Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০ (৩)
সাবা খান

প্রত্যুষের আলোটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সারা বাংলা জুড়ে যেন রাতে লুকানো এক গভীর স্বপ্নের অন্ধকারকে দূর করছে। রাস্তার পাশের গাছগুলোর পাতায় রাতের শিশির এখনো ঝুলে আছে। শহরের ব্যস্ততা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, এই শান্ত ভোরের মধ্যেই গুলশানের একটা ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে হইচই আর দৌড়াদৌড়ির শব্দ। সেই ফ্ল্যাটটা আয়ানের।
ভোরবেলা থেকেই সেখানে যেন ছোটখাটো যুদ্ধ লেগে গেছে। কিচেন থেকে হঠাৎ আয়ানের গলা শোনা যায়,
-“কিয়ান, রেডি হয়েছো?”
ভিতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট একটা গলা ভেসে আসে,
-“ইয়েস পাপা…”

আয়ান কিচেন থেকে বেরিয়ে লিভিং রুমে আসে, সে জানে এই ছেলেটা কতটা দুষ্ট। সে যে এখনো ব্রাশও করেনি সে সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আয়ান। কিন্তু কক্ষে যাওয়ার আগেই নজরে আসে ছোট্ট একটা মেয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে হেঁটে আসছে, ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে। দুই হাত দিয়ে বারবার চোখ মুছছে। তার কাঁধ পর্যন্ত এলোমেলো চুলগুলো সবদিকে ছড়িয়ে আছে। হামি তুলতে তুলতে ছোট ছোট কদমে এগিয়ে আসছে সে। আয়ান পা থামিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে ওঠে। মেয়েটা একদম রিয়ানার মতো হয়েছে, একই চোখ, একই মুখের ভঙ্গি, একদম পুরোপুরি মায়ের অনুকরণ।

ছোট্ট মেয়েটার নাম কিয়ারা, আর যার সাথে আয়ান একটু আগে কথা বলছিল, সে হলো কিয়ান। কিয়ান আর কিয়ারা, আয়ান আর রিয়ানার যমজ সন্তান। আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে তারা পৃথিবীতে এসেছিল। কিন্তু তাদের জন্মের পর জীবনটা একেবারে বদলে গিয়েছিল আয়ানের। এই দুই ছোট্ট মানুষকে সামলানোর জন্য তাকে নিজের চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হয়েছিল। শুরুর দিনগুলো ছিল ভীষণ কঠিন। যমজ হলেও, কিয়ান ছিল বেশ শক্তপোক্ত আর চঞ্চল। কিন্তু কিয়ারা ছিল তার বিপরীতে, খুবই দুর্বল, প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তো। রাতের পর রাত জেগে থাকতে হয়েছে আয়ানকে। এক হাতে কিয়ান, আরেক হাতে কিয়ারাকে নিয়ে কখনো দুধ বানানো, কখনো ওষুধ খাওয়ানো, কখনো আবার দুইজনকে একসাথে শান্ত করানো। সেই দিনগুলো ছিল ক্লান্তিকর। কিন্তু ধীরে ধীরে এই দুই ছোট্ট মানুষই হয়ে ওঠেছে আয়ানের পুরো পৃথিবী সাথে তার চোখের মণি।

আজ তারা দুজনেই পাঁচ বছরে পা দিয়েছে।আজ তাদের জন্মদিন। এই কারণেই ভোরবেলা থেকেই বাড়িতে এত উত্তেজনা। আরজে আরো দুদিন আগে চায়না যাওয়ার পূর্বেই তাদের গিফট সব পাঠিয়ে দিয়েছে। আয়ান ভোর রাতে উঠেই তাদের পছন্দের সকল খাবার বানিয়েছে, সাথে একটু বেশি করে বানিয়েছে কেননা সে এদেরকে নিয়ে নিজের অনাথ আশ্রমে ও যাবে, তাদের কেও দিবে।
কিয়ারা ধীরে ধীরে এসে আয়ানের সামনে দাঁড়ায়। তার ঘুম জড়ানো চোখ টেনে টেনে মেলে ছোট্ট গলায় শুধায়,
-“পাপা…”
আয়ান নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে নেয়। ফটাফট তার গালে একটু চুমু খেয়ে বলে,
-“গুড মর্নিং, কিউটি পাই”
কিয়ারা হঠাৎ উচ্ছ্বাসে বলে,

