হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭
সাঞ্জেনা শাজ
“ভালোবাসি…. ”
সপাটে চড় পড়লো একটা গালে। আপনারা কি ভাবছেন? সব সময়ের মতো নায়িকার গালেই চড় পড়েছে? উঁহু।পড়েছে দ্বীপের গালে।
বেচারা এসেছিলো মেহরাদের সাথে দেখা করতে। বড় বিজনেস ম্যান আর মেয়রের মধ্যে এতো সব কারাকান্ড চারদিকে মিডিয়া এসব ছড়াবে না?
ছড়িয়েছে! ভালো করেই ছড়িয়েছে। তাই তো দ্বীপ এসেছিলো মেহরাদের সাথে৷ আদনান ভাই নাকি আরও আগেই এসে দেখা করে গেছে। তার আবার খেলা ছিলো। দিন দুনিয়া ভুলে ভার্সিটির টিম জিতিয়ে এসেছে খেলে। সে এসেই মেহরাদ ভাইইকে বলেছিলো,
“ভাই, আপনি চাইলে আমার ভার্সিটির ফ্রেন্ডসদের দিয়ে আরও কেলানি দিতে পারি। কি বলেন..?”
মেহরাদ ভাই হেসে, তার কাধ চাপড়ে বারন করেছে। বলেছে ‘আজ দিয়েছি তাই-ই এক সপ্তাহের ধাক যাবে। এখন আপাতত সব ঠান্ডা হোক। ‘
সে-ও মেনে নিয়েছে। নিয়েই বের হতে গিয়ে সিড়িতে সিনিয়র এর সাথে দেখা। সে চোখ তুলে তাকিয়েছিলো। তাকাতেই দেখলো চোখের চাহনি কেমন শক্ত। সে কিছু বুঝলো না। বুঝার আগেই, তাকে ছাদে আসতে বললো। সে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। তারপর আবারও চাপা ধমকে হুশে ফিরেছে। আর ফিরেই পিছু পিছু ছাদে এসেছে।
তারপর মাননীয় সিনিয়র তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ভার্সিটিতে এগুলো কি শুনি?”
“কি শুনেন?”
শান্তা কিয়দংশ চুপ করে রইলো। তার রুচিতে বাধছে বলতে। এই ছেলে না-কি তাকে পছন্দ করে! পুরো ভার্সিটি জানে। আর সে এক আহাম্মক কিছুই জানে না। আজ কিছু জুনিয়র এর মাধ্যমে জানলো। অবশ্য সে-ও অনেক কাহিনি।
“কি শুনেন? বলুন…” দ্বীপ জিজ্ঞেস করলো।
“আমার বলতেও লজ্জা লাগছে। পুরো ভার্সিটিতে কি রটিয়ে রেখেছো, হে???”
“আশ্চর্য! ক্লিয়ার করে বলুন। ক্লিয়ার করে না বললে বুঝবো কি করে?”
শান্তা বলতে পাড়লো না। হাতে থাকা মোবাইলে টাইপ করে দ্বীপের সামনে ধরলো। যেখানে স্পষ্ট লেখা,
“তুমি আমায় ভালোবাসো। এটা পুরো ভার্সিটি রটিয়ে রেখেছো? আবার আমার জন্য ছেলে পেলেও ঠিক করা দেখে রাখার জন্য!” শেষের কথাটা নিজের মুখেই বললো।
দ্বীপ এতো বিচলিত হলো না। সে সারা ভার্সিটি ইচ্ছে করেই রটিয়েছে। এভাবে কতদিন! ওনার জানতে হবে না সে ভালোবাসে! তাই নিরুদ্বেগ রইলো।
শান্তা ফুসে উঠলো। তেজ নিয়ে বললো,
“কথা বলছো না কেন এখন? এগুলো কেন করেছো?”
“কারণ এটাই সত্যি।”
শান্তা তৎক্ষনাৎ জিবাবে কিছু খুঁজে পেলো না। একটু পর চেচিয়ে উঠলো,
“বয়স জানো তোমার? তোমার সিনিয়র হই। সেটা জানো তো?”
