Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৫
সানজিদা আক্তার মুন্নী

অন্ধকার বেলকনির এক কোণে, বেতের সোফাটায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে নাজহা। সে একদম নিথর, নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। দেখলে মনে হবে রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়, বরং দক্ষ ভাস্করের হাতে গড়া এক প্রাণহীন পাষাণমূর্তি। তার ভেতরকার প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের কোনো শব্দ বাইরে আসছে না। শুধু দুচোখের কোল ছাপিয়ে অবিরাম নেমে আসছে তপ্ত অশ্রুর ধারা। গাল বেয়ে সেই নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে বক্ষপিঞ্জরে। বুকের ঠিক মাঝখানটায় কে এক নামহীণ, লৌহকঠিন মুঠি দিয়ে চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে গেলেও বুকটা তীক্ষ্ণ ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠছে তার।

রাত তখন দশটা ছুঁই ছুঁই। আকাশের রূপ আজ বড় ভয়ংকর। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে আকাশটা ভেঙে পড়বে পৃথিবীর বুকে। অনেকক্ষণ ধরেই বিদ্যুৎ নেই। গোটা বাড়িটা এক জমাটবাধা, দমবন্ধ করা অন্ধকারে ডুবে আছে। সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকে চিরে হঠাৎ হঠাৎ নেমে আসছে বিজলির অন্ধকারী তীক্ষ্ণ আলো। টাশ! টাশ! কান ফাটানো সেই শব্দে গোটা আকাশ আর পৃথিবী থরথর করে কেঁপে ওঠছে। বিদ্যুতের এই এক পলকের আলোয় নাজহার ফ্যাকাশে, অশ্রুসিক্ত মুখখানা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর পরক্ষণেই তা আবার হারিয়ে যায় অতল অন্ধকারে।
হিমশীতল, বুনো বাতাস সজোরে ঝাপটা মারছে তার মুখে। এলোমেলো করে দিচ্ছে তার রুক্ষ চুলগুলোকে, কাঁপিয়ে তুলছে তার রুগ্ন, দুর্বল শরীরটাকে। কিন্তু নাজহার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বসে আছে এক বিধ্বস্ত লতার মতো। যে লতা ভয়ংকর কালবৈশাখীর আঘাতে শেকড়সহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, তবু মাটির মায়ায় কোনোমতে টিকে আছে। প্রকৃতির এই তাণ্ডবলীলা সে শূন্য দৃষ্টিতে দেখছে বটে, কিন্তু তার অবচেতন মন জানে, এর চেয়েও বহুগুণ ভয়ংকর এক তাণ্ডব আজ বয়ে গেছে তার নিজের জীবনের ওপর দিয়ে। তার পেটে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা এই ছোট্ট প্রাণটাকে তার রাখতেই হবে। এ আর কোনো ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। নয় কোনো মাতৃত্বের স্বাভাবিক চাওয়া। এ এক বাধ্যবাধকতা। মাত্র কিছুক্ষণ আগের কথা। বিবিজান, দাদাজান, ওয়াসেম, ইয়াদ, সবাই দলবেঁধে এসেছিল তার ঘরে। তারা হুমকি দিয়ে গেছেন তাকে। বিবিজানের বলেছেন। যদি পেটের বাচ্চার একটাও ক্ষতি করে সে, তালহা আর তোর ছোট চাচ্চুর লাশ ফেলে দিবেন তিনি জ্বিন লাগিয়ে দিবেন তার প্রিয়জনদের পেছনে। প্রথমটায় নাজহা বিশ্বাস করেনি। মুখে চাপা ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য নিয়ে সে প্রতিবাদ করেছিল, এসব সস্তা কুসংস্কার দিয়ে তাকে ভয় দেখানো যাবে না। কিন্তু বিবিজান থামেননি। তিনি একে একে এমন সব অকাট্য প্রমাণ তার সামনে তুলে ধরেছেন, পাই টু পাই। আর বলেছেন৷

“কালো জাদু করে মেরে ফেলব তোর আপনজনদের। একে একে সবার লাশ পড়বে তোর চোখের সামনে।”
নিজের চোখে নিজের মাস্টার চাচ্চুর গলাকাটা লাশ দেখেছে সে। আপনজনদের এমন বীভৎস মৃত্যু আর সে সইতে পারবে না। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই, মাথা নুইয়ে সে মেনে নিয়েছে এই অভিশপ্ত শর্ত। তবে সেও বিনা যুদ্ধে হার মানেনি, জুড়ে দিয়েছে নিজের একটি শর্ত। বাচ্চা হওয়ার ঠিক ছয় মাস পরই তৌসিরকে তাকে তালাক দিতে হবে। চিরতরে মুক্তি চাই তার এই দমবন্ধ করা বন্দিদশা থেকে।
তৌসির অবশ্য সেই কথায় হ্যাঁ বলেনি, টুঁ শব্দটিও করেনি। বিবিজানই দম্ভভরে বলে দিয়েছেন তৌসিরের হয়ে।
ওসময় পুরোটা সময় তৌসির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিথর, নির্বাক এক পাথরে খোদাই করা মূর্তির মতো। একটা শব্দও তার মুখ থেকে বের হয়নি। নাজহা বারবার তার দিকে আড়চোখে তাকিয়েছে। মনে মনে কতই না আশা করেছিল, অন্তত একবার, শুধু একবার তৌসির সামনে এসে দাঁড়াবে। বলবে, “এভাবে ওকে ধমকিও না, ও তো নিজেই ভেঙে পড়েছে।”

