Home হৃদয়ের সঙ্গোপনে হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৫

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৫

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৫
তোয়া নিধী দোয়েল

আজ শুক্রবার। তুর্কি আয়নার সামনে বসে ওর দীর্ঘ কেশের জট ছাড়াচ্ছে। চোখ-মুখে বিরক্তির ছাপ! পরনে বেগুনী রঙের কাপড়। ওর সব বদ স্বভাবের মধ্যে, একটা বদ স্বভাব হচ্ছে আদনান বাসায় থাকলে শাড়ি পরে তিড়িং-বিড়িং করে। থ্রি-পিসে নাকি ও-কে বয়সে ছোট লাগে। তবে, শাড়ি পরলে বয়সে একটু বড় বড় লাগে। তা নয়তো ঐ অসভ্য লোক আবার ‘পিচ্চি পিচ্চি’ করে।

কাপড়ের আঁচল মেঝে ছুঁই ছুঁই। সময় টা অপরাহ্ন। আদনান বাসায় নেই। সেই জন্যই তুর্কির মেজাজ খিঁচে আছে। ও বুঝতে পারে না; বন্ধের দিন ও এই লোকের এত কীসের কাজ। কই যায়। অসহ্য লাগে!
তুর্কি যখন এক মনে আদনানের প্রতি বিরক্ত ঝাড়ায় ব্যস্ত; তখন দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে আদনান। তুর্কি আয়নাতেই আদনানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আদনান দরজা বন্ধ করে তুর্কির দিকে এগিয়ে আসে।
পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে তুর্কির পাশে বসে জিজ্ঞাসা করে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-কী করছো?
তুর্কি আদনানের দিকে না তাকিয়েই অভিমানী কণ্ঠে বলে,
-কই গিয়েছিলেন?
আদনান পাঞ্জাবির পকেটে থেকে কিছু টাকা বের করে তুর্কির দিকে দেয়। নম্র কণ্ঠে বলে,
-এটা রাখো।
তুর্কি চুল আঁচড়ানো বাদ দিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে তাকায়। হাতে অনেক গুলো এক হাজার টাকার নোট! তুর্কি চিরুনি ফেলে টাকা গুলো হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
-এত টাকা দিয়ে কী করবো?
-তোমার হাত খরচ! নিজের ইচ্ছে মতো খরচ করো!
তুর্কি টাকা গুলো গুনে হতভম্ব হয়ে যায়! এক হাজার টাকার দশটা নোট! তুর্কি চোখ বড় বড় করে কণ্ঠে বিষ্ময় ঢেলে বলে,

– স্যার, আপনি পাগল? এত টাকা দিয়ে আমি কী করবো?!
-গত মাসে হাত খরচ দেওয়া হয়নি। এই মাস ও প্রায় শেষ এর দিকে! আজ মনে হতেই টাকা ওঠিয়ে নিয়ে এসে দিলাম।
তুর্কি দ্রুত আদনানের হাত টেনে ওর হাতে টাকা গুলো দিয়ে বলে,
-তাই এত টাকা! আপনার মাথা খারাপ? আর আমার হাত খরচ কেনো লাগবে?
আদনান মৃদু হেসে টাকা গুলো ফের ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বলে,
-বললাম তো, তোমার যা ইচ্ছে করবে। সব সময় আমার কাছে কিছু চাইতে কুণ্ঠাবোধ হতে পারে। তোমাকে দিলাম, যখন যা কিনতে মন চায় কিনো। আর দুঃখিত! আমার আরও আগে দেওয়া উচিত ছিলো।
-মোটেও আমার আপনার কাছে কিছু চাইতে কুণ্ঠাবোধ হয় না। এমনকি, আমি যদি কখনো চাকরি-বাকরি ও করি; তখন ও আমি আপনার কাছে সব কিছু চাইবো!
তুর্কি দুইটা নোট নিয়ে, বাকি গুলো আদনানের কাছে দিয়ে আরও বলে,

