Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩০

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩০

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩০
সানজিদা আক্তার মুন্নী

ঘড়ির কাঁটায় এখন সন্ধ্যা সাতটা। শিকদার বাড়িতে আজ উৎসবের রং লেগেছে। ধ্রুব আর ইকরার গায়ে হলুদ আজ একসঙ্গেই হচ্ছে এই বাড়িতে। ইকরার বাড়ির আত্মীয়-স্বজনে পুরো শিকদার বাড়ি গমগম করছে। তবে দোতলায় তৌসিরের ঘরে চলছে এক অন্যরকম উত্তাপ।ঘরের মাঝখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনজন তৌসির, নাজহা আর বিবিজান। যুদ্ধের মূল কারণ হলো নাজহার পোশাক। বিবিজানের হুকুম, বাড়ির বউ নাজহা তাই ওকে শাড়িই পরতে হবে। ওদিকে নাজহা নাছোড়বান্দা, সে তার পছন্দের শারারাই পরবে মানে পরবেই বিবিজান কে দেখতে পারে না এমনিতেই। আর উনার আদেশ শুনবে নাকী সে। বিবিজান নাজহার দিকে এক পা এগিয়ে এসে কড়া গলায় শাসাচ্ছেন, “তুই শাড়ি পরবি মানে তুই শাড়িই পরবি! এর ওপর একটাও বাড়তি কথা কবি না।”

নাজহা বিবিজানের কথায় একবার তৌসিরের দিকে আড়ো চোখে তাকাল। বেচারা তৌসির দাদী আর বউয়ের মাঝখানে পড়ে অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। নাজহা চোখ সরিয়ে সটান বিবিজানের চোখের দিকে তাকায় ফের অতঃপর দাঁত চেপে স্পষ্ট গলায় বলে, “আমি পরব না শাড়ি। আমি আমার পছন্দ মতো ড্রেস পরব।”
নাজহার মুখে এমন কথা শুনে বিবিজান রাগে কিড়মিড় করে ওঠেন। পুরনো হিসেব মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, “চারটে থাপ্পড় যে মেরেছিলাম মনে নেই? ভুলে গেছিস নাকি? বেশি বাড়াবাড়ি করলে মারব আরও কয়টা!”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কথাটা শোনামাত্র নাজহা অদ্ভুত এক কান্ড করে বসে। সে নিজের ডান হাতটা উঁচিয়ে ধরে। হাতের তালুতে আলতো করে থুতু ছিটিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, “না না, ভুলে যাইনি। সেটার শোধ তো তুলতে হবে, তাই না?”
তৌসিরের চোখ কপালে ওঠার জোগাড় এ দেখে! সে মনে মনে প্রমাদ গোনে, ‘আল্লাহ! আমার কালনাগিন না জানি এখন রাগের মাথায় আমার বুড়ি নাগিন কে থাপ্পড় মাইরা দেয়!’

কিন্তু তৌসিরের ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে নাজহা আচমকা বাঁ হাত বাড়িয়ে হুট করে তৌসিরের ঘাড়ের কাছে কলারটা খামচে ধরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ‘চটাশ! চটাশ! চটাশ! চটাশ!’ করে পুরো ঘর নিস্তব্ধ করে তৌসিরের দুই গালে চারটে কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। তৌসির হতভম্ব! গালে হাত দিয়ে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে দু’জনের দিকে । তার অপরাধটা কী? নাজহা তাকে মারল কেন?
নাজহা তৌসিরকে ছেড়ে দিয়ে বিবিজানের দিকে তাকায় আর ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ঝুলিয়ে নিয়ে বলে, “এই যে, শোধ তুলে নিলাম। এখন হয়েছে তো?”

নাজহার এই আস্পর্ধা দেখে বিবিজান আকাশ থেকে পড়েন। তিনি খেঁকিয়ে ওঠেন, “মাগি! এত বড় সাহস তোর? তুই আমার চোখের সামনে আমার নাতির গালে হাত লাগাস? মেরে লাল করে দিয়েছিস গাল!
নাজহা এ শুনে এবার শান্ত দৃষ্টিতে তৌসিরের দিকে তাকায়। তৌসিরের ফর্সা গাল সত্যিই লাল হয়ে আছে। সে আলতো করে তৌসিরের গালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মায়াময় গলায় বলে, “ইশশ! লাল হয়ে গেছে, তাই না?”
পরক্ষণেই বিবিজানের দিকে তাকিয়ে চিবুক শক্ত করে বলে ওঠে , “আমার জামাই! আমি ইচ্ছে হলে থাপ্পড় মারব, ইচ্ছে হলে চুমু খাব তাতে আপনার কী?”

কথাটা শেষ করেই নাজহা এক ঝটকায় তৌসিরের চুল খাবলে ধরে তৌসিরকে নিজের একদম কাছে টেনে আনে। তৌসিরের বিস্ময়ের ঘোর এখনো কাটেনি। নাজহা তার তার তপ্ত হয়ে থাকা দুই গালে গভীর আবেগে চুমু খায়।
তৌসিরের সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায় এই স্পর্শে! সে বাকরুদ্ধ, চোখ বড় বড় করে শুধু তাকিয়ে থাকে। গালে প্রথমে পড়ল চড়, আর তারপরেই স্ত্রীর উষ্ণ ঠোঁটের গরম স্পর্শ ব্যথা আর ভালোবাসার এই অদ্ভুত মিশ্রণে সে কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

নাজহার এই কান্ড দেখে বিবিজান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নেন। তিনি দাঁত চেপে ধরে কিছু বলতে যাবেন, ঠিক তখনই নিচ থেকে ডাক পড়ে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে তাকে এখনই যেতে হবে। যাওয়ার আগে তিনি নাজহাকে চোখ রাঙিয়ে বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে যান।
বিবিজান ঘর থেকে বের হতেই নাজহা তৌসিরকে ছেড়ে দেয়। তৌসির এখনো গালে হাত দিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে , তার হৃদস্পন্দন এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

