Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৬

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৬

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৬
তানিয়া হুসাইন

সকাল ৭টা।
ভীরের ঘুম ভাঙে গভীর নিশ্বাসের ভারে।
চোখ ধীরে ধীরে খুলতেই অনুভব করে বুকের ওপর একটা নরম অথচ ভারী ওজন,
ভীরের কপালে ভাজ পড়ে,
আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় সে,
তার বুকের ওপরে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে এক রমনী।
উমম বন্দিনী,
তার বন্দিনী।

____এলোমেলো চুল ছড়ানো, চোখ বন্ধ, ঠোঁট ফাঁকা, নিঃশ্বাস স্থির,
ঘুমের মধ্যেও নজর কাড়ে এই মেয়ে ,
এই মেয়ের রূপেই তো প্রথম দেখায় উন্মাদ হয়েছে সে।
ছোটখাটো আদলের এই মেয়ে কি জাদু জানে এটাই সে ভেবে পায়না।
____ভীর তার গলার পাশে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,
____তুই শুধু শ্বাস নিচ্ছিস, আর আমার বুক পুড়ছে।
তারপর ধীরে ধীরে আঙুল চালিয়ে ভীর চুলগুলো ঠিক করে দেয়,
ঠিক করতে গিয়ে আরো এলোমেলো করে ফেলে।
একটা করে চুল সরিয়ে গালে ছুঁইয়ে আবার সরায়।
এত কোমল স্পর্শ, যেন খরগোশের গায়ে হাত রাখছে।
মাখনের মত নরম।
একটু জোরে ধরলেই লাল দাগ পড়ে যায়।

___কিন্তু আফসোস একদিনেই এই মেয়ের শরীরে তার দেওয়া অজস্র দাগ।
___ভীরের চোখ যায় ইশায়ার গলা থেকে শুরু করে বুক পর্যন্ত দাগ গুলোর দিকে ।
হাত বাড়িয়ে ছুতে গিয়েই
ভীরের টনক নড়ে কি করছে সে।
ইশায়াকে ধীরে শুইয়ে দেয় বালিশে,
মুখের দিকে একবার তাকায়, তারপর উঠে দাঁড়ায়।
____যেতে হবে তার, সবাই অপেক্ষা করছে তার জন্য।
___ভীর ওয়াশরুমে চলে যায় শাওয়ার নিতে।
শাওয়ারের পানি পরে তার তামাটে ত্বকে।
ডান কাঁধ থেকে নেমে আসা ড্রাগন ট্যাটু টা জ্বল জ্বল করছে পানির স্পর্শে।
শরীরে ক্ষতের অভাব নেই।
___এগুলো তার বিজয়ের চিহ্ন, এক একটা জয়ের স্মৃতি।
ভীর লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে কমোরে তোয়ালে পেচিয়ে বেরিয়ে আসে।

____ক্লোজেটের দরজা খোলে।
সামনে ঝুলছে কালো কালো স্যুট,
ভীরের বেশিরভাগ জামা-কাপড় ব্ল্যাক।
মিলিটারি স্টাইল ব্লেজার, কালো হাইবুটস, ব্যালিস্টিক প্রোটেক্টর।
সে হাত বাড়িয়ে নেয় কালো স্কিন-ফিটেড শার্ট,
ব্ল্যাক কমব্যাট ফিট জ্যাকেট,ভিতরে বুলেটপ্রুফ লেয়ার।
কালো প্যান্ট।
কোমরে দুই পাশে Ber*etta M9, পিঠে H&K M*P5 ঝোলানো।
____ফোন নিয়ে ডিয়েগো কে কিছু বলে,
দুই তিন সেকেন্ডের মধ্যেই আবার ফোনটা রেখে দেয়।

____ভীরের জন্য আসে ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি,
মারিয়া এগিয়ে দেয় ভীরকে।
___ভীর চেয়ারে বসে, সোফায় পা ছড়িয়ে ।
চোখে ঠান্ডা আগুন, ঠোঁটে পাথরের নিস্তব্ধতা।
ভোরের আলো জানালায় হালকা ঝলকে পড়ছে।
ভীর ঠাণ্ডা মুখে এক চুমুক কফি নেয়।
চোখে গভীর চিন্তা, ঠোঁটে ক্ষীণ কঠোরতা।
___ভীর টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া এলেনা কে বলে—

