Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৩

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৩

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৩
Raiha Zubair Ripti

ভোর সকালে “নয়া দিগন্ত” নামের একটা সংবাদপত্রের ৪ নম্বর পাতায় ছাপা হয়েছে একটি চাঞ্চল্যকর খবর। পুরান ঢাকার আলোচিত তান্ত্রিক নরেশ খন্দকারের রহস্যজনক মৃত্যু। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন মানুষের ওপর কালো যাদু, তাবিজ-কবচ ও গোপন তন্ত্রসাধনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। গতকাল গভীর রাতে তার ব্যক্তিগত ডেরায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নরেশ খন্দকারের নিথর দেহ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থল থেকে আরও বেশ কিছু অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি মুসলিম হয়ে জন্ম নিলেও পরবর্তীতে তিনি নাস্তিক হন। নিজের নাম হোসাইন খন্দকার থেকে নরেশ খন্দকার করেন।

প্রাথমিক তদন্তে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মৃতদেহের শরীরে কোনো ধরনের আঘাত, ক্ষত কিংবা বিষক্রিয়ার সুস্পষ্ট চিহ্ন,কক্ষের ভেতরেও জোরপূর্বক প্রবেশের কোনো আলামত মেলেনি। ফলে এটি আত্মহত্যা, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু,সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মৃত্যুর কয়েকদিন আগ থেকেই নরেশ খন্দকার অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, রাতের বেলায় তার ডেরা থেকে প্রায়ই অদ্ভুত শব্দ ও চিৎকার শোনা যেত।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে। তবে রহস্যজনক এই ঘটনাকে ঘিরে পুরো এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত এখনো চলমান।
খবর টা পড়েই সেলিম মির্জার শরীর টা অদ্ভুত এক কাঁপুনি দিয়ে তরতর করে ঘামতে শুরু করলো। তান্ত্রিক মা-রা গেছে! কে মারলো? স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলো এটা? নাকি অস্বাভাবিক?
সাইদা মির্জা আকস্মিক স্বামীর চোখ মুখের এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখে কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-

“ কি হলো হঠাৎ? এমন দেখাচ্ছে কেনো তোমায়? ”
সেলিম মির্জা যেন চমকে উঠলো ভয়ে। কথার তালগোল পাকিয়ে ফেলতে শুরু করলো। হাতে থাকা খবরের কাগজ টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল- “ দেখো। ”
সাইদা মির্জা কুঁচকে রাখা চোখ মুখ নিয়ে খবরে কাগজটা দেখতেই তা সটান হয়ে চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। ফিসফিস করে জানতে চাইলো-
“ ক..কি করে হলো এটা? ”
“ জানি না সাইদা। গতকাল ও তো কথা হলো। তান্ত্রিক বললো কালো যাদু নাকি কাজ করছে না। সিকান্দারের এক মাইলের আশেপাশেও শয়তান যেতে পারছে না। সে ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। তান্ত্রিকের কথা শুনছিলো না। তান্ত্রিক কে আঘাত করতো সিকান্দারের কাছে আসতে পারছিলো না বলে। আচ্ছা ঐ কালো শক্তিই মারে নি তো তান্ত্রিক কে? ”
সাইদা মির্জা মুখ চেপে ধরলো তার। সতর্ক করে বলল-
“ হিসসস আস্তে বলো। কেউ শুনে ফেলবে তো। এটা তো এখন পুলিশদের কাছে চলে গেছে। কল লিস্ট চেক করলে তো তোমার নম্বর পেয়ে যাবে। সন্দেহের তালিকায় থাকবে। লোকজন জেনে যাবে তুমি বাবা হয়ে ছেলেকে কালো যাদু করেছিলে। ”