-“গুড মর্নিং, পাপা… আজকে আমরা মাম্মার কাছে যাবো না?”
আয়ান মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে নরম গলায় বলে,
-“হ্যাঁ সোনা, আজকে আমরা মাম্মার সাথে দেখা করতে যাবো”
কিয়ারা হঠাৎ হাততালি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে,
-“ইয়াহ…”
তারপর বাচ্চাদের মতো একটু অস্পষ্ট গলায় ফের বলে,
-“আমি মাম্মাম কে বলব ভাইয়া আমায় দুই দিন মেরেছে, উকে বক্কে দিতে… ভালো করে..”
আয়ান হেসে মেয়ের এক গালে হাত রেখে বলে,
-“ওকে, মাম্মা ভাইয়াকে ভালো করে বকে দেবে”
আয়ানের কণ্ঠস্বর থেকে বাক্য নিঃসৃত হতে দেরি কিন্তু ভিতর থেকে ধুপধাপ শব্দ করে দৌড়ে আসতে কিয়ানের দেরি হলো না, তার চুল এলোমেলো, কিন্তু মুখে ভীষণ সিরিয়াস ভাব। সে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,

-“পাপা, আমি মারিনি…ও আগে আমাকে মেরেছে”
কিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে,
-“না, ভাইয়া আগে মেরেছে”
-“ও আমার খেলনা ভেঙেছে”
কিয়ারা মুখ ফুলিয়ে বলে,
-“আমি ভাঙিনি পাপা, নিজেই পড়ে ভেঙেছে”
কিয়ান হাত তুলে দেখায়,
-“দেখো পাপা, এইখানে মেরেছে”
কিয়ারা রেগে মেগে চিৎকার করে বলে,
-“মিথ্যা, ওই আগে আমার চুল টেনেছে”
দুজনেই একে অপরকে দোষ দিতে থাকে। আয়ান দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। তারপর দুজনকেই কাছে টেনে নিয়ে বলে,

-“স্টপ, স্টপ আমার সোনারা, আজকে কিন্তু তোমাদের বার্থডে। আজকে কোনো ফাইট না”
কিয়ান একটু ভেবে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে, কিয়ারা মুখ ফুলিয়ে বলে,
-“তবুও মাম্মাম কে বলব”
আয়ান আবার হেসে ফেলে। তারপর দুজনকে নিয়ে টেবিলে বসায়। নিজ হাতে তাদের নাস্তা খাওয়ায়। কখনো কিয়ানের মুখে খাবার তুলে দেয়। কখনো কিয়ারার মুখ মুছে দেয়। দুজনেই মাঝে মাঝে হাসছে, ঝগড়া করছে, আবার কথা বলছে। নাস্তা শেষ করে, আয়ান তাদের সুন্দর করে রেডি করায়। কিয়ান পরে নেয় ছোট্ট শার্ট আর জিন্স নিজে নিজে। কিয়ারা পরে নেয় একটা সুন্দর ফ্রক। চুলে ছোট্ট ক্লিপ লাগিয়ে দেয় আয়ান। তারপর দুজনকে দেখে একটু থেমে যায়। তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো প্রশান্তির হাসি খেলে যায়।তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুইটা আশীর্বাদ।
কিয়ান হাত বাড়িয়ে বলে,

-“পাপা, লেটস গো..”
সাথে সাথে কিয়ারা লাফিয়ে বলে,
-“আমরা মাম্মাম এর কাছে যাবো”
আয়ান হেসে দুজনের হাত ধরে আওড়ায়,
-“চলো”
তিনজন একসাথে দরজার খুলে বেড়িয়ে পড়ে, উদ্দেশ্য আগে যাবে রিয়ানার কাছে তারপর সেখান থেকে আয়ানের অনাথ আশ্রমে।

আরজের কক্ষটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে আছে। ভোরের আলো ধীরে ধীরে ভারী পর্দার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকছে। বিছানার মাঝখানে শুয়ে থাকা ছোট্ট আরভির ঘুম ভাঙার পরও শরীরে সেই অলসতা রয়ে গেছে। বিছানার এক পাশে বসে আছে সানা। তার দুই হাত জড়িয়ে রাখা নিজের হাঁটুর ওপর। আর বিছানার অন্য পাশে বসে আছে আরজে, দৃষ্টি স্থির ছেলের দিকে। সে অপেক্ষা করছে, কখন তার ছেলে কিছু বলবে। এই অপেক্ষাটা যেন অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ হয়ে উঠছে তার কাছে। আরভি ধীরে ধীরে চোখ মেলে চারদিকে তাকায়। তার চোখ এখনো আধা ঘুমে ভরা।
তারপর ধীরে ধীরে সে মুখ ঘুরিয়ে তাকায় আরজের দিকে। কয়েক সেকেন্ড সে শুধু তাকিয়ে থাকে। তার ছোট্ট চোখ দুটোতে কৌতূহল। তারপর ঘুম জড়ানো কণ্ঠে, বাচ্চাসুলভ স্বরে প্রথম বার ডেকে ওঠে,

