Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬০

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬০

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬০
সানজিদা আক্তার মুন্নী

চোখের পলকে কেটে গেল আরও দুটো দীর্ঘ মাস। নাজহার প্রেগন্যান্সির জার্নি এখন একদম শেষ পর্যায়ে, ঠিক নয় মাস নয় দিন চলছে। দাদাজানের আকস্মিক প্রয়াণের পর পুরো বাড়ির পরিবেশ একটা থমথমে, অগোছালো ট্রমার ভেতর দিয়ে গিয়েছিল। সময়ের প্রলেপে সেই শোক কিছুটা ফিকে হয়ে এলেও, এক চাপা উৎকণ্ঠা এখন ভর করে আছে সবার চোখেমুখে নাজহা কে নিয়ে। এই বুঝি কিছু হলো, এই বুঝি সময় ঘনিয়ে এলো!

আজ তৌসির বাড়িতে নেই। বিশেষ কোনো দরকারে জিন্দাবাজার যেতে হয়েছে তাকে। তবে যাওয়ার আগে কড়া নির্দেশ দিয়ে গেছে, সামান্য কোনো অস্বস্তি বা প্রয়োজন হলেই নাজহা যেনো বিন্দুমাত্র দেরি না করে তাকে কল করে। কিন্তু নাজহার বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও সুবিধের নয়। তার শারীরিক অবস্থা বেশ শোচনীয়। সামান্য দু কদম হাঁটতেই হাঁপিয়ে উঠছে সে, ফুসফুস পর্যাপ্ত বাতাস টেনে নিতেও তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। পেটের ভেতর বিন্দু থেকে প্রাণ পাওয়া তিন তিনটে অস্তিত্ব! এই ত্রিমাত্রিক ভার বয়ে বেড়ানো কি চাট্টিখানি কথা? একেকটা মুহূর্ত অনন্তকালের সমান মনে হচ্ছে তার কাছে। মেরুদণ্ডে একটানা চিনচিনে ব্যথা, শরীর ফুলে ভারী হয়ে আছে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাজহা আজকাল নিজেকেই চিনতে পারে না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে তার মনে হয়, এ হয়তো অন্য কেউ অচেনা, অপরিচিত, দূরের কোনো মানুষ। আয়নার কাচে প্রতিফলিত মুখটার দিকে সে অপলক তাকিয়ে থাকে। চোখের নিচে কালির ছোপ, গাল দুটো ফুলে ভারী হয়ে গেছে, ঠোঁট ফেটে শুকনো। অথচ এই মুখটাই তো একদিন কত প্রাণবন্ত ছিল, কত উজ্জ্বল ছিল! বড় আকৃতির পেটটার ভারে তার নিজের অস্তিত্বই ঢাকা পড়ে যায় আয়নার প্রতিবিম্বে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নেয় সে কোথাও নিজের পুরনো ছায়াটুকুও খুঁজে পায় না। তিন-তিনটে মানবসন্তানকে জঠরে ধারণ করে একটা আস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলারও জায়গা নেই তার বুকে। বুকের খাঁচাটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে বলে মনে হয় নাজহার, পাঁজরের ঠিক নিচে সার্বক্ষণিক একটা ভোঁতা, তীব্র চাপ অনুভব করে সে।ওর মনে হয় হয়তো অদৃশ্য কোনো হাত পাঁজরের হাড়গুলো একটু একটু করে চেপে ধরছে ভেতরের দিকে।
নাভির চারপাশের চামড়া এতটাই টানটান হয়ে আছে যে নীলচে শিরাগুলোর পাশাপাশি সরু সরু লালচে স্ট্রেচমার্কগুলোও ফেটে পড়তে চাইছে। মানচিত্রের মতো ছড়িয়ে আছে সেগুলো তার পেটের ওপর কোথাও সরু, কোথাও মোটা, কোথাও আবার গভীর ফাটলের মতো। আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখে সে, চামড়াটা গরম, খসখসে। চামড়ারও তো একটা সহ্যসীমা আছে মনে মনে ভাবে নাজহা। সামান্য একটু এপাশ-ওপাশ করলেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে, হৃৎপিণ্ডটা মনে হয় নিজের স্পন্দনের জন্য জায়গাটুকুও আর খুঁজে পাচ্ছে না।

