স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২২
সানজিদা আক্তার মুন্নী
নাজহা কে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে সাথে সাথেই। এখন ফজরের আযানের স্বর ছড়াচ্ছে চারদিকে। তৌসিরদের নিজেদের ক্লিনিক আছে, সেখানেই নিয়ে এসেছে তৌসির ওকে। নাজহার পেটের পাশ থেকে বুলেট বের করা হয়েছে, নাজহা বর্তমানে কেবিনে আছে রেস্টে, জ্ঞান ফিরেনি এখনো।
তৌসিরের সাথে বিবিজান ওর বাবা এসেছেন। তাদের আসার পর রুদ্ররা সবাই এসেছে সবাই বলতে নাযেম চাচা, মিনহাজ মামা, কেরামত, নুহমানরা এসেছে। বিবিজান যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন নাজহার গুলি লাগলো কিভাবে তখন বিবিজান কে তৌসির মিথ্যা বলছে জীবনের এই প্রথম সে একের পর এক মিথ্যা বলে যাচ্ছে বিবিজান কে, তাও শুধুমাত্র নাজহার জন্য। আজ বলেছে তৌসির ট্রিগার টেনে মজা করছিল নাজহার সাথে আর ভুলে নাজহার লেগে গেছে। অবশ্য বিবিজান এ কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি, তারপরও ওকে খুব বাজে ভাবে বকেছেন। ছোট্ট একটা মেয়ে, যদি বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেত তাহলে কি হত?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তৌসির তো নিজের বাবার হাতে মারও খেয়েছে। ওর বাবা দুটো থাপ্পড় মাথায় মেরে বলেছেন, “যদি নাজহার কিছু হয় তাহলে তৌসিরের কিডনি বের করে উনি বেচে দিবেন।”
তৌসির সব বকা সহ্য করে নিচ্ছে। সত্য অর্থে এসব তৌসিরের গায়ে লাগছে না, তৌসিরের প্রাণ তো লুটে আছে নাজহার কাছে। কলিজার খচখচানিটা কমছেই না, বরং ক্রমাগত স্রোতের মতো বাড়ছে। তৌসির কিভাবে আর কাকেই বা বলবে ও যে তার নাজহা কে আঘাত করেনি? নাজহা যে বড্ড বোকা, নিজেই বোকামি করে নিজেই কষ্ট পেয়েছে। নাজহার কি? ও তো জ্ঞানশূন্য হয়ে ঘুমিয়ে আছে, কোনো কষ্ট কোনো ব্যাথা অনুভব হচ্ছে না তার। সব তো তৌসিরের। সব দায় তো ওর! একে তো নাজহার এই অবস্থা, শ্বাস ফেলতেও কষ্ট হচ্ছে, আরেক তো কতটি টাকা তৌসিরের যাবে! এই কষ্টের মধ্যেও তৌসির টাকার চিন্তাটাও করতেছে। কি আর করা, টাকা তো যাবেই। বউ টা সুস্থ থাকলেই হলো।
তৌসির কেবিনের সামনে করিডরে বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে আছে, বুকে দুই হাত গুঁজে ঠান্ডা হয়ে। পাশেই নাজহার বাবা আর ওর মাস্টার চাচ্চু আর তালহা ভাই বসে আছেন। রাত একটার সময় কল গিয়েছে তাদের কাছে নাজহার গুলি লেগেছে। ছিদ্দিক সাহেব সামনে যাদের পেয়েছেন তাদের কে নিয়েই চলে এসেছেন। এসে উনারা অনেক গলাবাজিও করেছেন বটে, তবে তৌসির তাদের একান্তে নিয়ে সাফসাফ বলেছে, “এই সব আপনাদের কীর্তি আমি জানি। আমারে জেলে দেওয়া, ফাসানি সব, আর আমার পরিবার এসব জানে না। আপনাদের মাইয়া বাঁচতে ভয়ে নিজেই নিজরে গুলি করছে। তাই এখন বেশি চিল্লাইলে আমার বিবিজান দাদাজান সবাই আপনাদের মাইয়ার আসল রুপ সম্পর্কে জানব আর পরে খেলা লাগবো। আফনারা তো জানেন আফনাদের কি দোষ।”
তৌসিরের কথা শুনেই নাজহার পরিবারের লোক আর “টু” শব্দ করেননি কেউ, কারণ উনারাই তো সবকিছুর মূল। এতকিছুর পর যে তৌসির নাজহা কে বাচিয়ে রেখেছে এটাই অনেক, আর কথা বলার প্রয়োজন নেই।
তৌসির নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। তখনি ওর পাশে এসে রুদ্র দাঁড়ায়। রুদ্র কে দেখে তৌসির ওর দিকে এক নজর তাকায়, ফের কিছু না বলে চুপ হয়ে যায়। রুদ্র তৌসিরের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে বলে, “ভাই, ভাবির কোনতা হইবো না, চিন্তা করিও না।”
তৌসির রুদ্রের কথায় ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কাঁধে রাখা রুদ্রের হাতটা নিজ হাতে চেপে ধরে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, “চিন্তা কি আর এমনি এমনি হয় রে রুদ্র? পেটর মাঝখানে যদি লাইগা যাইত, তাইলে আমার কত বড় ক্ষতি হইতো ভাবতাছোছ?”
