Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৯
সানজিদা আক্তার মুন্নী

নাজহা ছন্নছাড়া হয়ে বসে আছে বারান্দার এককোনায়। দরজার পাশের দেয়ালে মাথা ও পিঠ ঠেকিয়ে রেখেছে, তার নাক দিয়ে এখনো অল্প অল্প রক্ত গড়াচ্ছে। বিবিজান তাকে বেশ কয়েকটা থাপ্পড় মেরেছেন, সাথে লাথিও মেরেছেন। সে কিছু বলতে পারেনি, করতেও পারেনি। তৌসির একদৃষ্টে চেয়ে দেখেছিল সব, কিছু বলেনি সে। বিবিজান যে এত মার মারলেন, তারপরও কোনো বাক্য ব্যয় করেনি, চুপচাপ বেরিয়ে গিয়েছিল তখন রুম থেকে। তৌসির বের হয়ে যাওয়ার পর বিবিজান নাজহাকে আরো কয়েকটা লাথি মেরে কিছু বিশ্রী কথা শুনিয়ে চলে গেছেন।

নাজহার দোষেই সে আজ মার খেল। সে যদি একটু সতর্ক হয়ে কাজ করত, তাহলে এভাবে ধরা খেয়ে মরতে হতো না। সাদা একটা ড্রেস তার পরনে। সাদা ড্রেসের হাতগুলো লালচে হয়ে গেছে রক্ত মুছতে মুছতে। নাজহা হাত বাড়িয়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের বাবার নম্বরে কল দেয়। তিনি কল ধরতেই নাজহা কান্নায় ভেঙে পড়ে, “আব্বা… আব্বা, আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। এখান থেকে নিয়ে তোমরা যার কাছে বিয়ে দিবে তার কাছে চলে যাব। তুমি তো চাও ইকরাব ভাইয়ের কাছে যেতে? যাব, সত্যি বলছি যাব। আমার কিচ্ছু চাই না। আমি পারব না তোমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আমি পারব না। আব্বা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আব্বা ও আব্বা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। ও আব্বা, আমি এই জানোয়ারের সংসার করব না। আব্বা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আব্বা, আজ আমায় অনেক মেরেছে ঐ মহিলা। ও আব্বা, আমি না তোমার মেয়ে? নিয়া যাও না এখান থেকে। আমি বাঁচতে চাই আব্বা। ও আব্বা, একবার আমার কথাটা ভাবো না আব্বা… আব্বা… আব্বা…।”
এটুকু বলেই নাজহা শোকের ভারে বুক ফেটে আর্তনাদ উঠে বুকভাঙা ক্রন্দনে ভেঙে পড়ে সে। ছিদ্দিক সাহেব বুঝতে পারেন তার মেয়ে ধরা খেয়ে মার খেয়েছে আর এভাবে কাঁদছে। কিন্তু উনি তো এসব কান্নাকে প্রশ্রয় দেবেন না। একদমই না। তাই শান্ত গলায় বলেন, “আমি কিছু জানি না আম্মা। তুমি বলেছিলে তুমি যেভাবে পারো সেভাবে থাকবে।”

নিজের বাবার মুখ হতে এমন উত্তর শুনে নাজহার বুক ফেটে যায় কষ্টে তার হৃদয়টা ব্যথার ভারে বিদীর্ণ হয়ে যায়। সে কল কেটে এবার ভিডিও কল দেয়। ছিদ্দিক সাহেব ধরতেই উনাকে নিজের গাল, নাক দেখায়। দুই গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট লাল হয়ে ভাসছে। দেখিয়ে পাগলের মতো বলে, “আব্বা… আব্বা এই দেখো আমায় কিভাবে মেরেছে! তুমি এবার তো নিয়ে যাও?”
ছিদ্দিক সাহেব দেখেন। উনি দেখেন যে মেয়ের গায়ে একটা ফুলের টোকা, একটা কাঁটার আঁচড় লাগতে দেননি আজ সেই মেয়ের গাল রক্তে লাল। তারপরও বুকে পাথর বেঁধে তিনি বলেন, “আমি এখন কিছু করতে পারব না। তুমি কাজটা করেই আসো।”

নাজহা বাবার এমন কথা শুনে চিৎকার করে ওঠে, “তোমায় আল্লাহ বাপ কেন বানিয়েছেন? তুমি একটা স্বার্থপর! তুমি বাপ হওয়ার যোগ্য নও। আব্বা, যেখানে একটা বাবা নিজের সন্তানের জন্য নিজের কলিজা কেটে দেয়, সেখানে তুমি আমার সাথে এমন করছো? তুমি সত্যিই তো আমারই আব্বা? সত্যি তো? আমি তোমার আসল সন্তান তো?”
এ বলেই নাজহা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তার বুকের পাঁজর ভেঙে কান্না বেরিয়ে আসে সে কাঁদে চায় না তাও বেরিয়ে আসে, “তুমি… তুমি এত স্বার্থপর কেন আব্বা? ঐ মহিলা, মানে আমার মা, আমার জন্মদায়িনী নারী তাকে এতদিন আমি দোষ দিয়ে এসেছি যে তোমার সাথে কেন সে সংসার করলো না।