বিবিজান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ঘরের আবহাওয়া মুহূর্তেই বদলে যায়। তৌসিরের ঘোর কাটে। সে নাজহার দিকে গরম চোখে তাকায়। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে নাজহার দিকে এগিয়ে এসে ধমকে বলে, “এই, তোর সাহস তো দেখতাছি দেড় ইঞ্চি বাইড়া গেছে! বেয়াদব ছিনাল তোরে থাপ্পড়িয়ে দাঁতের মাড়ি ফুলিয়ে দিমু আমি।”
নাজহা তৌসিরের ধমকে একটুও ভয় পায় না। উল্টো সে তৌসিরের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে, “বাহ! এত সাহস? তাহলে যখন এতই সাহস, তখন আমার পায়ে পড়েছিলে কেন? ‘মাফ করে দেও, মাফ করে দেও’ বলে তো কম মিনতি তো করেননি।”

পুরনো কথা শুনে তৌসিরের ইগোতে লাগে। সে নাজহার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলে, “তুমি বউ, বউয়ের মতো থাকো। অতিরিক্ত উড়াউড়ি করিও না। আমার কাছে বিবিজান আগে। তুমি তার সাথে আজ যে বেয়াদবি করছো, সেটা কিন্তু আমি একদমই সহ্য করব না আর।”
নাজহা তাচ্ছিল্যের হাসি দেয় এ শুনে গলার স্বরে একরাশ অভিমান আর তিক্ততা মিশিয়ে বলে, “জানি তো, আপনার কাছে আপনার বিবিজানই সব। সেটা নতুন করে কেন বলছেন? আমি তো আপনাদের কেউ না, আমি হলাম সবার জীবনে ‘অপশনাল’। যখন দরকার হয় ব্যবহার করো, দরকার শেষ ছুড়ে ফেলো।”

একটু থেমে শ্বাস নিয়ে নাজহা আবার বলে, “আর যেটাকে আপনি বেয়াদবি বলছেন, সেটা বেয়াদবি না, সেটা আমার ইচ্ছে। আমি আপনাদের হাতের পাপেট না যে আপনারা যা বলবেন তাই শুনব। আমি তো হলুদে যেতেই চাইনি, শুধু আপনার মা বারবার বলছেন তাই যাচ্ছি। এখন যদি আর একটাও এক্সট্রা কথা বলেন, তাহলে কিন্তু আমি যাব না। আর আমি ‘না’ বললে সেটা কিন্তু আর ‘হ্যাঁ’ হবে না।”
কথাগুলো বলেই নাজহা বিছানার ওপর থেকে তার শারারাটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

তৌসির নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। তার আর কিছু বলার থাকে না। সে ভাবে, ‘এই মেয়ের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। বউয়ের সাথে তাল মেলাতে গেলে জীবন আর জীবন থাকবে না। তার ওপর ও যে কখন কী করে বসে, কোনো ঠিক নেই। দুদিন পর পর নতুন নতুন গাদ্দারিতে মেতে ওঠে। একে বিশ্বাস করে বিবিজানের সাথে তর্কে জড়ানো হবে নিতান্তই চরম বোকামি।’ তৌসির হতাশ ভঙ্গিতে বিছানায় বসে পড়ে।

ওদিকে ওয়াশরুমের ভেতরটায় অন্য এক পৃথিবী। নাজহা শারারা পরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায় সে। গালে থাপ্পড়ের পুরনো দাগগুলো এখন আর নেই, মিলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু মনের দাগ?
নাজহার চোখের কোণ বেয়ে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। বাইরের সেই তেজদীপ্ত নাজহা এখন নিমিষেই ভেঙে চুরমার। সে যে ভালো নেই, সে যে একটুও ভালো নেই এই কথাটা শোনার মতো কেউ নেই তার। তার যে আপন বলতে কেউ নেই এই বিশাল পৃথিবীতে। সবাই থাকে, কিন্তু নিজ প্রয়োজনে। প্রয়োজন ফুরালে সবাই পর হয়ে যায়।

নাজহা আয়নার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। কিন্তু বেশিক্ষণ কাঁদতে পারে না। চোখের পানি দুহাত দিয়ে দ্রুত মুছে ফেলে। জোরপূর্বক ঠোঁটে একটা মিথ্যে হাসি ফোটায়। আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে নিজেকেই বোঝায়, “না নাজহা, কাঁদলে চলবে না। তুমি অনেক স্ট্রং একটা পার্সন, তুমি খুব খুব স্ট্রং। এসব তুচ্ছ বিষয়ে কেঁদে কেন চোখের পানি ফেলছ?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে আবার বলে, “এই যে তোমার আশেপাশের মানুষরা, ওরা তোমায় বিশ্বাসঘাতক ভাবে, গাদ্দার ভাবে। ভাবুক! তাতে কী? তুমি তো জানো তুমি কার জন্য করছ, কেন করছ। নাজহা, একটু শক্ত হও। তোমাকে লড়তে হবে।”

নাজহা চোখেমুখে পানি দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে। যুদ্ধের মুখোশটা আবার মুখে এঁটে নেয় সে।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। তৌসির এখনো ঘরে বিছানায় বসে আছে। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা সাথে রাগ তো আছেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে এক ব্যাকুল আকুতি। নাজহা যখন শারারা টা পড়বে একটু সাজবে, তাকে ঠিক কতটা সুন্দর লাগবে, সেই দৃশ্যটা দেখার জন্য তার বুকের ভেতরটা তিরতির করে কাঁপছে।
অপেক্ষার প্রহর অনন্ত মনে হচ্ছে এখন তৌসিরের কাছে। বিরক্ত লাগছে্ হৃদয়ের গহীনে এক অবর্ণনীয় অস্থিরতা নাজহা আজ কেমন সাজে ধরা দেবে? তার রূপের নতুন কোন ছটায় আলোকিত হবে এই মুহূর্ত? সেই অদেখা সৌন্দর্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সময়ও বোধহয় তৌসিরের কাছে থমকে দাঁড়িয়েছে।

সহসা সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার যবনিকা পতন হলো। নিঃশব্দ চরণে ওয়াশরুমের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো নাজহা। তৌসিরের বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে তিরতির করে কেঁপে উঠলো আবারো। ধীর লয়ে দৃষ্টি তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায় সে। একি দেখছে সে! তার চিরচেনা তেজস্বী ‘সবুজ বাঘিনী’ আজ তো ভোল বদলে এক মায়াবিনী ‘হলদে পরী’র রূপ পরিগ্রহ করেছে। আহা, কী মারাত্মক, কী তীব্র এক সম্মোহনী সৌন্দর্য! কী মারাত্মক কী মারাত্মক! এ তো ভীষণ মারাত্মক অপরুপ।

নাজহার অঙ্গে আজ সরষে ক্ষেতের হলুদ আভা, যা তার দুধে আলতা কাঁচা সোনার মতো গায়ের রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। মনে হচ্ছে, কোনো এক জাদুকরী তুলির ছোঁয়ায় তার সমস্ত শরীরে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে। তার কালচে সবুজ হরিণি চোখের এই মায়া, আর সুডৌল গোলাপী ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এক চিলতে তিক্ততাই তৌসিরের জগৎ সংসার সব এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
নাজহার পরনে সরষে হলুদ রঙের জমকালো শারারা। হাঁটুর সামান্য ওপর পর্যন্ত প্রলম্বিত পূর্ণহাতা কামিজটির গলার কাজ ছিমছাম হলেও, নিচের অংশে সোনালি সুতো আর কাঁচের সুনিপুণ কারুকাজে আলোর ঝিলিক ছড়াচ্ছে। তবে সমস্ত দৃষ্টি কেড়ে নেয় তার নিচের ঘেরওয়ালা শারারা প্যান্টটি। সোনালি রঙের ফুল আর লতাপাতার নকশায় আবৃত সেই জমিন যেন এক চলন্ত স্বর্ণালী বাগান। হাঁটার তালে তালে প্যান্টের ভারী পাড়টি দুলছে।

বুকের ওড়নাটি সযত্নে ঠিক করে নিতে নিতে নাজহা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। খোঁপার বাঁধন আলগা হয়ে তার ঘন কেশরাশি এক উচ্ছল মেঘের তরঙ্গ অবাধ্যভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তার ফর্সা কাঁধ আর পিঠময়। খোলা চুলের এই মায়াবী ফ্রেমে তার মুখখানিকে দেখাচ্ছে জীবন্ত প্রতিমার মতো। নাজহার এই নিরুপমার রূপের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে তৌসিরের ঠোঁট দুটো অজান্তেই নড়ে বসে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে বেরিয়ে আসে ওর মুগ্ধ উচ্চারণ, “মাশাআল্লাহ, সুবহানাল্লাহ! আমার ‘গাদ্দারনী’ তো দেখি আজ সত্যিই এক অপরূপা হলদে পাখির বেশে আমার অন্তরের আসমানেতে ডানা মেলতাছে।”

নাজহা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তৌসিরের দিকে একবারও তাকায় না সে। ড্রেসের পিঠের দিকে থাকা ছোট চেইনটা লাগাতে হবে, তাই আলতো হাতে তার কেশরাশি গুটিয়ে কাঁধের একপাশে সরিয়ে নেয়। তৌসির ধীরে ধীরে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। মনে সুপ্ত ইচ্ছে ছিল নাজহাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরার, কিন্তু চেইনটা খোলা দেখে সে হাত বাড়িয়ে তা টেনে দিতে যায়।আয়নায় তৌসিরের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নাজহা কঠোর স্বরে বলে ওঠে, “আমার চেইন আমিই লাগাতে পারব। আপনার এত নাটক করতে হবে না, হাত সরান বলছি!”
তৌসির হাত সরিয়ে নেয় সাথে সাথে ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই নাজহার দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে। আয়নায় নাজহার চোখের দিকে চেয়ে বলে, “তোমার কী মনে হয়? আমি তোমার চেইন লাগাতে এসেছি? আমি তো এসেছি নিজের জন্য।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই ড্রেসের চেইনের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান নাজহার ফর্সা পিঠে তৌসির নিজের নাক ডুবিয়ে দেয়। অতঃপর খুবি আলতো ভাবে ঠোঁট ছুয়ায় ওড়না বিহীন এই উন্মুক্ত ত্বকে তৌসিরের ঠোঁট জোড়া স্পর্শ করতেই নাজহা তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে। সে দাঁত চেপে, চোখ বুজে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। একসময় সহ্য করতে না পেরে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চিৎকার করে ওঠে, “আমি কি ড্রেসটা খুলে ফেলব? খুলে ফেলব এখনই? শান্তি হবে আপনার? আমি এই ড্রেস আর পরব না, আপনার এসব নাটক আমার সহ্য হয় না!”
তৌসির বুঝতে পারে নাজহা এখন মারাত্মক খেপে যাবে। সে কথা না বাড়িয়েই নাজহার পিঠে আরও দশ-বারোটা চুমু খেয়ে চেইনটা টেনে দেয়। এরপর পেছন থেকে নাজহার কোমর জড়িয়ে ধরে, তার কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিসিয়ে বলে, “কৈতরী গো ও কৈতরী!”

নাজহার গা জ্বলে যাচ্ছে এই আদুরে আহ্বানে। আজ সকালে যে মানুষটা তাকে নির্মমভাবে মার খাওয়াল, এখন সে-ই কি না সোহাগ করছে! রাগে তার হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হওয়ার দশা। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়। প্রতিজ্ঞা করেছে সে আর তৌসিরের ওপর রাগ দেখাবে না। অভিমান তো আপন মানুষের ওপর করা হয়, তৌসির কি আদৌ তার আপন? তৌসির তো নিজেই তাকে আজ মার খাওয়াল। নাজহা জানে সে একা, সে তো একটা পাপেট যাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।

নাজহা ম্লান সুরে কানে দুল পরতে পরতে বলে, “এসব অভিনয় করে কী লাভ তৌসির? আমি তো আপনার হাতের একটা পুতুল মাত্র। একটা পাপেটকে এত কদর করে ডাকার কী আছে? আপনার আসল মতলব তো আমার শরীরটাই, তাই না? নিন, ভোগ করুন। তার জন্য এত নাটক বা মন জয় করার বৃথা চেষ্টার কী প্রয়োজন? ঘৃণা লাগে তৌসির, ঘৃণা! আপনার এই নিঃশ্বাস, এই ছোঁয়া সবকিছুই আমার কাছে চরম ঘৃণার।”
তৌসিরের মুখটা অপমানে আর কষ্টে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সে কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয় না। ঠিক তখনই কাঁচা হলুদের বাটি হাতে ঘরে প্রবেশ করেন বিবিজান। তাকে দেখে তৌসির বিদ্যুৎগতিতে নাজহার থেকে দূরে সরে যায়।

বিবিজান এগিয়ে এসে তৌসিরের হাতে বাটিটা ধরিয়ে দেন। নাজহার শারারা পরা দেখে তিনি মনে মনে ভাবছেন, ‘মেয়েটা নিজের কথাতেই থাকল, পরলই তো শারারা। কী শয়তান মেয়ে একটা!’ এরপর তৌসিরের দিকে তাকিয়ে কটমট করে বলেন, “নে, এই কাঁচা হলুদ তোর বউয়ের গায়ে লাগিয়ে দে। সবখানে লাগাবি। পারলে ওর ওইখানেও একটু লাগাইস যাতে ওইখানের ‘ঝল’ নামে!”
বিবিজানের কুৎসিত ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটি নাজহার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখে এক টুকরো বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বিবিজানের চোখে চোখ রেখে বলে, “আমার ওইখানের ঝল নামানোর জন্য এই হলুদের প্রয়োজন নেই বিবিজান। আপনার নাতি ওই… উমমম,,, উহুম যথেষ্ট।”

কথাটা বলে সে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে মিছেমিছি কেশে ওঠে, “উমুউমু… তাই না তৌসির সাব?”
বিবিজান হতভম্ব! তিনি দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে ওঠেন, “নির্লজ্জের মতো কথা বলছিস কেন লো মাগি?”
নাজহা গালির পিঠে পাল্টা জবাব দিতে মুখ খুলতেই তৌসির দ্রুত ওর মুখ চেপে ধরে। বিবিজানের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি ওর ওপর থেকে নিচ যেখানে যেখানে হলুদ লাগানো দরকার লাগিয়ে দেব। তুমি এবার যাও বিবিজান।”
বিবিজান আর কথা না বাড়িয়ে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যান। তিনি মনে মনে জানেন নাজহার এমন আচরণের কারণ আজ সকালের ঘটনা। মনে মনে নাজহাকে তিনি স্নেহ করলেও মুখে তা স্বীকার করতে পারেন না, তাই শাসন আর অপমানের ঢাল ব্যবহার করেন।

বিবিজান চলে যেতেই ঘরটা আবার এক ভারাক্রান্ত নীরবতায় ডুবে যায়।
তৃষ্ণা দাঁড়িয়ে আছে পাটোয়ারী বাড়ির সদর দরজায়। তার ওড়নার কোলে বেশ কয়েকটা বরই। সিতুজা বাপের বাড়ি যাওয়ার আগে বলে গিয়েছেন, যদি সে পারে তাহলে যেন উনার জন্য টকের তরকারি রেঁধে রাখে। তবে ও কী দিয়ে রাঁধবে খুঁজে পেল না। টমেটো শেষ হয়ে গেছে বাড়িতে। ইব্রাহিম সাহেবও বাড়িতে নেই, হায়দারবাদ গিয়েছেন কাজে। বাড়িতে সে আর ওয়াসেম। ওয়াসেমকে বলার সাহস নেই, তাই আর কোনো দিক না চেয়ে বরই পেড়ে এনেছে টক রাঁধবে বলে।

তৃষ্ণা দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় দেখে সিঁড়ি বেয়ে একটা মেয়ে নামছে। মেয়েটাকে দেখেই তৃষ্ণা চোখ নামিয়ে নেয়। এই মেয়েটা ওয়াসেমের ঘর থেকে আসছে। সকালে তৃষ্ণা যখন ঘর গুছাচ্ছিল, তখন ওয়াসেম এই মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকে তাকে বের করে দিয়েছে। অবশ্য বের করে দেওয়ার আগে বলেছিল, “আমরা এখন সময় কাটাব, তুই আমাদের ডিস্টার্ব দিস না।”

ওয়াসেম কোনোদিন কোনো নারী নিয়ে এভাবে কখনো আসেনি বাড়িতে। আজ এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটালো সে। তবে তৃষ্ণার সেই ক্ষমতা নেই যে, কেন নিয়ে এলেন তাকে প্রশ্ন করবে! কিছু সময় তৃষ্ণা ওয়াসেমের দিকে নিরীহ চোখে তাকিয়ে তারপর নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিয়েছিল তখন, “আ… আচ্ছা।”

এতটুকু বলেই সে ধীরে ধীরে নিচে চলে এসেছিল। কী বলবে তার? যে বলার অধিকার নেই, সে তো ওয়াসেমের কেউ না যে বলবে কিছু। ওয়াসেমের বাড়ি, ওয়াসেমের সব। তৃষ্ণা কী বলবে? বললে ওয়াসেম মারবে উল্টো তাকে, তাই চুপচাপ চলে এসেছে। ভেতরটা, বুকটা যন্ত্রণায় ডুকরে উঠছিল ওর, কিন্তু তারপরও কিছু করার নেই সব সহ্য করা ছাড়া। নিজেকে অনেক বুঝিয়ে রান্নাঘরে এসে রান্না করতে থাকে। রান্না করার সময় গলায়-বুকে আটকে থাকা কষ্টের পাথরটা গলে চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়েছিল তৃষ্ণার। কষ্টে বুক ফেটে যায় ওর, তৃষ্ণার চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে জল। শ্বাস এখনই বন্ধ হয়ে আসবে এমন অবস্থা হয়।

তৃষ্ণা সকালে নাস্তা করেনি। পেটের ক্ষিদেয় দুটো রুটি খেতে বসেছিল, তথাপি সেটাও সে পারেনি। খেতে গিয়ে কান্নার বেগের কারণে গলায় খাবার আটকে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে চোখের পানি সামলিয়ে সামলিয়ে রান্না করেছে অসহায়ের মতো।
এখন তৃষ্ণা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ নিচে নামিয়ে নেয়। মেয়েটা তৃষ্ণার পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে, “তোমার হাসবেন্ডের পারফরম্যান্স জাস্ট ওয়াও ছিল, ব্লিডিং করিয়ে দিয়েছে। তুমি সামলাও কিভাবে ডিয়ার?”

তৃষ্ণা অবলার মতো মেয়েটির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কী নির্মম পরিস্থিতি তার! নিজের স্বামী অন্য নারীর সাথে বিছানায় গেল, সেটাও তাকে দেখতে হলো। এমন ভাগ্য তৃষ্ণার দুশমনেরও না হোক।তৃষ্ণা বরইগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যায়। ওয়াসেম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে তারপর ঘরে যাবে। এখন গেলে নিশ্চয়ই আরো অনেক কথা শুনতে হবে তাকে। কিন্তু তৃষ্ণার ভাগ্য তাকে সায় কোনোদিন দেয়নি, আজও দিল না। ওয়াসেমের গলা ভেসে আসে, যে তৃষ্ণাকে ডেকে বলছে, “তৃষ্ণা! এই তৃষ্ণা! আমার জন্য এক কাপ কড়া লিকারের চা আর বিস্কুট নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।”

তৃষ্ণা ওয়াসেমের ডাক শুনে ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে নিজেকেই নিজে বলে, “সবই ভাগ্য! থাক, সুদিন নিশ্চয়ই আসবে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে কিছুই হয় না। অতএব, অপেক্ষা আর আক্ষেপের কোনো শেষ হয় না।”
ওয়াসেম তৃষ্ণাকে ডেকে গিয়ে রুমে সাদা বিছানায় কিছু পানি আর লাল রঙ ঢেলে দেয়। রঙের লালচে ছোপ ছোপ দাগ সাদা বিছানায় বসিয়ে দেয়। ওয়াসেম মেয়েটার সাথে কিছু করবে তো মেলা দূরের বাক্য, তাকে ছুঁয়েও দেখেনি। ওয়াসেম শুধু তাকে অ্যাক্টিং করার জন্য ভাড়া করে নিয়ে এসেছে। যাতে তৃষ্ণা অন্তত এইবার ওয়াসেমের উপর রাগ করে চলে যায়। তৃষ্ণা নিজের থেকে চলে গেলে ওয়াসেম বেঁচে যায়। ওয়াসেম তো তৃষ্ণাকে নিজে ছাড়তে পারবে না বাবার জন্য।

তৃষ্ণা চা নিয়ে রুমে পা রাখে ধীরে ধীরে। দেখে ওয়াসেম সোফায় বসে আছে, পরনে লুঙ্গি ব্যতীত আর কিছু নেই। তৃষ্ণা দৃষ্টি নতজানু করে সোফায় বসে থাকা ওয়াসেমের সামনে চায়ের ট্রে-টা রেখে দিয়ে সরে আসে। ওয়াসেম গোসলও করেছে তৃষ্ণাকে সত্যিটা বুঝাতে, যাতে তৃষ্ণা সত্যিটা বুঝে কষ্ট পায় আর চলে যায়। তৃষ্ণা এক পলক ওয়াসেমের দিকে তাকায়। দেখে সে গোসল করেছে। তৃষ্ণা এ দেখে মাথা নিচু করে নেয়, গোসল তো করবেই, এটাই স্বাভাবিক।
ওয়াসেম তৃষ্ণার তাকানো দেখে হেসে উঠে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার পাশে এসে দাঁড়ায় আর কটাক্ষ করে তাকে বলে, “কষ্ট হচ্ছে তৃষ্ণা তোর? হবার কথাই তো। তুই না চলে যা। তুই চলে গেলে আমি আরো বেশি এনজয় করতে পারব। চলে যা।”

তৃষ্ণা এটা শুনে কিছু বলে না, চুপচাপ বিছানার দিকে যায়। বিছানার অবস্থা দেখে তৃষ্ণার কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে। তার বুকের বাম পাশে যে চিনচিনে ব্যথাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা মনে হয় নীল বিষের মতো রক্তে মিশে যাচ্ছে। তৃষ্ণা কিছু বলছে না ঠিক, কিন্তু তৃষ্ণার হৃদয়ে দাউদাউ করে জ্বলছে এক না-বলা বিচ্ছেদের আগুন। শব্দরা আজ নির্বাক, কেবল ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি জানান দিচ্ছে তার এক বুক ফাটা আর্তনাদ।

