Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৯
সানজিদা আক্তার মুন্নী

ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাতটা ছুঁয়েছে, অথচ শিকদার বাড়ির বিশাল চারদেয়ালের ভেতর দিনের আলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। চারদিক ঘিরে রেখেছে এক গুমোট, নিথর স্তব্ধতা আর শোকের এক জমাটবাঁধা অন্ধকার। দাদাজান আর নেই এই রূঢ় সত্যটা এখনও এই বাড়ির ইট পাথরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। মাত্রই তাঁকে গোরস্থানের কবরে শায়িত করে ফিরেছে বাড়ির শোকাহত মানুষগুলো। পুরো বাড়িটাই এখন এক জীবন্ত গোরস্থানে পরিণত হয়েছে যেখানে চারপাশের বাতাসে ভাসছে স্বজনদের চাপা কান্নার গোঙানি, আর উঠোনের একপাশে চলছে মৃত মানুষের আত্মার শান্তির জন্য সিন্নি বিতরণের এক যান্ত্রিক ব্যস্ততা।

কিন্তু এই সমস্ত কোলাহল, আহাজারি আর শোকের আবহের অনেক দূরে, অন্দরমহলের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণে, জানালার পাশের ঠান্ডা মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে নিষ্প্রাণ পাথরের মতো বসে আছে তৌসির। তার রক্তবর্ণ শূন্য দৃষ্টি জানালার বাইরের ফাঁকা আকাশের দিকে স্থির, অথচ বুকের ভেতরটা তীব্র অনুশোচনা আর ভয়ংকর এক পাপবোধের দাউদাউ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি শ্বাস নিতে গিয়ে তার মনে হচ্ছে, কেউ তার গলা চেপে ধরেছে।
বাইরের মানুষগুলো যখন দাদাজানের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মশগুল, তৌসির তখন নিঃশব্দে নিজের কৃতকর্মের বিভীষিকাময় হিসেব মেলাচ্ছে। সে খুব ভালো করেই জানে, এই মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক বয়সের ভারে আসা বিদায় নয় এটি একটি নিখুঁত, সুপরিকল্পিত এবং নির্মম হত্যাকাণ্ড। আর সবচেয়ে ভয়ানক ও দমবন্ধ করা সত্যি হলো এই হত্যাকাণ্ডের সরাসরি অংশীদার খোদ তৌসির এবং স্বয়ং বিবিজান। তার নিজের হাতের তালুতে এখনও সে দাদাজানের ছটফটানির কম্পন অনুভব করতে পারছে।

গতরাতের সেই পৈশাচিক দৃশ্যটা তৌসিরের চোখের পর্দায় বারবার রক্তজলের মতো ফিরে এসে তাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে। গতরাতে বিবিজানের ডাকে উনার ঘরে পা রাখতেই তৌসিরের শরীরের সমস্ত রক্ত বরফ হয়ে গিয়েছিল। বিছানায় দাদাজানের হাত পা তখন মোটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, তাঁর চোখেমুখে এক অসহায় আতঙ্ক। বিবিজান নির্লিপ্ততায়, একদম ঠান্ডা, ভাবলেশহীন মাথায় তাকে নির্দেশ দেন দাদাজানের পা দুটো শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরতে আর নিজে হাতে তুলে নেন বালিশ চেপে শ্বাসরোধ করার মতো জঘন্যতম দায়িত্ব। কারণটা ছিল অতি স্পষ্ট। দাদাজান বিবিজানের এই কলুষিত ‘পাপের সাম্রাজ্য’ আর সহ্য করতে পারছিলেন না, চাইছিলেন সবকিছু ছেড়ে বহু দূরে, অচেনা কোথাও চলে যেতে।

তৌসির প্রথমে শিউরে উঠেছিল, দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে মুক্তি চেয়েছিল এই মহাপাপ থেকে। কিন্তু বিবিজানের চোখে তখন শয়তানের হাসি। তিনি যখন তৌসিরের দুর্বলতম জায়গায় আঘাত করে নাজহা আর ইয়াদ ওয়াসেমের ক্ষতির নিখুঁত হুমকি ছুঁড়ে দেন, তখন তৌসিরের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে, এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাকে নিজের দাদাজানের মৃত্যুতে হাত রাঙাতে হয়।
বিবিজানের এই নারকীয় নিষ্ঠুরতা অবশ্য তৌসিরের কাছে একেবারেই নতুন কিছু নয়। দাদাজানকে চিরকাল নিজের বশে রাখার জন্য, তাকে মানসিক পঙ্গু করে রাখার জন্য এই নারী বছরের পর বছর ধরে জাদুটোনার মতো নিজের মাসিকের রক্ত পর্যন্ত তাঁর খাবারে মিশিয়ে খাইয়েছেন। একজন মানুষ কতটা পৈশাচিক, কতটা বিকৃতমস্তিস্কের হলে এমন বীভৎস কাজ দিনের পর দিন করতে পারে, তা ভাবলেও তৌসিরের নাড়িভুঁড়ি উলটে আসতে চায়। শেষমেশ দাদাজানকে নির্মমভাবে হত্যার পর সেই বীভৎস মৃত্যুকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। আর বাড়ির শোকাহত মানুষগুলোও বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছাড়াই সেই মিথ্যাকে অম্লান বদনে মেনে নেয়।
অতীত হাতড়ে তৌসির যখন অবশ আর অসাড় হয়ে নিজের পাপের ভারে ডুবছে, ঠিক তখনই তার সামনে রাখা কাঠের চেয়ারটায় এসে বসে নাজহা। তার চোখে এক ফোঁটাও শোকের ছিটেফোঁটা নেই, কোনো সমবেদনা নেই বরং সেখানে জ্বলজ্বল করছে তীব্র অবজ্ঞা, ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুন। ঠোঁট বাঁকিয়ে একরাশ বিষ ঢেলে দিয়ে নাজহা বলে ওঠে, “কষ্ট হচ্ছে, তৌসির শিকদার?”

তৌসির কোনো উত্তর দেয় না, দেওয়ার মতো ভাষাও তার নেই। সে শুধু একজোড়া শূন্য, ক্লান্ত ও অপরাধী দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। নাজহা এবার একটা তিক্ত, তীক্ষ্ণ হাসি হেসে নিজের ফুলে ওঠা পেটে হাত বুলিয়ে বলে, “উনি তো বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, উনার মৃত্যুতে কেন কষ্ট হবে আপনার? কষ্ট তো হতো যদি এই পেটের ভেতরের এরা মরে যেত। এরা মরল না কেন বলুন তো? উনি কেন মরলেন?”
তৌসির কোনো পাল্টা যুক্তি দেওয়ার শক্তি পায় না। সে তো এখন মাঝদরিয়ায় এক ডুবন্ত মানুষের মতো, যে কিনা বাঁচার জন্য সামান্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে। সে ধীর পায়ে মেঝে ঘষে এগিয়ে যায়, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে আলতো করে নাজহার কোমর জড়িয়ে ধরে। তার গর্ভের সন্তানগুলোর ওপর কান পেতে সে নিথর হয়ে পড়ে থাকে। এই ঘোর অমানিশায়, তার এই অভিশপ্ত জীবনে, এই নিষ্পাপ অনাগত প্রাণগুলোকেই তার বেঁচে থাকার শেষ ও একমাত্র আশ্রয় বলে মনে হয়।