কিন্তু এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পেরেছি সে যা করেছে ভালো করেছে। খুব ভালো করেছে, নিজের জীবন বাঁচিয়েছে। তোমার মতো স্বার্থপরের সাথে কি করে সংসার করত সে? খুব ভালো করেছে। সে আমাকে কেন নিয়ে গেল না তার সাথে? আমার সাথে কেন এমন হলো? তুমি কিভাবে একটা মানুষরূপী জানোয়ারের কাছে সঁপে দিলে আমায়? তৌসিরকেও তো আমি দোষ দিতে পারি না, কারণ তার তো কোনো দোষ নেই। আমি তোমাদের কথায় বিয়েতে বসেছি। বলেছিলে আমি যখন বলব আমায় নিয়ে যাবে। তাহলে নিয়ে যাও, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও আব্বা… নিয়ে যাও না… আমি না এখানে থাকব না। আমার না দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি আর এসব করতে চাই না। আমি নিজের দিকে নিজে তাকাতে পারি না। ঘেন্না লাগে নিজেকে নিজের। আমাকে নিয়ে যাও। নিয়ে যাও আব্বা ও আব্বা।
এ বলে নাজহা হু হু করে বুক ফাটিয়ে কেঁদে ওঠে। ছিদ্দিক সাহেব ফোন কেটে দেন আর কিছু না বলে। বাবার এই স্বার্থপরতা দেখে নাজহা স্তব্ধ হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তৌসির নাজহার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সবকিছু শুনছে, দেখছে। বুকের ভেতর ঘা ধরে যাচ্ছে নাজহাকে এভাবে কাতরাতে দেখে। নাজহা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে, তখনি স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নাজহারের কল। নাজহা ঢোক গিলে কলটা ধরে। নাজহার ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে, নাজহাও নিজেকে সামলে সবকিছুর স্বাভাবিক উত্তর দেয়। কথায় কথায় নাজহার তাকে বলে, “নাজ, একটা কথা বলি? রাগ করবি না তো?”
“বল।”

নাজহার আমতা আমতা করে বলে, “নাজ, মম হসপিটালে। উনার এক্সিডেন্ট হয়েছে। উনি দু’দিন ধরে আমাকে বলছেন একটাবার যেন তোর সাথে কথা বলিয়ে দেই। বল না নাজ, একটিবার কথা।”
এ শুনে নাজহা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, “হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ল কেন উনার? মনে আছে আমার কথা? মনে ছিল উনার যে উনি কোনো একসময় দুটো সন্তান একসাথে পেটে ধরেছিলেন? নাকি এক্সিডেন্টের ধাক্কায় মনে পড়ল? কোনটারে ভাইয়া?”

নাজহার নিচু গলায় বলে, “বাদ দে, বল না কথা। মা তো।”
“তোর মা কিন্তু আমার না। পেট ধরলেই মা হওয়া যায় না।”
“নাজ, তোর কি আজ বেশি মন খারাপ? তোর সাথে কি কিছু হয়েছে? এভাবে কথা বলছিস যে?”
“না, তেমন কিছু না। তো তোর মায়ের কি অবস্থা এখন? বেশি গুরুতর এক্সিডেন্ট হয়েছিল নাকি?”
“এখন ভালো আছেন, কথাও বলতে পারছেন। অত গুরুতর না বললেও চলে, তবে চোট পেয়েছেন। গতকাল থেকে বারবার বলছেন তোর সাথে দু মিনিট কথা বলতে। বলবি কথা?”
“আমার সাথে হঠাৎ কেন কথা বলবেন? কে আমি? আমার জন্য এত দরদ উথলাচ্ছে কেন তোর মায়ের? আচ্ছা দে, বলি কথা। কি বলবেন শুনি।”

এটা শুনে নাজহার বিশ্বাস করতে পারে না, সত্যি রাজি হয়ে গেল ও? এতদিন পায়ে পড়েও রাজি করাতে পারেনি। এতকিছু না ভেবে নাজহার ফোন মায়ের হাতে দেয়। এতক্ষণ সব কথা মাও শুনছিলেন। নাওলা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে কানে লাগিয়ে ঠোঁট নাড়ান, “হ্যালো… ন… ন… নাজ?”
আজ এক যুগ পর মায়ের কণ্ঠ শুনল নাজহা। নাজহা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও। গলা দিয়ে কথা বের হয় না, শুধু কান্না বের হতে চায়। নাজহা নিজেকে অনেক কষ্টে কান্না দমিয়ে উচ্চারণ করে, “হ্যাঁ বলুন, কি বলবেন?”
নাওলা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন, “কেমন আছো? শ্বশুরবাড়িতে ভালো আছো তো?”
নাজহা আবারো ঢোক গিলে নিজেকে দমিয়ে উচ্চারণ করে, “ভালো থাকব বলেই তো আমাকে রেখে গিয়েছিলেন। তাহলে কেমন আছি জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনি কেমন আছেন? অবশ্য ভালোই থাকবেন। ভালো থাকার জন্যই তো গিয়েছিলেন। ভাইয়া বলল এক্সিডেন্ট হয়েছে নাকি? আপনার শরীর কি ফিট আছে? আগের মতো কি সুন্দর আছেন তো? চুলগুলো কি এখনো আগের মতো লম্বা আছে?”

মেয়ের বলা আর করা প্রশ্নে নাওলা ধরা গলায় বলেন, “হ্যাঁ আছে, আগের মতোই সুন্দর আছে!”
নাজহা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, “জানেন, আপনার এই সৌন্দর্যের ভাগিদার আমাকেও আল্লাহ বানিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে ভেবে কূল পাই না, আপনার মতো স্বার্থপরের মতো দেখতে কেন আমি হলাম? যাই হোক, অতীত টেনে লাভ নেই। আজ আপনার সাথে কথা বলছি একটা কারণে।”
“কী কারণে রে মা?”