রুদ্র কি বলে তৌসির কে সান্তনা দিবে তা ওর জানা নেই, কি বলা উচিত তাও বুঝে ওঠার ক্ষমতা ওর নেই। তৌসির যে নাজহা কে বাচিয়ে রেখেছে এতেই আশ্চর্য রুদ্র, তারউপর তৌসিরের এমন চিন্তা করা। রুদ্র জীবনের প্রথম দেখতেছে তৌসির কে এতটা চিন্তিত হতে কিছু নিয়ে। ঠোঁট, চোখ, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার তৌসিরের। হাত পা কাঁপতেছিল যখন তৌসির নাজহা কে নিয়ে গাড়িতে ওঠছিল হসপিটালে আসার জন্য। রুদ্র কিছু মুহুর্ত চুপ থেকে তৌসিরকে বলে, “আমি আসছিলাম বলতে, ভাবির জ্ঞান ফিরছে। তুমি চাইলে দেখা করতে পারো।”
তৌসির এ শুনে তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জোর গলায় বলে, “সাউয়া, তো আগে বলবি না এটা? আমি এতক্ষণ ধরে এটার অপেক্ষা করছিলাম!”
এ বলে তৌসির দ্রুত পায়ে কেবিনের দিকে অগ্রসর হয়। ছিদ্দিক সাহেব তৌসির কে যেতে দেখে উঠে এসে রুদ্র কে জিজ্ঞেস করেন, “নাজহার জ্ঞান ফিরছে?”
রুদ্র মাথা নাড়িয়ে উওর দেয়, “হ্যাঁ।”
ছিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞেস করেন, “আমি যাইতে পারমু?”
রুদ্র উনার করা প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায়, কি উত্তর দিবে বুঝে পাচ্ছে না। কিছু সময় চুপ থেকে কেবিনের দিকে তাকিয়ে বলে, “আফনে এখন না যাওয়াই ভালো তালই মশাই। ভাইসাব তো গেলো, এখন ভাই চলে আইলে যাইবেন না হয়।”
ছিদ্দিক সাহেব রুদ্রের কথায় যুক্তির গন্ধ পান। মনটা খচখচ করছে মেয়ের জন্য, কিন্তু কি আর করা, আগের জায়গায় চুপ করে বসে যান। উনি বসতেই তালহা ভাই হালকা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেন, “জ্ঞান ফিরলো নাজহার?”
ছিদ্দিক সাহেব মাথা না বোধক নাড়িয়ে উওর দেন, “হ্যাঁ, তৌসির গেছে দেখা করতে। না জানি মারে টারে কি না।”
তালহা ভাই এ কথা শুনে তিক্ত হেসে বলেন, “তোমার কি মনে হয় তৌসির ভাই ওকে মারবে? এত বড় ঘটনা ও ঘটিয়েছে, তারপরও তৌসির ভাই কতটা ব্যাকুল হয়ে আছে, আর এখন ওকে মারবে বলে মনে হয়? দেখো গিয়ে, ওকে জড়িয়ে ধরে হয়তো কান্না করতেছে।”
মাস্টার চাচ্চু এতক্ষণ চুপ ছিলেন। তালহা ভাইয়ের কথায় উনিও মত দিয়ে বলেন, “তৌসির আর যাই হোক, নাজহারে ফুলের টুকাও দিব না। সেদিন দেখলাম নিজ হাতে নাজহার পা ধুয়ে দিতাছে, তাও রাস্তার মধ্যে।”
তালহা ভাই উঠে দাঁড়ান আর কঠিন গলায় বলেন, “এতটা বিশ্বাস, এতটা ভালোবাসে তৌসির ভাই ওকে, আর ও কি করলো আর কি করতেছে? সব তোমাদের জন্য। তোমরা এসব থেকে ওকে বের করে দাও, একটা সুন্দর সংসার করতে দাও ওকে। তৌসির ভাই ভালো রাখবে ওকে।”
এ বলে তালহা ভাই উঠে দাড়িয়ে অন্যদিকে হনহনিয়ে চলে যান। ছিদ্দিক সাহেব আর নাদের সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন আগের জায়গায়।
এদিকে তৌসির নাজহার কাছে বেডের পাশে রাখা টুলে বসে আছে। হাসপাতালের সাদা চাদরে, ফ্যাকাশে মুখে শুয়ে আছে নাজহা। তার নিরীহ চোখ দুটো স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে তৌসিরের চোখের গভীর শূন্যতায়। তৌসিরও নিশ্চুপ। নাজহার এই কালচে-সবুজ, বাধ্য চাহনিতে সে নিজেও এক মায়াবী বাঁধনে আটকে আছে।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে নাজহা ধীরে ধীরে মুচকি হাসে। এই ক্ষীণ হাসিতেই লুকিয়ে আছে এক গোপন অহংকার। ফিসফিস করে সে শোধায়, “তৌসির সাব, আপনি বড্ড বোকা।”
এ শুনে তৌসিরের বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস। সে হাত বাড়িয়ে নাজহার ডান হাতটি আলতো করে নিজের মুঠোয় পুরে নিয়ে বলে, “এসব ছাড়ো। কেমন লাগছে?”
নাজহা তৌসিরের হাতের বৃদ্ধা আঙুল মুঠোয় ধরে, প্রশ্নটিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে, “মেয়র সাব, আমার মতো গদ্দারকে বাঁচিয়ে রাখার কারণ?”
