সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮১
তানিয়া হুসাইন
ভীর কিছু বলে না।একদম চুপচাপ বসে আছে।ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে।তার চোখ বারবার ইশায়ার পেটের দিকে যাচ্ছে, আবার সরে যাচ্ছে। মাথার ভেতর একই শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে
তার সন্তান… আবার ও মনকে শান্ত করছে যদি সত্য না হয়,তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
না তাকে সত্যটা জানতে হবে, হঠাৎ ভীর গর্জে ওঠে।
____মারিয়া এলেনা!
তার গলার তীব্র চিৎকারে করিডোর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।
মারিয়া এলেনা দৌড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই ভীর দাঁত চেপে বলে,
___ডাক্তার ডাকো। এখনই।
মারিয়া এলেনা এক মুহূর্ত দেরি না করে মাথা নত করে বেরিয়ে যায়।এদিকে ইশায়া এক মুহূর্তও শান্ত নেই।
সে বারবার উঠে যেতে চাইছে। তার চোখ দরজার দিকে সে এলিজার কাছে যাবে।ভীর ইশায়ার দ দু’হাত শক্ত করে ধরে আছে।তার গ্রিপ এতটাই শক্ত যে ইশায়া নড়তেই পারছে না।
ভীর বার বার বলছে,
___শান্ত হও।
কিন্তু তার নিজের গলাতেই শান্তির লেশমাত্র নেই।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে নিকো।
নিকো ভীরের রুমে ঢুকতেই পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে যায়।নিকোকে দেখার সাথে সাথেই ইশায়ার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে।মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরটা আগুনে জ্বলে ওঠে।সে ঝাঁপিয়ে ওঠে।ছুটে যেতে চায় নিকোর দিকে আঘাত করার জন্য।
কিন্তু ভীর আগেই শক্ত করে ধরে আছে তাকে।ইশায়ার ছোট্ট শরীর তার এক হাতে বন্দি।
ইশায়া দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে ওঠে,
___জা*নোয়ার! তোকে আমি শেষ করে ফেলবো!
তুই আমার আপুকে মে*রেছিস।তুই এলিজাকে মে*রেছিস!তোর ধ্বংস হবে দেখিস,কি মনে করেছিস এভাবে বেচে যাবি,তোদের শেষ একদিন হবে,
তোকে শেষ করে ফেলবো আমি!ছাড় আমাকে।সে আবারও নিকোর দিকে যেতে চায়,ভীরকে ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ভীর নিজেকে যতই ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছে ইশায়া তাকে তত রাগিয়ে দিচ্ছে।ইশায়া নিকোকে যা তা বলছে যা ভীরের সহ্য হয় না,
ভীর এইবার রেগে ইশায়ার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
___চুপ!একদম চুপ।
বেশি করে ফেলছো তুমি।বেয়াদবি সহ্য করবো না আমি,একদম চুপ থাকো।
কিন্তু ইশায়া থামার নামে নেই।সে কিছু শুনছে না। শুধু ছটফট করছে, চিৎকার করছে, মুক্ত হতে চাইছে বার বার ছটফট করছে।
____আমাকে ছাড় বলছিইই।
ভীর বাধ্য হয়ে তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরে।
নিকো ইশায়ার পাগলামি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দেখে।
ইশায়া থামার পর ভীরকে বলে,
___কি ব্রো… সত্যি?
ভীর ধীরে মাথা নাড়ে।জানিনা… ডাক্তার আসুক।
তার গলা অদ্ভুত রকম ভারী।
তারপর নিকোর দিকে তাকিয়ে বলে,
___ইঞ্জেকশন এর ব্যবস্থা করো।ডাক্তারকে ক্যাস্তেলান কে বলো তার টিম নিয়ে মেক্সিকো আসতে যত দ্রুত সম্ভব।
এই কথাটা শোনার সাথে সাথেই ইশায়া আবার ছটফট করে ওঠে।তার চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে যায়।সে আর এমন হতে দিবে না।এই অন্ধকারের মধ্যে থাকবে না সে।
ইশায়া নিজেকে ছাড়াতে চায়।কিন্তু ভীরের শক্ত বাধনে সে কিছুই করতে পারে না।তার হাত, তার শরীর সবকিছু যেন লোহার খাঁচার মধ্যে আটকে গেছে।ভীরের শক্তির কাছে সে নস্যি।
ইশায়া যখন মোচড়া মোচড়ি করতে করতে হাপিয়ে যায়,শান্ত হয়ে পরে।ভীর তখন আরও শক্ত করে তাকে ধরে রাখে বুকের মাঝে। তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক যুদ্ধ চলছে এই ছোট্ট শরীরে তার অংশ
তার সন্তান থাকতে পারে।এই ভাবনাটা তাকে কিরকম একটা করে তুলছে।
করিডোর দিয়ে দ্রুত হেঁটে আসছে কয়েকজন ডাক্তার।সব মহিলা ডাক্তার।একজনকে ডাকেনি ভীর।
এতোটা অধৈর্য সে এর আগে কখনো হয়নি। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন কয়েকজন মাঝবয়সী ডাক্তার।আগের ডাক্তার আনে নি ভীর,প্যালেসের সব কিছু আবার ও খুব শীঘ্রই বদল হবে।
রুমের ভেতরের ভারী পরিবেশ, ভীরের ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর তার দৃষ্টি সবকিছু তাকে মুহূর্তেই অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
ডাক্তারকে দেখেই ভীর ইশায়াকে ছেড়ে দেয়।তারপর সোজা তার দিকে তাকিয়ে বলে,
___এই ডাক্তার… জলদি পরীক্ষা করে বলেন তো ও কি প্রেগন্যান্ট?
ভীরের কথায় ডাক্তার থতমত খেয়ে যায়।সে একবার ভীরের দিকে, একবার ইশায়ার দিকে তাকায়।
তারপর ধীরে এসে বসে ইশায়ার সামনে।
সে নরম গলায় বলে,
___মিস… আমি একটু চেকআপ করবো।
কিন্তু আজ যেন ইশায়া পণ করে বসে আছে সে কারোর কথা শুনবে না।
ডাক্তার হাত বাড়াতেই ইশায়া সরে যায়।সে ডাক্তারকে তাকে ছুঁতেও দিচ্ছে না।
আসলে তার মানসিক অবস্থা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।অল্প সময়ের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেলো!
