সুইটহার্ট পর্ব ৯
মোনালিসা মেহরোজ
ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরেই নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো মেহরিন। মুখখানা এমন করে ঝুলিয়ে রেখেছে যেন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ একা তার কাঁধেই এসে পড়েছে। রুমে ঢুকেই বিছানার উপর ধপাস করে বসে পড়লো সে। তার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই শিফা আর শাওনও হাজির। দু’জনের মুখেই কৌতূহল আর আতঙ্কের মিশ্র ছাপ।
—এখন বল।
গম্ভীর গলায় বললো শিফা। সাথে শাওনও শায় দিয়ে বললো—-
—হ্যাঁ, পুরো ঘটনা বল।
মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুরু করলো সবকিছু। আদ্রিয়ান তাকে টেনে রুমে নেওয়া থেকে শুরু করে, অন্ধকারে শাওন ভেবে হাঁটু তুলে আঘাত করা, “পটল থেতলে দিয়েছি” বলা, তারপর আদ্রিয়ানের চিৎকার—সব। একটা শব্দও বাদ দিলো না মেহরিন।
—ওরেহ্ আল্লাহ্!
পুরো গল্প শেষ হতে না হতেই শিফা তীব্র চিন্তায় নিজের কপালে হাত রাখলো চিৎকার দিয়ে। শিফার এহেন প্রতিক্রিয়ায় শুকনো ঢোক গিললো মেহরিন। তারপর শাওনের দিকে তাকালো তার ভাবগতি দেখার আশায়। শাওনও একইভাবে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তাদের দু’জনের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তারা এইমাত্র জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সংবাদ শুনেছে। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বললো না। খানিকবাদে নীরবতা ভাঙলো শাওন।
—আমি কি ঠিক শুনলাম?
—হুম।
মাথা নাড়লো মেহরিন।
—তুই…
শাওন থেমে গেলো। মেহরিন কপাল কুঁচকে বললো—-
—কি?
—তুই আদ্রিয়ান চৌধুরীর ঐখানে লাথি মেরেছিস?
মেহরিন নিরীহ মুখে বললো—
—ইচ্ছা করে মারিনি।
—ইয়া আল্লাহ!
শিফা মাথা উঁচু করে সিলিংয়ের দিকে তাকালো। গলায় অবিশ্বাস্য ঢেলে আওড়ালো—
—এই মেয়েকে তুমি কোন মাটি দিয়ে বানাইছো, খোদা?
—আমি তো ভাবছিলাম ওটা শাওন।
—আমি?
শাওন প্রায় লাফিয়ে উঠলো।
—তুই আমাকে কি মনে করিস? আমি কি সারাদিন অন্ধকার রুমে মেয়েদের ভয় দেখিয়ে বেড়াই?
—না, কিন্তু তুই গাধামি করিস। এর আগেও আমার সাথে করেছিলিস মনে নেই?
—ওহ্, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!
শুকনো গলায় বললো শাওন। শিফা এবার দুই হাতে মাথা চেপে ধরলো।
—আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।
—কি?
—আদ্রিয়ান স্যার এখনও তোকে জীবিত রেখেছে কিভাবে?
মেহরিন ঠোঁট ফুলিয়ে বললো—
—তোরা এমন বলছিস যেন আমি খুন করেছি।
—খুন করলেও এত ভয় পেতাম না।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো শাওন। মেহরিনের দিকে তাকিয়ে ফের বললো—-
—কারণ খুনের শাস্তি একবার হয়। কিন্তু তুই যা করেছিস, তার প্রতিশোধ স্যার কতদিন ধরে নিবে আল্লাহই জানে।
শিফা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো।
—সত্যি বলতে কি, আমি এখন স্যারের জন্য কষ্ট পাচ্ছি।।
শিফার কথার পাছে শাওন বুকের উপর হাত রেখে বললো—
—আমিও পাচ্ছি, একজন পুরুষ হিসেবে আমি তার ব্যথা অনুভব করতে পারছি সবচেয়ে বেশি।
শাওনের কথায় বিরক্ত হলো মোহরিন। চোখ রাঙালো মেয়েটা।
—তোরা আমার বন্ধু না ওনার?
