Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৮

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৮

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৮
সানজিদা আক্তার মুন্নী

তৌসির নাজহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলে, “কী হইলো? এমনে কাঁপতাছো ক্যান তুমি?”
নাজহা জোরে শ্বাস ছেড়ে শক্ত হয়ে বলে, “আজব! আমি কাঁপব কেন? আপনি এত জোরে সামান্য ফোনের জন্য চিল্লালেন, তাই।”

তৌসির ফোনটা ভালোভাবে দেখে নেয়। সাইড বাটনেও ক্লিক করে দেখে, নাহ্, ঠিক আছে, কিছু হয়নি। এই নিয়ে সাতাশবার পড়ল হাত থেকে এতবার পড়েও ঠিক আছে। তৌসির নাযেম চাচার নাম্বারে কল দিয়ে সামনে পা বাড়ায় বাইরে যাওয়ার জন্য। নাজহা তৌসিরকে যেতে দেখেই কিছু না ভেবে পিছন থেকে তৌসিরের হাত ধরে আটকে নেয়। নাজহার হঠাৎ এমন আচরণ দেখে তৌসির থমকে যায়, বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে।
তৌসির ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। নাজহার হাতে ধরা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে, “কী হইলো?”
নাজহা নিজের বোকামিতে নিজেই অতিষ্ঠ ও হকচকিয়ে তৌসিরের হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, “না না না, কিছু না। এমনি।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

তৌসির এ শুনে আড়চোখে নাজহার দিকে একপলক তাকিয়ে সামনে ফিরে হাঁটা ধরে। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কিনারায় এক চিলতে মিঠে হাসি ফুটে ওঠে। এরিমধ্যে নাযেম চাচা ফোন ধরেন। তৌসির বলে, “রুদ্র কিসের লাইগা কল দিছে ক!” এটা বলতে বলতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
নাজহার জান ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। যদিও যে কিলারটাকে তার বাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছে তাকে নিজের পরিচয় বলা হয়নি, তারপরও ভয়ে জান-প্রাণ ওষ্ঠাগত। তৌসির কোথায় যাচ্ছে সেটা দেখতে নাজহা বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। এদিকে তৌসির করিডোরে যেতেই নাযেম চাচা ওকে বলেন, “তুই আর আসিস না। এই রুদ্র বাইন**দ কখন কোন বাল মারাইবো বুঝে না। তুই রেস্ট নে বাপ।”

তৌসির চাচার কথায় আশ্বস্ত হয়ে আবারো ঘরে ফিরে আসে। ঘরে এসে দেখে নাজহা নেই, মিনিটের মধ্যে সে বারান্দায় চলে গেছে। তৌসির বারান্দার দিকে যেতে যেতে বলে, “আমার ছিনাল খালি বেলকনিতে যায়। কবে না কোন জিন ভর করায় নিজের ঘাড়ে! ”
বারান্দায় গিয়ে দেখে নাজহা রেলিংয়ে হাত রেখে মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। তৌসির ধীরপায়ে নাজহার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তার কাঁধে হাত রাখে। আকস্মিক এমন হওয়ায় নাজহা ভয়ে লাফ দিয়ে পিছনে ফিরে তৌসিরকে দেখে বিস্ময়ের চরমে পৌঁছায়। তৌসির বাইরে গেল আবার চলেও আসলো এত তাড়াতাড়ি? নাজহার মাথায় হঠাৎই রাগ চড়ে যায়। কেন চড়ে, কী জন্য চড়ে যায় বুঝে পায় না সে।
সে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে, “আমাকে কথায় কথায় ছোঁয়া ছাড়া থাকতে পারেন না? বিষ লাগে আপনার এই ছোঁয়া, বললে শুনেন না?”

