প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২২
নীতি জাহিদ
সুনসান কামরা, চারদিকে নিঃসাড়তা, কেমন থমথমে ঝাঁঝালো দম আটকানো পরিবেশ। কিছুক্ষন হলো সামান্তা,তুশি এসে মোনাকে জামা কাপড় বদলে নিতে সাহায্য করলো। পরনে একটা গোলাপ রঙা সুতি শাড়ি। মন ঘিরে আতঙ্ক। এসি চলছে এরপরো ঘামছে। শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছছে বারংবার। ক্ষনকাল আগে অদ্ভুত এক কাজ করে বসেছে এই বাড়ির লোকজন। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে হয়তো ভাবতে পারেনি খান সাহেব। খানিকটা লজ্জা সদ্য বিবাহিত খান পত্নী ও পেয়েছে। তবে লজ্জায় লাল নীল হয়ে যাওয়া খান সাহেবের মুখ দেখে বড় আপা আঁচলে মুখ লুকিয়ে হেসেছেন তো, এই বাড়ির ছোট বউ তুশি জায়গা থেকে সরে গিয়েছে, ইশতিয়াক, সোহান, সামান্তা মুখ টিপে হেসেছে। ছেলে হিসেবে ইশান প্রকৃত কাজটাই করেছে বাবা মায়ের ওই মুহুর্ত টাকে আলোকচিত্র হিসেবে সংরক্ষন করেছে।
মিনহাজ চলে যাওয়ার পর মেয়েটা কান্নাকাটি করছিলো। সামান্তা মন খারাপ করে মালার ডালা হাতে নিয়ে সোফায় বসে ছিলো। তখনই কাজটা করে ফেললো আইরিন। আইরিন মোনাকে সোফায় বসিয়ে ইশানকে ডেকে বললো,
– ইশু বাবু, পাপাকে ডেকে আনো। বলো ফুফি এখনই ডাকছে? না আসলে জোর করে নিয়ে আসবে।
ইশান বুঝে গিয়েছে ফুফি রেগে গিয়েছে। ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বাবাকে জোর করে নিয়ে এসেছে। ইমরানের গায়ে পাঞ্জাবি দেখে সকলে আঁচ করে নিয়েছে কাজটা ইশানের। উপরে কাজে ব্যস্ত ছিলো। কাজ ছেড়ে আসাতে খানিকটা প্রভাব ফেললো খান সাহেবের মুডে। ইমরান মুখটা শক্ত করে বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আপা ডেকেছো কেনো?
আইরিন ইমরান কে ইশারা দিয়ে মোনার বিপরীত সোফায় বসতে বললো। ইমরান লক্ষ্য করলো মোনার মাথা পুরো ঢাকা ঘোমটায়। এভাবে তো দম আটকে যাবে। মোনার চেহারাটাই দেখা দুষ্কর। আইরিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এভাবে তো দম আটকে ম*রে যাবে। এমন নাক মুখ ঢেকে দিয়েছো কেনো?
কপাল কুঞ্চিত করে আইরিন উত্তত দিলো,
– এটা রিচুয়াল। তুই তাড়াতাড়ি করলেই মেয়েটা বেঁচে যাবে।
ইশান বাবাকে ধরে বসিয়ে দিতেই সামান্তা মামার হাতে মালা ধরিয়ে বললো,
– আম্মু রেগে আছে, মামীকে মালাটা পরিয়ে দেন মামা। মালা বদল হয়নি এখনো।
বোনের দিকে তাকিয়ে দেখে রান্নাঘর থেকে পায়েসের প্লেট এনে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে রাগের কি আছে তার মাথায় এলো না। কিছুটা অপ্রতিভ হলো। ইমরান হাতে মালা নিয়ে বসে আছে। আইরিন শান্ত গলায় বললো,
– তুই কি পরাবি নাকি আমি চলে যাব উপরে?
কামরার পরিবেশ থমথমে। আপাতত বাধ্যতামূলক কাজটা করে ফেললো। ঘোমটার উপর মোনাকে মালা পরিয়ে দিলো। সামান্তা এবং তুশি ধরে মোনার দু হাত ধরে ইমরানের গলায় মালা পরালো। ইমরান উঠে যাবে তখনই বলে উঠলো আইরিন,
– ঘোমটা তুলে বউয়ের মুখ দেখ?
এই পর্যায়ে ইমরান পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। এখন কি সেই বয়স আছে! কি বলে আপা! ঘাবড়ে গিয়ে বললো,
– আপা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না এবার। এই বয়সে এসব কাজের কোনো মানে হয়? বড্ড বেমানান।
– বিয়ে মানে মানানো বা বেমানান বলতে কিছু হয় জানতাম না। আমি যতদূর জানি সবার জীবনে বিয়েটা স্পেশাল কিছু। নাকি ভেবে বসে আছিস আগের টা বিয়ে আর এটা ছেলেখেলা?
বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ ইমরান। বাড়ির ছোটরা সামনে। আপা এভাবে হেস্তনেস্ত কেনো করছে? দম ছেড়ে বললো,
– কি করতে হবে?
