সায়রে গর্জন পর্ব ১৫
নীতি জাহিদ
ফোনের ক্যালেন্ডার চেক করে দেখতেই চিন্তারা ঘিরে ধরলো হাতে আছে মাত্র দু মাস। এর মাঝেই যা করার করতে হবে, বাড়ির পরিবেশ অবস্থার কথা ভেবে ভাইজানকে জানানোই হলোনা নিরার কথা। কিছুক্ষন আগেও মেয়েটা কাঁদছিলো। হোস্টেলে মানুষ হওয়া মেয়েটা আশ্রয় হিসেবে চেয়েছে শাহীনের বুক।রায়হান সাহেব বা শাহাদ কেউ একজন দ্বিমত করলেই হয়তো এর প্রতিবাদ করতে পারবেনা।অন্যভাবে, প্রতিবাদ না করলেও কাপুরুষের খাতায় নাম উঠবে। একদিকে নিরা অন্যদিকে শাহাদ। চিন্তিত শাহীন ফোন দিলো শাহাদকে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
– বলো শাহীন, সব ঠিক আছে বাড়িতে?
– জ্বি ভাইজান।
– শেফালীর কি অবস্থা?
– ভালো আছে।
– ভাইজান…
– হ্যাঁ বলো
– একটা কথা ছিলো।
– হুম
– মানে আপনি কিভাবে নিবেন…
– আনবান না করে সরাসরি বলো।
– সেদিন আম্মু বিয়ের কথা বলছিলো না। মেয়ে দেখতে যাবেন আপনারা…
– হুম
– মেয়ে কি পেয়েছেন? আমার তো হাতে দু মাস আছে।
– জানিনা আমি,আম্মু জানে।
– ওহ। আচ্ছা ঠিক আছে ভাইজান।এই জন্যই।
– হুম।
দুজনই চুপ। তৎক্ষনাৎ শাহাদ বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– কাপুরুষের মতো ব্যবহার করছো কেনো? আম্মু পছন্দ করলেই কি তুমি বিয়ে করবে? নওরীনকে কথা দিয়েছিলে কেনো?
শাহীনের বুক আচমকা ধুকধুক করা শুরু করেছে।মনে হলো কেউ ৩২০ ভোল্টের শক দিয়েছে। শরীর কাঁপছে।গলা শুকিয়ে কাঠ। অনবরত ঢোক গিলছে। টেবিলের সামনে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। কি শুনলো! ভাইজান নওরীনের কথা কিভাবে জানে! পানি খেতেই বিষম খেলো। ও পাশ থেকে পুনরায় স্বর ভেসে এলো,
– আস্তে পানি পান করো। নাকে মুখে উঠে যাচ্ছে।
– ভাইজান আসলে…
– নওরীনের অভিভাবক কে হবে?
– আমি বলতাম ভাইজান আপনাকে…
– বলোনি তো। সে কথায় আর না যাও।
– ভাইজান রাগ করবেন না। নওরীনের কেউ নেই। ওর বাবা মা…
– ঠিক আছে। আমি ঢাকা ফিরে এই ব্যাপারে কথা বলব।
– ঠিক আছে ভাইজান।
– শুভ রাত্রী।
ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই ধপ করে খাটে বসে পড়ে। আরো এক গ্লাস পানি খেয়ে নওরীনকে ফোন দেয়। ফোন রিসিভ হলো না। চিন্তায় মাথা এলোমেলো হয়ে গেলো। এ যেন যুদ্ধ যাবার আগেই অতর্কিত আক্রমন। চোখ মুখ অন্ধকার, বিবর্ন। ভাইজানের প্রথম প্রশ্নই ছিলো, নওরীনের অভিভাবক কে হবে?
আব্বু জানলে তো কুচিকুচি করবে। আব্বু সবসময় বলে পরিবার ভালো না হলে মেয়েরা ভালো শিক্ষা পায়না।সেখানে নওরীনের তো পরিবারই নেই। ভাইজান আব্বুর মুখের উপর কথা বলবেনা, নিজেও ভাইজানের মুখের উপর কথা বলতে পারবেনা। তবে কি এখানেই শেষ!
