মানে? ‘
—’ আপনারা দয়া করে পেশেন্ট কে আর মানসিক চাপ দেবেন না। এতো শিক্ষিত, সম্মানিত ব্যাক্তি হয়েও আপনারা যদি এরকম অশিক্ষিতর মতো আচরন করেন, পেশেন্টের স্বাস্থ্যের দিকটা একবারও চিন্তা না করে এরকম ইমারজেন্সির ভেতরে এসে ঝামেলা করেন, আমি আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো। লাস্ট ওয়ার্নিং এটা আমার। ‘
ডাক্তার সাহেব গর্জে উঠলেন একপ্রকার। ঈশানের স্বাস্থ্যের অবনতি চোখে পরার মতো। হার্টবিট ছোটাছুটি করছে একপ্রকার। প্রেশার হাই হচ্ছে দ্রুতবেগে। রাহেলা ছেলের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
—’ কিচ্ছু হয়নি। সব ঠিক হয়ে যাবে। তিতিরও সুস্থ হয়ে যাবে। ‘
—’ আর আমার বাচ্চা? তার কথা এড়িয়ে যাচ্ছো ক্যানো? মা? ‘
—’ বাচ্চাটা আর নেই, আব্বা। ‘
রাহেলা আর থাকতে পারলেন না এখানে। তাদের কে বের করে দেওয়া হলো এখান থেকে। ঈশান এক মূহুর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেলো। ভুলে গেলো পলক ফেলতেও। মরুভূমির বুকে আচমকা ধূলিঝড় এলে, মাঝ মরুভূমিতে দাড়িয়ে থাকা এক পথিকের যে অবস্থা হয়, ঈশানের অবস্থাও তেমন হলো বোধহয়। গোটা দুনিয়া এলোমেলো হয়ে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। তছনছ ঠেকলো সবকিছু। সফেদ বিছানার ওপর, মৃ ত লাশের মতো পরে রইলো।

চোখের পলক ফেলার মতো করে দু’টো দিন পার হয়েছে । ঈশানের শরীরের উন্নতি হয়েছে বেশ খানিকটা। তবে সেদিনের পর থেকে পাথর বনে গিয়েছে ছেলেটা। একটা শব্দও উচ্চারন করেনি। ভুলেও নয়। রাহেলাসহ পরিবারের আরও কয়েকজন দেখা করতে কয়েকবার এসেছে তার কাছে। তবে ঈশানের ভ্রুক্ষেপহীন আচরনে অবাক হয়েছে সবাই। ছেলেটা যেনো কাঁদতেও ভুলে গিয়েছে। আজকে দুপুরের দিকে জ্ঞান ফিরেছে তিতিরের। সবাই একপর্যায়ে ভয়ে ছিলো, ঈশানের মতো তিতিরও জানে কি-না প্রেগন্যান্সির বিষয়টা। তবে সেরকম কিছু হয়নি। তিতির জানতো না এত বড় খবরটা। নিশি, নূরিকে নিয়ে নিয়াজ আজকেই সিলেটের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। ওদিক থেকে মুক্তা দেওয়ান, রিশস, রোশনি সবাই অস্থির হয়ে আছে ঈশান আর তিতির কে দেখতে। চন্দ্রা দেওয়ানের কাছে কাউকে তো থাকতে হবে। সেই হেতুতে ওদের তিনজনকে নিয়ে ফিরছে নিয়াজ। তাছাড়া আরও বেশ কয়েকটা দিন হসপিটালে ছোটাছুটি করতে হবে। সবার শরীর খারাপ করে এভাবে থাকার মানে হয় না কোনো। স্থানীয় এক হোটেলে সবার থাকার ব্যবস্থা করা হলেও, সবাইকে ঘুরেফিরে হাসপাতালেই খুঁজে পাওয়া যায়।
তিতিরের বেডের পাশে বসে আছে নিশি আর রাহেলা। মেয়েটার মুখে যন্ত্রনার ছাপ থাকলেও হাসি-হাসি মুখ করে রাখার নিদারুণ চেষ্টা করছে। ঈশানের যে জ্ঞান ফিরেছে আরও দু’দিন আগে, সে যে এখন অনেকটা সুস্থ সেটা শুনে শান্ত হয়েছে খানিকটা। স্যালাইন চলছে। সেদিকে বিরক্ত মুখে তাকালো মেয়েটা। শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললো,

