Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২১

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২১

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২১
নীতি জাহিদ

রাত সাড়ে দশটা। এই ‘সময়’ কখনো বন্ধুর মতো আচরণ করে,আবার কখনো আচরণ করে শত্রুর মতো। সময়ের হিসেব সময় নিজেই নিয়ে নেয়। সময়ের সদ্ব্যবহার করা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা সময় নিজেই এক চুটকিতে বুঝিয়ে দেয়। আজ যদি মিনহাজ মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করতো হয়তো বিয়েটাই হতোনা। মেয়েকে নিয়ে রওয়ানা হয়েছে ইমরানের বাড়ির উদ্দেশ্যে। গাড়িতেই শুনেছে মায়া হুঁশ আসার পর থেকে পাগলামি শুরু করেছে। মনসুর মায়ার শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের তখনই বুঝিয়েছে, মায়াকে সামলে নেয়ার জন্য সময় দিতে। মায়ার স্বামীও আজ বুদ্ধিমানের মত স্ত্রীকে সেই সময়টুকু দিয়ে নিজ বাড়ি ফিরে গেলো। আত্নীয়রা সবাই মিনহাজকে দুষছে। এত ছোট মেয়ের বিয়ে এত বয়সের একজনের সাথে দেয়ার জন্য। অথচ এই আত্নীয়রাই এক সময় পাগল ছিলো ইমরানের জন্য। ওর সফলতা, ওর গাম্ভীর্য, ব্যবহার মুগ্ধতা ছড়িয়েছিলো সবার মাঝে। কারো মেয়ের জামাই, কারো বোন জামাই বানানোর জন্য উদ্বিগ্ন ছিলো। এখনো ইমরান তৃতীয় বিয়ের নাম নিলেই মেয়ে দেয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া অনেকেই। নারীরাই বেশি এই আলোচনায় মগ্ন। রিক্তা এবং সালমা দুজন সবার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে বলে ফোনে জানিয়েছে মিজান চাচা। মিনহাজের সবচেয়ে বড় ভরসা বাবা,চাচা, ভাই ও নয়ন। এরা প্রত্যেকে আজ তার সাপোর্টার ছিলো। কেউ অসম্মান করেনি তার এমন সিদ্ধান্তকে।

মোনা বাবার বুকেই ঘুমে আচ্ছন্ন। ক্রন্দনরত মোনাকে মিনহাজের বুকে দেখে ইমরান ভাবছে কি করে মানিয়ে নেবে এই মেয়ের সাথে! কাঁকনের অভিযোগ ছিলো ইমরানের সব কিছুই বেশি বেশি। এত কেয়ার কখনোই পছন্দ ছিলো না কাকনের! ইমরান স্ত্রীর ব্যাপারে পসেসিভ ছিলো। পছন্দ করতোনা কাঁকনের খোলামেলা চলন। আজ ইমরানের কোনো অনুভূতি কাজ করছেনা। প্রথম প্রথম মোনার খুনশুটি দুষ্টুমি আহ্লাদের মোহে ডুবে গিয়েছিলো। নিজেকে সরিয়ে গত চার বছর সামলে উঠেছে সব রকমের আবেগের তাড়না থেকে। চোখ বুজে ভাবছে আসলেও কি ভুলতে পেরেছে চার বছর পূর্বের আবেগ! ভেসে উঠেছে দুষ্টুমিতে মেতে উঠা মোনা। ছলছল, প্রাণোচ্ছল মোনার সেই গুণ কি এই মোনার মাঝে আছে? বিয়ে পড়ানোর কিছুক্ষন পর যখন মিনহাজের রুম থেকে মোনা বেরিয়ে আসলো মনে হলো সেই অশ্রুসজল মুখ খানাই ঘোর লাগানোর জন্য যথেষ্ট, কিশোরীর এলোমেলো পদক্ষেপ এবং ইমরানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা, বুকে উথাল-পাতাল ঢেউ খেলানো ঝড় তুলে দিয়েছে এই মেয়ে।
রবিনের পাশের সিটে বসে আছে। সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে ভাবনা-কার্য সিদ্ধিতে ব্যস্ত । সহসা ঘাড় ঘুরিয়ে পুনরায় তাকালো মোনার দিকে। স্নিগ্ধ সেই মুখ। ধ্যান হারিয়ে বসে আছে। গাড়িতে যে উপস্থিত আছে সদ্য হওয়া শ্বশুর মশাই, মামা শ্বশুর এবং চাচা শ্বশুর তা ভুলেই গিয়েছে। অকস্মাৎ নয়ন বলে উঠলো,