কিন্তু না। সেই সান্ত্বনার বাণী তার মুখ থেকে বের হয়নি। উল্টো সে নীরব থেকে তার পরিবারের এই জঘন্য কাজের সঙ্গ দিয়েছে। অবশ্য তৌসিরের এই নীরবতার পেছনের অসহায়ত্বও আছে। তৌসিরতো তার পা জড়িয়ে ধরেছিল সন্তানের জানের জন্য। তবে নাজহাকে রাজি করাতে পারেনি। নিজের অনাগত সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে শেষমেশ সে পরিবারের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। বাবা হওয়ার আগেই তৌসির আজ এক পরাজিত, অসহায় বাবা। যে নিজের সন্তানের জান নিজের স্ত্রী কে পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়ে গেছে।
নাজহার পরিস্থিতি আজ এমনই যে, সে চাইলেও ফোন করে কাউকে নিজের এই বিপদের কথা বলতে পারবে না। বিবিজান নিষেধ করেছেন তাকে। আর বিবিজান, সেই কালো জাদুর কীট, অমানবিক আর হিংস্র ওই মহিলা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তার কথার এতটুকু খেলাফ হলেই তালহা ভাইয়ের লাশটা পড়বে সবার আগে। কীভাবে সাহস করবে নাজহা? তার সেই শক্তি কোথায়?

আজ নাজহার নিজেকে তার একটি সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল মনে হচ্ছে, যাকে যেদিকে খুশি ঘোরানো যায়। তার প্রতিবাদের ভাষা আজ চিরতরে স্তব্ধ। লড়াই করার শেষ শক্তিটুকুও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অন্ধকারে বসে বৃষ্টির ছাট খেতে খেতে হঠাৎ করেই ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। বুকের ভেতরটা কাচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে। কেন তার নিয়তি এত নিষ্ঠুর? মায়ের স্নেহ সে কোনোদিন পায়নি। ভাইয়ের শাসনমাখা আদর তার কপালে জোটেনি। যাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল, তাকে সে নিজের বলে কখনো ছুঁতেও পারেনি। আর যার সঙ্গে স্বার্থের বেড়াজালে আটকে বিয়ে হলো, সে তাকে ভালোবাসেনি। আগলে রাখেনি। বিপদের সময় একটিবারও তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়নি।

সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো, আজ নিজের গর্ভের সন্তানকেও তার দুশমন ভাবতে হচ্ছে। যে সন্তানের অস্তিত্বের কথা জেনে গতকাল রাতেও সে আনন্দে কেঁদে ভাসিয়েছিল, আজ সেই সন্তানই তার বুকে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা এক দাবানল। প্রথমবার তালহা ভাইয়ের প্রাণের স্পন্দন টিকিয়ে রাখতে তাকে এই বিয়েতে বাধ্য হতে হয়েছিল। নিতে হয়েছিল ছলনার আশ্রয়। আর এবার চাচাদের ও তালহা ভাইয়ের প্রাণের জন্য, যাকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে, সেই মানুষটার সন্তানকে নিজের পেটে ধারণ করতে হচ্ছে। তৌসিরকে তার কৃতকর্মের শাস্তি দেওয়ার একমাত্র উপায় ছিল এই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দেওয়া। সেই শেষ অস্ত্রটাও আজ তার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হলো।
নাজহা নিজেকে সামলাতে চায়। দুই হাতে মুখ ঢেকে প্রাণপণে চেষ্টা করে কান্না থামাতে। কিন্তু পারে না। চোখের পানি আজ আর কোনো বাঁধ মানছে না।

এতক্ষণে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে।বৃষ্টির পশলা তীব্র বেগে এসে তার চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। নাজহার শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত। সারা গা টনটন করে ব্যথা করছে আঘাতের ব্যাথায় সাথে তো অল্প বয়সে কনসিভ করায় শরীরটা আরও ভেঙে পড়েছে। প্রতিটি পেশি, প্রতিটি হাড় এই ধকলের প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
অথচ, গতকাল রাতেও এক সুখের আবেশ ছিল তার মনে! তৌসিরের চাচির কাছ থেকে চুপিচুপি প্রেগন্যান্সি কিট এনে যখন বাথরুমে টেস্ট করেছিল, যখন দেখেছিল দুটো লাল দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, তখন তার দুই চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল। কিন্তু সেই চোখের পানি ছিল প্রাপ্তির, আনন্দের। সে ভেবেছিল সকালে বা বিকেলে তৌসিরকে বলবে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে কনফার্ম হওয়ার জন্য। সে এও ভেবেছিল, হয়তো এই ছোট্ট প্রাণটাই তৌসিরকে বদলে দেবে। কিন্তু না, সব খুশি, সব স্বপ্ন এক রাতের ব্যবধানে বিভীষিকায় রূপান্তরিত হয়ে গেল।

নাজহা আর বসে থাকতে পারে না। ধীরে ধীরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ওর দুর্বল পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। শরীরটা টলছে মাতালের মতো। বেলকনির লোহার রেলিংটা শক্ত করে খামচে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নেয় সে। এরপর ধীর, ক্লান্ত পায়ে অন্ধকার ভেদ করে নিজের রুমের ভেতর প্রবেশ করে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে একটা টর্চলাইটের হলুদ আলো প্রবেশ করে ঘরের ভেতর। আলোর রেখাটা প্রথমে মেঝের ওপর পড়ে, তারপর ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসে। হাতে খাবারের একটা ট্রে নিয়ে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে তৌসির।
নাজহা একবারও তাকায় না তৌসিরের দিকে। একবারও না। তার শরীরী ভাষায় এমন এক উপেক্ষা, যাতে মনে হচ্ছে তৌসির নামের কোনো মানুষের অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই। সে নিঃশব্দে গিয়ে বিছানার এক কোণে বসে পড়ে।
তৌসির ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। নাজহার সামনে খাবারের ট্রেটা নামিয়ে রেখে খুব ছোট্ট করে, প্রায় ফিসফিসিয়ে, কাঁপা গলায় বলে ওঠে,