“সবই জানি।”
“চুপ থাকো বেয়াদব ছেলে। ”
“ভালোবাসা এতো কিছু ভেবে হয়? আমি ভালোবেসেছি। এবং সেটা পুরো দুনিয়াকে জানানোর সৎ সাহসও রেখেছি। ”
শান্তার মস্তিষ্কটা টগবগ করছে। এসব কথা বাড়ির কেউ জানলে কি হবে? তাকে আস্ত রাখবে? তা-ও আবার নিজের থেকে ছোট ছেলে!
শান্তা দরদর করে ঘামতে থাকলো। এক হাতে কোমর চেপে আরেক হাতে ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো। এবার শান্ত স্বরে বললো,
“শুনো দ্বীপ। তুমি আমার জুনিয়র। আমার থেকে ১/২ বছরের ছোট হবে। আমি সব সময় তোমাকে নিজ পাড়ার ছোট ভাই হিসেবে দেখিছি। তুমি ছেলে মানুষ। কিন্তু আমিতো মেয়ে! লোক জানাজানি হলে কি হবে ভাবতে পাড়ছো? সমাজের ক’টা আঙুল তোমার দিকে উঠবে? সব কিছু আমায় ফেস করতে হবে। অথচ, আমি এসবের কিছুতেই নেই।”
দ্বীপ নিজের শার্টের কলার ঝাড়লো। সামনে বোতাম খুলে কলারটা একটু পিছনে ঠেলে দিলো। ভালো মানুষের ভেসে থাকার দিন শেষ। যার জন্য এতো নাটক সে এখন সব কিছু থেকে রেহায় চায়। তাকে বুঝাতে এসেছে! সিরিয়াসলি! সে বুঝালেই বুঝবে? এ বিষয়ে তো ভুলেও না! কস্মিনকালেও না।
“লোক, সমাজ সব দেখে নিবো সিনিয়র। আপনি শুধু আমায় দেখেন। আমার ভালোবাসাটুকু দেখেন। এখন যেহেতু সব জানেন, বলতে কোন দ্বিধা নেই। ভালোবাসি…”
ব্যস এর পরেই শান্তার নরম হাতের শক্ত এক থাপ্পড় পড়েছে দ্বীপের গালে। দ্বীপের অবস্থান বড়ই শান্ত। সেভাবেই কাধ ঘার বেকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন।
মিনিট ব্যায়ের পর টান টান হয়ে সোজা হয়ে চোয়ালের দু পেশি নাড়ালো। শান্তা জোশের বশে থাপ্পড় মে’রে নিজেই বেয়াকুব বনে তাকিয়ে আছে।
দ্বীপ এগুলো দু কদম, শান্তাও পিছলো দু’কদম। দ্বীপ নিজের গালের দিকে ইশারা করে বললো,
“গড প্রমিজ সিনিয়র, আমার এ গালে যদি আপনার ওষ্ঠজোড়ার আদরের ছোঁয়া আমি না নিয়েছি!আমিও দ্বীপ এহমাদ না৷ সেটাও ভালোবেসেই দিবেন। আসছি…”
গা ছাড়া ভঙ্গিতে সিড়ি দিয়ে লাফিয়ে নেমে গেল দ্বীপ। যতক্ষন দ্বীপের নানার শব্দ পাওয়া গেল ততক্ষণ বুকে হাত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো শান্তা। ছাদের রেলিং এর সাথে মিশে নিশ্বাস টানছে জোরে জোরে মেয়েটা। তার হটাৎ কি হয়ে গিয়েছিল? আর ছেলেটা এগুলো কি…কি বলে গেলো? আল্লাহ…..