এ প্রশ্নে তৌসিরের মুখে ভেসে ওঠে এক কৃত্রিম হাসি। ওর কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হয়ে আসে, “বহুত হিসাব তোমার লগে বাকি। এত সহজে মরলে ঐ হিসাবের কী হইব?”
নাজহা তৌসিরের কথায় ওর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে, “জানি তো। নিশ্চয়ই কোনো স্বার্থ আছে, নয়তো আমায় বাঁচিয়ে রাখার মতো মানুষ যে আপনি না।”
তৌসির আর কিছু বলে না। বলার ইচ্ছে ছিল অনেক কিছু, অনেক সময় নিয়ে, অনেক কিছু বলবে, তবে এখন না। এখন থাক। বলার প্রয়োজন নেই বেশি কিছু। তৌসির কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে নাজহার দিকে ঝুঁকে, তার ওপর থেকে পাতলা সাদা চাদরটা সরিয়ে নেয়।
এ দেখে নাজহা ছটফটিয়ে ওঠে জিজ্ঞেস করে, “কী হলো?”
তৌসির ওর কথায় কোনো উত্তর শোধায় না। চুপচাপ হাত বাড়িয়ে ওর পেটের ওপর থেকে পরনের মেডিকেলের শার্টটা সরিয়ে অপারেশনের জায়গাটিতে চোখ বুলায়। চোখ বুলানো শেষে মৃদু স্পর্শে হাত বুলিয়ে দেয় সেখানে। নাজহা হঠাৎ তৌসিরের ঠান্ডা স্পর্শে নাজহার শরীরটা আচমকা শিউরে উঠে ও হিসহিসিয়ে আওয়াজ করে, “উহুও। এভাবে হাত দিচ্ছেন কেন? কাতুকুতু লাগছে, ব্যথাও লাগছে তো।”
ব্যথা? তৌসির নাজহার মুখ এ শুনে অবাক হয়। নাজহা কি আদৌ ব্যথা বোঝে? সে হয়তো জানে, শরীরে আঘাত লাগলে কেমন লাগে। কিন্তু সেই বোঝার গভীরতা কতটুকু? কিন্তু তৌসিরের অন্তরের অন্তস্তলে যে নীরব ক্ষয়, যে যন্ত্রণা তিলে তিলে তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে, সেই তীব্র বেদনার ভার কি নাজহা কখনো অনুভব করতে পারবে? নাজহার পক্ষে কি বোঝা সম্ভব, আপন মানুষের জন্য কতটা হাহাকার জমা হলে একজন মানুষের ভেতরটা এমন শূন্য হয়ে যায়?
মনে হয় না। নাহ, সে বোঝে না।
কারণ, সে যদি সত্যিই বুঝত, যদি এক মুহূর্তের জন্যও তৌসিরের এই ছটফটানি, এই নীরব কান্না সে দেখতে পেত, তবে সে কখনোই এমনটা করতে পারতো না। নাজহা নিজেকে এভাবে আঘাত করে, নিজেকে কষ্ট দিয়ে তৌসিরকে এমন নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে ফেলতো না।
তার এই না বোঝাটাই তৌসিরের ব্যথাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। নাজহা নিজেকেও পোড়াচ্ছে, আর সেই আগুনের আঁচে তৌসিরের হাহাকার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
তৌসির কিছু সময় চুপ থেকে পাশ ফিরে নাজহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুই ব্যথা বুঝস নাজহা? তোরে মরণের দুয়ারে টলতে দেখে কতটা ব্যথা আমার হইছে, সেইটা তুই বুঝস নাজহা? নাজহা, তুই এত বোকা ক্যান?”
নাজহা তৌসিরের কথায় কোনো উত্তর দিতে পারে না, নিরুত্তর রয়ে যায়। অনুশোচনা নাজহার না হলেও, কোনো এক অজানা কারণে নিজের মনে এক আলাদা খারাপ লাগা কাজ করে। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে তৌসির সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, “বদমাশির কঠিন পর্যায়ে তুই চলে গেছিস। তোর কপালে দিনরাত নিয়ম করে খালি ফুরইন দিয়া বাড়ি দিয়া তোরে ঠিক করতে হইব লো নটি।”
নাজহা আজ আর তৌসিরের দেওয়া গালিতে রাগ করে না। শুধু মুচকি হেসে বলে, “তৌসির, আমার না বেঁচে থাকার ভারী আক্ষেপ। যখন গুলি লেগেছিল, খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আক্ষেপের সমাপ্তি ঘটল বুঝি, তবে না, তা হয়নি। এই ঘৃণার জীবন আরও কাটাতে হবে।”
তৌসির নাজহাকে সরল গলায় বলে ওঠে, “আর নাটকের বাণী গাইস না। গুলি তো আমারে মারতে চাইছিলি। যখন পিস্তল ঘুরাইতে পারস নাই, তখন বাঁচার লাইগাই নিজেরে মারছস।”
নাজহা অবাক হয় তৌসির এটাও জানে! জেনেও ওকে বাঁচিয়েছে? কী জন্য তৌসির ওকে বাঁচিয়ে রাখল? নাজহা বিস্ময় আড়াল করে সহজ ভাবে বলে, “সে তো বটেই, তারপরও মনে হয়েছিল বাঁচব না। আচ্ছা, এই গদ্দারকে আমারে বাঁচিয়ে রাখলেন যে? কারণটা কি জানতে পারি?”