“খাবার টা খেয়ে নে। ”
কথাটা আর শেষ হলো না বাইরে ঠিক তখনই আবারও এক কান ফাটানো শব্দে বিজলি চমকায়! সেই এক ঝলক তীব্র নীলচে আলোয় দুজনের মুখ মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নাজহা খুব ধীরে, অসম্ভব ধীরগতিতে নিজের ডান হাতটা বাড়ায়। সামনের প্লেটটা তুলে নেয় নিজের কোলে। তার শীর্ণ আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। না, একে ঠিক কাঁপা বলা যায় না। মনে হচ্ছে, প্রাণহীন কাঠের কয়েকটা টুকরো ভুল করে কোনো জাদুবলে নিজে থেকেই নড়েচড়ে ওঠছে। প্লেটের ওপর ভাতের ধবধবে সাদা স্তূপ, পাশে রাখা তরকারি থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠা হালকা গরম ধোঁয়া, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে উঠে আসা মশলার ঘ্রাণ। সবকিছু মিলেমিশে নাজহার নাকে এসে লাগে অদ্ভুত এক বমি উদ্রেককারী গন্ধ। স্পষ্ট এক বিষের মতো গন্ধ।

নাজহার কাছে এখন আর এটা কোনো সাধারণ খাবার নয়। এটা তীব্র হলাহল বিষ। তাও তাকে এটা গিলতে হবে। কারণ তার এই অভিশপ্ত, লাঞ্ছিত শরীরটা এখনো পৃথিবীতে টিকে আছে। আর নির্লজ্জের মতো, একগুঁয়েমির সাথে সে শুধু বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে।
এক লোকমা ভাত তুলে নাজহা এবার মুখের ভেতর পুরে দেয়। দাঁত দিয়ে চিবোয় না পর্যন্ত। মৃত মানুষের মতো গিলে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু ভাতের দলাটা গলার কাছে এসে ঠিকই আটকে যায়। ধারালো মাছের কাঁটার মতো বিঁধে থাকে সেখানে, কোনোভাবেই আর নিচে নামতে চায় না। নাজহা শক্ত করে চোখ বুজে এক ঢোক পানি মুখে নেয়, তারপর একপ্রকার জোর করেই খাবারটা নামিয়ে দেয় পাকস্থলীতে। এরপর আবার এক লোকমা ভাত মুখে নেয়। আবার এক ঢোক পানি খায়। তারপর আবার এক লোকমা নেয় নিয়ে গিলে। তাকে দেখে মনে হবে হয়তো কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা এক কাঠের যান্ত্রিক পুতুল। শুধু প্রোগ্রাম করা নির্দিষ্ট নিয়মে সে তার কাজ করে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ প্রাণহীন এবং অনুভূতিহীন এক অস্তিত্ব। হাত ওপরে উঠছে, মুখ খুলছে, গলা দিয়ে খাবার নামছে, সবকিছু একদম ঠিকঠাক চলছে। শুধু সেই যান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরের আসল মানুষটাই মরে ভূত হয়ে গেছে।

তৌসির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নাজহার দিকে। তার সেই দৃষ্টি একেবারে শূন্য এবং নিষ্প্রাণ। বুকের ভেতরটা তীব্র হাহাকারে খাঁ খাঁ করছে তার। মনে হচ্ছে, নিষ্ঠুর কোনো জন্তু তার বুকের ভেতরের সবকিছু ধারালো নখ দিয়ে খুবলে নিয়ে গেছে। সেখানে রেখে গেছে শুধু এক ধু ধু বিরান প্রান্তর, যেখানে এক ফোঁটা প্রাণের চিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই। নাজহার কালচে সবুজ টানা টানা চোখ দুটো এখন তাজা রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। অঝোর কান্নায় ফুলে ঢোল হয়ে আছে তার তিলোত্তমা-ময়ী শুভ্র মুখটা। চোখের নিচে গাঢ় কালশিটে দাগ, মনে হচ্ছে কেউ অযত্নে আঙুল দিয়ে কালো কাজল লেপে দিয়েছে সেখানে। ঠোঁট দুটো একদম শুকনো এবং ফেটে চৌচির। তৌসিরের মনে হচ্ছে, তার সামনে বসা এই বিপর্যস্ত মানুষটা আর তার সেই পুরোনো নাজহা নেই। এটা শুধু একটা মানুষের শূন্য খোলস। নাজহার ভেতরের তাজা প্রাণটা কোথায় চিরতরে হারিয়ে গেছে, আর পেছনে ফেলে রেখে গেছে নিষ্প্রাণ এই পাথরের মূর্তিটাকে।

আর একটি জীবন্ত মানুষের এভাবে পাথর হয়ে ওঠার পেছনে যে মানুষটি পুরোপুরি দায়ী, সে আর কেউ নয়। সে নিজে। তৌসির শিকদার সে নিজে। তীব্র আফসোসে তৌসিরের বুকের ভেতরটা দাবানলের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। অনুশোচনার যন্ত্রণায় ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এখন আর এসব করে কী লাভ? তাদের দুজনের মাঝে যে বিশাল দূরত্ব ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে, তা হাজার কোটি আলোকবর্ষেরও বেশি। যে পথ একবার মাঝখান থেকে দুদিকে ভেঙে যায়, সেই পথ আর কোনোদিন এক মোহনায় এসে মেলে না। তৌসিরের এখন এই নির্মম পরিণতি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। শুধু নিজের জমানো আগুনে দগ্ধ হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। নিঃশব্দে এবং ধীরে ধীরে, ভেতর থেকে পুড়ে ছাইয়ে মিশে যাওয়াটাই এখন তার একমাত্র নিয়তি। নাজহার এই যন্ত্রের মতো নির্বিকার ভঙ্গিতে খাবার গিলে চলার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে তৌসির আর সহ্য করতে পারে না। তার বুকের গহীন থেকে একটা চাপা গোঙানি জেগে উঠতে চায়, কিন্তু গলার কাছে এসে কোনোমতে আটকে থাকে সেটা। নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস একত্র করে, অত্যন্ত নরম এবং আলতো গলায় সে বলে,