কাল রাত থেকে তার সাথে যা হচ্ছে শারীরিক আঘাত, এলিজার ঘটনা…তার শরীরের প্রতিটা জায়গায় এখনো জ্বালা করছে ভীরের দেওয়া আঘাতগুলো।তার মাথার ভেতর ভেসে উঠছে সাফার মুখ।র*ক্তমাখা সেই দিনটা।
সেই অসহায় মুহূর্ত।বারবার সে যেন সেই দিনেই ফিরে যাচ্ছে।আর সব চেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছে তার বাবার কথা।বাবার কণ্ঠ… বাবার মুখ… বাবার সাথে কাটানো সব মুহূর্ত।সব স্মৃতি একসাথে তার বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বলছে।আর ভীরের এতো দিনের মিথ্যে ভালোবাসার নাটক।
সে কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না।
ডাক্তার আবার নরম গলায় প্রশ্ন করে
___আপনার শেষ *** কবে হয়েছিল?বমি বমি লাগছে?মাথা ঘোরে?
ইশায়া কোনো উত্তর দেয় না।ডাক্তার আবার জিজ্ঞেস করে। আবার।কিন্তু ইশায়া যেন মুখে কুলুপ এটে বসে আছে।
একটা শব্দও বের হয় না তার মুখ থেকে।ভীর চুপচাপ দেখছে ইশায়ার প্রতিটা কাজ। ভীরের ধৈর্য ভাঙতে শুরু করে।তার চোখ লাল, সে দাঁত চেপে রাগে দেওয়ালে ঘুষি মারে।
___ড্যাম ইট!
তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।এই মেয়ে এত জেদ্দি কেন?তার মাথার ভেতর রাগে আগুন জ্বলছে।
তার মনে হচ্ছে ওই মেয়ে যদি আবার তার সামনে আসতো…তাহলে তার কি করুন পরিণতি সে করতো।নিকোর জন্য পারলো না।তার শরীর রাগে কাপছে,
আজ এই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে শুধু তার জন্যই।
এদিকে ডাক্তার কাঁপছে ভীরের ভয়ে।ভীরের রাগ দেখে তার জান যায় যায় অবস্থা।সে জানে এই মানুষটা মুহূর্তেই তাকে শেষ করে দিবে।ইশায়ার চেইক আপ না করলে।কিন্তু সে কি করবে?কিছুতেই ইশায়াকে সামলাতে পারছে না সে।
কিছুক্ষণ এভাবেই চলে,সময় গড়ায়।
ভীর ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে ইশায়ার চুল মুঠো করে ধরে মাথা তুলতে বাধ্য করে।
ভীর শক্ত গলায় বলে,
__এই বা*ন্দীর বা*চ্চা… কথা কানে যায় না তোর?নাটক করছিস কেন?মার না খেলে ঠিক হবিনা তুই… তাইনা?
এরপর ও ইশায়া একটাও শব্দ করে না।সে শুধু মুখটা ভীরের হাত থেকে সরিয়ে নেয়।চোখ বন্ধ করে নেয় শক্ত করে।ভীর দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে,
__ঠিক আছে… অন্যভাবে জেনে নেবো আমি।দেখি কতক্ষন এভাবে থাকিস তুই।তোর জেদ আগে,না আমি ভীর আগে।
তারপর সে ডাক্তারের দিকে তাকায়।বলুন… কি করতে হবে?
ডাক্তার একটু গলা পরিষ্কার করে।তারপর সাবধানে বলে,
___প্রেগনেন্সি নিশ্চিত করার কয়েকটা উপায় আছে।
সে ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করে।সবচেয়ে সহজ হলো ইউরিন প্রেগনেন্সি টেস্ট। টেস্ট কিট এর মাধ্যমে করা যাবে। যদি শরীরে hCG হরমোন থাকে তাহলে টেস্ট পজিটিভ আসে।সে একটু থামে।
আরেকটা হলো ব্লাড টেস্ট।
র*ক্ত নিয়ে ল্যাবে পরীক্ষা করলে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়।
ভীর ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছে ইশায়ার দিকে।
আরও নিশ্চিত হতে চাইলে আল্ট্রাসাউন্ড করা যায়।
কিন্তু খুব শুরুর দিকে সবসময় দেখা নাও যেতে পারে।
ভীর কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে।তারপর নিচু গলায় বলে,
__ও তো কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।এই অবস্থায় কি হালকা সেডেটিভ বা ঘুমের ওষুধ দেওয়া যাবে?
ডাক্তার বলে,
হ্যাঁ দেওয়া যেতে পারে,তাতে রোগী কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে যাবে। তখন আমরা সহজে ব্লাড টেস্ট করতে পারবো।
