হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮
সাঞ্জেনা শাজ
শান্তার হাত কাটা নিয়ে হট্টগোল শেষ হতেই মেহমান আস্তেধীরে সকলে বেরিয়ে গিয়েছে। আদনানও বেড়িয়ে গিয়েছে সেই সাথে। সোহানাকে নিয়ে ওর মাথায় চিন্তা যুক্তি কিছুই আসেনি। ভেবেছে পরশু পরিক্ষা, তাই হয়তো পড়ছে।
সকলে চলে যেতে বড়ো রা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে একটু আলোচনা করে সকলেই সম্মতি জানালো। মেহরাদ ছিলো সাথে, ওঁকে জিজ্ঞেস করতেই জানালো,
“আদনানকে আমি বন্ধু কম ভাই হিসেবে মানি বেশি। আমার বোনদের নিয়ে চোখ বন্ধ করে ওঁকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু, বিষয় হচ্ছে, আদনান আমায় জানায়নি এ বিষয়ে কিছুই। হুট করে এ প্রস্তাব…. ”
“হয়তো পারিবারিক ভাবেই ওনারা প্রস্তাব রেখেছেন। ওনারা তো জানালো, আদনান দ্বিমত জানায়নি। কিন্তু, আজকে প্রস্তাব রাখার বিষয়টা হয়তো জানতো না। ” জাহানারা বেগম জানালেন ছেলেকে।
মেহরাদ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। চারদিকের পরিস্থিতি মধ্যে থেকেও শুভ্রতার শূন্যতা টা বারবার মনে পড়ছে। মেয়েটার কথা মাথায় আসতে মাথাটা হুট করেই মাথা ধরে গেলো যেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
“শান্তার মতামত নাও প্রথমে। আমি আদনানের সাথেও কথা বলে নিবো। সকলের সম্মতি থাকলে শুভ কাজে হাত দেওয়াই যায়। কিন্তু, সোহানার পরিক্ষার পর। বোর্ড এক্সাম এটা, হেলাফেলা চলবে না। এক্সাম দিয়ে নিক ভালো করে। তারপর যা হবার হবে বাড়িতে। ও কোথায় এখন? সন্ধ্যার পর একবারও নিচে দেখলাম না!”
“এই মেয়ের কথা বলো না। আস্ত অকর্মন্য হয়েছে একটা। সন্ধ্যায় নিচে নেমেছিলো একটু, কোন ফাঁকে চা’য়ের কাপ ভেঙে উপরে যে উঠেছে আর খবর নেই নামার। পড়ছেই নাকি কি করছে আল্লাহ জানে!” মেয়ের উপর রাগে গজরালেন সুরাইয়া বেগম কিছুক্ষণ। কিন্তু বাড়ির পুরুষদের সামনে ততোও গলা বাড়ালেন না। মেয়েদের উপর ছোট খাটো বিষয়ে গজরানো ওনাদের খুবিই অপছন্দের বিষয়। জানা কথা সকলের।
“শান্তাকে তো ভয় পায় না। আগামীকাল আমি-ই ওঁকে সময় দিবোনে একটু। তুমি রাগারাগি করো না। ”
মেহরাদের কথায় শান্ত হলো কিছুটা সুরাইয়া বেগম। ছেলেটা সব দিক দিয়ে দায়িত্বশীল। এই যে সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেছে পুরোই রাজপুত্র হয়ে। আগের মেহরাদের চেয়ে এই মেহরাদের দেহের ভারিক্কি ভাব, পুরুষালী অবয়বে গাম্ভীর্যভাব বেড়েছে। এইরকম তাদের সোনার টুকরো ছেলের এ ছন্নছাড়া জীবন তাদের মেনে নিতেই খুব কষ্ট হচ্ছে। বুকটা হাহাকারে ভরে উঠে।
বলা হয়, যে চোখের আড়াল হয়, সে মায়ারও আড়াল হয়। ওনারা সকলে মেহরাদকে দেখছে, তাই মেহরাদের জন্য কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। শুভ্রতাকে দেখছেও না, মেয়েটার কষ্ট গুলোও ওনাদের আর ছুতে পাড়ছে না। জীবন কি অদ্ভুত, হু!