তৌসির নাজহার এমন আচরণে স্তব্ধ। এই একটু আগেও তো কত ভালো আচরণ করছিল, আর এখন রূপ-রঙ পাল্টে গেল? তৌসির তিক্ত সুরে বলে, “ইচ্ছাধারী নাগিন তোরে আমি সাধে কই আর? তুই তো আস্ত একটা রং বদলানো গিরগিটি।”
নাজহা তৌসিরের কথার জবাবে চিৎকার করে ওঠে, “হ্যাঁ তো? আমি যা আমি তাই। কাছে আসার ফন্দি আঁটছেন, তাই না? এই যে এতক্ষণ ধরে এত রং-ঢং, সব আমাকে ভোগ করার ধান্দা, তাই না? আজ তো নিজের নিকৃষ্ট রূপটা দেখিয়েই দিয়েছেন, তাই নিজের চাহিদাটাও নিশ্চিত মিটিয়ে নিবেন।”

তৌসিরের রাগ হচ্ছে, সাথে কেমন একটা কষ্ট অনুভব হচ্ছে। নাজহা হঠাৎ বেলাইনে কথা বলছে কেন? কী হয়েছে ওর? তৌসির হাত বাড়িয়ে নাজহার দুই বাহুতে হাত রাখতে চায় কিন্তু নাজহা তা হতে দেয় না। সে সরে গিয়ে ঘরে যাওয়ার জন্য সামনে এগোতে এগোতে বলে, “বলেছি না, না ছুঁতে আমায়? আপনারা আমায় নিজেদের স্বার্থে ইউজ করেছেন। ইউজ! আপনি আমাকে দিয়ে ফারদিনকে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে মেরেছেন। আপনি একটা কীট।”
তৌসির নাজহার বাহু টেনে তাকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করায়। দাঁত চেপে বলে, “তো তোর সমস্যা এখানে যে, আমি ক্যান তোরে দিয়া ফারদিনরে মারাইলাম, তাই না?”

নাজহা তৌসিরের চোখে চোখ রেখে বলে, “হ্যাঁ, এটাই। কেন আপনি নিজের মতো পাপী আমাকে বানাচ্ছেন? কেন?”
তৌসির নাজহার মাথার পিছনের অংশের একগুচ্ছ চুল হালকা মুঠো করে ধরে নাজহাকে ঝাঁকিয়ে তুলে দাঁত চেপে বলে, “ঐ ফারদিন তোরে বিছানায় চাইছিল। ঐ খা**কির পোলা কী কী কইছে হুনবি তুই? দাঁড়া, শুনাইতাছি।”
এ বলে তৌসির নিজের ফোন ঘেঁটে একটা রেকর্ড বের করে নাজহার কানের কাছে ধরে। যেখানে ফারদিন বলছে, “মেয়র সাব, আমার কাছে টুকটাক হলেও আপনার কুকীর্তির কিছু প্রমাণ আছে। ভাবি সেগুলো পাবলিক করব। তবে আপনি যদি চান আমি এটা নাও করতে পারি, একটা শর্তে।”
তৌসির শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করে তখন, “কী শর্ত?”

ফারদিন একটা বিষাক্ত হাসি দিয়ে বলে, “আপনার ফুল।আপনার বউকে আমার বিছানায় একদিনের জন্য চাই। আপনি তো প্রতিদিন এই রূপসীকে নিয়ে পড়ে থাকেন বিছানায়, আমাকেও একদিন সুযোগ দিন। উফ! কী মারাত্মক সুন্দর মাইরি আপনার বউ, মেয়র সাব! আপনার জায়গায় আমি হলে তো দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা তাকে আদর দিতে ব্যস্ত থাকতাম। আপনি কী করে নিজেকে সামলিয়ে তাকে ছেড়ে থাকতে পারেন? একবার করব, শুধু একবার। একটাবার আপনার বউয়ের পুরো শরীরটা নগ্ন অবস্থায় দেখতে চাই, স্বাদ নিতে চাই। বউ দিয়ে প্রমাণ লুটে নিন। আপনার বউকে দেখার পর থেকে না আমি ঘুমের মধ্যেই তার সাথে মিলিত হওয়ার স্বপ্ন দেখি। উফ! কী গাল, কী ঠোঁট, কী চোখ, কী চাহনি, কী চুল! শুধু একবার ইচ্ছেমতো চু**”