কিন্তু পরক্ষণেই নাজহা আক্রোশে, সশব্দে তাকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেয়। তীব্র ঘৃণায় তার সুন্দর মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে ওঠে। বাঘিনীর মতো চাপা গর্জনে সে ফুঁসে ওঠে, “ছুঁবেন না আমায়, জানোয়ার কোথাকার! নিজের হাতে নিজের দাদাজানকে মেরে ফেলেছেন আপনি। আমার তো এখন ভয় হচ্ছে, কোনোদিন না জানি আমাকেও এভাবেই মেরে ফেলেন! আমি সব দেখেছি। আপনার ওই পিশাচ বিবিজান আর আপনার সব কীর্তি আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
নাজহার কথা শুনে তৌসিরের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে, মনে হয় এক টুকরো জ্বলন্ত কয়লা কেউ তার বুকে ছুঁড়ে মেরেছে। আসলে গতরাতে তৌসির আর বিবিজান যখন দাদাজানের নিথর, প্রাণহীন দেহটা বিছানায় তুলে শোয়াচ্ছিল, ঠিক তখনই আধখোলা দরজার আড়াল থেকে নাজহা পুরো ঘটনাটা দেখে ফেলেছিল। তৌসির কোনো কথা বলে ওঠার আগেই, দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়ান স্বয়ং বিবিজান।

তাঁর চোখেমুখে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই, বরং সেখানে বিরাজ করছে এক হিমশীতল, ক্রূর আর অহংকারী দৃষ্টি। স্থির, সাপের মতো ঠান্ডা চোখে নাজহার দিকে তাকিয়ে তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, “যখন দেখেই ফেলেছিস, তখন মুখ বন্ধ রাখিস। মুখ খুললে তোকে সহ তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীর এমন অবস্থা করব যে ভাবতেও পারবি না।”
এরপর তিনি ধীরে ধীরে তৌসিরের দিকে ঘুরে দাঁড়ান। কণ্ঠে এবার আদেশের রুক্ষ সুর, “তৌসির, বাইরে আয়। সকাল থেকে কিছু খাসনি, কিছু মুখে দে। খাওয়া শেষে এসে ওর লগে শুইবি। ও বড্ড বেড়েছে আজকাল, সব নামিয়ে দে। সাত আট মাসের পোয়াতি হলে কী হবে, শুইলে কিছু হবে না। তাড়াতাড়ি আয়।”
এই কুৎসিত, জঘন্য নির্দেশটা ছুঁড়ে দিয়েই বিবিজান তাঁর রাজকীয় ভঙ্গিতে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। তিনি চলে যেতেই নাজহা যেন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। অপমানে তার চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। সে হিংস্রভাবে তৌসিরের কাঁধ খামচে ধরে এক ঝটকায় তাকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলে, “তোর যদি এতই শোয়ার ইচ্ছে থাকে, তবে তোর ওই নোংরা মাগি বিবিজান এর কাছে গিয়ে শো। আমার শরীরে হাত দিলে কিন্তু একদম ভালো হবে না বলে দিচ্ছি!”

অপমানে, আত্মসম্মানে লাগা আঘাতে আর দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা ক্ষোভে এবার তৌসিরও রুখে দাঁড়ায়। তার ভেতরের যন্ত্রণার বাঁধ এক মুহূর্তে প্রচণ্ড বেগে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সে গলা চড়িয়ে হুংকার দেয়, “মুখ সামলে কথা বল ছিনাল! আমাকে কি উনার মতো ভেবেছিস নাকি? শোয়ার ইচ্ছে থাকলে বাইরে আমার অনেক ব্যবস্থা আছে আমার। এই এতগুলা দিনে একবারও কি তোর লগে জোর করছি? এই পেটের বাচ্চাগুলো ছাড়া অন্য কোনো কারণে কি তোর কাছে ঘেঁষেছি? আমি শরীরের ভিখারি পুরুষ না আর সেটা তুই নিজেও খুব ভালো কইরা জানস। তাই এসব সাউয়াজাতি কথা আর মুখে আনবি না।”
নাজহা তাচ্ছিল্যভরে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে এক বুক অবজ্ঞা আর চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান, “আমি জানি আপনি কেমন। আপনি একটা পশু, শুধুই একটা পশু।”
তৌসির আর তর্কে জড়ায় না। এই অশান্তি, এই বিষাক্ত মানসিক নির্যাতন এখন তার নিত্যদিনের সঙ্গী। সে নিঃশব্দে, এক বুক হাহাকার আর পরাজিত সৈনিকের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে এখনো চলছে স্বজনদের কান্নার রোল,আগরবাতির গন্ধ ভারী করে তুলেছে বাতাস। বাড়ির শোকাতুর মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে তৌসিরের বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কেঁপে ওঠে। একদিকে ভেতরের দমবন্ধ করা অপরাধবোধ, অন্যদিকে নাজহার এই মানসিক অত্যাচার সে আর বইতে পারছে না। তার চারপাশের দেয়ালগুলো মনে হচ্ছে ক্রমশ ছোট হয়ে এসে তাকে পিষে মারতে চাইছে। অথচ, কী নিদারুণ পরিহাস! এই পুরো ধ্বংসযজ্ঞের, এই সর্বনাশা জালের আষ্টেপৃষ্ঠে, একদম গলা পর্যন্ত সে নিজেই জড়িয়ে আছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তাই আর খোলা নেই।

বিকেল ধীরে ধীরে গড়িয়ে আসছে সন্ধ্যার দিকে। আকাশের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে এক আশ্চর্য কমলা আভা। মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য শিল্পী তার তুলির শেষ আঁচড়ে রাঙিয়ে দিয়েছে দিগন্তরেখা। জানালার কাচের ফাঁক গলে সেই আলো এসে ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে এক বিষণ্ণ সৌন্দর্য। বাইরের পৃথিবীতে পাখিদের ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। কিচিরমিচির, ডানা ঝাপটানোর শব্দ প্রকৃতি তার নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই শিকদার বাড়ির ভেতর, এই ঘরের চার দেয়ালের মাঝে নীরবতা যে থমকে আছে। এমন নীরবতা, যা শুধু কান দিয়ে শোনা যায় না, অনুভব করতে হয় বুকের ভেতর। বাড়ির বাতাসে ভাসছে আগরবাতির হালকা সুগন্ধ, মিশে যাচ্ছে শূন্যতার গন্ধের সাথে।
তৌসির ঘরের সোফায় বসে আছে কোম্পানির কাগজপত্র নিয়ে। তার সামনের টেবিলে ছড়ানো ফাইল, কিছু হিসাবের কাগজ। তার কপালে হালকা চিন্তার ভাঁজ, ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকানো। চোখ দুটো কাগজের কালো অক্ষরের ওপর স্থির থাকলেও, মনটা পড়ে আছে অন্য কোনো দূর অজানায়। হয়তো দাদাজানের পুরোনো স্মৃতিতে, হয়তো নিজের ভেতরের কোনো অন্ধকার কোণে।