– মনসুর চল গানের কলি খেলি। কেমন ঠান্ডা পরিবেশ?
এই অবস্থায় যদি কারো মজা করতে ইচ্ছে করে তবে সে নয়ন ব্যতীত কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। মিনহাজের নিরবতা দেখে মনসুরের মন চাইলো গাড়ির পরিবেশটা স্বাভাবিক হোক। ধীর গলায় বললো তুমি শুরু করো, নয়ন গানের প্রথম কলি ধরলো,
– He love me, he give me all his money
That Gucci, Prada comfy
My sugar daddy
মনসুর থতমত খেয়ে বলে,
– আমি খেলবোনা। কি গাও এসব।
ইমরান বেক্কল হয়ে তাকিয়ে ছিলো, এদিকে মিনহাজ গানই বুঝে নি। সবাইকে তাকাতে দেখে প্রশ্ন করলো,
– কি হইছে? এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো সবাই? কি গাইছে ও?
নয়ন শুকনো ঢোক গিলে বলে,

– কিছুনা ভাই। মজা করছিলাম।
জিহবায় কামড় দিয়ে আরেকটা গান ধরলো,
– কালা আমার হাতের কাঁকন, কালা গলার হার
কালা আমার হাতের কাঁকন, কালা গলার হার
কালা আমার নীল যমুনায় নিকষ আঁধার
কালা আমার নীল যমুনায় নিকষ আঁধার
ওর গান শুনে মিনহাজ কটমট করে তাকালো। মনসুর হাতে চাপ দিয়ে বললো,
– কি শুরু করলা নয়ন ভাই?
নয়ন ভ্রু কুচকে বলে,
– বিয়া বাড়িতেও নাচতে পারলাম না ঠিক মতো,গাড়িতে একটু গান গাইতেছি। তোমাগো দুইভাইয়ের দেখি সহ্য হয়না। ধুরো নিরামিষের দল। এরম করোস কেন মনসুর ?
রবিন গাড়ি চালাতে চালাতে বলে উঠলো,

– স্যার আপনার সব গান কালাকুলা, সুগার ড্যাডি দিয়ে শুরু হয় কেনো? মোনা ম্যাডামও স্যারের সামনে আসলে স্যারকে কালা মানিক, ব্ল্যাক ডায়মন্ড ডাকে। আপনারা দুজন এমন কালা কুলা পছন্দ করেন কেনো?
মিনহাজ, মনসুর তৎক্ষনাৎ লজ্জা পেয়ে গেলো। ইমরান রবিনের দিকে তাকাতেই রবিন ঢোক গিলে স্যরি বলে গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিলো। এদিকে নয়ন ভেটকি মারা হাসি দিয়ে বলে,
– আমি আর আমার ভাগ্নী বাস্তবতায় বিশ্বাসী রবিন। হি হি হি। কালা তো সুন্দর। যেমন তোমার স্যার।
ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে শূন্য রাস্তায় নজর দিলো। দুয়েকটা গাড়ি। নয়নের কথা গুলো মজার হলেও সবই বাস্তব মনে হচ্ছে। কেমন যেন অদৃশ্য তীর বুকে বিঁধছে। মিনহাজ ধমকে নয়নকে বললো,
– এসব কালাকুলা গাইবি তো চড় খাবি। অসভ্য। চুপ থাক।
সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট চুপ ছিলো। পুনরায় বলে উঠলো,
-আচ্ছা কালা না গেয়ে আরেকটা গাই।
” ভালা কইরা ঘর বানাইয়া,
ভালা কইরা ঘর বানাইয়া
কয়দিন থাকমু আর।
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি
পাকনা চুল আমার লোকে বলে…’