– বউয়ের ঘোমটা তুলে পায়েসটুকু খাইয়ে দেয়। মেয়েটা ক্লান্ত। বিশ্রাম নিতে হবে। তাড়াতাড়ি কর।
জোরে ব্রিদ ইন ব্রিদ আউট করে মোনার লেহেঙ্গার ওড়না তুললো। মুখটা একেবারে সরাসরি। মোনার চোখ আনত। চোখ দুটো ভেজা। সামান্তা ডেকে উঠলো,
– বড় মামী, মামার দিকে তাকান।
ভেজা চোখের পাপড়ি বেয়ে ঝরে পড়ছে অশ্রু। ইমরানের চোখের দিকে তাকাতেই মনে হলো মানুষটার চেহারা আগের চেয়েও রিষ্ট পুষ্ট হয়েছে। যদি আবেগের বয়সটা থাকতো এতক্ষনে গলা জড়িয়ে নির্ঘাত বেহায়ার মত বলে ফেলতো, আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছি ইমরান সাহেব। কষ্ট টা ভেতর থেকে নাড়া দিয়ে উঠলো। ইমরান তখনো নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। শুভদৃষ্টি হয়ে গেলো। এই প্রথম এভাবে একজন অন্যজনের চোখের দিকে তাকালো। কি বলবে বুঝতে পারছেনা ইমরান। চোখের কাজল লেপ্টে আছে, বয়সটা হয়তো চার বছর বেড়েছে কন্যার তবে কিশোরী বয়স ছেড়ে পূর্নাঙ্গ তরুণী আজ। এভাবে বেশিক্ষন তাকালে লজ্জায় পড়তে হবে। এমনিতেই ভীষণ বিচলিত এখন।
আচানক সোহান চিৎকার দিয়ে বললো,
– ইশান ক্যাপচার… শুভদৃষ্টি হয়ে গেলো।
মানুষ টা লজ্জা পেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। বাটির পায়েস থেকে এক চামচ পায়েস নিয়ে মোনার মুখের সামনে ধরলো। মোনা সংকোচ নিয়ে মুখে নিলো। মুখের পাশটাতে পায়েস লেগে গেলো খানিকটা। টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে সবার সামনেই মুছে দিলো। নিজের অজান্তে এমন কাজ টা করেই চোখ বুজে ফেললো। অলরেডি নিজের জিভেই সামান্য কামড় দিয়ে লজ্জা আড়াল করে নিলো। ভাব ধরলো যে এটা কোনো ব্যাপারই না। এদিকে আইরিন আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসছে। বাকিরাও মিটমিটিয়ে হাসছে।
আইরিন মোনাকে নির্দেশ দিতেই মোনা এক চামচ খাইয়ে দিলো। অন্যদিকে ইশতিয়াক মজা করে বললো,
– ভাবী আপনি ও একটা টিস্যু নেন। ভাইয়ার গায়ে লাগতে পারে।
ইমরান কিঞ্চিৎ হাসলো ঠোঁট কামড়ে। বাড়ির সবাই অবাক। এমন মুহূর্তে ইমরান হাসবে কেউ কল্পনা ও করেনি। বাকিরা ভেবেছিলো ধমক খাবে। পায়েস মুখে নিয়ে ভ্রু কুচকে বললো,
– আপা চিনি দিলে কেনো?
– এক চামচ খেলে আহামরি কিছু হবে না। রাতে বউয়ের সাথে মিষ্টি মিষ্টি আলাপ করার জন্য এই দিনে চিনি খেতে হয়। এখন আমি নিশ্চিন্ত। তোর মুখ দিয়ে মিঠা কথা বের হবে।
হতবাক হয়ে বোনের দিকে মিনিট খানেক তাকিয়ে নিজেকে আশ্বস্ত করলো। বোনের কথার পিঠে কথা বাড়ানোর সাহস করেনি। কি না কি বলে উঠে। এরচেয়ে এই পরিবেশ থেকে সরে যাওয়াই ভালো।
কি করতে হবে তাও বুঝতে পারছে না। আইরিন বললো,
– আশ্চর্য উপহার দেয়? কপালে আদর দেয়।
ইমরান বিচলিত হয়ে বলে,
– সোহান তোর আম্মাকে ডাক্তার দেখা।
ইশতিয়াক ফোনের বাহানার একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আপার বেফাঁস কথাবার্তা শুরু হয়ে গিয়েছে। সামান্তা নিজেও বোকা বনে গিয়েছে মায়ের কথা শুনে। মা যে এক কাঠি উপরে বুঝতেই পারেনি। আইরিন খানিকটা ধমকে বললো,
– বাহ! এত বছর সব গুছিয়ে রাখলাম আর এখন ভাই বলে পাগল।
কি বলল আর কি বুঝলো আপা! ইমরান লজ্জা পেয়ে সামান্তাকে বলে,
– আম্মু কি করতে হবে বলো? তোমার মা আমাকে নাকানিচুবানি খাইয়ে ছাড়বে।
সামান্তা মুচকি হেসে বলে,
– আম্মু তো কি কি যেন বলেছে। তাই করেন।
– উপহার নেই এখন সাথে।
আইরিন অন্যদিকে তাকিয়ে মেকি রাগ নিয়ে বললো,
– সামান্তা তাকে বলে দে, উপহার রুমে গিয়ে দিলেও হবে। এখন বাকি কাজ টা যেন সেরে নে।
