সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৬
তানিয়া হুসাইন
ভীর দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে।ভীর আসতেই নিক তাকে সব কিছু খুলে বলে।
আয়ুষ বসে আছে নিচে হাত বাঁধা। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। মেঝেতে টুপটাপ করে রক্ত পড়ছে, যেন সময় গুনছে মৃ*ত্যুর।
ভীর আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। সামনে গিয়ে আয়ুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাথাড়ি মারতে থাকে তাকে।শক্ত গলায় বলে,
___কার লোক তুই? কে পাঠিয়েছে তোকে?
প্রতিটা প্রশ্নের সাথে সাথে আঘাত করতে থাকে।
আয়ুষের মুখ থেকে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ে। নাক-মুখ ফেটে গেছে। তবুও সে চুপ। একটা শব্দও না।
এলিজার আত্মা কেঁপে উঠছে ভয়ে। আয়ুষের জন্য খারাপ লাগছে তার। কিন্তু তার থেকেও বেশি ভয় হচ্ছে সবকিছু সামনে চলে আসবে।ভীর থামছে না।
একটার পর একটা আঘাত।বারবার একই প্রশ্ন,
__এই ম্যাপ সে কিভাবে পেয়েছে?কে পাঠিয়েছে তাকে?
ঠিক তখনই ইশায়া নিচে নেমে আসে।
ভীর কোথায় গেছে খুজতে কাউন্সিলিং রুমের দিকে যেতে নিবে কিন্তু বাইরের শব্দ শুনে তার পা থেমে যায়।
মেইন ডোরের দিকে এগিয়ে যায় ইশায়া।দরজার কাছে পা রাখতেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা। চোখের সামনে যা দেখে ইশায়ার পুরো দুনিয়া উল্টে যায়,এরকম কিছু সে দুস্বপ্নে ও কল্পনাও করেনি।
চারপাশে অসংখ্য গার্ড। সবার হাতে অ*স্ত্র।যেনো কোন সিনেমার কাহিনি,কই দিনে ও তো ইশায়া এই জায়গায় এসেছিলো একেবারে খালি ছিলো সব জায়গা এখন এমন কেনো।
ইশায়া আরো সামনে যায় কি হচ্ছে এখানে স্পষ্ট দেখার জন্য।
মাঝখানে একজন লোকের হাত বাঁধা, সারা শরীর র*ক্তে ভেজা।আর ভীর…অনবরত তাকে মেরে যাচ্ছে।ওই লোকটা ভীর এটা দেখতেই ইশায়ার শরীর জমে যায়। বুকের ভেতর দম আটকে আসে।ভীর হঠাৎ হাতে থাকা স্টিকটা ফেলে দেয়।লম্বা একটা শ্বাস নেয়।
তার গলায় ভয়ংকর ঠান্ডা স্বর,
___শেষবার জিজ্ঞেস করছি। বল, তোকে কে পাঠিয়েছে।
এই ম্যাপটা তুই কিভাবে পেয়েছিস।
একটু থেমে আবার ও বলে,
বললে আমি তোকে ছেড়ে দেবো।
এটাই শেষ সুযোগ। নিজের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে বলে দে।
___আয়ুষ তখন ও চুপ।
একটা শব্দও করে না।কারণ সে ভালো করেই জানে সত্য বললেও তাকে ছেড়ে দেবে না ভীর।ভীর কতোটা ভয়ংকর সেটা মাফিয়া জগতের সবাই খুব ভালো করেই জানে।আর সত্য বললে এলিজাও বিপদে পড়বে।তাদের কাজটা সম্পূর্ণ হবনা।তাই আয়ুষ চুপ করেই থাকে।
ভীরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।
সে রি*ভলবার বের করে। কিন্তু আয়ুষের কোন পরিবর্তন আসে না। সে প্রস্তুত এটাই হবে সে জানে তাই মেনে নিয়েছে তার ভাগ্য।
ভীর প্রথম গু*লি করে আয়ুষের ডান পায়ে।
গু*লির শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে।আয়ুষের চিৎকার ভেসে ওঠে ।
ইশায়া মুখ চেপে ধরে। নিজের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা চিৎকারটা গিলে নেয়।চোখ ফেটে পানি পড়ছে তার।তা**র তার স্বামী তার ভালোবাসার মানুষের এই রুপ সে সহ্য করতে পারছে না,বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে ইশায়ার।