—’ তোমার ছেলের সাথে দেখা করবো, মামনী। ‘
মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো নিশি আর রাহেলা। ঈশান যে দু’দিন যাবৎ পাথর বনে গিয়ে বসে আছে, সেটা এড়িয়ে গেলো।
—’ করবি তো দেখা। কিন্তু তোর তো নড়াচড়া বারণএখন। ‘
—’ তোমার ছেলের? ‘
—’ তারও। ‘
—’ আমাদের এক কেবিনে রাখা যায়না? এখন তো আর কোনো সমস্যা নেই। ‘
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলে নিয়াজ। হাতের ফলমূলের ব্যাগ গুলো টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে হাসি হাসি মুখে বললো,
—’ এটা কি আপনাদের দেওয়ান বাড়ি পেয়েছেন, ভাবিসাহেবা? যে একঘরে ব্যবস্থা করে দেবো? হু? হসপিটাল এটা। এখানে এসব রোমান্টিসিজম করা চলবে না৷ ‘
মলিন হাসলো মেয়েটা। নিয়াজকে দেখে জ্বলজ্বল করে উঠলো চোখজোড়া। আহ্লাদী গলায় বললো,
—’ একটু ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়না? ‘
—’ যায় যদি, নিশ্চয় করে ফেলবো। এখন এতো প্রেশার নিতে হবে না। নার্স আসবে এক্ষুনি। রেস্ট নিতে হবে। সবাইকে বের হতে হবে খানিক পর। ‘

নিয়াজ প্যাকেটগুলো রেখে বেরিয়ে গেলো। ঈশানের কেবিনেও যেতে হবে। তিতির যে এখন কথাবার্তা বলছে বেশ স্বাভাবিক ভাবে সেটা ঈশানকে জানাতে হবে। যদিও শোনার পরও ছেলেটা সেরকম রেসপন্স করবে কি-না কে জানে!
বিগত কয়েকদিন যাবৎ আবহাওয়া বেশ খারাপ। রুগীর পরিবারের মানুষজনের বেশ ভোগান্তিই হচ্ছে বলা চলে। এটা সেটার জন্য ঘনঘন বাহিরে ছুটতে হচ্ছে। অথচ বাইরের বৈরি আবহাওয়ার জন্য নাজেহাল অবস্থা। আজকেও একই রকম অবস্থা। গোটা কেবিনে সে একাই। খানিক আগেই একগাদা ওষুধ দিয়ে ঘুম দিতে বলে গিয়েছেন ডাক্তার। রাহেলা, নিশি বের হয়ে গিয়েছে কেবিন থেকে। কেবিনের আলো নেভানো। এককোনে ছোট্ট টিমটিমে আলো জ্বেলে রাখা। রাত হয়েছে বোধহয় বেশ। ঘড়ি দেখা হয় নি। ঘুমের ওষুধ দিয়ে গিয়েছে কি তাকে? নিভু নিভু হয়ে আসছে চোখজোড়া। এসি কেবিন। বাইরের আবহাওয়া টা ঠিক কেমন সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। জানালার ওপরের পর্দা টেনে রাখা। সুতরাং একদম বন্দি লাগছে নিজেকে। অন্ধকার ঘরেও বুকচিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো মেয়েটার। ঈশান সুস্থ আছে। এ খবরের নিশ্চয়তা দিয়েছে অনেকেই। যদিও এখনো দেখাটা করতে পারেনি। মানুষ টাকে একটাবার দেখার জন্য ছটফট করছে বুকটা। অশান্ত হচ্ছে শরীর। চোখ বুজলেই সেদিনের সেই দূর্বিষহ স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

গোটা ঘরে নিজের চাপা শ্বাস আর এসিড শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু কানে আসলো না তার। তিতির ভেবে পায়না বুকটা হাহাকার করছে কেনো এতো। কি যেনো নেই, কিসের যেনো একটা শূন্যতা ঘিরে ধরছে তাকে। কি হারিয়ে গিয়েছে তার! কথায় আছে আবহাওয়াও নাকি মনের ওপর প্রভাব ফেলে। বাইরে এরকম বৃষ্টি, গুমোট পরিবেশ – তাই কি তার মনের এতো খারাপ অবস্থা? এতো খারাপ লাগছে মনটা। শরীরে খুব একটা কষ্ট নেই, এক ঈশানকে এক নজর দেখতে পাওয়ার হাহাকার ছাড়া আর কিসের এতো ভয়? কি হারিয়েছে তার! তিতির ভেবে পায়না। অস্থির হয়ে থাকা মন কিসে শান্ত হবে? চোখের কার্নিশে ভেজা অনূভব হতেই আরেকদফা চমকালো সে। ভীষন কান্না পাচ্ছে। হৃদপিন্ড আন্দোলন করছে। তিতির শ্বাস নিলো জোরে জোরে। ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে। ওষুধের প্রভাবে। কি হারিয়েছে তার জীবন থেকে, এই উত্তর অজানা রয়ে গেলো তার। হয়তো জবাব দিতে চাইবে না কেউ। এক অভাগা মা কে জানানো হলো না, তার গর্ভে সে ধারণ করেছিলো তার ভালোবাসার অংশ। অতি যত্নে ওই ছোট্ট পেটটায় বেড়ে উঠছিলে আরও একটি মানব অস্তিত্ব। মা হতে যাচ্ছিলো এই অভাগী।

