Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪১

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪১

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪১
তানিয়া হুসাইন

হঠাৎ,
একটি বিস্ফোরণের শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে ভেসে আসে।
ইশায়ার বুক কেঁপে ওঠে।
সে দাঁড়িয়ে যায় হঠাৎ।
আর একটার পর একটা গুলির শব্দ,
কিসের শব্দ দেখার জন্য ইশায়া জানালার কাছে যায়
তাকিয়ে দেখে, জানালার বাইরে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠছে।
আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে।
ভয়ে গলা থেকে শব্দ বের হয় না তার।
সে বুঝে ভীরের গার্ডদের সঙ্গে বাইরের লোকদের ভয়ংকর সংঘর্ষ চলছে।
কিছু গার্ড পাল্টা আক্রমণ করছে, কেউ ছুটে যাচ্ছে ছাদের দিকে,
কারও হাতে মে*শিন গা*ন, কেউ টোকা দিচ্ছে বাংকারের দরজায়।
ঘরের ভেতর থেকেও গোলাগুলির শব্দ এত তীব্র যে মনে হচ্ছিল,
এই প্রাসাদের ইটগুলো যেন কেঁপে উঠছে।
হঠাৎ করেই এই দানবীয় বাড়িটার ভেতরে নিজেকে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে তার,
সবচেয়ে অসহায়।

রাস্তার উপর ভীরের গাড়ি তখনো চলছিল।
অতিরিক্ত ঝড়ের কারনে জঙ্গলের অনেক জায়গায় গাছপালা পরে রাস্তা ব্লক হয়ে গিয়েছে,
রাস্তা ক্লিয়ার করে তারা আবার তাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
রাস্তা ব্লক দেখেও ভীর সরে যায় নি তার উদ্দেশ্য-ই আজকে মিগুয়েলের কাহিনি শেষ করে তারপরই বাড়ি ফিরবে।
চারপাশে পাহাড়া দিচ্ছিল তার বিশ্বস্ত গার্ডরা।
সাড়ি সাড়ি গাড়ি একসাথে চলছে,গাড়ির ভেতর অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ ডিয়েগোর ফোনটা বেজে উঠে।
এই মুহূর্তে ম্যাটিয়াসের ফোন দেখে অবাক হয় ডিয়েগো।
মুহূর্তে তার মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা ছড়িয়ে যায়।
ডিয়েগো রিসিভ করে ফোন কিন্তু পর মুহূর্তেই সে চুপ হয়ে যায়, তার চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে, মুখ থমথমে।
ডিয়েগো ফোন রেখে ভীরকে উদ্দেশ্য করে বলে,

— বস!
হামলা হয়েছে বাড়িতে। মিগুয়েল ও তার সাথে জড়িত সবাই মিলে আক্রমণ করেছে!
ওপাশ থেকে গলার স্বর ছিল হাওয়ায় ছুটে আসা আগুনের মতো উত্তপ্ত।
___ভীরের মাথা ঘুরে ওঠে এমন কথা শুনে, ভয় আর ক্রোধ একসাথে চেপে ধরে তার শরীরকে। গলা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে ।
এটা খুব স্বাভাবিক বিষয় হলেও তার কাছে ভয়ের কারণ হলো ইশায়া।
আর কি হল কত বড় ক্ষতি হলো এসব কিছুতেই তার কোন যায় আসে না,
তার যায় আসা শুধুমাত্র এই মেয়েটাকে ঘিরেই।
ভীর গর্জে ওঠে গাড়ির ভেতরেই,

____ইশায়ার সেফটির ব্যবস্থা কর।
ওকে সুরক্ষিত জায়গায় পাঠাতে বলো। ওর যেন একটা আঁচও না লাগে, ওর গায়ে যদি একটাও ক্ষত দেখি তাহলে ওরা মিগুয়েলের হাতে মরুক বা না মরুক, আমার হাতে নিশ্চিত মরবে!
ভীরের চোখজোড়া জ্বলে উঠছে আগুনের মতো। একটা মুহূর্তও সে আর দেরি করে না।
গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেয় না,উল্টো বাড়ির দিকে ঘুড়ায়,
গতি আরও বাড়াতে থাকে। মুখ দিয়ে অসংখ্য শব্দ ছুটে আসে,রাগে সে জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে।
ইশায়াকে হারানোর ভয় ভেতরে বাসা বাধছে,
সে কি ঠিক আছে নাকি ওর কিছু হয়েছে বারবার এসব চিন্তা মাথায় ঘুরছে।
____প্রাসাদের চারদিক ঘিরে প্রায় তিনশোর মতো প্রশিক্ষিত গার্ড ছিল ভীরের।
তারা সঙ্গে সঙ্গে অ*স্ত্র হাতে নিয়ে পাল্টা আক্রমণে নামে।
বাইরের দেয়ালজুড়ে বসানো ছিল হাই-ফাংশনাল সিকিউরিটি গা*নের ব্যবস্থা, যেখানে ড্রোন থেকে শুরু করে স্না*ইপার সবই ছিল সজাগ।