“এত জোর করে না খেলেও হবে। ভাত খেতে যদি না পারিস, বল, আমি অন্যকিছু নিয়ে আসি।”
তার প্রশ্নে ঘরের ভেতর কোনো উত্তর ধ্বনিত হয় না। নাজহা কথাগুলো কানেই তোলে না। নাজহা শুনেছে, কিন্তু সামনে বসা এই অপরাধীর অস্তিত্বটুকুও তার কাছে আর অনুভবের যোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। তার কাছে এখন এই ঘরে তৌসির শিকদার নামের কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। সেখানে বসে আছে শুধু একটা কালো ছায়া। তীব্র ঘৃণার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সে নিজের মনে অবলীলায় আরেকটা লোকমা মুখে তুলে নেয়। তার হাবভাব এমন, যেনো পাশে কোনো মানুষ নেই, যেনো কথাগুলো ভেসে আসছে বহুদূরের কোনো পরিত্যক্ত রেলওয়ে স্টেশনের ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম থেকে।

তৌসির এক বুক ভারী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ভারী পা জোড়া টেনে টেনে সে খাটপাসীর ড্রয়ারের কাছে যায়। সেখান থেকে বের করে আনে ব্যথার ওষুধের পাতা আর ক্ষতের মলম রাখা ছোট কৌটোটা। নাজহার সামনে রাখা ট্রেতে সেগুলো একে একে সাজিয়ে রাখে সে। তারপর আস্তে করে সাবধানে, প্লেটটা নাজহার হাত থেকে নামিয়ে নিয়ে বলে,
“ওষুধ খাও। জোর করে আর খেতে হবে না।”
নাজহা এবারও সম্পূর্ণ নিরুত্তর থাকে। অবিকল যন্ত্রের মতো পানির বাটিতে নিজের হাত ধুয়ে নেয় সে। তারপর আগের মতোই যান্ত্রিক ভঙ্গিতে ওষুধগুলো গিলে ফেলে। তার চোখে মুখে কোনো প্রশ্ন নেই। ঠোঁটে কোনো প্রতিবাদ নেই। বুকে নেই কোনো অভিযোগ। পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাও আজ নাজহার কাছে একটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। ঠিক দম দেওয়া পুতুলের মতো, যতক্ষণ দম আছে শুধু ততক্ষণই চলবে।
তৌসির আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ট্রে হাতে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

নাজহার বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে পাথর চাপা দিয়ে রাখা কান্নার বাঁধটা হঠাৎ মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ে। দুহাতে নিজের মুখ শক্ত করে চেপে ধরে হু হু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ও। তার এই গগনবিদারী কান্নাটুকু শুধু গলা থেকে আসছে না। তা জন্ম নিচ্ছে শরীরের প্রতিটা কোষ থেকে আলাদা আলাদা ভাবে। তার মস্তিষ্কের প্রতিটা স্নায়ু অবিরাম চিৎকার করছে। তীব্র ব্যথায়। দুঃসহ যন্ত্রণায়। বিছানার বালিশটা দুহাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে নাজহা। দাঁত দিয়ে সজোরে কামড়ে ধরে বালিশের কাপড়টা, যাতে কান্নার শব্দ এক ফোঁটাও কোনোভাবে ঘরের বাইরে যেতে না পারে। তার মনে হয়, এই মুহূর্তে যদি একটা ধারালো ছুরি নিজের হাতের কাছে পেত, তবে নির্দ্বিধায় সেটা নিজের গলায় চালিয়ে দিত সে। চিরতরে শেষ করে দিত তার এই অভিশপ্ত আর কলঙ্কিত অস্তিত্ব। সারা শরীর দাউদাউ করে জ্বলছে তার। এই জ্বলুনি শুধু শারীরিক ব্যথায় নয়, বরং এক চাপা ক্রোধ আর ভয়ংকর প্রতিশোধের আগুনে। এ এমন এক লেলিহান আগুন, যা পৃথিবীর কোনো পানিতে নিভবে না, এমনকি দীর্ঘ সময়ের স্রোতেও শীতল হবে না।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায় এভাবেই।
কাঠের দরজাটা ঠেলে তৌসির আবার ঘরের ভেতর ঢোকে। ঘরে পা রাখতেই তার চোখ যা দেখে, তা দেখে বুকের ভেতরটা আরেকবার অদৃশ্য কোনো নিষ্ঠুর হাতের থাবায় খামচে ধরে।
নাজহা বিছানার একদম এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। গলা পর্যন্ত টেনে নিয়েছে মোটা কাঁথাটা। তার মুখ ফেরানো উলটোদিকের দেয়ালের দিকে। আর তাদের দুজনের শোয়ার জায়গার ঠিক মাঝখানে সীমানাপ্রাচীরের মতো রাখা আছে একটা কোলবালিশ।
এটা একটা বালিশ নয়, এটা একটা অলঙ্ঘনীয় সীমানা।
ইস্পাতের তৈরি এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এক নিঃশব্দ কঠিন ঘোষণা, আপনি আমার কাছে আসবেন না, কোনোভাবেই ছোঁবেন না আমাকে।