তৌসির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নাজহার পায়ের কাছে বসতে বসতে বলে, “সবাই তো ভালোর লগে ঘর করে। আমি নাহয় গদ্দারের লগেই ঘর করলাম, একটু ভিন্ন থাকলাম।”
নাজহা নিশ্চুপ থাকে। তৌসির কী মতলবে ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে, কে জানে। এখন কোনোভাবে বাঁচলেই হলো। কী জন্য বেঁচে আছে, জানার প্রয়োজন এই মুহূর্তে অন্তত নাজহা বোধ করছে না। তৌসির নাজহার পায়ের ওপর থেকে চাদরটা সরিয়ে ওর পায়ের পাতায় আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “চেত আইছে পায়ে? ইনজেকশনের প্রভাব চইল্যা গেছে?”
এ বলে তৌসির নাজহার ডান পায়ের তর্জনী টেনে ধরে। নাজহা হালকা ব্যথা পেয়ে চোখ-মুখ খিঁচিয়ে আওয়াজ করে, “তৌসির, আস্তে টানুন না। ছিঁড়ে নিবেন তো।”
নাজহার চিৎকার শুনে তৌসির তিক্ত গলায় বলে, “ধুর ছিনাল, এমনে টানাটানি মারাইস না। আমি তোর পায়ের আঙুল টানতাছি আর কিছু না।”
“আপনি এভাবে টানছেন কেন? আমার পা থেকে হাত সরান। আমি মনে হয় বলিনি টানতে।”
“এ, তোর পা ধরার শখ আমার নাই। শুধু দেখতেছিলাম চেত আইছে নাকি।”
বিরক্তিতে এ কথা বলে তৌসির নাজহার কনিষ্ঠা আঙুল ধরে টেনে ধরে। নাজহা আবারো আওয়াজ করে ওঠে, “আপনি খুব খারাপ, তৌসির। কেন আমার সাথে ফাইজলামি করছেন?”
“আমি ফাইজলামি করতেছিনি। তুমি বুঝবা না কী জন্য এইটা করলাম।”
“আচ্ছা, হয়েছে। পা থেকে হাত সরান এখন। কেমন কেমন লাগে।”
তৌসির নাজহার কথার উত্তরে কিছু বলবে, তার আগেই নাজহার বাবা আর মাস্টার চাচ্চু কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করেন। তাঁরা বাইরে থেকেই দেখেছেন তৌসির যে নাজহার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর নাজহা মুচকি হেসে কপাল কুঁচকে ওকে কিছু বলতেছে। ছিদ্দিক সাহেব এমনটা একদমই আশা করেননি। তাঁরা প্রবেশ করে শুকনো কাশি দেন। তৌসির কিছুটা সংকোচে পড়ে উঠে দাঁড়ায়। মনে মনে গালি দেয়,” সাউয়া মাউয়া ফাইরা পাছায় লাত্থি দিয়া বের কইরা দিতে মন চাইতেছে খান**কির পোলাদের।”
তৌসির এদের এই নাটক সহ্য করতে পারে না, একটুও পারে না। উঠে দাড়িয়ে তৌসির এবার নাজহার দিকে তাকায় এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে, “তুমি কথা কও, আমি খাওয়ার জন্য কিছু নিয়ে আসি।”
এ বলে তৌসির সামনে এক কদম আগাতে নেয় তখনি নাজহা, তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে, তৌসিরকে চোখ দিয়ে ইশারা করে কাছে ডাকে। এই প্রকাশ্য আহ্বানে তৌসির কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে শ্বশুরদের সামনে নাজহার কাছে যাওয়াটা কেমন দেখায়? কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। তাই ছিদ্দিক সাহেবদের দিকে তাকিয়ে সে আমতাআমতা করে হেসে, নাজহার দিকে এগিয়ে যায়।
নাজহার মুখের কাছে ঝুঁকে যায় কি বলবে ও তা শুনার জন্য, ঝুঁকতেই নাজহার উষ্ণ শ্বাস তৌসিরের কানে এসে লাগে। নাজহা ফিসফিস করে আবদার জানায়, “আমার খিদে পেয়েছে, ভারী কিছু নিয়ে আইসেন। কিপ্টামি করে আবার পাঁচ টাকা দিয়ে বন নিয়ে আইসেন না।”
এই আবদারে তৌসির মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকায়, “আচ্ছা, আনব নে।”
এই বলে তৌসির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।তৌসির চলে যেতেই মাস্টার চাচ্চু এগিয়ে এসে নাজহাকে তুলে হেলান দিয়ে বসতে সাহায্য করেন এবং জিজ্ঞেস করেন, “কেমন লাগছে এখন?”
নাজহা তাৎক্ষণিক ঝাঁঝালো উত্তর দেয়, “আর কেমন লাগবে? গুলি খেয়েছো তো তুমি, বোঝো না কেমন লাগে?”
ছিদ্দিক সাহেব, তার পাশে বেডে বসে বড্ড করুণ গলায় বলেন, “তুই এত বোকা ক্যান রে মা? তোরে তৌসির জীবনেও মারতো না, এইটা না বুইঝা গুলি করলি! যদি অন্য কোথাও লাগতো?”