ললাট বেয়ে পড়ছে স্বেদজল। টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে ঘাম মুছে মোনার দিকে তাকাচ্ছে একবার, বাকিদের দিকে তাকাচ্ছে। রান্নাঘরের সামনে বাড়ির কাজে সাহায্য করা লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ অপ্রস্তুত। আচমকা মোনা বলে উঠলো,
– আপনি উপরে চলে যান। আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
আজ এত বছর পর মেয়েটা মুখ ফুটে দুই লাইন বলেছে। কৃতজ্ঞতার চোখে সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত রেখে আস্তে করে বললো,
– ধন্যবাদ।
বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি উপরে যাচ্ছি।
কেউ আর আটকায় নি। এমনিতেই বেশ লজ্জাজনক অবস্থানে পড়েছে এতক্ষন। কিছু বলে নি এই ঢের। আইরিন নিজেও আটকায় নি। এতক্ষন প্রতিটা কাজ চুপচাপ করেছে মানুষটা আইরিনের ভয়ে। তবে মোনার কাজে কেনো যেন আইরিন বেশ খুশি হয়েছে। ইমরানকে অপ্রস্তুত অবস্থা থেকে বের করতে মেয়েটা কি সুন্দর করে পরিস্থিতি সামলে নিলো। সামান্তা তুশিকে নির্দেশ দিলো যেন মোনাকে উপরে ইশানের পাশের কামরায় নিয়ে পোশাক বদলে নিতে সাহায্য করে।
ভাবনা থেকে বের হয়ে মোনা হাতের কাছে ফোনটা পেলো। তুশি রেখে গিয়েছে। বাবাকে ফোন দিতেই মিনহাজ রিসিভ করলো। মোনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলো। মেয়ের কান্না শুনে মিনহাজ নিজেকে আটকাতে চেষ্টা করে মেয়েকে বুঝালেন,
– আমার আম্মাটা কাঁদছে কেনো? ইমরান কিছু বলেছে?
ভেজা গলায় বললো,
– না। বাবা আমাকে এভাবে ফেলে গেলে কেনো?
– তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। তোমার পছন্দের মানুষের কাছেই তো রেখে এসেছি।
বাবাকে আর চিন্তায় ফেলতে মন সায় দিচ্ছেনা মোনার। দুটো সুন্দর কথা বলে ফোন রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাশের কামরার বারান্দায় চোখ গেলো। মোনা যে কামরায় আছে ওটা মাঝ কামরা। তার বাম পাশের কামরা বিশাল সাইজের আন্দাজ করা যাচ্ছে বারান্দা জুড়ে বিভিন্ন রকমের গাছ আর একটা স্টিলের সুইং আছে। অন্যদিকের ডান পাশের বারান্দাও বেশ সুন্দর তবে পূর্বের কামরার চেয়ে কিছুটা ছোট। রুমের দরজা খোলার আওয়াজ পেলো। সামান্তা এবং তুশি ঢুকলো। দুজনই বয়সে মোনার চেয়ে বড়। সামান্তা কাছে এসে বললো,
– বড় মামী নিচে চলুন। সবাই অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।
কিছুক্ষন আগেই সবার পরিচয় পর্ব দিয়েছিলো। তাই কাউকে ভুলে নি। বেশ সুন্দর এই বাড়ির মেয়েগুলো। তিনজনই একসাথে নেমে এলো। খাবার টেবিলে একপাশে বসিয়ে দিলো মোনাকে। সবাই যে যার যার মতো বসে পড়লেও সামনের চেয়ারটা খালি। তৎক্ষনাৎ সবাই দাঁড়িয়ে পড়াতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো ইমরান আসছে। বাকিদের দেখাদেখি মোনাও দাঁড়ালো। আইরিন খাবার বাড়ছে। ইমরানের হাতের ইশারায় সবাই বসে পড়লো। বসতে বসতে ইমরান সকলকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– আমি বেশ কয়েকবার বলেছি এভাবে খাবার টেবিলে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
আইরিন ধমকে বললো,
– এটা আমাদের রীতিনীতি। আব্বার পর তুই সেই জায়গায়। তুই বললেও ওরা দাঁড়াবে আর না বললেও দাঁড়াবে। আর যদি না দাঁড়ায় আমার ডান্ডা রেডি থাকবে ওদের পায়ের উপর বাড়ি দেয়ার জন্য। অভদ্রতা এই বাড়ির ছেলেমেয়েরা শিখে নি। খাবার শুরু করলে আমিই দাঁড়াতে দিতাম না। খাবারকে অসম্মান করে দাঁড়ানোটা অন্যায় হবে, কেউ শুরু করে নি।
– অসুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করাচ্ছো ওদের দিয়ে। আমি আসার আগে কেউ কখনো রাতে ডিনার করতে পেরেছে তোমার অত্যাচারে?
– পারবেও না কখনো। আমার রুলস ই রুলস।
বোনের সাথে কথায় পারা যাবেনা। এ যেন নতুন নয়। ইমরান পানির গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি পান করে ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– সকালে স্কুল আছেনা, আগে খেয়ে নিতে।
– পাপা আমার পেট ভরা, ও বাড়িতে আমি তো অনেক খেয়েছি।
মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। নিজের পাতে খাবার বেড়ে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। কেউ খাবার বেড়ে দেয়া পছন্দ নয়। নিজের সব কাজই নিজে করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।খাবারের আইটেম আজ খুব একটা বেশি না। আইরিন আগ বাড়িয়ে বললো,
– বেশি কিছু করতে পারিনি রে, সবজি টুকু করেছি আর মাংস টা মেরিনেট করা ছিলো…
কথা শেষ করতে দেয় নি ইমরান। হাত তুলে বোনকে থামিয়ে ইশারা দিলো বসার জন্য। বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপা তুমি আরো দশটা আইটেমে টেবিল সাজালেও আমি এই সবজি দিয়ে খেয়েই উঠবো জানো। খাবার শেষে কড়া করে এক কাপ কফি দিও। মাথা ধরেছে।
আইরিন জানে ভাইয়ের খাবার সবসময় সীমিত। ইশতিয়াক ভোজন রসিক। অন্যদিকে ইমরান খাবার বেছে খায়। মেইনটেইন ও করে টুকটাক। ডায়াবেটিস আছে। বংশগত রোগ। একবার ধরলে জীবনটাই রুটিনে অভ্যস্ত করতে হয়। ইশতিয়াককে অনেক বার বুঝানোর পর ও সে খেতেই থাকে। তখন ইমরান সবাইকে বুঝায় ওর যেহেতু খেতে পছন্দ ওকে যেন বারণ না করে। জীবনটা উপভোগ করুক। তুশির সাথে এই নিয়ে প্রায় ঝগড়া হয় ইশতিয়াকের। তুশি রুটিন করে দেয়। সেই রুটিন ইশতিয়াক ভাঙে। অবশ্য মেয়েটার ও দোষ আছে। মজার মজার রান্না করে স্বামীকে দেয় টেস্ট করতে। জিহবার স্বাদ ও বাড়ায়। এদের খুনশুটিতে ‘সোনালী সকালে’ সবসময়ই একটি হাস্যজ্বল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আপাতত টেবিলে নিরবতা। আইরিন বলে উঠলো,
– রিসিপশন কখন করবি কিছু ভেবেছিস?
অন্যমনস্ক ছিলো ইমরান। বোনের ডাকে সম্বিত পেয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন প্রশ্ন করার সময় কি এই খাবার টেবিল? না তো। খাবারের সময় কথা বলাই বড্ড অপছন্দের সেই জায়গায় কি করে আপা এমন কথা বললো! কথা না বাড়িয়ে বোনকে বললো,
– আপা খেতে বসো। খেয়ে শুয়ে পড়ো। ঔষধের সময় হয়েছে তোমার। ওসব নিয়ে আলোচনা করার সময় অনেক আছে।
ইশান বাবাকে বলে উঠে গেলো। ইমরানের এমন উত্তরে আইরিন নাখোশ। কেউ কথা বাড়ায় নি। আইরিন মন খারাপ করে খেতে লাগলো। গিটারের টুং টাং শব্দ আসছে সিড়ি দিয়ে। সিড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো ইশান গিটার বাজাতে বাজাতে সিড়ি দিয়ে নামছে। মুচকি মুচকি হাসি মুখে। ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে মোনাকে বললো,
– মা তোমাদের বাসায় গিটার দেখেছি। ওটা কার?
মোনার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো। তৎক্ষনাৎ মাথায় এলো ইশান ব্যাপারটাকে সহজ করতে চাইছে, সম্পর্ক গুলোকে স্বাভাবিক করতে চাইছে। মোনা ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর করলো,
– আমি যখন ক্লাস নাইনে তখন জেদ ধরেছিলাম বাবার কাছে। শিখেছিলাম কিন্তু এখন তো বাজাই না। তুমি দেখলে কি করে?
– ড্রইং রুমে ছিলো তো। তখন চোখে পড়েছে।
মোনা মাথা নেড়ে বললো,
– সকালে নিয়ে এসেছিলো আমার রুম থেকে চাচ্চু। ফুফির হলুদে একটু গান বাজনা করেছিলো কাজিনরা।
– তুমি গাওনা?