তৌসির আরও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনেক লম্বা, ভারী আর ঠিক পাথরের মতোই কঠিন এক দীর্ঘশ্বাস। ফ্যান আর লাইটের সুইচ সে একে একে নিভিয়ে দেয়। চোখের পলকে পুরো ঘরটা ডুবে যায় অন্ধকারে। শুধু জানালার পর্দার ফাঁক গলে চুঁইয়ে আসা সামান্য চাঁদের আলো এসে পড়ে বিছানার ঠিক একপাশে। সেই ম্লান, রুপালি আলোয় নাজহার শুয়ে থাকা শরীরের রেখাটা আবছাভাবে দেখা যায়। মনে হয় এক শুয়ে থাকা ব্যথার প্রতিমূর্তি, এক জীবন্ত বিষাদময় শোকগাথা পড়ে আছে সেখানে।
ড্রয়ার থেকে ক্ষতের মলমের কৌটোটা হাতে নিয়ে তৌসির বিছানায় ওঠে। খুব ধীরে এবংসাবধানে সে নাজহার দিকে এগোয় তবে মাঝখানে রাখা সেই সীমানার বালিশটা সে পেরোয় না, বরং সেটার এপাশেই নিজের জায়গা করে বসে। তারপর থরথর করে কাঁপা হাতে আলতো করে নাজহার বাহুতে স্পর্শ করে ওকে ডাকে,
“নাজহা, মলমটা লাগিয়ে দিই। ড্রেসটা একটু খুল তো।”

তৌসিরের হাতের উষ্ণ স্পর্শ শরীরে লাগতেই নাজহার সর্বাঙ্গে দশ হাজার ভোল্টের এক বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক প্রবল ঝটকায় বিছানা ছেড়ে উঠে বসে সে। তারপর হিংস্র, প্রায় ক্ষিপ্ত পশুর মতো এক জোরালো ধাক্কায় তৌসিরকে ছিটকে সরিয়ে দেয় নিজের কাছ থেকে। এতে তৌসিরের হাতের মলমের কৌটোটা ছিটকে গিয়ে বিছানার অন্য কোণে গড়িয়ে পড়ে। পরমুহূর্তেই তীব্র আক্রোশে চিৎকার করে ওঠে নাজহা,
“আমার শরীরে একদম হাত দেবেন না! আপনাকে আমার প্রচণ্ড ঘৃণা লাগে! আপনার ছোঁয়া লাগলে আমার সমস্ত শরীর রি রি করে ওঠে। আমার মনে হয়, নোংরা কোনো পোকা বাসা বেঁধেছে আমার ওই জায়গায়!”
তৌসির কথাগুলো শুনে একেবারেই স্থির হয়ে যায়। ওর বাড়ানো হাতটা শূন্যের মাঝপথেই আটকে আছে। ও নিজের আঙুলগুলো মুঠো করতেও পারছে না, আবার সোজা করে খুলতেও পারছে না। নাজহার বলা কথাগুলো কান দিয়ে ঢুকে সোজা তার বুকের ভেতর গিয়ে তীরের মতো বিঁধেছে। তীক্ষ্ণ, রক্তাক্ত এবং প্রাণঘাতী বিষাক্ত সেই তির। বেশ কিছুক্ষণ বোবা হয়ে বসে থাকে তৌসির। তারপর আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে দূরে গড়িয়ে যাওয়া মলমের কৌটোটা তুলে নেয়। সেটা নাজহার দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে দেয়। ওর গলাটা এখনো কাঁপছে, তাও নিজের কণ্ঠস্বরকে স্বাভাবিক আর সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলে,

“এটা লাগা। তোর হাত দিয়ে তুই নিজেই লাগিয়ে নে তাহলে।”
নাজহা কৌটোটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় না। মলমের ছোট কৌটোটা অযত্নে পড়ে থাকে দুজনের ঠিক মাঝখানে, সেই সীমানার বালিশটার ওপর। এই ভয়ংকর মুহূর্তের এক টুকরো নীরব সাক্ষী হয়ে। এক টুকরো জমে যাওয়া সময় হয়ে। ক্ষোভে নাজহার ফাটা ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। তার টানা টানা কালচে সবুজ নয়ন জোড়ায় চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করে ওঠে। কিন্তু সেটা কোনো জমানো অশ্রু নয়, সেটা হলো লেলিহান আগুনের ফুলকি।কালকূট বিষ মাখানো গলায় ও বলে,
“আমি আপনাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ঘৃণা করি, তৌসির শিকদার। আপনি আমার সাথে যে জঘন্য কাজ করেছেন, তারপর আর কোন মুখে আপনি আমার সামনে এসে কথা বলার সাহস পান?”
তৌসির পলকহীন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার মুখের দিকে। এই সেই মুখের ন্যায় যে মুখে একসময় তৌসিরকে দেখলেই ফুটে উঠত এক টুকরো লাজুক, লজ্জামাখা হাসি। আর সেই একই মুখ আজ শুধুই ঘৃণার এক জীবন্ত মূর্তি ধারণ করেছে। তৌসির নিরলস গলায় বলে,

“আমার দোষ আমি পুরোপুরি মানি। কিন্তু আমার করা দোষের শাস্তি তুই আমার নিষ্পাপ সন্তানরে দিবি? ও কি শুধুই আমার সন্তান? তোর পেটের সন্তানকে তুই কোনোভাবেই তোর পেটে রাখতে চাস না। কত আকুতি মিনতি করলাম তোর কাছে, কিছুই শুনলি না তুই। তারপর বিবিজান তোকে তোর আপনজনের ভয় দেখানো ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পায়নি। আর বিশ্বাস কর, আমারও তখন আর কিছু করার ছিল না।”
তৌসিরের কথাগুলো শেষ হতেই নাজহা হঠাৎ করেই শব্দ করে হেসে ফেলে। তীক্ষ্ণ, ধারালো এবং রক্তঝরানো এক হাসি। সেই হাসি চামড়ার চাবুকের মতো সপাং করে এসে আছড়ে পড়ে তৌসিরের উন্মুক্ত বুকে, নিমিষেই ছিন্নভিন্ন করে দেয় তার ভেতরের বেঁচে থাকা শেষ ভরসাটুকুও। তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞার সেই হাসি থামিয়ে নাজহা কঠিন স্বরে বলে,