রবিন গাড়ি থামিয়ে দিলো। আকস্মিক ব্রেক কষলো। মনসুর এবং মিনহাজ তব্ধা খেয়ে গেলো। মোনা ঘুম থেকে জেগে উঠলো। মিনহাজ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে নয়ন ইচ্ছে করে ইমরানকে লজ্জায় ফেলতে এমন গানগুলো গেয়েছে। ইমরান সেই সময়টা মোনার দিকে তাকিয়ে ছিলো মিনহাজ লক্ষ্য করে জানালার বাইরে চোখ দিয়েছিলো। মেয়ের জামাই যদি লজ্জা পায় তাই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিলো। লাভ তো হলোই না, উলটো ইমরানের এভাবে তাকানোতে নয়নের করা ফাইজলামি, নিজের জন্যই লজ্জার কারণ হয়ে উঠেছে। কত্ত ফাজিল হতে পারে নয়ন! একটা মুহুর্ত ও ছাড়বেনা মজা নেয়ার। নয়নের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো ইমরান এবং মিনহাজ। নয়নকে ধমকাতে না পেরে ঘাড় ফিরিয়ে রাগ ঝেড়ে ধমক দিলো রবিনকে,
– ষ্টুপিড, তুমি কি নতুন গাড়ি চালাচ্ছো রবিন?
– স্যরি, স্যার। কিন্তু স্যার আমরা গেটের সামনে।
ইমরান লক্ষ্য করলো বাড়ির গেটে পৌঁছে গিয়েছে। এদিকে নয়নকে মিনহাজ বকা দিচ্ছে। নয়ন মেকি অভিমান করার ভঙ্গিতে মিনহাজকে বললো,

– হাসন রাজা সংসার বিরাগী হয়ে গানটা গাইছিলো। আমি একটু তার কথা স্মরণ কইরা গাইলাম। কি সুন্দর গান, আয়না দিয়া চাইয়া দেখো পাকনা চুল আমার, লোকে বলে, বলে রে ঘর বাড়ি ভালা নাই আমার। তুমি আমারে ধমকাইতাছো কেনো ভাই? আমি কি এই গাড়িতে কাউরে বলছি। কারো পাকনা চুল আছে? ওহ হ্যাঁ তোমার কয়েকটা সাদা আছে। দেখি দেখি ইমরান তোর আছে?
মনসুর মুখ টিপে হাসছে। মোনা স্তব্ধ হয়ে দেখছে। চোখ দিয়ে চাচাকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে। চোখের পলক ঝাপটে চাচা ও বুঝিয়ে দিলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। ইমরান প্রচন্ড রেগে নয়নকে বলে উঠলো,
– বেয়াদপ।

বেরিয়ে গেলো সামনের দরজা খুলে গাড়ি থেকে। গেটের সামনে দাঁড়াতেই প্রথমে নয়ন, এরপর মনসুর বের হলো। আজ ইমরানের সেই black Jaguar নেই। ওই গাড়িতে ইশান, সোহান এবং আইরিন ছিলো। ওরা আরো কিছুক্ষন আগেই এসে পড়েছে। মিনহাজ মেয়েকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো। ইমরানের ডান পাশে মোনালিসা দাঁড়িয়ে আছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তীব্র মধুর সুগন্ধি নাকে লাগছে। এই তো ফুলের সুগন্ধ। স্পষ্ট বেলীফুলের ঘ্রাণ। ইমরান নিজেকে সরিয়ে নিলো আগের জায়গা থেকে। এই তীব্র সুবাস তার পরিচিত। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নববধূর শরীর থেকে আসছে। মোনা গেটের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। কারুকাজ করা তোরণদ্বার। বাড়ির নাম পড়ে মোনা মনে পড়লে ছোট দাদুর কথা। ছোট দাদু একদিন বলেছিলেন,

– ইমরান পড়াশোনা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে করলেও সে কিন্তু বিরাট সাহিত্যপ্রেমিক। তার কাজ কর্মে সাহিত্যের বহিঃপ্রকাশ টের পাওয়া যায়।
আজ মোনার ও তাই মনে হলো। নাহলে কেউ বাড়ির নাম রাখে ‘সোনালী সকাল’? নামটা ভাবতেই কেমন যেন মনের মাঝেই অদ্ভুত শিহরণ জেগে উঠলো। যে বাড়ির নাম এত সুন্দর সেই বাড়ি কতটা সুন্দর! অথচ বাড়ির মালিকের মন টা তিক্ত।
আইরিন সকলকে নিয়ে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছে। মোনা বাবার হাত ধরে এগিয়ে গেলো। মোনাকে হাসিমুখে বুকে টেনে নিলো আইরিন। ইশান বাবার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাবা কেমন যেন এলোমেলো। শুকনো মুখ, চিন্তিত চোখ, প্যান্টের ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিজের মতো বেখেয়ালি হয়ে হাঁটছে। বাবাকে ইশান প্রশ্ন করলো,
– পাপা তুমি কি চিন্তিত?
ছেলের প্রশ্নে সৎবিৎ পেয়ে বললো,
– না বাবা ঠিক আছি।
কিছু একটা ভেবে বললো,
– প্রিন্স, পাপা কি ভুল করেছি?
বাবা কি তবে অপরাধ বোধে ভুগছে! ইশানের খুব কষ্ট হচ্ছে তার বাবার জন্য। বাবার বাম হাতের বাহু চেপে ধরে আশ্বাস দিয়ে বললো,

– একদম ঠিক করেছো। পাপা রা ভুল করে না। আমি তো খুব খুশি। এখন আর কেউ ইশানকে বলবেনা ইশানের মা নেই।
ইমরান ছেলেকে দেখে মৃদু হাসলো। ছেলেটা সত্যি খুশি। ইশান বাবার হাত ছেড়ে মোনার কাছে ছুটে গেলো। মোনার হাত ধরে বললো,
– পাপার মোনালিসা, আমাকে মা ডাকতে অনুমতি দিবেন কি?
সবার সামনে এমন প্রশ্নে মোনা চমকে উঠলো। খানিকটা অপ্রস্তুত সে। ইমরান ছেলেকে কাছে টেনে বললো,
– ইশান, তুমিও জার্নি করেছো যাও রেস্ট নাও। ওসব পরে হবে।
ইশান ফোস করে দম ফেললো। হয়তো বেশিই আশা করে ফেলেছিলো। মাথা কাত করে একটু সামনে পাশ করে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ হাসলো। মোনা তখন ইশানের কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর ডান গালে হাত দিয়ে বললো,
– মাকে মা ডাকার জন্য কোন সন্তান অনুমতি নেয়?
পেছনে মোনার কথা শুনে বাকিরা স্তম্ভিত। ইশান চমকে উঠলো। চক চক করা চোখে মোনার হাত ধরে হেসে বলে,
– তাই তো। দেখেছো আমি কত বোকা।

মোনা ইশানের বড় চুল গুলো এলোমেলো করে দিলো। কিছুটা ঝাঁকড়া বড় চুল। দেখতে বেশ ভালো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে ইশানের সাথে বেশ মানিয়েছে। এই বাচ্চার লম্বাটে মুখে বড় চুল যেন পুরুষালি সৌন্দর্য্যকে কয়েক গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। ছেলেরা বেশির ভাগ মায়ের মত হয়। তবে ইশান সম্পূর্ণ বাবার ফটোকপি ভার্সন। লম্বাতে ছেলে যেন বাবাকে টেক্কা দিয়ে বেড়ে উঠছে। বাবার সমান হতে আর দেরি নেই। দূর থেকে ইমরানের গেট আপ নিলে ইশানকে ইমরানই মনে হবে। পার্থক্য ইশান শৈশব সুলভ দেহের গড়ন আর ইমরান মাঝ বয়সী বাবা। ইশানের প্রাণবন্ত হাসিটাও আজ দেখলো মোনা। বাবার সাথে খানিকটা মিল আছে।
সামান্তার হাতে মালার ডালা। মামার সামনে এসে ডালা দিয়ে বললো,
– মামা বড় মামীকে মালা পরিয়ে দিন।
ইমরান ভাগ্নীর দিকে চেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো পেছনে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এই রিচুয়াল তার পছন্দ হয়নি। মোনা মুখ ঘুরিয়ে নিলো।সামান্তাকে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,