– আগে গাইতাম। এখন ইচ্ছে করে না।
ইশান হেসে গিটারে সুর দিয়ে সবার দিকে তাকাচ্ছে। সবার মুখ সহাস্য। বাবা চুপচাপ খাচ্ছে। কথাই বলছেনা। আচানক ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
– পাপা প্লিজ, ইটস ফর মি… মিট দ্য টিউন।
ইমরান খাবার থামিয়ে ছেলের দিকে তাকালো। ছেলের চোখে মুখে প্রায় অনেক বছর পর এমন হাসি দেখলো। ছেলেটা এতটা মিশুক কি করে হলো! ছেলের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বললো,
– ইশান এখন ঘুমাতে যাও। আজ নয়…
– পাপা প্লিজ… অনলি ওয়ান প্লিইইইজ।
ইশান সুর তুলে ফেলেছে। ছুটে গিয়ে সোহান হাত ধুয়ে ফেললো। সোফায় বসে সেন্টার টেবিলে বিটবক্সের মতো সাউন্ড দিচ্ছে। ইশতিয়াক সুর তুললো শিষ দিয়ে। ইমরান বিস্মিত। ভাবতে পারছেনা বাসার ছেলে গুলা কেনো এতটা উতলা আজ। খুশির মতো কিছু তো হয়নি এখন। ইশানের দিকে তাকাতেই ছেলে অনুযোগ করে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটালো। আইরিন বলে উঠলো,
– ইমন, বাচ্চাটা জেদ করছে। একবার ধর। আমরাও তো বঞ্চিত আজ এত বছর।
খাবার শেষ করে বেসিনে হাত ধুয়ে টিস্যুতে হাত মুছে চেয়ারে বসলো। কথা বলছে না। ইশান বাবাকে চুপ থাকতে দেখে বুঝেই গেলো আজ পাপা আর গাইবেনা। নিজেই গেয়ে উঠলো,
– কোন গোপনে মন পুড়েছে
বৃষ্টি থামার পরে
আমার ভেতর ঘরে
নয়ন কালো মেঘ জমালো
ঝিনুকের অন্তরে
আমার ভেতর ঘরে।
এতটুকু গেয়ে ইশান থেমে গেলো। ছেলেটার চোখ ছলছল। কেউ না বুঝুক ইমরান জানে এই গানের পেছনে আত্নগোপন করা কষ্ট। মন চাইলো এই বিমর্ষ মুহুর্তে ছেলের মুখে হাসি দেখতে। সুর তুললো চোখ বন্ধ করে,
কোমল ধানের শিষে
দুঃখরা যায় মিশে।
সুখ পাখি কার্নিশে
হারায় অগোচরে
দিন খুঁজে যাই,দিন আসেনা
রাত আসে রাত করে
আমার ভেতর ঘরে।
থেমে যায় ইমরান। এই গানটা বাবা ছেলে দুজনেরই বড্ড পছন্দের। রাতে যখন ইশান কাঁদতো কষ্ট পেয়ে তখন ইমরান এই গান শোনাতো। আজো এই ছেলে বাবার পাশে শুয়ে এই গান শোনার বাহানা ধরে। এই গানের মাঝে লুকিয়ে আছে বাবা ছেলের একাকিত্বের চুপকথা, বিষাদ, চোখের জল, ইশানকে নিয়ে যুদ্ধ করার দিনগুলো। ভেসে উঠে পুরো চিত্র ইমরানের চোখের সামনে। ইমরান থেমে গেলেও ইশানের গিটার থামেনি। ঠিক তখনই আরেকটা মেয়েলী সুর কানে আসে সকলের,সুরটা আইরিনের।
অবুঝ চোখের তারায়
অন্ধ কাজল হারায়
এক ফালি হাত বাড়ায়
শান্ত চরাচরে।
সোনার কাকন কোন সে আপন
মুখ লুকায় প্রান্তরে
আমার ভেতর ঘরে।
স্তব্ধ পরিবেশ। ইশান, ইমরান দুজনের আইরিনের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে। ইশান যখন বাবার অনুপস্থিতিতে খেতে চাইতো না তখন আইরিন ও ইমরানের মত করে এই গান শুনিয়ে খাইয়ে দিত। ভাই আর ভাতিঝার এই মুহুর্ত গুলো তাকেও কাঁদায়। সবাই সুখ টা দেখে। অথচ এই সুখের পেছনে যে এক গাঢ় কষ্টকর ইতিহাস আছে তা পুরোনো সম্পর্কের মানুষরা ছাড়া সকলের অগোচরে। নিশব্দ ডাইনিং এরিয়া। ইমরান দাঁড়িয়ে পড়লো। ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে ইশানের মাথার চুল এলোমেলো করে বললো,
– গুড নাইট পাপা, ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে স্কুল আছে।
– ওকে পাপা।
সিড়ি দিয়ে উঠে সোজা নিজের কামরায় চলে গেলো ইমরান। পিছন ফিরে দেখেনি কিছুই। প্লেটের পানিতে টুপ টুপ করে পড়া চোখের জল যেন বলে দিচ্ছে পরাজিত তনয়ার পরাজয়। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে নিজেকে কেমন যেন এই পরিবেশে খাপ খাওয়াত্র পারছেনা মোনা। মানুষটা তার পছন্দের, তবে সে কি এতই অবহেলার! কেমন যেন এড়িয়ে চলছে ইমরান, অবশ্য মোনা নিজেও দুই কথা বলবে না।
কয়েকটা ঘন্টার ব্যবধানে কি করে বাবার রাজকন্যা আরেকজনের চারদেয়ালে বন্দি হয়ে গেলো! এই দেয়ালে ঝুলে আছে অদৃশ্য এক তালা। যার কোনো বস্তুগত চাবি নেই। এই তালার নাম সংসার। এর চাবিকাঠি তৈরি করে নিতে হয়। আর চাবি তৈরি হতে গেলে কত শত বাধা পেরোতে হবে তা অজানা৷ এই চাবি গড়ার মাধ্যম হলো ইমরান শরীফ খান। যে এখন অধরা, যার সংস্পর্শে যাওয়া এখন বাঘের ডেরায় ভুলে পা ফেলার মতো। এই বাড়ি আসার পর থেকে লক্ষ্য করে দেখলো বিয়েটা আসলে ইমরানকে করতে বাধ্য করা হয়েছে। বাবারা তার সন্তানদের জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে উঠে যে সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলো?