শাহীনের সাথে কথা শেষে পা বাড়ায় বাড়ির ভেতর। সিক্ত বস্ত্র।হাতে ফুলের স্টিক নিয়ে কামরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সামনের ক্ষীণ আলো ধীরে ধীরে বাড়ছে। শাহাদ পিছু নিলো সেই আলোর। তাকিয়ে দেখে এন্টিক বাতিদান হাতে অপ্সরী। বাড়িটাকে মাঝে মাঝে রহস্যময় মনে হয়। এই বাতিদানটাও এত পুরনো, এন্টিক পিস নিলামে উঠালেও মিনিমাম হাজার ত্রিশেক টাকা হবে। অদ্ভুত বাতিদান হাতে দিয়া। এই মেয়েটা এত অদ্ভুত কেনো! অন্দরের শয়ন কামরায় প্রবেশ করলো দিয়া,পিছু নিলো শাহাদ। দোলনায় ঘুমে আচ্ছন্ন প্রিয় কন্যা। দিয়া পিছু না ফিরেই বলে উঠলো,
– আপনি ভিজে গেলেন কি করে শেহজার বাবা?
শাহাদ অবাক হয়ে ভাবে এর মধ্যেই দেখে নিয়েছে শাহাদকে। দিয়া ঘুরে তোয়ালে এগিয়ে দিলো। শাহাদ ফুলটা টেবিলে রেখেই দিয়ার হাত থেকে তোয়ালে নিয়ে মাথা মোছা শুরু করলো। এই প্রশ্নটার উত্তর যে কতটা ভয়াবহ এই মেয়ে জানলে প্রশ্ন করতে কয়েকবার ভাবতো।তবে এই দিয়ার রূপ ভিন্ন। মনে হয় যেন কোনো রাজমহলের রাজকন্যা। পরনে সেই গোল রাউন্ড আনারকলি। মাথার এক পাশে ঘোমটা। শাহাদ পোশাক পালটে দিয়ার দিকে না তাকিয়েই বললো,
– আমি প্রিন্সেস নূরজাহানকে দেখিনি। তবে মজুমদার মহলের প্রিন্সেস মেহতাবকে দেখেছি।
বাতিদান সেট করে দিয়া শাহাদের দিকে সন্দিহান চোখে তাকালো। কি বুঝাতে চাইলো! শাহাদ পুনরায় বললো,
– টেবিলের উপর রেখেছি রজনীগন্ধার স্টিক। বাগানের সামনে দিয়ে আসার সময় মনে হলো অনেক দিন আমি এই সৌরভ থেকে বহু দূর।
কিছু একটা ভাবলো দিয়া। শাহাদের প্রতিটা কথার অর্থ ধরতে পেরে স্তব্ধ। মানুষটার শব্দ চয়ন যতটা স্পষ্ট অর্থ ততটাই জটিল। দিয়া রজনীগন্ধার সুগন্ধি দু বছর আগে গায়ে মাখা বন্ধ করেছে।এই সুগন্ধি বানানো দাদী শিখিয়েছিলেন। দাদীজানও শিখেছেন দাদীজানের মায়ের কাছ থেকে। রজনীগন্ধার নির্যাস থেকে ঘরোয়া উপায়ে এই সুগন্ধি বানানো হয়। দাদী দিলরুবা খানম বলতেন,
-“সুগন্ধি মাখবা শুধু স্বামীর জন্য, যতদিন বাপের বাড়িত আছো নিজের জন্য মাখো। বিয়া হলে স্বামীর জন্য,স্বামী মরলে আর মাখবানা। ”
গত দু বছর দিয়া আর এই সুগন্ধি মাখেনি। শাহাদ বিয়ের রাতে বলেছিলো,
– ‘ তোমার এই পারফিউম তোমার সত্ত্বায় মিশে আছে ফারাহ। তোমার আশে পাশে থাকলে মনে হয় আমি কোনো সুন্দর উদ্যানে আছি।যেখানে আমি আর উদ্যানের সবচেয়ে সুন্দর পরীটা দাঁড়িয়ে। আমার অনুপস্থিতিতে এই পারফিউম নিষিদ্ধ তোমার জন্য।’
ঠিকই তো আছে এত বছর অনুপস্থিত ছিলো তাই এই পারফিউম নিষিদ্ধ ছিলো।তবে আজ কেনো ফুল এনে এই বাক্য তুলে ধরলো। শাহাদের অপূর্ব দৃষ্টি এখনো দিয়ার দিকে। দিয়া প্রতিউত্তর করলো ভেবে,