—বর্তমানে?
শিফা আর শাওন একে অপরের দিকে তাকালো।
তারপর একসাথে বললো—
—আমরা নিরপেক্ষ!
কথাটা বলেই হেঁসে উঠলো দুজন। মুহূর্তেই মেহরিন একটা বালিশ তুলে ছুঁড়ে মারলো তাদের দিকে। কিন্তু তাতেও দু’জনের হাসি থামলো না।
—এক মিনিট।
বেশ কিছুক্ষন পর আচমকা থেমে গেলো শিফা। কপালে ভাজ ফেলে তাকালো মেহরিনের পানে। মেহরিন তখন চিন্তায় নখ কাটছে দাঁতের ফাঁকে।
—মেহু?
শিফার ডাকে অন্যমনষ্ক হয়েই উত্তর করলো মেহরিন—-
—কি?
—স্যার তোকে কেনো ওভাবে অন্ধকার ঘরে নিয়ে গেছিলো রে?
মুহূর্তেই থমকে গেলো মেহরিন। চোখজোড়া তার স্থির হলো। কেনো নিয়ে গেছিলো সেই কথা তো তার কাছেও ক্লিয়ার নয়। কিন্তু একদম না জানা তাও তো নয়। আদ্রিয়ান নিশ্চয়ই তাকে ধরে ফেলেছে, জানতে পেরেছে ওই মেসেজটা সে’ই পাঠিয়েছে। আর তাই জন্য’ই ওভাবে টেনে নিয়ে গেছিলো উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
কথাখানা ভাবতে গিয়েই গলা শুকিয়ে এলো মেহরিনের। শিফা তার পানে তাকিয়ে আছে কপাল কুঁচকে। শাওনও তাই। মেহরিন শুকনো ঢোক গিলে হাসার চেষ্টা করলো। বুকটা ভয়ে দুরুদুরু করছে তার। কাঁপা গলায় শিফার পানে তাকিয়ে না জানার ভান করে বললো—-
—অ….আমি কি করে জানবো ওনি কেনো নিয়ে গেছিলেন? বলেছিলেন না-কি আমায়?
সন্দেহের দৃষ্টিতে শিফা তাকালো মেহরিনের পানে। আঙুল তুলে চেপে ধরার ভঙ্গিতে বললো—-
—সত্যি তো? না-কি কিছু লুকাচ্ছিস?
মেহরিন দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো।
—সত্যি বলছি।
শিফা আর কথা বাড়ালো না। মেহরিন ভয়ার্ত ভঙ্গিতে চোখ ফিরিয়ে নিলো। যত যাই কিছু হয়ে যাক সেদিনের ঘটনা কাউকে বলা যাবে না। শিফা-শাওন মেসেজের ব্যপারে জানতে পারলে নিশ্চয়ই তাকে আচ্ছা-মতো কেলাবে। সাথে বাড়িতে জানাজানি হলে কি করবে সে? বাবা যদি জানতে পারে তাহলে তো তার খেলা এখানেই শেষ।
মেহরিনের গলা শুকিয়ে আসে। সে দ্রুত বসা হতে উঠে পা বাড়ায় ওয়াশরূমের দিকে।
—আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
শিফা-শাওন কথা বাড়ায় না। ঘর ছাড়ে মেহরিনের। শিফা নিজের বাড়ি ফিরে যায়, আর শাওন নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে। শিফা চুপচাপ গেলেও তার সন্দেহ মিটে না। আদ্রিয়ান কেনো মেহরিনকে এভাবে স্পর্শ করবে তা বুঝে উঠতে পারছে না মেয়েটা। ভাবনার সাগরে নিমজ্জিত হতে লাগলো শিফা।
পরদিন সকালে তারাহুরো করে ভার্সিটি যাওয়ার উদ্দেশ্য তৈরি হতে থাকলো মেহরিন। উদ্দেশ্য আদ্রিয়ানের খোঁজ নেওয়া। কাল ভয়ে পালিয়ে এলেও সারাটা রাত ঘুমুতে পারেনি মেয়েটা। আদ্রিয়ানের চিন্তায় এক করতে পারেনি দুচোখের পাতা। খালি মনে পরছে কাল অন্ধকার রূমে আদ্রিয়ানের আর্তনাদ। কিভাবে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ছিলো সে! কথাখানা ভাবতেই মেহরিনের আফসোস হতে লাগলো। কেনো সে মার*তে গেলো ওভাবে? কেনো যাচাই-বাছাই করলো না আগন্তুক সম্পর্কে?
মেহরিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা কেশরাশি বেনি করে নিলো। গায়ে ওড়না জড়িয়ে নিচে নামতেই দেখলো মনোয়ার শেখ খাবার টেবিলে বসে। মেহরিনকে আসতে দেখেই হাসলেন তিনি। শাওনও পাশেই বসে খাবারে মগ্ন। মনোয়ার শেখ মেয়ের পানে তাকিয়ে ডাক দিলেন—-
—মেহু! আয় খেয়ে যা।
মেহরিন কথা বাড়ালো না। খেতে পারবে না জানে। তবুও বসলো বাবার পাশে। টেবিলে বসতেই মনোয়ার শেখ বলে উঠলেন—-
—অভ্র’র সাথে কথা হয়েছিলো?
মেহরিন দাঁত খিঁচে নিলো। শাওন আড়চোখে তাকালো তার পানে।
—নাহ্।
মনোয়ার শেখ চট করে তাকালেন মেয়ের পানে। বললেন—-
—সেকি কথা? আজ বাদে কাল তার সাথে তোমার বিয়ে। চেনাজানারও তো একটা ব্যপার আছে না-কি?
—বাবা প্লিজ, আমি বিয়ে করবো না। বিয়েটা তুমি ক্যান্সেল করছো না কেনো?
সুফিয়া বেগম স্বামীর প্লেটে খাবার দিতে দিতে কড়া গলায় বলে উঠলেন—
—অনেক দেখেছি তোর নাটক। এখন আর শুনছি না। খেয়েদেয়ে ভার্সিটি যা, এই বিষয়ে কথা বলতে চাই না আর।
—কিন্তু মা…।
—চুপচাপ খা মেহু। কথা বাড়াস না।
মায়ের ধমকে চুপসে যায় মেহরিন। মলিন মুখে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বেড়িয়ে যায় ভার্সিটির উদ্দেশ্য। পথে শিফা-শাওন নানান কথাবার্তায় মগ্ন থাকলেও মেহরিন আজ আর কোন বাঁদরামি করেনি। চুপচাপ থেকেছে পুরোটা সময়। তার এহেন নিশ্চুপ থাকায় শিফা বেশ কয়েকবার খেয়াল করেছে, তবে বলেনি কিছুই। উল্টো সে টেনশনে আছে আজ ভার্সিটি গেলে কি হবে তা নিয়ে।
শিফা ভেবেছিলো কালকের সেই কান্ডের পর মেহরিন বেশ কয়েকমাস আদ্রিয়ানের থেকে গা ঢাকা দিয়ে থাকবে। তবে তা হলো না, উল্টো সকাল সকাল নিজেও তৈরি হলো সাথে তাকেও তৈরি করে বেড়িয়ে পরলো। সবকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিফা।
ভার্সিটিতে পৌঁছে প্রথম ক্লাসটা বহু কষ্টে শেষ করলো মেহরিন। এসে একবারও আদ্রিয়ানের দেখা পায়নি রমণী। পরের ক্লাসটা আদ্রিয়ানের। তাই অপেক্ষা করতে লাগলো কাঙ্খিত মানুষটিকে দেখার। সে আজ এসেছে কি-না তা নিয়েও বেশ সন্দেহে আছে মেহরিন। তবে তার সন্দেহ সত্যি হলো না। বরং কয়েক মুহূর্তবাদে গম্ভীর মুখে হনহন করে ক্লাসে প্রবেশ করলো আদ্রিয়ান। বরাবরের মতোই কঠিন তার মুখাবয়ব। ভ্রু যুগল কুঁচকে আছে খানিক। সাদা রঙা শার্টের উপর কালো ব্লেজারে মারাত্মক সুদর্শন লাগছে তাকে। ঘন কালো চুলগুলো একপাশে জেল দিয়ে সেট করা। প্রশস্ত বুকটা খানিক উন্মুক্ত হয়ে আছে শার্টের বোতাম আলগা হয়ে থাকার দরুন। আদ্রিয়ানের এহেন লুক অনেকেই মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো। কেউ কেউ বুকে হাত দিলো ঢলে পরে।
—গুড মর্নিং।
গম্ভীর মুখে কথাটা বলে ক্লাসে উপস্থিত সকল স্টুডেন্টের দিকে একপলক তাকালো আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ানের গমগমে কন্ঠস্বরের বিপরীতে সকল ছাত্র-ছাত্রীরাও উত্তর করে বসে পরলো।