হুইলচেয়ার টা ঠেলে নিয়াজ যখন ঈশানকে নিয়ে তিতিরের কামড়ার সামনে আসলো, রাত তখন গভীর হয়েছে। গোটা হসপিটালের শুনশান নিরবতা। দেওয়ান বাড়ির সবাইকে বিশ্রামের জন্য ঠেলেঠুলে পাঠানো হয়েছে।।ঈশানের কাছে রয়েছে শুধু নিয়াজই। ঈশানকে তিতিরের কথা বলতেই সায় দিয়েছে। যদিও মুখে কিছুই বলেনি। যা বুঝে নেওয়ার, নিয়াজই বুঝে নিয়েছে। বহু কসরতে ছেলেটাকে হুইলচেয়ারে বসাতে হয়েছে। এছাড়া আর গতি পায়নি সে। ঈশান যেভাবে থ মেরে আছে, ছেলেটা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরবে যেকোনো সময়। ঈশানের মতো ছেলের থেকে এতটা ভেঙে পরা আশা করা যায়না মোটেই।
নিয়াজ খানিকটা ঝুকে তলার স্বর খাদে নামিয়ে ঈশানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ তিতির হয়তো ঘুমাচ্ছে। যদি কথা বলতে ইচ্ছে হয়, তবে কথা বলে আসবি। ডাকতে হলে ডাকবি। আর যদি কথা বলতে ইচ্ছে না হয়। হাহাকার লাগে বড্ড বেশি। তবে মেয়েটার বুকে মাথা রেখে আসবি খানিকক্ষণ। ভালো লাগবে। ‘
অন্য সময় হলে, মন বোঝার জন্য হয়তো মৃদু হাসলো ছেলেটা। তবে আজকে সেরকম হলো না কিছু। গম্ভীর মুখে বসে রইলো। নিয়াজ মৃদু হেসে ঠেলে নিয়ে গেলো ভিতরে। তিতির সত্যই ঘুমাচ্ছে। গোটা ঘরই অন্ধকার। তবে সফেদ বিছানার ওপর শুয়ে থাকা মলিন চেহারার মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখতে পারলো না। নিয়াজ এগিয়ে নিয়ে এলো তাকে। রুমের এককোনায় রাখা একটা এক্সট্রা বেডটা টেনেটুনে তিতিরের বেডের সাথে মেলালো। ধীরেসুস্থে ঈশানকে তুলে দিলো সেখানটায়। বালিশ ঠিকঠাক করে তাকে রেখে নিচু গলায় বললো,
—’ এখানে থাক। তোর বা তিতিরের কারোরই আজ রাতে আর কোনো ওষুধ নেই। নার্স বা ডাক্তার সকালের আগে আসবে না। আমি বাইরে আছি। প্রয়োজন হলে ডাকবি কেমন? ‘
কেবিনের দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই নিস্তব্ধতা নামলো গোটা ঘর জুড়ে। ঈশান নিজের আঁটকে রাখা নিঃশ্বাস ধীরেসুস্থে ছাড়লো যেনো। খুব একটা নড়াচড়ায় সায় দেয় না শরীর। ব্যাথা হয় বড্ড। তবুও যতটা সম্ভব এগিয়ে এলো।
ফিসফিস করে ডাকলো,

—’ তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস, তিতির? ‘
ওপাশ থেকে সাড়া আসে না কোনো। ঘুমে তলিয়ে রয়েছে মেয়েটা। কয়েক মূহুর্তের নিরবতা বয়ে গেলো গোটা ঘরে।
—‘ আই অ্যাম আ মার্ডারার… খু’নি আ-আমি। আমাদের বাচ্চা, আমার অংশ – নিজের সন্তানের খু’নি আমি। খু’ন করেছি আমি তাকে । ‘
ছেলেটার বলিষ্ঠ শরীর থরথর করে কাঁপছে। অস্বাভাবিক রক্তিম দেখাচ্ছে তীক্ষ্ণ চোখজোড়া। পাশাপাশি দু’টো বেড। ঈশান নিজের ক্ষতবিক্ষত শরীরের পরোয়া করলো না মোটেই। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে ভরহীন পেঁচিয়ে ধরলো তিতিরকে। দাঁত কামড়ে মাথাটা তিতিরের বুকের বাঁ পাশে নিয়ে এসে ফুঁপিয়ে উঠলো। বিরবির করে বলে উঠলো,