– আম্মু, তুমি পরিয়ে দাও। এক জন পরালেই হলো।
এতটুকু বলে হনহন করে মেইন ডোর দিয়ে বাড়িতে ঢুকে গেলো। আইরিন মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
– রাগ করিস না…
মিনহাজ মৃদু হেসে বললো,
– রাগ করিনি আপা, ওর এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ আমি জানি। সময়ের ব্যাপার, সব মিটিয়ে নেবে। আপনারা বরং আপনাদের নতুন বউ নিয়ে বাড়ি যান। আমিও তো বোনকে বাড়ি ফেলে এসেছি।
আইরিন হেসে বললো,
– আয় খেয়ে যা। বাকি সব পরে হবে। আমি আগেই এসে খাবার রেডি করে রেখেছি। ও বাড়িতে তো খাওয়া হয়নি তখন।
– আরেকদিন আসবো। মেয়ে যখন বিয়ে দিয়েছি আসবো। কাল থাইল্যান্ড থেকে ঘুরে আসি এরপর।
মোনার বুকের ভেতর কেমন যেন করছে। বাবা এমন অপরিচিত পরিবেশে তাকে ফেলে রেখে কেনো যাচ্ছে? মন ভালো লাগছেনা। এত মানুষের সামনে আজ বাচ্চামো করতে পারছে না। তবুও ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,

– বাবা এখন থাইল্যান্ড যেও না। আমাকে নিয়ে যেও আরো কিছুদিন পর। প্লিজ।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
– বাবা ঘুরে এসে আমাদের সেই ড্রিম ট্যুর শিলং যাবো। অনলি তুমি আমি। আর কেউ না কেমন?
ক্রন্দনরত মোনাকে সামলে হাসিমুখে মিনহাজ মনসুরকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো ‘ সোনালী সকাল’ থেকে। পিছনে ফেলে এলো একমাত্র আদরের রাজকন্যার না দেখা সংসার। সকলকে সংশয়ে ফেলে আজকের দিনটাতে বিয়ে দেয়ার মতো কাজটা করে ফেলেছে। নিজেকে অথৈ জলে পেয়েছিলো যেদিন দেখতে পেলো ক্যান্সারের রিপোর্ট। অবস্থা গুরুতর। এখানে থেকে ট্রিটমেন্ট করাতে গেলে মেয়েটা অসহায় হয়ে পড়বে। বাবা হয়ে মেয়ের এত বড় ক্ষতি করতে পারবেনা। মিনহাজের সন্দেহ ছিলো মোনা পছন্দ করে কাউকে। তবে সেটা যে ইমরান হবে ভাবনাতীত ছিলো। এখানে সে দোষের কিছুই দেখছেনা। হয়তো তার চিন্তাভাবনাই অন্যরকম। মেয়ে অন্যায় করেনি পছন্দ করেছে, দোষের কিছুনা। মোনার ইমরানকে পছন্দ করার আদ্যোপান্ত পুরো এত বছরের ইতিহাস জানায় নয়ন। জানার পর থেকে বুঝে গিয়েছিলো তার হাতে সময় কম। মেয়ের জন্য নিরাপদ আশ্রয় দরকার। তার আগে মায়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একসাথে সকল কাজ নিজের কাঁধে নিলো। মায়ার বিয়ের কথা বেশ আগে থেকেই হচ্ছে। তবে বিপত্তি বাঁধার আগেই একই দিনে পর পর দুটো বিয়ে দিয়ে আজ প্রশান্ত মিনহাজের হৃদয়। ছোট্ট মোনা জানেও না তার বাবার অবস্থা। ইমরানকে রাজি করাতে কম ধকল পোহাতে হয়নি মিনহাজের। নিজেদের মাঝে এক প্রকার অন্তর্দন্ধ সৃষ্টি হয়েছিলো। একটা থেকে একটা ভালো ভদ্র,নম্র ও সুশিক্ষিত ছেলে হাজির করবে বলেছিলো ইমরান মোনার জন্য। তবুও এই বয়সে নিজের সাথে মোনার জীবন জড়াতে চায় নি। এক পর্যায়ে রাগ করে রাজি হয়ে যায়। মিনহাজ খুব করে চেয়েছে মেয়ে সুস্থ থাকুক। পারতো ভালো সুপাত্রের কাছে বিয়ে দিতে, তবে তার অনুপস্থিতিতে যদি সেই পাত্র মেয়ের অমঙ্গলের কারণ হয়৷ সেই পাত্রের দায়বদ্ধতা নেই, ইমরানের দায়বদ্ধতা আছে মিনহাজ কন্যাকে ভালো রাখার। মনের ভেতর শত সহস্র প্রশ্নের পসরা সাজিয়ে নিজেকে বুঝিয়ে খুশিতেই মেয়ের জন্য ইমরানকে পাত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। ইমরান রাজি হওয়া মাত্রই মিনহাজ বিয়ে পড়িয়ে নিলো। এই যদি হয় মেয়ের সাথে শেষ দেখা তবে হয়তো মেয়ের ভরা সংসার আর দেখা হবেনা। গাড়িতে উঠে ইমরানকে কল দিলো।

– ইমরান…
– বলো।
– চলে যাচ্ছি।
দুপাশ নিস্তব্ধ, নিরব, শব্দহীন। কি বলবে! ইমরানের আজ নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে। কিছুই করতে পারছেনা মানুষটার জন্য।
– মোনাকে রেখে গেলাম। আর যাই করিস, মেয়েটাকে ঘর ছাড়া করিস না।
এতটুকু বলেই কেঁদে দিলো মিনহাজ। মনসুর সামলাতে পারছেনা। বারান্দায় আঁধারে দাঁড়িয়ে ফোনের অপর পাশে থাকা কন্যা সঁপে দেয়া পিতার হাহাকার শুনতে পাচ্ছে। বুকের ভেতর চিন চিন ব্যাথা করছে। ফোস করে দম ফেলে বললো,
– কত টুকু, কীভাবে, কি করতে পারবো জানিনা। তবে আমার অর্ধাঙ্গী শ্রেষ্ঠ সম্মান টুকু নিয়ে থাকবে চিরদিন এই বাড়িতে ইনশাআল্লাহ।
– কথা দিলি তো? ম*রে গেলে তো দেখতে ও পাবো না,জানতে ও পারবোনা। তার আগেই কানে শুনে যাই।
– হাশরের ময়দানে আমার ঘাড় ধরে কাঠগড়ায় দাঁড় করিও যদি কথার খেলাফ হয়।
– ভালো থাকিস। ভালো রাখিস আমার কলিজাকে।
– তোমার মেয়ে আমার বুকে সযতনে থাকবে আমৃত্যু।
– ইনশাআল্লাহ। এত টুকুই আমার জন্য প্রশান্তি। আমার মন থেকে দোয়া। মেয়ের বাবা হিসেবে দোয়া করছি, বাবা- মায়ের দোয়া বিফলে যায় না।

– আমিন।
ফোন রাখতেই ইমরান তার রিভলভিং চেয়ারে চুপচাপ বসলো। মিনহাজের সাথে ইমরান থাইল্যান্ড যেতে চেয়েছিলো। অথচ সবরকম পথ বন্ধ করে রেখেছে মিনহাজ স্বয়ং। মিজান চাচা এবং চাচার ছেলে যাবে তার সাথে। বাকিদের এখানে প্রয়োজন। তার মনের প্রশান্তির জন্য সবাই দেশে থেকে ভালো থাকার অভিনয় করতে বাধ্য আজ থেকে। চিন্তাগ্রস্ত চোখ দুটো বন্ধ করলো। এত বড় একটি দায়িত্ব কি করে নিলো ঘাড়ে! কি করে ভালো রাখবে মোনাকে! যতটুকু আজ দেখে বুঝেছে শৈশবের সেই আবেগ ভুলে চুকে গিয়েছে মোনা। বিয়ে পড়ানোর সময়টাতে মেয়েটা বাধ্য হয়ে কবুল বলেছে। দেখতে দেখতে ইমরান আজ বেয়াল্লিশে। সুদর্শন মানানসই বয়সের কাউকে ছেড়ে কি করে নিজের বয়সের দ্বিগুনের কাউকে মেনে নেবে মোনা?

ফোনের ও পাশে সালমা রিক্তা শান্ত হয়ে সব শুনছে। স্পিকারে রেখেছে রিক্তা ফোন। এদিকের পরিবেশ আপাতত শান্ত। মিনহাজের ফ্ল্যাটে দুজন। রিক্তা প্রশ্ন করলো,
– এত কিছু হলো জানাও নি কেনো?
নয়ন এখনো বাসায় ফিরেনি এর আগেই রিক্তা বিরক্ত করছে। বাসায় ফিরতে লেট হবে। মিনহাজের মেডিকেল রিপোর্ট আসবে একটা। ওটা নেয়ার জন্য হাসপাতাল এসেছে। মিনহাজ নিজেই নিতে চেয়েছিলো। জোর করে বাসায় পাঠিয়েছে। সকালে ফ্লাইট। রেস্ট না নিলে শরীর আরো খারাপ করবে। রিক্তার জোরাজোরিতে ফোনে সব বলতে বাধ্য হলো।
নয়ন দম ফেলে উত্তর দিলো,

– কি করে জানাবো? দুশ্চিন্তায় কেটেছে প্রতিটা দিন। ইমরান আসার পর দুশ্চিন্তা কাটবে ভেবেছিলাম। ও এসে আরেক দফা রফা লাগিয়ে দিয়েছে। ওকে রাজি করাতে গিয়ে আমি আর ভাই হাঁপিয়ে উঠেছি। একটা মানুষ কি পরিমাণ নাছোড়বান্দা হয় বুঝতেই পারতাম না এমন দিন না আসলে। ইগো ধরে বসেছিলো বিয়ে করবেই না।
– কেনো কি করেছে ইমরান ভাই?
– ভাই বিয়ের কথা তোলায় ক্ষেপে গিয়ে বলে, আমাকে দুটো দিন সময় দাও। সুপাত্র নিয়ে আসছি। তুমি অসুস্থ বলে আমার সাথে তোমার অল্প বয়সী মেয়ে কেনো বিয়ে দিবে? তোমার আগে আমিও তো ম*রে যেতে পারি। মিনহাজ ভাই পালটা বলে, তুই প্রুভ কর আগে, মোনা তোকে ছাড়া অন্য কারো কাছে ভালো থাকবে? ইমরানের জবাব ছিলো, সময়ের সাথে ঠিক হবে।

তখন আমিও নাছোড়বান্দা হয়ে তর্ক শুরু করলাম। রিসোর্টের অবস্থা তুলে ধরলাম। এই নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে মিনহাজ ভাই বলে উঠলো, ওকে বিয়ে করিস না। আমিও চিকিৎসা করবোনা আপাতত, সুপাত্র খুঁজে বের করে দেখি মেয়ে ভালো থাকে কিনা? কারণ সমস্যা তো আমার মেয়ের মধ্যে। মেয়েও আমার, সমস্যা ও আমার। আর আমি মেয়ের বাবা তোমার হাতে পায়ে ধরা লাগতেছে বিয়ে করার জন্য। চলে যাও। এত কষ্ট করে ইতালি থেকে আসছো, ধন্যবাদ। ততক্ষনে ইমরান খানিকটা নমনীয় হয়ে বললো, মিনহাজ ভাই, বিশ্বাস করো আমি সৌভাগ্যবান তোমার মেয়ের প্রস্তাব তুমি দিয়েছো কিন্তু আমার বয়স দেখো। এর মাঝে আমি অসুস্থ। মিনহাজ ভাই হেসে বলেছিলো, অসুস্থ কার জন্য হয়েছিস? ইমরান নিরুত্তর ছিলো বেশ কিছুক্ষন। মিনহাজ ভাইয়ের জেদের কারণে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বললো,আমি রাজি। এরপর ভাই আর দেরী করেনি।
সালমা আর রিক্তা যতটা খুশি ছিলো এখন ততটাই গম্ভীর, ভারাক্রান্ত। রিক্তা চোখ মুছে বললো,

– ভাই কোন স্টেজে আছে?
– রিপোর্ট দেখিনি গো। দেখায় নি। কাউকে কিছুই জানাচ্ছেনা। আমি রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলাপ করি এরপর জানবো।
– আমার ভয় হচ্ছে।
– আমি তো রীতিমতো ভালো থাকার অভিনয় করছি। আমার অবস্থা ভাবো। রাখছি আমি, রিপোর্ট এসে গেছে। এসে কথা বলব। কাউকে কিছু বলোনা আপাতত।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২০

– ওকে।
ফোন রেখে সালমা আর রিক্তার চোখে নিরব অশ্রু। সালমা কম্পিত গলায় বললো,
– ও রিক্তা, এবার আমার মেয়েটা কি বাপ ও হা*রাবে?
রিক্তার দুচোখে অঝোরে অশ্রু। কি জবাব দিবে?

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২২