ঠকঠক আওয়াজ পেয়ে বারান্দা থেকে রুমে প্রবেশ করলো। হাতের সিগারেট এস্ট্রেতে ফেলে দরজা খুলে দিতেই দেখলো সামান্তা দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে সোহান। এই মেয়েটা আদুরে আবদার না করলে মামার কামরায় সচরাচর আসে না। আজ কি চাই? ভাগ্নিকে দেখে প্রশ্ন করলো,
– কিছু বলবে, আম্মু?
– জ্বি মামা।
– বলো।
– মামা, মামী কোথায় থাকবে?
হকচকিয়ে গেলো ইমরান। ভাগ্নে ভাগ্নীর মুখে এমন শব্দ শোনাটা বড্ড বেমানান। তবে বিষয়টি সত্যি চিন্তার। এতক্ষন তার মাথায় কেনো এলো না?একা তো নেই আজ থেকে। নিজের সাথে আরেকজনের জীবন ও জড়িয়েছে। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে উত্তর করলো,
– মামীকে প্রশ্ন করেছো তিনি কোথায় থাকতে চান?
সামান্তা উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো। ভারী গলার প্রশ্ন পুনরায় এলো,
– তিনি কোথায় থাকতে চান?
– আপনি যেখানে বলবেন?
– আমার দরজা উনার জন্য সবসময়ই খোলা। উনাকে যেয়ে বলো যে উনি যেখানে থাকতে আরামবোধ করবেন সে জায়গাই যেন বেছে নেন। ঠিকাছে?
সামান্তাকে পেছন থেকে তুশি ডাকলো। পেছন ফিরে দেখে তুশির সাথে মোনাও আছে। ওদের পেছনে ইশান, আইরিন, ইশতিয়াক। বাকিরা বুঝতে পারছেনা ইমরান কিভাবে রিয়েক্ট করবে। মন মেজাজ যতটা খারাপ সবাই ভেবেই নিয়েছে আজ হয়তো মোনার জায়গা হবেই না। সামান্তা মোনাকে সামনে এনে ইমরানকে বললো,
– মামা, মামী এসেছে।
ইমরান কিছুটা ইতস্তত বোধ করলো। তবুও মৃদু হেসে মোনাকে বললো,
– এসো, তুমি কি এই রুমে থাকতে চাও?
মোনা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মানুষটা এত ভদ্রভাবে কথা বলছে কেনো? মনে হচ্ছে যেন এটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। মোনা ঘাড় কাত করে ইতিবাচক ভঙ্গি করলো। ইমরান সরে গেলো দরজা থেকে। মোনা ভেতরেই ঢুকতেই বাকিদের বললো,
– ঠিক আছে, তোমরা শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে। ইশান ইট’স ঠু লেট।
সামান্তা এবং সোহানের পেছন থেকে মাথা বের করে ক্যাবলাকান্তের মতো হাসি দিয়ে বললো,
– এইতো পাপা যাচ্ছি। গুড নাইট।
– গুড নাইট।
মোনার দিকে তাকিয়ে মাথা উচিয়ে বললো,
– গুড নাইট মা।
মোনা শুষ্ক হেসে বললো,
– গুড নাইট।
সকলে যাওয়া পর্যন্ত ইমরান দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলো। দরজা আটকে একপাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলো সোহান মোনার ট্রলি রেখে গিয়েছে। ইমরান মোনার দিকে না তাকিয়েই বললো,
– চাইলে চেঞ্জ করে নিতে পারো। ওয়াশরুম ঐদিকে।
– আমি ঠিক আছি।
– শাড়ি পরে ঘুমানোর অভ্যেস আছে বলে তো মনে হয়না। জায়গা পরিবর্তনে কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। ওটা যেমন তোমার বাড়ি, এটাও তোমার বাড়ি, তোমার সংসার। নিজের মতো করে থাকো। অস্বস্তি নিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। ঠিক আছে?
– জ্বি।
– সাবাস, চেঞ্জ করে শুয়ে পড়ো। আমিও ভীষণ ক্লান্ত। গত দুদিন জার্নিতে ছিলাম।
মোনা ট্রলি থেকে একটা সুতি হাতের কাজের সাদা জামা বের করে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ইমরান খাটের কোণায় বসে ভাবছে গড় গড় করে সব কটা কথা উগলে দিলো ঠিকই তবে এখন বড্ড অস্বস্তি লাগছে। একই বিছানায় শুবে কি করে? এই মেয়ের মনে এক আকাশসম অভিমান। ইমরানেরই বা কি দোষ! নিজের মাঝে অনুভূতি প্রশ্রয় দেয়ার পরিস্থিতি, পরিবেশ তো ছিলোনা তখন। লোকে কি বলতো! আজ পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করাতে হয়তো গুটি কতক আঙুল উঠবে। কিন্তু চার বছর আগে ঘটলে তো নিজের এত বছরের অর্জিত সম্মান ধূলিসাৎ হতো। ওয়াশরুমের দরজা খোলার আওয়াজ শুনে সেদিকে তাকাতেই দেখলো সাদা জামা পরা সুন্দরতম নারী। বৈধ ভাবে এই নারী তার একান্ত নিজের। যতই হোক পুরুষ মানুষ। কিছুটা বিব্রত বোধ করে বললো,
– অস্বস্তি হচ্ছে?
মোনা নিরুত্তর। মাথা আনত। ইমরান শান্ত স্বরে বললো,
– অস্বস্তিবোধ করোনা। এই রুমটাতে আমার যতটুকু অধিকার তোমার তার চেয়ে বেশি। ধরে নাও আজ থেকে আমি তোমার রুমেই থাকবো। সারাদিন তো তোমারই। রাতে একটু আমাকে আশ্রয় দিলেই আমি কৃতজ্ঞ থাকবো।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মোনা তাকিয়ে আছে। সবসময় দেখেছে রেগে কথা বলতে, নতুবা ভারী গলায় তোড়পাড় করতে। এত শান্ত, ভদ্রতার সহিত কিভাবে কথা বলছে? নাকি মোনাই সরাসরি মানুষটাকে পেয়ে অহেতুক কারণে মুগ্ধতা খুঁজে পাচ্ছে। মোনাকে নিরব দেখে ইমরান পুনঃ বললো,
– খাট বেশ বড় এক সাথে ঘুমোতে কি অসুবিধা হবে?
মোনার হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে। ইমরান নিজেও বিচলিত এমন প্রশ্ন করে। বুঝতে পারছেনা নিজেদের মধ্যে সহজবোধ্যতা কি করে নিয়ে আসবে। মোনা দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো,
– জ্বি না।
– তবে শুয়ে পড়ো। চিন্তার কারণ নেই। আমি জানি আমি পুরুষ, আমি এ কথাও মানি তুমি আমার স্ত্রী। অসম্মান অবশ্যই করবোনা। নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ো। নিচে ঘুমানোর অভ্যেস নেই, নতুবা শুয়ে পড়তাম। আর রুমে ডিভান নেই যে বিকল্প ব্যবস্থা করবো। সোফার লেন্থ দেখেছো? আমার অর্ধেক। আমিও নিরুপায়? খুব বেশি অসুবিধা হবে কি?
– আমার সমস্যা নেই। আপনি শুয়ে পড়ুন। আমিও ঘুমাবো।
– ভেরী গুড।
ইমরান উঠে আলমারি থেকে আরেকটা কম্ফর্টার নামাতে গেলে মোনা বাঁধা দিয়ে বললো,
– আরেকটা কেনো?
– তোমার লাগবেনা?
– একটাতে হবে না আমাদের?
থমকে গেলো ইমরান। কিছুটা ভেবে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
– হুম।
ইমরান একপাশে টান টান করে শুয়ে পড়লো। মোনা অপর পাশে শুয়ে একে অন্যের বিপরীতে মুখ ঘুরালো। এভাবে কি ঘুম হয়? ক্লান্তি দুজনের চোখে মুখে। ইমরানের ঘুম প্রায় চলে এসেছে তৎক্ষনাৎ মোনার ফোন বেজে উঠলো উচ্চ শব্দে। হকচকিয়ে গেলো। ঘুমের ঘোরে ইমরান বলে উঠলো,
– মোনালিসা ফোনটা সাইলেন্ট করবে?
ইমরান কথাটা ঘুমের ঘোরে বললেও নিজের নামটা শুনে বুকে শীতল বাতাস বইলো। ফোন হাতে নিতেই নাম দেখে ধড়ফড় করে বুক কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
– ই ম রা ন সাহেব…
আধো আধো ঘুম চোখে ইমরান পাশ ফিরলো। ল্যাম্প শেডের আলোতে মোনার চোখে আতঙ্ক লক্ষ্য করে উঠে বসলো। ফোন কেটে গেলো। কিছুটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
– কোনো সমস্যা?
পুনরায় ফোন বেজে উঠলো। মোনা ফোন এগিয়ে দিলো। ইমরান নিজেও চমকে গেলো। রুমের দেয়ালে আটকানো মেটালের টিক টিক করা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো প্রায় রাত একটা। মোনাকে রিসিভ করতে বললো। ও পাশ থেকে নারী স্বর ভেসে এলো,
– মুনিয়া? মা কেমন আছিস?
কম্পিত গলায় বললো,
– ফু ফি ভা লো আছি।
মোনা আতঙ্কে কাঁপছে। মোনার কাঁধে হাত দিলো ইমরান। কাছে টেনে চোখ দিয়ে আশ্বাস দিলো কথা বলতে। সাহস পেয়ে বললো,
– ফুফি এত রাতে? ঘুমাও নি তুমি?