দিন যত গড়াচ্ছে, ততই তার শরীরটা রূপ নিচ্ছে নিরেট পাথরে। নাজহার পা দুটো ফুলে এমন ঢোল হয়ে আছে যে গোড়ালির হাড়ের কোনো অস্তিত্বই আর চোখে পড়ে না তার। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে সেখানে গর্ত হয়ে যায়, ফিরে আসতে সময় নেয়। কোনোমতে পা টেনে টেনে দু-পা হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠে সে।
আজ তার পরনে ফিকে নীল রঙের একটা ঢিলেঢালা সুতির গাউন আর ভেতরে পাতলা একটা সালোয়ার। এই পোশাকটুকু ছাড়া শরীরে আর কিছু সইছে না এখন তার। কোমরে সামান্য বাঁধন পড়লেই দম আটকে আসে, পেটে একটু চাপ লাগলেই ভেতরের তিনটে প্রাণ একসাথে বিদ্রোহ করে ওঠে। গাউনের নীল রঙটা ফিকে হয়ে এসেছে বহুদিনের ব্যবহারে, কিন্তু কাপড়টা নরম, শরীরে আরাম দেয় বেশ তাই পড়ে। বেলা এখন এগারোটা বাজে বাইরে রোদ চড়ছে। জানালা গলে ঘরে এসে পড়েছে রোদের সরু একটা ফালি, মেঝেতে আলো-ছায়ার নকশা এঁকে দিয়েছে সেটা। পিঠের পেছনে একটা মোটা বালিশ গুঁজে বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে নাজহা। আনমনে নিজের ফোলা পেটটার দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ভেতরের সন্তানগুলোর সাথে নিঃশব্দে কথা বলছে মনে মনে।

এরিমধ্য হঠাৎ তার কোমরের ঠিক নিচ থেকে একটা চিনচিনে, অপরিচিত যন্ত্রণা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গত কয়েক সপ্তাহের পরিচিত এই হালকা ব্যথার মতো নয় এটা, যা একটু হাঁটাহাঁটি করলেই সেরে যায়। আজকের ব্যাথার ধরনটা একেবারেই আলাদা। কোমরের হাড়ের গভীর থেকে শুরু হয়ে ব্যথাটা মনে হচ্ছে দু-পাশ দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে তলপেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। নাজহার মনে হয়, কেউ বুঝি তার পেটের ভেতর একটা শক্ত মুঠো করে তার নাড়িভুঁড়ি চেপে ধরেছে। আবার ছাড়ছে, আবার চাপছে এক অসহ্য খেলা খেলছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ব্যাথায় নাজহা। নিমেষেই বড় বড় হয়ে যায় তার চোখ, আটকে আসে নিঃশ্বাস। দু-হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে সে, চাপে আঙুলের গাঁটগুলো সাদাটে হয়ে যায় তার। চাদরের সুতি কাপড়ে ভাঁজ পড়ে যায়, কুঁচকে যায় বিছানার সাজানো রূপটা। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই নাজহার। সে শুধু চাইছে এই ব্যথাটা থামুক, একটু হলেও কমুক। আর বসে থাকা সম্ভব হয় না তার পক্ষে। চাদরে ভর দিয়ে কোনোমতে উঠে দাঁড়ায় নাজহা।

কিন্তু দাঁড়াতেই তার পা দুটো থরথর করে কেঁপে ওঠে, হাঁটুর জোর মনে হচ্ছে কেউ জাদুবলে শুষে নিয়েছে। পেটের ভারে শরীরটা সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে চায়, কোমরে হাত দিয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে নেয় সে। দু-কদম এগোতে চায়, কিন্তু তলপেটে এমন এক টান লাগে যে মেঝের সাথে তার পা দুটো আঠার মতো আটকে যায়। আবার ধপ করে বসে পড়ে বিছানায় নাজহা। কিন্তু স্বস্তি মেলে না তার। বসলে পেটে চাপ, দাঁড়ালে পায়ের কাঁপুনি, আর শুতে গেলে দমবন্ধ হয়ে আসে তার কোথাও একরত্তি শান্তি নেই। বিছানার এপাশ থেকে ওপাশ করে সে, বালিশটা বুকের কাছে চেপে ধরে কখনো, আবার ছেড়ে দেয়। মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়ে আছে, গাউনের কাঁধটা একদিকে নেমে গেছে। কিন্তু এসব ঠিক করার মতো অবস্থায় সে নেই এখন। ব্যথাটা একটানা আসছে না।

বরং আসছে সর্বনাশা ঢেউয়ের মতো। জলোচ্ছ্বাসের আগে সমুদ্রের পানি যেমন ফুলে ফেঁপে ওঠে, ঠিক তেমন। প্রথমে কোমরের এক কোণায় হালকা একটা টান, এরপর সেটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো তলপেটে, শেষে পাঁজরে এসে আছড়ে পড়ছে। পেটের দু-পাশে মনে হচ্ছে কেউ অদৃশ্য দড়ি বেঁধে উল্টো দিকে টানছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেই টান মারাত্মক হয়ে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে নেমে যায়। নাজহা সবেমাত্র একটু হাঁপ ছাড়ার সুযোগ পায়, আর তখনই আগের চেয়েও কয়েকগুণ তীব্রতা নিয়ে ধেয়ে আসে দ্বিতীয় ব্যাথার ঢেউ। প্রথমবার দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে সয়ে নেয় সে। দ্বিতীয়বার আর পারে না, পলক ফেলার আগেই তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনাপানি। ফোঁটায় ফোঁটায় চিবুক বেয়ে নামতে থাকে সেই পানি, গাউনের কলারে এসে শোষিত হয়ে যায়। তৃতীয়বার তার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে একটা যন্ত্রণাকাতর গোঙানি প্রায় শোনাই যায় না এমন। ঠোঁট কামড়ে শব্দটা গিলে ফেলতে চায় নাজহা, কিন্তু পারে না সে। দু-হাতে পেটটা আঁকড়ে ধরে সে, মনে হয় হাত দিয়ে টেনে যদি এই ব্যথাটা শরীর থেকে বের করে দেওয়া যেত তাহলে ও শান্তি পেত! গাউনের কাপড়টা খামচে ধরায় তার আঙুলের ফাঁকে ভাঁজ পড়ে যায় সুতির কাপড়ে। কপাল বেয়ে নামা ঘামের ফোঁটাগুলো তার চোখের পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। চুলের গোড়া ভিজে সপসপে, সামনের দিকের চুলগুলো লেপ্টে আছে তার কপালে।