– এই সৌরভ শুধু আমার সন্তানের বাবার জন্য জায়েজ। যেহেতু আমি তার চেয়ে দূরত্বে ছিলাম এবং আছি, তার মনের খাতায় আমার অনুপস্থিতির সংখ্যা সর্বাধিক, সেখানে অন্য পুরুষের জন্য হারাম এই সৌরভ।
দুজনের দৃষ্টি এক বিন্দুতে স্থির।একে অপরের দিকে কঠিন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে। অপলক দৃষ্টি। কারো চোখের পাপড়ি নড়ে উঠলেই মহা অপরাধ। দুজনের আঁখিতে ধ্বংসা/ত্ম/ক স/র্ব/নাশ। এ যেন নিরব সংকেত আসন্ন কোনো ঘটনার। শাহাদের সেল ফোনের মেসেজের আওয়াজে দৃষ্টিচ্যুত হলো দু জোড়া আঁখি। ফোন চেক করে উঠে দাঁড়াতেই দিয়া পুনরায় বললো,
– প্রিন্সেস নূরজাহান কিন্তু সম্রাট জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর কিন্তু বহু বিবাহ, মদ্যপ,অকর্মক চরিত্রের ছিলেন। আপনি আমাকে কি হিসেবে সিম্বোলাইজ করেছেন। সেই তুলনায় আকবর,শাহজাহান শ্রেষ্ঠ ছিলেন।
– না আমি জাহাঙ্গীর, না শাহাজাহান। আমার ক্ষমতা নেই এত বিয়ে করার। তবে আকবরের সাথে কিঞ্চিৎ মিল আছে। আকবর সনাতনধর্মের মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে আর আমি ইরানী। বেশ ভালো ইতিহাস জানো দেখছি। আকবরের সাথে ও তুলনায় লাভ নেই। আকবরের স্ত্রী সংখ্যা ধারণা অনুযায়ী ৫০০ এর অধিক। প্রিন্সেস নূরজাহানের কাজের ধরন তোমার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়তো!! আজকে বিকেলের কাজটা না দেখলে বুঝতেই পারতাম না।
দিয়া নিশ্চিত হলো এতক্ষনে। শাহাদ বিকেলেই ওই বাড়িতে ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে। পাভেল বলে দিয়েছে। আর রুমের কথোপকথন তো শাহাদ দেখে ফেলেছে তখনি বুঝতে পেরেছিলো। শাহাদের কি হয়েছিলো তা জানতে পাভেলের কাছে গিয়েছিলো দিয়া। পাভেল ফোনে মনি সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করছে,তখনই সন্দেহ হয়েছিলো। নিজে খুঁচিয়ে বের করেছে, মনি শাহাদকে অনেক আগে থেকেই চায়। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে ফেলেছে তখনই। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে শেফালী। উপরে যখন সকলে কথা বলছিলো। মনি হঠাৎ করে পেছন বারান্দার দরজা দিয়ে ঢুকলো। কিছুটা সন্দেহ লেগেছিলো। শ্বাস আটকে আসছিলো।মনে হচ্ছে,কেউ ওকে দৌঁড়িয়েছে মাইলের পর মাইল। শাহাদের কথা ইঙ্গিতে অনেকেই অনেক কিছু বুঝেনি। দিয়া বুঝতে পেরে নিশ্চুপ ছিলো।সকলের সামনে শেহজাকে কোলে নিয়ে তাহিকে বলেছিলো,