-“ড্যাড…?”
একটু থেমে তারপর মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে আবারও বলে,
-“তুমি আবারও আমার স্বপ্নে এসেছ?”
আরভির মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া বাক্যটুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই আরজের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে যায়। তার মুখের সব শব্দ যেন হঠাৎ হারিয়ে গেছে। সে শুধু তাকিয়ে আছে নিঃশব্দে। তার নিজের ছেলে, যাকে সে ছয় বছর ছুঁতেও পারেনি, সে নাকি প্রতিরাতে তাকে স্বপ্নে দেখে?
এই চিন্তাটা মাথায় ঢুকতেই তার বুকের ভেতর তীব্র এক ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। সে ভাবতেই পারেনি, কোথাও তার একটা ছোট্ট অংশ আছে, যে তাকে না দেখেও তাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখে। আরজের কণ্ঠনালি শুকিয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে যেন এই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরে একটা ঝড় উঠেছে। অদ্ভুত এক আনন্দ, অদ্ভুত এক বিস্ময় সব একসাথে। সন্তানের মুখ থেকে ‘বাবা’ ডাক শুনা বুঝি এতই মধুর। আরজে তার হাতটা ধীরে ধীরে সামনে বাড়িয়ে দেয় আরভির দিকে।
আরভি ধীরে ধীরে উঠে বসে, চোখে এখনো ঘুমের ছাপ। সে কৌতূহলীভাবে হাত বাড়িয়ে আরজের বাড়িয়ে রাখা হাতটা ছুঁয়ে দেখে। তার ছোট্ট আঙুলগুলো ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় আরজের আঙুল। তারপর সে মাথা ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত স্বরে আওড়ায়,

-“মম…
আমি ড্যাডকে স্বপ্নে ছুঁতে পারছি”
সানার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে ওঠে। এই নিষ্পাপ বাক্যগুলো তার হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। সে চুপ করে তাকিয়ে থাকে নিজের ছেলের দিকে। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। কিন্তু কণ্ঠস্বর থেকে যেন কোন আওয়াজ বেরুচ্ছে না। বারবার গলা জড়িয়ে আসছে তার, সে বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র অনুশোচনা জমে ওঠে। মনে কোণে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে,
সে কি সত্যিই, তার সন্তানকে বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে?
এই ছোট্ট ছেলে, যে প্রতিরাতে তার বাবাকে স্বপ্নে দেখতো?
তার চোখের কোণ ভিজে ওঠে। আরভি আবার আরজের দিকে তাকায়। তার চোখে এখনও উচ্ছ্বাস,

-“মম ইউ নো, ড্যাড রোজ আমার স্বপ্নে আসে।
কখনো আমরা পার্কে যাই,
কখনো ড্যাড আমাকে বড় বড় গাড়ি দেখায়
একদিন স্বপ্নে ড্যাড আমাকে একটা সুপারহিরো কেপ দিয়েছিল,
আর বলেছিল, তুমি ব্রেভ বয়”
তার ছোট্ট পাঁচ বছরের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে,
-“আমি তখন ড্যাডকে জড়িয়ে ধরেছিলাম….”
সে আর কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে যায়।তারপর একটু মন খারাপ করে বলে,
-“কিন্তু সব সময় ঘুম ভাঙলেই ড্যাড চলে যায়”
এই বাক্যটা শুনা মাত্রই আরজের চোখের ভেতর একটা ঝড় বয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা এত শক্ত হয়ে যায় যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে। সে কখনো কল্পনাও করেনি, তার ছেলে তার সাথে এমন একটা পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে, যেখানে সে প্রতিরাতে আসে। আর বাস্তবে, সে ছিল না। সানা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আরভির গালে হাত রাখে। তার কণ্ঠ কাঁপছে তারপরও খুব নরম গলায় শুধায়,