অন্যদিকে, খাটের ওপর নাজহা শুয়ে আছে। দুপাশে নরম তুলোর বালিশ দিয়ে ঘেরা, কাত হয়ে শুয়ে আছে সে। তার পরনের হালকা গোলাপি গোল ড্রেসটা পেটের ভারে টানটান হয়ে আছে। চিৎ হয়ে একটু শোয়ার সাধ্যও নেই তার। একটুখানি চিৎ হলেই বুকের ভেতর দম আটকে আসে, পিঠের নিচে এক ভোঁতা যন্ত্রণা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। তার ফোলা পেটের ভেতর তিন তিনটে ছোট্ট প্রাণ একসাথে নড়াচড়া করছে, মনে হচ্ছে তিনটে আলাদা পৃথিবী একই সময়ে জেগে উঠেছে। কখনো একটা ছোট্ট পা পাঁজরে আঘাত করছে, কখনো একটা কনুই পেটের ডান দিকে ঠেলা দিচ্ছে। নাজহা চোখ বন্ধ করে সেই অনুভূতি অনুভব করে। একদিকে অপার মাতৃত্বের আনন্দ, অন্যদিকে অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, এলোমেলো চুল কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে। ফর্সা মুখটা ক্লান্তিতে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ঠোঁট দুটো শুকিয়ে এসেছে।

অনেকক্ষণ এক ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতে থাকতে নাজহার শরীর বিদ্রোহ করে ওঠে। ধীরে ধীরে, অনেক কষ্টে সে বালিশগুলো একটু একটু করে সরিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে। তার ভ্রু কুঁচকে যায়, ঠোঁট কামড়ে ধরে সে চাপা যন্ত্রণা সহ্য করতে থাকে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট কষ্টের ছাপ ফুটে ওঠে। যে কষ্ট শুধু শারীরিক নয়, মনের গভীরের ক্ষত থেকেও উঠে আসছে। বেখেয়ালেই নাজহার পরনের গোল ড্রেসটা হাঁটুর কাছে গুটিয়ে উঠে গেছে, কিন্তু সে এখন এসব দেখার অবস্থায় নেই। দুই হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে, অনেক চেষ্টায় সে উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়েই দুই হাত কোমরে চেপে ধরে। কোমরের নিচ থেকে এক তীক্ষ্ণ ব্যথা মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। এই ব্যাথায় তার মুখ কুঁচকে যায়, ঠোঁট থেকে একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসছে। ধীর, অনিশ্চিত পায়ে নাজহা হাঁটতে শুরু করে এক পা, দুই পা করে। এই হাঁটার প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি বিশাল পাহাড় ডিঙানোর সমান এখন তার কাছে।
নাজহার এই নিদারুণ কষ্ট তৌসিরের চোখ এড়ায় না। কাগজের অক্ষরে আটকে থাকা তার দৃষ্টি হঠাৎই উঠে আসে নাজহার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সব কাগজপত্র এক ঝটকায় টেবিলের পাশে সরিয়ে রেখে সে উঠে দাঁড়ায়।

তৌসিরের মনটা আজ বিষাদে আচ্ছন্ন। দাদাজানের শূন্যতা তার বুকের ভেতর একটা কালো গর্ত হয়ে আছে, যা কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছে না। সাথে তো নিজের ভেতরের স্পষ্ট অপরাধবোধ, যা রাত-দিন তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। চারপাশের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি, নাজহার চোখের ঘৃণা মেশানো দৃষ্টি, সব মিলিয়ে বুকটা ভারী হয়ে আছে তৌসিরের। তৌসির উঠে এসে নিঃশব্দে নাজহার দিকে এগিয়ে যায়। পেছন থেকে সে আলতো করে নাজহার কোমর জড়িয়ে ধরে এমনভাবে যে মনে হবে কোনো নাজুক কাচের পুতুলকে ছুঁচ্ছে কেউ। তারপর সে নিজের দুই হাতে নাজহার তলপেটের ভারী অংশটুকু খুব সাবধানে শূন্যে তুলে ধরে। তৌসিরের বুকের উষ্ণতা নাজহার পিঠে এসে লাগে। এই উষ্ণতায় একটা চেনা গন্ধ লেগে আছে, যা হলো তৌসিরের শরীরের গন্ধ যা একসময় নাজহার কাছে স্বর্গ ছিল, আজ তা-ই তার কাছে বিষ আর মধুর মিশ্রণ হয়ে গেছে। তৌসির তল পেটে তুলে ধরায় নাজহার ঠোঁট থেকে একটা দীর্ঘ, গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে।

তার মনে হয় দীর্ঘ ডুবসাঁতারের পর সে জলের ওপরে মাথা তুলে বুক ভরে এক ঢোক অক্সিজেন পেয়েছে। তার চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য বুজে আসে,চোখের পাতলা পাপড়ি কেঁপে ওঠে। কিন্তু এই স্বস্তিটুকুও এখন তার কাছে অপরাধের মতো। যন্ত্রণাকাতর, ক্লান্ত গলায়, একটু কম্পিত স্বরে সে তৌসির কে জিজ্ঞেস করে, “ডেলিভারির আর কতদিন বাকি? আমি বাঁচব তো ডেলিভারি হওয়ার আগে? আমার এক একটা দিন এখন একশো দিনের সমান মনে হয়। আমি আর এই ভার নিতে পারছি না।”
কথাগুলো বলতে বলতে নাজহার গলা ধরে আসে। তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। শেষ শব্দটা প্রায় ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে আসে তার গলা হতে। তৌসির এই প্রশ্নের পিঠে কোনো কথা বলে না। সে নাজহাকে খুব সাবধানে, ধরে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে নিয়ে যায়। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সে নিজে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে নাজহার পায়ের কাছে। তারপর নাজহার ফুলে যাওয়া পা দুটো নিজের কোলের ওপর তুলে নিয়ে আলতো হাতে, নাজহার পায়ের পাতা টিপে দিতে দিতে শান্ত মতো স্বরে বলে,

“সব মিলায়া আর দুইটা মাস। তারপর সব ঠিক হইয়া যাইব। আর সহ্য করতে হইব না, সব ঠিক হইয়া যাইব।”
কথাটায় কি কোনো নিশ্চয়তা ছিল? না কি ছিল এক ক্লান্ত মানুষের নিজেকেই বোঝানোর প্রচেষ্টা? নাজহা ঠিক বুঝতে পারে না। তৌসিরের কথাগুলো নাজহার বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করে। তার চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। গোধূলির আলোয় সে অশ্রুবিন্দু চিকচিক করে ওঠে। তার ভীষণ ইচ্ছে করে, এই মুহূর্তেই তৌসিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলতে। তৌসিরের চওড়া বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে নিজের সব কষ্ট, সব ভয়, সব অভিমান উগরে দিতে। বলতে, “আমি ভয় পাচ্ছি, আমাকে শক্ত করে ধরুন।”
কিন্তু সে পারে না। তার বিবেক, তার ভেতরের সেই তীব্র ঘৃণার আগুন তাকে বাধা দেয়। চোখ বন্ধ করতেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাস্টার চাচ্চুর সেই নিথর, প্রাণহীন মুখ।মনে পড়তেই নাজহার মনে হয় এই মুহুর্তে তার বুকের ভেতর কেউ বরফের ছুরি বসিয়ে দিল। সে জোরে একটা শ্বাস ছাড়ে, ভেতরের সব আবেগ একটা শক্ত খোলসের নিচে চাপা দিয়ে তৌসিরের দিকে তাকায়। তীক্ষ্ণ, ছুরির ধারের মতো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ডাক্তার সিজার করতে না করেছে, তাই না? সিজার করলে আমি মারা যাব, তাই না?”
তৌসিরের হাতের নড়াচড়া এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। সে নাজহার দিকে শান্ত, নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকায়। তার চোখে কোনো ভাবান্তর নেই, কিন্তু গভীরে কোথাও এক অসহ্য বেদনা চিকচিক করছে। সে মলিন গলায় বলে,
“মরা বাঁচা আল্লাহর হাতে। তুই আমি কে তা জানার? যা হওয়ার তা ই হইব, এখন এসব উল্টাপাল্টা চিন্তা বাদ দিয়া চিন্তামুক্ত থাক।”