“ ওসব নিয়ে ভেবো না। এই কথাটা পাবলিক হবে না। ভুলে যেও না আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সত্য কে মিথ্যা আর মিথ্যা কে সত্য করতে পারি। পুলিশ দের বলা হবে আমার নাম যেন না আসে এসবে। ”
“ তাহলে তো হলোই। এসব নিয়ে আর কথাবার্তা বলো না। মরে গেছে, ল্যাটা চুকে গেছে। সিকান্দার যে সুস্থ হয়ে গেল। এখন কি করবে? ”
“ মাথা কাজ করছে না। এই ছেলে কিভাবে বাঁচলো এই কালো যাদুর কবল থেকে? বুঝে গিয়েছিল নাকি? ”
“ কি জানি বাবা। তোমার ছেলের ভাবভঙ্গি দেখে তো মনে হচ্ছে না বুঝে গেছে। বুঝে ফেললে বাড়িতে হাঙ্গামা হতো না? মনে হয় বুঝে নি। সেজন্যই এত শান্ত এখনো। ”
“ না বুঝলেই ভালো। এ ছেলেকে আর বশে আনা সম্ভব না হয় তো আমার এই জীবনে। ”
“ আচ্ছা চিন্তা করো না,আমি দেখি কি করা যায়। এখন চলো রেডি হয়ে অফিসে যাবে তো। ”

সাইদা মির্জা আর সেলিম মির্জা চলে যেতেই সিকান্দার নিচে নামলো। ফজরের নামাজ শেষে সে একটু মর্নিং ওয়াক করে। বসার ঘর কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় টি-টেবিলের উপর খবরের কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে চোখ সরাতে গিয়ে আবার চোখ আঁটকে ফেললো সেখানে। কালো যাদু নিয়ে কিছু একটা লেখা দেখলো মনে হলো। এগিয়ে আসলো। ঝুঁকে খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে পুরো লেখাটা পরলো। পড়া শেষে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো। কালো যাদুর পরিচর্চা আজকাল একটু বেশিই হচ্ছে দেশে। কিন্তু এই তান্ত্রিকের এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারন কি?
সিকান্দার খাবরের কাগজ টা যথাস্থানে রেখে চলে গেলো।
শিফার বাবা, শফিক সাহেব অনেক চেষ্টা করেও আর কোথাও থেকে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নিজের জীবনের শেষ সম্বল, পৈতৃক ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি বন্দক রাখতে হলো।
তিনি বিক্রি করতে চাননি। সেই মাটির সাথে জড়িয়ে ছিল তার বাবার স্মৃতি, দাদার স্মৃতি, অসংখ্য সুখ-দুঃখের গল্প। কিন্তু শিফা আর তার মা কোনোভাবেই টাকার অভাবে নিজের বাবা ও স্বামীকে হারাতে রাজি ছিলেন না। তাদের বিশ্বাস ছিল, মানুষটা বেঁচে থাকলে আল্লাহ চাইলে আবার সবকিছু ফিরে পাওয়া যাবে। কিন্তু মানুষটাই যদি না থাকে, তবে সেই ঘরবাড়ি দিয়ে কী হবে?
গ্রাম থেকে টাকা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতেই তারা বিস্মিত হয়ে গেল। হিসাব বিভাগের লোক জানালেন-

“ আপনার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা ইতোমধ্যেই জমা হয়ে গেছে। ”
শফিক সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন।
“ জমা হয়ে গেছে মানে?
“ জি। কয়েকদিন আগেই একজন ভদ্রলোক এসে সব পরিশোধ করে গেছেন।
“ কে সেই ভদ্রলোক ? ”
মনে মনে শফিক সাহেব ভাবলেন সেলিম মির্জা নাকি? কিন্তু তার ভাবনা কে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে লোকটা বলে উঠলো-
“ সিকান্দার শাহ্ নাম ছিলো উনার। ”
নামটা শুনে শিফা স্তব্ধ হয়ে গেল। কর্মচারী ড্রয়ার খুলে একটি সাদা খাম বের করে আবার বললেন-
“ আপনারা ঢাকার বাইরে ছিলেন বলে উনি একটা চিঠি রেখে গেছেন।
শিফা ধীরে ধীরে খামটা হাতে নিল। হাসপাতালের করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা খুলতেই ভেতর থেকে একটি ভাঁজ করা চিঠি বেরিয়ে এলো। শিফা পড়তে শুরু করল-

“ আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ, আঙ্কেল। আশা করি চিঠিটা পড়ার সময় আপনি আল্লাহর রহমতে সুস্থতার পথে আছেন। প্রথমেই একটা কথা বলি,আপনি যখন এই চিঠি পড়বেন, তখন ইনশাআল্লাহ আপনার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ হাসপাতালের কাছে জমা হয়ে যাবে। এই কথাটা জানার পর দয়া করে আপনার মন থেকে সব দুশ্চিন্তা দূর করে দিন। দ্বিতীয়ত আপনার ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল না। তাই সরাসরি যোগাযোগ করতে পারিনি। শুনলাম আপনি গ্রামে গিয়েছেন নিজের ভিটেমাটি আর ঘরবাড়ি বন্দক রেখে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে। কথাটা শুনে মনটা খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল। দাদির কাছ থেকে আপনার শারীরিক অবস্থার কথা জানার পর বুঝতে পারলাম, এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা। আপনি মির্জা বাড়িতে এসেছিলেন হয়তো অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু ফিরে গিয়েছিলেন ব্যথিত হৃদয়ে। সেজন্য আমি আপনার বাল্যকালের বন্ধু সেলিম মির্জার পক্ষ থেকে আপনার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। মানুষের ভুলের দায় অন্য কেউ বহন করতে পারে না, তবুও তার ছেলে হিসেবে মনে হয়েছে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা আমার দায়িত্ব।
শুনুন আঙ্কেল, আপনার চিকিৎসার জন্য যে টাকা প্রয়োজন ছিল, সেটা আমি হাসপাতালের কাছে জমা দিয়ে দিয়েছি। আল্লাহর ওয়াস্তে এই বিষয়টি নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না। আর একটি অনুরোধ। দয়া করে এই টাকা আমাকে ফেরত দেওয়ার কথা কখনো ভাববেন না।

আমি কোনো ঋণ দিইনি, কোনো উপকারও করিনি। কোনো দয়াও করি নি। একজন মানুষ হিসেবে আর একজন সন্তানের জায়গা থেকে আমার যতটুকু দায়িত্ব ছিল, আমি শুধু সেটুকুই পালন করার চেষ্টা করেছি।
ধরে নিন, আপনার নিজের ছেলে আপনার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা পাঠিয়েছে।
আপনার চিকিৎসার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন ছিল, সেটুকু আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর আমি এটা বিশ্বাস করি যে আজ আমি আপনার জন্য যা করেছি, তার প্রকৃত প্রতিদান আপনি নয়, আল্লাহ নিজেই আমাকে দিবেন। তাই অনুরোধ করছি, সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমাকে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা কখনো ভাববেন না।
আর যদি কখনো আমার জন্য কিছু করতে চান, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে আমার জন্য দু’আ করবেন। আল্লাহ যেন আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের ওপর অটল রাখেন। তিনি যেন আমার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। আমার অন্তরকে তাঁর দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখেন। আমাকে মানুষের উপকার করার তাওফিক দান করেন। আমার কাছে সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হবে।
নিজের ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি কিংবা জমিজমা নিয়ে চিন্তা করবেন না। সুস্থ হয়ে উঠুন। আপনার পরিবারের কাছে ফিরে যান। আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানদের জন্য আপনার সুস্থতা সবচেয়ে বড় সম্পদ। মহান আল্লাহ আপনাকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আপনার পরিবারকে হেফাজতে রাখুন। আপনার রিজিকে বরকত দান করুন।
ওয়াসসালাম।
আপনার আরেক ছেলে,
~সিকান্দার শাহ্..