ভীর দ্বিতীয়বার ট্রিগার টানে।বাম পায়ে গু*লি করে।
আয়ুষ লুটিয়ে পড়ে যায়।
ইশায়া এই বিভৎস দৃশ্য দেখে পিছিয়ে যায়।
কিন্তু গার্ডরা আয়ুষকে ধরে আবার দাঁড় করায়।
তার মাথা এক পাশে ঢলে পড়ে।চিৎকার করতে করতে শরীরের শক্তি ফুরিয়ে এসেছে তার।
ভীর আবারও বলে,
__বল, কিভাবে পেয়েছিস ম্যাপটা?কে পাঠিয়েছে তোকে এখানে?
__আয়ুষ নীরব।
ভীর কিছুক্ষণ শিকারির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর সামনে হাত বাড়ায়।
এনরিকো ভীরের হাতে একটা ধারালো ত*লোয়ার তুলে দেয়।
গার্ডরা আয়ুষকে হাঁটু ভেঙে বসিয়ে দেয়।
ভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
ইশায়া ওড়না মুখে চেপে ধরে। মাথা ঘুরছে তার।
এত বর্বরতা সে সহ্য করতে পারছে না।তার বুক কাপছে ভীর কি করতে যাচ্ছে এটা ভেবে।
ভীর হিংস্র চোখে আয়ুষের সামনে দাঁড়িয়ে ত*লোয়ারটা তার ডান হাতে চালিয়ে দেয়,ভীর দারিয়ে দেখে আয়ুষের গলা কা*টা মরগির মতো ছটফট,
আর তারপর ভীর ত*লোয়ারটা আয়ুষের গলা বরাবর ঠেসে ধরে।এক মুহূর্ত আর তারপর এক ঝটকায় ত*লোয়ার ঢুকে যায়।র*ক্ত ছিটকে এসে পড়ে ভীরের মুখে, শরীরে।মুহূর্তেই আয়ুষের শরীর নিথর হয়ে পরে যায়।
এতোক্ষণ পর্যন্ত সহ্য করলেও এই দৃশ্য দেখে ইশায়ার মুখ থেকে অস্ফুট গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসে।
পা পিছিয়ে যায়,ধাক্কা খায় কিছু একটার সাথে,
হঠাৎ শব্দে ভীর পিছন ফিরে তাকায়।
ভীরের চোখ তার দিকে পড়তেই ইশায়া আঁতকে ওঠে।
এতক্ষণ সে ভীরের শুধু পিছন দিকটাই দেখেছিল। কিন্তু সামনে ফিরতেই র*ক্তে মাখামাখি সেই মুখ দেখে ইশায়ার শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে।
ভীরের হাতে ধরা ত*লোয়ার থেকে র*ক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে।
তার সাদা টি-শার্ট র*ক্তে লাল হয়ে আছে।
ভয় আর ঘৃণায় ইশায়ার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে বার বার। বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসে।
এই মুহূর্তে ইশায়াকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীর নিজেই স্তব্ধ হয়ে যায়।তার হাত থেকে ত*লোয়ারটা পড়ে যায় নিচে, ধাতব শব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ে।
ভীর বাকরুদ্ধ।
এই পরিস্থিতি সে কিভাবে সামলাবে, ইশায়াকে কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
ভীর ইশায়ার দিকে এক পা এগোতেই,ইশায়া পিছিয়ে যায়।
পিছাতে পিছাতে সে হাত তুলে ‘না’ বোঝায়।
তার কাছে না আসতে বলে,চোখে আতঙ্ক, শরীর কাঁপছে।
ইশায়া পিছোতে থাকে, কিন্তু ভীর থামে না।
সে সামনে এগোয়।
ভীরকে নিজের দিকে আসতে দেখে ইশায়ার মাথার ভেতর সব এলোমেলো হয়ে যায়।কি করবে সে বুঝতে পারে না।হঠাৎ সে ঘুরে দৌড় দেয়।সোজা উপরের দিকে নিজের রুমের দিকে।
ইশায়াকে এভাবে দৌড়াতে দেখে ভীরও এক মুহূর্ত দেরি করে না।সে তার পিছু ছুটে যায়।প্যালেসের করিডোরে তখন শুধু দৌড়ের শব্দ।একজন ভয় থেকে পালাচ্ছে,
আর একজন সব হারানোর আতঙ্ক নিয়ে তাকে ধরে রাখতে ছুটছে।
ভীর দ্রুত ছুটে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইশায়ার পেট জড়িয়ে ধরে।মাটি থেকে শূন্যে উঠে যায় ইশায়ার পা।ভীর তাকে ঝাপটে ধরে।
কিন্তু ইশায়া চিৎকার করতে থাকে।তার চিৎকারে ভয়, আতঙ্ক, ঘৃণা সব একসাথে মিশে আছে।
ইশায়া নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ভীরকে।
দু’হাত ছটফট করছে, শরীর মোচড়াচ্ছে যেন বাঁচার শেষ চেষ্টা।ভীর শায়াকে ঠিকমতো ধরে রাখতে পারছে না।
ইশায়ার শরীরে যেন আজ অদ্ভুত এক শক্তি ভর করেছে। ভীর ইশায়াকে শক্ত করে ধরে তার দিকে ফিরায়,কিন্তু ইশায়া ভীরের হাতে শক্ত করে কামড়ে ধরে।
অপ্রস্তুত ভীর ব্যথায় হাত ঢিলে করতেই ইশায়া নিজেকে ছাড়িয়ে আবারো দৌড় দেয় তার রুমের দিকে।
ভীর হাত ঝাড়া মারে।চোখে ঝলসে ওঠে রাগ আর অস্থিরতা।
সে আবারো ছুটে যায় তাকে ধরতে।ইশায়া দ্রুত তার রুমের দিকে যায়,এই মূহুর্তে মাথা কাজ করছে না তার,কতবার হোচট খেয়েছে পিছন ফিরে ভীরকে দেখে আরো ভয়ে কুকড়ে যাচ্ছে ইশায়া যেই রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে নেয় ততক্ষনে ভীর এক হাত দিয়ে দরজাটা আটকে ধরে ।
ইশায়া নিজের সর্বশক্তি লাগায় দরজা বন্ধ করার জন্য।
তার হাত কাঁপছে, নিঃশ্বাস কাঁপছে তবু সে ঠেলে যাচ্ছে।
এদিকে ভীরের মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে ইশায়ার এমন কাজে,বার বার তার থেকে পালানোর চেষ্টায়।
ভীর জোরে দরজায় এক ধাক্কা দেয়।ধাক্কার চাপে ইশায়া ছিটকে পড়ে যায় মেঝেতে।
ভীর ভেতরে ঢুকে,
ইশায়া নিচে বসেই পিছন দিয়ে পিছাতে থাকে।
তার চোখ স্থির, মুখে অস্পষ্টভাবে কি যেন বিড়বিড় করছে ভাঙা শব্দ,
ভীর এগিয়ে এসে শক্ত হাতে ইশায়ার বাহু ধরে টেনে তোলে।
ইশায়া অস্ফুটে বলে,
___আমাকে ছুবেন না , আমাকে ধরবেন না,আমাকে ছেড়ে দিন…দয়া করুন…তার কণ্ঠে ভয়।
এ যেন সে ভীরকে নয় একটা হিংস্র দানবকে দেখছে সামনে।
ইশায়ার মুখে এমন কথা ভীরের সহ্য হয় না,ভীর আচমকা ইশায়াকে বুকে টেনে নেয়।
আদুরে হাতে ইশায়ার পিঠে হাত বোলাতে থাকে।
তার কণ্ঠ নরম হয়ে আসে অস্বাভাবিক নরম।
___হুসসসস… কিছু হয় নি… রিল্যাক্স…কিছু হয়নি… কিছু দেখো নি তুমি…
কিন্তু ইশায়া ভীরকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে।তার হাত বুকের উপর ঠেলে দেয়, শরীর শক্ত করে নেয়।তবুও পারে না।