“আপনাদের কি মনে হয়, এই অশুভ সন্তানকে আমি আমার পেটে সযত্নে ধারণ করে রাখব? আপনজনের ভয় দেখালেই আমি বাধ্য হয়ে তাকে রাখব? এই পশুর বাচ্চাকে আমি কোনোদিনও আমার গর্ভে রাখব না, তৌসির শিকদার। কিছুতেই রাখব না! আজ না হোক কাল, এর নোংরা অস্তিত্ব আমার পা বেয়ে দূষিত রক্ত হয়ে ঠিকই মাটিতে গড়িয়ে পড়বে। আপনি শুধু নিজের চোখে দেখে নিয়েন। এই অজাচিত সন্তানের একদম জানাজাহীন মৃত্যু হবে। ঠিক যেমন নির্মম মৃত্যুটা আমার চাচ্চুর হয়েছিল।”
কথাগুলো শুনে তৌসিরের বুকের ভেতর তীব্র হাহাকার করে ওঠে এক অনামা ধ্বংসাত্মক ঝড়। সেই হাহাকার চিৎকার হয়ে বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে আটকে থাকে। সে সম্পূর্ণ নিশ্চল হয়ে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করে নাজহা কে,
“আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা তো একদম নির্দোষ। ওরে কি তোর পেটে একটুখানি ঠাঁই দেওয়া যায় না? ওর তো পৃথিবীর কোনো দোষ নাই। ও তো এসবের কিছুই জানে না।”
নাজহার বিষ খেয়ে বিষ হজম করার মতো করে বলে,

“ওর কোনো দোষ নেই? ওর শুধু একটাই সবচেয়ে বড় দোষ, আর সেটা হলো ও আপনার সন্তান। আর আমি, আমার নিজের চাচ্চুর খুনির সন্তানকে কেন নিজের পেটে ধরব? ঠিক কোন দুঃখে আমি আপনার মতো এক অমানুষ জানোয়ারের বাচ্চাকে এই পৃথিবীতে জন্ম দিতে যাব?”
নাজহার ছুড়ে দেওয়া প্রতিটা শব্দ বন্দুক থেকে বের হওয়া একেকটা জ্বলন্ত বুলেট। আর সেই বুলেট তৌসিরের বুক ফুঁড়ে সেগুলো এপাশ থেকে ওপাশ বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা বিষাক্ত শব্দের সাথে বুকের ভেতর থেকে এক টুকরো করে তাজা মাংস নির্মমভাবে ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। তাও তৌসির হাল ছাড়ে না, সবটুকু শক্তি জড়ো করে শেষ একটা চেষ্টা করে বলে,
“এই সন্তান তো তোরও শরীরের অংশ। নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানকে নিয়ে এমন ভয়ংকর কথা বলতে তোর কলিজায় একটুও লাগে না?”

“না, একটুও লাগে না।আমার কলিজা তো আপনি বহু আগেই আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছেন। তাহলে নতুন করে আর লাগবে কীভাবে? এই সন্তান আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলের ফসল। আজ এই সন্তান আমার কোনো শখের নয়, কোনো পবিত্র ভালোবাসার নয়, বরং সে হলো আমার তীব্র ঘৃণার এক জীবন্ত প্রতীক।”
তৌসিরের বুকটা এবার সত্যি সত্যিই মড়মড় করে ভেঙে পড়ে। সেই অন্তর ভাঙার শব্দটা সে নিজেই নিজের কানে শুনতে পায়। বুকের ঠিক ভেতরে, একেবারে গভীরে, একটা দামি কাচের জিনিস ধীরে ধীরে চৌচির হয়ে ভেঙে পড়ার মতো সেই শব্দ। যে ভয়ংকর তৌসির শতাধিক মানুষ অবলীলায় খুন করতে পেরেছে। যার নিষ্ঠুর হাত একটুও কাঁপেনি জলজ্যান্ত তৌসিরের কলিজা টেনে ছিঁড়ে আনতে। যার পাষাণ রুহু একবারও কাঁপেনি লাশের স্তূপ আর রক্তের নদী বইয়ে দিতে। সেই তৌসিরই আজ নিজের মাত্র তিন সপ্তাহ বয়সী এক ছোট্ট ভ্রূণের জন্য কুকুরের মতো কাতরাচ্ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বুকের ভেতরে, একেবারে নিঃশব্দে। দুহাত পেতে প্রাণের ভিক্ষা চাইছে নাজহূর কাছে। যে হাতে একদিন শুধুই অসংখ্য মানুষের মৃত্যু লেখা ছিল, তার সেই অভিশপ্ত হাত আজ এক ফোঁটা নতুন প্রাণের জন্য কেঁপে কেঁপে সামনের দিকে এগিয়ে আছে।
তৌসির বুক চিরে এক তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। তার সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে পৃথিবীর সমস্ত গ্লানিময় পরাজয়, সমস্ত করুণ আকুতি আর সমস্ত আশা ভাঙনের শব্দ। ওর কণ্ঠটা আর কোনোভাবেই সংযত থাকে না, পুরোপুরি কেঁপে ভেঙে পড়ে,