চিঠির শেষ লাইনটা পড়তেই শিফার গলা আটকে গেল। “আপনার আরেক ছেলে…”
শব্দ দুটো যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করল শফিক সাহেবের হৃদয়ে। তিনি ধীরে ধীরে চিঠিটা হাতে নিলেন। অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর বুঝলেন, তার চোখ ভরে উঠেছে পানিতে। এক ফোঁটা…দুই ফোঁটা…তারপর টুপটাপ করে অশ্রু ঝরে পড়ল চিঠির ওপর। তিনি মাথা নিচু করে বসে রইলেন। জীবনে কত আত্মীয় দেখেছেন, কত আপনজন দেখেছেন। কতজনের দোরগোড়ায় গিয়েছিলেন। সবাই ফিরিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু রক্তের সম্পর্ক না থাকা একটি ছেলে তার জন্য এমন করবে,এটা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল সেই বন্দকের কাগজগুলোর কথা। সঙ্গে করে আনা টাকার ব্যাগটার দিকে তাকালেন তিনি। টাকাগুলো আর চিকিৎসার জন্য লাগবে না
তাহলে। এখন এই টাকা দিয়ে তিনি নিজের ভিটেমাটি ছাড়িয়ে আনতে পারবেন।
শিফা একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের পুরুষকে একতরফা ভালোবেসেছিল। যাকে তার ইহজনম পরজনম কেনো, কোনো জনমেই পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও তাকে ভালোবাসতে পারার সৌভাগ্য টুকুই বা ক’জন পায়? শিফা তাকে না পেয়েও শুধু একতরফা ভাবে ভালোবেসেও নিজেকে সৌভাগ্যবতী ভাবছে। যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তাদের এই দূর্দশা দেখে। তখন সিকান্দার যেন ফেরেস্তা স্বরূপ হয়ে তাদের জীবনে আসলো আল্লাহর তরফ থেকে। কারন আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে সরাসরি কোনো ফেরেশতা পাঠান না। বরং একজন সৎ মানুষ কে পাঠান। প্রকৃত মানুষরাই মানুষের উপকারে আসে।
শফিক সাহেব কাঁপা গলায় বললেন-

“ আল্লাহ… এমন ছেলেও আজকের দিনে আছে?”
তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। দুই হাত মুখে চেপে ধরে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন তিনি। সেই কান্না ছিল আল্লাহর রহমতকে চোখের সামনে দেখার। আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বললেন-
“ হে আল্লাহ… মানুষের রূপে তুমি আজ আমার জন্য রহমত পাঠিয়েছো। আমি জানি না সিকান্দার শাহ্ আমার জন্য কী, কিন্তু তুমি তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণ লিখে দিও। তার ঈমানকে পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ় করে দিও। তাকে কখনো কারও মুখাপেক্ষী করো না। যেভাবে সে আজ আমার ভেঙে যাওয়া মনটাকেও বাঁচিয়ে দিল, সেভাবে তুমি তার জীবনটাকেও তোমার রহমতে ভরিয়ে দিও, আমিন।

সিমরান আর অর্নবের সম্পর্ক টাকে ঠিক করানোর জন্য সেলিম মির্জা আর সাইদা মির্জা তাদের নেপালে পাঠিয়েছেন। এ বাড়িতে এখন কেবল তারা পাঁচজন আর কাজের লোকেরা আছে। সিকান্দার আজ আজ দুপুরে নিজের গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিল । শিফার বাবার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করার পর তার হাতে যে টাকাগুলো অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো নিয়েই সে এক ট্রাভেল এজেন্সিতে এসেছে। আর মাত্র কয়েক মাস পর যিলহজ্জ মাস। সে প্রতিবছরই হজে যায়। আর প্রতিবছরই সেখানে গিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাদী হিসেবে উট কুরবানি করে। প্রতিবছরের মতো এবারও সে আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেখানে উট কুরবানি করার নিয়ত করেছে। তবে এবারের হজটা তার কাছে অন্যরকম। কারণ এবার সে একা নয়। এবার তার পাশে থাকবে তার স্ত্রী মুনতাহা। যাকে নিয়ে সে মক্কা-মদিনায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। অফিসের ভেতরে বসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিচ্ছিল সিকান্দার। মুনতাহা আগে কখনো হজে যায়নি। তার কোনো পাসপোর্টও আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না। তাই সিকান্দার নিজেই সব কাগজপত্র, পাসপোর্ট প্রসেসিং আর ভিসার ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করছে। ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে বসে সে একে একে সব ফর্ম পূরণ করছিল।
কর্মচারী বলল-