অন্যদিকে আদ্রিয়ান ক্লাসে আসতেই মেহরিনের মরুভূমির ন্যায় শুকনো হৃদয়টা শীতল হয়ে এলো। ভালোভাবে আগাগোড়া পরখ করলো পুরুষটিকে। তবে আদ্রিয়ান একটাবারের জন্যও তার পানে তাকালো না।
এভাবেই কেটে গেলো বেশ কয়েকটা মিনিট।
পুরো ক্লাসের মধ্যে বসেও অনেক্ক্ষণ ধরে উসখুস করছিলো মেহরিন। বারবার তাকাচ্ছিলো আদ্রিয়ানের পানে। আদ্রিয়ান তা বেশ লক্ষ করেছে, তবুও না দেখার ভান করে পুরো ক্লাস পাড় করেছে পুরুষটি। ক্লাস শেষে কোন কথা না বলে গটগট পায়ে নিজের কেবিনে প্রবেশ করলো দৃঢ় মানব। অন্যদিকে মেহরিনও আর থমকে রইলো না। বরং শিফাকে এড়িয়ে দ্রুত পায়ে আদ্রিয়ান নামক কঠিন পুরুষটির পিছু নিলো। তবে কেবিনে ঢোকার আর সাহস পেলো না।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভার্সিটির একজন স্টাফকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মেহরিন। দ্রুত তাকে ডেকে হাত ধরিয়ে দিলো নীল রঙা একখানা চিরকুট। স্টাফটি মেহরিনকে খুব ভালো করেই চিনে। সেদিন প্রাচীর টপকে যাওয়ার সময় এই মানবটি’ই তো তাকে দেখেছিলো। মেহরিন তার হাতে চিরকুটটি গুঁজে দিয়ে বললো—-
—খুব জরুরি কাজ দিলাম আপনাকে। আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি, আপনি এটা আদ্রিয়ান স্যারকে দিয়ে দিন না কাকু।
লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মাথা নাড়িয়ে আদ্রিয়ানের কেবিনে পা রাখলো অনুমতি নিয়ে। অন্যদিকে মেহরিন দাঁড়ালো জানালার কার্নিশে। লোকটি ভেতরে ঢুকে বললো—-
—স্যার, ফাস্ট ইয়ারের মেহরিন আপনাকে এটা দিলো। জরুরি না-কি।
কপাল কুঁচকে গেলো আদ্রিয়ানের। লোকটি আবার বললো—
—সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি এটা নিন।
লোকটি চিরকুটটি টেবিলে রেখে বেড়িয়ে এলো ভেতর থেকে। অন্যদিকে তার বলা অনুযায়ী আদ্রিয়ান গম্ভীর মুখে তাকালো জানালার ওপারে। নজরে পরলো মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিনকে। আদ্রিয়ানের কপালের ভাজ গাঢ় হলো। চিঠিতে কি আছে ভাবতে ভাবতেই তা হাতে তুলে নিলো। ভাজ খুলতেই থ মেরে গেলো পুরুষটি। নীল চিরকুটটিতে বড়বড় অক্ষরে লেখা—-
—স্যার! আপনার পটলটি কি ঠিক হয়েছে? আমার না ভিষন চিন্তা হচ্ছে আপনাকে নিয়ে।
মুহূর্তের মধ্যে আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে বুঝে উঠতে পারলো না এতোবড় একটা মেয়ে কি করে এহেন আচরণ করতে পারে? মজা করছে কি সে তার সাথে? আদ্রিয়ান হাতে থাকা কাগজটা দুমড়ে-মুচড়ে আছড়ে ফেললো ডাস্টবিনে। বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিন শুকনো ঢোক গিললো। আদ্রিয়ান আচমকা দু’হাত জোড় করে দাঁতে দাঁত চেপে জোড়ে বলে উঠলো—–
—মাফ কর বইন, আর কোন কথা কইস না।
ওপাশে মেহরিন কাঁদো কাঁদো মুখে বললো—
—আমি তো শুধু খোঁজ নিচ্ছিলাম।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদ্রিয়ান। কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ায়—-
—বিশ্বাস কর, তোর মতো জাউড়া বেডি আমি আমার লাইফে দেখিনি।
মেহরিন শুনতে পারলো না আদ্রিয়ানের কথা। তাই তো সে এখনো চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে জানালার ওপাশে৷ আদ্রিয়ান নিজেকে সামলে নিলো। চেহারায় আকঁলো তীব্র গম্ভীর্যতার ছাপ। অতঃপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো—-
—লিসেন মিস
মেহরিন। আমার মনে হয় তোমার এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। আর নিজের পড়াশোনার উপর ফোকাস করা উচিত আমার দিকে না করে। সো প্লিজ, ইউ ক্যান গো।
মেহরিন ছটফটে কন্ঠে বললো—-
—বাট স্যার আমি তো জাস্ট….।
—আই সেইড স্টপ ইউর ফা*কিং কেয়ার’স টু মি। নাউ ইউ ক্যান গো, রাইট নাউ। অ্যান্ড ইয়েস, নেক্সট টাইম এটা ভুলে যাবে না আমি কে। অ্যা’ম আদ্রিয়ান চৌধুরী, ইউর প্রফেসর। কাল কি হয়েছে না হয়েছে, আমি তোমার সঙ্গে ঠিক কি আচরণ করেছি তা স্বপ্ন ভেবে ভুলে যাও। মাথায় রেখো আমার পরিচয়, আমার ব্যাক্তিত্ব। আর নিজের লিমিটে থেকে আমার সাথে ফাইজলামি করা বন্ধ করো। নইলে আমি তোমার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে বাধ্য হবো। আন্ডারস্ট্যান্ড?
মেহরিন আর কোন কথা বলার সুযোগ পেলো না আদ্রিয়ানের কড়া দৃষ্টিতে তার গমগমে কঠোর স্বরে। ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। চোখে জমলো অভিমানী অশ্রুকণা। আচানক বড্ড কষ্ট হলো আদ্রিয়ানের থেকে এহেন বাজে আচরণ পাওয়ায়। বুকটা ভারী হয়ে এলো, সাথে নোনাজলে ভরে উঠলো চোখের কোটর।
—স…সরি স্যার।
মেহরিন দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে বেড়িয়ে এলো ক্যাম্পাস হতে। শিফা-শাওন তখন ক্যাম্পাসে বসে বাদাম খাচ্ছে। তারা দেখেছিলো মেহরিনকে যেতে। তবে বলে নি কিছু। হয়তো মাফ চাইতে গিয়েছিলো বলে চুপচাপ বসে ছিলো তার অপেক্ষায়। তবে মেহরিনকে মলিন মুখে ফিরে আসতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু’জনেই। বেশ ভালোই বুঝতে পারলো কি ঘটতে পারে।
আদ্রিয়ানকে তারা ভালো করেই চিনে। ভার্সিটিতে এমন কোন স্টুডেন্ট অথবা প্রফেসর নেই যে আদ্রিয়ানের সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস রাখে। সেখানে মেহরিনের এমন কান্ডে আদ্রিয়ান যে তার গর্দা*ন নেয়নি এই ঢের।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিফা। শাওনকে টেনে বেড়িয়ে আসে মেহরিনের পিছুপিছু।
অন্যদিকে লম্বা শ্বাস টেনে চেয়ারে মাথা এলিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে নেয় আদ্রিয়ান। হুট করে তারাও একটু আফসোস হলো বোধহয় এতোটা কঠোর হওয়ায়! কিন্তু তাতে কি? সে কে তা তো ভুলে গেলে চলবে না। মেয়েটা যে তাকে জোকার বানিয়ে ছাড়ছে, এসব কি করে মানবে সে?
আদ্রিয়ান চোখজোড়া মেলে সিলিং’এর দিকে তাকায়। হুট করেই চোখজোড়া হেঁসে ওঠে তার। ঠোঁট কামড়ে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ায়—–
—মাই স্টুপিড সুইটহার্ট। ইউ আর অ্যা ক্রেজি, টু ম্যাচ ক্রেজি।
বিকেল তখন পাঁচটা।
রিকশা থেকে নেমে মেহরিন আশেপাশে তাকাতে লাগলো। শিফা ভাড়া মিটিয়ে এসে দাঁড়ালো জনমানব থেকে খানিকদূরে। আশেপাশে বহু মানুষের আনাগোনা।
ভার্সিটি থেকে বাড়িতে ফিরতে না ফিরতেই অচেনা নাম্বার থেকে ছোট্ট একটা মেসেজ আসে মেহরিনের ফোনে। কপাল কুঁচকে নিয়ে সেই মেসেজখানা দেখছিলো সে। পরে বুঝতে পারে নাম্বারটা অচেনা হলেও মানুষটা পুরোপুরি অচেনা নয়। কেননা সেখানে লিখা ছিলো বিকেলে রেস্টুরেন্টে দেখার করার কথা। নিচে ছোট করে লিখা ছিলো অভ্র নামক এক মানবের নাম।
মেহরিন বুঝতে পারে অভ্র তার সাথে দেখা করার জন্য ডেকেছে। প্রথমে আসতে না চাইলেও পরে কি মনে করে জানি রাজি হয়ে যায় সে। তবে সে একা আসেনি মোটেও, সাথে তার দু’বান্দা শাওন-শিফাও হাজির। যদিও কথা হয়েছে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে মেহরিন একা’ই যাবে। শিফা-শাওন আশেপাশে থাকবে তার অপেক্ষায়।
যেই ভাবনা সেই কাজ। শিফা-শাওন মেহরিনকে বিদায় দিয়ে পাশের পার্কের উদ্দেশ্য চলে গেলো। অন্যদিকে মেহরিন পা বাড়ালো নিদিষ্ট রেস্টুরেন্টের দিকে, যার ঠিকানা অভ্র দিয়েছিলো তাকে।
—কি বা*লের ওড়না পরে এসেছি মাইরি, খালি খুলেই যাচ্ছে। ধুর…..।
বিড়বিড় করতে করতে দু’হাতে ওড়না সামলে রেস্টুরেন্টের ভেতরে পা রাখে মেহরিন। খোলা চুলে সাদা রঙা গাউন, ঘাড়ের একপাশে ওড়না ছড়িয়ে দেওয়া। মুখে হালকা মেক-আপের আস্তরণ। সাজতে চেয়েছিলো না সে, তবে ওই যে তার প্রেস্টিজ! সেটার কি হবে? সুন্দর তো দেখাতে হবে।
সুইটহার্ট পর্ব ৮
মেহরিন রেস্টুরেন্টের কাচে নিজের সুশ্রী মুখখানা দেখে গর্বিত হাসে। অতঃপর চুলে ঝাড়া মেরে সামনের দিকে তাকায় কাঙ্খিত মানুষের আসায়। আর তাকিয়ে’ই থমকে যায় সে। হৃৎস্পন্দন বুঝি সেখানেই থেমে গেলো তার। মেহরিনের চোখ কোটর হতে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেলো মেয়েটা। বড়বড় চোখজোড়া মেলে সামনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকাই নিজের মাথায় হাত দেয়। অবিশ্বাস্য গলায় বিড়বিড় করে আওড়ায়—–
—ওরেহ্ শালা! এই দু’টো জাউড়া একসাথে ক্যান?