তৌসিরের এই শান্ত উত্তর নাজহাকে আরও উত্তেজিত করে তোলে। সে দাঁত চেপে, জেদের বশে, প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “আমি যা প্রশ্ন করেছি, সেটার উত্তর দিন। ডাক্তার বলেছে তো রক্ত বেশি গেলে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?”
তৌসির এবার নাজহার দিকে তাকায়। তার চোখে সেই চিরচেনা শান্ত দৃষ্টি ও নরম গলায় বলে “রক্ত লাগলে আমি দিমু। তোর আর আমার একই গ্রুপের রক্ত, চিন্তা করিস না। মরার কথা আমার, আমি মরমু, তুই কেন মরবি?”
এই কথাটা বিদ্যুতের মতো নাজহার ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরে কালবৈশাখী ঝড় উঠে আসে। নাজহার চোখ দুটো জ্বলে ওঠে আগুনের মতো,তার মুখ লাল হয়ে যায় ক্রোধে। সে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “আপনি মরবেন কেন? এখন কেন মরবেন? পেটের এই পাপগুলোকে রেখে এখন কেন মরবেন? আর আপনি আমায় কেন রক্ত দিবেন? আমি আমার চাচ্চুর খুনির রক্ত নিয়ে এই শরীরে বাঁচতে চাই না! আপনি আমায় রক্ত দিবেন না, বুঝলেন? আমি ডেলিভারির সময় মারা গেলেও আপনার এক ফোঁটা রক্ত আমি নেব না!”
প্রতিটি শব্দ একেকটা তীর হয়ে সরাসরি গিয়ে বিঁধে তৌসিরের বুকে। কিন্তু তৌসিরের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। সে শুধু চুপ করে শোনে। তার চোখের পাতা একবারও কাঁপে না, ঠোঁটে কোনো প্রতিবাদ আসে না। শুধু তার হাতের চাপটা নাজহার পায়ের পাতায় একটু শিথিল হয়ে আসে। কথাগুলো বলে নাজহা হাঁপাতে থাকে। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে, চোখ দুটো পানিতে ছলছল করছে। রাগে আর ক্ষোভে শরীরটা তার কেঁপে উঠছে। কিন্তু এই উত্তেজনা তার শরীরের পক্ষে ভালো নয়, তার পেটের ভেতর তিনটে ছোট্ট প্রাণ অস্থির হয়ে নড়াচড়া করতে থাকে। তৌসির কোনো প্রতিবাদ করে না। সে নাজহার পায়ে আবার আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, খুব শান্ত, প্রায় আদুরে গলায় বলে, “আইচ্ছা, দিমু না আমি রক্ত। অশান্তি করিস না, তোর কষ্ট হইব।”

তৌসিরের এই নির্লিপ্ততা, এই অসীম ধৈর্য নাজহাকে আরও বেশি পোড়ায়। আসলে ওর মনে যখনই অশান্তির ঝড় ওঠে, সে সব রাগ তৌসিরের ওপর ঝাড়ে। তৌসিরের এই শান্ত, নির্বিকার মুখটাই তার সব রাগ, সব ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু এখন। সে চায় তৌসিরও কষ্ট পাক, তৌসিরও চিৎকার করুক, রাগে ফেটে পড়ুক, যাতে নাজহা বুঝতে পারে, এই মানুষটারও বুকে রক্ত আছে, ব্যথা আছে। কিন্তু তৌসিরের সেই পাহাড়ের মতো অবিচল স্বভাব তাকে না চাইতেও শান্ত করে দেয়, নিজের কাছে নিজেকেই ছোট করে তোলে। ধীরে ধীরে নাজহার শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। ক্লান্তিতে সে বালিশে মাথা এলিয়ে দেয়। তার চোখের কোণ বেয়ে শেষ অশ্রুটুকু গড়িয়ে পড়ছে কানের পাশ দিয়ে বালিশে মিশে যায়। তৌসির বিছানার একপাশে এসে বসে। নাজহা নিজের ভারী, ফোলা উরুর ভার তৌসিরের উরুর ওপর ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ শুয়ে পড়ে। শোয়ার সময় তার ড্রেস আর প্লাজোটা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত গুটিয়ে উঠে যায়। মাতৃত্বের ভারে ক্লান্ত, ফ্যাকাশে অথচ এই ফোলা পা দুটো গোধূলির কমলা আলোয় তৌসিরের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কোনো এক জীবন্ত কবিতার ন্যায়, যেখানে মাতৃত্বের গৌরব আর শারীরিক যন্ত্রণা একসাথে মিশে আছে।

তৌসির ধীর হাতে,প্রায় শ্রদ্ধার সাথে নাজহার প্লাজোটা নিচ পর্যন্ত নামিয়ে দেয়। তারপর নাজহার দুই পাশে বালিশগুলো ঠিকঠাকমতো গুঁজে দেয়, যাতে সে আরামে শুতে পারে। এক হাতে নাজহার এলোমেলো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে হাতের তর্জনী দিয়ে আলতো করে নাজহার কপালের ঘাম মুছে দেয়।
তারপর নাজহার মুখের দিকে তাকিয়ে, সেই মুখ, যা একসময় তার পৃথিবী ছিল, আজও আছে, যদিও পৃথিবীটা পাল্টে গেছে, খুব নরম, প্রায় ফিসফিসানির মতো স্বরে সে জিজ্ঞেস করে, “এখন কি ব্যথাটা একটু কম লাগতেছে? একটু ঘুমাবি এখন?”
নাজহা উল্টো এবার তৌসির কে রাগ নিয়ে বলে,” এখন শান্তি হচ্ছে আপনার?আমাকে এই যন্ত্রণায় ফেলার জন্যই তো এমনটা করেছেন! এ সব আপনাদের চাল, আপনার চক্রান্ত। আপনি ইচ্ছে করেই কোনো সেফটি নেননি। নিলে কি আর একবারে তিন-তিনটে বাচ্চা আসে? এই যে আমার জান বেরিয়ে যাচ্ছে, এই বদদোয়া আপনাকে নিতে হবে তৌসির শিকদার। আমার সাথে আপনি মোটেও ভালো কাজ করেননি।”
তৌসিরের চেহারায় কোনো বিকার নেই। সে নাজহার স্ফীত পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীর, শান্ত গলায় বলে,
“আমার যদি সত্যিই কোনো খারাপ মতলব থাকত, তবে তিনটার জায়গায় পাঁচটা হতো। তুই তো জানিস, তোরা ভাই-বোন যমজ, আমরাও দুই ভাই যমজ। আমাদের রক্তেই তো যমজ হওয়ার বিষয় লুকিয়ে আছে।”
নাজহা জেদ ধরে বলে,

“না, সহজ না।আমি কতবার বারণ করেছি, বলেছি দুর্ঘটনা ঘটবে। আপনি শোনেননি। এখন হলো তো? পারলে আপনি এদের নিজের পেটে নিয়ে ঘুরুন।আমি আর পারছি না এই বোঝা টানতে।”
নাজহার এই রুটিন মাফিক অভিযোগে তৌসির অভ্যস্ত। যখনই নাজহার কষ্ট হয়, সে বলে বাচ্চাদের যেনো তৌসির নিজের পেটে নিয়ে নেয়। তৌসির নাজহার পেটে হাত বুলিয়ে আনমনেই বলে,
“এত যে অবহেলা করছিস আমার সন্তানগুলোকে, দেখিস, একদিন তুই-ই ওদের জন্য ছটফট করবি। তোর নাড়িছেঁড়া ধন ওরা। ওদের জন্য তোরও প্রাণ কাঁদবে, কিন্তু সেদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
নাজহা নিজের পেট থেকে ঝটকা মেরে তৌসিরের হাত সরিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে বলে,
“পশুর বাচ্চাদের জন্য আমার কোনোদিন করুণা হবে না! জন্মের পর ওদের মুখ না দেখেই আমি আমার বাড়ি চলে যাব।”

তৌসির মনে মনে হাসে। নাজহার মাতৃত্বের এই অস্বীকার তাকে বিচলিত করে না। সে জানে, এই তিন প্রাণ পৃথিবীতে এলে নাজহা তৌসির কে হয়তো তাদের ছায়াও মাড়াতে দেবে না তখন বলবে আমার সন্তানের পাশে আসবেন না।তৌসির ধীরে ধীরে নাজহার ড্রেসটা সামান্য তুলে নাজহার পেটে তিন জায়গায় তিনটি চুমু খায়। তিনটে চুমু খেয়ে নাজহার পেটের ভেতরের তিন প্রাণকে আলাদাভাবে সে অভয় দিচ্ছে, “বাবা আছে, কোনো ভয় নেই।” নাজহা দাঁত কামড়ে শুয়ে থাকে, আর কোনো বাধা দেয় না। সে সন্তান হারানোর প্রতিশোধ নেবে, তবে এখন নয়। কারণ, তার মাথায় এখন অন্য এক ভয়ংকর চিন্তার জট পাকিয়ে আছে। আজ সকালে যে দাদাজান মারা গেলেন, পুরো বাড়ি ভাবছে এটা স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু এর পেছনে বিবিজান বা তৌসির নয়, ছিল স্বয়ং নাজহা!
গত রাতের দৃশ্যগুলো তার চোখের সামনে সেলুলয়েডের ফিতার মতো ভেসে ওঠছে। রাতের খাবারের সময় সবাই যখন ব্যস্ত, নাজহা চুপিচুপি বিবিজানের ঘরে ঢোকে। বিবিজানের নির্দিষ্ট পানির গ্লাসে মিশিয়ে দেয় প্রাণঘাতী বিষ।

হাত কাঁপে না তার। কেন কাঁপবে? এই বিবিজানই তো তার চাচ্চুর মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারিগর। ওই বয়স্কা মহিলাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হাঁটার বাহানায় ওই ঘরের দিকে উঁকি দিতেই নাজহার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। সে দেখে, বিবিজান নয়, দাদাজান ঢকঢক করে গ্লাসের পানিটুকু গিলে ফেলছেন। ভুল মানুষকে বিষ খাইয়ে দিয়েছে সে। এরপর রাত তিনটার দিকে ঘুম ভাঙলে নাজহা দেখে, মেঝেতে তৌসির নেই। (তৌসিরকে সে নিজের পাশে শুতে দেয় না।) ভয়ে তার শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। দাদাজান কি মরে গেছেন? তৌসির কি সেখানে গেছে? ধরা পড়ার আতঙ্কে তার শ্বাস আটকে আসে। বুকের ভেতর একইসাথে ধরা পড়ার ভয় আর চাপা শান্তি কাজ করে। পা টিপে টিপে সেখানে গিয়ে যা দেখে, তাতে নাজহা যতটা না আতঙ্কিত হয়, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়। সে দেখে, তৌসির আর বিবিজান মিলে দাদাজানের নিথর দেহটা ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছে। নাজহা এটা দেখে ভেতরে ভেতরে খুশিও হয়। বিষটা এমন যে, ময়নাতদন্ত ছাড়া ধরা পড়ার কোনো উপায় নেই, শরীরও নীল হবে না। বিষটাও সে চুরি করেছিল তৌসিরের কাছ থেকেই। পুরো খেলাটা নাজহা খেলতে চেয়েছিল বিবিজানের সাথে, কিন্তু ঘুঁটি উল্টে দাদাজান মারা যান।

বিবিজান মরলে অন্তত প্রতিশোধের আগুনে একটা তৃপ্তি থাকত। কিন্তু নাজহার অশান্তির কারণ অন্য জায়গায়, সে পেটে সন্তান নিয়ে ভুল মানুষকে খুন করেছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তৌসির আর বিবিজান মিলে দাদাজানের মৃত্যুর এই নাটকটা সাজাচ্ছে কেন? দাদাজানের মৃত্যুতে তাদের কী লাভ? এই শিকদার বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে আসলে কতগুলো ভয়ংকর রহস্য লুকিয়ে আছে?

নাজহা ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা দুটি বুজে নেয়। তার চোখের ক্লান্ত পাপড়িগুলো নেমে আসে এক অব্যক্ত প্রশান্তির মতো। তার বুকের ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, সারাদিনের সমস্ত ভার সে আজ এই মুহূর্তেই নামিয়ে রাখে। তৌসির বসে আছে তার পায়ের কাছেই সে নাজহার উরু থেকে শুরু করে ধীর ধীরে আঙুলে চাপ দিতে থাকে। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে নেমে আসে নাজহার হাঁটুর কাছে, তারপর পায়ের গোছায়, অবশেষে পায়ের পাতায়। তৌসিরও চোখ বুজে নেয়। তার আঙুলগুলো এখনো নাজহার পায়ের পাতায় কিন্তু তার মন ভেসে গেছে বহুদূর কোনো এক অদেখা, অথচ অতি কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের আঙিনায়। তার বন্ধ চোখের পর্দায় ভেসে উঠতে থাকে তিনটি ছোট্ট অবয়ব তার সন্তানেরা। তার মনে হতে থাকে তার তিন সন্তানেরা আছে তারি চারপাশে। ঘরময় ছড়িয়ে আছে ওদের অস্তিত্ব কেউ হাঁটছে টলমল পায়ে, ছোট্ট পায়ের ছাপ ফেলে যাচ্ছে মেঝেতে। কেউ ছুটছে হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে, তার খিলখিল হাসিতে কেঁপে উঠছে ঘরের প্রতিটি কোণ। কেউ-বা মগ্ন নিজের ছোট্ট রাজ্যে অদৃশ্য খেলনার সাথে গল্প করছে, ফিসফিস করে বলছে এমন সব কথা যা শুধু শিশুরাই বোঝে। একটি ছোট্ট প্রাণ পিঠ বেয়ে উঠে আসছে তার কাঁধে। ছোট্ট আঙুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরছে তৌসিরের শার্টের কলার, পা দুটো দুলছে শূন্যে, আর মুখে এক বিজয়ীর হাসি মনে হচ্ছে সে গোটা দুনিয়া জয় করে ফেলেছে বাবার কাঁধে চড়ে।