ঘাড়ের কাছে চিটচিটে অস্বস্তি, ঘামে গাউনটা পিঠের সাথে একেবারে সেঁটে গেছে তার। বগলের নিচ দিয়েও ঘাম গড়িয়ে নামছে, কাপড় ভিজিয়ে দিচ্ছে। ঠোঁট কামড়ে কান্না চাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে সে, তবু ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। চোয়ালটা পাথরের মতো শক্ত করে রেখেছে নাজহা এখন ভেঙে পড়লে চলবে না, নিজেকে এই কথাটাই বারবার বলছে সে মনে মনে। “আর একটু, আর একটু শক্ত থাকতে হবে।” এক তো এই অসহ্য ব্যাথা তার ওপর ভেতরের তিনটে অবুঝ প্রাণ একসাথে প্রলয়নাচন শুরু করেছে। কেউ একজন তার পাঁজরের নিচে ছোট্ট পা দিয়ে লাথি ছুঁড়ছে, কেউ তলপেটে প্রবল চাপ দিচ্ছে, কেউ আবার দু-দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। পেটের পাতলা চামড়ার নিচ দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোথায় একটা ছোট্ট হাত সরে যায়, কোথায় একটা ছোট্ট গোড়ালি ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে যায়। চামড়ার ওপর ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ খেলে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে পানির নিচে কেউ আঙুল ঠেকিয়ে নাড়াচাড়া করছে।তাদের এই প্রতিটি নড়াচড়া নাজহার যন্ত্রণার আগুনে ঘি ঢালছে। ভেতরে তিনটে আলাদা ঝড়, আর সেই ঝড়ের ঠিক কেন্দ্রে সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে সে। ঘরে আর কেউ নেই, আশেপাশে আর কেউ নেই শুধু সে আর তার ভেতরের তিনটে প্রাণ। এত কষ্ট সে সইবে কী করে! একবার ভাবে চিৎকার করে কাউকে ডাকবে, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না। শব্দগুলো গলার ভেতরেই আটকে আছে কাঁটার মতো।

ব্যথার ফাঁকে ফাঁকেই দম নেওয়ার চেষ্টা করে নাজহা। লম্বা করে শ্বাস টেনে মুখ দিয়ে ছাড়তে চায়, কিন্তু আফসোস বুক ভরে শ্বাস নেওয়ারও উপায় নেই তার, পেট এত বড় যে ফুসফুসের প্রসারিত হওয়ার জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই। ছোট ছোট, ছেঁড়া ছেঁড়া নিঃশ্বাস টানে সে। নাজহার হাত-পা ক্রমশ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে, অথচ সারা শরীর ঘামে ভাসছে। আঙুলের ডগাগুলো অসাড় হয়ে যাচ্ছে তার। মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাচ্ছে শিরশিরে অনুভূতি ঠান্ডা স্রোতের মতো, ঘাড় থেকে শুরু করে কোমরের নিচ পর্যন্ত। কান দুটো গরম হয়ে উঠেছে তার, ভেতরে ভোঁ ভোঁ একটা শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না সে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা উষ্ণ, ভেজা অনুভূতি টের পায় নাজহা। তার মনে হয় তার তলপেটের গভীর থেকে ছিপি খুলে যায় কিছু একটার, ভেতরের সেই অসহ্য চাপটা হঠাৎ করেই একটু কমে আসে তার। চমকে ওঠে সে। কী হলো এটা? প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না নাজহা। গাউনের নিচ দিয়ে কুসুম গরম একটা স্রোত গড়িয়ে পড়ে তার দু-পায়ের ফাঁক গলে। প্রথমে অল্প, তারপর আরেকটু, তারপর আরও বেশি ঝিরঝির করে নেমে আসছে এই স্রোত।তার পরনের সালোয়ারটা কোমরের কাছ থেকে শুরু করে হাঁটু, তারপর গোড়ালি পর্যন্ত ভিজে জবজবে হয়ে যায় নিমেষেই। ভারী হয়ে আসা কাপড়টা লেপ্টে যায় তার পায়ের সাথে।