বাবার কথায় নাজহা একদৃষ্টিতে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে উনার দিকে। তারপর হেলা করে বলে, “আর কি হতো? মরে যেতাম। কীভাবে বুঝব ঐ লোক আমায় মারবে না? আমার পেট বরাবর পিস্তলের নল ধরে জিজ্ঞেস করতেছিল উদ্দেশ্য কী! যদি গুলি না খেতাম, তাহলে আজ সারা রাত আমারে ভয় দেখাতো। অতঃপর এক সময় সত্যিটা জেনে যেত। আব্বা, তৌসির শিকদারের খেলার কাছে আমাদের খেলা এখনো পুঁটি মাছের মতো। তার লগে পারব না।”
মাস্টার চাচ্চু টুলে বসতে বসতে নাজহাকে আশ্বস্ত করেন, “দেখ, পারব না সেটা আমরাও জানি। তবে না পারলেও কিছু একটার একাংশ করতে পারব। তৌসিরের দুর্বলতা তুই আর তাই তোর সব দোষ ওর কাছে তুলা পরিমাণ তুচ্ছ। আর এটাই সুযোগ। তুই কীভাবে কী করবি জানি আমরা। আমাদের উদ্দেশ্যটা সফল হলেই হলো।”
নাজহা বাবার দিকে তাকায় নিজের ভেতরের দ্বিধা প্রকাশ করে বলে, “আব্বা, ঐ লোকটা খুব খারাপ। কিন্তু জানো, আমার বেলা বড়ই অদ্ভুত তার আচরণ। আমার জন্য একপ্রকার সে পাগল। মানুষ সযত্নে যেভাবে আপন কিছুকে সাজিয়ে রাখে, ওভাবে আমায় রাখতে চায়। কত মিথ্যা যে আমার জন্য বলে, তার হিসেব নেই। আমার বলা কত বিশ্রী কথা যে হজম করে, তার শেষ নেই। আচ্ছা, এই লোককে আমার কি ঠকানো আদৌ উচিত?”
ছিদ্দিক সাহেব নাজহার কথায় কঠোর হয়ে যান। তিনি নাজহার আবেগ নিয়ন্ত্রণে আনেন, “নারীদের একটাই সমস্যা, আর তা হলো অতিরিক্ত আবেগ। মা রে, আবেগ জলে ভিজাইয়া যার লাইগা গেছো, তা করো বুঝছো? নইলে তুমিও তোমার পাওনা পাইবা না।”
নাজহা চুপ হয়ে যায়। তৌসিরকে ঠকাতে তার বুকে খুব করে বাঁধে। তৌসির যাওয়ার সময় নাজহা যখন কেঁদেছিল, ঐ কান্না মিথ্যা ছিল না ঐ কান্না ছিল আফসোস এবং মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার আফসোসে। নাজহা নিয়তির কাছে বাঁধা। যদি এই সব নিয়ম ভাঙতে পারত, তবে সে তৌসিরকে এত বাজে ঠকাতো না। তৌসিরের মুখের দিকে তাকালে তার কলিজা ফেটে যায়। তৌসির খারাপ, কিন্তু নাজহার সাথে আজ অবধি খারাপ কিছু সে করেনি। উল্টো সবসময় নাজহাকে খুশি রাখার চেষ্টা করেছে, অথচ নাজহাই নাকি ওর পিঠে ছুরি মারছে।
মাথা নিচু করে নাজহা জিজ্ঞেস করে, “আর কেউ এলো না আমায় দেখতে?”
মাস্টার চাচ্চু তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “এসেছে। আমরা গিয়ে পাঠাচ্ছি।”
“কে এসেছে?”
“এলেই দেখতে পাবি।”
ছিদ্দিক সাহেব নাদেরের কথায় উঠে দাঁড়ান এবং নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “ভালো থাকিস। যত্ন নেওয়ার কথা বলব না কারণ তোর জন্য আপদতো তৌসিরি যথেষ্ট।”
নাজহা মাথা নিচু করেই উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, তৌসিরি আমার জন্য যথেষ্ট।”
এই উত্তরে একইসাথে ছলনা, স্বীকৃতি এবং এক আলাদা কষ্ট লুকিয়ে আছে।
ছিদ্দিক সাহেবরা চলে যেতেই ধীরে ধীরে দরজা খোলে ভিতরে প্রবেশ করেন তালহা ভাই। নাজহার উনাকে দেখে অবিশ্বাসে চোখ বড় হয়ে উঠলো। হঠাৎ পাওয়া বিস্ময়ে দেহটা কেঁপে উঠলো। হাতে-পায়ে শিরশিরে আতঙ্কের ঝাঁকুনি নেমে এলো। নাজহা ঠোঁট নেড়ে অনেক দ্বিধায় উচ্চারণ করলো, “আ… আপনি?”
তালহা ভাই ধীর পায়ে এসে নাজহার বেডের পাশে রাখা টুলটিতে বসতে বসতে ওকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন লাগছে এখন? কেন এমন বোকামি করলি?”
নাজহা উনার দিকে অভিমানে চোখের পলক ফেলে না, সামনে স্থির চেয়ে থেকে শোধায়, “কোন লালসায় মরলাম তা অবশ্য এতক্ষণে আপনার জানা হয়ে গেছে।”
তালহা ভাই এমন জিদী কথায় তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলেন, “হুম, জানি।”
তালহা ভাই যে জানেন সেটা নিশ্চিত হয়ে নাজহা বলে, “তাহলে জিজ্ঞেস করছেন যে?”