সেসব ঘটনার সপ্তাহ পেড়িয়েছে। শুভ্রতা এখন সুস্থ। আর সুস্থ হয়েই সেই ঘুরতে যাওয়ার ভূত আবার মাথায় চাপিয়েছে। সঙ্গী হিসেবে তো সোহানা আছেই! সেই সাথে যোগ দিয়েছে শান্তা। মেয়েটা দু তিন দিন যাবৎ ভার্সিটি যাচ্ছে না। সকলে জিজ্ঞেস করলে এটা সেটা বলে বুঝিয়ে দিচ্ছে। সে-ও ঠিক করেছে ওঁদের সাথে যাবে। ভালো লাগছে না এখন তার এখানে। একটু রিফ্রেশমেন্ট এর দরকার। তবে আজ প্ল্যান ভিন্ন।
শুভ্রতা মেহরাদের দরজার সামনের পর্দা ধরে ঝুলে আছে মুখ ভার করে। একটু করে হেলছে দুলছে। গুন-গুন করে নিজের ভিতরের জেদকে প্রকাশ করছে। কিন্তু মেহিরাদ নিরুত্তর। সেদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। একচুয়ালি সে গুরত্বপূর্ণই মনে করছে না। সে তার কাজ নিয়েই ব্যাস্ত লেপটপে।
শুভ্রতা ঘ্যনর ঘ্যানর আরও বাড়ালো। চোখ দুটো টলটলে হলো রাগে দুঃখে। একটু নিয়ে গেলে কি হয়! তারা কি বাচ্চা! নিজেরা নিজেদের দেখে রাখতে পাড়বে না?
তারা আজ জেনেছে আগামী দু’দিনের মধ্যে মেহরাদ চট্টগ্রাম যাবে বিজনেস ট্যুরে৷ এটা শুনে তারা আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছিলো। তাদের সেখানে নিয়ে গেলেই তো হয়! অতি উৎসাহে শুভ্রতা মেহরাদ আসতেই মেহরাদের পিছু পিছু রুমে এসে লাফিয়ে উঠে বলেছিলো,
“আপনি নাকি চট্টগ্রাম যাবেন ট্যুরে?”
উনি কপালে ভাজ ফেলে তার দিকে তাকিয়েছিলো। সে অবশ্য সেসবে আটকায়নি। নিজের মতোই উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেছিলো ,
“আমরাও তো ট্যুরে যেতে চাচ্ছি কোথাও। আর মাত্র ৫/৬ দিন সময় আছে হাতে। তারপরই রেজাল্ট দিয়ে দিবে। আবার সেই কোচিং প্রাইভেট এগুলোই। একটু রিফ্রেশমেন্ট এর দরকার আছে না বলুন? আছে তো। আমাদের নিয়ে যান না প্লিজ? সোহানা আমি আর শান্তা আপু। মাত্র তিনজন!” তিন আঙুল দেখিয়ে বলেছিলো সে।
তারপর তিনি বড়ই স্বাভাবিক ভাবে আনন্দে খুশিতে আটখানা তার মনটা টুকরো টুকরো করে দিয়েছে এক বাক্যে। বলেছে,
“ট্যুরে যাচ্ছি না। বিজনেস ট্যুরে যাচ্ছি। সেখানে মাত্র তিনজন কি একজনও নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। নেভার।”
সে কতো করে বললো। না-না না-ই রইলো। কেন তার কথাই কি একটু মূল্য দেওয়া যায় না! এই-নি ভালোবাসা? একে বলে ভালোবাসা? ভালোবাসা যদি এমন হয়, তাহলে এ ভালোবাসা শুভ্রতার চাই না। এগুলো বলেই সে তখন রু। থেকে বেরয়ে গিয়েছলো। তখন সময় ছিলো নয়টা। এখন বাজে দশটা। সে আবার ঘুরে ফিরে মেহরাদের রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এবার ভিতরে যায়নি নাচতে নাচতে। দরজার পর্দা ধরে ঝুলে আছে। আশা, যদি একটু ডাকে তাকে!
কিন্তু ভদ্রলোক তার দিকে তাকালোই না! শুভ্রতা আর নিতে পারলো না। নিজেই ধুম ধাম পা ফেলে এগিয়ে গেল রুমের ভিতরে। কোমরে এক হাত চেপে আরেক হাতের আঙুল উঁচিয়ে মেহরাদকে বললো,
“আপনি নিবেন না সাথে করে?”
“নাহ।” নেহরাদের এক শব্দের জবাব।
মেয়েটা কতো আশা নিয়ে এসেছিলো। লোকটা পাড়ছে এমন করতে তার সাথে! সে রেগে গিয়ে বললো,
“আপনাকে আমি দেখে নিবো মেহরাদ ভাই…”
“আচ্ছা! কিভাবে দেখবি? এভাবেই না-কি আন/ড্রেস হতে হবে? ”
শুভ্রতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। কিসের মধ্যে কি! ওসব ভুলে আবারও বললো,
” বড় বাবাকে বলবো আপনায় বলতে। তখন কি করবেন, হু!”