-“সোনা…এটা স্বপ্ন না”
আরভি থমকে যায়। সে বিস্ময় নিয়ে তাকায় মায়ের দিকে। সানা চোখে জল নিয়ে ফিসফিস করে,
-“তোমার ড্যাড সত্যি এসেছে”
কথাটা শুনেই আরভির চোখ দুটো হঠাৎ বড় হয়ে যায়। মনে হচ্ছে সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। আরভি ধীরে ধীরে আবার তাকায় আরজের দিকে, অবিশ্বাসের সুরে বলে,
-“রিয়েলি…..”
ব্যাস কয়েক সেকেন্ড তারপর হঠাৎ সে কোনোদিকে না তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-“ড্যাড…..”
আর পরমুহূর্তেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরজের বুকে। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে, যেন আবার হারিয়ে যাবে ভেবে। বিপরীত পাশের মানব একদম স্থির হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড সে নড়তেও পারে না। তার বুকের সাথে লেগে আছে ছোট্ট একটা উষ্ণ শরীর।আরজের মনে হচ্ছে তার বুকের ভেতর কেউ একটা পুরো পৃথিবী এনে রেখে দিয়েছে।

না, পৃথিবী না, তার নিজের পৃথিবী। তার ছয় বছরের হারানো সময়, তার অজানা হাসি, সব যেন এই ছোট্ট শরীরটার মধ্যে। তার বুকের ভেতর টা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে নিজের দুটো হাত তুলে আরভিকে জড়িয়ে ধরে, খুব শক্ত করে। যেন ছেলেটা আবার হারিয়ে যাবে। তার বড় হাতটা ধীরে ধীরে নেমে আসে আরভির মাথায়। সে আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে খুব নিচু স্বরে আওড়ায়,
-“মাই বয়…”
শব্দ দুটো বলতেই তার গলাটা কেমন ভারী হয়ে আসে। এই একটা শব্দ, সে কত বছর ধরে বলতে পারেনি। সেই দিন হসপিটালের পর থেকে একটা ভাবনা তাকে রোজ ভিতর থেকে নিঃশব্দে জ্বালিয়ে দিতো, মনে হতো, তার সন্তানের এমন পরিনতির জন্য কোথাও না কোথাও সে দায়ী, তার করা পাপ গুলো দায়ী।
আরভি তখনও তাকে জড়িয়ে ধরে আছে।তার মুখটা আরজের বুকে চাপা। সে একটু মাথা তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,

-“তুমি… আবার চলে যাবে ড্যাড?”
সে একটু থেমে ফের দ্রুত বলে,
-“আমি আর মম তোমার সাথে যাব”
এই সরল বাক্যটা শুনে আরজে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ছেলেকে আরও শক্ত করে বুকে টেনে নিয়ে আওড়ায়,
-“ড্যাড উইল নেভার লিভ ইউ”
ছোট আরভি আবারও শিশুসুলভ কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
-“তুমি কি আমার আর মমের সাথেই থাকবে?”
আরজে ধীরে ধীরে তাকে নিজের বুক থেকে একটু দূরে আনে। তার ছোট্ট মুখটা দু্ই হাতের আজলে ভরে খুব গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে ছেলের চোখে। তার খসখসে, শক্ত হাতের তালুতে আরভির নরম গাল দুটো ধরা। তারপর ধীরে ধীরে বলে,

-“আনটিল দ্য ডেথ, আই উইল স্ট্রে উইথ ইউ”
বিপক্ষে আরভির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে যেন বিশ্বাস করতে চাইছে প্রতিটা শব্দ,
-“প্রমিস?”
-“প্রমিস”
আরভি হঠাৎ খুশিতে হাসতে শুরু করে। তারপর সে আরজের গলা জড়িয়ে ধরে আবারও বলে,
-“আমি জানতাম তুমি একদিন আসবে”
আরজের বুক আবার ভারী হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে ছেলেটাকে তুলে এনে নিজের কোলে বসায়। তার পাঁচ বছরের ছোট্ট পৃথিবী, এখন তার কোলে বসে। সে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। মনে হচ্ছে সে প্রতিটা মুহূর্ত মনে রাখতে চায়। আরভি তখন উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলতে শুরু করে,

-“ড্যাড, ইউ নো, আমি রোজ রাতে তোমার জন্য অপেক্ষা করতাম। ঘুমানোর আগে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মম বলতো, তুমি অনেক দূরে আছো
কিন্তু আমি জানতাম তুমি আসবে”
আরজের বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে ওঠে সে খুব ধীরে বলে,
-“তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলে?”
আরভি দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“হুম,
ইউ নো, ভ্যালিতে সবাই তাদের ড্যাডের কথা বলতো…কেউ বলতো তার ড্যাড তাকে ফুটবল খেলতে নিয়ে যায়। কেউ বলতো তার ড্যাড তাকে আইসক্রিম কিনে দেয়”
সে একটু মন খারাপ করে ফের বলে,
-“তখন আমি কিছু বলতাম না…”
আরজের আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো হয়ে যায়। আরভি আবার বলে,
-“মম আমাকে অনেক গল্প বলতো তোমাকে নিয়ে। বলতো তুমি খুব ব্রেভ, আর কেউ যদি আমাকে কষ্ট দেয়, তুমি তাকে বকা দিবে”
আরজে এবার ছেলের কপালে আলতো চুমু খেয়ে নরম স্বরে ছোট করে বলে,