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয় শরীরের ওপর থেকে নিজের সব নিয়ন্ত্রণ বুঝি হারিয়ে ফেলে সে। নাজহা বুঝতে পারে না এ কী হলো! কিন্তু পরক্ষণেই বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো তার মাথার ভেতরটা পরিষ্কার হয়ে যায়। পানি ভাঙছে তার! এতদিন শুনে এসেছে এই কথা, এতদিন পড়েছে আজ নিজে অনুভব করছে। ভয় আর বিস্ময় একসাথে এসে আছড়ে পড়ে তার বুকে। নিচের দিকে তাকায় নাজহা। তার পায়ের কাছে মেঝেতে ফোঁটা ফোঁটা পানি জমতে শুরু করেছে। টুপ করে পড়া প্রথম ফোঁটাটার পর আরও কিছু ফোঁটা, তারপর জায়গাটা ছোটখাটো একটা পুকুরের মতো হয়ে যায়। পরনে ভিজে যাওয়া গাউনের ওপর পেটের গোলাকার রূপটা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে তার। কাপড়টা পেটের সাথে এমনভাবে সেঁটে গেছে যে নাভির গর্তটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ভেতরের তিনটে প্রাণ নিঃশব্দে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। কোনো শব্দ নেই, পূর্বাভাস নেই, শুধু শরীরটাই নিজের ভাষায় তাকে জানিয়ে দিচ্ছে সময় ফুরিয়ে এসেছে। অপেক্ষার পালা শেষ। এবার মিলনের ক্ষণ। দীর্ঘ নয় মাস দশ দিন বুকে আগলে রাখা তিনটে প্রাণ এবার পৃথিবীর আলো দেখতে ব্যাকুল। নাজহার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে, চারপাশের পৃথিবীটা একটু ঘোলাটে ঠেকে তার কাছে। তার গাল বেয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে, সে খেয়ালও করছে না। নাজহার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে অদ্ভুত হাসি। তীব্র যন্ত্রণা আর ভয়কে ছাপিয়ে তার বুকের ভেতর মাতৃত্বের এক অনাবিল আনন্দ পাক খাচ্ছে। তিনটে ছোট্ট মুখ দেখার প্রহর, তিনটে ছোট্ট হাতের আঙুল নিজের আঙুলে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষা। তিনটে ছোট্ট হৃৎস্পন্দন তার বুকের সাথে মিলিয়ে শোনার সাধ। নিজের পেটের ওপর হাত রেখে আলতো করে বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে নাজহা, “একটু সবুর করো তোমরা, আর নেই সময়।”

আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা যাবে না। কাঁপা হাতে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা টেনে নেয় সে। স্ক্রিনে আঙুল রাখতে গিয়ে বারবার ভুল হয়ে যাচ্ছে হাত কাঁপছে এত যে স্ক্রিনের লক খুলতেই কয়েক সেকেন্ড লেগে যায়। কোনোমতে বিছানায় বসে ইকরাকে ফোন লাগায় নাজহা। কানের কাছে ফোনটা চেপে ধরে সে, রিং বাজছে একবার, দুবার কিন্তু ইকরা ফোন ধরে না। ইকরা এখন অফিসে। কাজের চাপে ব্যস্ত, ফোনের রিং টোন বাজতেই কিছুটা বিরক্তি নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। কিন্তু নাজহার নামটা দেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। এই সময়ে নাজহা ফোন দিচ্ছে? কিছু কি হলো? দ্রুত ফোনটা কানে ঠেকায় সে।
ওপাশ থেকে নাজহার কাঁপা, ভাঙা গলার স্বর ভেসে আসে। কথা ঠিকমতো বের হচ্ছে না তার মুখ থেকে, কিন্তু যা বলছে তাতেই ইকরার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। নিজের বর্তমান অবস্থার কথা জানিয়ে ইকরাকে সে নির্দেশ দেয় তৌসিরকে খবরটা দিতে। নাজহা নিজে তৌসিরকে ফোন দেয় না তার ইচ্ছে নেই তৌসির কে ফোন দেওয়ার। ইকরা নাজহা কে বলে, “তুই চিন্তা করিস না নাজহা, আমি এক্ষুনি তৌসির ভাই কে জানাচ্ছি। তুই শুধু একটু শক্ত থাক, আমি আসছি।”

