সে আমার বন্দিনী পর্ব ১০০
তানিয়া হুসাইন
মারিয়া এলেনা ইশায়াকে সবকিছু জানায়।
শব্দগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ালেও ইশায়ার কানে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে একটা গভীর অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে আর কোনো আলো দেখা যায় না।
ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ইশায়া। চুপচাপ মাথা নিচু, কপাল ঠেকানো। চারপাশে সবাই ব্যস্ত, সবাই তাকে তাড়া দিচ্ছে।
“আমাদের এখনই বের হতে হবে।সময় নেই।দ্রুত চলুন ম্যাম।কিন্তু ইশায়া পাথরে পরিণত হয়েছে।কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।কোনো উত্তর নেই।শুধু নিঃশব্দে চোখ বেয়ে ঝরে পড়ছে অশ্রু।একটার পর একটা ফোঁটা মেঝেতে পড়ছে, আর তার বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।মুখ থেকে অস্পষ্ট, ব্যথাতুর শব্দ বের হচ্ছে। সে নিজের সাথেই কথা বলছে বারবার কিছু একটা বিড়বিড় করছে।বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শেষ চেষ্টা।
মারিয়া এলেনা তার পাশে এসে বসেন। রানিয়া তার হাত ধরে তাকে উঠাতে চাইলে ইশায়া ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দেয়।
না…না…না…
ছুবে না আমাকে।সরে যাও এখান থেকে বলছি।বেরিয়ে যাও আমার ঘড় থেকে।চিৎকার করতে করতে কমরে এক হাত রেখে উঠে দাঁড়ায় ইশায়া।
তার শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেছে।তারপরও দাঁড়ায়।চোখ ভরা জল নিয়ে চারদিকে তাকায়।
___আমি যাব না…কোথাও যাব না আমি।
এই ঘরটা কতবার সে এই চার দেয়াল থেকে মুক্তি চেয়েছে।কিন্তু এই ঘরের প্রতিটি দেয়ালে জড়িয়ে আছে তার গত দেড় বছরের স্মৃতি।তার কষ্ট,কান্না, তার অভিমান।তার সংসার…আর ভীর।
শব্দটা মনে আসতেই বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যেতে থাকে।শ্বাস নিতে কষ্ট হয় ইশায়ার।দৃষ্টিটা ঝাপসা হয়ে আসে।ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ইশায়া।নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়।
তার গলায়,কাঁধে,হাতে,থুতনির পাশে ঠোঁটের কোণে তার দেওয়া চিহ্নগুলো এখনো দৃশ্যমান।
কালচে হয়ে থাকা দাগগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।ভীরের স্পর্শের চিহ্ন।সেই অধৈর্য, বেপরোয়া, জেদি মানুষটার স্পর্শ।যে মানুষটা ভালোবাসত নিজের মতো করে।
অধিকার ফলাত,আঘাত দিত,আবার নিজেই বুকে আগলেও রাখত।ইশায়ার বুকের ভেতরটা কেমন করছে তার মনে হচ্ছে এখন-ই সে শ্বাস আটকে মারা যাবে।
এগুলো কি তাহলে শেষ স্পর্শ।
সে কি আর কখনো ভীরের এই স্পর্শ অনুভব করবে না?কখনো শুনবে না তার গম্ভীর কণ্ঠ।কখনো দেখবে না সেই তীক্ষ্ণ চোখদুটো।মুহূর্তের মধ্যে ভেসে ওঠে শেষ বেলার সেই দৃশ্যটা। ভীর তাকে ডেকেছিল।তার কাছে আসতে চেয়েছিল।
আর সে যায়নি।ভয়ে অভিমানে দূরে সরে ছিল।
তারপর..তারপর মানুষটা চলে গেছে।
আর আসবে না সে, ইশায়া দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে।
বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।হাঁটতে হাঁটতে দেয়ালের কাছে যায় সে।
সেখানে টাঙানো ভীরের ছবি।কাঁপতে থাকা হাতে ছবিটা নামিয়ে নেয়।ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরতেই তার সমস্ত বাঁধ ভেঙে যায়। হু হু করে কেঁদে ওঠে সে।