-“হুম”
আরজে উপরে এটা মুখে বললেও মনে মনে চলছে অন্য কথা,
-“তাকে পৃথিবী থেকেই গায়েব করে দিব, যে তোমার দিকে হাত বাড়াবে”
এদিকে আরভি আবার উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,
-“আমি একবার ভ্যালির ‘শিয়াও পেংইও’ তে সবার সামনে ফাইটও করেছিলাম”
আরজে ভ্রু তোলে জিজ্ঞেস করে,
-“ফাইট?”
আরভি গর্বের সাথে বলে,
-“একটা ছেলে বলেছিল আমার ড্যাড নেই।
তখন আমি তাকে বলেছিলাম, আছে।
সে বলেছিল, মিথ্যা।
তখন আমি তাকে ধাক্কা দিয়েছিলাম”
আরজে চুপ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। অজান্তেই তার হাতটা মুষ্টি বদ্ধ হয়ে আসে। সে ধীরে বলে,

-“তুমি একা এসব সামলেছো?”
-”হ্যাঁ, আমি ওকে খুব মেরেছি কিন্তু ও আমাকে একটা উল্টে দিয়েছিল। তারপর মম এসে ওই ছেলের চুল ভালো করে টেনে দিয়েছে সবার সামনে, মমকে ঈশানী আন্না টেনে এনেছে”
বাক্য খানা শ্রবণ হতেই আরজের মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে যায়। সে চোখ তুলে একবার বিছানার বিপরীত পাশের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা রমণীর দিকে তাকায়। যে চোখ একটু আগেই টলমল করেছিল অশ্রুতে সেই চোখে এখন বিস্ময়। রমনীর বিস্মিত নয়ন জোড়া আরজের সাথে চোখাচোখি হতেই সে তড়িঘড়ি করে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলে। মনে মনে বলে,
-“আমার ভীর তো, জীবনেও কারো সাথে এত কথা বলতো না। আজ যেন বাপকে পেয়ে সব ভুলে বসেছে”
আরজে তার থেকে দৃষ্টি হটিয়ে আবারো ছেলের দিকে তাকিয়ে ছেলেটাকে বুকে টেনে নেয়। খুব শক্ত করে, মনে হয় যেন সে তার হারানো ছয় বছরকে আবার নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে। আরভির চোখে এখন আর আগের মতো অবাক চাহনি নেই। এখন তার চোখে শুধু উত্তেজনা আর আনন্দ। সে যেন হঠাৎ করে অনেক দিনের জমে থাকা গল্প বলার সুযোগ পেয়ে গেছে,

-“ড্যাড, ইউ নো, আমার একটা ব্লু কালারের সাইকেল আছে, যেটা আমাকে বড় পাপা কিনে দিয়েছে”
আরজে যদিও বড় পাপা মানে কে সে জানে না তারপরও ভ্রু তুলে প্রশ্ন করে,
-“তুমি চালাতে পারো?”
-“হুম… একটু পারি, ছোট পাপা আমাকে শিখিয়েছে, কিন্তু মাঝে মাঝে পড়ে যাই”
আরজে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-“পড়ে গেলে কি করো?”
-“মম ফুঁ দিয়ে বলে ‘ব্রেভ বয় কাঁদে না’
আরজের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আবারও সানার দিকে চলে যায়। তারপর আবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“আর তুমি কাঁদো না?”
-“না”
তারপর হঠাৎ উচ্ছ্বাসে বলে,

-“ড্যাড, আমি ড্রইংও করি, ঈশানী আন্না আমাকে শিখিয়েছে”
-“কী আঁকো?”
-“আমি একটা বড় বাড়ি আঁকেছি। ওই বাড়ির সামনে একটা গাড়ি আর তিনজন মানুষ। আমি, মম আর তুমি”
এই কথাটা শুনে আরজের বুকের ভেতরটা আবার ভারী হয়ে ওঠে। সে ধীরে বলে,
-“তুমি আমাকে এঁকেছিলে?”
আরভি খুব স্বাভাবিকভাবে বলে,
-“হুম,
ড্যাড, তুমি আমাকে ফুটবল খেলতে শিখাবে?”
বিপরীত প্রান্ত থেকে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর আসে,