ভীরের চোখ সরু হয়ে আসে।সে কি করবে বুঝতে পারছেনা।সে আবারো জিজ্ঞেস করে,
__এই অবস্থায়… ঘু*মের ইঞ্জেকশন বা ওষুধ দিলে কোন সমস্যা হবে না তাও?
ডাক্তার কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
___যদি সত্যিই প্রেগন্যান্ট হয়… তবুও সাধারণত হালকা সেডেটিভ একবার দিলে বড় কোনো সমস্যা হয় না।
কিন্তু ডোজ খুব কম রাখতে হয় আর সাবধানে দিতে হয়।
আমরা চাইলে শুধু হালকা ইনজেকশন দিতে পারি, যাতে রোগী ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর দ্রুত টেস্ট করা যাবে।এবং সে একটু শান্ত হবে,এই অবস্থায় বেশি হাইপার হওয়া ঠিক না মা আর বাচ্চার জন্য।
____ভীর দাঁড়িয়ে আছে একদম স্থির হয়ে।সে কি করবে বুঝতে পারছে না।তার চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
ইশায়া ডাক্তারকে তাকে ছুঁতেও দিচ্ছে না। হাত ছুঁড়ে দিচ্ছে, চিৎকার করছে।নিজের চুল টেনে টেনে ধরছে বার বার।নিজেকে আঘাত করছে, নিজের হাত কামড়ে ধরছে।কেউ তাকে শান্ত করতে পারছেনা।
ডাক্তার ভীরের দিকে তাকিয়ে আবার ও বলে ওঠে ,
___মি. আলভারেয… এভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব না। ওকে একটু সেডেট করতে হবে। না হলে ও নিজেকেই আঘাত করবে।ভীর কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তার মুঠি শক্ত হয়ে যায়।আর কোন উপায় নেই।
তারপর দাঁত চেপে বলে,
___করুন… কিন্তু সাবধানে।ওর যেন কিছু না হয়।
ভীর অনুমতি দেওয়াদ পর একজন নার্স এগিয়ে আসে।
মহিলা গার্ডরা শক্ত করে ধরে রাখে ইশায়াকে।
ইশায়া ছটফট করছে।
____আমাকে ছাড়ো! কেউ আমাকে ছুঁবে না!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নার্স তাকে জোড় করে ঔষধ দেয়। ধীরে ধীরে ইশায়ার শরীর ঢিলে হয়ে আসে।
চোখ ভারী হয়ে যায়।শেষবারের মতো অস্পষ্টভাবে ভীরের দিকে তাকায় সে।তারপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
রক্তের স্যাম্পল নেওয়ার জন্য ডাক্তার এগিয়ে আসে।তার কাজ করে ছোট একটা ভায়ালে র*ক্ত ভরে লেবেল লাগানো হয়।
আমরা Beta hCG Blood Test করবো। এতে নিশ্চিত জানা যাবে প্রেগনেন্সি আছে কিনা।
ভীর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
কত সময় লাগবে?
ডাক্তার উত্তর দেয়,
__সাধারণ হাসপাতালে ৪–৬ ঘন্টা লাগে।কখনও কখনও একদিনও লাগে।
কিন্তু আপনার জন্য আমরা ল্যাবকে জরুরি নির্দেশ দিতে পারি।১ ঘন্টার মধ্যেই রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।
ভীর ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,
__৩০ মিনিট।
ডাক্তার কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে।আমি চেষ্টা করবো।
ভীর বলে,
___চেষ্টা না। যেটা বলেছি সেটা করো,দ্রুত।
ডাক্তার স্যাম্পল নিয়ে বেরিয়ে যায়।
____ভীর স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।
তার বুক অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। সে নিজেই বুঝতে পারছে না তার ভেতরে ঠিক কি চলছে।এই বিষয়টা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।সে তো এই কয়দিন বাইরে ছিলো।ইশায়া যখন বলেছে… তখন তো এমনিতেই বলেনি এলিজাকে বাঁচানোর জন্য হলেও… এত বড় মিথ্যা কথা সে বলবে না।
ভীর কপালে হাত চেপে ধরে,
____উফফ… বিরক্তিতে তার মুখ থেকে অস্ফুটে শব্দ বেরিয়ে আসে।
মাথা কাজ করছে না তার।ভেতরে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।এই অনুভূতি তার কাছে একেবারেই নতুন।যেন বুকের ভেতর কোথাও অজানা একটা ঝড় উঠেছে।ভীর ধীরে মাথা তুলে চারদিকে তাকায়।
তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
___সবাই… বাইরে যাও।
রুমে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা একে একে বেরিয়ে যায়।
মারিয়া এলেনা, লুসিয়া, রোসা, আনা সবাই নীরবে বেরিয়ে পড়ে।
শেষ গার্ডটা বেরিয়ে গেলে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়।
এখন পুরো রুমে শুধু দুইজন মানুষ।একজন অচেতন ইশায়া।আরেকজন মেক্সিকোর ভয়ংকর মাফিয়া রাজভীর আলভারেয।ভীর ধীরে এগিয়ে আসে।
বিছানার পাশে বসে পড়ে।এক মনে তাকিয়ে থাকে ইশায়ার দিকে।ইশায়া এখন শান্ত হয়ে শুয়ে আছে।
কিন্তু সেই শান্ত শরীরটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র।এখন কি শান্ত হয়ে শুয়ে আছে কিন্তু একটু আগ পর্যন্ত সে কি কি করেছে।