তালহা ভাই নাজহা জে বুঝান, “নাজহা, এগুলো বোকামি। এগুলো ছাড়। এমন করিস না। এগুলো পাপ। তোর সংসার, সুন্দর সংসারটা নিজ হাতে শেষ করিস না।”
কিন্তু এসব বোঝার মানুষ নয় তো নাজহা উল্টো ও বলে ওঠে, “আপনাকে পাওয়ার লালসায় এমন দু-চারটে পাপের অধিকারিণী হতে আমার দ্বিধা নেই।”
তালহা এমন উত্তর আশা করেননি। উনি ভেবেছিলেন নাজহা হয়তো উনাকে ভুলে গিয়ে নতুন করে জগৎ বুনেছে, তবে আজ উনার সব ধারণা পাল্টে গেলো। সে তার জেদ নিয়েই আছে। তালহা ভাই স্তব্ধতা কাটিয়ে বলেন, “আমার জন্য এমন পাগলামি করিস না, নাজহা। বুঝ বাস্তবতা।”
নাজহা সোজা, কাট গলায় শোধায়, “সবকিছুর আগে আপনি। আপনি ব্যতীত পৃথিবীর সবকিছু আমার কাছে তুচ্ছ।”
“নাজহা, আবেগ ঝাড়। আবেগ দিয়ে বিবেচনা করলে হয় না। বাস্তবতা বড্ড কঠিন রে।”
আবেগ? নাজহা এ শুনে তালহা ভাইয়ের দিকে তাকায়। প্রতিবারই উনি এমন করেন। যখনই ভালোবাসা প্রকাশ করেছে, তার নাম আবেগ দিয়ে তিনি দূরে ঠেলে দিয়েছেন। আজও তাই করলেন। এত নিষ্ঠুর কেন তিনি? নাজহা বড্ড অসহায় ভঙ্গিতে উনাকে কয়েকটা কথা বলার জন্য মুখ খোলে। আজই সুযোগ, বলে দিক সব, যতটুকু পারে।
“নিজেকে আমায় ভালোবাসতে বাধ্য করলেন, আবার ছাড়তেও বাধ্য করলেন? এতটা নিষ্ঠুর কেন আমার প্রতি আপনি হলেন? তালহা ভাই, আমার না খালি দামি জিনিসের দিকে নজর যায় ভালোবাসা, সুখ, আর আপনি! জ্বরের তীব্রতায় যখন মহাবিশ্ব ভুলে যাই, কেবল আপনিই স্মরণে থাকেন। সম্ভবত আপনাকে এতটুকুই ভালোবাসতে পেরেছি। আপনি আমার প্রথম ভালোবাসা, আমার শেষ ভালোবাসা, শেষ চেষ্টা, শেষ আশা, শেষ মানুষ, শেষ বিশ্বাস, এবং শেষ শক্তি। বড্ড অবেলায় আপনাকে ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করুন, ভালোই বেসেছিলাম! আমি অভিশাপ দিবো না, যদি মনে করেন আপনি আমার সাথে ঠিক করেছেন, তাহলে এমন ঠিক যেন আপনার সাথেও হয়। আমাকে তো আপনার জীবনে রাখলেন না। তবুও মনে রাইখেন এই পৃথিবীতে কেউ একজন আছে যে আপনাকে ভালোবাসতে চেয়েছিল, কিন্তু আপনি তাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন! তালহা ভাই, আপনি কি আমার হবেন না? পুনর্জন্ম বলতে তো কিছু হয় না।”
নাজহার প্রতিটি কথাই তালহা ভাইয়ের অন্তরে রক্তক্ষরণ ধরিয়ে দিয়েছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে বলেন, “তোর এই কান্নায় আমার কিছু যায় আসে না, নাজহা। তুই ইমোশনাল করার চেষ্টা করিস না আমায়।”
এ বলে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে মনে মনে ভাবেন, “কত সহজে বলি ‘আমার কিছু যায় আসে না’, কিন্তু আমার যে কী যায়, কী আসে, সেটা শুধু আমিই জানি!”
তালহা ভাইয়ের এমন কথায় নাজহা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ভেঙেচুরা স্বরে বলে, “আমার অসহায় চোখের পানি মিথ্যা না, মিথ্যা না, বিশ্বাস করুন, মিথ্যা না। ‘আমার হইয়েন না, কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসিনি’ এই মিথ্যা অপবাদ অন্তত আমাকে দিয়েন না! আমার আপনাকে নিজের করে পাওয়ার বড্ড আফসোস।”
তালহা ভাই নাজহার মুখপানে তাকান। শুষ্ক চোখ দুটো এখন বিরহের পানিতে টইটুম্বুর হয়ে আছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে গাল বেয়ে পড়া পানিটুকু মুছে দিতে নিজ হাতে, কিন্তু তা যে সম্ভব নয়। নাজহাকে ছোঁয়ার অধিকার যে শুধুমাত্রই তৌসিরের। তালহা ভাই নাজহার কথার জবাব দেন, “পৃথিবীতে মানুষ কাঁদতে কাঁদতে জন্মায়, অভিযোগ করতে করতে বাঁচে, আফসোস করতে করতে মৃত্যুবরণ করে। তাই আফসোস কোনো বিষয় না। ”
নাজহা নিজ হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে নিতে নিতে আকুতি-ভরা গলায় জিজ্ঞেস করে, ” তালহা ভাই কী নাম দিমু আপনারে? প্রেম, মায়া, নাকি শুধুই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ধ্বংস?”