-“শিখাবো”
-“আর সুপারহিরো সিনেমা দেখাবে?”
-“সব দেখাবো”
-“আর, আমাকে বাইকে ঘুরতে নিয়ে যাবে?”
আরজে এবার একটু ঝুঁকে ছেলের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
-“শুধু ঘুরতে না, যতদূর তুমি যেতে চাও”
-“আমি কি সামনে বসব”
-“তুমি যেমন চাইবে”
আরজের এমন জবাবে ছোট আরভির ঠোঁটের কোণে এক মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটে ওঠে, কিন্তু পর মুহূর্তে কিছু একটা ভেবে তা মিলিয়ে যায়। হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে,
-“ড্যাড…”
-“হুম?”
-‘আমার স্বপ্নের মতো তুমি আবার চলে যাবে না তো?”
আরজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে ছেলের এমন প্রশ্নে। সে ছেলের গালে হাত রেখে দৃঢ় গলায় শুধালো,
-“ইয়োর ড্যাড ওয়োন্ট লিভ ইউ,
নট ফর আ সিঙ্গেল ব্রেথ, নট আনটিল দ্য ভেরি লাস্ট”
অদূরে বসে থাকা সানা এক দৃষ্টিতে তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ যেন সরছেই না। তার সামনে এই দৃশ্য টা,

“একজন বাবা আর ছেলে”
যে দৃশ্যটা হয়তো হওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে। একটা তীব্র অনুশোচনা যেন ভেতর থেকে উঠে আসে। সে ভাবতে থাকে,
সে কি সত্যিই ভুল করেছে?
সে তো আরভির ভালোর জন্যই চলে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল, আরজের অন্ধকার পৃথিবী থেকে দূরে থাকলেই তার ছেলে নিরাপদ থাকবে। সে ভেবেছিল, এই দূরত্বই হয়তো তার সন্তানের জন্য ভালো হবে তার ছেলে মানুষ হবে, আরজের মতো দানব হবে না।।
কিন্তু এখন, তার চোখের সামনে যে দৃশ্যটা, সেটা দেখে তার বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে। তার ছেলে, যে প্রতিরাতে বাবাকে স্বপ্নে দেখতো। যে রোজ বাবার জন্য অপেক্ষা করতো। সে কি সত্যিই, নিজের সন্তানের কাছ থেকে বাবাকে কেড়ে নিয়েছিল?

এই চিন্তাটা তার ভেতরে ছু*রি হয়ে বিঁধতে থাকে। তার বুকের ভেতর চাপা যন্ত্রণা জমে ওঠে। সে নিজেও টের পায় না, কখন তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। এক ফোঁটা জল ধীরে ধীরে তার চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। তার দৃষ্টি স্থির, আরজে আর আরভির দিকে। কিন্তু, যে চোখটা এই জলটা দেখতে পাওয়ার কথা ছিল না, সে ঠিকই দেখে ফেলেছে, আরজে হঠাৎ মাথা তুলে তাকায় সোজা সানার দিকে। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হয়। সানা চমকে মুখ আরেক দিকে ঘুরিয়ে ফেলে। মুহূর্তে আরজে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। সে এই মেয়েটার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না যার জন্য নিজের এত বছরের জমিয়ে রাখা রাগের একাংশও মিটায় নি তার উপর। কিন্তু এই মেয়ে টা ঠিক তার পছন্দের উল্টো কাজ গুলোই সবসময় করবে। আরজে কিছু না বলে বেডের পাশ থেকে টিস্যুর বক্সটা তুলে সেটা এগিয়ে দেয় সানার দিকে। গম্ভীর স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

-“আর একবার যদি তোমার চোখে পানি দেখি…
দ্যান আই ডোন্ট নো হোয়াট আই উইল ডু উইথ ইউ”
আরজে বাক্যটুকু উগড়ে দিয়েই আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না, সানা অবাক হয়ে তার দিকে তাকানোর আগেই আরজে ছেলের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
-“লেটস গো, মাই বয়,
ড্যাড তোমাকে যা চাইবে সব কিনে দেবে।
টেল মি হোয়াট ইউ ওয়ান্ট”
আরভির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সে একে একে বলতে থাকে,
-“টয় কার”
-“আর?”
-“একটা বড় রোবট”
-“ডান”

আরজে ছেলেকে কোলে তুলে দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। আরভি খুশিতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। দুজনের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে ঘর থেকে মিলিয়ে যায়। ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে পড়ে। আর তখনই সানা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে দুহাতে মুখ চেপে ধরে। তার কাঁধ কাঁপতে থাকে। চাপা কান্না গুলো একসাথে বেরিয়ে আসছে। তার বুকের ভেতর সেই একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে বারবার,
সে কি সত্যিই ছেলের ভালোর জন্য তাকে বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছিল?
এই চিন্তাটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে থাকে।