“মা বলবেন না। আমি কারো মেয়ে নই, মাও নই। আমাকে মা বলে ডাকার অধিকার একমাত্র আমার বাপ-চাচার।”
নাওলা কাঁপা গলায় বলেন, “ভুলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।”
নাজহা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে, “আমাকে মাফ করে দিয়েন। আপনাকে এতদিন স্বার্থপর বলে এসেছি বলে মাফ করে দিয়েন ভুল বলার জন্য। কারণ আজ আমি বুঝতে পেরেছি আমার বাবার সংসার করা যায় না। আপনি না খুব ভালো করেছেন চলে গেছেন, খুব ভালো করেছেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে আপনি কোর্টে বলেছিলেন এমন নিকৃষ্ট মানুষদের সাথে আর যাইহোক সংসার হয় না, তাই আমি তার থেকে মুক্তি চাই। সেদিনের পর থেকে এই কথার জন্য আমি আপনায় প্রচন্ড ঘৃণা করতাম। তবে তবে আজ আমি বুঝতে পারছি সত্যি এমন মানুষদের সাথে সংসার হয় না। আপনি আমার বাবার মতো স্বার্থপরকে ছেড়ে উত্তম কাজ করেছেন।”

নাওলা মেয়ের কথায় বুঝতে পারেন উনার মেয়ে একদম ভালো নেই। নিশ্চয়ই তার সাথে কিছু হয়েছে। তিনি চাল খাটিয়ে প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, তোমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে কি কাজ করে?”
নাজহা হেসে বলে, “নিকৃষ্ট সব কাজই করে। ড্রাগস চালান করে, হয়তো নিজেও নেয়। নারীদেহ দিয়ে ব্যবসা করে, হয়তো নিজেও সেই নারীদের দেহের স্বাদ নেয়। মানুষ খুন করে, তাদের অর্গান পাচার করে। লুটপাট সব সবই সে করে। ভালো না? দেখুন কত ভালো জায়গায় আমার আব্বা, আমার নিজের আব্বা আমায় বিয়ে দিয়েছে।”
নাওলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কি শুনছেন তিনি? নাওলা উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করেন,
“স স… সে কি তোমাকে মারে? অযত্ন করে?”

“না তো, মারে না তো, অযত্নও করে না। তার কোনো দোষ নেই। আসলে দোষ সব আমার, আমিই দোষী। জানেন, আমাকে এখানে আমার বাপ-চাচা সংসার করতে পাঠায়নি। পাঠিয়েছে এই লোককে ঠকাতে। যদি না শুনি, তাহলে আমাকে ছোট দাদি বলেছে মেরে ফেলবে। আ… আমার না বাঁচার অনেক ইচ্ছে, অনেক ইচ্ছে। ত… তাই আমি এখানে এসেছি। এখানে এসে দেখি এরাই এখন আমাকে মেরে ফেলবে। আ… আপনার মনে আছে? ছোটবেলা থেকেই আঘাত পেলে, বেশি কাঁদলে আমার নাক দিয়ে ব্লিডিং হতো?”
নাওলা স্তব্ধ হয়ে উত্তর দেন, “হ্যাঁ আছে!”

“জানেন, আজও ব্লিডিং হয়েছিল প্রচুর। কিন্তু আগের মতো কেউ ঔষধ দেয়নি বা রক্তটা মুছে দেয়নি। আপনি না জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কেমন আছি? তাহলে শুনুন, আ… আমি… আমি না একটুও ভালো নেই। আমি না ভালো নেই। জানেন একটা কথা? আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছিল, সে প্রথম দিকে আমাকে আপন ভাবতো, আমার যত্ন নিত। হয়তো এগুলো অভিনয় করতো। কিন্তু জানেন, এখন সেও আমাকে দেখতে পারে না। তাই আমি বাড়ি যেতে চাই, কিন্তু আব্বা আমার আব্বা আমাকে আর বাড়ি নিবেন না। আমার এখানেই কুকুরের মতো পড়ে থেকে মরতে হবে। আচ্ছা, অনেক কথা বলে ফেললাম। ভালো থাকবেন আর মাফ করে দিয়েন এতদিন ভুল বোঝার জন্য আপনাকে। দোয়া করিয়েন যাতে মরণটা আমায় একটু আগেই দেখা দেয়। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের জীবন আর প্রাণে সয় না, বুঝলেন?”

এটা বলেই নাজহা ফোন কেটে দেয়। নাওলার হাত থেকে নাজহারের ফোনটা ধপাস করে পড়ে যায়। তিনি সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। উনার পাশেই উনার ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। নাওলা নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন, “ভাই রে! আমার মেয়েটাকে ওরা নরকে দিয়ে দিয়েছে। তুই তোর গ্যাং-এর কাউকে পাঠিয়ে ওকে যেকোনো ভাবে এখানে নিয়ে আয়।”
উনার ভাই চোখ-মুখ শক্ত করে শান্ত গলায় বলেন, “আমি তো কবেই বলেছিলাম নিয়ে আসতে, তুমিই তো রাজি হওনি। আমার ছেলে লুসিয়ানকে বলব?”
“বল, ওকে বল নিজে গিয়ে নিয়ে আসতে।”
“আচ্ছা।”
নাজহা ফোনটা পাশে রেখে হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিতে নিতে ফুঁপিয়ে বলে, “আল্লাহ আমায় মা দিল, কিন্তু তার ভালোবাসা দিল না। আমার মা কেন আমায় ভালোবাসল না? আমার মা কেন তার সাথে নিয়ে গেল না? আমি মেয়ে তাই নিয়ে গেল না?”