-এই দুইটা আমার কাছে থাক। বাকি গুলো আপনার কাছে রেখে দিন। আমার কি পুচকু-টুচকু আছে যে এত টাকা আমার হাত খরচ লাগবে! যখন তিন-চারটা পুচকু হবে; তখন বেশি বেশি টাকা দিবেন। আমি ওদের নিয়ে ঘুরে বেড়াবো! খাবার-দাবার খাবো! এখন লাগবে না।
আদনান দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
-তোমার বয়স থেকে তিন-চার টা পুচকুর বয়স বাদ দিলে; তুমি বড়োজোর ওদের থেকে দুই-এক বছরের বড় হবে! তাই নিজে আরেকটু বড় হও আগে!
আদনানের কথা শুনে তুর্কি দুই চিকোন ভ্রুর মাঝে ভাঁজ ফেলে বলে,

-কীইই!
আদনান আর কিছু না বলে, মৃদু হেসে বাকি টাকা গুলো নিয়ে ওঠে যায়। জায়গা মত রাখতে রাখতে বলে,
-এই যে এইখানে রাখলাম। প্রয়োজন হলে নিও।
তুর্কি ছুটে গিয়ে ওর হাতে থাকা বাকি দুইটা নোট ও সেখানে রাখতে রাখতে বলে,
-এই গুলো ও রেখে দিন। পরে নেবো।
আদনান পাঞ্জাবি চেঞ্জ করে টি-শার্ট পরে বিছানায় গিয়ে বসে। তুর্কি ফের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো আরেকবার আঁচড়িয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে আদনানের সামিনে গিয়ে পিঠ ফিরিয়ে বসে। মাঝ বরাবর সিঁথি করে অর্ধেক চুল পিঠের দিকে নিক্ষেপ করে। এতে আদনানের মুখে চুলের ঝাপটা লাগে। ও চোখ বন্ধ করে ফেলে। তুর্কি বাকি অর্ধেক চুল নিয়ে বলে,

-চলুন স্যার একটা গেম খেলি!
আদনান প্রশ্নবোধক চাওনিতে তাকায়। তুর্কি ঘাড় কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে বলে,
-আজ দুই বেণী করবো। অর্ধেক চুলে আপনি করবেন; বাকি অর্ধেক চুলে আমি করবো। যে হারবে সে একটা ডেয়ার পাবে!
-কী ডেয়ার?
তুর্কি দুই হাঁটু ওঠিয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে দুই হাত দিয়ে ধরে বসে৷ আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,
-যদি আমি জিতি, তাহলে আপনি আমাকে আই লাভ ইউ টু বলবেন। আর যদি আপনি জিতেন, তাহলে আই লাভ ইউ বলবেন। ওকে?
আদনান ভ্রু কুঁচকে বলে,
-দুইটার মধ্যে পার্থক্য হলো কী?
তুর্কি অবাক কণ্ঠে বলে,
– পার্থক্য নেই মানে? আমি জিতলে বলবেন, আউ লাভ ইউ টু। আর আপনি জিতলে বলবেন, আই লাভ ইউ! পার্থক্য আছে না?

আদনান তুর্কি কে সামনে দিকে ঘুরিয়ে বসায়। অর্ধেক করা চুল হাতে নিয়ে বলে,
-তুমি হারলে একটার আগে পড়া ছেড়ে উঠতে পারবে না। আর আমি হারলে তোমার কথাই রইলো!
তুর্কি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে,
-ঠিক আছে। দেখা যাক।
দুইজনে দুই পাশে বেণী গাঁথতে থাকে। আদনান ওত ভালো করতে না পারলে ও প্যাঁচিয়ে একটা বেণীর আকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টায় আছে! তুর্কি বেণী করার মাঝে মাঝে কথা বলছে।
–আমি বাবার বাড়ি ও কখনো টাকা নাড়িনি। আম্মু যখন যা দিতো তাই নিতাম। কোনো প্রয়োজন হলে আম্মুর কাছ থেকে নিতাম। কিছু পছন্দ হলে বাবার কাছে চাইতাম। বাবা পাঠিয়ে দিতো। আর এখন আপনার কাছে চাইবো। আপনি দিতে না চাইলেও আমি জোর করে নেবো৷ বুঝেছেন?
আদনান ছোট করে জবাব দেয়