– আপু,আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে আমার কোনো রকম জোড়া লাগানো সংসারও কেউ ভাঙতে চাইছে।সেদিন বলেছিলাম না একটা কাজ পারিনা। এবার মানুষ খু*ন করে আমি সেই কাজটাও সম্পূর্ণ করবো।আমি কেনো কথা বাড়াই না জানেন? আমার বাবা ছিলো শান্তি প্রিয় একজন মানুষ। শিখিয়েছেন কিভাবে ধৈর্য্য ধরতে হয়,তবে আমার মা ছিলেন মহিয়সী। মায়ের কাছ থেকে তলোয়ার চালানো শিখেছি,সাইকেল চালাতে পারি।আমি কিন্তু ঘোড়াও চড়তে জানি। আমার বাবা মায়ের জন্মদিনে মাকে ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন।আমার অনুরোধে দাদাজান সেই ঘোড়াকে নিরাপদ স্থানে রেখে গিয়েছেন। দুনিয়াতে আমার এখন শেহজা আর ওর বাবা ছাড়া কেউ নেই।ওদের ক্ষতি করতে আসলে এবার আমি কারো গলায় ছোরা বসাতে এক মুহুর্ত বিলম্ব করবোনা।
বিকেলের ঘটনা মনে পড়তেই কথা না বাড়িয়ে সামনেই এগিয়ে চলে যেতে চাইলো। আচমকা থমকে বললো,
– আমি জানি সত্যি আমি খুব সুন্দর। বাবাজান আর আম্মিজানের অপরূপ সৌন্দর্য্যের সংমিশ্রণ আমি। সেই হিসেবে আপনি আমাকে প্রিন্সেস নূরজাহান না বলে প্রিন্সেস ডায়না বলতে পারেন। সেই বিখ্যাত উক্তি,” আমি যাকে ভালোবাসি, সে ছাড়া পুরো বিশ্ব আমাকে ভালোবেসেছিলো।”
শাহাদ নিষ্পলক চেয়ে রইলো দিয়ার যাওয়ার দিকে।বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই চোখে হানা দেয় রাজ্যের ঘুম।
উৎসব আমেজ শেষ। সকলের কাজে ফেরার সময় হয়েছে। নিজ কামরায় এসেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে গেলো। ঢাকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বারোটা। বাড়িতে সবাই এর আগে চলে এসেছে। শেহজাকে পেয়ে শিফা খুশিতে নাচতে নাচতে নিয়ে গেলো। দিয়া শাশুড়ীকে সাহায্য করতে রান্নাঘরে যেতেই শাহীন বললো,
– ভাবীমা একটা গুরুদায়িত্ব দিব পারবেন।
দিয়া চমকে উঠে ভাবুক চোখ শুধায়,
– কি দায়িত্ব ভাইয়া?
– ঘাবড়াবেন না প্লিজ। আগে বলেন ভাইজানের মুড কেমন?
– আমার সাথে তো সকাল থেকে দুটো কথাই হয়েছে,রেডি হও আর গাড়ি থেকে নামো। বুঝতে পারছিনা। হয়তো ভালো হবে।
– আজ বাড়িতে একটা বোম ফুটতে পারে আমার বিয়ে নিয়ে।সামলে নেবেন প্লিজ। আমি যাকে পছন্দ করতাম ভাইজান জেনে গিয়েছে। আমি শিউর আব্বু মুখের উপর না করে দিবে। ভাইজান আব্বুর মুখে তর্ক করেনা।
দিয়া মুচকি হেসে বলে,
– আচ্ছা এই ব্যাপার।ঠিক আছে আমি দেখছি। একটা বুদ্ধি দি?
– কী?
– বাসায় আজ সব কাজিনদের ফোন দিন। সবাই থাকলে ঝাড়ি কম খাবেন।
– সেরা তো।
– বাকিটা দেখি কি করা যায়। তবে মেয়ে ভালো??