তবুও, মিগুয়েলের আক্রমণ ছিল ভয়ংকর।
তাদের হাতে ছিল হেভি গি*য়ার, গ্রে*নেড, একে একে ভীরের কিছু গার্ড ছিটকে পড়ছিল রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে।
মিগুয়েলের লক্ষ্য ছিল একটাই ইশায়া।
প্রাসাদে ঢুকে মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া।
ওরা জানে, ইশায়া ভীরের দুর্বলতা আর ওই মেয়েকে তুলে নিতে পারলেই রাজভীর আলভারেযের দুনিয়া ভেঙে পড়বে।
তখন তাকে তারা নিজের ইচ্ছে মত ব্যবহার করতে পারবে।
ভীরের নির্দেশে কয়েকজন গার্ড লুসিয়া, রোসা, ও আনা দৌঁড়ে আসে ইশায়ার রুমে।
ইশায়াকে একটা নিরাপদ আশ্র‍য়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
কারণ যে কোন মুহূর্তে তারা চলে আসতে পারে।
কিন্তু ইশায়াকে বার বার বলার পর ও সে এক পা নড়ছে।
সে তার জায়গায় অনড়। কারোর কথা শুনছে না।
গার্ডগুলো বারবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে,
__এর মধ্যে ওয়াকি টকিতে শোনা যায় মিগুয়েলের কিছু সৈন্য প্রধান ফটকের দিকে আসছে।
তাই ওই গার্ডগুলো দ্রুত চলে যায় ওদেরকে আটকানোর জন্য।
___গো*লাগু*লির শব্দে ইশায়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠছে বার বার। ভয়ে মাথা কাজ করছিল না তার।
তাকে কে কি বলছে সে শুনছো ও না। ইশায়া কোনার এক জায়গায় হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে আছে।
তার চোখ ছলছল করছে মুখে বিষণ্নতা আর ভয়ের ছায়া।

____ইশু…!
হঠাৎ খুব পরিচিত কন্ঠের শব্দে ইশায়া উপরে তাকায়।
তাকে দেখেই ইশায়া চিৎকার করে ওঠে,
আপু!
তু… তুমি, তুমি এসেছো?
দেখো কী হচ্ছে!
আমার না খুব ভয় করছে আপু।
___সাফার মুখে একটুও ভয়ের ছাপ নেই। বরং সে শক্ত গলায় বলে,
ভয় পাস না ইশায়া! এটা ভয় পাওয়ার সময় না। তোকে লড়তে হবে।
এটাই সুযোগ।
___সাফার কথার কিছুই ইশায়া বুঝতে পারেনা।
তাই সে জিজ্ঞেস করে,
___মানে।
___মানে তোকে এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে,
___কি বলছো আপু।
আমি পারবোনা।
___সাফা শক্ত গলায় বলে,
পারতে তোকে হবে ইশায়া।

____না আপু, আমি পারব না। আমি কিছু চিনি না, কিছু জানি না। আমি হারিয়ে যাব। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আর ধরা পড়লে ভীর…
_____সাফা এগিয়ে আসে, তার চোখ যেন আগুন।
পারতেই হবে! যদি ওদের হাতে পড়িস, ওরা তোকে শুধু মেরে ফেলবে এই না, কি কি করতে পারে সেটা তোর ধারণার বাইরে।
এখান থেকেও খারাপ অবস্থা হবে তখন তোর।
আর ভীর তোকে সারা জীবন ধরে বন্দী রাখবে, তিলে তিলে শেষ করে দেবে।
তুই কখনোই এই বন্দিত্ব থেকে বের হতে পারবি না।
___এই সুযোগ,এই একটাই সুযোগ তোকে পালাতে হবে।
এরকম সুযোগ আর তুই কখনো পাবি না।
___ইশায়া অসহায় কন্ঠে বলে,
কিন্তু কিভাবে? আমি কিছুই জানি না,কিছুই চিনি না।
___চুপ! বেশি ভাবিস না। এখন যদি পালাতে না পারিস তাহলে এই দুনিয়াতে তুই আর কখনো নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচতে পারবি না।