-হুম।
তুর্কি আবার ও বলে,
-আর আমার এত কিছু লাগে না। এই যে আপনার সাথে প্যাঁচাল পারি, মাঝে মাঝে ঝগড়া করি, এক সাথে খাবার খাই, মাঝে মাঝে ঘুরতে বের হই; এতেই আমার শান্তি।
আদনান বেণীগাঁথায় মনোযোগ রেখে শান্ত কণ্ঠে বলে,
-হুম বুঝলাম। তবে নিজের তো কিছু শখ-আল্লাদ থাকে তাইনা? মাঝে মাঝে নিজের স্বাধীন ভাবে চলতে ইচ্ছে করে। এটা ওটা কিনতে ইচ্ছে করে। ঘুরতে ইচ্ছে করে। তো সেই স্বাধীনতা কে সম্মান করে এই সম্মানী!
তুর্কি স্বস্তির শ্বাস ফেলে। ঠোঁটে ফোটে মৃদু হাসি। আদনান যে ওর স্বাধীনতা নিয়ে এত কিছু ভাববে; তা ওর ভাবনার বাইরে ছিলো। সত্যি বলতে, ওর চাহিদা সত্যি খুব কম! এক দম সামান্য! ও শুধু চায় শেষ নিশ্বাসের আগ পর্যন্ত আদনানের সাথে থাকতে।

-শেষ!
আদনানের ডাকে ধ্যান ভাঙে তুর্কি। আদনান বেণীর শেষ প্রান্ত ওর মুখের সামনে ধরেছে! তা দেখে তুর্কির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। কারণ, ওর এখনো অর্ধেকের বেশি বাকি! আদনান কে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে কল্পনার অথৈ-জলে ডুবে গেছিলো তা ওর জানা নেই!
-তাহলে ডেয়ার টা কে পাচ্ছে!
তুর্কি দ্রুততরে বাকি বেণী টুকু শেষ করে হইহই করে ওঠে,
-আমি মানি না। আপনি আমার সাথে চিটিং করেছেন!
আদনান কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞাসা করে,
-কীভাবে?!
তুর্কি অস্থির কণ্ঠে বলে,

-আপনি আমার কল্পনায় এসে আমাকে তাড়া করেছিলেন। আমি পালাতে গিয়ে বেণী করতে দেরি করে ফেলেছি। সব দোষ আপনার। আপনার জন্যই হলো! আমি এইটা মানিনা। আবার শুরু থেকে শুরু করুন।
আদনান ওঠে একটা ছোট খোঁপা নিয়ে এসে তুর্কির বেণীর শেষ প্রান্তে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলে,
-ডেয়ার ইস ডেয়ার! তুমি হেরে গেছো মানে হেরে গেছো৷ এখন কথা না বাড়িয়ে ডেয়ার টা শুরু করো!

মুজাহিদ এর সাথে একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে নিজের ঘরে আসে রেজুয়ান। পায়ের আঘাত আগের থেকে অনেক ভালো। জগ থেকে পানি ঢেলে খায়। কাল রাতের পর থেকে উপমার সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। রেজুয়ান অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলো উপমার কলের জন্য। তবে আশানুরূপ কোনো ফল পায়নি।
অনুরূপভাবে, আজ সারাদিন ও অপেক্ষায় ছিলো। তবে তাতে ও লাভ হয়নি। উপমা কোনো টেক্সট বা কল কিছুই করে নি। তাই বেলা শেষে, মুজাহিদ বাড়িতে আসলে তাঁর সাথে আড্ডা দিতে গিয়েছিলো৷ কিন্তু, ওদের আড্ডা তো আর স্বাভাবিক মনুষ্যদের মত না! তাই দীর্ঘক্ষণ সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই ছুটে চলে এসেছে।

রেজুয়ান তৃতীয় বারের মত আশা নিয়ে ফোন হাতে তুলে। তবে এইবার ভাগ্য ওর সহায় হয়! সন্ধ্যার দিকে উপমা ছোট্ট একটা বার্তা পাঠিয়েছে— Hi! রেজুয়ানের বার্তা টা দেখা মাত্র দ্রুত হাতে টাইপিং করে— ‘Kathgolap’!
এসএমএস সেন্ড করে বিছানায় গা এলিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে উত্তরের। মিনিট দশেক পার হওয়ার পর ও কোনো উত্তর মিলে না। আরও বিশ মিনিট পার হওয়ার পর ও আবার টাইপিং করতে উদ্যত হয়। তবে তার আগেই ওপাশ থেকে উত্তর আসে— ‘Sorry! Active chilam na
রেজুয়ান মুচকি হেসে উত্তর লেখার জন্য কিবোর্ড চালাতে থাকে। তবে উপমার আইডি থেকে কল আসে। রেজুয়ান কল ধরে লম্বা করে ডাকে,