– পাক্কা। আপনার সাথে পারা দিয়ে ঝগড়া করতে আসবেনা। উলটা দেখবেন পা ছুঁয়ে সালাম করতে ছুটে আসবে।
– ইয়া আল্লাহ না না তার প্রয়োজন নেই।
সেই মুহুর্তে শেফালী লুলা পা নিয়ে এগিয়ে এসে বলে,
– ছোট ভাইজান,এই মেয়ের সাথে কেনো কথা বলছো? আমার বড় ভাইকে অশান্তিতে রেখে শান্তি হয়নি তো এখন আসছিস আমার ছোট ভাইয়ের সাথে ন-ষ্টামি করতে। বে**শ্যা।
প্রচন্ড জোরে আওয়াজ হলো। ছিটকে গেলো শেফালী। তব্দা খেলো শাহীন, দিয়ার মুখে হাত। রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছে সুলতানা কবির। রায়হান সাহেব ডায়নিং এ বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। শিফা শেহজাকে নিয়ে হাজির। এখনো শেফালী আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে। ছলছল চোখে চেয়ে আছে। মুখ দিয়ে একটি শব্দ উচ্চারণ করলো,
– বড় ভাইইজান…
শাহাদ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে। ঘুরে তাকালো শাহীনের দিকে। শাহীন বার কয়েক ঢোক গিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
– ভাইইজান আমি… কিছু… করিইইনি। জানিনা।
শাহীনের দিকে ভস্মীভূত দৃষ্টি নিয়ে বলে,
– যখন কেউ অর্ধাঙ্গীর চরিত্র নিয়ে আঙ্গুল তুলে এভাবে তাকে শায়েস্তা করতে হয় মনে রাখবি।
আজকে ভাইয়ের চোখে অনল দেখে কলিজা কাঁপছে। শেফালী কি করে এই কথা বললো! ভাবীমার চরিত্রে দাগ লাগালো।জড়িয়ে দিলো তার সাথে।তাহলে কি সে বাড়ির ভেতরে ভাবীমার সাথে কথা বলতে নিরাপদ নয়।সামান্য একটু কথা নিয়ে এত বড় ইস্যু। শেফালীর দিকে আঙ্গুল তুলে শাহাদ শাসিয়ে বলে,
– আজকের দিনের জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছি। যদি আমি ভুল হই নিজের হাতে সমস্ত সত্ত্বা ভুলে গিয়ে আমার ভালোবাসাকে মাটিচাপা দিয়ে ফারাহকে জ্যান্ত পুঁতে দিব। আর যদি কোনোভাবে আমি সঠিক হই তাহলে দিন গুণতে থাক শেফালী। ভাই হিসেবে যেমন আগলে রেখেছি ঠিক তেমনি শূঁলে চড়াবো তোকে আমি। আম্মুর জন্য প্রতিবার বেঁচে গিয়েছিস। আজ এতটাই নিচে নেমেছিস যে এক ভাইয়ের বউকে ছোট করতে অন্য ভাইয়ের চরিত্রে দাগ লাগাচ্ছিস!
সুলতানা কবির ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন,
– বাবু কি করেছে এই মেয়ে?
– জিজ্ঞেস করুন।
শাহীন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আম্মু, থাক না ওসব।
– না বল।
– আমি ভাবীমার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম,শেফালী তখন আমাকে আর ভাবীমাকে মিশিয়ে বাজে কথা বলছিলো।
গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে গেলো শাহীনের লজ্জ্বায়। রায়হান সাহেব,সুলতানা কবির আর শিফা হতবাক। শাহাদ যেভাবে তাকিয়ে আছে শেফালীর দিকে আজই সব অনলে পুড়িয়ে ছাই করবে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বের হচ্ছি আমি। দেখে রাখবেন আমার আমানত আম্মু। বহাল তবিয়তে থাকে যেন।
বেরিয়ে গেলো। রুমে চশমা আর গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল ফেলে যাওয়াতে ফিরে এসেছিলো নিতে।শুনে ফেলেছে শেফালীর মুখ নির্গত বাচ্য।নিজেকে আজ দমায়নি। নোমানকে ঢাকা আনা হয়েছে।আগে ঘরের সমস্যা সমাধান হবে।
সেই রাতের কথা আজো মনে পড়ে যায়। দুপুরে দিয়ার মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে হাসে শাহাদ। শাহাদের দিনগুলো কা*টে দিয়ার খুনশুটিতে। মধ্যাহ্ন ভোজ শেষে দুজনই বিশ্রামের জন্য যায়। দিয়া একটা লাল শাড়ি পরে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ভঙ্গি করে দেখাচ্ছে। দাদীজান বলতেন,
– মেহতাব বিবি, আপনারে তো মহলের সেরা সুন্দরী লাগতাছে। আমারে আজকে পানে একটু বেশি কইরা জর্দা দিবেন। আপনার মত লাল ঠোঁট বানায়ে মজুমদার মশাইকে আকৃষ্ট করমু নে।
– ইশ বুড়ির কত ঢং।
শাহাদ হাসছে দিয়ার ঢং দেখে। দিয়া মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে,
– হাসবেন না নেভিয়ান মশাই। আরো দেখবেন দাদা সাহেব কিভাবে রোমান্স করে?
– কিভাবে কিভাবে??