____Call every guard assigned for her. I want them in front of me. Now.
___মারিয়া ঝুঁকে সম্মান জানিয়ে মাথা নত করে বেরিয়ে যায়।
মুহূর্ত খানেকের মধ্যেই দরজার ওপাশে ভয়ের নিঃশব্দ ভঙ্গি নিয়ে দাঁড়ায় কয়েকজন গার্ড।
___সবাই কালো ইউনিফর্মে, চোখে ভয়।
মাফিয়া বসের সম্মুখীন হতেই সবাই ভয় পায়।
___তারা ভীরের সামনে দাঁড়ায়
এক সেকেন্ডের জন্য সবার নিঃশ্বাস পর্যন্ত থেমে থাকে এই ভয়ে তারা কি আবার কোন ভুল করল।
এখানে যে ভুলের শাস্তি একমাত্র মৃত্যু।
____ভীর ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখ এক দৃষ্টিতে ছুঁয়ে ফেলে সকলকে।
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ধারালো।

___আমি চলে যাচ্ছি। আমি না থাকা অবস্থায় প্রাসাদের একটি নিয়মও যেন ভাঙা না হয়,
একটিও নয়।
কোন কিছুর হেরফের হওয়া চলবে না।
ভীর ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়।
তার ঠোঁট শক্ত, চোখে ক্ষিপ্ততা।
চোখ তুলে তাকায় ঘরের মধ্যে খানে,
যেখানে আলো-ছায়ায় অর্ধেক মুখ ঢাকা,
নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছে ইশায়া।
তার চোখে কঠিন কিছু নেই এই মুহূর্তে,
শুধু কিছু না বলা ক্লান্তি,
মুখ জুড়ে বেদনার ছাপ স্পষ্ট।
___ গার্ডদের দিকে ফিরে হিমশীতল কন্ঠে আবার বলে,
ওকে দেখে রাখবে।
ওর যেন কোন কিছুর কমতি না হয়,
কোন জিনিস প্রয়োজন হওয়ার আগেই ওর পায়ের সামনে এনে হাজির করবে।
ওর পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত, যদি একটা আঁচরও পড়ে,
তোমাদের একজনও বাঁচবে না।
আমি তোমাদের টুকরো টুকরো করে আমার কুকুরগুলোকে খাওয়াবো।

___ভীরের ঠান্ডা হুমকি,
সবাই জড়োসড়ো হয়ে দাড়িয়ে আছে।
____তারপর আরেকবার ধীরে বলে,
ওর ওপর নজর রাখবে সবসময় এমনভাবে যেন সে নিজের কোনো ক্ষতি না করতে পারে।
___Heal her, Fast.
ভীর উঠে দাঁড়ায়,
ধীরে এক পলক তাকায় ইশায়ার দিকে।
তার চোখে ঝলকে ওঠে না বলা অনেককিছু
রাগ, আকর্ষণ, আর ভয়ানক এক মায়া।
তবু সে কিছু বলে না।
শুধু একটা নিঃশব্দ চেয়ে থাকা।
আর তারপর সোজা ঘুরে দরজার বাইরে বেরিয়ে যায়।

___ম্যাটিয়াস, ডিয়েগো, নিকো, সান্তিয়াগো, এনরিকো, কার্লোস, হাভিয়ের—সবাই সশস্ত্র প্রস্তুত।
___হাজারো গার্ড দাঁড়িয়ে।
পিছনে দাঁড়িয়ে ৮টা গাড়ির কনভয়।
উপরে ড্রোন, হেলিকপ্টার প্রস্তুত।
ভীর আসে ধীরে ধীরে,
চোখে গগলস, কোমরে অস্ত্র
ডিয়েগো ফাইল বাড়িয়ে দেয়।
___একজন এসে দরজা খোলে দেয়,
ভীর উঠে বসে,
এগিয়ে যায় সে তার রাজত্ব বাড়ানোর পথে।