– কাঠগোলাপ!
রেজুয়ানের কণ্ঠে কাঠগোলাপ শুনে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করে উপমা। কী কারণে অস্বস্তি হয় ওর জানা নেই! হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত গতিতে চলমান হয়।
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে রেজুয়ান আবার বলে,
-তুমি কই হারিয়ে গেছিলে বলো তো। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা তোমার কোনো খবর নেই! ছিলে কই?
রেজুয়ানের প্রশ্ন শুনে উপমার ধ্যান ভাঙে। ও লম্বা করে শ্বাস নিয়ে বলে,
-একটু বিজি ছিলাম। আপনার অবস্থা কেমন? আঘাতের কী অবস্থা?
-আগের থেকে ভালো। তোমার অবস্থা কেমন?
-এই তো আলহামদুলিল্লাহ। আচ্ছা শুনুন!

-হুম, শুনছি। বলো।
উপমা কিছু ভেবে বলে,
-আপনি ফ্রী আছেন কবে?
রেজুয়ান এক ভ্রু উঁচু করে বলে,
-কেনো?
-এমনি। আপনি একটা থ্যাংকস পাওনা। সেটা দেওয়ার জন্য।
রেজুয়ানের কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ে। সাধারণ একটা থ্যাংকস দেওয়ার জন্য ফ্রী থাকার কী দরকার?
-আমি তো সব সময় ফ্রী। তবে কিসের থ্যাংকস? কোনো স্পেশাল থ্যাংকস মনে হচ্ছে?
-ঐ যে সেই দিন রাতের একটা থ্যাংকস। আপনি যদি না থাকতেন জানিনা আমি একা কী করতাম। বা আমারই কী হতো! সেই জন্য…
-দেখা করি?
রেজুয়ানের কথায় থতমত খেয়ে যায় উপমা। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। ও বিব্রত কণ্ঠে বলে,

– হ্যাঁ…মানে সেই জন্যই বলছিলাম। যদি আপনি…
-আমি ওলয়েস ফ্রী। কয়টা নাগাদ বের হবে সেটা বলো।
‘তুমি বন্ধু কালা পাখি
আমি যেন কি..
বসন্ত কালে তোমায় বলতে পারিনি’
গান গাইতে গাইতে ঘরে ঢুকে মুজাহিদ। হাতে একটা প্লাস্টিকের বোতল। সেটা দিয়ে অন্য হাতে শব্দ তুলে তুলে গান গাইছে সে। রেজুয়ানের দিকে আসিতে গেলে, রেজুয়ান অনুনয়ের কণ্ঠে বলে,
-বাপের ভাই, ঝামেলা কইরো না। কাঠগোলাপ কল দিছে।
মুজাহিদের পা জোরা থামিয়ে ডান দিকে মাথা কাত করে। জার অর্থ সে ঝামেলা করবে না। রেজুয়ান ফের কথা বলার জন্য উদ্যত হয়; তখন মুজাহিদ ছুটে রেজুয়ানের কানের কাছে এসে জোরে জোরে গান গাইতে থাকে,
‘আজকে তোরে পাইছি রে
কই ছিলি আমায় ছেড়ে
যৌ…’

পুরো লাইন শেষ করার আগেই মুজাহিদ এর মুখ চেপে ধরে রেজুয়ান। এক লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে। দাঁত কটমট করতে করতে বলে,
-বাল। দয়া করে ঝামেলা কইরো না। পায়ে ধরি।
মুজাহিদ শয়তানি হাসি দিয়ে বলে,
-আজ থেকে সব প্রতিশোধ শুরু হবে। আমাকে এত দিন জালানোর ঝাঁঝ আজ তোরে বুঝামু।
এই বলে আবার গান গাওয়া শুরু করে,
‘আজকে তোরে পাইছি রে
কই ছিলি আমায় ছেড়ে’
এই বলে রেজুয়ানের কাছে আসতে থাকে। রেজুয়ান কানে ফোন নিয়ে ঘর থেকে বের হতে ছুট লাগায়। পিছন পিছন গান গাইতে গাইতে ছুটে মুজাহিদ।
‘আজকে তোরে পাইছি রে!’