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে বিশাল এক প্রাসাদের ওপর,
“ডার্ক লোটাস ভিলা”
কালো পাথরের তৈরি উঁচু দেয়াল পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। দেয়ালের মাথায় আধুনিক সিকিউরিটি সেন্সর বসানো। প্রতিটা কোণায় ক্যামেরা ঘুরছে ধীরে ধীরে। বিশাল গেটের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র গার্ড। ভিলার সামনে বড় একটা বাগান গোলাপ গাছে ভর্তি। আরজে কাল রাতেই এখাবে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু আসা হয়নি কারণ একটাই, সিকিউরিটি। এই জায়গা টাকে আরও ভালোভাবে সিকিউর করার জন্য।
গেট ধীরে ধীরে খুলে যায়। একটার পর একটা কালো গাড়ি ঢুকে পড়ে ভিলার সামনে।গাড়িগুলো এসে সারি করে থামে। প্রথম গাড়ির দরজা খুলে নেমে আসে কাইলিন। সে দ্রুত গিয়ে পিছনের দরজা খুলে দেয়। আর সেখান থেকে নেমে আসে, আরজে। তার কোলে ছোট্ট আরভি। আরভি গাড়ি থেকে নামতেই চারদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়,

-“ওয়াও…ড্যাড, ইটস ইয়োর হোম”
-“নো, ইটস আওয়ার হোম”
কাইলিন তখন ঘুরে অন্য পাশের দরজা খুলতে যাচ্ছে, যেখানে বসে আছে সানা। কিন্তু ঠিক তখনই আরজে হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়। কাইলিন সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়।আরজে নিজেই গাড়ির বিপরীত পাশ ঘুরে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। ভেতর থেকে সানা ধীরে ধীরে নেমে আসে। তার চোখ একবার চারদিকে ঘুরে যায়।
আরজে কিছু না নিঃশব্দে ছেলেকে কোলে নিয়ে ভিলার ভেতরের দিকে হাঁটা শুরু করে। সানা ধীরে ধীরে তাদের পেছনে হাঁটতে থাকে। কয়েক কদম যাওয়ার পর আরজে হঠাৎ থেমে যায়। সে পিছনে তাকানোর সাথে সাথে তার কোলে থাকা আরভিও পিছনে তাকায়।
সানাকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চিৎকার করে ওঠে,
-“মম, হ্যারি আপ, কাম অন”
সানার ঠোঁটে অজান্তেই একটা প্রশান্তির হাসি খেলে যায়। অনেকদিন পর, এই ডাকে তার বুকের ভেতর উষ্ণ কিছু অনুভূত হয়। সে দ্রুত পা বাড়িয়ে তাদের সাথে ভেতরে চলে যায়।

আরজে দের ভিতরে যাওয়ার কিয়ৎকাল পরেই পিছনে এসে থামে আরেকটা গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে আসে এসপি। তার পাশে বসে আছে সানিতা। সানা তাদের কে ফেলে আসেনি। আর আরভিও তাদের ফেলে আসতে রাজি ছিল না। আরজে প্রথমে একদমই রাজি ছিল না। সে নিশ্চিত, এই বারোভাতারিটা তার চোখের সামনে থাকলে সে নিজেকে সামলাতে পারবে না। তার সত্যিই ইচ্ছে করেছিল, ছেলের সামনে দাঁড়িয়েই এসপিকে মে*রে ফেলতে। কিন্তু সে তা করেনি। নিজের ভিতরের আ*গুন টাকে দাঁত চেপে থামিয়েছে। বউ আর ছেলের চাপে পড়েই সে শেষমেশ রাজি হয়েছে।
গাড়ির দরজা খুলে এসপি নেমে আসে। সে সানিতার দিকে তাকায়। সানিতা গর্ভবতী হওয়ার দরুন তার হাঁটা ধীর হয়ে গেছে। গাড়ি থেকে নামতেই সে একটু কষ্ট করে দাঁড়ায়। এসপি এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে সরাসরি তাকে কোলে তুলে নেয়। সানিতা ভড়কে যায়। তাড়াতাড়ি তার গলা জড়িয়ে ধরে বলে,