“আমার সন্তানের জানটা শুধু আমায় তুই ভিক্ষা দে। তোর কাছে আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নাই।”
নাজহা আবার সেই তাচ্ছিল্যভরা হাসি হাসে। খুবি ছোট্ট, ধারালো আর নিষ্ঠুর এক হাসি। ঠোঁটের এক কোনা সামান্য বেঁকে যাওয়া এক বাঁকা হাসি। যে হাসিতে কোনো মানবীয় উষ্ণতা নেই ও হেসে ওঠে বলে,
“এই সন্তানের জন্ম আমি কোনোদিনও দেব না, তৌসির শিকদার।”
কথাটা সাবলীলভাবে বলে নাজহা আবার ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নিজের মুখ ঘুরিয়ে নেয় দেয়ালের দিকে। তৌসির বেশ কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে থাকে। নিজের হাতে ধরা মলমের কৌটোটা অত্যন্ত ধীরে ধীরে বিছানার ওপর নামিয়ে রাখে সে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে অবসন্ন গা এলিয়ে দেয়। বুকের ওপর নিজের একটা হাত শক্ত করে চেপে রাখে। ওর মনে হয় ভেতরের সেই দগদগে ক্ষতটা হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখলে রক্তক্ষরণ হয়তো একটু কম হবে। ঠিক গতকাল রাতেও, হ্যাঁ, ঠিক এই সময়টাতেই সে নাজহার নরম বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিল। কত রকমের দুষ্টুমি করছিল, মিঠা খুনসুটিতে মেতে ছিল দুজন। নাজহা খিলখিল করে হাসতে হাসতে অতি আদরে তার চুল টেনে দিয়েছিল।

আর আজ? মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার নির্মম ব্যবধানে তাদের দুজনের মাঝে গড়ে উঠেছে হাজারো আলোকবর্ষের এক বিস্তর দূরত্ব। বিছানার ঠিক মাঝখানে রাখা সেই কোলবালিশটাই এখন এক ভয়ংকর উত্তাল সমুদ্র। যে সমুদ্র সাঁতরে পেরিয়ে যাওয়ার সাধ্য আজ আর কারও নেই। এই সমুদ্রে কোনো ঢেউ নেই, কোনো শব্দ নেই, কোনো কূল বা কিনারা নেই। আছে শুধু এক ঘোর অন্ধকার অতল গহ্বর।
তৌসির জ্যান্ত লাশের মতো বিছানায় শুয়ে থাকে। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সেই দৃষ্টির কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। বুকের ভেতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করে তার। মনে হচ্ছে কেউ গোটা একটা সাহারা মরুভূমি এনে বসিয়ে দিয়েছে সেখানে, যেখানে একবিন্দু জলের মতো সামান্য হাওয়ার অস্তিত্বও মৃত। তার মনে হয়, সে-ই বুঝি এই পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগা, সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষ। যার আপন বলতে এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই। থেকেও কেউ নেই।

ঠিক পাশেই শুয়ে আছে তার সবচেয়ে প্রিয় নারী। তার নিজের রক্তের সন্তান তিল তিল করে বেড়ে উঠছে যার গর্ভে। অথচ তাদের দুজনের মাঝখানে এখন এই এক দূরত্ব, যা পৃথিবীর সমস্ত কঠিন দূরত্বকে অনায়াসেই হার মানিয়ে দিবে হয়তো। হাত বাড়ালেই যাকে ছোঁয়া যাচ্ছে অথচ কোটি কোটি জন্ম কেটে গেলেও যার মনের কাছে আর কোনোদিন পৌঁছানো যাবে না।
দেয়ালঘড়ির কাঁটা এখন ঠিক রাত চারটের ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। নিঝুম রাত। চারপাশের পৃথিবীটা নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। নিরেট এক নীরবতা, যা কান পাতলে বুকের ভেতর একধরনের হাহাকার তৈরি করবে। মনে হয় গোটা জগৎ হঠাৎ করে একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে নাজহা। ওর চোখ দুটো একদম শুকনো, টকটকে লাল আর ফুলে ওঠা। সারাটা রাত এক ফোঁটা ঘুম নামেনি ওর ক্লান্ত দুচোখে। ঘুম আসেনি,। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় এমনভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, ঠিক অদৃশ্য কোনো পিশাচ নিজের রুক্ষ মুঠোয় ওর পুরোটা হৃদয় চেপে ধরে নিংড়ে দিচ্ছে। একটু একটু করে, ধীরগতিতে, অথচ কী ভয়ংকর নির্মমভাবে! ক্লান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করলেই বীভৎস দৃশ্যটা চোখের পর্দায় আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। স্পষ্ট ভেসে ওঠে মাস্টার চাচ্চুর গলা কাটা রক্তমাখা লাশটা। উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রক্তের কালচে স্রোত, আর তৃষ্ণার্ত কোনো বন্য জীবের মতো সেই রক্ত চুষে নিচ্ছে শুষ্ক মাটি। নিথর রক্তাক্ত দেহটা পড়ে আছে এক পাশে।

নাজহার বুকের ভেতরটা কষ্টে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। গলা ঠেলে বারবার বেরিয়ে আসতে চাইছে একটা গগনবিদারী চিৎকার, ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা। অথচ কোনোভাবেই পারছে না সে। জমাট বাঁধা কান্নাগুলো ঠিক গলার কাছে এসে ভারী পাথর হয়ে আটকে আছে। নিচে নামছেও না, আবার ঠোঁট গলে বেরোচ্ছেও না। শুধু ভেতরে ভেতরে ধিকধিক করে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে ওর অস্তিত্ব।
বুক চিরে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে নাজহার। শরীরটা টেনে ধীরে ধীরে উঠে বসে সে। বিছানার চাদরটা হাতের আঙুলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কিছুক্ষণ পাথরের মতো স্থির হয়ে থাকে, বুঝি নিজেকে একটু গুছিয়ে নিচ্ছে ভয়ংকর কোনো অনিবার্য সিদ্ধান্তের জন্য। এরপর নিঃশব্দ পায়ে সে নেমে আসে ঠান্ডা মেঝেতে। ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় খাটপাশের পুরোনো কাঠের ড্রয়ারটার দিকে। থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতে টান দেয় হাতলে। ড্রয়ার খুলতেই ক্যাঁচ করে একটা চাপা শব্দ ওঠে। ড্রয়ারের ভেতরে হাত ডুবিয়ে দেয় নাজহা।

ওর চিকন আঙুলগুলো অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায় এদিক-ওদিক। তার হাতে ঠেকে তীক্ষ্ণ আর ধারালো একটা ধাতব বস্তু।তা হলো চকচকে একটা ছুরি। শক্ত মুঠোয় ছুরিটা বের করে আনে সে। পলকহীন স্থির দৃষ্টিতে নাজহা তাকিয়ে থাকে ছুরিটার দিকে। অনেকক্ষণ সময় কেটে যায়। ঠোঁটের কোণে এক যন্ত্রণাদায়ক হাসি ফুটে ওঠে ওর। এমন এক করুণ হাসি, যাতে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই। আছে শুধু ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে পড়া এক বিধ্বস্ত মানুষের শেষ আত্মসমর্পণ। খুব ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে সে তাকায় নিজের বিছানার দিকে। বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তৌসির। ওর মুখটা কী ভীষণ শান্ত, বুকটা নির্ভার ভঙ্গিতে ওঠানামা করছে। ঠোঁটের কোণে কেমন এক চিলতে নিশ্চিন্ত প্রশান্তি লেপ্টে আছে। দেখে মনে হব পৃথিবীর কোনো পাপ কোনোদিন তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করেনি।

ডান হাতের মুঠোয় ছুরিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে নাজহা। প্রচণ্ড চাপে আঙুলের গাঁটগুলো রক্তশূন্য হয়ে ফ্যাকাশে রূপ নেয়। তারপর ধীর পদক্ষেপে সে এগিয়ে যেতে থাকে বিছানার দিকে।
বিছানার ঠিক পাশটিতে এসে থমকে দাঁড়ায় সে। কাঁপতে থাকা কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিস করে সে বলে ওঠে,
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। এই দাহে আমি আর স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারব না। তাই আগে আমার মৃত্যুর কারণকে মারব। আমার সন্তানের খুনিকে মারব। তারপর আমি মরব। আমি মরব, তবে আগে আপনাকে মেরে মরব তৌসির শিকদার।”
এ বলে আরও এক পা সামনে এগিয়ে যায় নাজহা। তৌসিরের ঘুমন্ত মুখের ওপর থেকে এক সেকেন্ডের জন্যেও চোখ সরে না ওর। নিজের মনেই বিড়বিড় করে যন্ত্রণাজর্জর কণ্ঠে সে বলে,
“ভালোবাসা যে কখনো কখনো হত্যার চেয়েও রক্তাক্ত হয়, তা আজ বুঝলাম।”
কথাটা বলেই সে থেমে যায়। দৃষ্টি নিবদ্ধ তৌসিরের ঘুমন্ত মুখের ওপর। নাজহার আহত কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে একরাশ তিক্ত শব্দমালা,

“আপনার সাথে সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু আজ গড়ব আপনার কবর। আপনার বুকে আশ্রয় খুঁজেছিলাম, সেই বুকেই আঁকব ক্ষত। কথা ছিল আমাদের মিলনের, অথচ হতে যাচ্ছে বিসর্জন। আপনার বুকে মাথা রাখার কথা ছিল, তবে আজ রাখব ছুরি।”
উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ঠিক এক একটা ফোঁটা তপ্ত রক্ত। কিন্তু তা ওর ঠোঁট বেয়ে পড়ছে না, বরং বুকের গভীর ক্ষত থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। কথাগুলো বলতে বলতে খুব সাবধানে তৌসিরের ঠিক পাশে গিয়ে বসে নাজহা। হাতের ধারালো ছুরিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে সে। আঙুলের গাঁটগুলো হাতের চাপে আরও সাদাটে হয়ে আসে। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে আবার সে বলে ওঠে,
“ভেবেছিলাম জীবনসঙ্গী, অথচ হয়ে গেলেন জীবন কলঙ্ক।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৪

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মুহূর্তে নাজহার হাত-পা আর একটুও কাঁপছে না। বরং নিরেট স্থিরতায় কঠিন হয়ে আসছে ওর গোটা শরীর। ঠিক ভেতরের সব উত্তাল ঝড় একেবারে থেমে গিয়ে এখন শুধু এক হিমশীতল শান্ত স্রোত বইছে। এই শান্ত রূপটা বড় বেশি ভয়ংকর। এই শান্ত রূপটা নিশ্চিত মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ।খুব ধীরগতিতে শূন্যে ছুরিটা তুলে ধরে সে। ইস্পাতের ফলাটা স্থির হয়ে নেমে আসে তৌসিরের স্পন্দিত বুকের ঠিক উপরে। ঘুমন্ত তৌসিরের বুকটা কী শান্তভাবে ওঠানামা করছে। শেষবারের মতো একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাজহা। তারপর ধীরে ধীরে তৌসিরের বুকে ছুরিটা তাক করে নাজহা উচ্চারণ করে,
“মানুষ ভেবে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম কিন্তু জানোয়ার বলে মারতে হচ্ছে।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৬

10 COMMENTS

  1. আপু তুমি আমাদের এভাবে ঠকালে, অন্তত তোমার থেকে এটা আশা করিনি কেন এমন করলে কেন। আমাদের মনের অবস্থা তো একবার দেখা উচিত ছিল,এবার তোমাদের অনেক শান্তি লাগছে তাই না😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭

Comments are closed.