ঘড়িতে তখন রাত দশটা। টেবিলের একপাশে বসে আছে তুর্কি। সামনে খোলা বই— গণিতের চ্যাপ্টার ‘জটিল সংখ্যা’! আর পাশে বসে আছে আদনান। গম্ভীর মুখের সামনে ধরে রেখেছে বই। ঘরের মধ্যে নীরবতা।
আজ সন্ধ্যে থেকেই তুর্কি কোনো বাহানা না দিয়ে এক টানা পড়েছে। নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে কি না। কিন্তু, এখন আর ভালো লাগছে না। তাই সে পতির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আদনান নিচের ঠোঁট কামড়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। যেন ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল চলছে।
আদনানের ঐ সিরিয়াস মুখের, ঠোঁট কামড়ানো ওর কাছে গণিতের থেকেও বেশি দুর্বোধ্য লাগছে।
আদনান বইয়ের পাতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তুর্কির দিকে তাকায়। দেখে তুর্কির মনোযোগ বইয়ের পাতায় নেই। ও ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করে

-কী করছো?
তুর্কি ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
– স্যার, আপনি ভীষণ সুন্দর! সেটাই দেখছিলাম। এত সুন্দর মানুষ চোখের সামনে বসে থাকলে পড়ায় মনোযোগ কীভাবে বসবে?
আদনান বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
-তাহলে মুখে একটু ময়লা মেখে বসি? তখন তো ঠিকই বসবে? কী বলো?
আদনানের খ্যাঁক খ্যাঁক উত্তর শুনে তুর্কি আর কথা না বাড়িয়ে সামনে থাকা বই ওর দিকে ঠেলে দেয়। আদনান এবার বইয়ের পাতায় আঙুল দিয়ে বলল,
–এই দেখো, z = a + ib। z একটি জটিল সংখ্যা। যা দুইটি…
-যেমনঃ আমি! আর আপনি হচ্ছেন imaginary! সেইজন্যই আপনি আমার ভাষা বুঝতে পারেন না! তাইনা?
আদনানের কথা শেষ হওয়ার আগেই তুর্কি আত্মবিশ্বাসের সাথে একটা উত্তর দেয়। আদনান বইয়ের পাতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তুর্কির দিকে তাকায়। তুর্কি ঠোঁটের হাসি প্রশস্থ করে বলে,
-এই ভাবে পড়লে বেশি মনে থাকবে। স্কুলের স্যাররা বলতো, কঠিন পড়া গুলো ছন্দ আকারে পড়বে। তাহলে বেশি মনে থাকবে। সেই জন্য বললাম।
আদনান দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ফের বইয়ের দিকে তাকায়। রাশভারী কণ্ঠে আবার বলে,

-ধরো এক্স(x)…
-সরি, স্যার! আমি বিবাহিত। আমি স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে ধরতে পারবো না। আর আপনিই বা কেমন? নিজেকে ছেড়ে অন্য কাউকে ধরতে বলছেন? অসভ্য লোক!
তুর্কির কথা শুনে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দেয় আদনান। শান্ত কণ্ঠে বলে,
-বোর লাগছে?
কথাটা শুনে বেশ চমকায় তুর্কি! কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,
-নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছি! সেই সন্ধ্যা থেকে এক টানা পড়ছি। এখন আর ভালো লাগছে না।
আদনান চোখ খুলে তুর্কির দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,

-আচ্ছা। আসো ছাদে যাই। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করো। তাহলে রিফ্রেশমেন্ট লাগবে।
তুর্কি আরেক দফা চমকায়! এ লোক সত্যি ও-কে এই রকম একটা অফার দিচ্ছে? ও দ্রুত আদনানের হাতের উপর নিজের হাত দিয়ে বলে,

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৪

-চলুন!চলুন!
আদনান কে আর কিছু বলতে না দিয়ে; তুর্কি ওর হাত টেনে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য উদ্যত হয়। দরজার কাছে এসে থেমে যায় তুর্কি। আদনানের হাত ছেড়ে বলে,
-আপনি যান। আমি আসছি।

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৬