তৌসির এতক্ষণ দাঁড়িয়ে সবকিছু স্পষ্ট শুনছিল। কি বলবে এখন সে? আর কি করবে? কিছু বোঝার ক্ষমতা তার নেই। তৌসির তপ্ত শ্বাস ছেড়ে নাজহার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নাজহা তৌসিরকে দেখে মুখ তুলে তাকায়। তৌসিরকে হঠাৎ দেখে ভড়কে যায়। তৌসির ওর সব কথা শুনে নেয়নি তো? নাহ, শোনেনি হয়তো। কিভাবে শুনবে? নাজহা পেছনে কিছুটা সরে যায়। তৌসির নাজহার তাকানো দেখে কিছু বলে না, চুপচাপ তার দিকে ঝুঁকে যায় তাকে কোলে নিতে। তৌসিরের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে নাজহা সে যে এখন নাজহাকে কোলে নিবে, তারপর নিয়ে মিথ্যা প্রেম দেখাবে! নাজহা নিজেই ধীরে ধীরে উঠে যায় দেয়ালে হাত দিয়ে। অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকায় কোমরে ধরে গেছে, পা ঝিনঝিন করছে। দাঁত পিষে উঠে দাঁড়ায়।
তৌসির নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নাজহাকে বলে, “আমি কোলে নেই?”

নাজহা তৌসিরের দিকে তাকায়, তবে কঠোর দৃষ্টিতে নয়, নিরলস চাহনি নিয়ে। মেকি হেসে স্বাভাবিক গলায় বলে, “না। না, নিতে হবে না। আমি হাঁটি। পা ধরে গেছে, না হাঁটলে ঠিক হবে না।”
তৌসির নাজহার এই সহজ উত্তর আশা করেনি। নাজহার এই সহজ আচরণ তৌসিরের হজম হলো না। আচ্ছা, নাজহা কি তার উপর কোনো রাগ করেনি? কোনোপ্রকার রাগ-ক্ষোভ যে সে ঝাড়ছে না! হয়তো বাবার স্বার্থপরিতার জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। তৌসির নাজহার গালের দিকে তাকাতে পারছে না, কষ্ট হচ্ছে। বুকটা মুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। নাজহার তুলোর মতো ফর্সা গালগুলোতে বিবিজানের আঙ্গুলের দাগ বসে গেছে। নাক দিয়ে পড়া রক্ত কপালে, গালে, ঠোঁটে, ঠোঁটের কিনরায় লেগে আছে। ড্রেসের হাতায়, সাদা ওড়নায় রক্তের ছোপ ছোপ দাগও স্পষ্ট। তার মানে অনেক রক্ত বেরিয়েছে। তৌসিরের নিজের উপর রাগ হচ্ছে। কেন যে সে রাগ করে বাইরে গেল? কি জন্য যে গেল? বিবিজান ইচ্ছে মতো মেরেছেন। কিভাবে তিনি এতটা নির্দয় হলেন? অবশ্য নাজহা যে কান্ড ঘটিয়েছে, এতে রাগ হওয়ারই কথা।

তৌসির নাজহার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে সামনে পা বাড়ায়। নাজহা চুপচাপ রোবটের মতো সামনে এগোতে থাকে। তৌসির নাজহাকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়। তারপর বলে, “তুমি বসো, আমি টাওয়াল ভিজিয়ে নিয়ে আসি।”
নাজহা মাথা নাড়ায়। তৌসির তাড়াতাড়ি গিয়ে ওয়াশরুম থেকে ছোট্ট টাওয়াল ভিজিয়ে নিয়ে এসে নাজহার পাশে বসে। হাত বাড়িয়ে নাজহার মুখ মুছে দিতে চায়, কিন্তু নাজহা মুখ তুলে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে আবারো মেকি হেসে বলে, “আমি মুছে নিচ্ছি।”

এটা বলে তৌসিরের হাত থেকে নাজহা টাওয়ালটা নিয়ে নাক-মুখ মুছে নেয়। তারপর গলায়, হাতে লেগে থাকা রক্ত মুছে নেয়। তৌসির নাজহার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে পলকহীন চোখে। কি হলো হঠাৎ? কেন করছে নাজহা এই ব্যবহার? সে কেন রাগ দেখাচ্ছে না? সে কেন এত শান্ত আজ? বেশি কষ্ট দিয়ে দিয়েছেন কি ওকে বিবিজান? তৌসির খাটপাসের উপর থেকে ভেসলিনের কৌটা নিয়ে খোলে আঙ্গুলের ডগায় নিতে চায়, তবে তার আগেই নাজহা তার আঙ্গুল দিয়ে নিয়ে বলে, “আমার হাত দিয়ে লাগাই।”
এ বলে মুখে ভেসলিন লাগিয়ে নেয়। তৌসির এমন আচরণে আর চুপ থাকে না। এবার সে নাজহার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে, “আমাকে মাফ করে দাও। আমি সত্যি জানতাম না তোমার এই অবস্থা করে দিবে বিবিজান।”

তৌসিরের এই কথায় নাজহা মুচকি হেসে বলে, “আর জানলে কি করতেন?”
তৌসির নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “জানলে কখনোই রুম থেকে বের হতাম না।”
“মিথ্যা বলছেন কেন? আমাকে মার খাওয়াতেই তো নিজের বিবিজানকে নিয়ে ঘরে এসেছিলেন। আর মাফ আমার চাওয়ার কথা, আপনার তো না। আপনি কেন মাফ চাইছেন?”