মেহরাদ এযাত্রায় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। ‘কাকে বলবে! বাবাকে বলবে! হাহ!’ মেহরাদের খুব হাসি পেলো। সে বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে বললো,
“আচ্ছা, বলিস যা। ”
“বড় বাবা বললে নিয়ে যাবেন তো? ” উচ্ছ্বাস নিয়ে শুধালো শুভ্রতা।
মেহরাদ উপর নিচ মাথা নাড়াল। শুভ্রতার খুশি কে দেখে। সে এখানেই দু লাফ দিয়ে উঠলো। দৌড়ে বের হলো রুম ছেড়ে। শান্তা সোহানাকে জানালো। তারাও বেশ খুশি হলো। সোহানা একবার বলতে চাইলো, তুই যা বইন। আমরা যাবো না। তোদের মধ্যে কাবাব মে হাড্ডি হবো? আপু আমায় ভর্তা বানাবে। বেচারি কিছুই বললো না। শান্তা তাকে কড়া করে নিষেধ করেছে। বলেছে আমরা সু’বোন অন্য কোথাও যাবো। ভাইয়া নিয়ে যেতে রাজি হলে ওরা যাক। কিছু কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করে আসুক৷ আমরা পরেও যেতে পাড়বো। এখন কাউকে কিচ্ছু বলতে হবে না। সকলে রাজি হলে যাওয়ার আগে একটা নাটক করে আমাদের যাওয়া আটকে দিবোনে ওকে? দু বোনেই প্ল্যান সাজিয়ে রেখেছে। এদিকে শুভ্রতা সব কিছুর বেখবর। সে কতক্ষন এটা সেটা বলে নিচে যেতে চাইলো বড় বাবাকে বলতে। আবার করিডরে এসে থেমে গেলো। এখন তো ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়! সকালে বলবে বলে। আবারও মেহরাদের রুমের দিকে ছুটলো। দরজা সে যেমন হাট করে খুলে গিয়েছে তেমনই খোলা।
সে ঢুকে মেহরাদকে কোথাও দেখলো না। ঘুরে ঘুরে বারান্দার সামনে গিয়ে দাড়ালো। দেখলাও অন্ধকারে এক অবয়ব। মেহরাদকে খুব সহজেই খুজে পেয়ে সেদিকে পা বাড়ালো।
বারান্দার গ্রিল ধরা দু-হাত। শুভ্রতা বাহুর নিচ দিয়ে ঢুকে মেহরাদের বুকে মিশে দাড়ালো। মৃদু আবছা আলোয় ওর চোখ দুটো জ্বল জ্বল করতে থাকলো। মেহরাদ গ্রিল ছেড়ে এক হাতে শুভ্রতার কোমর চেপে আরেক হাত ঘার গলিয়ে ধরলো। ভ্রু উচিয়ে শুধালো,
“খুব খুশি,হু?”
“খুউউউব।”
“কারণ? ”
“আপনার সাথে যাবো। আর…আর বাবার সাথেও দেখা করবো ওইদিকে। যাবে না দেখা করা?”
“যাবে তো।”
“ব্যাস৷ আর অনেক ঘুরবো আমরা। ”
“ক্লায়েন্টদের আসতে নিষেধ করে দিবো, হ্যাঁ? বিজনেস ট্যুর ফ্যামিলি ট্যুর বানিয়ে দেই। কি বলিস?”
শুভ্রতা মুখ গুজু করলো। সে কি সেটা বলেছে না-কি! মেহরাদ এবার সতর্ক ভঙ্গিতে বললো,
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬ (২)
“নিয়ে যাবো। সেদিকে গিয়ে কোন ডিস্টার্বনেস টলারেট করবো না। একটুও না। বাড়তি কোন নটাংকিও না। ”
“আমি আবার কি ডিস্টার্ব করবো!” সে ঠোঁট উলটে বললো।
মেহিরাদ বললো,
“গেলেই বুঝতে পাড়বি।”
শেষে আবার নিজেই বিরবির করে বললো,
“তুই তো যাবি না, আমার প্রেশার বাড়িয়ে রাখবি…”