সুযোগ সবসময় আসে না।
আর এটাই তোর কাছে প্রথম আর শেষ সুযোগ।
হয় বাঁচার মতো করে বাঁচবি নয়তো মরে যাবি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যেতে হবে।
এখানে থাকলে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবি না। স্বাধীনতা বলে কিছুই থাকবে না।
আগের মত সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর জীবন চাইলে এখন, এই মুহূর্তে পালা!
নিজের মন মস্তিষ্কের কথাগুলোর মধ্যে টানাপোরানে পড়ে যায় ইশায়া।
সেও তো চায় আগের মত বাঁচতে।
সবার সাথে মিলেমিশে শান্তিতে থাকতে।
কিছুক্ষণ চুপ থাকে ইশায়া,তারপর করে ফেলে এক অভাবনীয় কাজ।
কিন্তু একবারও এটা ভাবেনা এই লোকদের হাত থেকে বেঁচে গেলেও ভীরের থেকে কিভাবে সে পালাবে।
আদতেও কি সে কিছু করতে পারবে।
পাবে নিজের স্বাধীনতা।

বাইরে তখন আগুনের লেলিহান শিখা।
একেকটা বি*স্ফোরণে দালানের অংশ কেঁপে কেঁপে উঠছে।
ভীরের গার্ডরা সমস্ত রণশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করে চলেছে।
আকাশ থেকে ড্রো*ন গুলি বর্ষণ করছে, প্রাসাদের ছাদে থাকা স্না*ইপাররা একের পর এক শত্রু নিধন করছে।
তবুও রক্ত ঝরছে, মৃ*তদেহ জমছে চারপাশে।
____জ্বলন্ত চারপাশ, বারুদের গন্ধ, গুলির শব্দ, ভয়ার্ত চিৎকার এই পরিস্থিতির মাঝেও একটা কল্পনার দৃঢ়তা তাকে ধাক্কা দেয় এই সাহসের পথে।
সাফার কণ্ঠ, তার গলার দৃঢ়তা, ভরসার চোখ সব যেন মাথার ভেতর কুয়াশার মতো জমে উঠেছে।
এর বলেই, ইশায়া তুলে নেয় একটা পাতলা চাদর, সেটাকে পেঁচিয়ে ফেলে নিজের মাথা-মুখ পুরোপুরি ঢেকে নেয়।
নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলে।
___আপু আমি জানি না কী করবো, চারদিকে আগুন, যদি ধরা পড়ে যাই?
গলার আওয়াজ কেঁপে উঠছে ইশায়ার।

___কিচ্ছু হবে না। সাহস রাখ! তোকে এখনই বের হতে হবে।
আমার সাথে চল!
চুপি চুপি দরজার পাশ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ইশায়া।
চারপাশে এমন বিশৃঙ্খলা, গার্ডরা কেউ পাল্টা আক্রমণে, কেউ আহতদের টানছে, এই ভয়াবহতার মধ্যেও কেউ টের-ই পায় না, একটা মেয়ে পালাচ্ছে।
যাকে ঘিরে এই যুদ্ধ।

অন্যদিকে,
রাস্তায় ছুটছে একের পর এক কালো এসইউভি।
ভীরের চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো রক্তিম লাল।
___ইশায়া একতলায় নামতেই তার পায়ের নিচের মাটি সরে যায়।
রক্তে রঞ্জিত সিঁড়ি, গু*লিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গার্ডদের লা*শ,
ধোঁয়ার কুন্ডলী আর ভাঙা দেয়ালের নিচে চাপা পড়া মানুষের হাহাকার তাকে স্তব্ধ করে দেয়।
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
হাত ঠান্ডা, গলা শুকিয়ে আসছেন
তবু পেছনে ফেরার আর উপায় নেই।
সে হামাগুড়ি দিয়ে এক গার্ডের মৃ*তদেহের পাশ দিয়ে যায়।
চোখের সামনে পড়ে থাকা রক্তমাখা মুখটা দেখে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
গাড়ির পাশে দৌঁড়ে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
চোখ বেয়ে নেমে আসে দুটো নোনা জল।
কিন্তু সামনের গেট টা দেখে ভেতর থেকে একটা স্বস্তি কাজ করে।
এই গেট টা পার করতে পারলেই সে মুক্ত
ইশায়া নিজেকে শক্ত করে, গাড়ির পাশ দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মেইন গেট এর দিকে আসতেই,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪০

____মেইন গেটের মুখে একসাথে থামে একের পর এক গাড়ি।
কালো বুলে*টপ্রুফ এসইউভি, প্রতিটা গাড়ির জানালা অন্ধকারে ঢাকা।
গাড়ি থেকে নামছে একে একে ভীরের লৌহমানব গার্ডরা।
কারো হাতে এ*কে৪৭, কারো হাতে পিস্তল।
সবার চোখে আগুন, সবার শরীর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
সবচেয়ে পিছনের গাড়ি থেকে নেমে আসে ভীর।
তার চোখে চোখ রাখা যাচ্ছে না, পাগল হয়ে গেছে সে,
শক্ত চোয়াল, এলোমেলো চুল, রক্ত লাল চোখ।
তার রাগ, তার ভয়, তার ভালোবাসা, সবকিছু মিশে গেছে এক প্রাণঘাতী রূপে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪২