প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৩
নীতি জাহিদ
জানালার পর্দা ভেদ করে আলো সরাসরি মুখে পড়েছে। সকালের তাজা ঘুমটা ভেঙে গেলো। আজ তো ভার্সিটি ও নেই। সেমিস্টার ফাইনালের পর ছুটি কয়েকদিন তাহলে বাবা কেনো এমন করছে? জানালা টা কি এখনই মেলে দিতে হলো? ঘুমের আবেশেই মোনা বলে উঠলো,
– বাবা কেনো এমন করছো? আরেকটু ঘুমাই। প্লিজ।
– মা, এখন সাড়ে বারোটা বাজে। আর ঘুমিয়ো না, আমি বোর হচ্ছি। নাস্তা করবে উঠো।
ঘুমের মাঝে এই ডাক শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠলো। কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিলো তার সম্পর্ক গত রাতেই বদলে গিয়েছে। ইশানকে দেখে চমকে উঠলো। পাশে চেয়ারে স্যুট বুট পরা ইমরান বসে আছে। হাতে পেপার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সত্যি সাড়ে বারোটা। দু হাতে চোখ কচলে বললো,
– স্যরি বাবা, আমি বলতে পারবোনা। এত বেলা হয়েছে? আরো আগে জাগাও নি কেনো?
ইশান খাটে বসে বললো,
– সকালে তো আমি স্কুলে গেলাম। এক্সাম দিলাম। একটু আগে এসেছি। জাগাতে এসেছিলাম। পাপা বললো আরেকটু পর জাগাতে তাই ফ্রেশ হয়ে এসে জাগালাম।
– আচ্ছা, তুমি বসো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি পাঁচ মিনিটের মাঝে।
ওয়াশরুমের কাছে গিয়ে মোনা ফিরে এসে বললো,
– একটু বাবার সাথে কথা বলবো।
ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো সময় এসে গিয়েছে। ইমরানের পরীক্ষা শুরু। এখন থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ সাবধানে ফেলতে হবে। কথার বাণ এফোড় ওফোড় করতে পারে মেয়েলী হৃদয়। এরা সচরাচর নমনীয় হয়, মায়াময়ী হয়ে থাকে। এদের আঘাত করে নিজেকে হীন প্রমাণ করার মত কাজ আর নেই। বরং সামলে নেয়াটাই যে শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত। কিছুটা ভেবে উত্তর করলো,
– সকালে ফ্লাইট ছিলো। আমি এয়ারপোর্ট থেকেই এলাম…
কথা শেষ হওয়ার আগেই মোনা চোখের পানি ছেড়ে দিলো। ইশান গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান হতভম্ব। কথা টুকু শেষ করতে দিলোনা। এজন্যই মিনহাজ ভয় পাচ্ছিলো এই মেয়েকে নিয়ে। বাবা পাগল মেয়ে সামলানো মুশকিল না শুধু ব্যাপারটা রীতিমতো
না মুমকীন হয়ে দাঁড়ানো। আর পাঁচটা কোম্পানি সামলানো এর চেয়ে ঢের সহজ কাজ। ইমোশন নিয়ে কাজ তো বহু বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছে ইমরান। ইশানকে নিজের মতো গড়েছে। জীবনে এমন একটা দিন আসবে ভাবনাতীত ছিলো। মোনা দু হাতে চোখের পানি মুছে বললো,
– আমাকে নেন নি কেনো?
– ঘুমাচ্ছিলে। সমস্যা নেই ফিরে আসলে আমরা একসাথে যাবো।
– বাবা আমাকে চায়নি?
আদুরে গলায় ইমরান মৃদু হেসে বললো,
– অবশ্যই চেয়েছে। কিন্তু অপেক্ষা করতে গেলে যে দেরি হতো। তোমাকে বলতে বলেছে যেন দুষ্টুমি না করো। আর পৌঁছে কথা বলবে তোমার সাথে।
– আচ্ছা।
ইশান মোনার গাল মুছে বলে,
– তুমিও তো বাচ্চাদের মতো কাঁদো মা।
ঠোঁট ফুলিয়ে অভিনয় করে বললো,
– আমিও এভাবে কাঁদতাম।
ইশানের অভিনয় দেখে মোনা হেসে দিলো। অভিনয় করে দেখাচ্ছে বাচ্চা বেলায় সে কিভাবে কাঁদতো। এখন তো ওসব স্মৃতি। ইশান খাটে বসে গল্প জুড়ে দিয়েছে এদিকে মোনা ওয়াশরুমের দরজা খোলা রেখে ব্রাশ করতে করতে হাসছে। ইমরান মৃদু ধমকে ইশানকে বললো,
– মজা পরে করো, মতিয়া আন্টিকে বলো মায়ের জন্য নাস্তা নিয়ে আসতে। মোনালিসা ঠিক ভাবে ফ্রেশ হয়ে এসো। বাইরে পানি ছিটকে আসছে। পরে ওই পানিতে তোমরা দুজনই পড়বে।
মোনা ভস্ম করা চোখে তাকিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। ইমরান মোনার অভিব্যক্তি দেখে ভ্রু কুচকে ভাবলো, আসার পর থেকেই এমন কেনো করছে মেয়েটা! পর পরই মাথায় এলো, এই মোনা আগের মোনা নয় যে আদুরে ভাবটা থাকবে। আগে যেমন সারাক্ষন বিড়াল ছানার মত পিছু ঘুরতো এখন তার কথায় প্রকাশ পায় শক্ত পোক্ত জবাব। এদিকে ইশান মতিয়াসহ খাবার ট্রলি সমেত ঢুকলো। মোনা বেরিয়ে এসে মুখ মুছতে মুছতে ইশানের দিকে বললো,
– এখন তো লাঞ্চের সময় নাস্তা করলে তো দুপুরে খেতে পারবোনা।
ইমরানকে স্পষ্ট উপেক্ষা করেছে। ব্যাপারটা ইমরানের বেশ অপমানে লাগলো। ভারী গলায় ইমরান বললো,
– লাঞ্চের সময় লাঞ্চ করবে। এখন নাস্তা করো।
কথা না বাড়িয়ে ঢাকনা উলটে দেখলো রুটি,সালাদ,সবজি,জুস। মোনা ইশানের সাথে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে। এক কামড় নিজে নিচ্ছে তো আরেক টুকরো ইশানের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। পেপার পড়ার আড়ালে এই দৃশ্যটা দেখতে বেশ। মেয়েটা বন্ধু পেলো। ইশান মা পেলো। ইমরানের ব্যাপারটা বড্ড ভালো লাগছে। এ যেন চোখে শান্তি!
অন্যদিকে মতিয়া বানু গালে হাত দিয়ে নিচে আরাম করে বসে এদের তামশা দেখছে। মাঝে মাঝে টুকিটাকি নিজেও বলছে। ইমরানের হঠাৎ চোখ আটকে গেলো মোনার স্নিগ্ধ মুখে। এই মেয়ের হাসিতে জাদু আছে। খুব সাধারণ এর মাঝেও অসাধারণ কিছুর স্পষ্ট ইঙ্গিত। অকস্মাৎ কামরায় ছুটে এলো আইরিন সাথে করে রাবিয়াকে নিয়ে। আইরিন এসেই রাম ধমক দিলো মতিয়াকে,
– কিরে মতিয়া নিচের কাজ ফালায় তুই এখানে কি করিস?
মতিয়া হুমড়ি খেয়ে উঠে গেলো। অপরদিকে রাবিয়া মতিয়া ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে। রাবিয়া বিচার দিয়েছে মতিয়ার নামে, মতিয়া সেই নিয়ে তুমুল ঝগড়া। মতিয়া কামচোর, সুযোগ পেলেই গল্পে মেতে উঠে, ঠিক মতো কাজ করে না এসব অভিযোগ করেছে রাবিয়া। ইশান হাসছে। পাশের রুম থেকে সবাই ছুটে এসেছে। আকস্মিক আইরিন লক্ষ্য করলো কামরায় ভাই আছে। ভয়ে ভয়ে ইমরানের দিকে তাকালো সবাই। বাইরে থেকে কখন এসেছে কেউ টের পায় নি। সেই সকালে বের হয়েছিলো। নিজের ব্যক্তিগত কামরায় শোরগোল ইমরানের অপছন্দের। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে সবার দিকে। আইরিন থামাচ্ছে ওদের দুজনকে। ঝড়ের পূর্বাভাস। চুলোচুলির পর্যায়ে চলে গেলো এই দুইজনের ঝগড়া। ইমরান বাজখাঁই গলায় ধমক দিলো,
– বের হও রুম থেকে সবাই।
কেঁপে উঠলো কামরা। আইরিন বকে বের করে দিলো। ইশান এবং মোনা চেয়ে চেয়ে দেখছে। মোনা শেষ রুটি টুকু ইশানের মুখে দিয়ে নিজে জুসটুকু খেতে খেতে ফিসফিস করে বললো,
– এই বাড়িতে কি এসবই চলে?
ইশান এগিয়ে এসে বলে,
– হ্যাঁ, তবে পাপার সামনে পড়েনা এরা। যেদিন পড়ে সেদিনই শেষ। যেমন আজকের ধমকে আগামী এক সপ্তাহ আর সামনে আসবেনা।
ওদের দুজনের ফিসফিসে চোখ গেলো ইমরানের। কত সময় লাগাচ্ছে এরা? এত কথা কিসের। মেজাজ চটে আসে। বাড়িটা সার্কাসে পরিণত করেছে সবাই।
– এতটুকু নাস্তা করতে এত সময় লাগে?
ধমক শুনে মোনা বিষম খেয়ে গেলো। জুসটুকু গিলতে ও পারলোনা। ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে বাবাকে বললো,
– পাপা, মায়ের সাথেও এমন করবে।
হাতের পেপার ফেলে ছুটে এসে মোনাকে ধরলো। নাকে মুখে বিষম খেয়ে মেয়েটা কাশছে। মোনার মাথায় আলতোভাবে চাপা দিতে দিতে বললো,
– আস্তে। স্বাভাবিক হও।
টিস্যু দিয়ে মোনার নাক চেপে ধরলো। একটু স্বাভাবিক হতেই মুখ মুছে দিয়ে পানি এগিয়ে দিলো। হালকা স্বরে বললো,
– এজন্য খাওয়ার সময় কথা বলা আমার অপছন্দের।
মোনা কটমটে স্বরে বললো,
– এত জোরে কথা বলেন কেনো? স্বাভাবিক স্বরে বলা যায় না?
ইশান লজ্জা পেয়ে গেলো। মা এভাবে বাবাকে ধমকালো। ইশানের দিকে তাকিয়ে মোনা নিজেকে স্বাভাবিক করে ইমরানকে পুনরায় বললো,
– স্যরি। আমি এভাবে বলতে চাই নি।
সামনে থেকে মোনা উঠে চলে গেলো। ভীষণ লজ্জা পেলো ইমরান নিজেও। নিজের মাঝে নিয়ন্ত্রণ এনে ইশানকে বললো,
– ইশান মাকে বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাও। চেষ্টা করো যেন মন ভালো করতে পারো তার।
– আচ্ছা পাপা, তুমি কি বের হবে?
– হ্যাঁ পাপা, একটু কাজ আছে।
এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বাড়ি আসার এটাই একমাত্র কারণ ছিলো মোনাকে মিনহাজের যাওয়ার খবর দেয়া। বাইরে থেকে অন্য কিছু শোনার আগে ঘরের ব্যাপার ঘরেই সামলে নিয়েছে। এখন মোনাকে অন্য কিছু বুঝালে ও মেয়েটা মন খারাপ করবেনা। তবে যা ব্যবহার দেখাচ্ছে। ইমরানের হজম হচ্ছেনা। তবু ও নিজেকে মানাচ্ছে এই বলে, সব দোষ তার। কষ্ট যেহেতু দিয়েছে কষ্ট পেতেই হবে। মোনার কাছে সব এখনো অজানা। থাকুক কিছু অগোচরে।
মান্থলি মিটিং আজ। টিউলিপের সকল ক্রিয়েটিভ ডিজাইনারদের নিয়ে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। লাঞ্চের পর সবাই অপেক্ষা করছে চেয়ারম্যান স্যার এবং এমডি স্যারদের জন্য। কনফারেন্স রুমে ঠিক চারটায় সকলে সমবেত হয়েছে। ইমরান এবং নয়ন প্রবেশ করতেই সকলে দাঁড়িয়ে পড়লো।অপেক্ষা মিনহাজের জন্য। নয়ন জানিয়ে দিলো মিনহাজ দেশে নেই। অফিসের কাজে দেশের বাইরে গিয়েছে। ইমরান এবং নয়ন দুজনই আজ শূন্যতা বোধ করছে। পুরোটা মিটিং আজ ম্যানেজার সাহেব এবং নয়ন সামলে নিলো। এত সময় ইমরান চুপচাপ ছিলো। কিছু তথ্য নিয়ে নয়ন নিজেও গোলমাল পাকিয়ে ফেলছে। আজকের আলোচনার বিষয়টা সম্পূর্ণ নতুন। এই বিষয়ে নয়নের জ্ঞানের পরিধি স্বল্প। এতদিন অনেক প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করেছে, অনেক ধরনের ফেব্রিক্স নিয়ে কাজ করেছে তবে জি আই পন্য নিয়ে এই প্রথম টিউলিপ কাজ করবে। এই পন্য নিয়ে কাজ করার আগ্রহ গত কয়েক বছর ধরে ইমরানের মাথায় চেপে বসেছে। এত এত কাজ করেছে কিন্তু এমন অদ্ভুত দেশীয় চিন্তা মাথায় আসাতে প্রথম দিন মিনহাজ ও ভীষণ অবাক হয়েছিলো। মিনহাজকে অবাক করে দিয়ে নতুন তথ্য দিলো ইমরান। সে কথা শুনে এয়ারপোর্টে আজ মিনহাজ খুশিতে চোখের জল ফেলে বলেছিলো,
– আমি ভুল করিনি। ঠিক হাতেই আমার কন্যা তুলে দিয়েছি। মেয়ে আমার ভালো থাকবে ইনশাআল্লাহ।
ভাবনা থেকে বেরিয়ে ইমরান দাঁড়িয়ে সকলকে বললো,
– টিউলিপ অনেক পন্য নিয়েই কাজ করেছে। এই প্রথম জি আই নিয়ে কাজ করবে। আপনাদের আজ এখানে ডাকার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আগামী এক সপ্তাহ সবাই ফিল্ড ভিজিটে যাবেন। তার দায়িত্ব কোম্পানি নিবে। সিলেক্টেড প্লেস হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা। তাঁত পল্লীগুলো ঘুরে ঘুরে জামদানীর উপর সব ধরনের তথ্য বের করে নিয়ে আসবেন। ছোট্ট একটা প্রোডাকশন হাউজ আমাদের ফ্যাক্টরিতে করবো। তবে আমাদের সম্পূর্ণ পন্য সংগ্রহ হবে রূপগঞ্জ থেকে। ওখানকার ভৌগোলিক পরিবেশ এখানে পাওয়া যাবে না। একেকটি পন্য হবে ইউনিক। ডিজাইন দিবেন আপনারা। তানায় সুতোর টান তুলবে আমাদের তাঁত শিল্পীরা, যাদের আমরা তাঁতী বলি। এদের একেকটি কাজ তুলে ধরা আমার অন্যতম উদ্দেশ্য। যাদের মাথা থেকে যত সূক্ষ্ম, নিখুঁত ডিজাইন বের হবে, যার জামদানীর ডিজাইন দেশ ছেড়ে বিদেশে সমাদৃত হবে তার পদোন্নতি সেই অনুযায়ী হবে। ক্লিয়ার?
এতক্ষন সবাই ব্যাপারটাতে বিরক্তি প্রকাশ করলেও এখন বেশ মজা পেয়েছে। এমন ইন্টারেস্টিং কাজ এর আগে কখনোই করা হয় নি। এই ব্যাপারটি সবাইকে গোপন রাখতে বলা হয়েছে।
তিহান এবং সাদাফ চুপচাপ শুনছে। তিহান মন মরা হয়ে বললো,
– স্যার আমরা তো শাড়ির কিছু বুঝিনা।
ইমরান কলম ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
– জামদানী যে কেবল শাড়ি হয় তা কে বললো, পাঞ্জাবির জন্য ডিজাইন করবেন, ফতুয়ার জন্য করবেন,শেরওয়ানিতে করবেন, কোটি, ক্যাজুয়াল শার্টে করবেন। কিপ ইউর ব্রেইন এংগেইজড এন্ড থিংক হায়ার। মেয়েরা শাড়ি, গয়না, জুতা, ব্যাগ আরো যা যা আছে সব কিছুতে বুদ্ধি কাজে লাগান।
তিহানসহ অন্য ছেলেদের চোখ চকচক করে উঠলো। এই ব্যাপারটা নয়নের মাথায় ও তো এলোনা। নয়ন টেবিলে থাবা দিয়ে উত্তেজিত হয়ে বললো,
– ইটস আমেজিং। ওকে এভ্রি ওয়ান, লেটস রেডি ফর ঠুমোরো।
– ওকে স্যার।
তামান্না প্রশ্ন করলো,
– স্যার আমাদের কি নিউ ব্র্যান্ড নেম হবে?
ইমরান উত্তর দিলো,
– অবশ্যই।
নয়ন নিজেও উৎসুক। এই নাম আজ সকালে মিনহাজকে এয়ারপোর্টে বলেছিলো। নয়ন জানতে চাইলে বলছিলো সবার সামনে বলবে। মিনহাজ যদি ফিরে এসে শোনার সুযোগ না পায় তাই আগেই জানিয়েছে। ইমরান হেসে স্লাইড চেঞ্জার হাতে নিয়ে স্ক্রিনে স্লাইড ওপেন করলো। সকলকে এলইডি স্ক্রিনে তাকাতে বললো। তাকাতেই খুব সুন্দর জামদানী লোগোসহ একটি নাম ভেসে উঠলো বাংলা বর্ণমালায় এবং ইংরেজি অ্যালফাবেটে। রিমি ভ্রু কুচকে উচ্চারণ করলো,
– ‘মোনালিসা’ MONALISA
নয়ন দু অধর আলগা করলো। নিচে আবার ট্যাগ লাইন। তিহান জোরে বললো,
– স্যার নিচের ট্যাগ লাইনটা কি অন্য ভাষার শব্দ?
– হুম। পড়ুন।
সাদাফ ইউরেকা বলে চিৎকার দিয়ে বলে,
– ওহ মাই গুডনেস, ইটস ফ্যান্টাসটিক।
ইমরান খানিকটা হেসে সাদাফের দিকে তাকালো। সাদাফ উচ্ছ্বাস নিতে বললো,
– স্যার এখানে, Sei Bellisima ( সেই বেলিসিমা) লিখা তাই না? নিচে মেড ইন বাংলাদেশ।
ইমরান মাথা নাড়ালেন। সাদাফের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কিছু কি বুঝতে পেরেছেন?
– জ্বি স্যার।
রিমি প্রশ্ন করলো,
– স্যার জামদানী দেশীয় পন্য, মোনালিসা নামটা তো বিদেশী।
সাদাফ রিমিকে উদ্দেশ্য করে কিড়মিড় করে বললো,
– মিস. রিমি আপনি একটু থামুন। আপনি স্যারের থিংকিং লেভেলে এখনো পৌঁছাতে পারেন নি। স্যার আমি কি একটু বলবো?
ইমরান সম্মতি দিয়ে বললো,
– প্লিজ ক্যারি অন।
সাদাফ ব্যাখ্যা করতে লাগলো,
– মোনালিসা এমন একটি নাম যা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী সমাদৃত। প্রিন্সেস ডায়নার নাম যতটা না মানুষ জপে তার চেয়ে কয়েক গুন বেশি জপে মোনালিসা। সব ভাষাভাষীর মানুষের জন্য বোধগম্য। না কারো উচ্চারণে সমস্যা হয়, না কারো লিখাতে সমস্যা হয়। মোনালিসা নামে অনেক প্রোডাক্ট থাকতে পারে। তবে কোনো দেশের জি আই পন্য এই নামে কেউ বের করেছে বলে মনে হয় না। জি আই পন্য মানে একটি ভৌগোলিক নির্দেশক পন্য। জিওগ্রাফিকেল ইন্ডিকেশন। জামদানী বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যাবেনা। যাকে এক নামে চেনে ঢাকাই জামদানী। বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পন্যগুলো মধ্যে অন্যতম হলো জামদানী। অন্য কোথাও জামদানী তৈরি হলেও আমাদের মতো সুতোয় কাউন্ট আনতে পারেনা সেখানকার তাঁতীরা, আমাদের ডিজাইন উঠেনা তাদের তানায়। হলো ক্লিয়ার কেনো মোনালিসা নাম হবে আমাদের ব্র্যান্ডের? যা দেশ-বিদেশ সব জায়গায় সকলের মুখে মুখে থাকবে, সহজে উচ্চারিত হবে। ভিঞ্চি এমন ভাবে মোনালিসাকে আমাদের মাইন্ডে সেট করেছে আমরা অনায়াসে উচ্চারণ করতে পারি। এবার আসুন ট্যাগ লাইন, সেই বেলিসিমা একটি ইটালিক কমপ্লিমেন্ট। যার অর্থ তুমি খুব সুন্দর। পুরো বাক্য দাঁড়ালো, মোনালিসা, সেই বেলিসিমা। আমাদের ভাষায়, মোনালিসা তুমি অপরূপা। জামদানীতে মোনালিসা তুমি অনন্য, অপরূপা।
কনফারেন্স রুম জুড়ে করতালি। ইমরান হাসছে। নয়ন ইমরানকে দেখছে নির্বাক হয়ে, মুগ্ধ হয়ে। ইমরানের চোখ নয়নের উপর পড়তেই নয়ন গালে হাত দিয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে জোরেই বললো,
– মানুষ কতটা ভালোবাসতে পারে একটা নামকে?
ইমরান কেশে উঠলো। গ্লাস থেকে পানি নিয়ে গলা ভিজিয়ে চোখ পাকালো। সাদাফের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ভেরী গুড সাদাফ। খুব ভালো প্রেজেন্টেশন ছিলো। আমার ভাবনাটাকে এত গুছিয়ে সবার মাঝে রিপ্রেজেন্ট করবেন আমি ভাবতে পারিনি। ইনশাআল্লাহ আমরা খুব ভালো একটা টিম পাব। গো এহেড।
ইমরান বেরিয়ে এলো। নয়ন পিছু ছুটলো। বিরক্ত করছে ইমরানকে। ইমরান ধীরে ধমকে বললো,
– নয়ন এটা অফিস। বাচ্চামো করবি না।
– তুই নাকি আমার মোনা মাকে এখন পছন্দ করিস না। ভালোবাসিস না, অনুভুতি নেই।
– না নেই। তোর এত কথা জানতে হবে কেনো?
– স্বীকার করিস না কেনো? তাহলে আস্ত একটা ভালোবাসাময় ব্র্যান্ড খুলতে চাইছিস কেনো?
– মোনালিসা নামটা ভিঞ্চির দেয়া, আমার না।
– তোমার মোনালিসা তো তোমারই। ঢং করো কেনো? আজ মিনহাজ ভাই এজন্যই খুশী হয়ে বলেছিলো সঠিক হাতে কন্যা তুলে দিয়েছেন তাই না?
– চুপ। কথা বাড়াবিনা। আমার মনে হয়েছে এই নামটা জামদানীর সাথে যায়। তাই দিয়েছি। দ্যাটস ইট।
– Rome was not built in a day বুঝলি? এত বড় একটা ডিসিশন তুমি ইমরান একদিনে নাও নি। তুমি জামদানী পরা মোনার প্রেমেই মজেছিলে চার বছর আগে ইমরান শরীফ খান। এতটাও অবুঝ নই আমি।
– বেশী বুঝা ভালো না।
– ম/রতে বসেছিলি কেনো….
চোখ রাঙালো ইমরান নয়ন কথা শেষ করতে পারেনি। অলরেডি সবাই যার যার কিউবিকলে পৌঁছে গিয়েছে। সারাটা দিন আজ মন খারাপের মাঝে পার করেছে। এই মুহুর্তটাকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে চায়। ইমরানের রাঙানো চোখের দিকে তাকিয়ে সবাইকে বলে,
– এভ্রিওয়ান লিসেন টু মি, যেহেতু নতুন ব্র্যান্ড ওপেন হচ্ছে আমরা চিয়ার আপ করি। আমার বেসুরে গলায় গান ধরলাম, আমার সাথে শুরু করো।
ইমরানকে শুনিয়ে ওর সামনে এসে জোরেই গান ধরলো,
– আগুন লাগাইয়া দিলো কনে
হাসন রাজার মনে
আগুন লাগাইয়া দিলো কনে
নিভে না দারুণ আগুন
নিভে না দারুণ আগুন
জ্বলে দিল ও জানে
হেঁটে চলে যাচ্ছিলো ইমরান। গান শুনে পেছন ফিরে নয়নের দিকে তাকালো। পুরো অফিসে সকলের মুখে এই গান। নয়ন ঝোপ বুঝে কোপ মে/রেছে। দুষ্টুমিসূচক হাসি তার চোখে মুখে। লজ্জা পেয়ে গেলো ইমরান। নিজেকে আটকাতে না পেরে টোল পড়া গালে হাসি দিলো নিরামিষ খান সাহেব। নয়ন হাসি দেখেই বুঝে গেলো পাথরে ফুল ফুটেছে। অফিসে বাকিরা না বুঝেই নয়নের গানে তাল দিলো। চেয়ারম্যান স্যারের মুখে হাসি দেখে তো আশকারা পেয়ে গলা ছাড়লো আরো জোরে। হাসি আনন্দে সকলে মেতে উঠলো। এদিকে রিমি তামান্নাকে বলেই ফেললো,
– আমি সত্যি স্যারকে ভালোবেসে ফেলেছি তামু। স্যারের হাসিটা জোস।
কথাটা সাদাফ শোনা মাত্রই মুখ চেপে ধরলো। ততক্ষনে গান শেষ সবাই যে যার যার কাজে ফিরে যাচ্ছে। রিমির হাত ধরে টেনে বের করে নিয়ে আসলো। পিছু নিলো বাকিরা। ক্যান্টিনে এনে ঠান্ডা একগ্লাস পানি দিতে বললো ছোটুকে। রিমির দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। রেগে বললো,
– তোর সমস্যা কোথায় বলবি?
– কিসের সমস্যা? এভাবে সবার সামনে টেনে আনলি কেনো আমাকে?
– বেয়াদপের মত যখন তখন একই কথা আওড়ে যাচ্ছিস কোন আক্কেলে? স্যার শুনলে কি ভাববে? চার বছর পার হয়েছে। কি শিখলি?
– এখানে ভাবার কি আছে? আমি কি উনাকে যেয়ে বলেছি নাকি। আমার ভালো লেগেছে তাই বললাম। ভালোবেসেছি আমি এক্সপ্রেস করলাম এত ভাবার তো প্রয়োজন নেই।
সাদাফ ক্রোধে টেবিলে আঘাত করে চৈতি,তিহানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– একে বুঝা? স্যার যথেষ্ট ভদ্র একজন মানুষ এসব শুনলে সবার ক্যারিয়ার শেষ হবে। এছাড়া উনি ম্যারিড, ছেলে আছে উনার।
রিমি তেঁতে উঠে দাঁড়ায়। বললো,
– ম্যারিড ছিলো, এখন ডিভোর্সি। ছেলে তো বড়, আমার সমস্যা নেই। তোদের কি সমস্যা। আসোনা আসল কথায়, আমি যদি স্যারকে বলি এসব কথা স্যার যদি আমাকে এক্সেপ্ট করে তখন খুব লাগবে তাই না, যে বান্ধবী স্যারের বউ হয়ে গেলো। অথচ তোমরা তখনো সামান্য অফিসার। এত হিংসা তোর পেটে সাদাফ?
চমকে গেলো বাকিরা। স্তব্ধ ক্যান্টিন। তামান্না কষে এক চড় মা/রলো রিমিকে। তিহান বলে উঠলো,
– মজা মাস্তি সবই লিমিটে ছিলো, আজকের এই কথার পর আমি অন্তত তোকে চিনিনা। ছিঃ তুই কখনো আমাদের ফ্রেন্ড ছিলি? সাদাফ আজ থেকে আমি ওর সাথে আর ফ্রেন্ডশিপ রাখবোনা। তোদের যা ইচ্ছে কর। কতটা ছোটলোক হতে পারে ও। কি বললো এটা? কিসের লোভে পেয়েছে ওকে?
তামান্নাও উঠে গেলো। চৈতি সাদাফের হাত ধরে টেনে নিয়ে আসলো ওকে। সাদাফ এখনো নিরুত্তর। কি বললো রিমি। এই মেয়েটা কত ইনোসেন্ট ছিলো। ঠিক মতো কথাও বলতে পারতোনা। প্রথম দিন থেকে একটু করে করে ওকে শিখিয়েছে সবাই। চৈতি ধিক্কার দিয়ে বললো,
– ছোটলোক ছোটলোকই থাকে। এরা কখনো পরিবর্তন হয়না। পরিবেশ ও পরিস্থিতি ভেদে নিজের রূপটা সামনে নিয়ে আসে। কত কি না করেছিস তুই ওর জন্য। খবরদার আর মিশবিনা ওর সাথে।
মাথার উপর আজ আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে সাদাফের। এই মেয়েটা প্রথম যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কিছুই জানতোনা। দুঃসম্পর্কের মামার বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে গেলো। তখন থেকে সাদাফ ছায়ার মত লেগে ছিলো মেয়েটাকে শেখানোর জন্য। অফিসে ওদের গ্যাংয়ের সাথে পরিচয় করালো। সাদাফের বন্ধু হিসেবে সকলে হাতে ধরে কাজ শেখালো অথচ আজ কি বললো! দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো সাদাফের। মস্তিষ্ক অচল। চাপ দিতে চাইলোনা। উচ্চাকাঙ্খা এই মেয়ের বরাবরই ছিলো। আজ স্পষ্ট প্রকাশ পেলো। একটাই কথা মনে এলো, Pride goeth before destruction.
একটার পর একটা আলোচনা সভা সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত ইমরান। অফিস শেষ করে ছুটে এসেছে। বাসায় তার কনফারেন্স রুমে নতুন একটা আলোচনা সভা। তবে এবারের টা ভিন্ন। এখানে কয়েকজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি, বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি রয়েছে। নিচতলায় এই আলোচনা সভা বসবে। একটি ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার নিয়ে আলোচনা। অফিস থেকে এসে এক কাপ কফিতে হালকা চুমুক দিয়েই উপরে নিজের কামরা থেকে কিছু জিনিস এনে তৈরি হয়ে নিলো। একে একে লোকজন আসা শুরু করেছে।
ব্যবসা নিয়ে বিষদ আলোচনা চলেছে। সোহান এসে কানের কাছে কিছু একটা বলাতে ইমরান নড়ে চড়ে বসলো। পুনরায় আলোচনায় মনোযোগ দিলো। কিছুক্ষন আগে সোহান একটা ফাইলের জন্য আলোচনা সভা থেকে উঠে ড্রইং রুমে এসেছিলো। তখনই কেয়ারটেকার জোয়াদ্দার জানালো এই ব্যাপারটা। সচরাচর এই কনফারেন্স রুমে বাড়ির কেউ প্রবেশ করেনা। আর বাড়ির সদর দরজা কনফারেন্স রুমে প্রবেশের জন্য ব্যবহার করা হয়না। পেছন সাইডে আলাদা স্ট্রিট করা আছে।
নিচতলার লিভিং রুমে নাস্তার ব্যবস্থা হয়েছে। সকলে নাস্তা নিতে নিতেও আলোচনায় মগ্ন। এর মাঝে হঠাৎ দোতলা থেকে নেমে আসছে খান পত্নী। ব্যাপারটা ইমরানের ভালো লাগেনি। তবে সে নিরুপায় কারণ আগে থেকে মোনাকে জানানো হয়নি এই ব্যাপারে। সেক্ষেত্রে দোষ ইমরানের। সোহান তখন কানে দিয়েছিলো এখানকার একজন ব্যবসায়ী বারান্দা থেকে মোনাকে আড় চোখে দেখছিলো তা কেয়ারটেকার জানিয়েছে। এখনো সেই লোক হা করে তাকিয়ে আছে। ইমরান গলা ঝেড়ে বলে উঠলো,
– মি. মাজহার চা নিন।
মনোযোগ বিচ্যুত করে মাজহার চা নিয়ে হেসে বললো,
– বাসায় কি নতুন অতিথি এসেছে?
এতক্ষনে বাকিদের মনোযোগ মোনার দিকে। সোহান খুব বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। হয়তো মামীকে ইশারা দিয়ে কিছু বুঝাবে। এমনিতেই কিছুক্ষন আগে ইমরানকে বলেছে মাজহার ঝামেলা করলে ওকে মা*রবে। এই লোকের সমস্যা আছে কিছুটা। সোহানেত বয়স কম, রক্ত গরম। তাই হুটহাট সিদ্ধান্তে পটু এই জেনারেশন। ইমরানের ইশারায় চুপচাপ সোফায় বসে পড়লো। সকলের সামনে একটু উঁচু আওয়াজে ডাকলো,
– এক্সকিউজ মি, মিসেস ইমরান। ক্যুড ইউ প্লিজ কাম হিয়ার?
মোনা থতমত খেয়ে গেলো কিচেনের দিকে যাওয়ার আগেই। মাথায় অবশ্য ভালো করে ঘোমটা পেঁচিয়ে নেমে এসেছে। দেখতে খুব গুছালো ঘরোয়া বউ লাগছে হালকা নীল থ্রি পিছে। মোনা এগিয়ে এলো বাকিরা চমকে উঠলো। মিসেস ইমরান! একবার ইমরানের দিকে তাকায়, পুনরায় মোনার দিকে। মোনা এগিয়ে আসতেই সোহান উঠে গেলো। মোনাকে সোফায় বসতে দিয়ে নিজে চেয়ার নিয়ে বসলো। মোনা সকলকে সালাম দিতেই ইমরান বলে উঠলো,
– মোনালিসা, আমার সহধর্মিণী । গত কালই পারিবারিক ভাবে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
একে একে সকলের সাথে পরিচয় শেষে মোনাকে বললো,
– উনারা প্রত্যেকে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী।
মোনা মাথা ঝাঁকালো। এরমধ্যে যে প্যাঁচাল পাড়ার সে পেড়েই ফেলল,
– ভাবী সাহেবার বয়স তো খুব কম মি. খান। আপনার একটু বেশি হয়ে গেলোনা?
ইমরান নিশ্চুপ। সোহান কিছু বলবে তার আগেই মোনা বলে উঠলো,
– তাতে কি ভাই সাহেব। আপনাদের ভাবী সাহেবার এতেই চলবে।
– ব্যাপারটা তবে সো কল্ড সমাজের সাথে মিলে গেলো না? গোল্ড ডিগার একটা থিওরি তো আশে পাশে ঘুরে।
মোনা শক্ত পোক্ত হয়ে বসে বললো,
– গোল্ড ডিগার কিনা জানিনা তবে সুগার ড্যাডি বা ড্যাডি ডিগার কন্সেপ্টের সাথে ম্যাচ করলেই করতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে আমার পরিবারকে হতে হবে একবারে ছন্ন ছাড়া, অথবা ভিখিরি গোছের। কারণ সেই হিসেবে আমার বাবা তো না খেতে পেয়ে অল্প বয়সী মেয়েকে এমন দ্বিগুন বয়সী টাকা ওয়ালা পুরুষের সাথে বিয়ে দেয়ার কথা তাই নয় কি? পুঁজি বাদী সমাজ ব্যবস্থার রিফ্লেশন এর প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছেন আপনি।
অনড় বসে আছে ইমরান। ড্রইং রুম জুড়ে নিরবতা। কেমন সত্য কথা গুলো বলছে। তাও আবার নির্ভয়ে। সোহান মামার দিকে একবার তাকায় তো মামীর দিকে। এর মাঝে আরেকজন ব্যবসায়ী বলে উঠলো,
– পুঁজি বাদী সমাজব্যবস্থায় তো ক্যাপিটালিজম খুব স্ট্রং। তবে কি সেই ক্ষেত্রে মি. খান ক্যাপিটালিজম খাটালেন আপনাকে বিয়ে করতে? ডোন্ট মাইন্ড আ’ম জাস্ট কিডিং।
– তবে আপনি বলতে চাচ্ছেন খান সাহেবের কাজ এখানে কার্ল মার্ক্সের মার্ক্সিজমে পড়েছে? আপনি নিশ্চিত হলেন কি করে যে আমি কোনো নিচু শ্রমিক শ্রেণীর কর্মকর্তার মেয়ে? কারণ ওয়ার্কিং ক্লাসই তো সবচেয়ে বেশি এসবের শিকার তাই না
– জাস্ট কিউরিওসিটি।
মোনা হেসে উত্তর দিলো,
– তাহলে তো এখানে ক্যাপিটালিজম আসছে না বিয়েটা তো স্বেচ্ছায় করা হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আগেই বলে রাখছি, আপনারা আমাকে কোনো থিওরির কাতারেই ফেলতে পারবেন না। বিয়েটা স্বেচ্ছায় করা। এমন যদি হত খান সাহেবকে ক্যাপিটালিজম খাটাতে হবে তবে সেখানে আমি মিশেল ফুকোর থিওরী অফ পাওয়ার খাটাতাম। মনে আছে তো key points গুলো? ফার্স্ট প্রায়োরিটি গোস টু- পাওয়ার ইজ এভ্রি হোয়্যার, দেন কামস বায়োপলিটিক্যাল পাওয়ার। আমি শ্রমিকের মেয়ে হলেও চাইলেই সেল্ফ প্রোটেক্টিভ হয়ে পাওয়ার এক্সারসাইজ করে ঠিকই বিয়েটা আটকে দিতাম। পাওয়ার এক্সারসাইজ করতে তো বাধা নেই। আর মনে আছে তো মিশেল ফুকো থিওরীতে উল্লেখ করেছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের কথা। শ্রমিকরা চাইলে সবই পারে।
এতক্ষনে ইমরান মুখ খুলে বললো,
– সাপোজ, জোর খাটালাম বিয়েতে তখন ব্যাপারটা কেমন হত?
– তার মানে আপনি সাপোর্ট করছেন ক্যাপিটালিজমকে? তাহলে তো বলতে হবে ব্রিটিশদের এত অত্যাচার আমাদের কোনো শিক্ষাই দিতে পারেনি। সেই তো অপ্রেসর রয়েই গেলেন। ওরা যা করেছে আপনারাও তাই করছেন। ব্রিটিশ মুক্ত হয়ে কি লাভ স্বভাবে তো ফিরিঙ্গিয়ানা রয়েই গেলো! সেই আগের কাহিনী, The Rich get more richer and the poor get poorer এর পরিবর্তে হবে The oppressor get more oppressive and the submissive get oppressed. ব্যাপারটা এমন হবে, ধরে এনে একজন কচি মেয়েকে বিয়ে করে সমাজকে বুঝিয়ে দিলেন আপনি সমাজপতি আর এদিকে সেই কাঙাল পিতা মেয়েকে বিসর্জন দিয়ে বুঝিয়ে দিলো এটাই সমাজের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। শতাব্দী পেরোলেও সমাজ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসবেনা। অথচ উচিত ছিলো সমাজে কন্ট্রিবিউশান করে ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা যেমনটা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রাম মোহন রায় এবং হাজী মহম্মদ মহসীন করেছেন। সেইক্ষেত্রে অল্প বয়সী কন্যার তার বয়সের সাথে মানানসই কাউকেই বিয়ে করিয়ে দেয়াটা সমর্থনযোগ্য ছিলো।
ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইউনুস সাহেব আচমকা হাত তালি দিয়ে বলে উঠলেন,
– ব্রাভো। হোয়াট এন আউটস্ট্যান্ডিং লজিক আ’ম এম ইম্প্রেসড। বয়স খুব একটা কম না হলেও ধরছি তেইশ বা চব্বিশ। ভাবী আপনার আসল পরিচয় দিন তো। আপনার বাবার সাথে একবার হাত মেলাবো।
মোনা হেসে বললো,
– ইমরান সাহেবই দিক।
– তিনি তো চুপচাপ হয়ে গেলেন ভাবীসাহেবা। বোল বন্ধ করে দিলেন যে। এখন থেকে আপনার সাথে পরামর্শ করতে হবে।
হাস্যোজ্জ্বল ইমরানের দিকে তাকাতেই বুঝা গেলো তার চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। কথায় হে রে যাওয়ার পর ও এমন উচ্ছ্বাস স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে এমন ধার ওয়ালা সহধর্মিণী পেয়ে সে মুগ্ধ। ইমরান হেসে বললো,
– আপনারা আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ সাহেবকে চেনেন?
সবাই বলে উঠলো,
– জ্বি।
– মিনহাজ সাহেব আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুর। মোনাশা উনার একমাত্র মেয়ে।
মাজহার খুব বিশ্রি ভাবে বললো,
– মিনহাজ সাহেবের বেশ টাকা। উনার কিসের অভাব পড়েছে।
মোনা একেবারে মাজহারের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
– অভাব টা কারো নয়। মেন্টাল এটাচমেন্ট। আই হ্যাভ সেইড ইট টু টাইমস, আমি স্বেচ্ছায় বিয়েটা করেছি। আই নিড আ কিং লাইক ইমরান শরীফ খান এন্ড হি নিডস আ কুইন লাইক মি। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইমরান শরীফ খানের সহধর্মিণী হওয়ার যোগ্যতা শুধুমাত্র মোনাশা ইকবালেরই আছে, সৃষ্টিকর্তা তাই লিখে রেখেছেন ভাগ্যে। ইতিহাস পড়েন নি, এক রাজ্যের রাজার সঙ্গে অন্য রাজ্যের রাজকন্যার বিয়ে হত। এটা তো খুব সাধারণ ব্যাপার। এখানে ও ঘটনা একই সাল টা ভিন্ন। ইতিহাসে ছিলো পনেরোশো, ষোলোশো শতকের কথা আর এখানে একবিংশ শতাব্দী। ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হলো রাজা ইমরান শরীফ খানের সাথে রাজকন্যা মোনাশা ইকবালের বিয়ে। অসম্ভব কিছু তো না। এখন আবার দ্বিতীয় বিয়ে টানবেন না। রাজারা একাধিক বিয়ে করতে পারে তবে কোন রানী সবচেয়ে প্রিয় সেটাই মুখ্য বিষয়।
হাসছে উপস্থিত অনেকে। প্রশংসা করছেন। মোনা পাশ কাটিয়ে উঠে চলে আসার সময় বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২২
– ডিনার করে যাবেন সবাই। আমি একটু আসছি। ইমরান সাহেব উপরে একটু কাজ আছে। যাবো?
– অবশ্যই প্লিজ। ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
জাফর সাহেব হেসে বলেন,
– শী ইজ ফ্যান্টাসটিক। আমি তো ভাবীর আত্নবিশ্বাস দেখলাম। অভিনন্দন মি. খান। বিয়ের জন্য তো অবশ্যই সাথে এমন একজন গুণী, প্রতিভাবান সহধর্মিণী পাওয়ার জন্য। কথার কি ধার!
ইমরান মাথা নেড়ে খানিকটা হাসলো। তবে নিজেই কিছুটা চমকে আছে। মোনার এই দিকটা তার অজানা ছিলো। এভাবে তাক লাগিয়ে দিলো! ভয় হচ্ছে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। নাকানিচুবানি খাইয়ে ছাড়বে এই মেয়ে। ছোট্ট মোনা আর এই মোনা, আকাশ পাতাল তফাৎ। অকপটে বললো স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে অথচ বিয়ের দিন মুখ খানা দেখলে যে কেউ বলতে এক ঘন্টা মে*রে এরপর পরীক্ষা দেওয়াতে বসিয়েছে। সবই আসলে ভাগ্যের লিখন!