এটা বলে নাজহা মুচকি হেসে নিজের হাত তৌসিরের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়। তৌসির নাজহার এই কথায় স্পষ্ট বুঝতে পারে নাজহা মনে করছে তৌসির ইচ্ছে করে তাকে মার খাইয়েছে। নাজহা চুপচাপ উঠে যায় বিছানা থেকে আর বলে, “অতীত হয়ে গেছে। এগুলো ভুলে যান। কথা বাড়ালে কথা বাড়বে, বাদ দিন তো।”
নাজহা উঠে চলে যেতে নেয়। তৌসির দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। নাহ, ভুল ভাঙাতে হবে। এই মেয়ে তাকে সাংঘাতিক ভুল বুঝেছে। তৌসির ঝাপটে নাজহাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আর বলে, “না না, তুমি যা ভাবছো তা না। ভুল বুঝছো আমায়। আমি এমন কিছু চাইনি। কৈতরি গো ও কৈতরি, বিশ্বাস করো আমি কল্পনায়ও ভাবি নাই। মাফ করে দাও, তোমার পায়ে পড়ি মাফ করে দাও।”

তৌসিরের এই আকুতি নাজহার কাছে নিতান্তই অভিনয় মনে হয়। তৌসির নাজহাকে নিজ দিকে ঘুরিয়ে নাজহার দুই গালে হাত রেখে তার আঘাতপ্রাপ্ত গালে অজস্রবার চুমু খেতে থাকে আর বলে, “এই গালের আঘাতগুলো তো শুধু তোমার গালে, কিন্তু ক্ষত তো আমার অন্তরে। মাফ করে দাও এই নিকৃষ্ট আমায়, একটু দয়া করে মাফ করে দাও না।”

নাজহা মুচকি হেসে বলে, “বাদ দিন না। যা হয়েছে তো হয়েছে, দোষটা আমারই।”
তৌসির এ বলে নাজহাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলে, “নাহ, দোষ তোমার না। সব দোষ আমার। প্রিয়তমাদের আবার দোষ হয় নাকি?”
নাজহা দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত চেপে বলে, “তৌসির আমায় ছাড়ুন, আমার শরীর জ্বলতেছে।”
তৌসির এটা শুনে তাড়াতাড়ি নাজহাকে ছেড়ে দিয়ে ওর দুই বাহুতে হাত রেখে হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোমায় শরীরেও আঘাত করেছে?”

নাজহা তৌসিরের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে, “জ্বলতেছে শরীরে আপনার ছোঁয়ায় জ্বলতেছে। দয়া করে একটু কৃপা করুন, আমার থেকে দূরে থাকুন।”
তৌসির নাজহার এ কথায় কিছুটা স্বস্তি পায়। যাক, অবশেষে সে একটু স্বাভাবিক হচ্ছে। তৌসির নাজহার হাত টেনে ধরে তাকে আবারো বুকে টেনে নিতে নিতে বলে, “মাফ করে দাও না। ভুল হয়ে গেছে, ভুল তো হয়ই। আমি আর এমন পাপ করব না। মাফ করে দাও।”

এটা বলে শক্ত করে তৌসির নাজহাকে জড়িয়ে ধরে। আজ জীবনের প্রথম তার কোনো অপরাধ করার এত অনুশোচনা হচ্ছে। নাজহা চিৎকার করে ওঠে, “তৌসির, আপনাকে আমার মস্তিষ্ক চাইলেও অন্তর থেকে কখনো মাফ করব না। আপনি দয়া করে আপনার এই মিথ্যা প্রেম ঢালা বন্ধ করুন। একটু রেহাই দিন না। ভুল করে নিয়েছি আমি ভুল। প্রয়োজনে এবার আপনিও মারুন। আপনার বিবিজান আমাকে থাপ্পড় লাথি মেরেছে, আপনি প্রয়োজন পড়লে বেল্ট দিয়ে মারুন। ছুরি দিয়ে হাত-পা কেটে দিন, জিভ কেটে দিন। তারপরও এই নাটক বন্ধ করুন। আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধ করুন।”

এটা বলে নাজহা ঢোক গিলে। কান্না আসছে। নাহ, সে কাঁদবে না। একটুও কাঁদবে না এই মানুষের সামনে। চোখের পানি সে ফেলতেই পারে না।
তৌসির নাজহাকে ছেড়ে দিয়ে তাকে নিয়ে বিছানায় বসে আর বলে, “তুই একটা অমানুষ, তালুকদারের মাইয়া। তোর ভেতরে জ্ঞান খুব কম। তুই এক তো গাদ্দারি করে ধরা পড়েছিস, তারউপর আমি মানাতে চাচ্ছি, আর তুই আমার উপর রাগ ঝাড়ছিস?”

এ বলে নাজহার হাত ধরতে চায় তৌসির। নাজহা নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলে, “আমি কি বলেছি আমাকে মানান? না তো, বলিনি তো। হ্যাঁ আমি গাদ্দার, আমি খারাপ, বিশ্বাসঘাতক। আমি না সাথে বড্ড স্বার্থপরও। আমার সাথে কেন এমন নাটক করছেন শুনি? আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না তৌসির। আমি আর আপনায় বিশ্বাস করি না।”
এটা বলে নাজহা তৌসিরের দিকে তাকায়। তার চোখের কোণ বেয়ে পড়ে এক ফোঁটা নোনাপানি। তৌসির নাজহার কথায় বিদারক এক হাসি টেনে ধরে বলে, “অথচ তুমি বারবার আমার বিশ্বাস ভাঙ্গার পরও তোমারে আমি এখনো বিশ্বাস করি।”

নাজহার চোখের কোণ বেয়ে পড়া নোনা জলটুকু মুছে দিতে দিতে তৌসির বড্ড অসহায় সুরে তাকে বলে, “তোমাকে আমি সর্বদাই অন্তরের খুব কাছে রেখেছি। তাই প্রতিদানে তোমার দেওয়া ঘৃণা, ছলনা আর এই নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমি তোমার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।”
নাজহা তৌসিরের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আর বলে, “আমি আপনার এসব কথা বিশ্বাস করি না।”
এটা বলেই সে ওয়ারড্রবের দিকে গিয়ে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। তৌসির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বসে থাকে। কি হবে তার আর নাজহার এই সম্পর্কের? সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। বিবিজান এত নিমকহারামি কিভাবে করলেন? সে একদিন উনাকে বলেছিল যাই হয়ে যাক আমার মৃত্যু হয়ে গেলেও আমার নাজহা কে কিছু তুমি করো না। আজ কি করে দিয়েছেন ওর গালের অবস্থা তিনি।

বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে পা রাখতেই ওয়াসেমের চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়ে তার। কারণ, সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তৃষ্ণা তার স্ত্রী। অবশ্য ‘স্ত্রী’ কেবল নামেই। ওয়াসেম তাকে মনে-প্রাণে স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করে। ​বছরখানেক আগে তার বাবা এমএলএ ইব্রাহিম পাটোয়ারী আর মা সিতুজা পাটোয়ারী জোর করে তাদের বিয়ে দিয়েছিলেন। ওয়াসেম বরাবরই বিয়ে-সংসার বিষয়গুলোকে ঘৃণা করে। তার মতে, এসব তার জন্য নয়। সে এসবের অযোগ্য। তাই গত এক বছর ধরে এক ছাদের নিচে থেকেও তারা দুই গ্রহের বাসিন্দা। ভালোবাসার স্পর্শ তো দূর, স্ত্রীর নূন্যতম অধিকারটুকুও সে তৃষ্ণাকে দেয়নি।

​স্বামীর এমন অবহেলা সত্ত্বেও তৃষ্ণা স্ত্রীর সব দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে ঠিকই। ওয়াসেমের করা শত অপমান সহ্য করে সে ‘বেহায়া’র মতো পড়ে আছে এ বাড়িতে। থাকবেই তো এছাড়া তার যাওয়ার জায়গাই বা কোথায়? মা-হীন এতিম মেয়েটি সৎ মায়ের সংসারে অনাদরে বড় হয়েছে। কত মারধর, কত অত্যাচার সহ্য করেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এখন ফিরে গেলে সৎ মা তাকে ঘরেই তুলবে না। তার চেয়ে এই পাটোয়ারী বাড়ি অনেক ভালো। ওয়াসেম ছাড়া বাড়ির বাকি সবাই তাকে যথাযথ সম্মান দেয়। স্বামীর ভালোবাসা না থাক, অন্তত তিনবেলা পেট ভরে খাওয়া আর পড়াশোনাটা তো শান্তিতে করতে পারছে। এটাই বা কম কী?​ওয়াসেমকে দেখামাত্রই তৃষ্ণা মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। কিন্তু ওয়াসেম তাকে যেতে দেয় না। খপ করে হাত চেপে ধরো তার। হ্যাঁচকা টানে দরজার পাশের দেয়ালে তাকে চেপে ধরে সে। দুই হাতে তৃষ্ণাকে বন্দি করে হিসহিস করে বলে ,
“তুই কবে যাবি এখান থেকে? যা না সরে যা আমার জীবন থেকে!”
​তৃষ্ণা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। এভাবে দেয়ালের সাথে চেপে ধরায় তার খুব কষ্ট হচ্ছে। তার ওপর ওয়াসেমের গা থেকে ভেসে আসছে রক্ত আর মদের তীব্র দুর্গন্ধ। সে দৃষ্টি নিচু করে নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে,

“আহ্! আমাকে ছেড়ে দিন লাগছে আমার।”
​তৃষ্ণার কথায় ওয়াসেম উল্টো ধমকে ওঠে , “আমার দিকে তাকা তৃষ্ণা!”
​ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকায় তৃষ্ণা। ওয়াসেমের চোখে চোখ পড়তেই সে আবার তৃষ্ণার ন্যায় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, “এত গালাগালি দেই, মারধর করি, এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি তবুও তুই পড়ে আছিস কেন এখানে?”
​ওয়াসেম সব জানে, তার অসহায়ত্ব সম্পর্কে সে অবগত; তবুও বারবার একই প্রশ্ন করে তৃষ্ণাকে ক্ষতবিক্ষত করে। অন্যদিন চুপ থাকলেও আজ আর চুপ থাকে না তৃষ্ণা। ওয়াসেমের চোখের দিকে তাকিয়ে নিদারুণ এক অসহায় সত্য উগড়ে দিয়ে অসহায় গলায় বলে,

“শান্তিতে দু-মুঠো ভাত খাওয়ার লোভে।”
​হ্যাঁ, এটাই রূঢ় সত্য। শুধু মাএ দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের লোভেই সে এখানে পড়ে আছে। ক্ষুধার যন্ত্রণা তৃষ্ণার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? বিয়ের আগে খুব কম সময়ই তার কপালে ভালো খাবার জুটত। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর তার পাতে আসত বাসী ভাত, নয়তো আগের দিনের পান্তা। সেই ভাতটুকু খেতে বসেও তাকে শুনতে হতো বাবা আর সৎ মায়ের লাথি-ঝাঁটা আর অকথ্য গালিগালাজ।সেই নরক থেকে এই জীবনটা তো তৃষ্ণার কাছে রাজপ্রাসাদ। এখানে মার খেতে হয় না, শান্তিতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত খাওয়া যায়, গায়ে অন্তত ভদ্রস্থ কাপড় রাখা যায়। তৃষ্ণা বড় লোভী হ্যাঁ, ভীষণ লোভী সে। তবে তার লোভ সোনা-দানা বা টাকার জন্য নয় তার লোভ একটু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, একটু গরম ভাতের।