তৃষ্ণার সারা শরীর কাঁপছে। তৃষ্ণা কাঁপা কাঁপা হাতে বিছানার চাদর তুলে নিয়ে মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলে, “আমি বিছানার চাদরটা ধুয়ে আসি, নাপাক হয়ে গেছে পুরো। আর কিছু নাপাক করেছেন? করলে দিন, ধুয়ে দেই।”
এই কথা শুনে তো ওয়াসেমের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। কী বলে এই মেয়ে? এতকিছু দেখার পরও এত নীরব? ওয়াসেম রেগে ঘরের দেয়ালে চায়ের কাপটা সজোরে ছুঁড়ে মেরে তৃষ্ণার দিকে বাঘের মতো ছুটে এসে তৃষ্ণার দুই হাতের নরম বাহু চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে, “শালী মাদাচু**দ, বেহায়া, বাইনচুদ! তোর কি রাগ হয় না? তুই কি মানুষ? তোর সামনে আমি আরেকজনের সাথে বিছানায় গেলাম আর তুই সেই বিছানার চাদর ধুয়ে দিবি?”

তৃষ্ণার বুকটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে। ব্যথায় দুই হাতের বাহু মনে হচ্ছে ছিঁড়ে যাচ্ছে। তৃষ্ণা তাও ওয়াসেমের দিকে তাকায় না। কেন জানি তাকাতে ইচ্ছে করছে না ওয়াসেমের দিকে আজ তার। ভেতরের কান্নাগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে তার। চিৎকার করতে চাইলেও কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। অন্তরের গহীনে এমন এক হাহাকার জেগেছে, যা প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে পাজর ভেঙে দিচ্ছে। একরাশ বিষণ্নতা পাথরের মতো বুকে চেপে বসে আছে, মনে হচ্ছে দম নিতে গেলেই সব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। অব্যক্ত অভিমানে বুকটা ভারি হয়ে আসছে তৃষ্ণার, দুচোখ ঝাপসা হয়ে নামতে চাচ্ছে শ্রাবণের অবিরাম ধারা।

তৃষ্ণা মাথা নিচু করেই নিজের হাত ওয়াসেমের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে, “আমি তো মানুষ না, আমি তো কুকুর। আর রাগ কেন হবে? আপনার ইচ্ছে, আপনার বাড়ি, আপনার ঘর। আপনি যাকে তাকে নিয়ে আসতে পারেন। আমি তো আপনার স্ত্রী নই যে এসব নিয়ে রাগ করব। কুকুরের আবার মানুষের উপর রাগ দেখানোর অধিকার আছে নাকি?”

তৃষ্ণার কথাটুকু শুনে ওয়াসেম স্তব্ধ। ওয়াসেম নিজের হাতের বাঁধন আরো শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে, “তুই এত বেহায়া কেন তৃষ্ণা? তুই এমন কেন? তোর কি গন্ডারের চামড়া?”
তৃষ্ণার অজান্তেই এই কষ্টে তার চোখের কোণ বেয়ে টুপ করে এক ফোঁটা পানি বেয়ে পড়ে। তৃষ্ণা চায়নি চোখের পানি পড়ুক, অনেক চেষ্টা করেছে আটকানোর, কিন্তু এই অবাধ্য চোখের পানি তার চেষ্টাটাকে গুঁড়িয়ে দিল। সে চায়নি এই পুরুষকে চোখের পানি দেখাতে। তৃষ্ণার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। চোখের জল থামার আর নাম নেই। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে শুধু দেখছে তার চারপাশটা মনে হয় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, তার শ্বাস নিতেও এখন বড্ড কষ্ট হচ্ছে। তৃষ্ণা ঢোক গিলে গলা পরিষ্কার করে, কারণ কান্না গলায় আটকে আছে। তৃষ্ণা মাথা নিচু করে বলে, “আমি তো… আমি তো এতিম। আমার তো যাওয়ার জায়গা নেই। থাকলে বিশ্বাস করুন, চলে যেতাম।”

ওয়াসেম তৃষ্ণার এই কথাগুলো শুনে আর কোনোপ্রকার কথা বলে না এ প্রসঙ্গে। উল্টো তৃষ্ণাকে ধমক দিয়ে বলে, “তৃষ্ণা, আমার দিকে তাকা। তৃষ্ণা, আমার দিকে তাকা তৃষ্ণা!”
তৃষ্ণা তাকাতে চায়নি কিন্তু ধমকের তীব্রতায় সে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। তৃষ্ণার চোখে পানি দেখে ওয়াসেম থমকায়। তৃষ্ণাকে ওয়াসেম কখনো কাঁদতে দেখেনি। তৃষ্ণার চোখে সে কখনো পানি দেখেনি আগে। তৃষ্ণার চোখে পানি দেখে ওয়াসেম শান্ত গলায় প্রশ্ন করে ওকে, “তুই কাঁদছিস তৃষ্ণা?”

তৃষ্ণা ওয়াসেমের প্রশ্নে দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “না, না তো। আমি কাঁদব কেন?”
“তোর কষ্ট হচ্ছে তৃষ্ণা, তাই না? আমি অন্য নারীর সাথে থেকেছি, সেটায় কষ্ট হচ্ছে তাই না?”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের প্রশ্নে কী উত্তর দিবে? ওয়াসেম জানে তৃষ্ণার কষ্ট হচ্ছে, তারপরও সে এই জঘন্য প্রশ্ন করছে। ওয়াসেম ইতিমধ্যে তৃষ্ণার এক হাত ছেড়ে দিয়েছে। তৃষ্ণা ছাড়া পাওয়া হাতে চোখের পানি মুছে নিতে নিতে ওয়াসেমকে বলে, “আমার কষ্ট হবে কেন? আপনি আমায় স্ত্রী হিসেবে মানেন না। তার মানে আপনি আমার জন্য একজন পরপুরুষ। আর একজন পরপুরুষ কার সাথে কী করল, তাতে আমার কষ্ট হবে কেন?”