নাজহা আর শুনতে পারে না, শরীরটা নুয়ে পড়ছে, হাত-পা কাঁপছে। একজন পুরুষ তার শরীরকে এভাবে ব্যবহার করার স্বপ্ন দেখছিল! নাজহার ঠোঁট-মুখ শুকিয়ে আসে। নাজহা নিজের মন ও মস্তিষ্কের সাথে যুদ্ধ করে ব্যর্থ হয়ে আগপিছ কোনো প্রকার চিন্তাভাবনা ছেড়ে তৌসিরকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে। তৌসিরের বুকে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে ওঠে। তৌসিরের পরনের গেঞ্জির পিঠের অংশ খামচে ধরে ফুপিয়ে বলে, “আমার সহ্য হচ্ছে না। আপনি বন্ধ করুন এটা। কেউ এতটা বিকৃত মস্তিষ্কের কী করে হতে পারে তৌসির? আমার মাথা কাজ করছে না। আমি কী করব, কীভাবে বোঝাব কী জন্য আপনাকে জড়িয়ে ধরেছি।”

তৌসির ফোনটা সোফায় রেখে নাজহাকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। নাজহা ফারদিনের বলা বিষাক্ত কথাগুলো মনে করে বারবার খামচে ধরে তৌসিরের পিঠের গেঞ্জির কাপড়। এতে তৌসির মনে মনে ভাবে, “না জানি আমার আশি টাকা দিয়ে কেনা এত ভালো গেঞ্জিটা না ছিঁইড়িয়া দেয় এখন কান্না মারাইতে মারাইতে।”
নাজহাকে তৌসির বলে, “এর জন্য ওরে তোমারে দিয়া মারাইছি। আর তুমি যাতে গাদ্দারিতে আর এক পা না বাড়াও, সেজন্য ভিডিও কইরা রাখছি।”

নিজের হুঁশ ফিরে এলে নাজহা তৌসিরের বুক হতে মাথা তুলে তৌসিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার জন্যই তো ও এমন বলার সাহস পেয়েছে। না আপনি কুকীর্তি করতেন, না ও এসবের প্রমাণ নিত, না এসব বলত।”
তৌসির নাজহার চোখের পানি দুহাত দিয়ে মুছে দিতে দিতে বলে, “দোষ আমার না, দোষ তোর। তুই যদি ঐ বাই****দরে সেদিন আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ না দিতি, আর না ও বাড়িতে আসত, আর না তোরে দেখত।”
এতটুকু বলে তৌসির নাজহাকে আর কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কোলে তুলে নেয় ঘুমাতে যাওয়ার জন্য। নাজহাও আর মুখ দিয়ে একটা টু শব্দ বের করে না। বিছানায় এসে নাজহাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে তৌসির। নাজহাও আর আপত্তি জানায় না। তৌসির নাজহার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে ম্লান সুরে বলে, “একটা কথা জানো তালুকদারের মাইয়া?”

“কী?”
“আমাদের বিয়ে হয়েছে, আমাদের সংসার হবে, বাচ্চাকাচ্চা হবে। আমার হাত ধরে তুমি হয়তো বৃদ্ধও হবে। তবে।আমাদের মধ্যে কখনোই ভালোবাসা হবে না।”
“হ্যাঁ, হয়তো এটাই। আমরা কখনোই একে অপরকে মেনে নিতে পারব না। বিশেষ করে আমি আমি আপনার মতো জানোয়ারকে কখনো মেনে নিব না মন থেকে। করব আমি আপনার সংসার, তবে তা হবে মিছেমিছি।”
তৌসির এই কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। তার মুখ থেকে আর কোনো প্রকার বাক্য বের হয় না। চুপচাপ চোখ বুজে নেয়।

তৌসির কিছুক্ষণ স্থির থেকে হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ধীরকণ্ঠে নাজহাকে বলে, “নাজহা, দেখে নিও সামনের বছর ঠিক এই সময়ে, এই জায়গায় আমরা থাকব তিনজন।”
​নাজহা বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করে, “তিনজন? কে কে?”
​”আমি, তুমি আর তোমার গর্ভে আমাদের বাচ্চা।”
এই ​কথাটা শোনামাত্রই নাজহা স্তব্ধ হয়ে যায়। অবচেতনেই তার হাত চলে যায় নিজের পেটে সেখানে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে ওঠে, “আ-আমার পেটে আপনার সন্তান? না অসম্ভব! আমি কিছুতেই আপনার সন্তান ধারণ করব না।”

​তৌসির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নাজহার পেটের ওপর রাখা তার হাতটার ওপর নিজের হাত রেখে শক্ত গলায় বলে, “তুমি ধারণ করবে আর না করবে কী? সন্তান দেওয়ার মালিক আল্লাহ, আর উসিলা আমি।”
এই কথা শুনেই ​নাজহা এক ঝটকায় তৌসিরের হাতটা সরিয়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে, “এই কদর্য স্বপ্ন কোনোদিনও বাস্তব হবে না। এখন ঘুমাতে দিন, ফজরের আজান দিয়ে দেবে।”

হাত সরিয়ে দেওয়ায় তৌসির দমে না গিয়ে বরং আরও তার কাছে সরে আসে। আলতো করে নাজহার অবিন্যস্ত চুলগুলো কানের পিছে গুঁজে দিয়ে আবেশে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খায়। তারপর নাজহার পেটের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে নিয়ে সেখানে নিজের হাতের তালু রাখে। তৌসিরের উষ্ণ হাতের স্পর্শে নাজহার সারা শরীর শিউরে ওঠে। সে চোখ বুজে ফেলে অশান্তিতে। এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর অস্থিরতা তাকে আচ্ছন্ন করে নেয়। তৌসির ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “এই স্বপ্নটা আমরা দুজনে মিলে সত্যি করমু।”
​নাজহা দাঁত চেপে নিজের আবেগ সংবরণ করার চেষ্টা করলেও তৌসিরের এই গভীর সান্নিধ্য তাকে ক্রমশ নিস্তেজ করে দিচ্ছে। তবে নাজহা আর নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় না, বরং তৌসিরের দেওয়া এই মায়াবী যন্ত্রণাটুকু নিঃশব্দে উপভোগ করতে থাকে।

পরিত্যক্ত একটি গোডাউনে এখন মরণ দশা চলতেছে। ঘরের ভেতর চারদিকে ভ্যাপসা গন্ধ বইতেছে। আর সেখানে ওয়াসেম তার নিকৃষ্ট খেলা চালাচ্ছে।
​ঘরের মাঝখানে একটি মরচে ধরা লোহার টেবিল। সেই টেবিলের উপর হাত-পা ছড়িয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে বিশ বছর বয়সী এক নগ্ন তরুণীকে। মেয়েটির শরীরে এক টুকরো সুতোও নেই তাকে দেখে মনে হবে কসাইখানায় সাজিয়ে রাখা এক নিথর মাংসপিণ্ড। চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াসেমের গ্যাংয়ের কিছু কাস সদস্যরা। তাদের চোখে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো আদিম লালসা তারা লালসা নিয়ে মেয়েটির ফখফখা নগ্ন গায়ের দিয়ে শুকোনের মতো তাকিয়ে আছে। মেয়েটি গোঙাচ্ছে তার গলার স্বর বসে গেছে। ভাঙা গলায় ও ওয়াসেমের দিকে তাকিয়ে আকুতি জানায়, “আমাকে ছেড়ে দিন কে আপনি? কেন আমার সাথে এমন করছেন?”

​ওয়াসেম পকেট থেকে একটি ঝকঝকে রুপালি ছুরি বের করে। সেটির ফলায় বাতির মৃদু আলো প্রতিফলিত হয়ে মেয়েটির চোখের উপর গিয়ে পড়ে। ধীর পায়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে ওয়াসেম আর বরফশীতল গলায় সে ফিসফিস করে বলে, “তুমি তো আমার শিকার, ডার্লিং। এই শরীর দিয়েই তো তুমি পুরুষ শিকার করো, তাই না? আজ ভাবলাম, শিকারি নিজেই একটু শিকার হয়ে দেখুক!”

​মেয়েটি বাঁচার শেষ চেষ্টায় কান্নায় ভেঙে পড়ে। শরীর কাঁপাতে কাঁপাতে সে বলে, “আপনি যা চাইবেন আমি তা-ই দেব। আমি আপনার সাথে রাত কাটাতে রাজি, দয়া করে এভাবে বেঁধে রাখবেন না!”
​ওয়াসেম থেমে গিয়ে মেয়েটির মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসে সে। তার নিঃশ্বাসে মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছে মেয়েটা। ওয়াসেম চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “ভুল বুঝলে সুন্দরী। আমি নারীদেহের লালসায় আসক্ত নই আমি আসক্ত নারীদেহের তপ্ত রক্তের স্বাদে। তোমার ওই নরম চামড়ার নিচে যে উষ্ণ স্রোত বয়, ওটার নেশাই আলাদা।”

​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যুদ্বেগে ওয়াসেম মেয়েটির বুকের বা পাশের নরম স্তনে ছুরি বসিয়ে দেয়। ঠিক যেভাবে পাকা আমের ওপর ছুরি চালানো হয়, সেভাবে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ওয়াসেম মেয়েটির বুকের চামড়া কাটতে শুরু করে। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। বীভৎস যন্ত্রণায় মেয়েটি এমন এক চিৎকার দেয় যে মনে হয় তার গলার রগগুলো ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসে, তার মুখ দিয়ে লালার সাথে রক্ত মিশে গলগল করে নামে।

​ওয়াসেমের মধ্যে এখন এক জান্তব উন্মাদনা ভর করেছে। সে হাত থেকে ছুরিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সরাসরি মেয়েটির ক্ষতস্থান খাবলে ধরে সেখানে মুখ বসায়। তৃষ্ণার্ত পশুর মতো সে কুলি করে করে তাজা রক্ত গিলতে থাকে। তার দাড়ি-গোঁফ ভিজে একাকার হয়ে যায় লাল স্রোতে। ওয়াসেম মেয়েটার রক্ত চুষে জানুয়ারের মতো খেতে থাকে।​ঠিক তখনই পেছন থেকে কায়নাব ওয়াসেমের ছায়াসঙ্গী ও ম্যানেজার এসে তাকে শক্ত করে টেনে ধরে। বিরক্তির স্বরে কায়নাব বলে, “ওয়াসেম, থামো! আজ অনেক হয়েছে। অতিরিক্ত নেশা ভালো নয়।”

​কায়নাব এক ঝটকায় ওয়াসেমকে সরিয়ে নেয় এরপর অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজের কোমর থেকে পিস্তল বের করে মেয়েটির পেট বরাবর ট্রিগার টিপে দেয়। একটি কান ফাটানো শব্দ হয়, আর সব শান্ত হয়ে যায়। মেয়েটি চিরদিনের জন্য নিথর হয়ে পড়ে।​ওয়াসেম নিজের দাড়ি থেকে চটচটে রক্ত মুছতে মুছতে উন্মাদ হাসিতে ফেটে পড়ে। কায়নাবের দিকে তাকিয়ে বলে, “কায়নাব, আমার ভাইয়েরা আসছে দ। সব আয়োজন নিখুঁত হওয়া চাই।”
​কায়নাব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কোন ভাই? বাংলাদেশি নাকি নাগাল্যান্ডের?”

​ওয়াসেম নিজের রক্তভেজা শার্টটি খুলে দলা পাকিয়ে অন্ধকার কোণে ছুড়ে মারে। তার চোখে এখন এক নতুন ধ্বংসের নেশা সে গর্জে উঠে বলে, “দুজনই আসছে! একসাথে দুজনের জন্যই আয়োজন করো কায়নাব! রক্তের বন্যা বইয়ে দাও!”
​অট্টহাসি হাসতে হাসতে ওয়াসেম গোডাউন থেকে বেরিয়ে যায়।

সকাল দশটা। শিকদার বাড়িতে বিয়ের ধুম পড়ে গেছে। আগামীকাল ধ্রুব আর ইকরার বিয়ে, তাই আজ সকাল থেকেই বাড়িতে এলাহি কারবার। কিন্তু এই বাড়ির এক পুরনো সমস্যা বিয়ে বা কোনো শুভ কাজ হলেই কাউকে না কাউকে জিনে ধরে। তৌসিরের বিয়ের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল, আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। এবার জিন ধরেছে সিমরানকে। ​সিমরানের ঘরের অবস্থা এখন থমথমে। সে বিছানায় বসে আবোল-তাবোল বকছে। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে তৌসির, সিমরানের বাবা-মা, বিবিজান, রুদ্র এবং বাড়ির আরও অনেকে। পরিস্থিতি সামলাতে হুজুর ডেকে আনা হয়েছে।​হুজুর গম্ভীর মুখে সামনে এগিয়ে এসে জিনরূপী সিমরানকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কেন ওর ওপর ভর করেছ? কী দোষ ওর?”

​সিমরান খিকখিক করে হাসতে হাসতে উত্তর দেয়, “আমি কদম গাছের সামনে শুইয়া ছিলাম, তখন ও আমার ওপর পাড়া মারছে। তাই ওর সাথে আমি লাগছি।”
​এই কথা শোনা মাত্রই ঘরের আবহাওয়া বদলে যায় । ভয়ের বদলে বিরক্তি ফুটে উঠে তৌসির সহ উপস্থিত সবার চোখে-মুখে। যাকে ধরে, প্রতিবার সেই একই কদম গাছ আর গায়ে পাড়া দেওয়ার মিথ্যা অজুহাত দেখায়!
​তৌসির আর সহ্য করতে পারে না। বিরক্তি নিয়ে জিনরূপী সিমরানের একদম সামনে এসে দাঁড়ায় ও। তারপর তিক্ত সুরে বলে, “তো তুই অদৃশ্য হইয়া যেখানে সেখানে সাউয়া মেলাইয়া শুইয়া থাকস ক্যান? ভালো করছে পাড়া মারছে!”

​সিমরানের ভেতর থাকা জিনটা চিৎকার করে শাসিয়ে বলে, “এই! তুই বেশি কথা কবি না। নয়তো তোর বইনরে মাইরা দিমু!”
​তৌসিরের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ে যায় সে বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে উল্টো সিমরানের চুল হালকা করে টেনে ধরে ধমকে বলে, “তুই না জিন? তুই না জাদু করতে পারস? তাইলে তুই মাটিতে শুইয়া থাকস ক্যান? রুপার পালঙ্ক বানাইয়া সেইটায় শুইতে পারছ না? ছিনিাল কোথাকার! জিন যদি না হইতি, তাইলে এতক্ষণ তোর সাউয়া ফাটায়া নিতাম।”

​অপমানে আর রাগে জিনটা হুংকার দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। তারপর বিবিজানের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলে, “তোর নাতিরে সামলা বুড়ি! নয়তো তোর নাতির নয়া বউরে গিয়া ধরমু!”
​বিবিজান এতক্ষণ চুপ ছিলেন, কিন্তু নতুন বউয়ের কথা শুনে তিনিও আর স্থির থাকতে পারেন না। তিনি এগিয়ে গিয়ে সিমরানরূপী জিনের গালে কষে এক থাপ্পড় মেরে ​চড়া গলায় বিবিজান বলেন, “তুই যাইবি নাকি আমি আমারগুলারে ডাকমু? তখন কিন্তু অবস্থা খারাপ হইয়া যাইব!”
​বিবিজানের থাপ্পড় আর ধমক খেয়ে জিনের সুর নরম হয়ে যায় সে মিনমিন করে বলে, “আমারে আমার পাওনা দিয়া দাও। আমারে এক কেজি মিষ্টি দিয়া দাও, আমি চইলা যামু।”
মিষ্টির কথা শুনেই তৌসির খেঁকিয়ে ওঠে। কড়া গলায় বিবিজানকে বলে, “বিবিজান, কিসের মিষ্টি দিবা? এই মাদারচ** জিনরে খাওয়ানোর জন্য টাকা কি গাছে ধরে? এক কেজি মিষ্টির দাম কমসেকম সাড়ে তিনশ টাকা! ওইসব ফালতু খরচ আমরা করতে পারুম না।”

দাদাজান এতক্ষণ চুপ ছিলেন। এবার গম্ভীর হয়ে বিবিজানের দিকে তাকিয়ে বলেন, “তুমি তোমার নাতিরে লইয়া এখন এইখান থাইকা যাও। আমরা জিন ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতাছি।”
বিবিজান আর কথা বাড়ালেন না। তিনি উঠে দাঁড়ান এবং শক্ত হাতে তৌসিরের বাহু টেনে ধরে ওকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।বাইরে এসেই তৌসিরের গালে কষিয়ে এক থাপ্পড় মারেন বিবিজান আর দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলেন, “তুই যে এমনে গালাগালি করতাছিস, এই জিন যদি পরে উস্কে গিয়া তোর বউয়ের ঘাড়ে চাপে? নাজহা একরঙা মাইয়া, ওরে ধরলে কি আর ছাড়বো মনে করস?”
তৌসির গালে হাত বুলিয়ে বিকারহীনভাবে হাসতে লাগে আর তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “আরে ধুর! আমার বউ এই জিনের থাইকা দশগুণ তেজি। জিনের সাধ্য নাই ওরে ধরার। উল্টা আমার বউয়ের ঝাঁঝের আগুনে পুইড়া জিনই ছারখার হইয়া যাইব।”

বিবিজান গায়ের চাদরটা ঠিক করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “চল তোর ঘরে যাই। তোর বউয়ের লগে আমার কিছু কথা আছে।”
ওদিকে নাজহা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। ফোনের ওপাশে তার ‘মাস্টার চাচ্চু’। কাল রাতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা সে পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট করছে নাজহা বলে, “মাস্টার চাচ্চু, ওরা তোমাদের পাঠানো ওই কিলারকে ধরে ফেলেছে। যখন ধরেছিল, তখন আমার ‘গোলাম’-এর ফোনে কল এসেছিল। ও দেখতে গিয়েছিল কী হয়েছে, কিন্তু কিছু না দেখেই চলে এসেছে। আমি যখন মিথ্যা রাগ দেখিয়ে জানতে চাইলাম কেন আমাকে দিয়ে খুন করাল, তখনই ও সত্যটা বলেছে। আমাকে ফারদিনের একটা রেকর্ড শুনিয়েছে ওই ফারদিন ভালো লোক ছিল না মাস্টার চাচ্চু, আস্ত একটা জানোয়ার ছিল।”

মাস্টার চাচ্চু জিজ্ঞেস করলেন, “সে তো জানি, কিন্তু কী করেছিল সে?”
নাজহা ঘৃণার সাথে উত্তর দিল, “অনেক জঘন্য কাজ, যা তোমাকে মুখে বলতে পারব না আমি।”
ওপাশ থেকে মাস্টার চাচ্চু বললেন, “আচ্ছা, বলতে হবে না। তুই শুধু মনে রাখিস তোর আসল কাজটা কী। বোকামি করে কান্না করিস না, ভয় পাস না।”
শিকারির মতো তীক্ষ্ণ চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে নাজহা বলল, “না, মনে রেখেছি। তোমরাও মনে রেখো আমি কিন্তু তৌসিরের মতো পশুর সংসার করব না। কাজ শেষ হলে আমাকে এই লোকের হাত থেকে বাঁচাতে হবে কিন্তু।”
“সে তোকে বলতে হবে না।”

নাজহা বাঁকা হেসে বলে, “না, মনে করিয়ে দিলাম। কারণ তোমরা তো স্বার্থপর। স্বার্থ শেষে যদি আমায় এই জাহান্নামেই মরার জন্য ফেলে রাখো!”
কথাগুলো বলেই ফোনটা নামিয়ে রেখে দেয় নাজহা। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যেই না পেছনে ঘুরে দাঁড়ায় , আচমকাই ‘চড়াস’ করে এক তীব্র চপেটাঘাত আছড়ে পড়ে তার লালিমা মাখা ফর্সা গালটার ওপর।থাপ্পড়টা মেরেছেন স্বয়ং বিবিজান। ঘরের ভেতর বিবিজান আর তৌসির আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন এবং তার সব কথা শুনে ফেলেছেন, তবে তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি নাজহা।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৭

থাপ্পড়ের আঘাতটা এতই অতর্কিত আর জোরালো ছিল যে, নিজেকে আর স্থির রাখতে পারে না নাজহা। প্রচণ্ড অভিঘাতে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে, চোখের সামনের পৃথিবীটা মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে যায়। টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ে নাজহা। আঘাতের তীব্রতায় নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে উষ্ণ রক্তের ধারা।
নাজহা কে কি মেরে ফেলা হবে? কি হবে তার সাথে? জানতে বেশি বেশি কেমন্ট করুন!

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৯