​এই লোভের কী ভয়ংকর শাস্তি সে পেয়েছে, তা মনে পড়লে আজও তার আত্মা কেঁপে ওঠে। একদিন পেটের তীব্র জ্বালায় সহ্য করতে না পেরে চুলা থেকে নামানো গরম ভাত আর তরকারি লুকিয়ে খেয়েছিল সে। কিন্তু পোড়া কপাল তার, সৎ মায়ের চোখে সেটা ধরা পড়ে যায়।
​গরম ভাত খাওয়ার ‘অপরাধে’ সেদিন সৎ মা নয় বছর বয়সী ছোট্ট তৃষ্ণার কোমল মুখের ভেতর ইটের ছোট ছোট টুকরো ঢুকিয়ে দিয়ে, মাটিতে ফেলে গলায় পাড়া দিয়ে তার গালে একের পর এক থাপ্পড় মেরেছিল। মুখের ভেতর নরম ভাতের বদলে তখন ছিল ইটের ধারালো কুচি। ইটের ঘষায় আর থাপ্পড়ের চোটে মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে বুক ভেসে গিয়েছিল।

​সেদিন সেই পৈশাচিক আঘাতে তার মুখ এতটাই ফুলে গিয়েছিল যে, পরের দুদিন ভাত তো দূরের কথা, গলার কাছে জমে থাকা থুতুটুকুও সে গিলতে পারেনি। তৃষ্ণা যদি জানত, এক বেলা গরম ভাতের দাম এতটা রক্ত দিয়ে শোধ করতে হবে, তবে সে জীবনেও ওই ভাতে হাত দিত না। সেই বিভীষিকার পর বাবার বাড়িতে সে আর কোনোদিন গরম ভাত খায়নি। তাই আজ এই সংসারে পড়ে থাকা শুধু একমুঠো গরম ভাতের আশায়, যেখানে ভাতের গ্রাসে রক্ত মিশে থাকে না।

ওয়াসেম তৃষ্ণাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। হঠাৎ সে তৃষ্ণার চুলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে মুঠি শক্ত করে ধরে এবং তাকে নিজের খুব কাছে টেনে আনে আর কঠিন গলায় বলে, “তুই এ বাড়িতে থাক, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা। তোকে দেখলেই আমার রাগ উঠে।”
তৃষ্ণা ব্যথা পায়, তাও কোনো প্রকার কষ্ট প্রকাশ না করে শান্ত গলায় বলে, “আপনার মাকে বলুন না। আপনার ঘর থেকে আমি তো যেতেই চাই, কিন্তু মা তো রাজি হন না। আমি কী ভুল করেছি? কেন আপনি আমাকে এতটা ঘৃণা করেন?”

কথার উত্তরে ওয়াসেম তৃষ্ণার চুল ছেড়ে দিয়ে তাকে সজোরে দেয়ালে ধাক্কা দিয়ে হুকুমের সুরে বলে, “যা, আমার জন্য ভাত নিয়ে আয়।”
তৃষ্ণা মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পায়। তবুও কোনো শব্দ না করে চুপচাপ ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ওয়াসেম তৃষ্ণার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, “কেন যে তোকে আমি দেখতে পারি না, তা আমি নিজেও জানি না। তুই সামনে থাকলে রাগ হয়, আবার না থাকলেও কষ্ট হয়। তুই একটা বিষাক্ত রোগ রে শালী!”
এসব বলতে বলতে ওয়াসেম গোসল করতে ওয়াশরুমে ঢোকে। ওয়াশরুমে আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে সে দাড়িতে হাত বোলায়। নিজের প্রতিবিম্বের সাথে কথা বলতে বলতে সে ভাবে, “ওয়াসেম, তোর ভাই তো তোরই জেরক্স কপি। সে তো আসবে। ওকে একটু কনফিউশনে ফেলবি না? দাড়িটা কি কেটে ফেলবি? নাহ, কাটব না। এখন না, আগে ও আসুক তারপর দেখা যাবে।”

তৃষ্ণা রান্নাঘরে গিয়ে ওয়াসেমের জন্য খাবার প্লেটে বাড়াতে থাকে। সিতুজা বেগম তৃষ্ণার দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারেন যে, তার গুণধর ছেলে মেয়েটির ওপর অত্যাচার করেছে। তিনি সব বুঝেও কিছু বলেন না, শুধু তৃষ্ণার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যান।
তৃষ্ণা খাবার নিয়ে রুমে আসে এবং প্লেটটি বিছানার ওপর রাখে। ঠিক তখনই ওয়াসেমের গালি তার কানে আসে, “এই তৃষ্ণা! কুত্তার বাচ্চা, তুই কই? এতক্ষণ ধরে ডাকছি, জবাব দিস না কেন? আমার লুঙ্গি আর আন্ডারপ্যান্ট দে।”
তৃষ্ণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলনা থেকে কাপড় আর গামছা নিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় টোকা দেয়। সে বলে, “এই নিন।”
ওয়াসেম দরজা সামান্য খুলে মাথা বের করে এবং তৃষ্ণার হাত থেকে কাপড় নিতে নিতে ধমক দেয়, “কোথায় গিয়ে মরেছিলি? এতক্ষণ ধরে ডাকছি, জবাব নেই কেন?”

কথাটা বলেই ওয়াসেম ভেজা মাথায় ঝাঁকুনি দেয়। তার দাড়ি আর চুলে লেগে থাকা পানি ছিটকে এসে পড়ে তৃষ্ণার চোখে-মুখে। তৃষ্ণা কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে, “আ আমি খাবার আনতে গিয়েছিলাম।”
ওয়াসেম আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে বেরিয়ে আসে। এসে দেখে তৃষ্ণা সোফার সামনের টি-টেবিলে খাবার সাজিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। ওয়াসেমকে আসতে দেখেই সে সরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।ওয়াসেম সোফায় বসতে বসতে কড়া গলায় বলে, “রুমের বাইরে এক পা-ও ফেলবি না। ফেললে পা কেটে ফেলব।”
তৃষ্ণা ভয়ে ভয়ে বলে, “আপনার ভেজা কাপড়গুলো ধুয়ে দিতাম।”
ওয়াসেম ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়, “আমি খাচ্ছি। তুই গামছা দিয়ে আমার চুল আর দাড়ি মুছে দে। আমি বেরিয়ে যাব, তারপর যা ইচ্ছে করিস।”

