সে খলনায়ক পর্ব ২৪
ফারহানা সানিয়াত
সকাল থেকে আজ আকাশটা মেঘলা মেঘলা ভাব, বাহিরে শীতল মৃদু মন মাতানো বাতাস। প্রাণপ্রিয়া তার ঘরের জানালা খুলে চোখ বন্ধ করে পরিবেশটা অনুভব করে, দুদিন কেটে গেছে সে পার্টির পর যার যার জীবন আবার প্রতিদিনকার রুটিন অনুযায়ী চলছে। তবে আশ্রমে আজকের দিনটা একটু অন্য রকম প্রাণপ্রিয়া চোখ খুলে দেয়াল ঘড়ির দিকে ঘুরে তাকায় সকাল এগারোটা এগারো,
বসার ঘরে বাচ্চাদের হইচই শব্দ সবার পরনে নতুন জামা আজ তাদের স্কুলে পার্টি মিসেস সেলিনা তাদের ঠিকঠাক ভাবে রেডি করিয়ে দিচ্ছেন। আর কড়াভাবে আদেশ দিচ্ছেন স্কুলে বেশি দুষ্টুমি না করতে সোজা আশ্রমে ফিরে প্রাণপ্রিয়ার কথামতো নিজেদের খেয়াল রাখতে, কারন তিনি তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়র বাড়িতে যাবেন আজ। আশ্রমের কৃতপক্ষ থেকে এর অনুমতি নিয়েছেন ৩-৪ দিন পর ফিরে আসবেন।
প্রাণপ্রিয়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে তার মুখে মৃদু হাসি।
__ তুমি কি এখনই বের হয় যাবে আন্টি? প্রাণপ্রিয়া প্রশ্ন করে,
সেলিনা মাথা নাড়ান হ্যাঁ এখনই বের হয়ে যাব, তুমি সবকিছুর খেয়াল রাখতে পারবে না?একই কথাটা সেলিনা দুদিন ধরে প্রাণপ্রিয়াকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছেন সেলিনার চিন্তিত কন্ঠ,,
প্রাণপ্রিয়া দ্রুত উপর নিচ মাথা নাড়ায় অবশ্যই কেনো পারবো না এটা আমার দায়িত্ব আর আঙ্কেল তো আছেই তুমি নিশ্চিন্তে যাও,,
সেলিনা হা করে শ্বাস ফেলেন,, ভাইজান তো অসুস্থ তুমি ও ছোট দরকার না হলে আমি কখনো ই যেতাম না কিন্তু,,,
প্রাণপ্রিয়া মুখের হাসি চওড়া করে সেলিনার কাছে এসে বলে,,
__ আহা আন্টি আমি আর ছোট নেই এসব দায়িত্ব নিতে আমার শিখতে হবে তুমি যাও আমি সবকিছুর আর সবার খেয়াল রাখবো।
সেলিনা আবারো হা করে শ্বাস ফেলেন প্রাণপ্রিয়ার দায়িত্বশীলতার উপর তার বিশ্বাস আছে ।তবুও তার মুখে চিন্তিত ভাব।, আসলে দূর সম্পর্কে তার কোনো আত্মীয় আছে সে জানতো না কিন্তু দুদিন আগে হঠাৎ তার ওই আত্মীয়র ফোন,,নানা পরিচয়ে সে নিজেও চিনতে পেরেছিলেন খুবই দরকারি বিষয় নাকি তার সাথে সামনাসামনি কথা আছে তাদের, সে ও অনেকটা কৌতুহল হয়েছিল তাই আশ্রমের কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে অনুমতি নিয়েছেন।
__ ঠিক আছে ভালোভাবে থাকবে সবার খেয়াল রাখবে সাথে নিজের ও, বাকি কথা আমার ভাইজানের সাথে হয়েছে তিনি বাজার থেকে আসলে আমার যাওয়ার কথা বলো ,
প্রাণপ্রিয়া মেঝে থেকে ব্যাগ তুলে সেলিনার দিকে দিয়ে বলে,,
__ আচ্ছা এখন তুমি যাও না হলে তোমার দেরি হতে পারে।
সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার হাত থেকে ব্যাগ নেন, হুম
এরপর তিনি সদর দরজার দিকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ান তার সাথে আশ্রমে ছেলেমেয়েরাও।
প্রাণপ্রিয়া তাদের যাওয়ার দিকে যে পর্যন্ত দেখা যায় তাকিয়ে থাকে। তবে তাদের যাওয়ার সাথে সাথে মুখ থেকে হাসিটা তার আস্তে আস্তে গায়েব হয়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়,,
গার্ডেনের বেতের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে ইভান দৃষ্টি তার নিজ ফোনের স্ক্রিনে, যেখানে জ্বলজ্বল করছে তার আর প্রাণপ্রিয়ার ছবি, সে ঝুম করে তার পাশের প্রাণপ্রিয়ার হাসি উজ্জ্বল নিষ্পাপ মুখখানা গভীর দৃষ্টিতে দেখে।
__ আমাকে হঠাৎ কেনো এভয়েড করছিস প্রিয়া? ছবির দিকে তাকিয়ে ইভান মনে মনে প্রশ্ন করে উঠে।
আর ভাবে দু দিন আগে সেই পার্টির রাতে যখন সে প্রাণপ্রিয়াকে ডাকতে ডাকতে পিছে পিছে গিয়েছিল।
আর প্রাণপ্রিয়া তার ডাক শুনে ও থামে নি উল্টো দৌড়ে চলে গিয়েছিল এরপর কেটে যাওয়া দু দিনের মধ্যেও তার ফোন মেসেজ কিছু দেখছে বা ধরছেন না।
এর কারন ইভান যানে না কিন্তু অনেক হয়েছে আজ সোজা সে আশ্রমে যাবে আর জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে? কেন তাকে এভয়েড করছে! সে কি কোনো ব্যাপার নিয়ে তার ওপর রাগ।
নিজ ভাবনায় ইভান ভেতর থেকে ছটফট করে ওঠে
এটা তারজন্য যন্ত্রণাদায়ক মনে হচ্ছে। হয়তো কোনো ভাবে সে হার্ট করে ফেলেছে, সেটা কি পার্টি রাতে!!!
ইভান স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোফায় গায় এলিয়ে দেয়,,
তৎক্ষণাৎ ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসার শব্দ,
ইভান বিরস মুখে ফোন মুখের সামনে ধরে,,
“দেখা কর”
প্রাণপ্রিয়ার নাম্বার থেকে ছোট্ট একটা মেসেজ।
আশ্রমের একপাশে মাটি খুঁড়ে প্রাণপ্রিয়া ফুল গাছের চারা লাগাচ্ছে। তার কাছে প্রকৃতির সুন্দর্য অসম্পূর্ণ মনে হয় ফুল গাছ ছাড়া তাই নিজ পয়সা খরচ করে কয়েকটা ফুল গাছের চারা কিনেছে নার্সারিতে থেকে ,, চারাগুলো সে কাল কিনেছিল কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় লাগানোর সময় পাইনি তাই আজ দ্রুত সব কাজ শেষ করে গাছগুলো লাগাতে বসেছে।
ইভান আশ্রমের গেট দিয়ে প্রবেশ করে মেসেজ পেয়ে সে তৎক্ষণাৎ বাইকে উঠে ৫ মিনিটের মধ্যে চলে এসেছে, কিন্তু এই প্রথম এখানে এসে তার ভেতরটা কাঁপছে একটা অদ্ভুত অনুভূতি ও ঘিরে ধরে তবে সেগুলোকে সে বড় একটা বড় নিশ্বাস ফেলার সাথে ভেতর থেকে ফেলে সামনে চুল গুলো পেছনের দিকে ঠেলে পা বাড়ায়।
প্রাণপ্রিয়া মাটির গর্তে ফুল গাছের একটা চারা রেখে সেটার উপর মাটি দেওয়া শুরু করে, কাজটা সে খুব মনোযোগ দিয়ে করছিল কিন্তু পায়ের শব্দ শুনে পিছে ঘুরে তাকাতেই ,,
__ ইভান!
তার ঠোঁটের মধ্য দিয়ে আসা মিষ্টি কণ্ঠ ইভানের সব ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
__ স্যার আমি অনেক দুঃখিত এখানকার সবকিছু হ্যান্ডেল করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
দামিয়ান সোফায় হেলান দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসা দৃষ্টি তার হাতের কলমের দিকে ,,
__ তোমার হয়তো সময় ফুরিয়ে এসেছে কি বলো গম্ভীর কণ্ঠ দামিয়ানের।
ভিডিও কলে থাকা নিকলাই ঢোক গিলে মাথা নত করে।
দামিয়ান কলম থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ল্যাপটপের দিকে তাকায়,,
__ বিশ্বস্ত হলেও কোনো কাজের না তুমি কি করা উচিত তোমাকে ।
নিকলাই কম্পিত কণ্ঠ,, সসরি স্যার কিন্তু আমি কি করবো মিস্টার মিখাইল সব ডিল নিজে হ্যান্ডেল করছে আমাকে কোন কিছু জানাচ্ছে না।
দামিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়,পাশে বসা ক্যাথরিন অস্থির হয়ে বারবার কাউকে ফোন দিচ্ছেন কিন্তু ওপাশ থেকে ধরছেনা তাই রাগে সে হাতের ফোনটা ছুড়ে মারে ফ্লোরে ।
দামিয়ান এক নজর তার মমের দিকে তাকিয়ে নিকলাই কে ভিডিও কল কাটার জন্য আদেশ দেয়। নিকলাই আদর্শ পেয়ে দ্রুত কল কাটে।
__ মম!
ক্যাথরিন রাগে ফুঁসছে,,
তোমার উচিত আমাকে আদেশ দেওয়া ওই মিখাইলকে মারার জন্য,
ক্যাথরিনা চোখ বন্ধ করে নিজেকে কোনোমত শান্ত করে,,
__ কি বলছো ভুলে যেয়ে না সে আমার হাসব্যান্ড,,
দামিয়ান শব্দ করে হেসে উঠে, তাহলে তাকে সাবধান করে দিও আমার কাজে বাধা না হতে না হলে এত টুকরো করব যে চিহ্ন ও খুঁজে পাবে না।
__ সরি,
সদর দরজা কাছে মোড়ায় প্রাণপ্রিয়া ইভান দুজনেই বসা,
__ সরি সেই রাত আর কেটে যাওয়া দু দিনের জন্য ,,
ইভান অবাক হয়,,
প্রাণপ্রিয় বড় নিশ্বাস নেয়,, আমার জানি না কি হয়েছিল সে রাতে আমি শুধু চলে যেতে চেয়েছিলাম এরপর দূরে থাকতে,,
ইভান ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিল সে স্বাভাবিক কথা বলছিল এতক্ষণ তবে প্রাণপ্রিয়া কথা তুলতে,,
__ আমার কোনো ব্যবহার বা কথায় তুই হার্ট হয়েছিস?
প্রাণপ্রিয়া দ্রুত মাথা নাড়ায়,, নাহ কখন ই না,
__ তাহলে কেনো দূরে থাকতে,,
প্রাণপ্রিয়া ইভানের কথার মাঝে বলে
তুই জানিস আমি তোকে বন্ধু হিসাবে কতটা পছন্দ করি। তুই আমার জীবনের একটা অংশ। তাই… আমি মনে করি আমাদের এই সম্পর্ক সবসময়ই এমনই থাকুক।
প্রাণপ্রিয়া শান্তভাবে হাসির জন্য তার ঠোঁটের কোণগুলিকে টেনে তোলার চেষ্টা করে কিন্তু ইভান লক্ষ্য করেনি বলে মনে হচ্ছে।
__ কি বলতে চাইছিস তুই?
প্রাণপ্রিয়া মাথা নত করে আমাদের দূরত্ব বজায় রেখে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখা উচিত যেমনটা আঙ্কেল আন্টি বলে।
ইভান কপাল কুঁচকে ফেলে, দূরত্ব বজায়!
প্রাণপ্রিয়া মাথা নাড়ায় হুম দূরত্ব বজায় যেমন আমার কলেজের বান্ধবী আর তোর ভার্সিটির বন্ধুর আমাদের দুজনের জীবনে আছে তেমন,
__তুই আজেবাজে কথা বলছিস প্রিয়া…
__ একদমই না আমি আমাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করছি ইভান,
ইভান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, হঠাৎ এর কারণ আমি বুঝতে পারছি না।
কারন তুই যে বোকা প্রাণপ্রিয়া কিছুটা শব্দ করে হেসে উঠে।
আমরা বড় হয়েছি ইভান এটা আমার থেকে তুই ভালো বুঝিস আমাদের দুনিয়া আলাদা আমি চাই না আমাদের বন্ধুত্ব কখনোই খারাপ না হোক আমি তোকে বন্ধু হিসাবে অনেক চাই।
ইভানের দৃষ্টি কাপছে সে চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়,,
প্রাণপ্রিয়া হাসি মুখে হাঁ করে শ্বাস ফেলে সে সেই রাতে স্বপ্নময় পার্টি থেকে আসার সময় বড়লোকের বিকৃতি মস্তিষ্ক নিয়ে ভাবছিল। তখন তার মাথায় কিছু মুহূর্তের জন্য ইভান আর বন্ধুত্বের মধ্যে একটা রেখাও দেখতে পেয়েছিল। একজন ধনী ডাক্তারের ছেলের সাথে সামান্য আশ্রমের মেয়ের বন্ধুত্ব যাকে অসহায় ভেবে বিনোদন হিসেবে ভেবে নেওয়া যায় এটা বাস্তব আর বেদনাদায়ক ছিল। তাই সে চায় বন্ধুত্বটা সুন্দর রাখার জন্য দূরে থেকে সম্পর্ক রাখবে। যাতে কখনো তাদের বন্ধুত্বের মাঝে সে অসহায় সামান্য একজন আশ্রিতা কথাটা তুলে না আসে।
সে খলনায়ক পর্ব ২৩
__ তুই এমন টা করতে পারিস না প্রিয়া আমরা শুধু বন্ধু না আমরা অনেক ভালো বন্ধু । ইভানের কন্ঠ কাঁপছে,,
__ এর জন্যই আমাদের দূরে থাকতে হবে আর দূরে থাকলে সম্পর্ক আরো মজবুত হয়।
প্রাণ প্রিয়ার ঠোঁটের কোণে স্বচ্ছ হাসি,,