___আপনি কোথায়…?
কান্নার মাঝে ভেঙে ভেঙে বের হয় কথাগুলো।
___আসুন না…ওরা কিসব বলছে।আমি কোথাও যাব না।আপনি আসুন।
আপনি নেই দেখে সবাই আমাকে জোর করছে।
ছবিটার উপর মাথা রেখে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে থাকে ইশায়া।
___আমার খুব কষ্ট হচ্ছে…
শুনতে পাচ্ছেন না, শুনতে পাচ্ছেন না আপনি,আপনার বেবি কষ্ট পাচ্ছে।
নিজের পেটের উপর হাত রাখে ইশায়া।
তার কান্না আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
আপনি আসুন না প্লিজ।
আমি আর কিছু করব না।আপনার সাথে ঝগড়া করব না..অভিমান করব না.আপনার যা করার করুন..তারপরও ফিরে আসুন।একবার শুধু ফিরে আসুন,কথাগুলো বলতে বলতে চিৎকার করতে থাকে ইশায়া।
সারা ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার বুকফাটা আর্তনাদ।সেই কান্না শুনে উপস্থিত প্রত্যেকের বুক কেঁপে ওঠে।ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডগুলো পর্যন্ত চোখ নামিয়ে নেয়,তাদের চোখেও অশ্রু স্পষ্ট।
____এই খবরটা শোনার পর প্রথমে ক্যাটালিনার বুক কেঁপে উঠেছে, পরিস্থিতি যে ভয়াবহ দিকে মোড় নিতে পারে, সেটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগেনি। ভীরের অনুপস্থিতিতে তাদের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যাবে এই চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলেছে।
তবে ক্যাটালিনা বেশিক্ষণ ভেঙে পড়ার মানুষ নয়। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করে সে। সিদ্ধান্ত নেয় তারা আর এখানে থাকবেনা, সিনালোয়ায় চলে যাবে। ভীরের সমস্ত সম্পদ, অর্থ এবং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেবে। সে এটাই ভাবে ভীর আর বেঁচে না থাকলে তার রেখে যাওয়া সবকিছুর একমাত্র দাবিদার এবং মালকিন হবে সে-ই।
অন্যদিকে, খবরটা শুনে জেইনের মুখে আনন্দের ঝলক ফুটে উঠে,ভেতরের পৈচাশিক আনন্দ বেরিয়ে আসে।তার উপর থেকে বহুদিনের বোঝা নেমে গেছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের ছাপ।সে এতদিন যেটা চেয়েছে যেটার স্বপ্ন দেখেছে এখন সে সেটা খুব সহজেই পেয়ে যাবে। তাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই এখন।
কিন্তু বেলার প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্নতার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে তার। অজানা এক শূন্যতা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে ফেলছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়, কিন্তু তার মনের গভীরে এক অস্বস্তিকর কষ্টের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ছে।
___ক্যাটালিনা নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। তার সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ইশায়াকে পথ থেকে সরাতেই হবে। এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় সুযোগ। ভীরের লোকেরা একবার এখানে পৌঁছে গেলে তার আর কিছুই করার সুযোগ থাকবে না। তার আগেই যা করার করতে হবে। পরবর্তীতে সবকিছু ধামাচাপা দেওয়াও তার জন্য কঠিন হবে না। ভীর এখন নেই তাই ভয়ের কোনো চিহ্নও তার মধ্যে নেই।
কিন্তু ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ায় জেইন।
জেইন বারবার অনুনয় করতে থাকে।
___প্লিজ, ক্যাট… ওকে আমি চাই। একবার শুধু একবার।একবারের জন্য হলেও আমার ওকে চাই।এরপর তোমার যা ইচ্ছা করো আমি কিছু বলবো না। প্লিজ, আমার এই কথাটা রাখো। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছি না।
তার কণ্ঠে উন্মাদনা, চোখে বিকৃত আকাঙ্ক্ষার ছায়া।
ক্যাটালিনা কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকে। জেইনকে সে কখনোই সহজে না বলতে পারে না।
তাই সে ঠান্ডা গলায় বলে,
__ঠিক আছে। কিন্তু শুধু একবার। তারপর ওর কাহিনী শেষ করতে হবে। মনে রেখো, কোনো ঝামেলা আমি চাই না।
কথাটা শুনেই জেইনের ঠোঁটে এক শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে।বহুদিনের লালিত ইচ্ছা পূরণের সুযোগ পেয়ে গেছে সে।
আর দেরি না করে সে সোজা ইশায়ার রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
আর ক্যাটালিনা সে যায় ইলারা আলভারেয এর ঘড়ে।
ভীরের খবর শুনে জ্ঞান হারিয়েছে সে।তার আশেপাশে থাকা গার্ডরা তাকে দেখছে।ক্যাটালিনা রুমে ঢুকে সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলে,কেউ কিছু বলতে নিলে সে কড়া চোখে তাকায়।
আর কেউ সাহস পায় না কিছু বলার।
ভীরের অনুপস্থিতিতে তার কথাই সবাইকে মানতে হয়।
সবাই বেরিয়ে যেতেই ক্যাটালিনা এগিয়ে যায় ইলারা আলভারেয এর দিকে।
এই বুড়ির সাথে তার শত্রুতা অনেক আগের। প্রথমে কিছু করতে পারেনি রিকের জন্য আর তারপর ভীরের জন্য।
ক্যাটালিনা ইলারা আলভারেয এর অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলে।শ্বাস নিতে না পেরে তার হার্টবিট দ্রুত হয়ে যায়।ক্যাটালিনা মুখে হাসি নিয়ে দেখে সেই দৃশ্য।
ইলারা আলভারেয এর এই কষ্ট সহ্য হয় না ক্যাটালিনার।তাই বিছানার সাইডে রাখা আরেকটা বা*লিশ হাতে নিয়ে ইলারা আলভারেয এর মু*খে চেপে ধরে,যতক্ষণ পর্যন্ত তার শরীরটা স্থির না হয়ে যায়।
____অন্যদিকে ইশায়া
অবিরাম কান্নায় তার চোখ দুটো ফুলে গেছে। বুকফাটা আর্তনাদে পুরো ঘর ভারী হয়ে উঠেছে। তার প্রতিটি কান্না আহাজারি উপস্থিত সবার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করছে।
এমন সময় শব্দ করে দরজা খুলে যায়।জেইন ভেতরে প্রবেশ করে।তার উপস্থিতিতেই ঘরের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
মারিয়া, রানিয়া, কায়রা এবং বাকি মেয়েরা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা বুঝতে পারে। তারা জেইনের সামনে এসে দাঁড়ায়, তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে।
ঠিক তখনই সেখানে এসে উপস্থিত হয় ক্যাটালিনা।
তার চোখে ছিল কঠোরতা।
___সবাই বের হয়ে যাও।কঠিন স্বরে আদেশ দেয় সে।
মারিয়া কিছু বলতে যায়। রানিয়াও প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে।কায়রা এগিয়ে আসে। কিন্তু ক্যাটালিনা তাদের কথা শেষ করার সুযোগও দেয় না।মুহূর্তের মধ্যে ব*ন্দুক তুলে ধরে সে।আমি যা বলেছি, তাই হবে।
তার গলায় হুমকি, মুহূর্তের মধ্যেই ক্যাটালিনার গার্ড রা এসে ওদেরকে ধরে। আর কেউ সাহস করে কিছু বলতে পারেনা।অসহায় চোখে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে একে একে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
ইশায়া কিছুই বুঝতে পারছিল না।
___কী হচ্ছে?কেন হচ্ছে?
তার মানসিক অবস্থা এমনিতেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে শারীরিক দিক থেকেও সে অসুস্থ। বাস্তবতা বোঝার মতো শক্তিটুকুও আর তার মাঝে অবশিষ্ট নেই।
ক্যাটালিনা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার ইশায়ার দিকে তাকায়।তার ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি।তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।একজন একজন করে সবাই চলে যেতে দেখে ইশায়ার বুকের ভেতর হঠাৎ অজানা আতঙ্ক জন্ম নেয়।সে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে যেতে চায়।কিন্তু জেইন তার হাত চেপে ধরে।
ইশায়া ভয় পেয়ে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত ছাড়িয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়।
___ কে তুমি, কেনো এসেছো আমার রুমে।চলে যাও… এখান থেকে চলে যাও।
তুমি জানো না এই প্যালেসে কোন পুরুষের প্রবেশ নিষেধ। তাও আমার রুমে তুমি কোন সাহসে প্রবেশ করেছো, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ইশায়া।
ইশায়ার কথায় জেইন হেসে ওঠে।
কার জোরে এত চেটাং চেটাং কথা বলছেন ম্যাডাম, যার জন্য এই গলার জোর সে তো আর নেই।জেইন আবার ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।
জেইনের এই কথায় ইশায়ার ভেতরটা অস্থির হয়ে ওঠে।
তাকে ঘিরে ভীরের করে দেওয়া সুরক্ষার দেয়ালটা যেন আজ ভেঙ্গে পড়েছে,তার অনুপস্থিতিতে। ইশায়ার চোখে তখন আতঙ্ক স্পষ্ট।
সে হাতের কাছে যা পাচ্ছে, তাই ছুড়ে মারতে শুরু করে।
কিন্তু জেইন থামেনা, তার মুখে হাসি।
ইশায়া মরিয়া হয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।বার বার ভীরকে ডাকছে।
পিছিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ পা হড়কে যায় ইশায়ার।
একটি উঁচু কার্পেটের কিনারায় পড়ে যায় সে, পেটে প্রচণ্ড আঘাত লাগে।
ব্যথায় তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে।
____আহ্…!
ইশায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।সে কুঁকড়ে যায় যন্ত্রণায়।আর সেই নিস্তব্ধ, ভারী ঘরের মধ্যে তার ব্যথাভরা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।কিন্তু তাকে সাহায্য করার জন্য কেউ নেই আজ।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া, রানিয়া আর কায়রার বুক কেঁপে ওঠে সেই চিৎকারে।
কিন্তু তারা কিছুই করতে পারছে না।তাদেরকে আটকে দেওয়া হয়েছে।
পেটে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে ইশায়া। যন্ত্রণায় তার পুরো শরীর কাঁপছে। এক হাত শক্ত করে পেটের ওপর চেপে ধরে সে অনবরত চিৎকার করছে।এই মেয়ের সামান্য একটু উহহহ শব্দে রাজভীর পুরো প্যালেস মাথায় উঠিয়ে ফেলতো,আজ তার অনুপস্থিতিতে ইশায়ার এমন দশায় কেউ এগিয়ে আসছে না। কতটা অসহায় হয়ে গেছে সে এই মুহূর্তে। ইশায়া বার বার ভীরকে মনে করছে। তাকে ডাকছে, তার চোখ থেকে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তিটুকুও আর তার শরীরে অবশিষ্ট নেই।
ইশায়ার অসহায় অবস্থা দেখে জেইনের ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে,তার হাত যায় শার্টের বোতামে, একে একে সবগুলো বোতাম খুলে শার্ট টা ছুড়ে মারে সে দূরে।এক পা এক পা করে ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।ইশায়া সরে যেতে চাইলেও পারেনা। সে শুধু আতঙ্কভরা চোখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে।জেইন ইশায়ার দিকে ঝুঁকে
পড়তেই ঠিক সেই মুহূর্তে ধড়াম করে দরজাটা খুলে যায়।
হন্তদন্ত হয়ে আবার রুমে ঢুকে পড়ে ক্যাটালিনা।
এমন সময় তাকে এখানে দেখে জেইনের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়।
___কী হয়েছে?
বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে জিজ্ঞেস করে সে।
কিন্তু ক্যাটালিনার মুখের অবস্থা দেখে পরের মুহূর্তেই তার মুখের রং বদলে যায়।
দ্রুত এগিয়ে এসে ক্যাটালিনা বলে,
___আমাদের এখনই পালাতে হবে।মাতেওর লোকেরা প্যালেসে আক্রমণ করেছে!
কথাটা শুনতেই জেইনের বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।তার চোখে স্পষ্ট ভয় নেমে আসে।সে খুব ভালো করেই জানে ক্যাট কাদের কথা বলছে।
যাদের হাতে ভীর আর নিকের মতো মানুষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়েছে, তাদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার নেই।
তারা তাদেরকে ধরতে পারলে নিশ্চিত….।
জেইন কোন ঝুঁকি নিতে চায় না।তবুও সে দ্বিধাগ্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
___কিন্তু… একে কী করবে?
মেঝেতে পড়ে থাকা ইশায়ার দিকে তাকায় সে।
ক্যাটালিনার চোখও সেদিকে ।
___ওকে নিয়ে যাব না।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে নিচু স্বরে বলে,
___এর কাহিনি শেষ করেই এখান যেতে হবে। কালসা*প বাঁচিয়ে রাখতে নেই।তারপর জেইনের দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বলে,
___তুই যা। বেলাকে নিয়ে দ্রুত বের হো। আমি আসছি।
জেইন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করে না।নিজের প্রাণটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।বেঁচে থাকলে জীবনে এরকম মেয়ে অনেক পাওয়া যাবে।সে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
রুমে তখন শুধু ক্যাটালিনা আর ইশায়া।ইশায়া যন্ত্রণায় কুঁকড়ে পড়ে আছে।শ্বা*স নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।ক্যাটালিনা তার কাছে এগিয়ে যায়।তার হাতে ছোট্ট একটি শিশি।সে ইশায়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং জোর করে শিশির ভেতরে থাকা বি*ষ ইশায়াকে খাইয়ে দিতে চায়।
ইশায়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার শরীরে শক্তির সাথে পেরে ওঠে না।ইশায়া জোড়াজুড়ি করলে ক্যাটালিনা ঠাসস ঠাসসস করে তার গালে ৪-৫ টা থা*প্পড় বসিয়ে দেয়।তারপর ইশায়ার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে সম্পূর্ণ বি*ষ ইশায়ার মুখে ঢেলে দেয়।
এর পরেই ইশায়ার যন্ত্রণা আরও বেড়ে যায়।প্রচণ্ড কাশিতে তার বুক কেঁপে উঠতে থাকে।কাশতে কাশতে তার ঠোঁটের কোণা বেয়ে র*ক্ত বেরিয়ে আসে।মেঝেতে ছিটকে পড়ে লাল র*ক্তের ফোঁটা।ইশায়া ছটফট করতে থাকে।
আর সেই দৃশ্য দেখে অদ্ভুত এক তৃপ্তি অনুভব করে ক্যাটালিনা।বহুদিনের জমে থাকা বিদ্বেষের প্রতিশোধ সে নিয়ে ফেলেছে।কিন্তু সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই।প্যালেসের বাইরে ইতিমধ্যেই ঝামেলা শুরু হয়ে গেছে।শত্রুরা যদি ভেতরে পৌঁছে যায়, তাহলে তাদেরও বাঁচার সুযোগ থাকবে না।
তাই শেষবারের মতো মেঝেতে পড়ে থাকা ইশায়ার দিকে তাকিয়ে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় ক্যাটালিনা।
প্যালেস তখন বিশৃঙ্খলায় ডুবে গেছে।চারদিকে আতঙ্ক।পালানোর তাড়া।দূরে অ*স্ত্রের গর্জন।সিঁড়ি বেয়ে, করিডোর পেরিয়ে, নিরাপত্তা বলয়ের ভেতর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায় ক্যাটালিনা।তাদের জন্য প্রাইভেট জেটের ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ,
জেটের ভেতরে বসে আছে জেইন আর বেলা।
তারা দুজনই উদ্বিগ্ন চোখে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
ক্যাটালিনাকে দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারা।কোনো কথা না বলে ক্যাটালিনা জেটে উঠে বসে।দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
ইঞ্জিনের গর্জন ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে ওঠে।
____ইশায়ার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। শরীরের ভেতর থেকে জীবনটা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে প্যালেসজুড়ে তখন মৃ*ত্যু আর আতঙ্কের ছায়া।
যে যার জীবন বাঁচানোর জন্য ছুটছে।
কেউ অ*স্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে, কেউ পালানোর পথ খুঁজছে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে নিজের প্রিয়জনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও একজন মানুষ ইশায়াকে ফেলে চলে যেতে পারে নি।মারিয়া এলেনা।
সে কষ্ট করে মেঝেতে পড়ে থাকা ইশায়াকে তুলে বসায়।
চোখের কোণে জল নিয়ে কাঁপা গলায় বলে,
___ম্যাম… উঠুন। প্লিজ উঠুন। আপনার বাচ্চার জন্য হলেও উঠুন। ওকে বাঁচাতে চাইলে আপনাকে কষ্ট করতে হবে। এখন হার মানলে চলবে না।
ইশায়া চেষ্টা করেছে,সত্যিই চেষ্টা করেছে
কিন্তু তার শরীরের বি*ষ ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে ফেলেছে।শরীরে এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ট নেই।
তবুও মারিয়া এলেনা হাল ছাড়ে না।
কোনোমতে তাকে নিজের কাঁধে ভর দিয়ে উঠায়। তারপর প্যালেসের পিছনের দরজা দিয়ে তাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।চারদিকে এত বিশৃঙ্খলা ছিল যে কেউ তাদের দিকে খেয়ালই করে নি।লুকিয়ে-চুরিয়ে, সবার চোখের আড়ালে, ইশায়াকে গাড়িতে বসায় মারিয়া।
তারপর নিজেই স্টিয়ারিং ধরে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে যায়।
প্যালেসের বাইরে তখনও লড়াই চলছে।গার্ডরা প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে শত্রুদের সঙ্গে।আর শত্রুরা মরিয়া হয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।গো*লাগু*লির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছে।কিন্তু সেই যুদ্ধ থেকে অনেক দূরে, অন্য এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
একটি জীবনকে বাঁচানোর যুদ্ধ।হাসপাতালে পৌঁছেই মারিয়া এলেনা দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
___ডাক্তার! নার্স! প্লিজ, কেউ আসুন।তার চিৎকারে আশপাশের সবাই চমকে ওঠে।
ততক্ষণে ইশায়া পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়েছে।তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।মুহূর্তের মধ্যে চিকিৎসকরা তাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়।শুরু হয় দ্রুত চিকিৎসা।অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
আর বাইরে একা দাঁড়িয়ে থাকে মারিয়া এলেনা।সে বারবার করিডোরে পায়চারি করছে।সে জানে না কি হবে।সে সময়মতো ইশায়াকে নিয়ে আসতে পেরেছে কি না। ভীরের পরিবার তার জন্য অনেক কিছু করেছে।
ভীরের মা তাকে আশ্রয় দিয়েছে।ভীর তার পাশে দাঁড়িয়েছে বহুবার।
সেই ঋণ সে কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।
আজ যদি তাদের জন্য নিজের প্রাণও দিতে হয়, তবুও সে পিছিয়ে যাবে না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়।অবশেষে অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে একজন ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে আসেন।তার মুখের গম্ভীর ভাব দেখেই মারিয়ার বুক ধক করে ওঠে।
সে দ্রুত এগিয়ে যায়।
___ডাক্তার…কি হয়েছে, কেমন আছে ওরা?
প্রথমে ডাক্তার কিছু বলেন না।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে,তারপর পুরো বিষয়টা জানান।পেশেন্টের শরীরে অত্যন্ত বেশি মাত্রায় বি*ষ প্রবেশ করেছে।।সেই বি*ষের প্রভাব তার গর্ভের সন্তানের ওপরও পড়ে।
মারিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে পরে।
___আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু পেশেন্টকে বাঁচাতে পারলেও আমরা তার সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি।
মারিয়া এলেনার কানে বার বার বাজতে থাকে ডাক্তারের বলা শেষ কথাটা।
___বাঁচাতে পারেনি ভীরের সন্তানকে।
অপারেশন করে বের করা হয়েছে প্রায় সাত মাসের একটি পূর্ণাঙ্গ মেয়ে শিশু।একটি ছোট্ট জীবন…যে পৃথিবীতে আসার আগেই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে ফেলেছে।মারিয়া এলেনা পাথর হয়ে যায়।তার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। একজন নার্স একটি সাদা তোয়ালে জড়ানো ছোট্ট শিশুকে এনে তার হাতে তুলে দেয়।শিশুটি নিস্তব্ধ,নিঃশ্বাসহীন।মারিয়া এলেনা তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভীরের মুখ।
কত স্বপ্ন ছিল তার!নিজের সন্তানকে নিয়ে।তার চোখে-মুখে ফুটে উঠত সেই উচ্ছ্বাস।একজন ভয়ংকর মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোমল স্বপ্ন।আর আজ একই দিনে সব শেষ হয়ে গেল।
ভাগ্য একদিনেই তাদের সমস্ত সুখ কেড়ে নিল।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৯
___ইশায়ার এখনও জ্ঞান ফেরেনি।চিকিৎসকেরা তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
আর তার ছোট্ট কন্যাশিশুটিকে হাসপাতালের কা*ডল কট রাখা হয়, যাতে মায়ের জ্ঞান ফিরলে শেষবারের মতো নিজের সন্তানকে দেখতে পারে।
সাদা কাপড়ে মোড়ানো শিশুটি শান্ত হয়ে শুয়ে আছে।মনে হচ্ছে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।আর তার কয়েক হাত দূরে,হাসপাতালের বিছানায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে ইশায়া
হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতরে, নীরবে শেষ হয়ে গেছে ভীর আর ইশায়ার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান এক অধ্যায়।