“ স্যার, নতুন আবেদন তাই প্রসেসিং একটু সময় লাগবে। দুজনেরই ভিসা একসাথে লাগবে।”
সিকান্দার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
“ ঠিক আছে, সব দ্রুত করে, হজ প্যাকেজের সব প্রসেসিং শুরু করে দিন। ”
কর্মচারী হাসি মুখে বললেন-
“ জি স্যার। ”
কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে করতে সিকান্দারের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। জীবনে সে অনেকবার হজ করেছে।
কাবা শরীফ দেখেছে। আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে কান্না করেছে। মুযদালিফার আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে। মিনার পথে পথে হেঁটেছে।
কিন্তু এবারের অনুভূতিটা যেন একেবারেই আলাদা। প্রথমবারের মতো নিজের স্ত্রীকে নিয়ে আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য হতে যাচ্ছে তার। মুনতাহা তার কাছে বাসর ঘরে এই আব্দার টা করেছিল। মুনতাহাকে সাদা ইহরামের ভিড়ে কাবার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখার কল্পনাতেই তার বুকটা ভরে উঠল। স্বাক্ষর শেষ করে সে কাগজগুলো কর্মচারীর দিকে এগিয়ে দিল। তারপর খুব ধীরে মনে মনে বলল-

“আলহামদুলিল্লাহ…”
মানুষ হয়তো তার এত খরচ দেখে ভাবে সে নিজের অর্থ খরচ করছে। কিন্তু না, সিকান্দার জানে, আল্লাহ যার জন্য ব্যয় করার তাওফিক দেন, প্রকৃত মালিকানা আসলে তাঁরই।
শিফার বাবার জন্য কিছু ব্যয় করতে পেরে যেমন তার মন শান্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি নিজের স্ত্রীকে নিয়ে হজের নিয়ত করেও তার হৃদয় ভরে উঠছে কৃতজ্ঞতায়। সে বিরবির করে রবের নিকট শুকরিয়া আদায় করে বলল-
“ ইয়া রব , আমার এই সফরকে আপনি কবুল করুন। আমার সামান্য আমলকে আপনি আপনার রহমতে ঢেকে দিন। আর আমাকে এমনভাবে বানান, যেন আমি শুধু আপনারই হয়ে বাঁচতে পারি আজীবন। ”
সিকান্দার রাতে বাড়ি ফিরলো। মুনতাহা তখন এশার নামাজ পড়ে একটু দোয়া-দরুদ পড়ছিলো। বেশ অনেক গুলো দোয়া-দরুদ সে শিখেছে সিকান্দারের থেকে। শুদ্ধ ভাবে কুরআন পড়া শিখছে।
সিকান্দারের রুমে ঢোকার উপস্থিতি টের পেয়ে মুনতাহা পড়া শেষ করে রুমে এসে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দেয়। সিকান্দার পানিটা খেয়ে হাসি মুখে বলল-
“ আপনার আর আমার হজে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে আসলাম মন। ইনশাআল্লাহ এবার আমি আপনাকে সাথে নিয়ে হজে যাচ্ছি। আপনার স্বপ্ন আমার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। ”
মুনতাহার চোখ মুখ খুশিতে ফুটে উঠলো –

“ সত্যি যাচ্ছি? ”
“ হুম। আপনার পাসপোর্ট তো নেই। সেটার জন্য কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। ”
“ আমি আর আপনিই যাচ্ছি শুধু? ”
“ হু। আর কেউ তো নেই যাওয়ার। ”
মুনতাহা পাশে বসলো। সেলিম মির্জার কত টাকা পয়সা,তারপরও তিনি হজ করতে যান না। তার ছেলেমেয়ে স্ত্রী রাও যায় না। এত টাকা পয়সা থেকে তাহলে লাভ হলো কিসে? যদি মানুষের কাজে,আল্লাহর পথেই ব্যয় করতে কার্পণ্য করে।
সিকান্দার ফ্রেশ হয়ে এশার নামাজ পড়ে বসার ঘরে আসলো। কেউ নেই এখানে। দাদি রুমে শুয়ে আছে। সাইদা মির্জাও রুমে। সেলিম মির্জা বাসায় নেই। সিকান্দার সোফায় বসে পকেটে থাকা ফোনটা বের করলো। কিছুক্ষণ স্ক্রোল করতেই বসার ঘরের টেলিফোন টা বেজে উঠলো। সিকান্দার গিয়ে ধরলো ফোনটা। ওপাশ থেকে এক পুরুষালী গলায় ভেসে আসলো-