খবর পেয়ে ইকরা এক সেকেন্ডও দেরি না করে তৌসিরের নাম্বারে ডায়াল করে। অফিসের করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ফোনটা কানে ঠেকিয়ে রাখে সে। ওদিকে তৌসির আর রুদ্র সবেমাত্র বাড়ির মেইন গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। দুপুরের কড়া রোদ মাথার ওপর, কপালে চিকচিক করছে ঘাম। দুজনেই কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করতে করতে আসছিল হঠাৎ পকেটে ফোনের ভাইব্রেশন অনুভব করে তৌসির। বুক পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে এক নজর তাকায় সে। ইকরার নাম দেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। কানে ঠেকায় ফোনটা আর বলে, “কী হইছে রে? তুই ফোন মারাস ক্যা আমারে?”
ফোনের ওপাশ থেকে ইকরার গলাটা কেঁপে ওঠে। তাড়াহুড়ো করে সে বলে ওঠে, “ভাই, ঘরে যাও। নাজহার পানি ভাঙ্গতেছে।”

কথাটা কানে যেতেই তৌসিরের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। মুহূর্তের জন্য ওর মনে হয় পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। চোখের সামনে দুনিয়াটা বোধহয় ঘুরপাক খায় একবার। ওর গলার ভেতরটা শুকিয়ে আসে নিমিষেই। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সে ফোনটা কেটে দেয়। তারপর একপ্রকার দৌড়ে সে ঘরের দিকে ছোটে। দৌড়াতে দৌড়াতেই তৌসির রুদ্রকে হাঁক ছাড়ে, “রুদ্র, হসপিটালে ফোন লাগা। রেডি থাকতে ক সবাইরে। আর গাড়ি রেডি কর। জলদি।”
রুদ্র কিছু জিজ্ঞেস করার সময় পায় না। সে শুধু তৌসিরের চোখের দিকে এক পলক তাকিয়েই বুঝে নেয়।
লুঙ্গির দুই কোণ তুলে হাতে চেপে ধরে তৌসির দৌড়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। উঠানে পা রাখতেই বিবিজান অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকান। কপাল কুঁচকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “কিরে, তোরে কে দৌড়ায়?”
তৌসির দম নেওয়ার ফুরসত না নিয়েই উত্তর দেয়, “বিবিজান, হাসপাতালে যাইতে হইবো। তাড়াতাড়ি রেডি হও।”

এটুকু বলে সে আর দাঁড়ায় না। বিবিজানের প্রশ্নের অপেক্ষাও সে করে না। সোজা ঘরের দিকে এগিয়ে যায় । ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তৌসিরের পা থমকে যায় এক মুহূর্তের জন্য। সে যা দেখে, তাতে ওর বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে।নাজহা মেঝের ওপর আধভেজা অবস্থায় বসে আছে। তার চুলগুলো এলোমেলো, কপালে ঘাম জমে আছে বিন্দু বিন্দু। সেই ঘাম ওর গাল বেয়ে নেমে এসে চোখের পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। ব্যথায় কাতরাচ্ছে সে। কাঁদছেও বটে, তবে নিঃশব্দে। তার চোখ থেকে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে, কিন্তু ওর মুখ থেকে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। তার ঠোঁট দুটো শুধু কেঁপে কেঁপে উঠছে। একটা চাপা গোঙানি ওর গলায় এসে আটকে যাচ্ছে বারবার।
দৃশ্যটা দেখে তৌসিরের কলিজাটা পুড়তে শুরু করে। মনে হয় কেউ মুঠোয় পুরে চেপে ধরেছে ওর কলিজাটা। তার চোখের সামনের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসে এক পলকের জন্য। দ্রুত পায়ে সে এগিয়ে যায় নাজহার দিকে। কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে নাজহার পাশে। মেঝের পানিতে তার লুঙ্গির কোণ ভিজে যায়, কিন্তু সেদিকে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। এই অবস্থায় নাজহাকে কোলে তুলে নেওয়া সহজ কাজ নয়। নাজহার শরীরটা ভারী, পেটের আকার বড়। তবে তৌসিরের জন্য এটা কোনো ব্যাপার না। সে ঝুঁকে এক হাত নাজহার পিঠের নিচে আর অন্য হাত ওর হাঁটুর নিচে দিয়ে আস্তে করে তাকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁত চেপে নাজহার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমাকে ফোন দেওয়া যাইত না? ইকরা তোর লাং না আমি? যে ওরে ফোন করস। বাড়িতে আর কেউ নাই? বেদনায় ধরছে, বলতে পারলি না?”

তার কথাগুলোর ভেতরে ক্রোধ নেই, আছে শুধু অসহায়ত্ব। সেই অসহায়ত্ব তার গলার ভেতর থেকে চুঁইয়ে পড়ছে। কথাগুলো শুনে নাজহা কোনো উত্তর দেয় না। উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি ওর শরীরে নেই। সে শুধু এক হাতে তৌসিরের ঘাড়ের কলার চেপে ধরে। তার আঙুলগুলো কেঁপে কেঁপে কাপড়টাকে আঁকড়ে ধরে রাখে, আরেক হাত সে রাখে নিজের পেটের ওপর। ব্যথায় কেঁপে কেঁপে ওঠে ওর সারা শরীর। কাঁপা গলায় নাজহা ফিসফিস করে তৌসির কে বলে, “আমার আব্বাকে বলুন আসতে। আমি মৃত্যুর আগে উনাকে একবার দেখতে চাই। আমার আব্বা খারাপ হলেও আমি উনাকে ভালোবাসি।”

কথাটা শুনে তৌসিরের পা এক মুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে আসে। ওর বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে। তবু সে থামে না। থামার সময় এটা না। নাজহাকে সে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। নাজহার মাথাটা ওর বুকে এসে ঠেকে। বাড়ির সবাই তৌসিরের পিছন পিছন আসেন। কেউ আঁচল চেপে কাঁদছেন, কেউ মুখে আল্লাহর নাম জপছেন। সবার মুখে দোয়া, সবার চোখে আতঙ্ক। নাজহা কে নিয়ে সবাই চিন্তায় মরছেন। উঠান পেরিয়ে গাড়ির কাছে এসে তৌসির নাজহাকে আস্তে করে পেছনের সিটে শোয়ায়। তারপর নিজে বসে। বিবিজান কোনোরকমে দৌড়ে এসে সামনের সিটে বসেন। রুদ্র দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দেয়। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে সাথে গাড়িটা ছিটকে বেরিয়ে যায় বাড়ির গেট পেরিয়ে। যাওয়ার আগে বিবিজান সিমরানকে ডেকে বলে গেছেন, ইকরা আর ও প্রয়োজনীয় সব কিছু গুছিয়ে যেনো এক ঘণ্টার ভেতরে হসপিটালে পৌঁছায়। গাড়ি চলতে শুরু করতেই নাজহার ব্যথা আরও বেড়ে যায়। নিজের পেটে দুই হাতে চেপে ধরে সে চিৎকার করে ওঠে।

কেঁদে কেঁদে নাজহা বলে ওঠে, “তৌসির, আমি এই ব্যথা নিতে পারছি না।” নাজহার মনে হতে থাকে কলিজাটা বেরিয়ে আসছে তার শরীর থেকে। প্রতিটা মুহূর্ত এখন তার কাছে এক একটা যুগের সমান। তৌসির নাজহা কে শান্তু করতে নাজহার পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “কিচ্ছু হবে না কৈতরী, কিচ্ছু হবে না। আমি আছি তো।”
নাজহা হঠাৎ তৌসিরের ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে। তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ব্যাথাচুত্য গলায় বলে,

“তৌসির শিকদার, আমি মারা গেলে আপনি আমার জানাজায় দাঁড়াবেন না। আমার কবরের এক মুঠো মাটিও দিবেন না। আমার লাশ দেখবেন না আপনি। আপনি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন অনেকবার। রাখতে হবে কিন্তু, নয়তো আমার রুহু আপনাকে অভিশাপ দিবে। বলুন হ্যাঁ। বলুন হ্যাঁ বলুন।”
তৌসিরের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। একে তো নাজহার এই অবস্থা, তার মধ্যে এত কঠিন ওয়াদা। তার কণ্ঠ আটকে আসে। চোখের কোণে জমা পানিটা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, তবে পারছে না। তৌসিরের মনে হয়, পুরো জীবনের সব কষ্ট এই এক মুহূর্তে এসে জড়ো হয়েছে। সে নাজহার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে মাথা নাড়িয়ে বলে, “জি, জি, আমি রাখমু। সব কথা রাখমু।”
কথাটা শোনার পর নাজহা একটু শান্ত হয়। তৌসিরের হাত চেপে ধরে সে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ভাঙা গলায় বলে, “আমার সন্তানগুলো মা হারা হয়ে গেলে অবহেলা কইরেন না। খুনি বানিয়েন না, মানুষ বানিয়েন কেমন? আমার ছেলে হলে ওদের ভালো কাজে লাগিয়েন। আপনার মতো নিষ্ঠুর জীবন ওদের দিয়েন না। আর মেয়ে হলে আমার আব্বা যেভাবে আমাকে স্বার্থের জন্য বিক্রি করে দিয়েছে, এভাবে বিক্রি করে দিয়েন না কেমন? বাবা হিসেবে ভালো হইয়েন তৌসির শিকদার।”
তৌসির নিঃশব্দে শুনে যায়। ওর কণ্ঠ টা এখন কোথাও আটকে গেছে। তার বুকের ভেতর শব্দরা ভিড় করছে, কিন্তু একটাও বাইরে আসছে না। নাজহা একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করে। তার কণ্ঠটা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে তাও সে বলে,

“আমার মাস্টার চাচ্চুর লাশটা যেখানে পুঁতেছেন তার ডান পাশে আমায় কবর দিয়েন। আমি অনেক খারাপ একটা মা। আমার সন্তানদের বইলেন। বইলেন ওদের পৃথিবীতে আনতে চাইনি আমি।”
কথাটা শেষ না হতেই ব্যথা আবার আঁকড়ে ধরে ওর পেটের তলায়। ছটফটিয়ে ওঠে সে। তার শরীরটা ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে চিৎকারটাকে সে গলার ভেতরেই চেপে রাখার চেষ্টা করে। তৌসিরের চোখে পানি টলমল করছে এই কথাগুলো শুনে। ওর বুকের ভেতর কোথায় একটা বাঁধ ভাঙছে, কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে পারছে না। রুদ্র যত দ্রুত পারে গাড়ি চালাচ্ছে। হর্ণের শব্দে রাস্তার অন্য গাড়িগুলো একপাশে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই গতিও তার কম মনে হচ্ছে। রাস্তাটা মনে হচ্ছে আজ অনেক লম্বা হয়ে গেছে। প্রতিটা সিগন্যাল, প্রতিটা মোড়।এক একটা যুগের সমান মনে হচ্ছে।
নাজহার মনে হচ্ছে ভেতরের তিনজন একসাথে বেরিয়ে আসবে। তার পেট ফেটে যাবে হয়তো। কোনোরকমে সে তৌসিরের কাঁধে হাত রাখতে চায়, কিন্তু ওর হাতটা পিছলে গিয়ে আটকায় তৌসিরের বুকে। তৌসিরের শার্টের কাপড়টা মুঠোয় খামচে ধরে কেঁদে ওঠে নাজহা,
“মৃত্যুর আগে একটাবার আমি আমার নিষ্ঠুর বাপ চাচাদের দেখতে চাই। তারা নিষ্ঠুর হলেও আমি তাদের ভালোবাসি আমাকে তাদের সাথে দেখা করান।”

কথাটা বলে নাজহা হু হু করে কেঁদে ওঠে। বুক কাঁপিয়ে কাঁদে সে। তৌসির ওর পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “চুপ কর বলছি। তোর বাপরে বলছি তোর কিচ্ছু হবে না। তুই এত সহজে মরলে আমাকে ঘৃণা করবে কে? অনেক ঘৃণার হিসাব তোর আমার বাকি।”
নাজহা ব্যথায় দুই হাতে পেট চেপে ধরে। ক্ষীণ গলায় সে বলে, “আমার মৃত্যুর পর মায়াকে বিয়ে কইরেন। ও আপনার সন্তানদের ভালো রাখবে। ভালো রাখবে আপনাকেও।”
তৌসির এ কথায় নাজহার দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলে না সে। বলার মতো কোনো শব্দ ওর কণ্ঠে আসে না। শুধু দাঁত দিয়ে নিজের নিচের ঠোঁটটা সে চেপে ধরে রাখে, যাতে ভেতরের কান্নাটা বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে।

হাসপাতালে গাড়ি এসে থামে। নার্স আর ডাক্তাররা রেডি, তাঁরা স্ট্রেচার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গেটের সামনেই। রুদ্র আগেই ফোন করে সব জানিয়ে রেখেছে। গাড়ির দরজা খুলে তৌসির আগে নামে। তারপর সাবধানে সে নাজহাকে কোলে তুলে নেয়। নাজহাকে স্ট্রেচারে শোয়াতে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য তার হাত কাঁপে। ব্যথায় নাজহার নাক মুখ লাল হয়ে গেছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে সে কান্না, পারছে না। তার কপালের ঘামে চুল লেগে আছে।
নাজহাকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হবে, ঠিক তখনই হাসপাতালের গেট দিয়ে আরেকটা গাড়ি এসে থামে। নাজহার আব্বা ছিদ্দিক সাহেব এসেছেন। তাঁর সাথে ছোট চাচ্চু, লাল চাচ্চু, বড় চাচ্চু, মেঝো চাচ্চু, বড় বাবা, সেজো বাবা সবাই এসেছেন। প্রায় ছুটতে ছুটতে তাঁরা নামেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বিবিজান তাঁদের খবর দিয়ে এসেছিলেন।
নাজহার পাশেই এখন তৌসির দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখ লাল, মুখ শক্ত হয়ে গেছে। তৌসিরের কলিজাটা পুড়ে যাচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে চারপাশের সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নাজহা তৌসিরের লুঙ্গিতে আলতো করে টান দেয়। ওকে নিজের দিকে ঝুঁকতে বলে ইশারায়। তৌসির ঝুঁকলে ক্ষীণ গলায় সে বলে, “আমার আব্বাকে দেখতে দিন।”

ছিদ্দিক সাহেব দৌড়ে আসেন তাদের দিকে। নাজহার পাশে এসে দাঁড়ান তিনি। ছোট চাচ্চুরা সবাই এসে দাঁড়ান চারপাশে। ছিদ্দিক সাহেব কাঁপা হাতে নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কোনোরকমে তিনি বলেন, “কিচ্ছু হইবো না আম্মা। তুমি চিন্তা কইরো না।”
কথাটা বলে তিনি ঝুঁকে নাজহার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ান। বহুদিন পর। বহু বহু দিন পর। বিয়ের পর হয়তো এই প্রথম তিনি আদর করলেন নাজহা কে। এই স্পর্শে নাজহার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। নাজহা উনার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে কেঁদে ওঠে কাঁপা গলায় সে বলে, “আব্বা, একটা কথা রাখবে?”
ছিদ্দিক সাহেব আধো গলায় বলেন, “বলো মা।”
তাঁর চোখে পানি চলে আসে। তিনি নিজেই জানেন না, আজ কেন তাঁর এত কষ্ট হচ্ছে। নাজহার জন্য এত টান তিনি কখনো অনুভব করেননি। আজ উনার বুকের ভেতর কোথাও একটা পাথর গলে যাচ্ছে। এতদিনের জমে থাকা সব হিসেব নিকেশ, সব স্বার্থ, সব নিষ্ঠুরতা মনে হচ্ছে এক ঝটকায় ভেসে যাচ্ছে। নাজহা নিজের সব চাচাদের দিকে একবার তাকিয়ে একটু হেসে বলে, “তোমরা এসেছ চাচ্চুরা। জানো, মনে হয়েছিল মৃত্যুর আগে আমি হয়তো তোমাদের দেখতেই পাব না।”

চাচাদের সবার চোখ ভিজে আসে। বড় চাচ্চু মুখ ফিরিয়ে নেন। তাঁর কাঁধ কেঁপে কেঁপে ওঠে নিঃশব্দ কান্নায়। মেঝো চাচ্চু চোখ মোছেন। ছোট চাচ্চু দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ কোনো কথা বলতে পারেন না। শব্দরা এখন সবার গলায় গিয়ে আটকে গেছে।এটুকু বলে নাজহা ছিদ্দিক সাহেবের দিকে তাকায়। উনার চোখে চোখ রেখে সে ভাঙা গলায় বলে, “আব্বা, আমার জানাজায় তুমি সামিল হইয়ো না। তুমি আমার কবরের মাটি ছুঁইয়ো না। তুমি আমার লাশ দেইখো না। আমার কথাটা রাইখো। নয়তো আমার রুহু কষ্ট পাবে।”

ছিদ্দিক সাহেবের হাত কেঁপে ওঠে শুনে। তিনি কিছু বলতে চান, কিন্তু পারেন না উনার কণ্ঠ আটকে যায়। মেয়ের মুখ থেকে এই কথা শুনে উনার মনে হচ্ছে উনার বুকের ভেতরে কেউ ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। সেই ছুরি ধীরে ধীরে এমনভাবে ঢুকছে, যে তিনি চিৎকার করারও শক্তি পাচ্ছেন না। নাজহা আবার বলে, “তুমি আমায় নিজের মেয়ে মনে করো না আব্বা। আমি মরেছি কি বেঁচেছি, এতে তোমার কিছু যায় আসে না আব্বা। তাই তুমি আমার জানাজায় সামিল হইয়ো না আব্বা।”
একটু থেমে দম নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নাজহা বলে, “আব্বা, তুমি অনেক নিষ্ঠুর আব্বা। কিন্তু আমি তো তোমার মেয়ে, তোমার মা। তাই তোমায় ঘৃণা করতে পারলাম না।”
ছিদ্দিক সাহেবের চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে নাজহার হাতের ওপর। তিনি কিছু বলবেন নাজহা কে কিন্তু বলতে পারেন না ডাক্তাররা তাড়া দেন। আর সময় নেই। কথা বলার সময় নেই, কান্নার সময় নেই। নাজহাকে দ্রুত ভেতরে ঢুকানো হয়। স্ট্রেচারের চাকা মেঝেতে ঘষা খেতে খেতে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তবে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো তৌসিরের দিকে তাকিয়ে নাজহা বলে যায়, “আপনাকে আমি কখনোই মাফ করব না তৌসির শিকদার। কিন্তু আপনি আমার সন্তানের বাবা হিসেবে আমার জন্য ভালো ছিলেন। আপনাকে ধন্যবাদ আমায় এতটুকু পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার জন্য।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৯

এই কথাগুলো ছুরির মতো তৌসিরের বুকে এসে বিঁধে। প্রতিটা শব্দ যেন আলাদা আলাদা ক্ষত। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলতে পারে না। তার ঠোঁট দুটো শুধু কেঁপে ওঠে। হাত বাড়িয়ে নাজহাকে আঁকড়ে ধরতে চায় সে, কিন্তু স্ট্রেচার ততক্ষণে গড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। তার আঙুলগুলো শূন্যে কেমন বোকার মতো ঝুলে থাকে কয়েক সেকেন্ড। নাজহাকে অটি রুমের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। স্ট্রেচারের চাকার শব্দ ক্রমে দূরে সরে যায়।অটি রুমের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। তৌসির এক দৃষ্টিতে সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে স্থীর হয়ে। সে নড়ে না, কথা বলে না। পিছনে ছিদ্দিক সাহেব দেয়াল ধরে বসে পড়েন মেঝেতে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here