তালহা ভাই হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে ধরেন, “আবেগ দিতে পারিস।”
নাজহা তালহা ভাই কে আবারো দু’চোখের ভেজা ডগায় অনুরোধ মেশানো গলায় বলে ওঠে, ” জানেন তালহা ভাই, দীর্ঘকাল ভালোবাসার পর বুঝলাম, বহুবছর ভালোবাসা যায়, তবে একসাথে থাকা যায় না!”
নাজহার কথাগুলো ক্ষত-বিক্ষত ভরসার মতো শোনালো তালহা ভাইয়ের কাছে। উনি কী বলবেন, কী বলার আছে উনার? কিছু ব্যথা যে শব্দহীন ভাবে ভেতরটা তছনছ করে দেয়। তালহা ভাই এবার নাজহার চোখে চোখ রেখে ম্লান সুরে বলেন, “নাজহা, তোকে কিভাবে বুঝাই, রাত আমারও হয়, কিন্তু ঘুম হয় না! যা নসিবে আছে তাই হবে।”
নসিবের কথা শুনে নাজহা ভরাডুবি, ক্লান্ত স্বরে ফিসফিস করে ওঠে, “মানলাম নসিবে যা আছে তাই পেয়ে যাবো বা হয়ে যাবে, কিন্তু ‘অন্তরে’ যে আপনি আছেন, তার কী হবে?”
তালহা ভাই আর কিছু বলতে পারেন না, শুধু ওকে বলেন, “এত আফসোস করিস না। সব শেষে আমরা পাই একটা অসহায় জীবন, যে জীবন নিয়ে আমাদের আফসোসের শেষ থাকে না। ভালোবাসতে চেষ্টা কর তৌসির ভাইকে। ভবিষ্যতে জীবন সুন্দর হবে।”
নাজহা নাছোড়বান্দা। ও আবারো উনার কথার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের কথা ধারণ করে, “আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসার ক্ষমতা কোনো দিন জন্মাবে না আমার। আমি এমন ভবিষ্যত চাইনি যেখানে, শূন্যতার শূন্যস্থানে আলোর বড়ই অভাব।”
নাজহা হয়তো আরও কিছু বলতে চাইছিল, ঠিক তখনই দরজার পাল্লা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে তৌসির। তৌসিরের হাতে খাবারের প্যাকেট। তৌসিরের উপস্থিতি টের পেয়ে তালহা ভাই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ান। নাজহার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসেন তিনি, কিন্তু সেই হাসিতে বিদায়ের করুণ সুর স্পষ্ট। ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন তিনি,
“আচ্ছা আমি গেলাম সকালে আসবো নাহয় আবার৷”
নাজহা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। তালহা ভাই চলে যাবেন? সত্যিই চলে যাবেন? বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠে তার। মুখ ফুটে যদি একবার বলতে পারতো তালহা ভাই থেকে যান না আরেকটু, শুধু একটু থেকে যান! কিন্তু আফসোস, নাজহার যে সেই সাধ্য নেই, বিন্দু পরিমাণও নেই। তাই বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাটাকে গিলে নিয়ে চোখ নামিয়ে নেশ সে। আলতো করে মাথা দুলিয়ে অভিমানে জড়ানো গলায় বলে,
“না আর আপনি কেন আসবেন? অচথা কষ্ট করার প্রয়োজন নেই তালহা ভাই। লাল চাচ্চু মোল্লা চাচ্চু ছোট চাচ্চু কে বলিও আসতে।”
তালহা ভাই অবুঝ নন, নাজহার কথাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা বড্ড অভিমানের ছোঁয়াটুকু তিনি ঠিকই পেলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি শুধু বলেন,
“আচ্ছা তাহলে ভাই গেলাম।”
নাজহা যান্ত্রিকের মতো মাথা নাড়ে, “আচ্ছা।”
যাওয়ার আগে তালহা ভাই তৌসিরের দিকে এগিয়ে এসে তৌসিরের কাঁধে হাত রেখে পরম বিশ্বাসে বলে ওঠেন,
“খেয়াল রাইখেন তৌসির ভাই ভারী আদরের আমাদের নাজহা। আর পারলে মাফ করে দিয়েন ওকে। জানি আপনি আগলেই রাখবেন তারপরও বলছি একটু আগলে রাইখেন ভালো খারাপের বুঝটা এখনো আসেনি।”
তৌসির তালহা ভাইয়ের কথায় উনার কাঁধে হাত রেখে ভরসা জোগিয়ে ভারী গলায় বলে,
“চিন্তা করিও না তালহা বোন তোমার অযত্নে থাকবে না।”
তৌসিরের চোখে নিরলস আস্থার ছাপ দেখে তালহা ভাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তৌসিরের মুখপানে চেয়ে বলেন,
“ভরসা করলাম। আসি।”
এ বলে তালহা ভাই যাওয়ার জন্য সামনে পা বাড়ান। অন্যদিকে তৌসির ধীর পায়ে নাজহার দিকে অগ্রসর হয়। তালহা ভাই দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যান, একবারের জন্যও আর পিছু ফিরেন না তাকালেই যে মায়া বাড়বে, পা আর চলতে চাইবে না।
রুমের ভেতর এখন পিনপতন নীরবতা। তৌসির নাজহার পাশে খাবারের প্যাকেটটা রাখে। তারপর শান্ত গলায় বলে,
“নুহমান স্যুপ এনে দিয়েছে খাবে?”