“কী বললি? আমি তোর পরপুরুষ?”
“স… সেটাই তো!”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের কথায় মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়। জবাবটা এই জবাবটা ওয়াসেমের পছন্দ হয় না। ওয়াসেম চিৎকার করে এক হাতে তৃষ্ণার কোমর খামচে ধরে তাকে একদম নিজের কাছে টেনে নিয়ে দাঁত চেপে বলে, “তোর সাহস বেশি হয়ে গেছে। তুই এত বড় কথা বলিস? মুখ টেনে ছিঁড়ে দিব।”
ওয়াসেমের এমন আচরণে তৃষ্ণার পায়ের তালু পর্যন্ত ঘামছে। ওয়াসেমের এতটা কাছে সে কোনোদিন আসেনি। তার মধ্যে ওয়াসেম তার পেট খামচে ধরেছে। ওয়াসেমের উষ্ণ শ্বাস তার মুখে আছড়ে পড়ছে। তৃষ্ণা ভয়ে চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে আকুতি করে, “ভুল হয়ে গেছে, মাফ করে দিন। এমন করব না কখনো। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। আমাকে ছেড়ে দিন না, আমার না শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

ওয়াসেম এ কথা শুনে তৃষ্ণাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় আর বলে, “তোর মতো কুকুরকে ছোঁয়ার রুচি আমার নেই।”
তৃষ্ণা চুপচাপ দেয়ালের সাথে সেঁটে বসে থাকে। নিজের কপালের দোষ দিবে, নাকি নিজের দোষ দিবে খুঁজে পায় না তৃষ্ণা। প্রতিটাদিন ওয়াসেমের এই অসহ্য অপমানগুলো সহ্য করতে হয় তার। তার এই অবস্থা দেখে কোনো পশুরও মায়া হতো হয়তো।
ওয়াসেম তৃষ্ণাকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে। তার মনে হয় তার উচিত হয়নি তৃষ্ণাকে এভাবে আঘাত করা। তাই তাকে তুলে দাঁড় করানোর জন্য তৃষ্ণার দিকে যায়। ওয়াসেমকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তৃষ্ণার চোখে ভেসে ওঠে তার সৎ মা, যখন তার বাবাকে তার নামে মিথ্যা বিচার দিয়ে তাকে মার খাওয়াতো। তার বাবা তখন ঠিক এভাবে এগিয়ে এসে তাকে লাথি মারতো। হয়তো এখন ওয়াসেমও তাকে লাথি মারবেন এ ভয়ে তৃষ্ণা ফুপিয়ে ওঠে,

“আমাকে মাইরেন না! আমি তো দু’বেলা ভাত খাওয়ার লোভে আপনার সংসারে পড়ে আছি। এখান থেকে চলে গেলে কে আমাকে ভাত দিবে? আমি তো এতিম, আমার তো কেউ নেই।”
এ আর্তনাদ শুনে ওয়াসেমের পা আর এগোয় না, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায় ওয়াসেম। চেষ্টা করে এগিয়ে যেতে, তবে সে ব্যর্থ হয়। আজ এই প্রথম তৃষ্ণা তার সামনে কাঁদল। প্রতিবার সব গালিগালাজ হাসিমুখে সহ্য করে নিত। হয়তো মার খাওয়ার ভয়ে কাঁদছে। ওয়াসেমের মনে প্রশ্ন জাগে, হয়তো খুব বেশি মারত তাকে তার সৎ মা আর বাবা মিলে, তাই মার খাওয়ার ভয়েই এভাবে এখানে পড়ে আছে। তৃষ্ণা চুপসে গিয়ে গুটিশুটি মেরে বসে থাকে, অপেক্ষা করে ওয়াসেমের মারের। ওয়াসেম তাকে মারে না। সে গিয়ে তৃষ্ণার সামনে বসে আর তৃষ্ণাকে প্রশ্ন করে, “তোকে তোর বাবা আর সৎ মা মিলে অনেক মারত, তাই না?”

তৃষ্ণা ওয়াসেমের এমন নরম আচরণে বিস্ময় নিয়ে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। চোখের পানি দুই হাতে দ্রুত মুছতে মুছতে বলে, “না, না তো… মারত না তো।”
তৃষ্ণার মুখে মিথ্যা কথা শুনে ওয়াসেমের রাগটা আরো বেশি বেড়ে যায়। ওয়াসেম হাত বাড়িয়ে তৃষ্ণার চুলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে চুলের গুচ্ছ শক্ত করে ধরে আর চিল্লিয়ে ওঠে, “সত্যি কথা বল! মিথ্যা বলিস না তৃষ্ণা। ওরা তোকে মারত, তাই তুই মারের ভয়ে কাঁদছিস। নয়তো তোর মতো বেহায়া ভয় পাওয়ার মতো না। বল, সত্যি করে বল।”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে, “হ্যাঁ মারত। আমার বাবা, সৎ মা মিলে মারত, খুব মারত। উনিশ থেকে বিশ হলে মারত। অন্যের উপর রাগ হলে সে রাগ আমার উপর মেটাতো। আমাকে আমার সৎ মা আর বাবা কথায় কথায় খালি মারত। ওরা না আমাকে ভাত খাইতে দিত না। আমি এই মার খাওয়ার ভয় আর ভাত খাওয়ার লোভে এখানে কুকুরের মতো পড়ে আছি। আপনিও মারবেন? মারুন। আপনি মারলেও আপনার এখানে থাকলে আমি ভাত খেতে পারব। যতকিছুই হয়ে যাক, আমি এখান থেকে যাব না।”