বাংলাদেশ,
সকালবেলা,
ঢাকার কড়া রোদের আলোয় ঘুম ভাঙে বাড়ির সবার । কিন্তু সেই আলো যেন আর আগের মতো উজ্জ্বল নয়।
____ইশায়ার মা, সায়মা রহমান, ডাইনিং টেবিলে নাস্তা পরিবেশন করছেন। হালকা রঙের শাড়ি, চোখে ঘুম না-ভাঙা ক্লান্তি, তবু হাত থেমে নেই।
জীবন তো কারো জন্য থামে না।
সবার প্লেটে খাবার পড়ছে, কিন্তু কারো মনোযোগ সেদিকে নেই।
হঠাৎ করে আসা একটা ঝড় ওদের সবার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিয়েছে।
___কই এখন বাড়িতে বিয়ের আমেজে পরিপূর্ণ থাকার কথা,
আর কোথায় একসাথে দুই মেয়ে হারানোর কষ্ট।
___জান্নাতের শরীরটাও ইদানিং ভালো যায় না।
চোখে ক্লান্তি, চুপচাপ বসে আছে।
____সাফার বাবা-মা ও চট্টগ্রামে শিফট হয়ে গেছে।
এই শহরের আনাচে-কানাচে তাদের একমাত্র মেয়ের স্মৃতি এখানে তারা থাকতে পারবে না।
__সবাই আটকানোর অনেক চেষ্টা করেছে,
কিন্তু কামরুল আহমেদ ট্রান্সফার নিয়ে চলে যান।

_____একটু পর ওপর থেকে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে আদ্রিয়ান।
___চোখে গভীর কালি, মুখে বড় হয়ে ওঠা দাড়ি, পোশাক পরিপাটি হলেও চোখে ফাঁকা শূন্যতা।
এক সময় যেই ছেলেটা প্রাণবন্ত ছিল, আজ তার মুখে স্থবিরতা। হাসি নেই। সাফার মৃত্যুর পর থেকেই সে যেন একটা মৃত আত্মা বয়ে বেড়াচ্ছে।
আদ্রিয়ানকে চুপচাপ বেরিয়ে যেতে দেখে,
____সায়মা রহমান ডাকে,
আদ্রিয়ান, নাস্তা করে যা বাবা।
____আদ্রিয়ান মাথা নাড়ে, বলে,
ক্ষুধা নেই মা,
অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
___তার কণ্ঠে আগের মত উচ্ছলতা নেই, ভেতরে যেন একটা কুয়াশা গিলে ফেলেছে সব।
সবাই চুপ করে থাকে।
তাকে চলে যেতে দেখে,
ইশায়ার মা চোখের পানি আটকে রেখে বলে ওঠেন,
___তোরা তো চলে গেলি,
সাথে করে আমার ছেলেটার জীবনের সব সুখ নিয়ে গেলি।
তার কণ্ঠ ভারি, ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।

___বেলা করেই ঘুম ভাঙে ইশায়ার।
চোখ মেলে তাকাতে সময় লাগে কিছুক্ষণ।
তার মাথাটা ভার হয়ে আছে,
মনে হচ্ছে যেন ঘুম থেকে নয়, একটা দুঃস্বপ্ন থেকে উঠেছে।
___উঠে নিজের দিকে তাকাতেই বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নেয়,
জামা কাপড়ের বেহাল দশা।
একহাত দিয়ে জামার উপরের দুটো বোতাম লাগিয়ে নেয়।
মনে করার চেষ্টা করে কি হয়েছে।
কিন্তু কিছুই ঠাহর করতে পারেনা
সে,

___ইশায়া ধীরে ধীরে উঠে বসে,
কাঁধ থেকে চুলগুলো গড়িয়ে পড়ে,
চোখে এখনো ঘুম আর বিষণ্নতার ছায়া।
____ঠিক তখনই, দরজার কাছে দাঁড়ানো ছায়ারা নড়েচড়ে ওঠে।
তিনজন গার্ড, কালো পোশাক আর মুখে কঠোর নির্লিপ্ততা নিয়ে এগিয়ে আসে।
___ম্যাম, আপনি ঠিক আছেন?
___কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে জানান।
___তাদের কণ্ঠে আবেগ নেই,
কিন্তু দায়িত্বের ভার আছে।
তারা যেন পাহারাদার নয়,
একটা সোনার খাঁচার নিঃশব্দ প্রহরী।

__ইশায়া তাকিয়ে থাকে চারপাশে,
নরম বিছানা, দামী পর্দা,
কিন্তু তবুও যেন একটা শূন্যতা সব কিছু গ্রাস করে আছে।
__সে ধীরে বলে ,
না! কিছু লাগবে না।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৫

____গার্ডরা নিঃশব্দে পেছনে সরে যায়,
দরজার পাশে ফের আগের জায়গায় ফিরে দাঁড়ায়।
বাইরে পাখিরা ডাকছে,
কিন্তু এই ঘরটা এখনো শব্দহীন।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৭