শাহাদ উৎসুক দৃষ্টিতে শোয়া থেকে উঠে বসলো। দিয়া ঢং করে শাহাদের হাত ধরে বলে,
– আপনি এখানে দাঁড়ান। আমার কোমরে হাত দিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে বলেন, ও আমার দিলরুবা, তুমি তো অপরূপা। তুমি আমার জানেরই জানের জান পরানের পরান।
শাহাদ অনুকরণ করে বললো,
– ও আমার ফারাহ, তুমি অপরূপা,তুমি আমার জানেরই জান পরানের পরান।
দিয়া বলে উঠলো,
– আহ হা, মুরাদের বাপ আপনার কি ভীমরতি ধরছে। মেহতাব বিবি এসে পড়বে তো। ছিঃ ছিঃ লজ্জ্বা।
শাহাদ তাল মিলিয়ে বলে,
– ইশ কি লজ্জ্বা! কিছু হবেনা আসুক কেউ। আমি আমার বউকে আদর করবো এখন।
দিয়া ভ্রু কুচকে বলে,
– সীন থেকে বেরিয়েন আসেন মশাই।
– কিসের কি? আমি এখন ব্যস্ত সীনে। বিরক্ত করবেনা। মুড চলে এসেছে।
দিয়া নিজেকে ছাড়াতে চেয়েও পারলোনা। শক্ত পোক্ত পুরুষালি হস্ত আকড়ে ধরলো। লজ্জালু দিয়া নিজেকে আড়াল করলো মানুষটার মাঝে। প্রতিদিনের এই ভালোবাসাময় স্পর্শ দিয়াকে ভুলিয়ে দিয়েছে আপন মানুষ না থাকার কষ্ট। মৃদুমন্দ বাতাস ভেসে আসছে বারান্দা দিয়ে। বিয়ের পর থেকে গত এক মাস শাহাদ প্রতিটি মুহুর্তে মাতিয়ে রেখেছে অবিরাম সুখে।শাহাদের আকাঙ্ক্ষিত নারী এই ফারহানা মেহতাব দিয়া। ভালোবেসে স্ত্রীর নাম দিয়েছে ফারাহ। যার নামের অর্থ “সুখ”। রাশেদ চলে যাবার পর ভুলেই গিয়েছিলো ভালো থাকা। দিয়া এসে শাহাদের জীবনটাকে সুখে রাঙিয়ে দিয়েছে। তবে সেই সুখের মেয়াদ ছিলো মাত্র একমাস। সেদিন রাতেই ঘটে যায় ভয়াতুর, হৃদয় কাঁপানো ঘটনা। সেই সত্যতা বের করতেই আজ মুখোমুখি হবে নোমানের। শাহাদের আত্না কেঁপে উঠেছিলো সেদিন প্রনয়ীনিকে নোমানের বুকে দেখে। আজ ও বিশ্বাস হয়না, ইশ যদি ভুল হত সেই চিত্র,যদি মিটে যেত সেইদিন।যদি এমন হত এমন কোনো দিন জীবনে আসেনি। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে সব রকমের ভ্রমকে ছাপিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা সত্যি প্রমানিত হয়েছিলো নোমানের কথায়,
সায়রে গর্জন পর্ব ১৪
– হ্যাঁ ভাইজান আমার আর দিয়ার সম্পর্ক চলছে।
শেফালী চেঁচিয়ে বলেছিলো,
– আমি ভাবীকে আরো অনেকবার দেখেছি নোমানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে। আমার জীবনের সুখ কেড়ে নিয়েছে এই মেয়ে ভাইজান। এক্ষুনি বের করে দিন।
দিয়ার চুল ধরে সেদিন শেফালী কষে থা/প্পড় মেরেছিলো। লা/থি দিয়েছিলো পেট বরাবর। তবে মহান রবে ইচ্ছে হয়তো আরো মহান। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর সেদিনই পেয়েছিলো। জটিলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে ন’মাস। শর্ত মতে শেহজার এক বছর হলে শাহাদের সাথে বিচ্ছেদ হবে দিয়ার। মাত্র দু মাস সময় আছে। আজ শেহজার দশ মাস। সকল সম্পর্কে আজ ছেড়ে যাবে। শাস্তি পেতে হবে অপরাধীকে। হোক সে দিয়া! অথবা শেফালী! অথবা নোমান!!