“ সেলিম স্যার বাসায় আছে? উনাকে ফোনে চেষ্টা করলাম। পেলাম না। ”
সিকান্দার চিনলো না। সেজন্য বলল-
“ উনি বাসায় নেই। আপনি কে বলছেন? ”
“ আমি ইন্সপেক্টর শরাফত উল্লাহ। আপনি কে? ”
“ আমি সিকান্দার শাহ্। ”
লোকটা নাম শুনেই চিনে ফেললো। সেজন্য বিনয়ের সাথে বলল-
“ স্যারের ছেলে। দুঃখিত চিনতে পারি নি। আপনার বাবা আসলে বলবেন একটু যেন থানায় আসেন। ”
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে আসলো।
“ সব কিছু কি ঠিকঠাক আছে? থানায় যাওয়ার কথা বলছেন যে। ”
লোকটা আমতা-আমতা করে বলল-
“ আসলে,আপনাকে বলাটা ঠিক হবে কি না। তারপরও বলছি। আপনারই তো বাবা। তান্ত্রিকের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর টা শুনেছিলেন? ”
“ জি শুনেছিলাম। ”
“ উনার সাথে আপনার বাবার মাস খানেক ধরে অনেক কথাবার্তা হতো ফোন কলে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের সবাই জেনেছে। আর স্যার বলেছিল এটা পাবলিক না করতে। সেটা নিয়েই আর কি কথাবার্তা বলার জন্য। ”
সিকান্দারের কুঁচকে আসা কপাল আরো কুঁচকে গেলো এই কথা শুনে। সেলিম মির্জা গত একমাস ধরে তান্ত্রিকের সাথে কথাবার্তা বলছিলো কেনো? তার সাথে তান্ত্রিকের কি সম্পর্ক? কিছুটা সন্দেহ হলো সিকান্দার। সেজন্য বলল-

“ আপনি আমার একটা হেল্প করতে পারবেন?”
“ জি স্যার বলুন। ”
“ ঐ তান্ত্রিকের বাসার ঠিকানাটা আমাকে দিতে পারবেন? ”
“ সে না হয় দিব। কিন্তু স্যার বাড়িটা তো সিল লাগানো। ঢুকতে পারবেন না। ”
“ আপনার সাথেই ঢুকবো আমি। আমি জাস্ট একটু ঢুকে দেখতে চাই। ”
“ ঠিক আছে। কাল তাহলে আসুন। ”
“ ঠিক আছে ধন্যবাদ। আর হ্যাঁ আরেকটা কথা। ”
“ জি বলুন। ”
“ এই কথাটা যেন সেলিম মির্জা না জানে। একটু এই দিকটায় নজর দিবেন। ”
“ ঠিক আছে স্যার চিন্তা করবেন না। ”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২২

সিকান্দার ফোন কেটে দিলো। তার মনের মধ্যে যেই চিন্তা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে সেগুলো যেন সত্য না হয়। সে আল্লাহ কে ডাকছে। সিকান্দারের ভাবনা যেন ভুল হয়। হ্যাঁ সেলিম মির্জা লোকটা খারাপ। অনেক খারাপ। নিজের ছেলেকে কালো যাদু করার মতো খারাপ না হোক। সিকান্দার তাহলে সত্যি এবার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাবে।
সিকান্দার কপাল স্লাইড করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে রুমের দিকে যেতে নিচ্ছিলো। এমন সময় সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে দৌড়ে প্রবেশ করে ড্রাইভার রহিম বলে উঠলো-
“ বড় স্যারের গাড়ি এক্সিডেন্ট হইছে। অবস্থা ভালো না। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করানো হইছে। তাড়াতাড়ি চলেন আপনারা…”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here