ওয়াসেমের হুকুম শোনামাত্র তৃষ্ণা নিঃশব্দে সোফার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওয়াসেমের কাঁধ থেকে গামছা তুলে নিজের হাতে নিয়ে আলতো ছোঁয়ায় সে ওয়াসেমের ভেজা চুল আর দাড়ি মুছিয়ে দিতে থাকে। তৃষ্ণার এই পাথর-চাপা নীরবতা ওয়াসেমের অসহ্য লাগে। কেন মেয়েটা প্রতিবাদ করে না? ওয়াসেম অকারণে এত রাগ দেখায়, গায়ে হাত তোলে, মুখভর্তি গালাগাল দেয় তবুও তৃষ্ণার ঠোঁট থেকে একটা টুঁ শব্দও বের হয় না। ওর এই মেনে নেওয়াটাই ওয়াসেমের পৌরুষে আঘাত করে।

ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে তুলতে ওয়াসেমের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে তীব্র ঘৃণা, “তৃষ্ণা, তুই একটা আস্ত বেহায়া। রাস্তার একটা কুকুরের চেয়েও তুই নিকৃষ্ট। মানুষের চামড়া এত মোটা হয় কী করে? এত নির্লজ্জ কেন তুই?”
এ শুনে তৃষ্ণার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক ম্লান, প্রাণহীন হাসি এই হাসি। তৃষ্ণা নিরলসভাবে বলে, “আমি এমনই। ঠিক ওই রাস্তার কুকুরের মতোই।”
কথাটা তৃষ্ণা খুব গা-ছাড়া ভাবে বললেও, ওয়াসেম জানে না তার এই নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত তীরগুলো তৃষ্ণার হৃদপিণ্ডটাকে কীভাবে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। সেই অদৃশ্য রক্তক্ষরণ দেখার চোখ ওয়াসেমের নেই।
চুল মোছা শেষ হলে ওয়াসেম আদেশ করে, “চুলগুলো টেনে দে এবার। আর শোন, তুই আসলে কুকুরও না। কারণ কুকুরকে কয়েকবার তাড়িয়ে দিলে সে আর ফিরে আসে না। আত্মসম্মান থাকে তার। কিন্তু তোকে তাড়াতে তাড়াতে আমি ক্লান্ত, তবু তুই যাস না।”

ওয়াসেমের চুলে আঙুল চালাতে চালাতে তৃষ্ণা খুব ধীর গলায় বলে, “যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বলেই তো পড়ে আছি। আমি কবে যাব, সেই চিন্তা না করে বরং একটু কষ্ট করে আমার মৃত্যু কামনা করুন। দোয়া করুন যেন দ্রুত মরে গিয়ে আপনাকে এই ‘বোঝা’ থেকে মুক্তি দিতে পারি।”
তৃষ্ণার মুখে মৃত্যুর কথা শুনে ওয়াসেমের চিবানো থেমে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকায় তৃষ্ণার চোখের দিকে সেখানে শুধুই শূন্যতা দেখতে পায় সে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে আবার ভাত মুখে নিয়ে বলে, “তুই মরলে তোর জানাজায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তোর মতো একটা বেহায়ার জানাজা পড়ার রুচিও আমার নেই।”

তৃষ্ণা এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে থাকে এক আকাশ অভিমান তাচ্ছিল্যের সুরে তৃষ্ণা ধারণ করে, “কুকুরের আবার জানাজা হয় নাকি? আমি তো কুকুর, আমার জানাজা কে পড়বে? তবে দেখে নেবেন, একদিন ঠিকই আমি হারিয়ে যাব। আপনার মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে দিয়ে। সেদিন আর এই বেহায়া, লোভী মেয়েটাকে দেখতে হবে না। আপনার রাগও পুষতে হবে না। সেদিন হবে আপনার জীবনের পরম শান্তি আর স্বস্তির দিন।”

তৃষ্ণার কথায় ওয়াসেম কেমন স্তব্ধ হয়ে যায়। ভাতের নলা আর গলা দিয়ে নামতে চায় না তাও সে জোর করে মুখে হাসি এনে প্রশ্ন করে, “সেদিনটা কবে আসবে?”
তৃষ্ণা সামনের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে, “হয়তো অতি শীঘ্রই। ঠিক বলতে পারছি না, তবে সামনের এমন দিনটায় আমি আর আপনার সাথে থাকব না, এটুকু বলতে পারি।”
ওয়াসেমের হাত এবার পুরোপুরি থেমে যায়। প্লেটের ভাত প্লেটেই পড়ে থাকে। সে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে শঙ্কিত গলায় প্রশ্ন করে, “কোথায় যাবি তুই?”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৮

তৃষ্ণা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই উত্তর দেয়, “হয়তো মরে যাব, নয়তো কোথাও হারিয়ে যাব।”
“কোথায় যাবি? টাকা আছে তোর কাছে?”
“হ্যাঁ, আছে তো! বিষ কেনার টাকা আছে। ওতেই আমার হয়ে যাবে।”
ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে ওয়াসেম বলে, “আমি যদি তোকে যেতে না দেই?”
তৃষ্ণা ম্লান হেসে বলে, “যেদিন আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে, যেদিন ওপরওয়ালার পক্ষ হতে ডাক পড়বে সেদিন পৃথিবীর কেউ আটকাতে পারবে না। আমি চলে যাবই। সাথে আপনার সব বিরক্তির কারণও চিরতরে মিটে যাবে।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩০