Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৭

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৭

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৭
তামান্না ইসলাম শিমলা

পাগল আব্দুল করিম গায়
ভুলিতে পারিনা আমার মনে যারে চায়
পাগল আব্দুল করিম গায়
ভুলিতে পারিনা আমার মনে যারে চায়
কুলনাশা পিরিতের নেশায় কুলমান গেছে
হায়গো কুলনাশা পিরিতের নেশার কুলমান গেছে
দেওয়ানা বানাইছে
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে
বন্ধে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
বন্ধে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
দেওয়ানা বানাইছে
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে
বন্ধে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
বন্ধে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
দেওয়ানা বানাইছে
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে

গান শেষ করে হাত গিটারটা নিচে রাখল, আবারও নতুন করে সিগারেট ধরাল তেহরাব। চারদিক নিস্তব্ধ অন্ধকারে ঢুবে আছে, আকাশে অর্ধবৃত্ত চাঁদ। মধ্যরাত, ঘুম নেয় চোখে, তাই তো গিটার নিয়ে বসেছে ছাদের এক কোণে৷ কিছুটা সময় নিজেকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, কিন্তু মন যে একা থাকতে চাইছে না।
কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করতে অধর প্রসারিত হয় তেহরাবের, সে জানে এত রাতে কে আসতে পারে।
“ঘুমাওনি কেন? ডাক্তার রাত জাগতে মানা করেছে না”
চেয়ার টেনে বসল ইউসুফ, তাকাল আলোকিত চাঁদের দিকে।
“তুমি এখনো ঘুমাও নি কেন?”
তেহরাব কিঞ্চিৎ হাসে, সিগারেটে টান দিয়ে বলে,
“ঘুম আসছে না!”
ইউসুফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তেহরাবের দিকে, ছেলেটাকে সে চেনে। পড়তে পারে চোখের ভাষা,
“কি হয়েছে? জ্বর কি বেড়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”
তেহরাব চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে, তাকাল বাবার মুখপানে। গম্ভীর শীতল কন্ঠে বলল,
“উহু, শরীর খারাপ তো লাগছে না!”
“তাহলে?”

তেহরাব হুট করে ইউসুফের কোলে মাথা রাখল,ইউসুফ চমকাল। কিছু সময় লাগল বিষয়টা বুঝতে, অতঃপর মাথায় হাত রাখল।
“কি হয়েছে তেহু?”
তেহরাব নিশ্চুপ, তার গভীর দৃষ্টি দূর আকাশের চাঁদের দিকে। ছেলে যে ভাবনার জগতে আছে তা বুঝতে সময় লাগল না ইউসুফের, তেহরাবের হাতটা শক্ত করে ধরল ইউসুফ।
“তেহরাব, মন খারাপ?”
“আব্বু আমি কি অনেক বেশি খারাপ?’
ছেলের নরম কন্ঠে অন্তর কেঁপে উঠল ইউসুফের, তার কঠিন স্বভাবের ছেলেটার এমন নরম ধরে আসা গলা সে মানতে পারছে না। ইউসুফ তেহরাব উঠো বসায়, ছেলের চোখের দিকে তাকায়। তেহরাবও তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে, ইউসুফের বুকে চিলিক দিয়ে উঠল ছেলের এহেম দৃষ্টি দেখে।

“তেহরাব বল কি হয়েছে? এমন লাগছে কেন তোকে?’
ইউসুফ তেহরাবের বাহু ধরে ঝাঁকায়, তেহরাব বলে,
“ বল না, আমি অনেক খারাপ?”
ইউসুফ মাথা নাড়ায়, তার ছেলেটা এমন করছে কেন?
“তুই খারাপ হতে যাবি কেন? কি হয়েছে বল তো? এমন কথা বলছিস কেন?”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে নিজের চেয়ারে হেলান দেয়,
“তাহলে তনয়া কেন আমাকে ভালোবাসে না বাবা? কি করেছি আমি? কি অন্যায় করেছি? শুধু ভালোই তো বেসেছি, মেয়েটা কেন আমায় ভালোবাসে না!”
তেহরাবের কন্ঠস্বর কাঁপছে, বন্ধ চোখ জোরা থেকে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরল। ইউসুফ সইতে পারছে না, তার এই শক্ত, কঠিন, গম্ভীর ছেলেটা কাঁদছে? তাও একটা মেয়ের জন্য!
ইউসুফ জড়িয়ে ধরল তেহরাবকে, তেহরাবও জড়িয়ে ধরল,
“আব্বু কিছু কর না, কষ্ট হচ্ছে আমার। বুকের ভেতরটা কেমন করছে, আমি তনয়াকে হারিয়ে ফেলব না তো বাবা?”
ইউসুফ তেহরাবের পিঠে হাত রাখে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক ভাবে বলে,
“তুই বেশি চিন্তা করছিস, কটা দিন অপেক্ষা কর বাবা৷ তনয়া তোরই হবে, আমি নিজে ওকে এ বাড়ির বউ করে আনব।”

“ও বোঝে না বাবা, ও বোঝে না, একটুও বোঝে না। আমার যন্ত্রণা হয়, মরে যেতে ইচ্ছে করে, তাও তনয়া বোঝে না। তুমি তো জানো বাবা কতটা ভালোবসি ওকে আমি, ও কেন বুঝে না? কি করলে বুঝবে? আমি কি করব আব্বু?”
ইউসুফ কি বলবে বা কি করবে বুঝতে পারছে না,বড় করে শ্বাস নেয় সে। একটা মানুষ ভালোবাসার জন্য এতটা পাগলামি করে? এ ছেলে সত্যি বাঁচবে না।
“বললাম তো তনয়া তোরই হবে, আমি আছি তো!”
তেহরাব ইউসুফকে ছেড়ে তার দিকে তাকায়, ইউসুফের হাত ধরে অসহায় মুখ করে বলে,
“সত্যি এনে দেবে তো? নাহলে কিন্তু মরে যাব আমি, সত্যি মরে যাব।”
ছেলের কথাগুলো তার হৃদয়ে আঘাত করছে, ছোট বেলায় যেমন খেলনার জন্য বায়না ধরত ঠিক আজও বাচ্চাদের মতো বায়না ধরেছে তার ছেলে। গলা শুকিয়ে আসছে তার, ঠোঁট মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে,
“মরার কথা কেন বলিস বাবা ? আমাদের কথা একবারও ভাবছিস না?’
তেহরাব জবাব দেয় না, দুহাতে মাথা চেপে বসে থাকে,
“আমি একটু একা থাকতে চাই বাবা!”
ইউসুফ আর কিছু বলে না, একাই থাকুক কিছু সময়। সে চলে যায়, তেহরাব তার ঘাড় অব্দি চুল গুলো খামচে ধরে বসে থাকে। বিড়বিড় করে বলে,
“একই আকাশের নিচে আমি আর তুই, একই বাতাস গায়ে মাখছি! তবু কেন মনে হচ্ছে তুই অনেক দূরে? তুই মিশে আছিস আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি অজানা অনুভূতিতে।! অথচ কেন মনে হচ্ছে আমি তোকে হারিয়ে ফেলছি?”

“আমি কখনো আপনার ছিলাম না তেহরাব ভাই, আপনি নিজ মনে আমাকে নিজের ভেবে গিয়েছেন। আপনার অনুভূতির গভীরতায় আমিও যে ডুবে গিয়েছিলাম, পাপ করে ফেলেছি আমি। আমি আপনাকে ডিজার্ভ করি না তেহরাব ভাই, আপনার জীবনে এমন কেউ আসুক যে আপনার জীবনটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলবে। খারাপ তো আমি, আমাকে মনে করে কষ্ট কেন পাবেন? আর চারটি দিন, আমি অনেক দূরে চলে যাব। আপনার ভাগ্য থেকেও, আপনার চাওয়ার থেকেও, অনেক দূরে!”
অনুভূতি গুলো ডাইরি বন্দি করে রেখে দিল তনয়া, সে যে বন্দিনী এক পাখি। উড়ার অধিকার আছে, তবে নিজ আঙিনায়। সীমা ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য তার নেই, হবেও না কোনো দিন।
ডাইরিটা আলমারিতে রেখে আবারো ফিরে আসল টেবিলে, জানালা খোলা। চাঁদের মৃদু আলো চোখে মুখে এসে পরছে তার। তাকাল অর্ধচন্দ্রের দিকে, হাসল কিঞ্চিৎ।
“আপনাকে নিয়ে ঘর বাঁধার সপ্ন আমি কখনই দেখি নি তেহরাব ভাই, তবে কেন আজ সপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা হচ্ছে? দুনিয়া কত অদ্ভুত তাই না? যে যত বেশি ভালোবাসে দিন শেষে তারাই বেশি কষ্ট পায়, আমি তো বাসতে চাই নি। আমার তো কষ্ট পাওয়ার কথা না!”
হঠাৎ তনয়ার মনে হল তার মন খুব করে তেহরাবকে দেখতে চাচ্ছে, কি আশ্চর্য। মনেরও বুঝি আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেয়? কি সব চেয়ে বসে!

নিজেকে নিজে শাঁসালো তনয়া, এমন অবাদ্ধ হলে চলবে না। আজ হুট করে সে অনুভব করল এতদিন যাকে অবহেলা করে এসেছে আজ তার জন্যই তার মন পুড়ছে, কি আশ্চর্য এই পৃথিবী!
পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিল, আজ মাস খানিক বাদে নিজের ফেসবুক আইডিটা লগ-ইন করল। কেন করছে তার জানা নেয়, মনের অজান্তেই সার্চবারে এসে তেহরাব সরকার আইডিটা সার্চ দিল। কিন্তু কই? আইডি তো নেই। মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে গেল, অতঃপর ফোনটা রেখে দিল আগের জায়গায়।৷ চোখ বেয়ে পরা অশ্রু, ধরে আসা কন্ঠে নিজেকে নিজে ধমকাল,
“এত অধঃপতন হয়েছে তোর তনয়া? এত বেহায়া কেন তুই? দুদিন পর তোর বিয়ে আর তুই কিনা,ছিহ ছিহ ছিহ!”

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে পাখিদের ঘর ছাড়ার তারা লাগে, খুঁজতো বের হয় খাবার।
এদিকে প্রাইভেটে বেস থাকতেও বোর লাগছে তানহার, ঘুমে চোখ বারবার বন্ধ হয়ে আসছে তার। আর রিমু বারবার খুঁচা মেরে ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে, বিরক্ত তানহা। এত পড়াশোনা তো তার ভালো লাগে না, নেহাতই উপায় নেই।
প্রাইভেট ছুটি দিতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচে তানহা, রিমুর সাথে বেরিয়ে আসে স্যারের বাসা থেকে।
“আজকে তো তোকে একাই ক্লাস করতে হবে!”
রিমুর কথায় তানহা ভ্রু কুঁচকায়,
“একা কেন? তুই আছিস তো!”
“আছি তবে টিফিন পর্যন্ত, টিফিনে চলে যাব।”
তানহা গাল ফোলায়,
“যাবি কেন?”
রিমু হাসি হাসি মুখ করে বলে,
“আরে কালকে বললাম না ইরা আপুকে দেখতে আসবে, দুজনের দুজনকে পছন্দ হয়েছে। বিয়েও ঠিক হয়ে গিয়েছে!”
তানহা মুখ ভেঙায়,