রাতে মেহরাদের সময় কাটে পুরনো স্মৃতি হাতড়ে। মাঝে মধ্যে নিস্তব্ধ রাত জুড়ে গাড়ি চালিয়ে। আবার মাঝেমধ্যে, অসহ্য বুকের হাহাকার দমাতে না পেড়ে সেডেটিভ নিয়ে। কখনো কখনো রাতের অন্ধকার চিড়ে ধোঁয়া উড়িয় নিকোটিনের। সেই সাথে অ্যলকোহল। আজও তারই রূপ প্রতিয়মান।
অন্ধকার রাতের জোৎসনা বিলাস মেহরাদের দ্বারা বর্তমানে অসম্ভব।তবুও, সে খুব শান্ত অবিচল দৃষ্টিতে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে একের পর এক মার্লব্যারো’র প্যাকেট খালি করছে। মস্তিষ্ক জুড়ে এক রমনীর বিচরণ চলছে। বুকের তীব্র উচাটন বাড়াচ্ছে। ধপধপ করা মাথা নিয়ে হৃৎপিণ্ড এবার কারো বিরহে খাঁ খাঁ করছে।
আজ হটাৎ করেই মেহরাদের শূন্য হৃদয় হাড়ানো সুর হাতড়ে বিরহী কন্ঠের ভারী স্বরে আওড়াল,
“তুমি ছাড়া শূন্য শূন্য লাগে,
ঠোঁটে আসে নাম তোমার বারে বারে
বোঝাই কাকে….
এ কেমন ব্যাথা…? ”
সোহানা সারা রাত জ্বরে ছটফট করলো অসহ্য রকম পা’য়ের ব্যাথা নিয়ে। কাউকে জানায়নি এ ব্যাথার কথা। রাতে খাবার খেতে যায়নি নিচে। রুমেও কাউকে আস্তে দেয়নি। সাফি এসেছিলো একবার। বড়ো বোনের বিয়ের বিষয় নিয়ে উল্লাস করতে। সোহানা বিরক্ত হয়েছে । ভাইকে ধমকে ধামকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিলো পড়ার বাহানায়।
সুরাইয়া বেগম এসেছিলেন ছেলের অভিযোগ শুনে মেয়েকে আচ্ছা রকম বকা দিতে। এসে দেখে মেয়ে লাইট অফ করে শুয়ে। পড়া আর খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করাতে দুটোতেই অসম্মতি জানিয়ে দিয়েছিলো মেয়েটা। সকালে উঠে পড়তে বসবে বলে জানিয়েছে।
রাতে কখন কান্না করতে করতে ঘুমিয়েছে অজানা মেয়েটার। জ্বরে পুরো দেহে কাপছে। তবুও ফজরের আজান শুনে উঠার চেষ্টা করলো। বাদ ভাঙ্গা হৃদয়ের অনুভূতি গুলো রবের কাছে জমা দিয়ে দিতে চায় সে। এগুলো তার আর চাই না। এ অনুভূতির ওজন অনেক বেশি। তাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে একদম। এ যে তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে! পুড়ে যাওয়ার মতো জঘন্যতম ব্যাথাও এ কষ্ট ছাপিয়ে উপরে উঠতে পাড়ে নি তার কাছে। এ কেমন অনুভূতি, কেমন জ্বালা!
মেয়েটা খুব কষ্টে অজু করতে গেলো পুড়া পা টেনে। অজুর শেষ ধাপে পা’য়ে পানি লাগাতেই চোখ খিচে নিলো। অশ্রু গড়ালো অঝোরে। মৃদু চিৎকার অস্ফুটে স্বরে বেড়িয়ে আসলো ঠোঁট ফুরে। জায়নামাযে এসে বসে বসে সালাত আদাই করলো। রবের দুয়ারে হাত উঠিয়ে বলল,
“যাকে ভাগ্যে রাখো নাই, তারে কেন ভালো বাসাইলা খোদা? আমার এ কষ্ট লাঘব কি করে হবে? তুমি রহমত দান করো আল্লাহ। তুমি ছাড়া কে আছে, প্রশান্তি দান করার! আমায় ধৈর্য শক্তি বাড়িয়ে দেও আল্লাহ। ”
সালাত শেষে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলো না মেয়েটা। নিজের সাথে যুদ্ধ করে বই নিয়ে বসতে চেয়েছিলো। কিন্তু জ্বরে কাবু করে নিয়েছে। কখন ঢলে পরেছে শীতে কাপতে কাপতে হুশ নেই।
প্রায় সাতটার পর সুরাইয়া বেগম মেয়ের রুমে আসলেন। দুই মেয়ের কি হয়েছে আল্লাহ জানে! দুটোর একটাও আজ নিচে নামেনি এখনো। বড় জনের দরজা আটকানো। ডেকে এসেছে এক দফা। এখন ছোট জনের রুমের কাছে এসে দেখে দরজা ভেজানোই। উঠেছে ভেবে স্বস্থি পেলেন বুঝি কিছুটা।