আরেকজন বসে আছে তার উরুতে যার তুলতুলে নরম শরীর, গোলগাল গাল। ছোট্ট হাতের পাতা সে বুলিয়ে দিচ্ছে তৌসিরের মুখে, দাড়ির খোঁচায় কৌতূহলী আঙুল রেখে চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে। আর মায়াভরা আধো কণ্ঠে ডাকছে আব্বা… আব্বা বলে। আর তৃতীয়জন? সে বসে আছে মেঝেতে। তার ছোট্ট হাত দুটো বাড়িয়ে দিচ্ছে তৌসিরের দিকে কোলে ওঠার আকুল আবদারে তার ঠোঁটে অভিমানের ছায়া, চোখে সেই চিরন্তন বিশ্বাস যে বিশ্বাস শুধু সন্তানরাই বাবার চোখে রাখতে জানে। সে টানছে তৌসিরের লুঙ্গির কোণ, ফোলা ফোলা গালে জমে আছে অভিযোগে “আমাকেও কোলে নাও, আব্বা।”
এসব ভেবে তৌসিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক নিঃশব্দ হাসি যা রবের দানের প্রতি অপার শুকরিয়ায় ভেজা। চোখ বোজা অবস্থাতেই সে হাসতে থাকে যেই হাসিতে মিশে আছে অপেক্ষা, প্রার্থনা, আর এক বুক ভরা অনাগত পিতৃত্বের আকুলতা। তার বুকটা ভরে ওঠে প্রশান্তিতে।

সকালের ঘড়িতে এখন বেলা দশটার কাঁটা স্থির। বারান্দার এক কোণে একরাশ জমাটবদ্ধ বিষণ্নতাকে নীরব সঙ্গী করে মাছ কাটতে বসে আছেন সিতুজা আর তৃষ্ণা। ভোর সাতটা নাগাদ বাজার থেকে রুপোলি তাজা মাছ নিয়ে আসে ওয়াসেম, আর এখন সে পাশের ইজিচেয়ারটায় অলস ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিচ্ছে। চায়ের কাপের শেষ তলানিতে চুমুক দিয়ে ওয়াসেম হঠাৎই এই ভারী নীরবতা ভেঙে সিতুজাকে লক্ষ্য করে বলে ওঠে,
“জানো মা, গতকাল তৌসিরের সাথে কথা হলো। ওর নাকি একসাথে তিনটে বাচ্চা হবে। চেকআপের পর ডাক্তাররাই কনফার্ম করেছে।”

কথাটা সিতুজার কানে পৌঁছানোমাত্র বুকের গভীর থেকে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস মোচড় দিয়ে বেরিয়ে আসে। তিনি চট করে ওয়াসেমের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তীব্র শ্লেষের সাথে বলে ওঠেন, “শুনে তো বেশ খুশিই হলাম! তৌসির তো মানুষের পরে বিয়ে করে এক টানে তিন তিনটে বাচ্চার বাপ হয়ে গেল, আর এদিকে কিছু মানুষের বিয়ের দু বছর এক মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও আমার কপালে দাদী ডাক শোনার ভাগ্য হলো না।”
উনার এই তীক্ষ্ণ আক্ষেপে তৃষ্ণা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সে নিস্পৃহভাবে আপন মনে মাছ কেটে চলে, তার আঙুলগুলো এক অদ্ভুত যান্ত্রিক নৈপুণ্যে আঁশটে ত্বকের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। কিন্তু ওয়াসেমের পুরুষালি অহংকারে মায়ের এই কথাটি তীরের ফলার মতো গিয়ে বিঁধে। সে তৃষ্ণার দিকে একরাশ চরম তিক্ততা নিয়ে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলে, “তৌসির বিয়ে করেছে এক অভিজাত ঘরের নবাবনন্দিনীকে। আর আমার গলায় তুমি ঝুলিয়ে দিয়েছ এক গোলামের মেয়েকে! সে তোমায় দাদী ডাক শোনাবে কোন লাটে, শুনি?”

এই অপমানজনক উচ্চারণেও তৃষ্ণা এতটুকু টলে যায় না, বেদনার কোনো রেখাও ফোটে না তার মুখে। প্রতিদিনের এই অবহেলা আর লাঞ্ছনা এখন তার মজ্জাগত, এক কঠিন বর্মে সে আবৃত করে নিয়েছে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব। সে আগের মতোই শান্ত হাতে মাছ কেটে চলে, শুধু তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে বিদ্রূপাত্মক, তিক্ত হাসি। নীরব অবহেলার এই অলক্ষ্য হাসিটি চাবুকের মতো গিয়ে লাগে ওয়াসেমের চোখে, বিঁধে তার পুরুষতান্ত্রিক অহমিকায়। ওয়াসেমের এই ঔদ্যত্ব দেখে সিতুজা আর স্থির থাকতে পারেন না। তিনি শক্ত গলায় ধমকে ওঠেন, “বড় ঘরের মেয়ে কি আমি তোর জন্য দেখিনি রে? দীর্ঘ পাঁচ পাঁচটা বছর তোকে রাজি করানোর সাধ্য সাধনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে, শেষমেশ এই ধীর স্থির মেয়েটার সাথেই তোকে বেঁধে দিলাম। আর এই দুটো বছরের সংসারে মেয়েটার ওপর তুই যে কী পরিমাণ মানসিক আর শারীরিক অত্যাচার করছিস, তা আমি মা হয়ে সব জানি। আজ যদি কোনো তথাকথিত বড়লোকের দেমাগী মেয়ে হতো, তবে কেস দিয়ে তোকে লাত্থি মেরে বাপের বাড়ি চলে যেত। আমার তৃষ্ণার মতো মেয়ে বলেই সব মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বৌমাকে এভাবে আর একটা কথাও বলবি না তুই। যদি সংসার করতে এতই বিষ লাগে, তবে ডিভোর্স দে ওকে! আমি তোকে কতবার বলেছি, তালাক দিয়ে দে, আমি নিজে ওর জন্য এর চেয়ে হাজার গুণ ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেব।”

মায়ের মুখে অন্য কোথাও বিয়ের কথা, বিশেষ করে তৃষ্ণাকে অন্য কারও বাহুলগ্না দেখার কল্পনাতেই ওয়াসেমের ভেতরটা মুহূর্তেই পুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকে। এক তীব্র আদিম ঈর্ষা আর অন্ধ ক্রোধ তার সমস্ত চেতনাকে গ্রাস করে নেয় মনে হচ্ছে কোনো বিষাক্ত সরীসৃপ তার শিরা উপশিরা বেয়ে নীল বিষ ঢেলে দিচ্ছে। কিন্তু নিজের দম্ভ বজায় রাখতে সে বাইরে এক তাচ্ছিল্যের মুখোশ পরে, উদাসীন সুরে বলে, “দেব ডিভোর্স! কিন্তু ও তো নিজে চায় না। ও তো চায় আমার লাত্থি ঝাঁটা খেয়েই এই সংসারে পড়ে থাকতে। ও নিজে যদি আজ তালাক চায়, আমি এখনই লিখে দিতে রাজি আছি। আমার বয়েই গেছে!”
ওয়াসেমের এই ঔদ্ধত্যে সিতুজা রাগে ফুঁসে উঠে তৃষ্ণার দিকে তাকান, “তুই কি সত্যিই ওর এই নরককুণ্ডে পড়ে থাকতে চাস, তৃষ্ণা? তুই শুধু একবার মুখ ফুটে বল। তুই ‘না’ বললেই আজই আমি ডিভোর্সের কাগজ আনানোর ব্যবস্থা করছি। তোকে আয়রাদ মনে মনে কতটা পছন্দ করে তা তুই খুব ভালো করেই জানিস, ও তোকে মাথায় করে রাখবে।”

‘আয়রাদ’, নামটি শোনামাত্রই ওয়াসেমের সারা শরীরে তো এক অদৃশ্য দাবানল জ্বলে ওঠে। ক্রোধে তার ভেতরের সমস্ত স্নায়ু ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠছে, কপালের পাশে একটি সূক্ষ্ম রগ দপদপ করে জানান দিচ্ছে ভেতরের প্রলয়কে। সে কোনোমতে নিজেকে সংবরণ করে দাঁত চেপে বসে থাকে, কিন্তু তার ভেতরটা এখন পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে। তৃষ্ণা এবার সিতুজার দিকে তাকায়। তার চোখের কোণে এক অসীম, যুগান্তকারী ক্লান্তি লেগে আছে মনে হচ্ছে বহু যুগের অবসাদ এসে জমা হয়েছে এই কৃষ্ণবর্ণ দৃষ্টিতে। সে নিরাসক্ত গলায় বলে, “আপনি আমার জন্য যা ভালো মনে করবেন মা, আমি তাতেই রাজি। আমি হ্যাঁ বা না কিছুই বলব না। উনি যখন এই ছোটলোকের বাচ্চাকে নিজের ঘরে রাখতেই চান না, তখন আমি আর সেঁটে থাকব কেন? তালাকই হয়ে যাক তাহলে।”

তৃষ্ণার মুখ থেকে অনায়াসে তালাকের এই সম্মতি শুনে ওয়াসেমের কপালের রগগুলো রাগে ফুলে ওঠে। এক ভয়ানক মানসিক অস্থিরতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে, তার ভেতরের আদিম সত্তাটি এক বন্য পশুর মতো লোহার খাঁচায় আছড়ে পিছড়ে মরছে। তবুও সে চতুরতার সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নিজের ভেতরের হিংস্র আক্রোশকে সুগভীর অতলে চাপা দিয়ে, একদম ঠান্ডা ও স্বাভাবিক গলায় বলে, “ঠিক আছে, তালাক তাহলে আজ বিকেলেই হবে। তৃষ্ণা, আমার শার্টটা জলদি ইস্ত্রি করে দে, আমি অফিসে যাব।”
কথাটা বলেই ওয়াসেম বারান্দার রশিতে ঝুলতে থাকা গামছা আর লুঙ্গিটি এক ঝটকায় টেনে নিয়ে পুকুরের দিকে চলে যায় গোসল করতে। তৃষ্ণা কোনো বাক্যব্যয় না করে চুপচাপ ঘরের দিকে পা বাড়ায় হাত ধোওয়ার জন্য। দুজনের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সিতুজা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করেন, “এবার নিশ্চয়ই মুক্তি পাবে মেয়েটা। আর কত! এই নরকযন্ত্রণা এবার অন্তত শেষ হোক।”

হাত ধুয়ে ঘরে এসে তৃষ্ণা ওয়াসেমের শার্ট প্যান্ট ইস্ত্রি করতে বসে। বাইরে এখন দ্বিপ্রহরের তীব্র রোদ আর গুমোট গরমের রাজত্ব, ঘরে বিদ্যুৎ নেই। গরমে তার সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে, কপালের পাশ ঘেঁষে ছোট ছোট চুলের অবাধ্য গুচ্ছ ত্বকের সাথে সিক্ত হয়ে লেপ্টে আছে। বিদ্যুৎ না থাকলেও বিকল্প ব্যাকআপের শক্তিতে ইস্ত্রিটি কোনোমতে সচল রয়েছে। ভেতরের চাপা দীর্ঘশ্বাস আর বাইরের ভ্যাপসা গরম, দুটি মিলে তৃষ্ণার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঠিক এমন সময় গোসল সেরে, ভেজা চুলে জলবিন্দু ছড়াতে ছড়াতে ঘরে ঢোকে ওয়াসেম। দরজায় পা রাখতেই তার শিকারি দৃষ্টি আটকে যায় এক অপার্থিব, সম্মোহনী দৃশ্যে তার বুকের গভীরে সমস্ত নিঃশ্বাস এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যায়। বিছানার ওপাশে মেঝেতে বসে, শার্ট বিছিয়ে গভীর মনোযোগে ইস্ত্রি করছে তৃষ্ণা। তার অঙ্গে এক শুভ্র পোশাক, মনে হচ্ছে সদ্য ফোঁটা শিউলির পাপড়িতে মোড়ানো কোনো নিঃশব্দ মূর্তি। এখন তার গলায় ওড়না নেই রক্তিম ওড়নাখানা কোমরের চারধারে আঁটসাঁট গিঁটে বাঁধা। তার আধখোঁপায় বাঁধা চুলের কিছু অবাধ্য গোছা মৃদু হাওয়ায় উড়ছে তার উন্মুক্ত, দুগ্ধশুভ্র ঘাড় বেয়ে চিকন রেখা টেনে নেমে আসছে বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা, যা মুক্তোর দানার মতো স্বচ্ছ লাগছে।

ওয়াসেমের শুষ্ক গলা এই রূপসুধা দর্শনে আরও শুকিয়ে আসে। তৃষ্ণার এই এলোমেলো, সিক্ত, অজান্তেই ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর সৌন্দর্যের সামনে সে নিজেকে এক নিষিদ্ধ শ্বাপদের মতো অনুভব করতে থাকে। তৃষ্ণা তো এসবের কিছুই টের পায় না, সে আপন মনেই শার্টের ভাঁজে ইস্ত্রি চালিয়ে যাচ্ছে, তার ভ্রু দুটি সামান্য কুঁচকে আছে গভীর একাগ্রতায়। ওয়াসেম নিঃশব্দে, বাঘের মতো চতুর পদক্ষেপে এগিয়ে যায় তার দিকে। সোফার কাছে পৌঁছে সে কাঁধের ভেজা গামছাটি কুশনের ওপর ফেলে দেয়। তারপর কুশনের আড়ালে হাত ঢুকিয়ে টেনে আনে এক ভারী কালো কুচকুচে এক আগ্নেয়াস্ত্র।