-“এই, কি করছো ফারাদ ভাই”
মুহূর্তে এসপি থেমে দাঁড়ায়। তার চোখ গরম হয়ে ওঠে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দন্ত পাটি চেপে আওড়ায়,
-“আরেকবার ভাই বলবি? চায়না থেকে তোকে নিচে ফেলে দেব”
সানিতা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কিছু না বলে, আরও শক্ত করে তার গলা জড়িয়ে ধরে। এসপি আর কিছু না বলে সামনের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা চাপা হাসি ফুটে ওঠে। সে তাকে কোলে নিয়েই ভিলার ভেতরে চলে যায়।
এর কিছুক্ষণ পর আরেকটা গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামে রওনাক, তার সাথে ঈশানী। তারা চারদিকে একবার তাকায়। তারপর দ্রুত ভেতরের দিকে হাঁটা শুরু করে। এক এক করে সবাই ঢুকে পড়ে, আরজের ‘ডার্ক লোটাস ভিলার’ ভেতরে।

রাত প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। ডার্ক লোটাস ভিলা এখন আলোয় ভরে উঠেছে। বাইরের বাগানের লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে, কালো পাথরের পথগুলো হলুদ আলোয় ঝলমল করছে। ভিলার চারপাশে টহল দিচ্ছে সশস্ত্র সিকিউরিটি। ক্যামেরাগুলো নিরবচ্ছিন্ন ঘুরছে। সবকিছু নিখুঁতভাবে সুরক্ষিত। ঠিক তখনই, মেইন গেটের অন্ধকার দিক থেকে যেন একটা ছায়া ভেসে আসে।
কালো পোশাকে ঢাকা এক দীর্ঘদেহী মানুষ।
গার্ডদের একজন তাকে দেখতে পেয়েই থমকে দাঁড়ায়। তারপর দ্রুত সড়ে দাঁড়িয়ে বলে,
-“স্যার…”
আরেকজনও একইভাবে মাথা নিচু করে পথ ছেড়ে দেয়। লোকটা কিছু না বলে সামনের দিকে এগিয়ে যায় নিশ্চুপভাবে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। যেন ভেতরে ভেতরে সে কোনো ভয়ংকর আনন্দ লুকিয়ে রেখেছে। সে ভিলার ভেতরে ঢুকে পড়ে। লম্বা করিডোর ধরে সে এগিয়ে যায়। প্রতিটা সিকিউরিটি তাকে দেখে সরে দাঁড়ায়। কেউ প্রশ্ন করে না, আর না কেউ বাধা দেয়। লোকটা এগিয়ে গিয়ে আরজের রুমের সামনে এসে সে থামে। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয়, সামান্য ফাঁক। সে ধীরে ধীরে সেই ফাঁক গলিয়ে ভেতরে তাকায়। নজরে আসে, ভিতরে আরজে নেই বেডের ওপর বসে আছে সানা। তার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আরভি। সানা মৃদু হেসে ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে বলে,

-“সোনা… তোমার কেমন লেগেছে ড্যাড কে?”
এই প্রশ্ন শুনে আরভির চোখে মুখে উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে,
-“ড্যাড ইজ দ্য বেস্ট, ড্যাড আমাকে কোলে করে পুরো বাড়ি দেখিয়েছে”
হঠাৎ আরভির মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায়। সে ধীরে মায়ের দিকে তাকিয়ে ফের বলে,
-“মম…ড্যাড আবার নিজের কাজে চলে যাবে?”
সানা ছেলের গালে আলতো করে হাত রেখে নরম কণ্ঠে শুধায়,
-“না সোনা, ড্যাড এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবে”
-“অলওয়েজ?”
-“হুম”

আরভির মুখে আবার হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু এই পুরো দৃশ্যটা দরজার ফাঁক দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে আরেকজন। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে পৈশাচিক হাসি। তার চোখে ঝলসে ওঠে তীব্র প্রতিশোধের আ*গুন। তার দৃষ্টি জমে আছে আরভির ওপর। তারপর ধীরে ধীরে সানার দিকে, চোখে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর আনন্দ। যেন এই সুখের দৃশ্যটা তার কাছে একটা খেলা মাত্র। সে আর কেউ না, ‘থমাস স্টিফেন’
তার ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা আরও গভীর হয়। সে ফিসফিস করে নিজের মনে বলে,
-“ফ্যামিলি…হাউ টাচিং, একটা মন্সটারের ও ফ্যামিলি থাকে?….”
তারপর আবার ফিসফিস করে আওড়ায়,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০

-“একটা মন্সটারের ফ্যামিলি থাকতে নেই জেবি কিং”
ঠিক তখনই করিডোরের বিপরীত দিক থেকে ভেসে আসে ভারী পায়ের শব্দ। থমাস ধীরে মাথা তোলে তাকায় নজরে আসে করিডোর ধরে এগিয়ে আসছে “আরজে”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১১