ভীর শক্ত হাতে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেতার পিঠে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে বারবার, ধীরে, যেন শিশুকে শান্ত করছে।সে ইশায়াকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।কিন্ত ইশায়ার ছটফট থামছেনা।
ভীরের শার্টে এখনো শুকায়নি আয়ুষের র*ক্ত।
আর সেই র*ক্তের গন্ধই ইশায়ার শ্বাস আটকে দিচ্ছে।ইশায়ার শরীর ও লেপ্টে যায় র*ক্তে।
ভীর বারবার ইশায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
তার কণ্ঠ নরম, ঠান্ডা , আদুরে কিন্তু সেই শব্দগুলো ইশায়ার কানে পৌঁছাচ্ছে না।
ইশায়া এখন কোনো কিছু শোনার মতো পরিস্থিতিতে নেই।সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা
তার চোখ দুটো ফাঁকা, নিঃশ্বাস অগোছালো।ইশায়া ছটফট করেই যাচ্ছে।
হাত দিয়ে ঠেলে, শরীর মোচড় দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু ভীর তাকে ছাড়ে না।একেবারে শক্ত করে বুকের মধ্যে আটকে রেখেছে।তার বাহু যেন লোহার বাঁধন।
সে বোঝাতে চাইছে সে ইশায়াকে কিছুতেই ছাড়বে না।আর সে না ছাড়লে কারোর ক্ষমতা নেই তাকে এখান থেকে ছোটানোর।এটাই ইশায়ার জায়গা এটাই তার ঠিকানা।
ভীর ফিসফিস করে বলতে থাকে,
___শান্ত হও… আমি আছি…
কিছু হয়নি।
কিন্তু এই আশ্বাসগুলো এখন ইশায়ার কাছে নিষ্ঠুর শোনায়।ইশায়া চিৎকার করতে করতে একসময় কণ্ঠ ভেঙে ফেলে।শক্তি ফুরিয়ে আসে তার।ইশায়ার চিৎকার ধীরে ধীরে কাঁপা নিঃশ্বাসে বদলে যায়।ছটফট করতে করতে একসময় সে নেতিয়ে পড়ে।তার শরীর ঢিলে হয়ে আসে।হাতের শক্তি কমে যায়।মাথা হেলে পড়ে ভীরের বুকে।
ভীর এতক্ষণ ধরে এই সময়টারই অপেক্ষা করছিল।ইশায়াকে এটাই বোঝাতে চেয়েছে তার কাছ থেকে কখনো সে দূরে যেতে পারবে না।দূরে যাওয়ার চেষ্টা করাই ভুল এতে শুধু সময় আর শক্তি দুটোই নষ্ট।
ইশায়া শান্ত হতেই ভীর তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তারপর একঝটকায় তাকে কোলে তুলে নেয়।
ইশায়ার মাথা তার কাঁধে হেলে থাকে।চোখ আধখোলা, নিঃশ্বাস কাঁপা।ভীর ইশায়াকে কোলে করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।
চারপাশে নীরবতা, শুধু হালকা আলো আর টাইলসের ঠান্ডা স্পর্শ। ভীর ইশায়াকে ধীরে বাথটাবের ভেতর বসিয়ে দেয়, তারপর পানি ছাড়ে বাথটাব ভরতে থাকে ধীরে ধীরে।শরীরে পানির প্রথম ছোঁয়াতেই ইশায়া আবার ছটফট করে উঠে যেতে চায়। আচমকা সেই প্রতিক্রিয়ায় ভীর তাকে শক্ত করে ধরে ফেলে। কোনো কথা নেই, কোনো ব্যাখ্যাও নেই ভীর ইশায়ার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তার অধরে অধর ডুবায়,ভীরের সিক্ত অধর জোড়া গভীর মত্ততায় ইশায়ার অধরযুগল শুষে নিতে থাকে।ইশায়া ভীরের গলা খামছে ধরে,আঙুলগুলো কাঁপছে তার।ইশায়ার ঠোঁটে সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ডুবে থাকতে থাকতে ভীর নিজেই বাথটাবের ভেতরে নেমে আসে। পানির ভেতর দুজনের শরীর ঠান্ডা পানি আর উত্তপ্ত স্পর্শের অদ্ভুত সংঘর্ষ।ভীরের বেসামাল স্পর্শে ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। বুক ওঠানামা করে দ্রুত, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু ভীর নির্বিকার। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো থামার ইঙ্গিত নেই। সে পুরোপুরি ইশায়াতে মত্ত।
ভীর যেন ইশায়ার মন-মস্তিষ্ক থেকে একটু আগের সবকিছু মুছে দিতে চাইছে ভয়, যন্ত্রণা, প্রতিরোধে
সময় গড়িয়ে যায়।অতিরিক্ত ঠান্ডায় ইশায়ার শরীর ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভেজার কারণেই এমন হয়েছে।
ভীর ইশায়ার শরীর একটি বাথরোব জড়িয়ে দেয়। সাবধানে তাকে কোলে তুলে নেয়। ইশায়ার লম্বা ভেজা চুলে টাওয়াল জড়ানো।
ভীর ইশায়াকে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে।ইশায়াকে আলগোছে বসিয়ে দেয় বিছানায়।
শরীরটা সেখানে আছে, কিন্তু ইশায়ার মন যেন বহু আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাথার ভেতর পুরো শূন্যতা একটা চিন্তাও ধরা দিচ্ছে না। কী করবে, কী বলা উচিত, এমনকি শরীর নড়ানোর শক্তিটুকুও নেই। সে বোবা হয়ে বসে আছে।
পেটের ভেতর চিন চিন করে ব্যথা উঠছে। অস্বস্তিটা অচেনা নয়, তবু ভয় ধরিয়ে দেয়।প্রেগন্যান্সির এই শুরুর সময়েই কি এমন হয়?পেটের নিচের দিকটা অবশ হয়ে আসছে।এতটা ব্যথা কেনো হচ্ছে।
ভীর মেডিসিনের বক্স খুলে, একটা স্লিপিং পিল তুলে নেয়। তারপর বক্সটা আবার ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দেয় লক করে দেয়।ঘড়ের ভেতর কেমন যেন আজ অস্বাভাবিক নীরবতা।
ভীর এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে ইশায়ার সামনে নিচে বসে পড়ে। গ্লাস আর ওষুধটা এগিয়ে দেয় ইশায়ার দিকে।কিন্তু ইশায়া তাকায় পর্যন্ত না।
ভীরের ঠোঁটের কোনে তখন এক অদ্ভুত, ভয়ংকর হাসির রেখা ফুটে ওঠে যেটা শান্ত, কিন্তু হিংস্র।
সে গ্লাসটা পাশে রেখে দেয়। তারপর হঠাৎ করেই ইশায়ার মুখ শক্ত করে চেপে ধরে। কোনো সুযোগ না দিয়েই জোর করে ওষুধটা তার মুখে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর জোর করে পানি ঢালে।
ইশায়ার মুখ সে ধরে রাখে ততক্ষণ যতক্ষণ না নিশ্চিত হয়, ওষুধটা সে গিলে ফেলেছে।
ওষুধটা খাওয়া শেষ হতেই ভীর যেন একটু শান্ত হয়।
কিন্তু সেই শান্তির নিচে জমে আছে ভয়ানক রাগ।
ভীর জানে ইশায়া যদি তার সাথে মিথ্যাচার না করত, তাহলে সে এতটা ডেস্পারেট হতো না।