নাজহা তৌসিরের কথায় কোনো উত্তর দেয় না। সম্পূর্ণ নিরুত্তর থেকে এক অচেতন দৃষ্টিতে তৌসিরের দিকে কেবল তাকিয়ে রয়। নাজহার এমন ভাবলেশহীন চাওয়া দেখে তৌসির ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“কিতা লো এমনে তাকাস ক্যান?”
নাজহা দৃষ্টি না সরিয়েই সেই আগের মতো তাকিয়েই বলে,
“রাগ হয় না আপনার আমার উপরে? আমাকে এত যত্ন করছেন?”
তৌসিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে তাচ্ছিল্যের হাসি। সে বাঁকা হেসে বলে,
“না হয় না জানস তালুকদারের মাইয়া তোর বেলায় আমার কোনো রাগ ক্রোধ কাম করে না। আমার চোখে তুই মানেই নির্মুল।”
তৌসিরের কথায় নাজহা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে হাসল অল্পখানি। এই হাসিতে লুকিয়ে রইল বিষাদ, তীব্র এক বিষাদ। নাজহা হেসে বলে ওঠে,
“আপনার সব পাপ কবুল করে আমি যদি আপনায় মেনে নেই?”
নাজহার এই অতর্কিত কথায় তৌসির অভিভূত হয়ে নীরবতায় ডুবে যায়। চোখের পাতা ঝাপটাতেও ভুলে যায় সে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে এক বেখেয়ালি হাসি দিয়ে ব্যঙ্গ গলায় শোধাশ,
“আমার পাপ তুই কি কবুল করবি? তুই নিজেই তো নোবেল প্রাপ্ত গাদ্দার। আমার থেকে তো তোর পাপ বেশি।”
নাজহা জানত, তৌসিরের থেকে কখনোই, কোনোদিনও ভালো কিছু শোনার আশা করা বৃথা। তথাপি সে এই আশা করেছিল, তৌসিরের মনের আসল ভাবটা জানবে বলে। কিন্তু তা আর হলো কই? তৌসির উল্টো ওকে ভেটকিয়ে দিল। নাজহা আর কিছু বলল না, চুপচাপ মাথা নিচু করে নিল।
তৌসির ওকে মাথা নিচু করতে দেখে নিজেও নিজের ভুল জায়গায় রাশ টানলো। সত্য বলা জবানকে সামলিয়ে নিয়ে নাজহার দিকে ঝুঁকে গিয়ে। নাজহার শার্টটা সাবধানে সরিয়ে অপারেশনের সেলাইয়ের জায়গাটিতে গভীর মনোযোগে চোখ বোলালো আবারও। তৌসিরের এই বারবার দেখা কে দেখে নাজহা বিরক্তিকর গলায় বলে ওঠে ,
“এই আপনি বারবার আমার পেট দেখতেছেন কেন? লজ্জা করে না আপনার?”
তৌসিরের লাজ-লজ্জা বরাবরই কম। তাই নাজহার কথাটাও ও গায়ে না লাগিয়ে নাজহার ন্যায় সরল চোখে চেয়ে নির্লজ্জের মতো বলে,
“যে পেটে কয়দিন পর আমার টুনা বা টুনি বড় হইবো তার ন্যায় তাকাতে লজ্জা করব ক্যান লো ছিনাল আমার?”
নাজহা চরম বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ‘চ’ শব্দ বের করে বলে,
“সরুন তো আমার খিদে পেয়েছে খাব আমি।”
তৌসির সরলো না, জবাবে ওর দিকে আরেকটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বুনে,
“আমি যে খাবার আইনা দিলাম তার বদলে কিছু নেই।”
কথাগুলো শেষ করেই তৌসির আলতো হাতে নাজহার শার্টটা ঠিক করে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে সে সরে আসে একেবারে নাজহার মাথার কাছে। হুট করে তৌসিরের এমন বিপজ্জনক সান্নিধ্য আর ঘনিষ্ঠতা দেখে নাজহা সচকিত হয়ে ওঠে। ভুরু কুঁচকে বেশ সতর্ক গলায় সে জিজ্ঞেস করে,
“কি হলো?”
তৌসির ওর কথার কোনো উত্তর দেয় না। বরং আচমকা হাত বাড়িয়ে নাজহার থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে। নাজহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তৌসির মুখ নামিয়ে আনে তার দিকে অতঃপর তার গালে, ঠিক ঠোঁটের কিনারায় গভীরভাবে ঠোঁট ছোঁয়া সে। অপ্রত্যাশিত এই স্পর্শে নাজহা জমে যায়, নিজের অজান্তেই আবেশে ও ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলে। পরক্ষণেই নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলে উঠে,
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২১
“তৌসির ছাড়ুন কি করছেন টা কি।”
তৌসির আরো প্রগাঢ় ভাবে ওর গালে চুমু খেতে খেতে। ওর কথার উল্টো পিঠে অন্য একটা অদ্ভুত কথা শোধাশ, আর তা হলো
“জবানের ঠিক রাইখো তালুকদারের মাইয়া এইডার বহুত দাম।”
নাজহা বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। কী বলল তৌসির? কেন বলল? অদ্ভুত এক ঘোরলাগা চোখে নাজহা থমকে রয়।