কিন্তু ভিতরে গিয়ে দেখে মেয়ে রুম অন্ধকার করে এখনো ঘুমেই। অথচ আগামীকাল মেয়েটার পরিক্ষা৷ সন্তানের পরিক্ষার সময় মায়েদের মেজাজ এমনিতেই চওড়া থাকে। এখন আরও বেশি হলো। দাম করে রুমের লাইট জ্বালিয়ে জানালা খুললেন গজ গজ করতে করতে।
“এই মেয়ে কোন হুশ জ্ঞান নেই তোর? কয়টা বাজে দেখেছিস? কালকে পরিক্ষায় কি দিবি, শুনি? রাতে এই কথা হয়েছিলো তোর সাথে? জমিদারের বেটি, পরিক্ষার কথা গুলে খেয়ে বসে আছিস? উঠ…” বলেই তিনি কম্ফর্টার টানলেন। এসি বন্ধ রেখেও এভাবে কম্ফর্টার জড়ানোর মানে তখনও তার অজানা।
সোহানার গা বেয়ে তপ্ত ভাব বের হচ্ছে। গাল মুখ লাল হয়ে আছে। মায়ের টানে হুশ ফিরেছে কিছুটা। গলা ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। চোখ জোড়া কুচকে রাখলো টেনে খুলতে না পেরে। সুরাইয়া বেগম ভ্রু কুচকে কর্কশ আওয়াজে শুধালো,
“এই কথা হয়েছিলো তোর সাথে রাতে? আগামীকাল কি পরিক্ষা দিতে যাবি কি যাবি না? বল তুই আমায়। না দিলে বল, শান্তার আগে তোর বিয়েটাই দিয়ে দেই।”
আবারও সেই বিয়ে! সোহানা কাপা দেহ টেনে উঠে বসতে নিলেই সুরাইয়া বেগম আগলে ধরলো ওঁকে। ধরতেই বুঝলো মেয়েটার গা’য়ে মাত্রাতিরিক্ত জ্বর। আৎকে উঠলেন তিনি। সারা কপালে গালে, গলায় হাত ভুলিয়ে বললেন,
“জ্বরে যে গা পুড়ে যাচ্ছে? জ্বর আসলো কখন? জানালি না একটা বার? ” তিনি অস্থির হলেন চিন্তায়। মেয়েটার পরিক্ষা, সেই মূহুর্তে এরকম জ্বর কিভাবে বাধালো মেয়েটা!
মেয়েকে ধরে ভালো করে বসালেন তিনি। গা থেকে কম্ফর্টার সড়িয়ে কপালে হাত মোছাতে মোছাতে বললেন,
“মাথায় পানি ঢেলে দেই? এতো জ্বর! কখন থেকে? ”
সোহানা জ্বরে ঢুলছে। পা’য়ের ব্যাথা অসহ্য রকম বাড়া। মাথা নাড়ালো শুধু মেয়েটা। সুরাইয়া বেগম মেয়ের জন্য বালতি ভরে পানি আনতে যাবেন এর আগেই খাটে বসা মেয়ের ঝুলানো এক পা’য়ের দিকে নজর যেতেই চিৎকার করে উঠলেন। ওনার চিৎকারে বাড়ি শুদ্ধ মানুষ হন্তদন্ত হয়ে রুমে আসতে শুরু করলো।
পুরো শরীর কাটা দিয়ে উঠলো সুরাইয়া বেগমের মেয়ের পুড়ে যাওয়া পা দেখে। চিৎকার করে বলে উঠলেন,
“এটা এটা কখন হলো? আল্লাহ! এই কি অবস্থা? কোন সময় হলো? আল্লাহ….”
তিনি আহাজারি শুরু করলেন। শান্তা পাশের রুম থেকে সবার আগে এসেছে। মা’কে দেখলো বোনের সদ্য চামড়া উঠে কুচকে যাওয়া পা ধরে আছে। ভিতরটা মুচড়ে উঠলো মেয়েটার বোনের এ বিভৎস পা’য়ের অবস্থা দেখে। দেখলো বোন জ্বরের ঘোরে আছে। আমজাদ তালুকদার মেয়ের কষ্ট অনুভব করতে পেরে ভেঙে পড়লেন। সকলেরই একিই অবস্থা।
আহাজারি শুরু করলো সকলে, মেয়েটার পা’য়ের এ অবস্থা কখন হলো? কিভাবে সহ্য করে আছে? কাউকে একটু জানালো না? কিভাবে সম্ভব!
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৭
অফিস বাদ দিয়ে সকাল আটটা নাগাদ সোহানা কে নিয়ে হসপিটাল ছুটেছে মেহরাদ। তার বুকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, তার বোনের কষ্টের পাল্লা হিসেব করে। বিনা চিকিৎসা ব্যাতিত মেয়েটা কিভাবে এতো সময় রয়েছে এ পায়ে? কথাটা মাথায় আসতেই শরীর হীম হয়ে আসে তার। সকলের গবেষণায় শুনেছে, রাতে যখন চা’য়ের কাপ ভেঙেছে সেই তখনই এমন হয়েছে বোধহয়।
তাহলে ঠিক বারো ঘন্টা মেয়েটা এ অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করছে বীনা শব্দ ব্যাতিত! পা’য়ের ভিতরের সাদা চামড়া দৃশ্যমান। চারপাশে পানিতে ঠোস পড়ে আছে কয়েক জায়গায়। কি করুন অবস্থা পা টার! মেহরাদের বোনের দুশ্চিন্তাই মাথা আওড়ে যায় পুরো পুরি।