তৃষ্ণা এবার ওয়াসেমকে লক্ষ্য করে। ত্বরিত হাতে ইস্ত্রির সুইচ বন্ধ করে শার্টটি ভাঁজ করতে যায় সে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই দুটি অতি শক্তিশালী বাহু পেছন থেকে এসে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। ওয়াসেম দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তার ঠিক পেছনে। তার শক্ত বাহুদুটি লতার মতো পেঁচিয়ে ধরেছে তৃষ্ণার ক্ষীণ কোমর। মুখটি এগিয়ে এনে সে নিজের নাসিকা ডুবিয়ে দেয় তৃষ্ণার উন্মুক্ত, ঘর্মাক্ত ঘাড়ের ভাঁজে। গভীর এক তীব্র উষ্ণতায় তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় তৃষ্ণার ফর্সা ত্বক। সে তৃষ্ণার উন্মুক্ত কাঁধে নিজের নাক মুখ এমনভাবে ঘষতে থাকে মনে হচ্ছে কোনো বহুদিনের তৃষ্ণার্ত পথিক হঠাৎ মরুভূমিতে অমৃতের সন্ধান পেয়েছে।
ওর এই আকস্মিক, আদিম স্পর্শে তৃষ্ণার সমগ্র শরীর এক নিমেষে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে যায়। তার সমস্ত চেতনা অবশ হয়ে আসে, হাতের শার্টটি খসে পড়ে যায় মেঝেতে। ওয়াসেম তার গলায় মুখ ঘষতে থাকে সে তো এখন এক তীব্র নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছে। তার দুই বাহুর বন্ধনে তৃষ্ণার কোমর আরও কঠিন, আরও হিংস্রভাবে চেপে ধরে সে, এতটাই শক্ত যে তৃষ্ণার ফুসফুস বাতাস নেওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। তারপর ওর কানের লতির কাছে মুখ এনে এক ক্ষিপ্ত, ফিসফিসে কণ্ঠে ওয়াসেম গর্জে ওঠে,

“তালাক চাস, তাই না? আয়রাদের বউ হতে চাস তুই? এত বড় সাহস তোর যে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে এই কথা উচ্চারণ করিস! তোকে না বারণ করেছিলাম এই বিষয় নিয়ে দ্বিতীয়বার মুখ না খুলতে? বেশি ডানা গজিয়েছে তোর, জানোয়ারের বাচ্চা! তুই আমার সংসারে থাকতে চাস না?”
কথা শেষ করেই ওয়াসেম এক মত্ত আক্রোশে তৃষ্ণার ঘাড়ে সজোরে দাঁত বসিয়ে দেয়, মনে হচ্ছে কোনো হিংস্র শ্বাপদ তার শিকারের শরীরে নিজের মালিকানার স্থায়ী ক্ষত এঁকে দিচ্ছে। তীব্র যন্ত্রণায় তৃষ্ণার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে, অপমানে ও ক্ষোভে চোখ ফেটে পানি আসতে চায়। নিজেকে এই পৈশাচিক আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করার জন্য সে আপ্রাণ মোচড় দিয়ে ওঠে, ওয়াসেমের লোমশ বাহু দুটোকে নিজের তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে খামচে ধরে। এক গোঙানির মতো চাপা স্বরে সে বলে ওঠে, “আপনিই তো সবসময় বলেন আমি আপনার যোগ্য নই! তাহলে কেন আমি আপনার পায়ে পড়ে থাকব? আমাকে কি একটু শান্তিতে বাঁচতে দেবেন না আপনি?”

কিন্তু তৃষ্ণার এই আকুল আর্তি ওয়াসেমের বধির কামনার দেয়ালে আছড়ে পড়ে অর্থহীন হয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই তৃষ্ণা অনুভব করে, তার কামিজের কাপড়ের ভেতর দিয়ে শীতল কোনো সরীসৃপ হড়হড় করে ঢুকে আসছে। বরফশীতল, কঠিন এক ধাতব নল সোজা তার নাভির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে স্থির হয়, তা হলো সোফা থেকে নেওয়া ওয়াসেমের সেই কালান্তক পিস্তল। তৃষ্ণার সারা শরীর ভয়ে শিউরে ওঠে। তার মনে হয়, এই বুঝি ট্রিগার চেপে ওয়াসেম তার বুকের স্পন্দন চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে। ওয়াসেম এক হাতে তাকে নিজের প্রশস্ত, পাথুরে বুকের সাথে পিষে মারার মতো চেপে ধরে, অন্য হাতে পিস্তলটি ধরে রাখে তৃষ্ণার নাভির ওপর। এক হিংস্র বাঘের মতো ফিসফিসিয়ে শাসিয়ে ওঠে সে,
“যদি মায়ের সামনে তালাকের কথা আর একটা বারও মুখে এনেছিস, তবে এই বন্দুক থেকে পাঁচ পাঁচটা গুলি বের হয়ে বুক ঝাঁঝরা করে দেবে ওই আয়রাদের, যার সাথে তোর নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে! আর শেষ বুলেটটি আমি সরাসরি বিঁধিয়ে দেব তোর এই অবাধ্য কলিজার ভেতর!”

কথাটি শেষ করেই ওয়াসেম তৃষ্ণার কাঁধ থেকে নাক ঘষতে ঘষতে উঠে আসে তার কানের লতি পর্যন্ত। এক গভীর, আদিম আসক্তিতে সে তৃষ্ণার শরীরের ঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নেয়, কোনো আজন্ম আফিমখোর তার নেশার বস্তুটি শুঁকছে মনে হবে। তারপর তৃষ্ণার মুখটি জোর করে ঘুরিয়ে নিজের গালে চেপে ধরে সে, তৃষ্ণার নাকে নিজের নাক ঘষে প্রমত্ত আবেগে। কোনো অনুমতি, কোন ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি তৃষ্ণার ঠোঁটে ঠোঁট মেলায় সে। এক জোরপূর্বক, উন্মাদ, অধিকারপ্রতিষ্ঠাকারী চুম্বনে লিপ্ত হয় ওয়াসেম। তৃষ্ণার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে, ভয়ে, তীব্র যন্ত্রণায় এবং অচেনা শিহরণে। অবিন্যস্ত সেই চুম্বনের পর ওয়াসেম তার মুখটি সামান্য সরায়। তৃষ্ণার অশ্রুসিক্ত, আতঙ্কিত চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে শেষবারের মতো তীব্র শাসানির সুরে বলে ওঠে সে,

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৮

“তুই আমার বউ। আমার একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি। আমার জিনিস আমি কখনোই, কোনোদিনও অন্য কাউকে দেব না, তা মনে রাখিস। তুই শুধু আমার বউ, বুঝতে পারছিস? তুই শুধু আমার, একদম শুধু আমার!”
কথাগুলো শেষ করেই ওয়াসেম আবারও তৃষ্ণার থুতনি চেপে ধরে নিজের তৃষ্ণার্ত ও ক্ষিপ্ত ঠোঁট জোড়া তৃষ্ণার ঠোঁটে বসিয়ে দেয়। এক অনন্ত বন্দিত্বের সিলমোহর এঁকে দেয় তার অধরে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here