“কি ভাগ্য আমার,ননদের বিয়েটাও খেতে পারব না।”
রিমু হেসে উঠে,
“বিয়ের নাই খবর আবার ননদ!”
“হবে হবে, অবশ্যই হবে। কিন্তু আজ কেন বাড়ি চলে যাবি সেটা বল!”
রিমু মাথা নেড়ে বলে,
“শুক্রবারে আপুর বিয়ে, তাই প্লান ফ্লান করবে। আজকে বড় আম্মুর বাসায় দাওয়াত আমাদের, আমি তো একটু পরপর যায় তাই আগে থেকেই সব জানি!”
তানহা দাঁড়িয়ে পরে, রিমুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,
“আমার আপুর তো শনিবারে বিয়ে, তাহলে তুই যাবি কি করে?”
রিমু তব্দা খেয়ে তাকিয়ে থাকে তানহার দিকে,
“শা*লি ভাল্লাগে না, এখন কি হবে? কত শখ ছিল তনয়া আপুর বিয়ে খাব, ধ্যাত!”
তানহা রিমুর মাথায় গাট্টা মেরে বলে,

“সমস্যা নাই, শুক্রবারে ইরা আপুরটা খেয়ে শনিবার চলে আসবি। তাই তো হয়, এমনিতেও আপুর বিয়েতে তেমন অনুষ্ঠান করবে না। আমার ওইযে চাচাতো বোন আছে না রাফা? ওর বিয়ে আবার প্রত্যয় ভাই মানে ফুপুর বড় ছেলের সাথে, আপুর আবার ছোট টার সাথে।”
রিমু হাসতে হাসতে বলে,
“এত প্যাচ ক্যান ভাই, মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে!”
তানহা রিমু হাত ধরে স্কুলের গেটের দিকে দৌড় দেয়,
“তারাতারি চল, গেট বন্ধ করে দেবে!”

“ভাইয়া, ও ভাইয়া, উঠ না!”
ইরা বারবার কুশন দিয়ে তেহরাবকে বারি দিচ্ছে, কিন্তু তেহরাবের হেলদোল নেয়। গভীর ঘুমে মগ্ন সে, ঘুমাবেই বা না কেন? চোখ জোরা বন্ধই করেছে ভোরের দিকে, কিন্তু শান্তি আর কই পাচ্ছে?
“ভাইয়াআআআআআ!”
“যা এখান থেকে বা*ল, মনটা চাইতাছে একটা থাপ্পড় মাইরা কানশা গরম কইরা ফালাই। চিল্লাচিল্লি লাগাইছস ক্যান?”
তেহরাবের রাগী কন্ঠে ধমক খেয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসে ইরা, এসব ধমক তার গায়ে লাগে না। তেহরাবের হাত ধরে টানতে টানতে বলে,
“ আমি মার্কেটে যাব, নিয়ে চল আমাকে। উঠ তারাতারি!”
টানাটানিতে মেজাজ বিগড়ায় তেহরাবের, এমনি কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছে।
বালিশ ছুড়ে মারে ইরার দিকে,
“বের হো বা*ল, চ্যেতাইস না!”
“ধুর বা*ল, চল না৷ দরকার আছে!’
তেহরাব এবার কিছু না পেয়ে চিল্লাতে শুরু করে,
“ আব্বা ওই আব্বা, আম্মু ওই মা এই বালটারে চোখের সামনে থিকা সড়াও তো। এই তুই যাবি? নাকি কানের নিচে মারমু?”
ইরা মুখ ভেঙিয়ে বলে,

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৬

“এমন লাগাইছস কেন? আব্বুই বলছে তোরে নিয়া যাইতে, উঠ!”
তেহরাব না পেরে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পরে চোখ মুখ ঢেকে, ইরা এক টানে সড়িয়ে দেয়।
“ভাইয়া উঠ না বা*ল, প্লিজ!”
তেহরাব চোখ মুখ খিঁচে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে ইরার মুখের দিকে, অতঃপর কিছু একটা ভেবে বলে,
“যা রেডি হো, ফ্রেশ হয়ে আসছি আমি।”
ইরাকে আর পায় কে, দৌড়ে চলে যায় নিজের রুমে, তেহরাব হাসে। দেখতে দেখতো ছোট্ট ইরা বড় হয়ে গিয়েছে, কদিন পর বিয়ে। এমনিতেই বাড়ি থাকে সা ইরা দুবছর যাবৎ, তবে শশুড় চলে যাবে কথাটা মাথায় আসলেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। যতই হোক বোন তো!!

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৮