শরীরের জায়গায় জায়গায় অসংখ্য আ*ঘাতের চিহ্ন।
বে*ল্টের কালচে দাগ।লালচে ফোলা জায়গা।
ভীর ধীরে হাত বাড়িয়ে দেয়।তার আঙুলগুলো খুব সতর্কভাবে ছুঁয়ে যায় সেই ক্ষতগুলো।তার বুকের ভেতরটা আজ বড্ড ছটফট করছে।হঠাৎ তার চোখ পড়ে নিজের হাতে।তার হাতেও র*ক্ত শুকিয়ে গেছে।নিজেকে আ*ঘাত করেছে সে।ভীর কয়েক সেকেন্ড সেই হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর ধীরে চোখ বন্ধ করে।ভীর খুব করে চাইছেযদি পারতো সব কিছু ঠিক করে দিতো।কালকের রাত থেকে এখন পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে সব যদি সে মুছে দিতে পারতো।সব ঠিক ছিলো।সবকিছু কত সুন্দর ছিলো।কিন্তু এখন?সে কিভাবে সামলাবে ইশায়াকে?জীবনে এই প্রথমবারের মতো ভীরের নিজেরই নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে।
হাজারো রাজ্য শাসন করা মেক্সিকোর মাফিয়া…
আজ একটা মেয়ের সামনে অসহায় হয়ে বসে আছে।
ভীর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে।সময় যেন থমকে আআছে।তারপর উঠে দাঁড়ায়।আলমারির দিকে যায়।
আলমারি খুলে ইশায়ার একটা জামা বের করে।
ইশায়ার আগের জামাটা এখনো গায়ে।ভীর ধীরে আবার বিছানার পাশে ফিরে আসে। যত্নে সহকারে সে ইশায়ার ক্ষতগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করে।ওষুধ লাগায়।খুব সতর্কভাবে যেন একটু বেশি চাপ পড়লেই সে আবার ব্যাথা পাবে।তারপর ইশায়ার জামা বদলে দেয়।ইশায়ার লম্বা চুলগুলো নিয়ে সে বিপাকে পড়ে যায় সবসময়।সে এসব কিছুই পারে না।চুল ধরলেই যেন আরও এলোমেলো হয়ে যায়।ভীর বিরক্ত হয়ে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে।শেষ পর্যন্ত মাথার এক পাশে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করে।কিন্তু তাতেও চুলগুলো ঠিকমতো থাকছে না।আরও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
তবুও সে চেষ্টা করে।এদিকে হাত নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আবার ভীরের হাত থেকে র*ক্ত পড়তে শুরু করে।
কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই।তার সব মনোযোগ এখন একটাই জায়গায় ইশায়া।
ভীর ধীরে ঝুঁকে আসে।তার কণ্ঠটা অদ্ভুত নরম।
খুব নিচু স্বরে বলে,
___এটা যদি সত্যি হয় ইশায়া।সে একটু থামে।তার চোখ ইশায়ার মুখে স্থির।আবারো বলে,
এটা যদি সত্যি হয় আমার থেকে খুশি হয়তো আর কেউ হবে না।
তার ঠোঁটে এক ফোঁটা ক্লান্ত হাসি আসে।
তুমি জানো… আমার মাঝে খুশি জিনিসটা নেই।কোনো কিছুই আমাকে আনন্দ দেয় না।
সে ধীরে ফিসফিস করে।আমি হার্টলেস,আই এম ফা*কিং হার্টলেস ম্যান।
তারপর হাত বাড়িয়ে ইশায়ার পেটের উপর আলতো করে হাত রাখে।কিন্তু জানো… আজ আমার বুকের ভেতরটা কেমন হাসফাস করছে।
তার গলার স্বর আরও ভারী হয়ে যায়।
এই পেটে যদি আমার অংশ থাকে…আমার সন্তান থাকে,ভীরের চোখে অদ্ভুত এক ঝলক দেখা যায়।
তাহলে আমি তোমাকে পৃথিবীর সব সুখ দেবো।আমার জীবন আমি তোমার নামে লিখে দিবো।আমার জীবনে অপ্রাপ্তির খাতাটা পূর্ণ হয়ে যাবে।
তার চোখ হঠাৎ দূরে কোথাও হারিয়ে যায়।জানো…আমি কখনো মাকে পাইনি।মায়ের শেষ স্মৃতি বলতে আমার কাছে তার এই আংটিটা আর তার ডাইরি টাই আছে।বাবাকেও নিজের কাছে পাইনি।
সে তার নিজের নতুন সংসার তার সাম্রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।আমি শুধু তার কাছে তার দায়িত্ব আর তার বংশের প্রদীপ ছিলাম। একা বড় হয়েছি,
তার কন্ঠে হালকা কাঁপন।কিন্তু আমার সন্তানকে আমি সব কিছু দেবো।যা যা আমি পাইনি তা সব কিছু দেব।
সে আবার ইশায়ার পেটে হাত রাখে।যা আমি কোনোদিন পাইনি সব আমার সন্তান পাবে।আমি হাজার খারাপ মানুষ হই কিন্তু আমি একজন ভালো বাবা হব দেখো।
ভীর ধীরে ধীরে ইশায়ার সামনে আরো ঝুঁকে আসে।
তার চোখে আজ অদ্ভুত এক কোমলতা, যেটা কেউ কখনো দেখেনি।
সে খুব আলতো করে ইশায়ার কপালে একটা চুমু খায়।
তারপর ভীরের আঙুল ধীরে নেমে আসে ইশায়ার ঠোঁটের দিকে।
ইশায়ার ঠোঁটে ছোট্ট যে তিলটা আছে সেখানে খুব আস্তে করে আঙুল ছোঁয়ায় সে।এই তিলটা যেন তার কাছে অদ্ভুত প্রিয়।
ভীর নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে,
___সব ঠিক হয়ে যাবে… দেখো।তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক জেদ।ডা. কাস্তেলানকে ফোন দিবো আমি।সে আসবে।
তার চোখে তখন অন্ধকার এক দৃঢ়তা।আবারও সব ঠিক হয়ে যাবে।
ভীর ধীরে ইশায়ার কপাল থেকে চুল সরিয়ে দেয়।
সব ভুলে যাবে তুমি…সব কিছু আবার ঠিক হয়ে যাবে।
আমার থাকবে তুমি।
তার আঙুল এবার ইশায়ার গাল ছুঁয়ে নেমে আসে।
___আমাকে চিনবে।শুধু আমাকে।তার চোখে তখন অদ্ভুত এক অধিকার জ্বলে উঠেছে।
___শুধু আমাকে… আর কাউকে না।আর কারোর প্রয়োজন নেই তোমার।আমি আছি তোমার জন্য।
তার আঙুল আবার ইশায়ার পেটের উপর গিয়ে থামে।
আমি তুমি আমাদের সন্তান।আর কিছু লাগবে না।
সে খুব ধীরে মাথা নাড়ে।কাউকে না।তার চোখে তখন ভয়ংকর এক অন্ধকার ভালোবাসা।তোমার কাউকে প্রয়োজন নেই।ভীর বার বার একই কথা আওড়াতে থাকে।এই কথাগুলো বলতে বলতেই ভীর আবার ঝুঁকে আসে ইশায়ার ঠোঁটে খুব ধীরে একটা চুমু খায়।
তারপর ভীর উঠে দাঁড়ায়। শান্ত হয়ে শুয়ে আছে ইশায়া, ইমুখটা নিস্তেজ, শ্বাসগুলো ধীর।কিন্তু ভীর জানে এই শান্তি বেশিক্ষণ থাকবে না।ইশায়া জেগে উঠলেই আবার ঝড় উঠবে।আবার সেই পাগলামি, সেই চিৎকার।ভীর গভীর নিঃশ্বাস নেয়।তার অনেক কাজ বাকি।সবকিছু শেষ করতে হবে ইশায়া ওঠার আগেই।একটা ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভীর বেরিয়ে যায় রুম থেকে।ভীর বেরিয়ে যেতেই গার্ডদের বলে রুমে যেতে এবং ইশায়াকে প্রতিটা সেকেন্ড নজরে রাখতে।
প্যালেসের বিশাল হলরুমে নেমে আসে ভীর
__ডিয়েগো ইতিমধ্যেই প্যালেসের ভেতরের সব গার্ড চেঞ্জ করে ফেলেছে। বিশ্বস্ত কয়েকজন গার্ড ছাড়া বাকি সবাইকেই।আর প্যালেসের বাইরের গার্ডদের সব ইনফরমেশন নিয়ে , যাদের সব ঠিক ছিল তাদেরকে রেখেছে বাকিদেরকে বাদ দিয়ে দিয়েছে।এবং নতুন করে আরো গার্ড নিয়োগ করা হচ্ছে, সবকিছু দেখে। আরো নিয়োগ করা হবে, প্যালেসের সুরক্ষা আগের থেকে তিনগুণ করা হবে। এই কাজগুলোই দেখছে ডিয়েগো,এনরিকো, সান্তিয়াগো।
____হলরুমের মাঝখানে সোফায় বসে আছে নিকো রামিরেজ।মাথা নিচু করে বসে আছে সে।হাতে ফোন, কিন্তু চোখ ফোনে নয়।
ভীর এগিয়ে আসে।
তার পদশব্দে নিক একটু মাথা তোলে, আবার চুপ হয়ে যায়।ভীর তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
গম্ভীর গলায় বলে,
___ডা. কাস্তেলানের সাথে কথা হয়েছে?।
কখন আসবে সে?
নিকো কোনো উত্তর দেয় না।চুপ করে বসে থাকে।
ভীর ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
___কি হলো?তার গলায় বিরক্তি।কথা বলছিস না কেন?
নিক ধীরে নিঃশ্বাস ফেলে।মাথা তুলে ভীরের দিকে তাকায়।তার চোখে স্পষ্ট দোটানা।কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলে,
___ব্রো ডা. কাস্তেলান একটা কথা বলেছে।
ভীরের চোখ গাঢ় হয়ে ওঠে।
___কি কথা?
নিক ধীরে বলে,
___ডা. বলেছে… ইশায়া যদি প্রেগনেন্ট হয়…তাহলে এই অবস্থায় কোনোভাবেই সেই ইনজেকশন দেওয়া যাবে না।
ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওটে আবারো,
__কেন?
নিক এবার স্পষ্ট গলায় বলে,
__কারণ এখন যদি এই ইনজেকশন দেওয়া হয়… তাহলে মি*সক্যারেজ হয়ে যাবে।বাচ্চাকে বা*চানো যাবেনা।
নিকোর কথা শুনে ভীর স্তব্ধ হয়ে যায়।নিক কথা চালিয়ে যায়।তুই তো জানিস এই ইনজেকশনটা কি করে।এটা স্মৃ*তি মুছে ফেলে।কিন্তু শরীরে এর অনেক সাইড ইফেক্ট আছে।আর ইনজেকশনে এমন অনেক কিছু-ই আছে, যেগুলো বাচ্চার জন্য ক্ষ*তিকর।
ভীর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নিক ধীরে বলে,
__তাই ডা. কাস্তেলান বলেছে, আমরা আসলে কি চাই সেটা আগে তাকে জানাতে।
ইনজেকশন দেওয়া তার জন্য সমস্যা না।সে দিতে পারবে।কিন্তু তুমি যদি বাচ্চাটা রাখতে চাও,তাহলে এই মুহূর্তে এই ইনজেকশন দেওয়া সম্ভব না।
ভীর পরে যায় বিপাকে।মাথার ভেতর যেন হাজারটা চিন্তা একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে।সে কিছুতেই নিজের অংশের কিছু হতে দিবে না,কিছুতেই না,এতে যাই হয়ে যাক না কেনো।
এই সন্তান… তার র*ক্ত… তার অস্তিত্বের অংশ।
কিন্তু ইশায়াকে কিভাবে সামলাবে কি করবে সে?
মাথা যেন আর কাজই করছে না।
মুহূর্তের মধ্যে মাফিয়া বসের সেই স্থির মস্তিষ্কটা এলোমেলো হয়ে গেছে।
হলরুমের ভারী নীরবতার মধ্যে ভীর সোফায় বসে।
দৃষ্টি শূন্যে স্থির, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক তীব্র ঝড় বইছে।
এর মাঝে ডিয়েগো গার্ডের ব্যবস্থা নিয়ে কিছু বলতে এগিয়ে আসে।
তার গলা সতর্ক, চোখে দ্বিধা
___বস, গার্ডদের নতুন শিফট আর সিকিউরিটির ব্যাপারে….
কথা শেষ করার আগেই ভীর হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়। ক্লান্ত গলায় বলে,
__যা করার তুমি করো… যেটা ভালো মনে হয় তোমার।
ডিয়েগো ভীরের মুখের দিকে একবার তাকায়।
সেই চিরচেনা কঠিন মুখটা আজ অদ্ভুতভাবে ভারী আর অস্থির লাগছে।সে আর কিছু বলার সাহস পায় না।চুপচাপ সরে যায়।
নিক পাশেই বসে।সে ভীরের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে,
___এতো টেনশন করো না ব্রো। আগে দেখো রিপোর্টে কি আসে তারপর একটা ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
ভীর কোনো উত্তর দেয় না।সে চুপচাপ বসে আছে।
দুই হাত শক্ত করে জড়ানো, চোখে অদ্ভুত এক অপেক্ষা।সময় যেন আজ খুব ধীরে চলছে।
ঠিক তখনই ডাক্তার আসে রিপোর্ট নিয়ে ।
ডাক্তারকে দেখেই ভীরের বুকের ভেতর ধুকপুক করতে শুরু করে।যে মানুষটা ব*ন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েও চোখের পলক ফেলে না, সে আজ একটা রিপোর্টের অপেক্ষায় অস্থির হয়ে আছে।
ডাক্তার এগিয়ে আসে।তার মুখে হালকা হাসি।
ভীরের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
___কংগ্রাচুলেশন, মিস্টার রাজভীর আলভারেয
আপনি বাবা হতে চলেছেন।
এক সেকেন্ডের জন্য পুরো হলরুমটা স্তব্ধ হয়ে যায়।
ডাক্তার আবার বলে,
___আপনার ওয়াইফ ৬ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট।
কথাটা শোনা মাত্রই ভীরের ঠোঁটের কোনে ধীরে ধীরে একটা প্রশান্তির হাসি বয়ে যায়।
যেন বুকের ওপর থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেল।বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
রক্ত যেন দ্রুত বয়ে যেতে শুরু করে শরীর জুড়ে।
শরীরের লোম পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যায়।তার জীবনের সবথেকে বড় খুশির সংবাদ।এই নি*র্মম, র*ক্তে ভেজা মাফিয়া জীবনের মাঝেওআজ প্রথমবার সে অনুভব করল,তার ভেতর একটা নতুন জীবন জন্ম নিতে চলেছে।
এর মাঝেই নিক হঠাৎ লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
সে সরাসরি ভীরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে,
___ওহহহ ব্রো! কংগ্রাচুলেশন!
হাসতে হাসতে বলে আমাদের চ্যাম্প আসতে চলেছে ব্রো! তুমি বাবা হতে চলেছো!আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা।
নিকের উত্তেজনায় পুরো ঘরের ভারী পরিবেশটাই বদলে যায়।ভীরও হেসে ওঠে নিকোকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
নিকো খুব খুশি হয়।তার মুখে সেই চিরচেনা হাসিটা আরও বড় হয়ে ওঠে।
আর ভীর ভীরের তো খুশির কোনো সীমানাই নেই।এতদিন ধরে র*ক্ত, ব*ন্দুক আর বি*শ্বাসঘাতকতার মাঝেই কেটেছে তার জীবন।
কিন্তু আজ… প্রথমবার সে অনুভব করছে অন্যরকম এক সুখ।তার নিজের র*ক্ত…তার উ*ত্তরাধিকার…এই পৃথিবীতে আসতে চলেছে।
নিকো হঠাৎই উঠে দাঁড়ায়।
___ওয়েট ব্রো!
বলে সে দ্রুত বা*র কাউন্টারের দিকে চলে যায়।বা*র পুরোটা ভর্তি বিশ্বের সবচেয়ে দামী আর বিরল ম*দের বোতলে।নিকো তাকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে।
তারপর গাঢ় অ্যা*ম্বার রঙের তরল ভরা বোতলটা নেয়।
গ্লাস হাতে নিয়ে সে ভীরের দিকে এগিয়ে আসে।
তার চোখে আনন্দের ঝিলিক।গ্লাসটা ভীরের হাতে দেয়।
ভীর গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড।
তার চোখে অদ্ভুত এক অনুভূতি।
নিকো হালকা হাসে।
___তোমার উত্তরাধিকার… ব্রো।
তারপর গ্লাসটা একটু তুলে বলে,
__টু দ্য নিউ কিং অফ দ্য আলভারেয এম্পায়ার।
ভীরের ঠোঁটের কোণে আবার সেই শান্ত হাসিটা ফুটে ওঠে।সে গ্লাস তুলে নিকোর গ্লাসের সাথে ঠুকায়।
ক্রিস্টালের শব্দটা নীরব হলরুমে টং করে বেজে ওঠে।
___টু মাই চাইল্ড…
ধীরে বলে ভীর।তার গলা ভারী হয়ে আসে।
দুজনেই টে*কিলার চুমুক দেয়।
____হলরুমের দাঁড়িয়ে আছে ডাক্তার।
ভীর চুপচাপ ডাক্তারের সাথে কথা বলছে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এই মানুষটা কয়েক মিনিট আগেও বাবা হওয়ার খবর শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল।উল্লাসে মেতে উঠেছিলো।
এর মাঝে নিক তো মিষ্টি খাওয়াচ্ছে ডিয়েগো, সান্তিয়াগো সবাইকে। নিকোর খুশি দেখে কে।
ইশায়াকে নিয়ে সে কখনো খুশি না থাকলেও ভীরের বাবা হওয়ার বিষয়টায় সে খুব খুশি, আর সেটা তার করা কাজেই বোঝা যাচ্ছে।
ভীর ডাক্তার এর সাথে সব বিষয় নিয়ে কথা বলে। ডাক্তার ভীরকে সব কিছু বুঝিয়ে বলে।
ডাক্তার গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বলল,
___মিস্টার আলভারেজ, প্রথমেই একটা কথা বলি। সাধারণত গর্ভধারণের সময়কাল প্রায় ৯ মাস বা ৪০ সপ্তাহ। এখন যদি টেস্ট অনুযায়ী দেখি, তাহলে বেবি এখন একেবারে শুরুর দিকে আছে। অর্থাৎ সামনে প্রায় পুরো সময়টাই বাকি।
ভীর স্থির চোখে তাকিয়ে শুনছে।
ডাক্তার আবার বলতে শুরু করল,
এই সময়টাকে আমরা কয়েকটা ভাগে ভাগ করি। প্রথম তিন মাসকে বলা হয় ফার্স্ট ট্রাইমেস্টার। এই সময়টা খুব সেনসিটিভ। বাচ্চা তখন মায়ের গর্ভে ঠিকভাবে বসে যায়, তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো তৈরি হওয়া শুরু করে হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, হাত-পা সবকিছুর গঠন শুরু হয়।
ভীরের চোখে তীব্র মনোযোগ। ডাক্তারের বলা একটা শব্দও মিস করে না সে।
___এই সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্রাম, মানসিক শান্তি আর সঠিক খাবার।
মাকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।প্রতিদিন ফল, সবজি, দুধ, ডিম, প্রোটিন জাতীয় খাবার।অতিরিক্ত মসলা বা ভারী খাবার না।পানি বেশি খেতে হবে।আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো ফোলিক এসিড আর আয়রন। এগুলো বেবির ব্রেইন আর শরীরের বিকাশের জন্য খুব জরুরি।
মারিয়া এলেনা, রানিয়া, লুসিয়া,আনা সব নোট করছে যা যা ডাক্তার বলছে।
ডাক্তার আবার বলে,
___ইশায়ার মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা ঠিক নেই। তাই তার বিশেষ যত্ন নিতে হবে। স্ট্রেস যেন একদম না থাকে। গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক চাপ সরাসরি বেবির ওপর প্রভাব ফেলে।
ভীরের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক ছায়া নেমে আসে।
__এই সময় হঠাৎ রাগ, কান্না, অস্থিরতা, ভয় সবকিছুই খুব স্বাভাবিক। একে আমরা বলি মুড সুইং। শরীরে হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য এটা হয়। তাই তাকে শান্ত রাখতে হবে, ঝগড়া করা যাবে না, ভয় দেখানো যাবে না।
ভীরের কপাল একটু কুঁচকে যায়।এমনিতেই সামলাতে পারেনা সে এই মেয়েকে,এর মাঝে এগুলো সামলাবে কি করে।
ডাক্তার আরেকটা কথা বলতে বলতে আমতা আমতা করছে।
ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
__আর কিছু?
ডাক্তার একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
___জ্বি… একটা বিষয় আছে। প্রথম তিনমাস মেলামেশা করা ঠিক না।
এই কথা শোনার পর ভীর বিরক্ত হয়।তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
ডাক্তার বিষয়টা বুঝে শান্ত গলায় ব্যাখ্যা দিল,
___দেখুন, প্রথম তিন মাসে বেবি খুব নাজুক অবস্থায় থাকে। গর্ভে ঠিকভাবে স্থির হওয়ার সময় এটা। এই সময় বেশি শারীরিক চাপ বা চাপ সৃষ্টি হলে ঝুঁকি বাড়ে। তাই ডাক্তাররা সাধারণত এই সময়টা সাবধান থাকতে বলেন।
ভীর বিরক্ত গলায় বলে,
___আর না মানলে?
ডাক্তার এবার একটু দৃঢ় গলায় বলল,
প্রথম তিনমাস সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এর পরের সময়, মানে চতুর্থ মাস থেকে সপ্তম মাস পর্যন্ত, যদি মায়ের শরীর ভালো থাকে, কোনো জটিলতা না থাকে, তখন অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তার সীমিতভাবে অনুমতি দেন। তবে সেটাও খুব সতর্কভাবে।
কিন্তু শেষের দিকে, মানে অষ্টম আর নবম মাসে, আবার সাবধান থাকতে হয়। তখন মায়ের শরীর ভারী হয়ে যায়, বেবি বড় হয়ে যায়, তাই চাপ পড়লে সমস্যা হতে পারে।
প্রথম আর শেষের দিকটা একটু সতর্ক থাকতে হয়।
ডাক্তার আবারও বলে,
তাকে নিরাপদ আর শান্ত পরিবেশে রাখতে হবে। তবেই মা আর বাচ্চা দুজনেই সুস্থ থাকবে।
ভীর ডাক্তারের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে।কিন্তু এটাই বুঝছে না বাকি সবগুলো মানলেও, ইশায়া থেকে এতদিন সে কিভাবে দূরে থাকবে।
আবার ভাবে বেইবির জন্য সে সব করতে পারবে।তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা জমে উঠছে।ভীর জানে এই পৃথিবীর সবকিছু সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।কিন্তু ইশায়া…আর এখন তার গর্ভে থাকা সেই ছোট্ট প্রাণ ওদের জন্য তাকে নিজের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটাকেও হয়তো আটকাতে হবে।
___ডাক্তারের কথা শেষ হতেই কয়েক সেকেন্ড নীরব হয়ে থাকে ভীর।
তারপর সে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
___ওকে তো শান্ত করা যায় না।খেতেও চাইবে না।
অন্য কোন ভাবে কিছু করা যাবে কি? স্যালাইন বা অন্য কিছু?
ডাক্তার কি বলবে বুঝতে পারতেছে না।
ওকে কি এই অবস্থায় ঘুমের ঔষধ দেওয়া যাবে?
মানে এরকম কিছু যেটায় সে শান্ত থাকবে। কারণ সে এই বাচ্চা চাচ্ছে না।
এক মুহূর্ত থেমে ভীর শক্ত স্বরে বলে,
___আর আমি চাই… মা আর বাচ্চার যেন কোন ক্ষতি না হয়।
ডাক্তার কিছুক্ষণ ভীরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর শান্ত গলায় বলে,
__দেখুন মিস্টার আলভারেজ… এই সময় মায়ের মানসিক অবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি মা মানসিকভাবে বাচ্চাকে গ্রহণ না করে, ভয় পায় বা সবসময় অস্থির থাকে তাহলে সেটা বেবির ওপরও প্রভাব ফেলে।
স্ট্রেস হরমোন বলে একটা বিষয় আছে। মা যদি সবসময় রাগ, ভয়, বা অস্থিরতার মধ্যে থাকে, শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন বাড়ে। এটা দীর্ঘ সময় থাকলে বেবির গ্রোথ বা মানসিক বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভীর নীরবে শুনছে।ডাক্তার এবার ভীরের আগের প্রশ্নের জবাব দেয়।
__আপনি বলছিলেন স্যালাইন বা অন্য উপায়ে কিছু করা যায় কি না।
সে মাথা নেড়ে বলে,
যদি মা একদমই খেতে না চায়, তখন কিছু ক্ষেত্রে IV Fluids বা স্যালাইন দেওয়া হয়, যাতে শরীরে পানির ঘাটতি না হয়।আর প্রয়োজন হলে ভিটামিন, গ্লুকোজ বা নিউট্রিশনাল সাপোর্ট দেওয়া যায় ইনজেকশন বা ড্রিপের মাধ্যমে।
ভীর আবারো বলে,আর ঘুমের ঔষধ?
ডাক্তার এবার স্পষ্ট গলায় বলে,
__গর্ভাবস্থায় আমরা খুব সহজে সেডেটিভ বা ঘু*মের ঔষধ দেই না। কারণ অনেক ওষুধ প্লাসেন্টা দিয়ে বেবির শরীরেও চলে যেতে পারে।
তবে যদি রোগী খুব বেশি অস্থির হয়, নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করে বা মারাত্মক প্যানিক অ্যাটাক হয় তাহলে খুব লো ডোজে কিছু সেফ মেডিকেশন দেওয়া হয়, যেগুলো গর্ভাবস্থায় তুলনামূলক নিরাপদ।
ভীর গভীরভাবে শুনছে।
ডাক্তার আবার বলল,
কিন্তু এগুলো নিয়মিত দেওয়া ঠিক না। এটা শেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভীর আবার জিজ্ঞেস করে,
সে খেতে না চাইলে?
ডাক্তার একটু চুপ থাকে তারপর বলে,
প্রথমে চেষ্টা করতে হবে তাকে স্বাভাবিকভাবে খাওয়ানোর। ছোট ছোট পরিমাণে খাবার দিতে হবে। ফল, জুস, স্যুপ এগুলো সহজে খাওয়া যায়।
যদি সে একদমই না খায়, তখন আমরা লিকুইড ডায়েট দিতে পারি।
আর খুব দরকার হলে নাসোগ্যাস্ট্রিক টিউব ব্যবহার করা হয়। এটা একটা পাতলা টিউব, নাক দিয়ে পেটে ঢোকানো হয়, যার মাধ্যমে তরল খাবার দেওয়া যায়।তবে এটা সাধারণত তখনই করা হয়, যখন রোগী দীর্ঘ সময় কিছুই খাচ্ছে না এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আর একটা বিষয় মনে রাখবেন। তাকে জোর করে সবকিছু করানো যাবে না। কারণ গর্ভবতী মায়ের শরীর ও মন দুটোই খুব সংবেদনশীল থাকে।
যতটা সম্ভব তাকে শান্ত রাখতে হবে।নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে।
আর তাকে বুঝিয়ে, ধীরে ধীরে মানসিকভাবে এই অবস্থাটা গ্রহণ করতে সাহায্য করতে হবে।
ভীর চুপ করে শুনছে ।তার চোখে তখন অদ্ভুত এক জেদ আর উদ্বেগের মিশ্র ছায়া।সে শুধু একটা কথাই ভাবছেইশায়া এই সন্তান চায় না।কিন্তু ভীর চায়।
আর ভীর যখন কিছু চায় তখন সেই জিনিসটা পৃথিবীর কোন শক্তি তাকে থেকে কেড়ে নিতে পারে না।
____এদিকে লুকা আয়ুষ এলিজা কারোর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না।সে খুব বিচলিত হয়ে পড়েছে।
মাতেও গভীর ভাবনায় মগ্ন।
ডন লুকাকে ফোন হাতে নিয়ে কাউকে ফোন লাগাতে গেলে মাতেও তাকে থামিয়ে বলে,
__ওয়েট লুকা।এমন কোন কাজ করো না যার জন্য আমাদের এত দিনের পরিকল্পনা সব জলে যায়।
লুকা বিরক্ত হয়ে বলে,
___তাহলে তুমি কি বলছ এভাবে চুপচাপ হাতে হাত ধরে বসে থাকবো।
আমি অ্যাট লিস্ট ওকে ফোন দেই তাহলে তো ওখনকার খবর তো জানতে পারবো।
মাতেও বিরক্ত গলায় বলে,
__আমার মনে হয় এলিজা আর আয়ুষ ধরা পরে গেছে।
এজন্যই ওদের দুজনের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না।
আর ওরা ধরা পড়া মানে ভীর আরো সতর্ক হয়ে পড়েছে।
এখন সে সবাইকে সন্দেহ করবে। কেউ তার সন্দেহের বাইরে যাবে না, ভীর সবাইকে চার্জ করবে, পুরো সিস্টেম বদলে ফেলবে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮০
এখন ম্যাটিয়াসের সাথে যোগাযোগ করা মানে আমাদের শেষ দাবার গুটিও ধ্বংস করে ফেলা।
তাই এমন কোন কাজ করো না যাতে আমাদের পুরো গেম নষ্ট হয়ে যায়।
অপেক্ষা করো দেখো কি হয় এমনিতেই সব জানা যাবে।
লুকা রাগে হিস হিস করতে করতে তার জায়গায় গিয়ে বসে।
আর এদিকে মাতেও সব কিছুর হিসাব মিলাতে ব্যস্ত।তীরে এসে সে কিছুতেই তরী ডুবতে দিবেনা।