ওয়াসেম তৃষ্ণার কথা শুনে তৃষ্ণার চুলের মুঠি ছেড়ে দেয়। খুব ইচ্ছে করে তার কেন জানি তৃষ্ণার চোখের পানিটুকু মুছে দিয়ে বলতে, “তোকে এখান থেকে যেতে হবে না। তুই থেকে যা এখানে।”
তৃষ্ণা ওয়াসেমকে চুপ থাকতে দেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। বিছানার চাদরটা ধুয়ে দিতে হবে যে। তৃষ্ণা এগিয়ে গিয়ে নিচে পড়ে থাকা বিছানার চাদরটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে নেয়, তখনি ওয়াসেম তৃষ্ণাকে পিছন থেকে ডেকে ওঠে, “তৃষ্ণা দাঁড়া।”

তৃষ্ণা ওয়াসেমের ডাকে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে চেয়ে প্রশ্ন করে, “বলুন।”
ওয়াসেম তৃষ্ণাকে ইশারা দিয়ে নিজের কাছে বসতে বলে। তৃষ্ণা ওয়াসেমের কাছে চুপচাপ এসে দাঁড়ায়। মন চায়নি আসতে, কিন্তু না এসে তো বাঁচার পথ নেই। তাই এসেছে। না এলে যদি মারে! তৃষ্ণার হাত টেনে ধরে ওয়াসেম তাকে নিজের পাশে বসায়। তৃষ্ণা বিস্ময় নিয়ে বসে গিয়ে ওয়াসেমকে জিজ্ঞেস করে, “কিছু প্রয়োজন আপনার? কিছু বানিয়ে দিব? কিছু ধোয়ার আছে?”
ওয়াসেম তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়, “না, প্রয়োজন নেই।”

“তাহলে ডাকলেন কেন?”
“ইচ্ছে হয়েছে ডেকেছি। তুই আমার চাকর, তুই এত প্রশ্ন কেন করছিস? চুপচাপ বসে থাক।”
তৃষ্ণা আর কথা বাড়ায় না। চুপ করে ওয়াসেমের ধরা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে ভাবে, “যে হাত দিয়ে আপনি আমার হাত ধরেন সবসময়, যে হাত দিয়ে আমার বাহু চেপে ধরেন, থুতনি চেপে ধরেন সেই হাত দিয়েই অন্য নারীকে ছুঁলেন? তার সুখের কারণ হলেন?”
তৃষ্ণাকে নিজের হাতের দিকে তাকাতে দেখে ওয়াসেম প্রশ্ন করে, “কী দেখিস?”
“অন্য নারীকে ছোঁয়া হাত দেখি।”
তৃষ্ণা আনমনে কথাটা বলে দেয়। তবে পরক্ষণেই ওয়াসেম কিছু সুধানোর আগেই বলে ওঠে, “না, না, না… কিছু না, এমনি দেখছি। কিছু না।”

ওয়াসেম তৃষ্ণার ভয় দেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “তুই খুব বোকা তৃষ্ণা। আমার মতো মানুষের সাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখছিস? তুই বড্ড বোকা তৃষ্ণা।”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের কথা শুনে দৃষ্টি নিচু করে বলে, “আমি স্বপ্ন দেখি না আপনার সাথে জীবন কাটানোর। আমি শুধু একটু মার আর গালমন্দ থেকে একটা জীবন চাই!”
“আমার সাথে থাকলে এমন জীবন পাবি না।”
“আপনি গালি দিলেও সমস্যা নেই, মারলেও সমস্যা নেই। আপনার এখানে থাকলে আমি ভাত খেতে পারি, শান্তিতে ঘুমাতে পারি। এতটুকুই যথেষ্ট আমার জন্য।”

ওয়াসেম তৃষ্ণার কথায় তার দিকে তাকায়। হয়তো বা একটু হলেও সে বুঝতে পারে, তৃষ্ণা একটু ভালো থাকার লোভেই আছে এখানে। সে নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে তৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, আমি যদি দাড়িটা কেটে চাপদাড়ি করি, তাহলে কেমন হবে?”
এটা শুনে তো তৃষ্ণা তব্দা খেয়ে যায়। ওয়াসেম তাকে জিজ্ঞেস করছে দাড়ি কাটলে কেমন লাগবে তাকে? তৃষ্ণা মাথা তুলে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। সত্যি তাকে? তৃষ্ণা আমতা আমতা করে মাথা নাড়ায়, “ভ… ভালো লাগবে।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৯

ওয়াসেম এটা শুনে তৃষ্ণার দিকে বিরক্তি নিয়ে চায়। শুধু ভালো লাগবে বলল কেন? অন্যকিছু কেন বলল না? সুন্দর লাগবে বললেও তো পারত। ওয়াসেম তৃষ্ণার হাত ছেড়ে দেয় আর বলে, “যা গিয়ে এই নাপাক চাদর ধুয়ে দে, যা।”
এটা বলে ওয়াসেম নিজেই উঠে চলে যায় রুম থেকে। তৃষ্ণা বুঝতে পারে না, এতদিন পর এই প্রথম এত সুন্দর ব্যবহার কী জন্য করল ওয়াসেম তার সাথে? তৃষ্ণা মনে মনে বলে, “ মানুষ হয়ে জন্মালোম ঠিকই, কিন্তু কপালটা কুকুরের চেয়েও অধম। একবেলার ভাতের জন্য মানুষের পায়ের কাছে পড়ে থাকতে হয়। আমার তো রক্ত-মাংসের সম্পর্ক বলতে কেউ নেই, তাই এই সংসারের লাথি-ঝাঁটাই এখন আমার আপন।আমার পেটের খিদে-ই তো আমার সবচেয়ে বড় দুশমন, যার লোভি-ই দিল আমায় বেহয়ায় উপাধি।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩১

1 COMMENT

Comments are closed.