সে তো এমন কিছু চায় নি।কিন্তু মিথ্যা কোন কালেই তার পছন্দ না।
ভীর নিজেকে বোঝায়, আজ যা হয়েছে এর সম্পূর্ণ দায় ইশায়ার।বাইরের ঘটনা নিয়ে ভীরের কোন ভাবাবেগ নেই।এগুলো তার কাছে কিছুই না।
হ্যাঁ ইশায়াকে সামলাতে একটু বেগ পেতে হবে,ওটাও ব্যাপার না সে সব কিছুই পারবে।
ইশায়ার মুখটা কেমন ছোট, ফ্যাকাশে হয়ে আছে। ঠোঁট কাঁপছে।এই দৃশ্যটা ভীরের ভেতরে অদ্ভুত কিছু একটা নাড়া দেয়।এতোটা নিস্তেজ কেনো লাগছে, ভী তাকিয়ে থাকে ইশায়ার দিকে অসম্ভব এক মায়া নিয়ে। বিকৃত হলেও মায়া তো মায়াই।
ভীর বিছানার মাঝ বরাবর একটা বালিশ টেনে আনে। তারপর ইশায়াকে তুলে খুব যত্ন করে শুইয়ে দেয়। পাশে বালিশ দেয়, যেন শরীরটা একদিকে গড়িয়ে না যায়।
দুটো মোটা কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে দেয় তার ছোট্ট নাজুক শরীরটা যা ঠান্ডায় এখনো তির তির করে কাঁপছে।
ঘুমের ওষুধ ধীরে ধীরে কাজ করতে শুরু করে।
ভীর ইশায়ার ঠোঁটের কাটা জায়গায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। শরীরের আরও কয়েক জায়গায় তার স্পর্শের দাগ গাঢ় হয়ে ফুটে আছে সেগুলোও চোখে পড়ে।
ভীর ইশায়ার গালে আঙুল ডুবিয়ে নিচু গলায় বলে,
__কেন বলেছিলি তুই অসুস্থ? আমাকে দূরে রাখার জন্য।
এখন ভালো লাগছে? কলিজা খুব বড় হয়ে গেছে, তাই না?
তার কণ্ঠস্বর ঠান্ডা কিন্তু হুমকি স্পষ্ট,
__আমার সাথে মিথ্যাচার করবি না।
নাহলে নেক্সট টাইম… এর থেকেও খারাপ কিছু হবে।
ইশায়ার চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসে।
চেতনা ঝাপসা হয়ে গেলেও, মনের ভেতর সে একটাই কথা বারবার আওড়ায় আমি কখনো আপনাকে এই নতুন অস্তিত্বের কথা জানতে দেবো না।
যে নির্দ্বিধায় মানুষকে শেষ করতে পারে তার আমার অংশ এই ছোট্ট প্রাণের কথা জানার কোনো অধিকার নেই।
শেষমেশ ইশায়ার চোখ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসে।
ভীর নিচু স্বরে বলে,
__ঘুমাও। এর জবাব তুমি কাল দিবে।উত্তর তো আমার চাই।
বলে সে ইশায়ার গালে আলতো চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ায়।
কোমরে জড়ানো সাদা টাওয়াল,
ভীর প্যান্ট আর নতুন একটা টি-শার্ট পরে, বেরিয়ে যাওয়ার আগে আবার ও একবার ইশায়ার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকায়।সে নিজেও জানে না,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৫
এরপরের পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবে।
কিন্তু এটুকু জানে, যেভাবেই হোক ইশায়াকে সামলাতেই হবে।
ভীর রুম থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা বাইরে থেকে লক করে। তারপর নিচে নেমে আসে।
তার কাজ আছে।
এই রহস্যের সমাধান তাকে খুব দ্রুত বের করতে হবে।