– তোকে রেখে কি করে ঘুমাই। চলে আয় তুই আমার কাছে। থাকিস না তুই ওই বাসায়। আমি জানি তোর বাবা তোকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে ইমরান ভাইয়ের সাথে যাতে আমি উনাকে বিয়ে করতে না পারি তাই না রে।
– ফুফি এসব কথা কাল বলি। আমার শরীর খারাপ লাগছে?
– কেনো রে? এ্যাই তুই কোথায় ঘুমাচ্ছিস? উনার রুমে? তোকে ছুঁয়েছে? তোদের মাঝে কিছু কি হয়েছে?
বিস্মিত দুজন। ইতস্তত বোধ করলো ইমরান। লজ্জায় মোনার মাথা নত। ইমরান ফোনটা হাত থেকে নিয়ে মায়াকে ধমকে বললো,
– মায়া, ঘড়ি দেখেছো? অলরেডি রাত একটা। এত রাতে ভাস্তিকে ফোন দিয়ে তার বেডরুমের, স্বামীর খবর নেয়া কি ধরনের অসভ্যতা ?
– ইমরান ভাই? ও ইমরান ভাই? কেমন আছেন আপনি? মুনিয়া তো কচি বাচ্চা ইমরান ভাই। ও সংসারের কি বুঝে? শুনেন না, কালকে এসে ওকে রেখে যান এই বাসায়। আমি আজকে শ্বশুর বাড়ি যাই নি। ডিভোর্স দিয়ে দিবো ওই লোকটাকে। আমাকে বিয়ে করে নিবেন কাল?
– জাতে মাতাল হলেও, তালে ঠিকই আছো। আমি ভীষণ লজ্জিত বোধ করছি। সম্পর্কে তুমি আমার ফুফু শাশুড়ি। কোথায় কি বলতে হয় সেই জ্ঞানটুকু আদৌ হলোনা। ঘুমাও। এলোমেলো মাথা ঠিক হবে। আমি আমার স্ত্রী নিয়ে যথেষ্ট ভালো আছি। ইনশাআল্লাহ সুখে থাকবো। নতুন বিয়ে হয়েছে তোমার, অকল্যাণকর কথা বলবে না। সংসারটা সুন্দর ভাবে করো। রাখছি। আল্লাহ হাফেজ।
ফোন কেটে ইমরান মোনার ফোন সুইচ অফ করে দিলো। মোনার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,
– আমার অনুমতি ছাড়া কয়েকদিন ফোন অন করবেনা। বাবার সাথে কথা বলতে মন চাইলে আমাকে জানাবে ঠিক আছে?
মোনা ঘাড় কাত করলো। ইমরান বিড়বিড় করে বললো,
– কত কি যে এখন ফেস করতে হবে?
– স্যরি?
– কেনো?
– আমার জন্য সব হলো।
– নিজেকে কখনো দুষবে না। সৃষ্টিকর্তা যাই করেন ভালোর জন্য করেন। তুমি আমার ভবিতব্য। এখন ঘুমাও।
ইমরান পুনরায় নিজের জায়গায় যেতেই মোনা প্রশ্ন করলো,
– ফুফি তো আপনাকে খুব ভালোবাসে, বিয়ে করলেন না কেনো?
ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দিলো,
– তোমাদের পাড়ার জাবেদ তোমাকে খুব ভালোবাসে, বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো, বিয়ে করোনি কেনো?
জাবেদের খবর কি করে জানে উনি? হকচকিয়ে গেলো এমন প্রশ্নে। তবুও জবাব দিলো,
– ও তো আমাকে বিরক্ত করতো। ওকে আমি পছন্দ করতাম না।
– সত্য তেঁতো হলেও সত্য, মায়া আমাকে ভীষণ বিরক্ত করতো, ওকে আমি পছন্দ করতাম না। উত্তর পেয়েছো?
– ফুফি তো খুব সুন্দরী তবে কিসের এত আপত্তি ছিলো আপনার?
– কে বলেছে দুনিয়াতে সব সুন্দরের পূজা করতে হবে?
– সে তো আমি ও আপনাকে বিরক্ত করেছি।
হঠাৎ ইমরান শব্দ করে হেসে দিলো। অনুভূতি ছিলো না মিথ্যা, প্রশ্রয় দেয়া হয়নি কখনো। যখনই প্রশ্রয় দিয়েছে দূর্ঘটনা ঘটেছে। তবে আজ মন স্পষ্ট সায় দিচ্ছে প্রাণ খুলে কিছু বলার। ঠোঁট টিপে হাসি আড়াল করে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২১
– দুটোর মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ভিঞ্চির মোনালিসা স্বয়ং বিরক্ত করতো আমার মতো সাধারণ একজন ছাপোষা মানুষকে, আমি কতটা সৌভাগ্যবান ভেবে দেখেছো! সাধে তুমি আমার মোনালিসা! এতে যদি বিরক্ত হতাম আমার চরিত্র এই ভেবে কলঙ্কিত হত যে, তুই কি পুরুষ ইমরান! বাকিটা বুঝে নিও। শুভ রাত্রি।