—‘ আমাকে ক্ষমা করিস না, তিতির । তোর বাচ্চার খু*নি আমি। বাপ হয়ে নিজের সন্তান কে খু*ন করেছি। ‘
জড়িয়ে আসছে ছেলেটার কন্ঠ। তিতির হাসফাস করে ওঠে ঘুমের ঘোরে। ঈশান খানিকটা মাথা উচুলো। তিতিরের উদরেরদিকে অসহায় দৃষ্টি তাক করলো। বুক অবধি সফেদ চাদর টেনে রাখা। চাদর টা কানিকটা নামিয়ে দেখবে? যেখানটায় তার অংশ বেড়ে উঠছিলো? ঈশান কাঁপা কাঁপা হাতে খানিকটা চাদর সরাতেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখা ব্যান্ডেজ চোখে পরলো। ছিটকে সরিয়ে আনলো হাতটা। চোখ ঘোলা হয়ে এলো। ঠোঁট কামড়ে শব্দ করে কান্না আটকালো। ওই পেটটায় কতো মুখ ডুবিয়েছে। এই মেয়েটার গোটা শরীর তার শান্তির জায়গা। এই ছোট্ট পেটটায় তার অংশ ছিলো। আজ চর নেই। তার ভুলে নেই। বাবা ঠিকই বলেছে কি? ঈশান নিজের হাতটা তিতিরের পেটের ওপর রাখলো। বিরবির করে বললো,
—’ আবার বাবা টা এখানেই ছিলো। তাই না? বাবা? এখন সাড়া দিচ্ছো না কেনো? তোমাকে ডাকার তো সুযোগই পেলাম না। ভাগ্য আমাকে সেই সুযোগই দিলো না। ‘
হাত বুলিয়ে দিলো সেখানটায় । কাঁপা গলায় বললো,

—’ আমি বাবা হতাম। আমার অংশ আসতো দুনিয়াতে। আমার আর তিতিরের ভালোবাসার চিহ্ন। আমি খু*ন করেছি তাকে। আমার ভুল। আমার জন্য, আমার হটকারিতার জন্য আমার তিতিরের শরীরে এতো এতো ক্ষত। এতো আঘাত। আমি নাতো ভালো স্বামী হতে পারলাম, না তো ভালো বাবা হতে। আমার শাস্তি কি হওয়া উচিত? ‘
ঈশান ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার। রাইসুল সাহেবের মুখে সন্তান হারানোর খবর পাওয়ার পর, সন্তানের খু*নি হিসেবে নিজেকে দাড় করানোর পর, রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো সে। পাথর হয়েছিলো। শুকিয়ে গিয়েছিলো চোখের পানি। এতগুলে ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড যেনো সেই অপরাধের হিসাব মেলাচ্ছিলো। তিতিরকে কাছে পেয়ে, কাছ থেকে ওর শরীরের ক্ষতগুলো দেখে, আর সামলানো গেলো না নিজেকে।
—’ আব্বু, অ্যাম সরি। তোমার বাবা তোমাকে প্রটেক্ট করতে পারেনি। তোমার মাম্মাম কে আগলে রাখতে পারেনি। তোমার দাদু একদমই ঠিক বলেছে। আমিই যোগ্য নই তোমার মাম্মামের। আমি সবভাবে ব্যার্থ। সবভাবে। ‘
ছেলেটা শ্বাস ফেললো জোরে জোরে। গ্রীবা এগিয়ে তিতিরের কাঁধে মুখ গুজলো। তপ্ত জলে ভিজে উঠলো মেয়েটার উন্মুক্ত কাঁধ। ঘুমের তীব্রতায় টের পেলো না সে-সব। ঈশান ফিসফিস করে বললো,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (২)

—’ তোকে কি আমার মুক্তি দেওয়া উচিত, তিতির? তাহলে এই পাপের খানিকটা হলেও প্রায়শ্চিত্ত হবে? কিন্তু আমিও তো বাবা হতাম। আমারও বাচ্চা ও। তাহলে বাবা কেনো বুঝলো না। কেনো আমাকে খু*নি বললো? এ যন্ত্রনা কাকে বোঝাই, মাই লাভ। নিজের সন্তানের খু*নি হয়ে এ জীবন আমি কিভাবে পারি দেবো। তোর কোল খালি করে দেওয়ার মতো অন্যায় বয়ে নিয়ে, আমি কি করে তোর সমানে যাবো? কি করবো আমি?”

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here